হিন্দু রসায়নী বিদ্যা/ক্রান্তিকাল
ক্রান্তিকাল
৮০০-১১০০ খ্রীষ্টাব্দ
এ যুগের আয়ুর্বেদশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থকার বৃন্দ ও চক্রপাণি। বাগ্ভটের পরবর্তী যুগে ভারতবর্ষে ধাতব ঔষধসমূহের ব্যবহার ক্রমশই বিস্তৃতি লাভ করিতেছিল, এবং তাহার ফলে বনৌষধির উপর নির্ভরও ধীরে ধীরে কমিয়া আসিতেছিল। চক্রপাণি দত্ত এবং তৎপূর্ববর্তী গ্রন্থকর্তা বৃন্দের সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ধাতুঘটিত যৌগিক ব্যবহার পরিপূর্ণরূপেই প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। প্রমাণ স্বরূপ উল্লেখ করা যাইতে পারে যে খ্রীষ্টীয় দশম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া পরবর্তী কালে রচিত আয়ুর্বেদ গ্রন্থের প্রত্যেকখানিতেই ধাতুঘটিত ঔষধগুলির ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। এইখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সুশ্রুতে ঔষধ প্রস্তুত বিধির যে বিবরণ দেওয়া আছে পরবর্তী যুগের কোন চিকিৎসাবিজ্ঞানই তদপেক্ষা উন্নততর বিধি উল্লেখ করিতে সমর্থ হয় নাই।
বৃন্দ এবং চক্রপাণির কালনির্দেশ চরক ও সুশ্রুতের কালনির্দেশ অপেক্ষা অনেকটা সহজ। চক্রপাণি গৌড়াধিপতি নয়পালের রাজবৈদ্য নারায়ণের পুত্র। নয়পাল ১০৪০ খ্রীষ্টাব্দে গৌড়ের সিংহাসনে অধিরোহণ করেন।[১] চক্রপাণি জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন কিন্তু বৌদ্ধধর্মের প্রতি তাঁহার গভীর আস্থা ও প্রগাঢ় শ্রদ্ধা বিদ্যমান ছিল। আত্মপরিচয়ের সূত্রে চক্রপাণি তদীয় গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন,—
গৌড়াধিনাথরসবত্যাধিকারিপাত্র
নারায়ণস্য তনয়ঃ সুনয়োহন্তরঙ্গাৎ।
ভানোরনু প্রথিতলোধ্রবলীকুলীনঃ
শ্রীচক্রপাণিরিহ কর্তৃপদাধিকারী।
বৃন্দ এবং চক্রপাণি উভয়েই নাগার্জুনের প্রতিভাকে স্বীকার করিয়া লইয়াছেন এবং মুখ্যত চরক, সুশ্রুত ও বাগ্ভটের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া গেলেও তন্ত্রোক্ত ঔষধ ও তাহাদের ব্যবহারবিধি উভয়কেই প্রভাবান্বিত করিয়াছে। বস্তুত তাঁহারা ঔষধের কৃতকার্যতাবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অনেকক্ষেত্রে তন্ত্রসুলভ মন্ত্রোচ্চারণবিধি পর্যন্ত অনুসরণ করিতে উপদেশ দিয়াছেন।[২]
বৌদ্ধধর্ম ত্যাগ ও সেবার ধর্ম। মানব ও জীবজন্তু সকলেরই আধিব্যাধি মোচনের চেষ্টা প্রত্যেক বৌদ্ধের অবশ্য-কর্তব্য বলিয়া পরিগণিত হয়। বৌদ্ধযুগে এই উদ্দেশ্যে দেশের সর্বত্র বৌদ্ধ বিহারের সঙ্গে সঙ্গে মানব ও পশুচিকিৎসার জন্য দাতব্য প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হইয়াছিল। যে সকল রুগ্ন ব্যক্তি এই সমস্ত চিকিৎসালয়ে। আসিতে পারিবে না তাহাদের কথাও বৌদ্ধগণের পক্ষে ভুলিয়া যাওয়া সম্ভব ছিল না। যাহাতে তাহাদের চিকিৎসার কোন ব্যাঘাত না হয় তদুদ্দেশ্যে জনাকীর্ণ নগরপ্রান্তে স্তম্ভ উত্তোলন করিয়া তাহার গাত্রে বিভিন্ন ব্যাধির ঔষধ প্রস্তুতপ্রণালী ক্ষোদিত করিয়া দেওয়া হইত। “নাগার্জুনেন লিখিতা স্তম্ভে পাটলিপুত্রকে” একটি ঔষধের প্রস্তুতি ও ব্যবহারবিধি বৃন্দ এবং চক্রপাণি উভয়েই সংকলন করিয়া দিয়াছেন। ইহা হইতে স্পষ্ট বোঝা যায় বৌদ্ধযুগের শ্রেষ্ঠ রাসায়নিক নাগার্জুন বৃন্দ এবং চক্রপাণি উভয়েরই পূর্ববর্তী।
চক্রপাণি বৃন্দলিখিত ‘সিদ্ধিযোগ’কে অনুসরণ করিয়া নিজগ্রন্থ রচনা করেন। বৃন্দ আবার মাধবকরের ‘নিদান’ গ্রন্থ অবলম্বন করিয়া ‘সিদ্ধিযোগ’ প্রণয়ন করিয়াছিলেন। “বৃন্দেন*** সংলিখ্যতে গদবিনিশ্চয়জক্রমেণ” ইত্যাদি উক্তি করিয়া বৃন্দ নিজেই তাহা স্বীকার করিয়া গিয়াছেন।
এই সকল প্রমাণ হইতে মনে হয় বৃন্দ চক্রপাণির এক বা দুই শতাব্দী পূর্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিলেন এবং তাঁহারও অনুরূপ সময় পূর্বে মাধবকরের ‘নিদান’ হিন্দুগণের মধ্যে একখানি অতিপ্রসিদ্ধ চিকিৎসাশাস্ত্রের গ্রন্থ বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছিল। এইভাবে ‘নিদানে’র রচনাকাল অষ্টম শতকে আসিয়া দাঁড়ায়। মুসলমান খলিফাগণের আদেশে এই ‘নিদানে‘র একটি অনুবাদ আরবী ভাষায় প্রকাশিত হইয়াছিল।
বৃন্দব্যবস্থিত তাম্রপর্পটি প্রস্তুতবিধি নিম্নে লিখিত হইল—“গন্ধক, তাম্র এবং মক্ষি (pyrites) একত্র চূর্ণ করিয়া পারদের সহিত মিশ্রিত করিতে হইবে। অতঃপর অন্ধভূষা প্রথায় (ঢাকামুখ পাত্রে) ইহাকে ভস্ম করিয়া মধু সহযোগে সেবন করিতে হইবে।
“একভাগ গন্ধক ও তাহার অর্ধেক পারদ লইয়া উত্তমভাবে মিশ্রিত কর। অতঃপর মধু ও ননী সহযোগে ইহা সেব্য। এই ঔষধের নাম ‘রসামৃতচূর্ণ’।”
“ধুতুরা-রসের সহিত পারদ উত্তমরূপে মিশ্রিত করিয়া প্রলেপ দিলে উকুন মরিয়া যায়।”
চক্রপাণি হইতেও দুই একটি উদাহরণ উদ্ধৃত করা যাইতে পারে। “রসপর্পটিকা খ্যাতা নিবদ্ধা চক্রপাণিনা” বলিয়া ভূমিকা করিয়া চক্রপাণি বলেন, “একভাগ পারদের সহিত একভাগ গন্ধক উত্তমরূপে মর্দন করিলে কজ্জলী অথবা রসপর্পটির উদ্ভব হয়।” বৃন্দও অবশ্য ইহার ব্যবহার নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন। পারদের শোধনপ্রণালী সম্বন্ধে চক্রপাণি সুবিস্তৃত উপদেশ প্রদান করিয়াছেন। তাম্রযৌগিকের চূর্ণ চক্রপাণি ‘তাম্রযোগ’ পর্যায়ে, লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। তিনি বলেন, “অতি পাতলা নেপালী তাম্রের পাত লইয়া তাহাকে গন্ধকচূর্ণ দ্বারা উত্তমরূপে আচ্ছাদিত কর। অতঃপর ইহাকে একটি বাটির ন্যায় পাত্রে রাখিয়া অনুরূপ আর একটি পাত্র দ্বারা ঢাকিয়া দাও। উভয় পাত্রের সংযোগস্থল চিনি অথবা চাউলের গুঁড়া দিয়া বন্ধ করিয়া দিতে হইবে। অতঃপর ইহাকে তিন ঘণ্টা বালির খোলায় উত্তপ্ত করিয়া লইলে ‘তাম্রযোগ’ প্রস্তুত হয়। ইহাকে চূর্ণ করিয়া অন্যান্য ঔষধের সহিত সেবন করিতে হইবে।”
এই যুগে (একাদশ শতাব্দীতে) হিন্দুদিগের আলকিমির (Alchemi) জ্ঞান কতটা ছিল ইহা জানিতে স্বভাবতই কৌতূহল জন্মে। এ সম্বন্ধে আলবেরুনি বলেন, “পৃথিবীর কোন জাতিই আলকিমির প্রভাব হইতে একেবারে মুক্ত নহে। কেহবা ইহাকে অল্প আবার কেহবা ইহাকে অধিক পরিমাণে অনুশীলন করে মাত্র। আলকিমির অনুসরণ দেখিয়া কোন জাতির বুদ্ধিমত্তা অথবা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় পাওয়া যায় না। বহু বুদ্ধিমান ব্যক্তি আলকিমির চর্চা করেন আবার অনেক অল্পবুদ্ধি লোকও আলকিমির অনুশীলনকারিগণকে উপহাস করিয়া থাকেন। এই সকল বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা তাঁহাদের মনগড়া বিজ্ঞান সম্বন্ধে অতিশয় উৎসাহী। কিন্তু তাঁহাদিগকে বড় বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না, কারণ দুর্ভাগ্যকে দূর করিয়া ভাগ্য অনুসন্ধান করিতে তাঁহারা অতিরিক্ত মাত্রায় আগ্রহান্বিত বলিয়াই এইরূপ করিয়া থাকেন। একদা এক সাধুকে প্রশ্ন করা হইল যে, ‘ধনীরা যখন পণ্ডিতের গৃহে পদার্পণ করিতে চায় না তখন পণ্ডিতেরাই বা কেন ধনীর গৃহে উপস্থিত হইয়া জনতার সৃষ্টি করেন?’ সাধুটি ইহার উত্তরে বলেন, ‘ইহার কারণ পণ্ডিতেরা ধনের ব্যবহার বিশেষ রূপে জ্ঞাত আছেন কিন্তু ধনীরা বিজ্ঞানের মর্যাদা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।’ অন্যদিকে আলকিমির প্রতি বীতশ্রদ্ধ বলিয়াই অজ্ঞলোকদিগের প্রশংসা করা যায় না, কারণ তাহাদের উদ্দেশ্যও নিন্দার ঊর্ধ্বে নহে। অন্য কোন কারণে না হইলেও কেবলমাত্র মূঢ়তা ও অজ্ঞতার জন্যই তাহারা আলকিমির প্রতি বীতশ্রদ্ধ।
“হিন্দুগণ এই আলকিমি সম্বন্ধে অসম্ভব রকম উৎসাহী নন। আলকিমির অনুরাগীরা কিন্তু এ সম্বন্ধে সমস্ত তথ্য গোপন রাখিতে প্রয়াস পান এবং নিজ সম্প্রদায়ের লোক ব্যতীত অন্য কাহারও সহিত ইহার আলোচনায় পর্যন্ত সংকুচিত হন। এইজন্য আমি হিন্দুদিগের নিকট হইতে এই শাস্ত্র সম্বন্ধে বিশেষ কোন জ্ঞান সঞ্চয় করিতে পারি নাই। আলকিমি চর্চায় তাঁহারা কি প্রথা অবলম্বন করেন, কোন্ ধাতু সাধারণত তাঁহারা গ্রহণ করেন, ধাতব, জান্তব অথবা ভেষজ কোন্ পদার্থ ব্যবহার করেন আমি তাহার কিছুই জানিতে পারি নাই। কেবল নিম্নলিখিত কয়েকটি প্রক্রিয়ার নাম তাঁহাদের মুখে শুনিয়াছি মাত্র। এগুলি হইল ঊর্ধ্বপাতন, ভস্মীকরণ এবং বিশ্লেষণ * * আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে তাঁহারা ধাতুর ব্যবহারমূলক প্রক্রিয়াগুলিই অধিকতর পছন্দ করেন।
“আলকিমির অনুরূপ তাঁহাদের আর একটি নিজস্ব বিশেষ শাস্ত্র আছে, ইহাকে বলা হয় রসায়ন। এই শাস্ত্র ‘রস’ অথবা স্বর্ণ সম্পর্কিত। এই রসায়ন বলিতে আমরা বুঝি কতকগুলি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এবং উদ্ভিজ্জ পদার্থ হইতে প্রাপ্ত কতকগুলি মৌলিক ও মিশ্রিত ঔষধ। যাহাদের রোগ নিরাময় হইবার কোন আশাই নাই তাহাদের স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার করা, যাহারা বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে তাহাদিগকে নবীন যৌবন দান করাই ইহার উদ্দেশ্য।”
সুশ্রুতের ‘রসক্রিয়া’ শব্দের অর্থ ‘ঘন ক্বাথ’। ইহার পরবর্তী যুগে যখন কেবল উদ্ভিজ্জ ঔষধের পরিবর্তে পারদ ও অন্যান্য ধাতুঘটিত ঔষধের প্রচলন আরম্ভ হইল তখন শরীরস্থ রসের উপর পারদের আশ্চর্য শক্তি দেখিয়া পারদের নাম ‘রস’ রাখা হইল। প্রাচীন গ্রন্থসমূহে রসায়ন শব্দের অর্থ বার্ধক্যনিবারক ও আয়ুবর্ধক ঔষধ। ক্রমশ কেবলমাত্র পারদ ও ধাতুসঞ্জাত আয়ুবর্ধক ঔষধকেই রসায়ন বলিয়া অভিহিত করিবার প্রথা বিস্তৃতি লাভ করিল।
- ↑ নয়পালের যুগ সম্বন্ধে নিম্নলিখিত পুস্তিকাসমূহ দেখিতে হইবে— (1) Cunningham's Archaeological Survey of India, III. p. 119. (2) Journ. As. Soc. LX, Pt. 1. p., 46. (3) Life of Atisa by S. C. Dasa.
- ↑
অয়ং মন্ত্রঃ প্রযোক্তব্যো ভিষজা চাভিমন্ত্রণে॥
ওঁনমো বিনায়কায় অমৃতং রক্ষ রক্ষ মম ফলসিদ্ধিং
দেহি দেহি রুদ্রবচনেন স্বাহা।১৭। বৃন্দরসায়নাধিকারঃ। Poona Edition, p. 518.
ইদমিহ দৃষ্টোপকরণমেতদৃষ্টন্তুমন্ত্রেণ।
স্বাহান্তেন বিমর্দো ভবতি ফড়ন্তেন লোহবলরক্ষা।
সনমস্কারেণ বলির্ভক্ষণময়সো হূমন্তেন॥
‘ওঁ অমৃতোদ্ভবায় স্বাহা।’‘ওঁ অমৃতে হ্ণং ফট্।’
‘ওঁ নমশ্চণ্ডবজ্রপাণয়ে মহাযক্ষসেনাধিপতয়ে সুরগুরুবিদ্যামহাবলায় স্বাহা।’ ‘ওঁ অমৃতে হ্ণং।’
ইতি চক্রপাণিরসায়নাধিকারঃ।