বিষয়বস্তুতে চলুন

হিন্দু রসায়নী বিদ্যা/প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞানের অবনতি

​

প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞানের অবনতি

 প্রাচীন ভারতে উচ্চবর্ণের লোকেরাই শিল্পবিজ্ঞানের চর্চা করিতেন। শ্বেত, যজুর্বেদ অথবা তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে আমরা যে সকল বৃত্তির উল্লেখ দেখি তাহা হইতে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার কিছুটা অনুমান করা যায়। দুঃখের বিষয় জন্মগত জাতিভেদ প্রথা প্রবর্তিত হইবার ফলে শিল্পবিজ্ঞানের চর্চায় বিশেষ ব্যাঘাত জন্মিয়া ছিল। বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্রে’ উল্লিখিত চৌষট্টি কলার মধ্যে নিম্নলিখিত কয়েকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য—

 সুবর্ণরত্নপরীক্ষা—স্বর্ণ এবং রত্নাদির পরীক্ষা ও মূল্য নিরূপণ।

 ধাতুবাদ—ধাতুনিষ্কাশন এবং রসায়নের চর্চা।

 মণিরাগাকরজ্ঞান—মণিরত্নাদির বর্ণ ও খনি প্রভৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান।

 শুক্রাচার্য কথিত ‘শুক্রনীতিসার’ গ্রন্থেও বিভিন্ন কলার বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে। যথা—‘পাষাণধাত্বাদিদৃতিস্তভস্মীকরণং কলা’ অর্থাৎ ধাতু ও প্রস্তরসমূহ বিদ্ধকরণ ও তাহাদের ভস্মীকরণ সম্পর্কিত কলা। ‘ধাত্বৌষধীনাং সংযোগক্রিয়াজ্ঞানং কলা স্মৃতা’—ধাতু এবং লতাপাতার সংযোগ কলা হিসাবে গণ্য হইত।

ধাতুসাঙ্কর্যপার্থক্যকরণন্তু কলা স্মৃতা।
সংযোগাপূর্ববিজ্ঞানং ধাত্বাদীনাং কলা স্মৃতা॥

 ধাতুমিশ্রণ (alloying) প্রস্তুতি ও তাহাদের বিশ্লেষণ বিভিন্ন কলার অন্যতম।

 কবি বাণের জনৈক বন্ধু ধাতুনিষ্কাশন ব্যবসায় করিতেন। সংস্কৃত সাহিত্যে ‘লোহবিদ্‌’ ও ‘ধাতুবিদ্’ প্রভৃতি শব্দের বহুল ব্যবহার দেখিয়া অনুমান করা যায় তখনকার দিনে ধাতুনিষ্কাশকসম্প্রদায় সমাজে অপেক্ষাকৃত সম্মানের আসনই অধিকার করিয়াছিলেন। রঞ্জনশিল্প ও ভারতবর্ষে সাফল্য ও সমৃদ্ধি অর্জন করিয়াছিল।

​ বৈদিক যুগে ঋষিরা কেহই জাতিগত বৃত্তি অবলম্বন করিতে বাধ্য ছিলেন না, আপন আপন রুচিপ্রবৃত্তি এবং সুযোগসুবিধা অনুযায়ী বৃত্তি অবলম্বনের স্বাধীনতা সকলেরই ছিল। বৌদ্ধপরবর্তী যুগে যখন ব্রাহ্মণ্য ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করিল তখন কিন্তু অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়া গেল। যাজক সম্প্রদায়ের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করিতে গিয়া মনু প্রভৃতি পরবর্তী পুরাণ রচয়িতারা নূতন নূতন নিয়মের নাগপাশে সমগ্র সমাজকে বাঁধিয়া ফেলিলেন। সুশ্রুতের মতে শল্যশাস্ত্রের শিক্ষার্থীর পক্ষে শবব্যবচ্ছেদ অবশ্য-কর্তব্য বলিয়া নির্ধারিত হইলেও মনু ব্যবস্থা দিলেন শব স্পর্শ করিলেই ব্রাহ্মণ অশুচি হইবেন। বাগ‍্ভটের অল্পকাল পরেই শল্যশাস্ত্র এবং শারীরস্থান (anatomy) ক্রমশ নিন্দনীয় বলিয়া গণ্য হইতে আরম্ভ করে এবং শেষ পর্যন্ত এই দুইটি বিজ্ঞান হিন্দুদিগের পক্ষে লুপ্ত-বিজ্ঞান হইয়া দাঁড়ায়। তথাকথিত উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকেরা সমাজের অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরে ব্যক্তিগণের হস্তে কলাচর্চার ভার অর্পণ করিয়া নিজেরা অন্য ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করিলেন।

 অনভিজাত শ্রেণীর হস্তে শিল্পকলার ভার অর্পিত হওয়ায় এবং জন্মগত জাতিভেদ প্রথা প্রবর্তিত হওয়ায় অবশ্য কিছুটা সূক্ষ্মতা এবং শ্রেষ্ঠত্ব শিল্পসমূহে আমদানি হইয়াছিল, কিন্তু যে মূল্যে ইহা পাওয়া গিয়াছিল .তাহা ভারতে জ্ঞানবিজ্ঞানের সমাধি রচনার পক্ষে পর্যাপ্ত ছিল। বুদ্ধিমান ও শিক্ষিতসমাজ শিল্পসমূহের দিক হইতে দৃষ্টি সরাইয়া লওয়ায় শিল্পগুলির পক্ষে গতানুগতিকতার হাত হইতে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব হইয়া উঠিল, ‘কি এবং কেন’ যাহারা বুঝিতে পারিত তাহারা নিরাসক্ত হওয়ায় শিল্পগুলির ক্রমোন্নতি বা অগ্রগতিতে পূর্ণচ্ছেদ পড়িয়া গেল। পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের সহিত হিন্দুমনীষার সংস্রব ছিন্ন হওয়ায় ভারতভূমিতে বয়েল বা নিউটনের আবির্ভাব অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইল।

 হিন্দুধর্মের পুনরভ্যুদয়ের যুগে ভারতীয় সমাজে যে বিরাট পরিবর্তনের সূচনা দেখা দিল ভারতে বিজ্ঞানের অবনতির কারণ নির্দেশ করিতে বসিয়া তাহাকেও ​একেবারে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। শংকরাচার্য কর্তৃক পরিমার্জিত এবং পরিবর্তিত বেদান্তদর্শনের ভাষ্যে পার্থিব সুখসুবিধার মূল্যহীনতায় এত জোর দেওয়া হইল যে ভারতবর্ষে বিজ্ঞানচর্চার প্রেরণা আর প্রতিষ্ঠালাভ করিতে সমর্থ হইল না। বিজ্ঞানচর্চা ক্রমশ অধিকতর নিন্দনীয় হইয়া উঠিল। কণাদ এবং তদীয় দর্শনের প্রতি শংকরের বিরাগ সুস্পষ্ট:

 তস্মাদেবমসারতরতর্কসংদূব্ধত্বাৎ ঈশ্বরকারণশ্রুতিবিরুদ্ধত্বাৎ শ্রুতিপ্রবণৈশ্চ শিষ্টের্মন্বাদিভিরপরিগৃহীতত্বাৎ, অত্যন্তমেবাহনপেক্ষাস্মিন্ পরমাণুকারণবাদে কার্যাহর্যৈঃ শ্রেয়োঽর্থিভিরিতি বাক্যশেষঃ।২।২০১৭ সূত্রভাষ্যম্॥

 জাতিভেদ প্রথায় জর্জরিত, এবং বেদ পুরাণ স্মৃতি শাসিত, পরলোকে নিবদ্ধদৃষ্টি হতভাগ্য হিন্দুজাতির ক্ষুরধার বুদ্ধি এবং অপরিমিত মনীষা বিজ্ঞানের ক্ষেত্র হইতে বিচ্যুত হইয়া অন্ধকারে ঘুরিয়া বেড়াইতে আরম্ভ করিয়াছে। গৌরবময় অতীতের ইতিহাস তাহাকে একদিন প্রেরণা দিবে এই উদ্দেশ্যেই হিন্দু রাসায়নী বিদ্যার ইতিহাস আজ তাহার জানা প্রয়োজন।