বিষয়বস্তুতে চলুন

হিন্দু রসায়নী বিদ্যা/বৈদিক যুগ

​

বৈদিক যুগ

 বিভিন্ন সভ্য জাতির রাসায়নিক জ্ঞানের মূল উৎস সন্ধান করিতে গেলে প্রথমেই লক্ষ্য করা যায় যে, সকল ক্ষেত্রেই রাসায়নিক জ্ঞানের মূলে রহিয়াছে চিকিৎসাবিজ্ঞান, ধাতুনিষ্কাশন এবং পরশপাথরের অনুসন্ধান। অতীত ভারতে রসায়নশাস্ত্রের অনুশীলন প্রধানত চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিপূরক হিসাবেই অনুসৃত হইয়াছিল, পরবর্তী কালে অবশ্য উহা ধর্মানুশীলনের পর্যায়ে পড়িয়া তন্ত্রশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত হইয়া যায়।

 ইউরোপীয় জাতিসমূহ এবং আরববাসীদিগের মধ্যে পরশপাথর ও অমৃতের অনুসন্ধান হইতে রসায়নশাস্ত্রের প্রথম উৎপত্তি। অতঃপর প্যারাসেলসসের সময় হইতে (১৪৯৩-১৫৪১ খ্রী.) সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহায়করূপেই রসায়নের ক্রমবিকাশ সাধিত হইয়াছিল। ভারতে কিন্তু যোগের অঙ্গরূপে রসায়নের সম্যক্ অনুশীলন নিয়মিত ভাবে করা হইত। গজনীপতি সুলতান মামুদের সমসাময়িক আলবেরুনি তাঁহার ভারতবর্ষ সম্বন্ধীয় পুস্তকের একস্থানে লিখিয়াছেন যে পতঞ্জলির মতে রসায়ন মোক্ষলাভের একটি উপায়। ইহার পরে রসায়ন ক্রমশ তন্ত্রশাস্ত্রের সহিত ঘনিষ্ঠ হইতে ঘনিষ্ঠতর রূপে সংশ্লিষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল।

 হিন্দুর বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের মধ্যে বেদ প্রাচীনতম এবং হিন্দুগণ বেদকে অপৌরুষেয় বলিয়া বিবেচনা করেন। ঋগ‍্বেদে দেববৈদ্য অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের স্তবে উল্লিখিত হইয়াছে, তাঁহারা অন্ধকে দৃষ্টি এবং খঞ্জকে চলৎশক্তিদানে সমর্থ ছিলেন। গ্রীক পুরাণের দিওস‍্কুরোয়ের (Dioskouroi) সহিত অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের যথেষ্ট সাদৃশ্য দেখিতে পাওয়া যায়। বেদে বর্ণিত বিশ‍্পলা নাম্নী কুমারীর উপাখ্যানে দেখা ​যায় বিশ‍্লার একখানি পা কোন যুদ্ধে কাটা পড়িলে অশ্বিনীকুমারেরা তাঁহাকে লোহার পা তৈয়ারি করিয়া দিয়াছিলেন।

 ঋগ্‌বেদের শ্রেষ্ঠ দেবতামণ্ডলীর প্রায় সকলকেই মৌলিক পদার্থনিচয় এবং প্রাকৃতিক ঘটনাসমূহের প্রতীক মাত্র বলিয়া মনে হয়। অগ্নি, বায়ু, সূর্য প্রভৃতি ইহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এতদ্ব্যতীত রোগনিবারক অথবা রোগপ্রতিষেধক বনৌষধিসমূহকেও দেবগণের সমান মর্যাদা দিয়া অনেক স্তব রচনা করা হইয়াছে। বৈদিক ঋষিগণের মধ্যে সোমলতার পূজা বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল, সোমরসকে তাঁহারা অমৃত বলিয়া গণ্য করিতেন। এই সোমরসই দেবতাদিগকে অমরতা দান করিয়াছিল; ইহা ব্যাধিনাশক। সোমদেব রোগমাত্রকেই আরোগ্য, করিয়া থাকেন।

 বেদে রোগনিবারক অনেক ওষধি ও লতাপাতার উচ্ছ্বসিত গুণকীর্তন দেখিতে পাওয়া যায়। একটি স্তবে বলা হইয়াছে, “হে দেব বরুণ, শত সহস্র ওষধি তোমার।”

দুই-একটি শ্লোকের উল্লেখ এখানে অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। বেদের সূক্তে বলা হইয়াছে—

যা ঔষধীঃ পূর্বা জাতা দেবেভ্যস্ত্রিযুগং পুরা।
মনৌ নু বভ্রূণামহং শতং ধামানি সপ্ত চ
শতং বো অস্ব ধামানি সহস্রমুত বো রুহঃ।

অধা শতকৃত্বো যূয়মিমং মে অগদং কৃত॥

 অথর্ববেদে ব্যাধির চিকিৎসায় মন্ত্রতন্ত্রের বহুল উল্লেখ থাকিলেও মূলত ইহা উদ্ভিজ্জ দ্রব্যসমূহের নানাপ্রকার ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্বন্ধীয় তথ্যে পরিপূর্ণ। অথর্ববেদে অপামার্গকে[১] “আরোগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং সমস্ত বনৌষধির রাজ্ঞী” বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। হিন্দু চিকিৎসাবিজ্ঞানে আজিও অপামার্গকে রেচক ও মূত্রবর্ধক বলিয়া অতি উচ্চস্থান দেওয়া হয়। একটি শ্লোকে সোমলতা ​সম্বন্ধে বলা হইয়াছে, “এই ব্যক্তিকে আমরা অমৃতের শক্তি পান করিতে দিতেছি, এতদ্ব্যতীত সে যাহাতে শতায়ু হয় তাহার ঔষধ প্রস্তুত করা হইয়াছে।” কুষ্ঠ নিবারণে একটি কৃষ্ণবর্ণ বনজ ঔষধির ব্যবহারের উল্লেখ অথর্ববেদে দেখিতে পাওয়া যায়,―“রাত্রিতে তোমার জন্ম, হে লতা! তুমি ঘন, চিক্কণ, কৃষ্ণবর্ণী। তুমি এই কুষ্ঠ রঞ্জিত কর এবং ধবল চিহ্ন দূর করিয়া দাও।” কেশোৎপাদনকারী একটি বিশেষ ওষধি সম্বন্ধে অথর্ববেদে বলা হইয়াছে, “দেবী পৃথিবীর বুকে দেবীর ন্যায় তোমার উদ্ভব, হে লতা, আমরা তোমাকে মাটি খুঁড়িয়া তুলিয়াছি, হে নিতত্নি, তুমি কেশসমূহকে দৃঢ় কর। পুরাতন কেশকে শক্ত কর, নূতন কেশ উৎপাদন কর এবং নূতন কেশ যাহা উদ্‌গত হইয়াছে তাহাকে সুন্দর কর।”

 বৈদিক যুগে জন্মগত জাতিভেদ প্রথা বর্তমান না। থাকিলেও চিকিৎসাবিদ্যার চর্চা উত্তরাধিকার সূত্রে আরম্ভ করা হইয়াছিল। ঋগ‍্বেদে জনৈক ঋষি কথাপ্রসঙ্গে বলিতেছেন,—

 “আমি শ্লোকরচনাকারী, আমার পিতা চিকিৎসক, মাতা জাঁতায় শস্য পিষিয়া থাকেন। আমরা সকলেই ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসায়ে নিযুক্ত।”[২]

 অথর্ববেদ ঋগ‍্বেদের অনেক পরে রচিত। কিন্তু আমরা ঋগ‍্বেদেই হিন্দু চিকিৎসাশাস্ত্রের বহুল উল্লেখ দেখিতে পাই। অথর্ববেদ প্রধানত যাদুবিদ্যা, প্রেতপূজা, মায়াজাল ও সম্মোহনবিদ্যার চর্চায় মুখর। ইহাতে দুষ্কৃতিকারীর প্রতি দুরন্ত অভিশাপ বর্ষণ, শত্রুকে হতবাক্ ও দুর্বল করিবার জন্য নানাপ্রকার মন্ত্রতন্ত্র উচ্চারণ, শত্রুনিধনে বহুবিধ যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান, বিবিধ ওষধি প্রয়োগে রমণী বশীকরণ প্রভৃতি বিষয়ের বিস্তারিত নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। এই দিক দিয়া দেখিতে গেলে অথর্ববেদের সহিত প্রাচীন মিশরীয় ও গ্রীক শাস্ত্রসমূহের যথেষ্ট সাদৃশ্য বর্তমান।

 আপন আপন স্বার্থসিদ্ধি এবং অসদভিপ্রায় চরিতার্থ করিবার উদ্দেশ্যে আধি​ভৌতিক ব্যবস্থার স্মরণ লইবার প্রেরণা দেওয়ায় অন্যান্য বেদের সহিত অথর্ববেদকে সমান আসন বা সম্মান দেওয়া হয় নাই। ঋক্, যজুঃ ও সামবেদ হিন্দুর শাস্ত্রগ্রন্থ হিসাবে পূজিত হইয়াছে, কিন্তু অপস্তম্ব, যাজ্ঞবল্ক্য অথবা মনুপন্থীরা অথর্ববেদকে ধর্মগ্রন্থ বলিয়া স্বীকারই করেন নাই, বরঞ্চ অথর্ববেদোক্ত বিধিসমূহকে নিন্দাই করিয়া গিয়াছেন। বস্তুত প্রাচীন ভারতে হিন্দু চিকিৎসাবিজ্ঞান মন্ত্রতন্ত্র ও যাদুবিদ্যার প্রভাব একেবারে কাটাইয়া উঠিতে পারে নাই বলিয়া চিকিৎসকসম্প্রদায়কে কোনদিনই বিশেষ সম্মানের আসন প্রদান করা হয় নাই। হিন্দু ব্যবহারশাস্ত্রে তাহাদিগকে অবহেলাই করা হইয়াছে এবং প্রধানত এই ব্যবহারশাস্ত্রের মত অনুসরণ করিয়া মহাভারতে চিকিৎসকগণকে ‘নীচ’ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। তৎসত্ত্বেও একথা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে যে অথর্ববেদের গুণগ্রাহী এবং অনুসরণকারীরা কি শত্রুনিপাতে, কি রোগচিকিৎসায় জনসাধারণের বিশেষ করিয়া দেশের শাসকসম্প্রদায়ের প্রভূত কল্যাণসাধন করিয়াছেন।

 অথর্ববেদের চর্চা হইতেই ভারতে তথাকথিত ‘আলকিমি’র জন্ম হইয়াছে বলিতে পারা যায়। অথর্ববেদে মুক্তা, স্বর্ণ ও সীসকের প্রভূত প্রশস্তি দেখিতে পাওয়া যায়। একটি শ্লোকে বলা হইয়াছে, “বহ্নিসম্ভূত স্বর্ণব্যবহারকারী দীর্ঘ জীবন লাভ করে।” অপর একটি শ্লোকেও উল্লিখিত হইয়াছে, “সূর্যপ্রদত্ত স্বর্ণ উজ্জ্বল বর্ণবিশিষ্ট। যাহারা ইহা ব্যবহার করে তাহারাও দীর্ঘায়ু হয়।” স্বর্ণকে জীবনীশক্তি এবং আনন্দবর্ধক আর সীসককে দুষ্টপ্রভাব দূরীকরণে সমর্থ বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। যথা—

 “সীসকে বরুণ দিয়াছেন আশীর্বাদ, অগ্নি দিয়াছেন শক্তি। ইন্দ্র আমাকে দিয়াছেন এই সীসক, দুষ্টপ্রভাব দূরীকরণে ক্ষমতা ইহার অব্যর্থ।”[৩]

 বৈদিক যুগে হিন্দু চিকিৎসাশাস্ত্র পূর্ণাঙ্গ হইয়া গড়িয়া উঠে নাই অথবা ইহা ​সর্বাংশে যুক্তিবাদের উপরও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। কিন্তু তাহা হইলেও বেদে এই সম্পর্কে যাহা-কিছু উল্লিখিত হইয়াছে তাহাকে নিতান্ত উপেক্ষণীয় মনে করিলে ভুল করা হইবে। হিন্দু রসায়নচর্চার ধারা অনুসরণ করিতে গেলে বৈদিক যুগের পরেই আসিবে আয়ুর্বেদের যুগ। এই যুগে হিন্দু চিকিৎসাশাস্ত্র যুক্তিবাদ ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত দেখিতে পাওয়া যায়। হিন্দু রসায়নশাস্ত্রের ইহাই হইল এক গৌরবময় যুগ।

  1. ↑ Botanical name-Achyranthes aspera.
  2. ↑ R. C. Dutt-Civilisation in ancient India-p. 65.
  3. ↑ “To the lead Varuna gives blessing, to the lead Agni gives help. Indra gave me the lead: unfailingly it dispels sorcery."-Bloomfield's Atharva Veda―pp. 62-65.