বিষয়বস্তুতে চলুন

হিমালয়-অভিযান

উইকিসংকলন থেকে
হিমালয়-অভিযান
​

হিমালয়-অভিযান

শ্রীযোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত

কলিকাতা

১০ই অগ্রহায়ণ, ১৩৪৮

page

​


সুচীপত্র

১
৪১
৪৭
১৩১
১৪৫
১৫২
১৯৭

page

​ ‘শিশু-ভারতী’ সম্পাদনার সময় বিদেশীয় দুর্গমযাত্রীদের জীবনী ও তাঁহাদের অভিযান বিবরণ প্রকাশ করিবার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হইয়াছে, আমাদের ভারতীয়দের মধ্যে কি দুর্গমের অভিযাত্রী কেহ নাই? ইহা কখনও সম্ভবপর নহে। এজন্য এবিষয়ে নানাভাবে অনুসন্ধান করিতে আরম্ভ করি এবং তাহারই ফলে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে যে সমুদয় অসমসাহসিক দুর্গমের যাত্রী বা Explorer-এর পরিচয় পাইয়াছি, এ-গ্রন্থমধ্যে তাঁহাদের কয়েকজনের অভিযান বিবরণ প্রকাশ করা হইল।

 বৌদ্ধযুগে ভারতীয় বৌদ্ধশ্রমণেরা পর্ব্বতের তুঙ্গশৃঙ্গ ও তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ সমুদ্র লঙ্ঘন করিয়া তিব্বত, চীন, মধ্যএসিয়া, সিংহল, ব্রহ্মদেশ, সুমাত্রা, যবদ্বীপ প্রভৃতি নানাস্থানে গিয়া যেমন বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন; তেমনি ঐসব দেশের লোকদের মধ্যে ভারতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রচার করেন। তাঁহাদের কয়েকজনের বিষয় মনিষী শরৎচন্দ্র দাশ তৎপ্রণীত “Indian Pundits in the land of snow” নামক গ্রন্থে প্রকাশ করিয়াছেন। ঐ সকল বৌদ্ধ পণ্ডিতদের সম্বন্ধে সবিস্তারে জানিতে হইলে বৌদ্ধ গ্রন্থাদি এবং চীন দেশীয় পর্যটক ফাহিয়ান, ইউয়ান্‌চাং, ইৎসিং প্রভৃতির লিখিত ভ্রমণ বিবরণ পাঠ করিতে হয়। শরৎচন্দ্র তদীয় গ্রন্থে শান্তরক্ষিত, পদ্মসম্ভব, কুমারজীব, ধর্ম্মকীর্ত্তি প্রভৃতি প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ পণ্ডিতদের নামোল্লেখ করিয়াছেন। ইঁহারা তিব্বতে, চীনে ও মধ্যএসিয়ায় গমন করিয়াছিলেন।

​ আমরা এই গ্রন্থে সর্ব্বজনবিদিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশের তিব্বত-যাত্রা এবং কুমারজীবের দুর্গম অভিযানের বিষয় বলিয়াই ঊনবিংশ শতাব্দীর দুর্গম যাত্রীদের কয়েকজনের পরিচয় প্রদান করিলাম।

 ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দে ক্যাপ্টেন মণ্টগোমেরি (Captain Montgomerie R E, F, R, S.) নামক ভারতীয় জরিপ বিভাগের (Indian survey office) একজন সুদক্ষ কর্ম্মচারী কয়েকজন ভারতবাসীকে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে কিভাবে অভিযান করিতে হয় তৎসম্বন্ধে শিক্ষা প্রদান করেন। তাঁহারা “Pundit Explorers” নামে অভিহিত হন। ইঁহাদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় শ্রেণীর লোকই ছিলেন, যদিও ইঁহারা সকলেই পণ্ডিত নামে আখ্যাত হইতেন। ইহাদের কথা বলিতে গিয়া Captain J. B. Noel তাঁহার লিখিত “Through Tibet to Everest” নামক গ্রন্থে লিখিয়াছেন: “In 1860 Captain Montgomerie, an active officer of the Indian Survey, hit upon the idea of training certain intelligent Indians in the use of scientific instruments. They became known as the ‘Pundit Explorers.’ Thy were not all Hindus although styled Pundits.” আতা মুহম্মদ (Ata Mahomed) “মোল্লা” (The Mullah) নামে পরিচিত ছিলেন। ইনি সিন্ধু নদের উৎসসন্ধানে গমন করিয়া অসাধারণ সাহসিকতার ও কষ্টসহিষ্ণুতার পরিচয় দেন। আমরা এখানে তাঁহার লিখিত বিবরণ প্রকাশ করিয়াছি। মির্জা সুজা (Mirza Shuja) নামক পারশ্যদেশবাসী মুসলমান ​আফগানিস্থান ও পামির অভিযানে গমন করিয়া বোখারা (Bokhara) নগরে নিদ্রিত অবস্থায় শত্রুহস্তে নিহত হন।

 অনেক দিন পর্য্যন্ত এই সব দুঃসাহসিক অভিযানকারীদের বিষয় জনসাধারণের নিকট প্রচারিত হয় নাই। এমন কি তাঁহাদের নামও প্রকাশিত হইত না। কল্যাণ সিংহ “A. K.” এবং হরিরাম—যিনি এভারেষ্ট অভিযান করেন তিনি “M. H.” নামে পরিচিত হন।

 এই সব অভিযানকারীরা তাঁহাদের যাত্রাপথে প্রতি পদক্ষেপের সহিত জমির পরিমাপ করিতেন, দূরবর্ত্তী পর্ব্বতশ্রেণীর দূরত্ব, উচ্চতা, পথ-ঘাট, নদ-নদী, লোকজন, কৃষিক্ষেত্র, হ্রদ, এসব নানা বিষয়ের সন্ধান লইতেন এবং দুর্দ্দান্ত দস্যু-তস্করের হস্ত হইতে ও বিদেশী পর্য্যটক মাত্রেরই প্রতি সন্ধিগ্ধ প্রকৃতির তিব্বতীয় রাজপুরুষদের নিকট তীর্থযাত্রীরূপে আত্ম-গোপন করিয়া চলিতেন। রাত্রিবেলা প্রার্থনাচক্রের (prayer wheel) মধ্যে গোপনে সংগৃহীত তথ্য লিখিয়া লুকাইয়া রাখিতেন। ফাঁপা লাঠির ভিতরে তাঁহাদের Boilingpoint thermometer থাকিত। নোয়েল সাহেব বলেন এই সব দুর্গম যাত্রীদের ভাগ্যে মিলিত...“only a few rupees a month. They were rewarded only when they returned—if they returned!” মাসিক সামান্য কয়েকটি টাকা মাত্র মিলিত শুধু তাঁহাদের ব্যয়ের জন্য আর যদি ফিরিয়া আসিতে পারিতেন তবে তাঁহাদের ভাগ্যে মিলিত যৎকিঞ্চিৎ পারিতোষিক মাত্র! শারীরিক ক্লেশ, অনাহার, দস্যু তস্করের হস্তে নির্য্যাতন ইহাই হইত তাঁহাদের এইরূপ অভিযানের প্রাত্যহিক পুরস্কার।

​ এখানে এই সব পণ্ডিত দুর্গম-যাত্রীদের সকলের কথা প্রকাশ করিতে পারিলাম না। আমরা দীপঙ্কর অতীশ শ্রীজ্ঞান ও কুমারজীবের পরেই ঊনবিংশ শতাব্দীর দুর্গমের অভিযাত্রী পণ্ডিত কিষণ সিংহ, কিন্‌থাপ, লালা, শরৎচন্দ্র দাশ ও আতা মুহম্মদের বিবরণ মাত্র প্রকাশ করিলাম। অন্যান্য ভারতীয় অভিযানকারীদের বিবরণ প্রকাশ করিতে গেলে এক বিরাট গ্রন্থ হইয়া পড়ে।

 পণ্ডিত নৈনসিং (Nain Shing) ১৮৭৩-৭৪-৭৫ খ্রীষ্টাব্দে হিমালয়-অভিযান করেন। তাঁহার পর্য্যটন বিবরণ নানা তথ্যে পূর্ণ। নৈনসিংহের লিখিত পর্য্যটন কাহিনী প্রকাশ করিতে গেলে একখানি স্বতন্ত্র গ্রন্থ লিখিতে হয়। নৈনসিং আলমোরা জেলার মিলাম নামক গ্রামের গভর্মেণ্ট ভার্ণেকুলার স্কুলের (Government Vernacular) School) হেড্‌মাষ্টার ছিলেন। ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্য্যন্ত তিনি শিক্ষা বিভাগের সহিত সংশ্লিষ্ট ছিলেন। পরে তিনি Great Trigonometrical Survey বিভাগের অধ্যক্ষ কর্ণেল জে, টি, ওয়াকারের (Colonel J. T. walker, R. E.) উৎসাহে দুর্গমের যাত্রী হইবার অভিলাষী হইয়া তৎসম্বন্ধে যথোপযুক্ত শিক্ষা লাভ করিয়া হিমালয়ের দুর্গম প্রদেশে অভিযান করেন এবং বিবিধ আবিষ্কার দ্বারা অপূর্ব্ব কীর্ত্তি রাখিয়া গিয়াছেন। আমরা প্রসঙ্গক্রমে এই গ্রন্থ মধ্যে তাঁহার নাম উল্লেখ করিয়াছি। ডাক্তার স্‌ভেন হেডিন্ (Sven Hedin) তাঁহার লিখিত “Trans-Himalaya” নামক বিখ্যাত গ্রন্থে নইনসিং মধ্য তিব্বতে যে হ্রদ আবিষ্কার করেন তাহার উল্লেখ করিয়াছেন। হেডিন্ তাঁহার তিব্বত-ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলিয়াছেন “One of my aims was to find an opportunity of visiting one or ​more of the great lakes in Central Tibet which the Indian pundit, Nain Sing, discovered in 1874, and which since then had never been seen except by the natives. During my former journey I had dreamt of discovering the source of the Indus, but it was not then my good fortune to reach. The mysterious spot had never been inserted in its proper place on the map of Asia—but it must exist somewhere.” [Trans-Himlaya vol. I. pp. 2-3] অর্থাৎ আমার এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, ১৮৭৩ খ্রীষ্টাব্দে ভারতীয় পণ্ডিত-অভিযানকারী নৈনসিং মধ্যতিব্বতে যে সব হ্রদ আবিষ্কার করিয়াছিলেন সে সকল বৃহত্তম হ্রদের কয়েকটি স্বচক্ষে পর্য্যবেক্ষণ করা। ঐ সব হ্রদ তিব্বতীয়েরা ব্যতীত বিদেশীয় পর্য্যটকদের মধ্যে নৈনসিং ভিন্ন অপর কেহ দেখিতে পারেন নাই। নৈনসিংয়ের শ্রেষ্ঠত্ব ইহা হইতেই উপলব্ধি হইবে। আর সিন্ধু নদের উৎস সন্ধানে মোল্লা আতা মুহম্মদ ভারতীয়দের অসাধারণ গৌরব বৃদ্ধি করিয়াছেন।

 কিন্‌থাপ সম্বন্ধে কাপ্তেন নোয়েল সাহেব বলেন; “One of the most romantic of all these adventures was that of the Pandit Kinthup. He was sent to trace the courses of the great Tibetan river, the Tsanpo and to find out if it was the same streamn as the Brahmaputra which pours into India from the Himalayas through the impenetrable forests of the Abor savages.”

 কিন্‌থাপ ব্রহ্মপুত্রের উৎস সন্ধানে প্রেরিত হইয়াছিলেন। তাঁহার এই অভিযান ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ। তিব্বতীয়দের হস্তে তিনি বন্দী হইয়াছিলেন, সঙ্গী চৈনিক লামা কর্ত্তৃক ক্রীতদাসরূপে বিক্রীত হইয়া​ছিলেন এবং নানারূপ অবস্থান্তরের মধ্য দিয়া কিন্‌থাপ দেশে ফিরিয়া আসেন। তাঁহার অভিযান বিবরণ প্রথমে অনেকে অলীক বলিয়া মনে করেন কিন্তু ভারতীয় জরিপ বিভাগ বিবিধ প্রমাণের দ্বারা জানিতে পারেন যে তাঁহার অভিযান বিবরণ অসত্য নহে। [The Survey story he gave of his wanderings was so romantic that many disbelieved him, but the Department trusted his account officially; and, indeed, later his discoveries were proved true. Kintup received just reward for his devotion. The Geographical Society honoured him, while the Indian Government gave him Order of Commander of the Indian Empire and a gift of a prosperous village where he could spend the remainder of his days.] ভৌগোলিকসমিতি এবং ব্রিটিশ গভর্ণমেণ্ট এই দুঃসাহসিক অভিযানকারীকে তাঁহার অভিযানের পুরস্কারস্বরূপ সি, আই, ই উপাধি দান করেন এবং একখানি গ্রাম জায়গীরস্বরূপ দিয়াছিলেন। কিন্‌থাপ তাঁহার শেষ জীবন এইভাবে নিরাপদে ও শান্তিতে অতিবাহিত করিয়াছিলেন।

 ‘এভারেষ্ট—অভিযান’ সম্পর্কে কোনও কল্পনা যখন ইউরোপীয় ভৌগোলিক সমিতি করেন নাই, সে সময়ে হরিরাম বা “M. H.” পর্য্যটকরূপে এভারেষ্ট অভিযানে অগ্রসর হইয়াছিলেন। তিনি নেপালের অন্তর্গত কোশি নদীর পথে অগ্রসর হইয়া, এভারেষ্ট গিরিশৃঙ্গের পশ্চিম দিকে অবস্থিত ২০,০০০ ফিট উচ্চ দুর্গম গিরিবর্ত্ম অতিক্রম করিয়া তিব্বতের সীমান্তবর্ত্তী গিরিশ্রেণীর উত্তর দিকের দিঙ্গ্রি (Dingri) নামক স্থানে উপনীত হন। এভারেষ্টের উত্তরাংশের অভিনব ভৌগোলিক বিবরণ তিনি সংগ্রহ করিয়াছিলেন, কিন্তু সম্মুখস্থ দুরধিগম্য তুষারমৌলি ​বিরাট গিরি-শ্রেণীর জন্য আর অধিক দূর অগ্রসর হইতে পারেন নাই। হরিরাম দিঙ্গ্রিতে গিয়া লোকমুখে শুনিয়াছিলেন যে দূরবর্ত্তী বরফাবৃত গিরিশৃঙ্গের মধ্যেও বৌদ্ধমঠ (Lamasery of the snows) আছে।

 হরিরাম ও শরৎচন্দ্র দাশ এই দুইজন নির্ভীক ও দুঃসাহসিক পর্য্যটক ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে এভারেষ্ট অভিযান করিয়া ভারতীয় অভিযানকারীদের গৌরব বৃদ্ধি করিয়াছেন। এ প্রসঙ্গে নোয়েল সাহেব বলেন: ‘This journey of “M. H.” and that of Sarat Chandra Das in 1879 were the nearest foreign approaches made to Mount Everest. Sarat Chandra Das made a journey to satisfy a religious ambition, travelling from India to Lhasa. He was not a trained geographer and his account of the country along the eastern approaches to Mount Everest was vague, but interesting as showing the hardships of travel over high mountain lands. He wrote a delightful book, Journey to Lhasa and Central Tibet (John Murray, 1902). যতদূর জানা যায় ভারতীয়দের মধ্যে হরিরাম ও শরৎচন্দ্রই সর্ব্বপ্রথম এভারেষ্ট-অভিযান করেন তাঁহাদের পূর্ব্বে কেহ করেন নাই। সম্প্রতি অনুসন্ধানে শরৎচন্দ্রের লিখিত এভারেষ্টের পূর্ব্বাঞ্চল সম্বন্ধে ভৌগোলিক বিবরণ যথার্থরূপে প্রমাণিত হইয়াছে।

 শরৎচন্দ্র ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে কাঞ্চনজঙ্ঘা গিরিশ্রেণীর পশ্চিম পার্শ্বস্থ দুর্গম গিরিবর্ত্ম অতিক্রমপূর্ব্বক গিয়ানসুর গ্রামের নিকটবর্ত্তী তাসিচোডিং নামক মঠে উপনীত হন। সেখান হইতে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্ত্তী প্রায় ২০,০০০ হাজার ফিট উচ্চ চাথাংলা গিরিসঙ্কট পথে জেমু নদীর মালভূমিতে উপনীত হন। আমরা ঐ ​দুর্গম অভিযানের বিবরণ “Journal of the Budhist Text and Anthropological Society র প্রকাশিত পত্রিকার Vol. VII, 1899 হইতে সঙ্কলন করিয়াছি।

 “A Lay Of Lachen” নামক কবিতায় মাননীয় কোলম্যান্ ম্যাকলে [Late Hon’ble Colman Macaulay] শরৎচন্দ্র সম্বন্ধে লিখিয়াছেন:

...Sarat Chandra, hardy son
Of soft Bengal, whose wondrous store
Of Buddhist and Tibetan lore
A place in fame’s bright page has won,
Friend of the Tashu Lama’s line,
Whose eyes have seen, the gleaming shrine,
Of holy Lhassa came to show
The wonders of the land of snow.”

 আমরা এতদিন পর্যন্ত কেবল বিদেশী পর্য্যটকগণের অভিযান বিবরণই পড়িয়া আসিয়াছি। লিভিংষ্টোন্, আয়ার, বার্ক, ষ্ট্যান্‌লি, স্‌ভেন হেডিনের আবিষ্কার ও দুঃসাহসিক অভিযানের আখ্যায়িকাই আমাদের বালকবালিকারা এবং তরুণ-তরুণীরা শুনিয়া আসিতেছে, কিন্তু এই ভারতীয় বীরেরা, এভারেষ্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, তিব্বত, মোঙ্গোলিয়া ও সিন্ধুনদের এবং ব্রহ্মপুত্র নদের উৎস সন্ধানে গিয়া নানাদেশ, নানা অপরিজ্ঞাত জাতি, হ্রদ, নদী ও বিভিন্ন দেশের যে বিবিধ তথ্য সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছেন তাহাত আমরা জানিতাম না।

 আমরা বাল্যকালে শুনিয়াছিলাম ষোড়শ বৎসর বয়সে রাজা রামমোহন রায় তিব্বত গমন করেন। এ সম্বন্ধে বর্ত্তমান যুগের অনেক ঐতিহাসিক সন্দিহান ছিলেন, সম্প্রতি বন্ধুবর ডক্টর শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ সেন, এম-এ, বি. লিট (অক্সন), পি-এইচ-ডি মহাশয় দিল্লীর দপ্তরে ​এমন অনেক পুরাতন দলিলপত্র পাইয়াছেন যাহা হইতে রামমোহনের ভোট দেশও তিব্বত গমন সম্পর্কেও নূতন নূতন তথ্য জানা গিয়াছে। তিনি শীঘ্রই ঐ সমুদয় চিঠিপত্র ও দলিল ইত্যাদি সবিস্তারে প্রকাশ করিলে রামমোহনের তিব্বত-যাত্রা সম্পর্কিত বিবরণ ও ভবিষ্যতে প্রকাশ করা সম্ভবপর হইবে।

 আমার এই গ্রন্থ প্রকাশে আমি বিশেষভাবে ভারতীয় জরিপ বিভাগের নিকট ঋণী। আমি তাঁহাদের নিকট নানাভাবে সাহায্য লাভ করিয়াছি। তাঁহারা আমাকে পণ্ডিত কিষণ সিংহ, লালা, কিন্‌থাপ, মোল্লা আতা মুহম্মদ প্রভৃতি সম্পর্কিত কাগজপত্র বা সরকারী মুদ্রিত দুষ্প্রাপ্য বিবরণী (Reports of the Trans-Himalayan Exploration, 1878, 1878-79) এমন কি তাঁহাদের অফিসের একমাত্র ‘Reference copies’ পর্য্যন্ত সাহায্যার্থ পাঠাইয়া দিয়াছেন। দেরাদুনে অবস্থিত ভারতীয় জরিপ বিভাগের Geodetic Branch এর ডাইরেক্টারের নিকট হইতেও প্রয়োজনীয় বিবরণী পুস্তিকা, ফোটোগ্রাফ ইত্যাদি জরিপ বিভাগ আনাইয়া দিয়াছেন। তাঁহাদের সাহায্য না পাইলে আমার পক্ষে ভারতীয় এইসব অপরিজ্ঞাত দুঃসাহসিক অভিযানকারীদের বিবরণী প্রকাশ করা সম্ভবপর হইত না।

 কলিকাতা Royal Asiatic Societyর পুস্তকালয় হইতে নানাবিধ প্রয়োজনীয় দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়া এবং পাঠের সুবিধা করিয়া দিয়াছিলেন স্বনামপ্রসিদ্ধ বিদ্যোৎসাহী ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক, বৌদ্ধশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ডক্টর শ্রীযুক্ত বিমলাচরণ লাহা, এম-এ, বি-এল, পি-এইচ্-ডি মহোদয়। এইজন্য তাঁহাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীমান চন্দ্রশেখর গুপ্ত, এম্-এ আমাকে ​বহু ইউরোপীয় অভিযানকারীদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত সংগ্রহ করিয়া পাঠাইয়। ও যথাসাধ্য সাহায্য করিয়াছেন।

 আমি যথাযথরূপে এই সব অভিযানকারীদের বিবরণ ইংরাজী ভাষায় লিখিত সরকারী বিবরণী হইতে সঙ্কলন করিয়াছি। আশা করি ইহা সকলেরই প্রীতিপ্রদ হইবে।

 যাঁহারা দুঃসাহসিক অভিযাত্রীদের ভ্রমণ-বিবরণী পাঠে আগ্রহান্বিত তাঁহারা আমার এই হিমালয়-অভিযান কাহিনী পাঠ করিয়া আনন্দলাভ করিলেই উপকৃত হইব। আমি যথাসাধ্য সরল ভাষায় এই অভিযানবিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছি। আশা করি এই গ্রন্থখানি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাবিভাগের কর্ত্তৃপক্ষের এবং জনসাধারণের সহানুভূতি লাভ করিবে।

 কলিকাতা
শ্রীযোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত
১লা শ্রাবণ, ১৩৪৮।

দ্বিতীয় সংস্করণের নিবেদন

 আমি অত্যন্ত আনন্দের সহিত স্বীকার করিতেছি যে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ “হিমালয়-অভিযান” ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার্থীদের “দ্রুত পঠনের” জন্য নির্দ্ধারিত করিয়া অনুগৃহীত করিয়াছেন। এজন্য তাঁহাদিগকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি।

 কলিকাতা
শ্রীযোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত
১০ই অগ্রহায়ণ, ১৩৪৮।

page

​

বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।
দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী—
মানুষের কত কীর্তি কত নদী গিরি সিন্ধু মরু
কত না অজানা জীব কত না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন;
মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ।
সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণ বৃত্তান্ত আছে যাহে
অক্ষয় উৎসাহে—
যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী
কুড়াইয়া আনি।
জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে
পূরণ করিয়া লই যত পারি ভিক্ষালব্ধ ধনে।

—রবীন্দ্রনাথ

এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।