বিষয়বস্তুতে চলুন

হিমালয়-অভিযান/কিন্‌থাপ

উইকিসংকলন থেকে

কিন্‌থাপ

ব্রহ্মপুত্ত্রের উৎস-সন্ধানে

[কিন্‌থাপ নামে একজন সিকিমি ১৮৮০-৮৪ খ্রীষ্টাব্দে দার্জ্জিলিং হইতে ব্রহ্মপুত্রের উৎস-সন্ধানে যাত্রা করেন। ইউরোপীয় ও ভারতবর্ষীয়দের মধ্যে কিন্‌থাপই সর্ব্ব প্রথম ব্রহ্মপুত্রের উৎস সন্ধানে গমন করিয়া ছিলেন। তাঁহার সেই বিবরণী (Records of the Survey of India 1879-1892) তে প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্‌থাপ দুই বৎসর তিব্বতের অজ্ঞাত প্রদেশে জীবন বিপন্ন করিয়া অভিযান করিয়াছিলেন। অনেকেই কিন্‌থাপের জীবন সম্বন্ধে সন্দিহান ছিলেন। লৌহিত্যের বর্ত্তমান নাম ব্রহ্মপুত্ত্র এবং জম্বুনদ তিব্বতের সাংপো। এই বৃহৎ নদের উৎস সন্ধানে কিন্‌থাপ আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। ভারতের ও এক হিসাবে জগতের রহ্মপুত্ত্রের উৎস সন্ধানের ইতিহাসে কিন্‌থাপের নাম প্রথম অভিযানকারী রূপে সগৌরবে উচ্চারিত হইবে।]

 ব্রহ্মপুত্ত্র ভারতের একটি শ্রেষ্ঠ নদ বা নদী। তিব্বতের দুর্গম পার্ব্বত্য-প্রদেশে ইহার জন্ম। সে-দেশে এই নদীর নাম সাং-পো (Psang po)। সাংপো তিব্বতের পর্ব্বতশ্রেণীর গায়ে গায়ে অধিত্যকা ও উপত্যকা প্রদেশ দিয়া বহিয়া আসিয়াছে। কোথা হইতে এই নদীর উৎপত্তি? আর কোথায় এই নদী যাইয়া মিশিয়াছে তাহা অনেক দিন পর্য্যন্ত মানুষের অজানা ছিল। অনেকের এইরূপ বিশ্বাস ছিল যে এই সাং-পো নদী তিব্বতের রাজধানী লাশা সহরের পার্শ্ব দিয়া প্রবাহিত হইয়া শেষটায় দক্ষিণ দিকে আসিয়া ব্রহ্মপুত্ত্র নাম ধারণ করিয়াছে। ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দের আগষ্ট মাসের আগে কোন শ্বেতাঙ্গ লাশা নগরীতে পদার্পণ করেন নাই। কাজেই এই নদীর উৎস-সন্ধানে কোনও শাদা মানুষ উহার পূর্ব্বে যাইতে পারিয়াছেন কিনা সন্দেহ। যদি সাংপো আর ব্রহ্মপুত্ত্র নদ অভিন্ন হয় তবে নিশ্চয়ই কোন উচ্চ গিরিশৃঙ্গ হইতে জলপ্রপাতের আকারে ইহার পতন সম্ভব। কিন্তু কোথায় সে উৎপত্তি স্থান? কোথায় সেই প্রপাত? কে তাহার সন্ধান লইবে?

 সে-কালের লোকেরা ধারণা করিতে পারিতেন না যে ব্রহ্মপুত্ত্র নদ-সমুদ্র-সমতা হইতে প্রায় ১৬০০০ ফিট উচ্চ মানসসরোবরের কাছাকাছি উৎপত্তিলাভ করিয়া সেই উচ্চতা প্রায় সমানভাবে তিব্বতের শেষ সীমা পর্য্যন্ত রক্ষা করিয়া আসিতেছে। আসাম-সীমান্তে নামিয়া আসিবার সময় ১০০০ ফিট নিম্নে নামিয়া আসিতে পারে এইরূপ কল্পনা সেকালের বৈজ্ঞানিকেরা কেহ করিতে পারেন নাই।

 মানুষের মনে নদ, নদী, পাহাড়-পর্ব্বত সম্বন্ধে স্বাভাবিকভাবে নানা কল্পনা আসে। ব্রহ্মপুত্ত্র নদ সম্বন্ধেও যুগে যুগে মানুষ কত কল্পনাই না করিয়া আসিয়াছে! সে-সব কাহিনী এখনও নানাজনের মুখে নানাভাবে শুনিতে পাওয়া যায়। সে-কালের কোন ইংরাজ নিষিদ্ধ দেশে যাইতে পারিতেন না। যদিই বা কেহ ছদ্মবেশে যাইতে চেষ্টা করিতেন তাহা হইলে তাঁহাকে তিব্বতের ভাষা শিক্ষা করিতে হইত। আর তিব্বতীয় ভাষা শিক্ষা করাও ত সহজ নহে। কিন্তু যাহাদের মনে দুর্জ্জয়কে জয় করিবার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠে তাহাদিগকে কি কেহ নিরস্ত করিতে পারে?

 ভারতীয় জরিপ বিভাগের কাপ্তেন হারম্যানের (Captain Harman) মনে ব্রহ্মপুত্ত্র নদের উৎস সন্ধানের ইচ্ছা হইল। তিনি দার্জ্জিলিং আসিলেন। সেখানে নিমসিং নামে একজন সিকিমকে কি ভাবে সেক্সটাণ্ট যন্ত্র (Sextant) বা কৌণিক দূরত্ব মাপের যন্ত্র এবং দিগ্‌দর্শন (Compass) ব্যবহার করিতে হয়, সে-সব শিক্ষা দিলেন। কি ভাবে মানচিত্র দেখিতে হয়, মানচিত্র আঁকিতে হয়, পর্ব্বতের উচ্চতার পরিমাপ করিতে হয়, এ-সব বিষয়ে কাপ্তেন হারম্যান নিমসিংকে শিক্ষা দিয়াছিলেন। নিমসিংয়ের পূর্ব্বে তিনি কিষণসিংহ নামক আর একজনকেও এ-বিষয়ে উদ্যোগী করিয়াছিলেন। কিন্তু একা একজনের পক্ষে ত জরিপের কাজ করা চলে না, দু’জন না হইলে চলাফেরার সুবিধা হয় না, কাজও দ্রুত অগ্রসর হয় না।

 সে-সময়ে দার্জিলিংয়ের বাজারে কিন্‌থাপ নামে একজন সিকিমি দর্জী ছিল। সে এই অনুসন্ধান কার্য্যে নিমসিংয়ের সঙ্গী হইবার ইচ্ছা প্রকাশ করিল। সিকিমি-কিন্‌থাপ লোকটি বেঁটে খাটো রকমের ছিল, চোখ দু’টি ছিল বেশ তীক্ষ্ণ, কপালটা বেশ চওড়া আর তাহার মাথায় ছিল একরাশ চুল। তাহাকে দেখিলেই মনে হইত যে হাঁ, এ কাজের মানুষ বটে, একে কোন কাজের ভার দিলে সে কাজের জন্য আর ভাবিতে হইবে না—আর এ-যেন অজানার সন্ধানী হইয়াই জন্মিয়াছে।

 ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দে একদিন সকালবেলা নিমসিং ও কিন্‌থাপ অজানা পার্ব্বত্যপথে সাংপো নদীর উৎস সন্ধানে যাত্রা করিল। তাঁহারা দারুণ শীতের মধ্যে পার্ব্বত্যপ্রদেশে প্রায় ১২,০০ ফিট উচ্চ পথ ধরিয়া সাংপো নদীর গতি-পথ ধরিয়া ক্রমশঃ অগ্রসর হইতে লাগিলেন। তাঁহাদের হাতে ছিল জপমালা। পা বাড়াইবার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহারা জপের গুটিতে হাত দিতেন। এক কথায় জপের মালা গণিতে গণিতে তাঁহারা পথ চলিতেছিলেন। আমাদের এই দুইজন অভিযানকারী পথে পথে জরিপ করিতে করিতে অবশেষে গয়লা নামক একটি স্থানে আসিয়া পৌঁছিলেন। এই জায়গাটি ছিল ঘন বনে ঢাকা। এই অধিত্যকার আশে-পাশে ছিল তুষারাবৃত উচ্চ পর্বতশ্রেণী; শিখরের পর শিখর তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে। এইখান হইতে সাংপো নদীর গতি উত্তর দিকে প্রবাহিত হইয়াছে।

 ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে নিমসিং ও কিন্‌থাপ গয়লা হইতে দার্জ্জিলিং ফিরিয়া আসিলেন। তাঁহারা আসিয়া বলিলেন,— সাংপো নদী আসামের প্রান্তভাগ হইতে লম্বালম্বি দক্ষিণাভিমুখী হইয়া ভারতবর্ষে আসিয়া পড়িয়াছে। সেকালের জরিপ বিভাগের কর্ত্তারা এবং বৈজ্ঞানিকেরা তাহাদের কথায় বিশ্বাস করিলেন না।

 পূর্ব্বেই বলিয়াছি যে কিন্‌থাপের শিরায় শিরায় প্রবাহিত ছিল দুর্জ্জয়কে জয় করিবার মত উষ্ণ রক্তধারা। কোন বিপদেই তাঁহার মন ভাঙ্গিয়া পড়িত না। মৃত্যু-ভয় তাঁহার ছিল না, অজানাকে জয় করিবার দুর্দ্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা তাঁহাকে কিছুতেই পিছু হটাইত না। তিনি নিমসিংয়ের কাছে জরিপ করিতে শিখিয়াছিলেন। কিন্‌থাপ আবার সাংপো নদীর উৎস সন্ধানে যাত্রা করিলেন। এইবার তাঁহার সহযাত্রী হইলেন একজন চীন দেশীয় শ্রবণ বা লামা। এই লামা পূর্ব্বে তিব্বতের এক বৌদ্ধ-বিহারে ছিলেন, দৈবক্রমে ভারতীয় জরিপ বিভাগে আসিয়া পড়েন। কিন্‌থাপকে এইবার বলা হইয়াছিল যে তিনি যেন নির্ভীকভাবে সাংপো নদীর গতিপথের অনুসরণ করিয়া কেবলি অগ্রসর হইতে থাকেন। যদি তিনি নির্দ্ধারিত সময়ের মধ্যে ভারতে ফিরিয়া না আসেন, তবে যেন প্রত্যহ ৫০ খানি করিয়া ৫০০ খানি কাঠের টুকরা নদীর স্রোতের মধ্যে ফেলিয়া দেন, জরিপ বিভাগের লোকেরা নীচের দিকে সেই সব কাষ্ঠ খণ্ডের দিকে লক্ষ্য রাখিবে। এবং তখন তাহারা বুঝিতে পারিবে যে কিন্‌থাপ বাঁচিয়া আছেন কিনা।

 তীর্থযাত্রী ও পুণ্যপ্রার্থী বৌদ্ধ লামাদের তিব্বতের কোথাও যাইতে বাধা নাই, আর লাশা ত তাঁহাদের তীর্থস্থান। কাজেই এইবার কিন্‌থাপ নিঃশঙ্কচিত্তে চৈনিক লামার সহযাত্রীরূপে সাংপো নদীর উৎস-সন্ধানে চলিলেন। তাঁহার পিঠে ছিল একটি থলিতে কাঠের বোঝা। তিব্বতের লোকেরা তীর্থযাত্রীদের খুব সমাদর করে। কাজেই এ-যাত্রায় তাঁহাকে কোন তিব্বতীয়ই সন্দেহের চক্ষে দেখিল না। কিন্তু এই চীনা লামাটির মনে অজানার সন্ধানের জন্য কোন আগ্রহ ছিল না। লামা কোন একটি গ্রামে গিয়া পৌঁছিলে বেশ ভালভাবে থাকিবার, খাইবার এবং শুইবার ব্যবস্থার জন্যই ব্যাকুল হইতেন। যে গ্রামে এরূপ বাস ব্যবস্থা মিলিত, সেই গ্রাম হইতে চৈনিক লামা এক পাও বাড়াইতে চাহিতেন না। চারি মাস চলিয়া গেল, লামা বেচারা কিন্‌থাপকে মহা বিপদে ফেলিলন, তিনি কিছুতেই নড়িতে চাহেন না! কোন রকমে লামাকে যৎকিঞ্চিৎ নগদ মুদ্রা দিয়া প্রলুব্ধ করিয়া কিন্‌থাপ তবে আবার যাত্রা-পথে অগ্রসর হইতে পারিয়াছিলেন।

 কিন্‌থাপ ও চীনা লামা পথ চলিতে লাগিলেন। কখনও কখনও তাঁহাদের গুহার মধ্যে ঘুমাইতে হইত, কখনও ভিক্ষা করিয়া খাদ্য-সংগ্রহ করা হইত, কখনও কখনও অনাহারে দিন কাটিত। এইভাবে কিন্‌থাপ ও তাঁহার সঙ্গী লামা পেমকোইচাং নামক একটি জায়গায় আসিলেন। লাশা সহর ঐস্থান হইতে ৩২০ মাইল দূর। শেষ পঁচিশ মাইল পথ ছিল অত্যন্ত দুর্গম—খাড়া পাহাড়। সে পাহাড়ে শিলাস্তূপের পর শিলাস্তূপ। কোন দিকে উঠিবার কোন পথ নাই। কোন রকমে তাহারা একটা খাড়া পাহাড়ের উপর উঠিল। সেখান হইতে তাহারা দেখিতে পাইল প্রায় ৩০০০ ফিট নীচ দিয়া গভীর গর্জ্জন করিতে করিতে সাংপো নদী বহিয়া চলিয়াছে। জলের কি ভয়ঙ্কর বেগ!

 পেম্‌কোই-চাংয়ে আসিয়া কিন্‌থাপ দেখিতে পাইল যে সাংপো নদী এখান হইতে দুইটি শাখায় বিভক্ত হইয়া চলিয়াছে। বৌদ্ধমঠ হইতে নদী অনেকটা দূর দিয়া প্রবাহিত হইয়াছে। ঐ বিহারটিতে সাত আট জন লামা বাস করিতেন। কিন্‌থাপের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে এইভাবে সাংপো নদী বহিয়া যাইয়া একটি জলপ্রপাতের আকারে নিম্নে পড়িয়াছে। প্রপাতের নীচে একটি হ্রদের মত জলাশয় রহিয়াছে। সম্ভবতঃ জলপ্রপাতের উচ্চতা প্রায় ১৫০ শত ফিট হইবে।

 এই পেম্‌কোইচাংয়ের কাছাকাছি দুর্ভেদ্য পর্ব্বতের বুক দিয়া সাংপো একটি ‘ক্যানিয়নে’র দুর্গম পথ-অন্তরালে অদৃশ্য হইয়াছে। কাজেই এমন কাহারও সাধ্য নাই যে ঐ নদীর আর অনুসরণ করিতে পারে। এখান হইতে লামা ও কিন্‌থাপ অনেকদূর পর্য্যন্ত নীচের দিকে নামিয়া আর একটা পথের সন্ধান করিয়া লইলেন। এইবার তাঁহারা যে গ্রামে আসিলেন, সেখানে আসিয়া চীনা লামাটি বেশ চালাকি করিলেন, তিনি কিন্‌থাপকে জোঙ্গ-পোন্ বা গ্রামের সর্দ্দারের নিকট সামান্য অর্থ গ্রহণে দাসরূপে বিক্রয় করিয়া সে গ্রাম ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন। কিন্‌থাপ বুঝিতে পারিলেন যে গ্রামের সর্দ্দার তাঁহাকে সন্দেহের চোখে দেখিতেছে। ইতিমধ্যে তাহার পিস্তলটি এবং একটি কম্পাস ও অন্যান্য কিছু কিছু আস্‌বাব ও যন্ত্রপাতি সর্দ্দার কাড়িয়া লইয়াছিল। এ-জন্য কিন্‌থাপ ভয়ে ভয়ে তাঁহার কাছে অন্য যে একটি দিগ্‌দর্শন যন্ত্র ছিল, তাহা লুকাইয়া রাখিলেন। এ-ঘটনা ঘটিয়াছিল ১৮৮১ সালে। অতি কষ্টে কৌশল করিয়া কিন্‌থাপ এই গ্রামের সর্দ্দারের হাত হইতে উদ্ধার পাইয়াছিলেন।

 এইভাবে মুক্তিলাভ করিয়া কিন্‌থাপ চলিতে চলিতে মার্পুং নামক গ্রামে আসিয়া পৌঁছিলেন। এ-দিককার প্রাকৃতিক দৃশ্য ছিল অতি চমৎকার। অদূরে তুষারমণ্ডিত ধবল গিরিশ্রেণী। অধিত্যকা-প্রদেশে ধানের ক্ষেত ও পিচফলের বাগান। আর একটি সুন্দর পর্ব্বতশৃঙ্গের উপরে ছিল একটি বৌদ্ধ মঠ।

 তারপর কি হইল, সে-কথা আমরা এখানে কিন্‌থাপের নিজের ভাষায় শুনাইতেছি—“আমি এখানে শুনিলাম যে আমাকে ধরিয়া নেওয়ার জন্য জোঙ্গপোন্ পঞ্চাশ জন লোক পাঠাইয়াছে! আমি এই মঠের লামাকে তিন বার নমস্কার করিয়া জোঙ্গপোনের কথা বলিলাম। লামা আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—আমার বাপ-মা বাঁচিয়া আছে কিনা এবং আমি কোথায় যাইতেছি। আমি বলিলাম, তীর্থ করিবার উদ্দেশ্যে লাশা চলিয়াছি। আমার বাপ-মা কেহই বাঁচিয়া নাই। তারপর আমি লামার কাছে মিনতি জানাইলাম যে তিনি যেন আমাকে জোঙ্গপোনের লোকের কাছে প্রত্যর্পণ না করেন।

 জোঙ্গপোনের লোকেরা আমার এই স্থানে আসিবার পাঁচ দিন পরে আমাকে লইবার জন্য আসিয়াছিল। কিন্তু লামা তাঁহাকে আমার মূল্য বাবদ পঞ্চাশ টাকা পাঠাইয়া দিলেন। কাজেই আর কোনও গোল হয় নাই। আমি সাড়ে চার মাস লামার কাছে ছিলাম। পরে তাঁহার নিকট হইতে এক মাসের ছুটি লইয়া তীর্থ দর্শনে অর্থাৎ নদীর উৎস সন্ধানে বাহির হইয়া পড়িলাম।”

 কিন্‌থাপ আবার অন্য একটি বিহারে আসিলেন। এইখানে কাঠগুলি খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিয়া সাংপো নদীর জলে ফেলিয়া দিলেন। সেই কাঠের টুকরাগুলি ভাসিতে ভাসিতে আসামের পথে বাঙ্গালা দেশে আসিয়াছিল। কিন্তু সেইগুলির দিকে কে লক্ষ্য করিবে? কাপ্তেন হারম্যান তখন মারা গিয়াছিলেন।

 কিন্‌থাপ এইবার লাশা গিয়াছিলেন। সেখান হইতে জরিপ বিভাগের কর্ত্তাদের নিকট পিস্তল এবং কম্পাস হারাইবার কথা লিখিয়া জানাইয়াছিলেন।

 লাশা হইতে কিন্‌থাপ মাপুং ফিরিয়া আসিয়া সেই ত্রাণকারী লামার কাছে কিছুদিন ছিলেন, তিনি তাঁহাকে মুক্তি দিলেন। যাত্রাপথে এই সাহসী অভিযানকারী দর্জির কাজ করিয়া নিজের খাদ্য সংস্থান করিয়াছিলেন। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে কিন্‌থাপ দার্জ্জিলিং ফিরিয়া আসিয়াছিলেন।

 কিন্‌থাপ ইংরাজী জানিতেন না ও লেখাপড়া বিশেষ কিছু জানিতেন না। মুখে মুখে তাঁহার ভ্রমণকাহিনী ও আবিষ্কারের কথা বলিয়া যাইতেন। কিন্‌থাপ তিন বৎসর কাল যে পাহাড়, পর্ব্বত ও উপত্যকা, বন-জঙ্গল দেখিয়া আসিয়াছিলেন সে-সব কথা সে সবিস্তারে বলিয়া যাইতেন। এবং অপরে তাহা লিখিয়া লইত। তাঁহার কথা ভৌগোলিকেরা প্রথম বিশ্বাস করিতেন না, এমন কি জরিপ বিভাগের কর্ত্তারাও তাঁহার বর্ণিত বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। ১৯১১ সালে ভারতীয় জরিপ বিভাগ কিন্‌থাপের বৃত্তান্ত প্রকাশ করেন। তাঁহার এই অভিযানের কাহিনী জরিপ বিভাগের একজন কর্ম্মচারী ইংরাজীতে অনুবাদ করিয়াছিলেন। কিন্‌থাপ যে চারি বৎসর কাল এই অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন সে-সময়কার সব কথা, সবদিন তিনি লিখিয়া লইতে পারেন নাই।

 কিন্‌থাপের পর জরিপ বিভাগের পেমবারটন্ (Mr. Pemberton) ও ট্রেন্‌চার্ড (Mr. Trenchard) সাহেবও সাংপো নদীর উৎস সন্ধানে অভিযান করিয়াছিলেন। তাঁহারা অতিকষ্টে দুরারোহ পর্ব্বতশৃঙ্গে আরোহণ করিয়া সাংপো নদীর সম্বন্ধে অনুসন্ধান করেন। এই ভীষণ পথে বৎসরে পনেরো দিনের বেশী চলাচলের সুযোগ থাকে না। দিহাং অভিযানের বেলী (Mr. Bailey) ও মুর্শেদ (Mr. Moorshed) পূর্ব্বমুখে যাত্রা করিয়া ১৫,৪০০ ফিট উঁচু একটি অজানা পর্ব্বতশৃঙ্গ আবিষ্কার করেন। তাঁহারা পূর্ব্বদিকে যাইতে যাইতে অন্য একটি তুষারমণ্ডিত পর্ব্বতশ্রেণীও দেখিতে পাইয়াছিলেন। কিন্‌থাপ সেপথে অগ্রসর হইতে পারেন নাই। বেলী এবং মুর্শেদ সেইদিকে অগ্রসর হইতে যাইয়া ব্যর্থকাম হইয়াছিলেন। তাঁহারা উত্তরদিকের পথ ধরিলেন এবং দুর্লঙ্ঘ্য পর্ব্বতশ্রেণীকে বেষ্টন করিয়া পশ্চিম দিকে সাংপো নদীর সন্ধান করিতে অগ্রসর হইয়াছিলেন। সেখান হইতে তাঁহারা গিয়াছিলেন দক্ষিণ দিকে সে এক অজ্ঞাত বনপ্রদেশে। তাঁহাদের এ অভিযানে অভিনবত্ব ছিল।

সাংপো বা ব্রহ্মপুত্ত্র নদের জল প্রপাত

 সাংপো বা ব্রহ্মপুত্ত্র নদের প্রপাত সম্বন্ধে কিন্‌থাপের বর্ণনা যে কতদূর সত্য সে-সম্বন্ধে ক্যাপ্টেন মুরশেদ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া যাহা লিখিয়াছেন ও কিন্‌থাপ সাংপোর জলপ্রপাতের সম্বন্ধে যে কথা বলিয়াছেন তাহাতে সামান্য কিছু ভুল থাকিলেও তাঁহার বর্ণিত বিবরণ সত্য। প্রায় চারি বৎসর কাল ভ্রমণ করিয়া কিন্‌থাপ অন্যের কাছে যে বর্ণনা দিয়াছিলেন তাহাতে অনুবাদক এক স্থানের নাম অন্য স্থানের সহিত গোলমাল করিয়া ঐরূপ গোলযোগের সৃষ্টি করিয়াছিলেন।

 মিঃ বেলী এবং মিঃ মুরশেদ নামক জরিপ বিভাগের দুইজন কর্ম্মচারী সাংপোর গতিপথ অবলম্বন করিয়া মাত্র দশ মাইল পথের বেশী অগ্রসর হইতে পারেন নাই। কাজেই ঐ ভূভাগকে অনাবিষ্কৃত দেশ বলিতে পারা যায়। এই পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে ব্রহ্মপুত্ত্র নদের কয়েকটি জলপ্রপাত রহিয়াছে। এই জলপ্রপাত কয়টির জন্যই ব্রহ্মপুত্ত্র অতি সহজে নীচের দিকে নামিয়া আসিতে পারিয়াছে।

 ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দে কিংডেনওয়ার্ড এবং লর্ড ক্রুড্ নামে দুইজন অভিযানকারী সাংপোর অনাবিষ্কৃত প্রদেশসমূহ আবিষ্কারের জন্য যাত্রা করেন। তাঁহাদের বিশেষ লক্ষ্য ছিল, কিন্‌থাপের বর্ণিত জলপ্রপাত সত্যসত্যই আছে কি না তাহার সন্ধান করা।

 পেমাকোচুংয়ের পর কোন পথ ছিল না। এজন্য তাঁহাদিগকে পথ তৈরি করিয়া চলিতে হইয়াছিল। সে-পথ ছিল অতি ভীষণ। দুই দিকে উচ্চ পর্ব্বতশ্রেণী। সেই পর্ব্বতশ্রেণীর মধ্য দিয়া সাংপো নদী ভীষণ গর্জ্জন করিতে করিতে উন্মত্ত জলধারা বুকে লইয়া বহিয়া চলিয়াছে। তাঁহারা যে সংকীর্ণ গিরিপথ দিয়া অগ্রসর হইতেছিলেন, তাহার প্রায় ১০০০ ফিট নীচ দিয়া সাংপো নদী কল-প্রবাহে বহিয়া যাইতেছিল। এই পথে যাইতে যাইতে তাঁহারা দেখিতে পাইলেন কোথায় যেন পাহাড়ের বুকে সাংপো আপনাকে লুকাইয়া রাখিয়াছে। সেদিকে অনুসন্ধান করিতে যাইয়া তাঁহারা দেখিতে পাইলেন একটি অতি সুন্দর জলপ্রপাত। এই জলপ্রপাতটি পেমাকোচুংয়ের কাছাকাছি। এই জলপ্রপাতটি ত্রিশ ফিটের বেশী উঁচু নহে। কিন্তু জলপ্রপাতের শোভা অতি চমৎকার। জল-প্রবাহের উপর সূর্য্যের কিরণ প্রতিফলিত হইয়া প্রপাতের বুকে শত শত রামধনুর সৃষ্টি হইয়াছে। সত্য সত্যই মেঘমুক্ত দিনে সূর্য্যের কিরণে এই জলপ্রপাতের বুকে শত শত ইন্দ্রধনুর সৃষ্টি হয়। কিন্‌থাপ ১৫০ ফিট উচ্চ যে জলপ্রপাতের কথা বলিয়াছিলেন সেইটির নাম হইতেছে সিংচি-চোগি। এই জলপ্রপাতটি ত্রালা নামক স্থানের কিছু নীচের দিক্ হইতে উৎপন্ন একটি ছোট নদীর উৎসমুখে অবস্থিত। গয়ালার কাছাকাছি সাংপো নদীর সহিত উহা মিলিত হইয়াছে।