হিমালয়-অভিযান/কুমারজীব
কুমারজীব
তিব্বতের রাজধানী লাশা নগরীতে এক সময় কেহই প্রবেশ করিবার অনুমতি লাভ করিতে পারিত না বলিয়া লোকে উহার নাম দিয়াছিল নিষিদ্ধ নগরী বা “Forbidden City”। পণ্ডিতেরা তিব্বতের নামোৎপত্তি সম্বন্ধে নানা কথা বলিয়া থাকেন। কেহ বলেন, সে অতি প্রাচীনকালে তু-বুট্ নামে একটা জাতি ছিল বরফে ঢাকা বন্ধুর এই পার্ব্বত্য দেশের অধিবাসী। বেট, ভূত, বোড এ সব শব্দ দ্বারা তিব্বতের সেই প্রাচীন অধিবাসীদের নানা গোষ্ঠিকে বুঝাইত। এইভাবে তু-বুট্ হইতে দেশটির নাম হইল তিব্বত। ঐ সব জাতীয় লোকেরা যে মোঙ্গোলীয় তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।
তিব্বতের এইসব অধিবাসীদের মধ্যে ভারতবর্ষের বৌদ্ধ শ্রমণেরা আসিয়া মহাপুরুষ বুদ্ধদেবের ধর্ম্ম প্রচার করেন। এখনও মধ্য এসিয়া, চীন প্রদেশ প্রভৃতি স্থানে ভারতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির শত শত নিদর্শন দেখিতে পাইবে।
সেকালে যে সব শ্রমণেরা হিমালয় পর্ব্বতের তুঙ্গশৃঙ্গ লঙ্ঘন করিয়া তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন তাঁহারা যে কিরূপ ধর্ম্মপ্রাণ, সাহসী ও নির্ভীক দেশহিতৈষী ব্যক্তি ছিলেন তাহা সহজেই বুঝিতে পারা যায়।
দেড় হাজার বৎসরেরও আগে, অনুমান ৩১৮ খ্রীষ্টাব্দে, চীনদেশে হিয়ান্-ইউ নামে এক সম্রাট ছিলেন। তিনি বৌদ্ধধর্ম্মের একজন পরম উৎসাহী পরিপোষক ছিলেন। তাঁহার রাজত্বকালে প্রজাদের মধ্যে দশ ভাগের নয় ভাগ লোকই শাক্য মুনির মহদ্ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিল। চীনাদের বৌদ্ধধর্ম্ম গ্রহণ এবং চীন-সম্রাট এই ধর্ম্মকে রাজধর্ম্মরূপে গ্রহণ করায় চীনারা বুদ্ধদেবের দেশ এই ভারতবর্ষে আসিয়া বৌদ্ধধর্ম্মশাস্ত্র পড়িবার জন্য অতিমাত্রায় ব্যাকুল হইয়া পড়িল। সে সময়ের চৈনিক পর্য্যটকেরা মধ্য এসিয়ার পথে পারস্যদেশ অতিক্রম করিয়া ভারতে আসিতেন। সম্রাট হিয়ান-ইউর সময়ে বৌদ্ধধর্ম্ম চীন হইতে পারস্য পর্য্যন্ত প্রচারিত হইয়াছিল।
৪০৫ খ্রীষ্টাব্দে চীন-সম্রাট তিব্বতে এক অভিযান প্রেরণ করেন। তিনি সৈন্যাধ্যক্ষের প্রতি এই আদেশ দেন যে “তুমি সেখানে যদি কোন ভারতীয় প্রসিদ্ধ পণ্ডিত দেখিতে পাও তাঁহাকে সঙ্গে আনিবে—কিংবা পাঠাইয়া দিবে।” সে সময়ে কুমারজীব নামে একজন ভারতীয় পণ্ডিত উত্তর তিব্বতের অন্তর্গত খুশী নামক স্থানে থাকিতেন, তাঁহার সহিত শ্রমণ বিমলাক্ষ নামে একজন পণ্ডিত ছিলেন, বিমলাক্ষের চোখ দুইটি ছিল নীল পদ্মের মত নির্ম্মল ও উজ্জ্বল। তাই সেই শ্রমণের নাম হইয়াছিল বিমলাক্ষ।
কুমারজীব ও বিমলাক্ষ চীন সম্রাটের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়া ৪০৮ খ্রীষ্টাব্দে চীনদেশে রওয়ানা হইলেন। পথে যে তাঁহাদের কত ভীষণ মরুভূমি উত্তীর্ণ হইতে হইল, সে দুর্গম পথের কল্পনা করাও সহজ নহে। অজানা পথ, জল মিলে না, খাদ্য মিলে না, সঙ্গী নাই, রৌদ্রতপ্ত বালুকার সাগরের যেন সীমা নাই; সেই পথে কুমারজীব চলিয়াছিলেন সঙ্গী বিমলাক্ষকে লইয়া চীনের রাজধানী নান্কিনে।
বিমলাক্ষ এই পথের ক্লেশ সহ্য করিয়া চীনে পৌঁছিলেন বটে, কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তাঁহার মৃত্যু হইল।
কুমারজীবকে সম্রাট অত্যন্ত সমাদরের সহিত গ্রহণ করিলেন। তাঁহার সুখ-সুবিধার দিকে সর্ব্বদা লক্ষ্য রাখিতেন।
সম্রাটের আদেশে কুমারজীব ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্ম্ম-গ্রন্থাদির চীন ভাষায় অনুবাদ করেন। অনেকের কাছেই হয়ত আশ্চর্য্য বলিয়া মনে হইবে কিন্তু অতি সত্য কথা ৮০০ জনেরও বেশী ভারতীয় পণ্ডিত এই অনুবাদ কার্য্যে বৌদ্ধ ভিক্ষু কুমারজীবকে সাহায্য করিতেন। সম্রাট নিজে বৌদ্ধশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন বলিয়া ঐ সমুদয় অনুবাদ পড়িতেন ও আলোচনা করিতেন। কুমারজীব সংস্কৃত ও চীন ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন বলিয়া অনুবাদের কার্য্যে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেন। তিনি প্রায় ৩০০ শতখানি গ্রন্থের অনুবাদ করিয়াছিলেন। এই সব বইয়ের টীকাটিপ্পনী এমন সুন্দরভাবে করিয়াছিলেন যে সামান্য লেখাপড়া-জানা লোকও বুঝিতে পারিয়াছে।
চীনদেশের ইউ-ইয়াং নামক দেশের অধিবাসী বিখ্যাত পর্য্যটক ফাহিয়ান কুমারজীবের নিকট বৌদ্ধশাস্ত্রে শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে ভারতবর্ষে আগমন করেন—বিনয়পিটক সম্বন্ধে গবেষণা করিতে এবং উক্ত গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করিবার জন্য।
কেহ কেহ বলেন—“খাসগড় ও তুরকানের মধ্যভাগে কাচনগর অবস্থিত। এখানে সুপ্রসিদ্ধ বৌদ্ধ-ভিক্ষু কুমারজীব লালিতপালিত হইয়াছিলেন। এই স্থানে তিনি মহাযান বৌদ্ধধর্ম্মে দীক্ষিত হন এবং পরে চীন ভাষায় কতকগুলি বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুবাদ করেন। ক্রমে কাচ মহাযান বৌদ্ধধর্ম্মের একটি শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হইয়াছিল। চৈনিক পর্য্যটক হুয়েন সাং-এর মতে এখানে বৌদ্ধধর্ম্ম উন্নত ছিল এবং অনেক বিহার ও বৌদ্ধ মূর্ত্তি ছিল।”[১]
ফাহিয়ানের কথা এই প্রসঙ্গে সংক্ষেপে বলিতে হইতেছে। এই চীন পর্য্যটক তাতার, আফগানিস্থান এমন কি ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্ত্তী অধিবাসীদের মধ্যেও বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচারিত দেখিতে পাইয়াছিলেন। আফগানিস্থান হইতে তিনি দুর্লঙ্ঘ্য গিরিপথে অগ্রসর হইয়া সিন্ধুনদের পারে নানাদেশ ও পল্লী অতিক্রম করিয়া উজ্জয়িনী আসেন। সেখান হইতে মগধ আসিয়াছিলেন।
ভারতবর্ষের প্রধান প্রধান বৌদ্ধ-তীর্থ পর্য্যটন করিয়া এবং বহু পুঁথি সংগ্রহ করিয়া ফাহিয়ান সিংহলে আসেন। সিংহল হইতে ক্যানটন্ গমন করিবার সময় সমুদ্রের মধ্যে তিনি ভীষণ ঝড়ে পড়িয়াছিলেন। জাহাজের যাত্রীরা প্রাণভয়ে ভীত হইয়া পড়িয়াছিল। সেই জাহাজের ব্রাহ্মণ-যাত্রীরা ফাহিয়ানকে লক্ষ্য করিয়া যাত্রীদিগকে বলিয়াছিল যে, এই চীনা শ্রমণ জাহাজে উঠার জন্যই এমন ঝড় উঠিয়াছে, অতএব আসুন আমরা এই শ্রমণকে একটি দ্বীপে নামাইয়া দেই,—একজন লোকের জন্য কি আমরা সকলে প্রাণ হারাইব?
জাহাজে ফাহিয়ানের এক বন্ধু ছিলেন, তিনি বলিলেন—“যদি তোমরা ফাহিয়ানকে নামাইয়া দাও তবে আমাকেও নামাইয়া দিতে হইবে। কিন্তু মনে রাখিবে যদি কোন রকমে চীন দেশে পৌঁছিতে পারি তাহা হইলে সে দেশের রাজার কাছে তোমাদের এই হীন ব্যবহারের কথা বলিব। রাজা বৌদ্ধধর্ম্মের বিশেষ পক্ষপাতী। অতএব আমাদের প্রতি দুর্ব্যবহার করিবার পূর্ব্বে ভাল ভাবে বিচার করিয়া কাজ করিও।” জাহাজের যাত্রীরা এই কথা বলিবার পর ফাহিয়ানের প্রতি আর ব্রাহ্মণ-যাত্রীরা কোনরূপ বিরুদ্ধ ব্যবহার করিতে সাহসী হয় নাই।
ফাহিয়ান যখন চীনদেশ হইতে রওয়ানা হন, তখন তাঁহার সঙ্গীরা ছিলেন সংখ্যায় অনেক, কিন্তু পথ-ক্লেশ ও ব্যারামে ভুগিয়া অনেকেই মারা যান।
ফাহিয়ান কুমারজীবের নিকট সংস্কৃত ভাষা ও বৌদ্ধশাস্ত্র সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করেন ও দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং তাঁহার আদেশেই তিনি তাঁহার ভ্রমণ-বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করেন। তাহাতে বুঝা যায় যে ভারতীয় পণ্ডিত কুমারজীবের প্রতি তিনি কিরূপ শ্রদ্ধাবান্ ছিলেন।
সেই কোন্ সুদূর অতীতে ভারতীয় পণ্ডিত কুমারজীব হিমালয় পর্ব্বতের দুর্গম পথে অভিযান করিয়া তিব্বত, তুরকান প্রভৃতি স্থানে গমন পূর্ব্বক দেশে দেশে ভারতের জ্ঞান-গৌরব প্রচার করিয়াছিলেন তাহা ভাবিলেও হৃদয় অতুলনীয় গৌরবে পুলকিত হইয়া উঠে।
- ↑ বৌদ্ধধর্ম্মের বিস্তার। ডক্টর বিমল চরণ লাহা; ভারতবর্ষ। মাঘ, ১৩৪৭,২১৭ পৃষ্ঠা।