বিষয়বস্তুতে চলুন

হিমালয়-অভিযান/তিব্বতে-বাঙ্গালী—শরৎচন্দ্র দাশ

উইকিসংকলন থেকে

তিব্বতে বাঙ্গালী—শরৎচন্দ্র দাশ

 বাঙ্গালী তিব্বত-যাত্রীদের মধ্যে শরৎচন্দ্র দাশের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শরৎচন্দ্র দাশ ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে এভারেষ্ট গিরিশৃঙ্গের প্রায় কাছাকাছি গিয়া পৌঁছিয়াছিলেন। তিনি তিব্বতীয় ধর্ম্ম, সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতি এবং নৈতিক নিষ্ঠা-পদ্ধতি এবং ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করিবার জন্য তিব্বতে গমন করেন। তাঁহার লিখিত লাশা ও মধ্য তিব্বতের বিবরণ বেশ চিত্তাকর্ষক গ্রন্থ।

 ১৮৪৯ খ্রীষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার চক্রশালার অন্তর্গত আলমপুর নামক গ্রামে বৈদ্যবংশে শরৎচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। কলিকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়িবার সময় তিনি স্যার অ্যালফ্রেড ক্রফ্‌টের (Sir Alfred Croft) প্রীতি ও অনুগ্রহ লাভ করেন। সে সময় হইতেই শরৎচন্দ্র বরাবর ক্রফট্ সাহেবের নিকট হইতে নানা বিষয়ে সাহায্য ও উৎসাহ পাইয়া আসিয়াছেন। ক্রফট্ সাহেবের চেষ্টা ও যত্নেই শরৎচন্দ্রের তিব্বত-যাত্রাও সম্ভবপর হইয়াছিল।

 ১৮৭৪ সালে তিনি দার্জ্জিলিংএর তিব্বতীয় বোর্ডিং স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে নিযুক্ত হন। দাশ মহাশয় তখন প্রেসিডেন্সী কলেজের পূর্ত্ত বিভাগের একজন ছাত্র ছিলেন। তদানীন্তন ছোট লাট স্যার জর্জ্জ ক্যাম্পবেল সাহেব সেই বৎসরেই প্রথম ঐ বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা করেন। তিব্বতীয় বোর্ডিং স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ লাভ করিয়া শরৎচন্দ্র তিব্বতীয় ভাষা শিখিবার জন্য প্রভূত যত্ন ও পরিশ্রম করিতে লাগিলেন।

 এক বৎসর পরে তিনি স্বাধীন সিকিম রাজ্যের অন্তর্গত বৌদ্ধমঠ পরিদর্শনে গমন করেন। সেই সময়ে শরৎচন্দ্রের সহিত সিকিমের রাজা, রাজমন্ত্রী ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ সিকিমবাসীদের ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ ও পরিচয় হয়।

 ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দে তিব্বতের অন্তর্গত পেমাইয়াংসি নামক মঠের উগায়েন-গিয়াংসু নামক একজন লামা তিব্বতীয় বোর্ডিং স্কুলে তিব্বতীয় ভাষা শিক্ষা দিবার জন্য শিক্ষকের পদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। পেমাইয়াংসি নামক মঠের সন্ন্যাসীরা বিবিধ উপঢৌকন সহকারে উগায়েনগিয়াৎসুকে তাসিলুনপো ও লাশা নগরীতে প্রেরণ করেন।

 শরৎচন্দ্র এ সময়ে তিব্বত যাইবার জন্য ব্যাকুল হইয়াছিলেন। লামা উগায়েনগিয়াৎসুর তাসিলুনপো ও লাশা যাইবার সুযোগে তিনিও নিষিদ্ধ নগরী লাশায় গমন করিবার জন্য উৎসুক হইয়া পড়িয়াছিলেন এবং ব্রিটিশ সরকার ও তৎ সম্বন্ধে উপায় অন্বেষণ করিতেছিলেন। শরৎচন্দ্রের তিব্বত যাত্রার সাহায্যকল্পে লামা ইংরাজ সরকার কর্ত্তৃকও অনুরুদ্ধ হইয়াছিলেন। লামা উগায়েনগিয়াৎসু লাশা নগরীতে উপস্থিত হইয়া শরৎচন্দ্রের পক্ষে অনেক অনুরোধ করিলেও কোন ফল না হওয়ায় লামা তাশিলামার দীক্ষাগুরুর সহিত সাক্ষাৎ করিতে তাসিলুনপো গমন করেন। দীক্ষাগুরুর উপদেশ অনুসারে তাশিলামা শরৎচন্দ্রকে তথায় লইয়া যাইবার জন্য উগায়েনগিয়াৎসুর দ্বারা একখানি আমন্ত্রণলিপি প্রেরণ করেন। শরৎচন্দ্র তাসিলুনপো নগরের প্রধান মঠের একজন ছাত্ররূপে পরিগৃহীত হইলেন। তিনি যে পথ দিয়া আসিতে ইচ্ছা করেন আসিতে পারিবেন, তৎসম্পর্কেও অনুমতিপত্র প্রদত্ত হইল। এতদ্ব্যতীত তাশিলামা এরূপ আদেশ প্রচার করিলেন যে, যে কোনও জোঙ্গপোন বা ‘জঙ্গপন’ (বিভাগীয় শাসনকর্তা) বা তিব্বতবাসীকে তাঁহার এই আদেশলিপি বা ছাড়পত্র প্রদর্শন করিলে তাঁহারা এই ভারতীয় পণ্ডিতকে সাহায্য করিবেন এবং তাঁহার সঙ্গের যে সকল জিনিষ পত্র থাকিবে তাহাও নির্দ্দিষ্ট স্থানে নিরাপদে পৌঁছাইয়া দিবার ব্যবস্থা করিবেন।

 তাসিলুনপো বিহারের অন্তর্ভূত পেনচিনরেনপোচ্ বিহারটির সম্বন্ধে কয়েকজন ইউরোপীয় পর্য্যটক ও অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন।

 লামা উগায়েনগিয়াৎসু কর্ত্তৃক আমন্ত্রণলিপি পাইয়া শরৎচন্দ্র ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসে লামা সমভিব্যহারে একটি ফোটোগ্রাফের ক্যামেরা, একটি পকেট সেক্‌সটাণ্ট বা কোণ-পরিমাপক যন্ত্র, একটি দিগদর্শনযন্ত্র, একটি থার্ম্মোমিটার, একটি দূরবীক্ষণ ও নগদ দেড়শত টাকা মাত্র সঙ্গে লইলেন। মঠে উপহার দিবার জন্য সঙ্গে উপহার দ্রব্যাদিও কিছু কিছু ছিল।

 শরৎচন্দ্র এই তিব্বত-যাত্রা সম্পর্কে বলিয়াছেন: “আমার মনে অতি শৈশব হইতেই একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল তুষারাবৃত হিমালয় গিরিশ্রেণীর অপর পারস্থিত নিষিদ্ধ নগরী লাশা দেখিব। কোনরূপ রাজনীতির অভিসন্ধি বা অন্যরূপ কোনও উচ্চ আকাঙ্ক্ষাই আমার মনে উদিত হয় নাই। নিষিদ্ধ নগরীতে প্রবেশ করিবার পথে বিপদকে আলিঙ্গন করিবার জন্য এক দুর্দ্দমনীয় উৎসাহ ব্যতীত অন্য কোনরূপ চিন্তা আমার মনে আসে নাই। ঈশ্বরের প্রতীক্ লামাদিগকে দর্শন করিব, তাঁহাদের সহিত নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করিবার দৃঢ় সঙ্কল্প লইয়াই আমি তিব্বত যাত্রা করিয়াছিলাম। সে সময়ে আমার মনে অর্থলাভের আকাঙ্ক্ষা, উচ্চ রাজপদ লাভের প্রলোভন ইত্যাদি কিছুই স্থান পায় নাই।”

 “আমি দার্জ্জিলিঙ্গের তিব্বতীয় বোর্ডিং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করিবার সময় ১৮৭৪ হইতে ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দ পর্য্যন্ত তিনবার সিকিম রাজ্যে গিয়াছিলাম। সিকিমে যাইবার পর আমার হৃদয়ে এক অপূর্ব্ব চিত্র প্রতিফলিত হইতে লাগিল। আমি যখন উন্মুক্ত প্রান্তরে দাঁড়াইয়া সূর্য্যকিরণোজ্জ্বল নির্ম্মল প্রভাতে হিমালয়ের চিরতুষারাবৃত ধূসর ও বিরাট দিগন্ত প্রসারিত অভ্রশ্রেণীর ভীমকান্ত রূপ ও অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য ও তাহাদের কল্পনাতীত উচ্চতা অবলোকন করিতাম, তখন আমার হৃদয় এক মহান্ ভাবে অভিভূত হইয়া পড়িত। এই অনন্ত হিমারণ্যের অপরিজ্ঞাত পর্ব্বতগুহার নিভৃত নিলয়ে যে সকল ঋষিকল্প লামাসন্ন্যাসীগণ অবস্থান করিতেছেন, তাঁহাদিগের পুণ্যধামে যাইবার জন্য মনোমধ্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগরিত হইত। আমার মনে অপরিজ্ঞাত ও অশ্রুতপূর্ব্ব বৌদ্ধ-মঠের অভ্যন্তরে সযত্ন রক্ষিত প্রাচীন ভারতের অমূল্য সাহিত্য-রত্নের আবিষ্কারের জন্য গভীর আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিত। যখনই আমি শুভ্রতুষারবিমণ্ডিত গৌরীশঙ্কর ও কাঞ্চনজঙ্ঘার অত্যুঙ্গ শিখরের দিকে চাহিয়া তিব্বতের সুনীল গগন প্রান্তের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতাম, তখনই তিব্বতের মঠবাসী দেবকল্প লামা ও তাঁহাদিগের পবিত্র বিহারসমূহ দেখিবার জন্য চিত্ত ব্যাকুল হইয়া পড়িত। মনে মনে ভাবিতাম বিধাতা কি আমার এই প্রাণের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করিবেন না?”

 “তিব্বতীয় বোর্ডিং বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করিবার সময় আমি লামাদের সম্পর্কে কয়েকখানি গ্রন্থ অধ্যয়ন করিয়াছিলাম। সেই সকল গ্রন্থে একাদশ খ্রীষ্টাব্দের মহাত্মা অতীশ ও অন্যান্য কয়েক জন ভারতীয় বৌদ্ধ পণ্ডিতের কথা গল্পচ্ছলে লিখিত ছিল। অতীশের অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও তাঁহার চেষ্টায় তিব্বতীয়দের কিরূপ উন্নতি হইয়াছিল এবং মিলার্পা নামক একজন পণ্ডিত কিরূপ বিস্ময়কর ক্রিয়া-কলাপ দ্বারা স্বকার্য্য সাধন করিয়াছিলেন তাহা পাঠ করিয়া তিব্বত-যাত্রা করিবার জন্য আমি একান্ত অধীর হইয়া পড়িয়াছিলাম।”

 “আমার বিশ্বাস ছিল তিব্বতীয় ভাষায় লিখিত গ্রন্থাদি পাঠে ও তত্রত্য অধিবাসীদের সহিত কথোপকথনে আমার যতটুকু অভিজ্ঞতা জন্মিয়াছে তাহাতে তিব্বত গমন করিলে আমার অভীষ্ট সিদ্ধ হইবে। এইরূপ বিশ্বাসের বশবর্ত্তী হইয়াই আমি তাসিলুনপো ও লাশা নগরীর কয়েকজন প্রধান ব্যক্তির নিকট আমার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করিয়া কয়েকখানি পত্র লিখিয়াছিলাম। আমার সহকারী শিক্ষক লামা উগায়েনগিয়াৎসু উক্ত পত্রাদিও তিব্বত গমনের সময় সঙ্গে লইয়াছিলেন। আমি ইহাও শুনিয়াছিলাম যাহারা তিব্বতীয় ধর্ম্ম-গ্রন্থাদি পাঠ করিতে ভালবাসে, তিব্বতীয়গণ তাহাদিগকে প্রীতির চক্ষে দেখেন।”

 “লামা উগায়েনগিয়াৎসু প্রায় তিন মাস কাল দৌত্যকার্য্য করিয়া যখন আমার জন্য আমন্ত্রণলিপি লইয়া আসিলেন, তখন আমি তাশিলামার স্বাক্ষরিত ছাড়পত্র শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টর স্যার এ, ক্রফট্ মহোদয়কে দেখাইলাম এবং অবশেষে ব্রিটিশ গভর্ণমেণ্টের অনুমতি লাভ করিয়া কলিকাতা আসিয়া ভারতীয় সার্ভে অফিসে জরিপ-সংক্রান্ত নানাবিধ কার্য্য শিক্ষা করিয়া পর বৎসর জুন মাসে তিব্বত যাত্রা করিলাম।”

 শরৎচন্দ্র এই বার নিশ্চিন্ত হইয়া লামা উগায়েনগিয়াৎসুর সহিত ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসে তিব্বত-যাত্রা করেন। তাঁহার সঙ্গে একজন পথপ্রদর্শক ও দুইজন কুলি অনুগমন করিয়াছিল, এইবার তিনি প্রধান মন্ত্রীর অতিথি হিসাবে মাত্র ছয়মাস কাল তিব্বতে ছিলেন। এই ছয়মাস শরৎচন্দ্র তাসিলুনপোর মঠ সংশ্লিষ্ট লাইব্রেরীর গ্রন্থমালা দেখিয়া বিস্মিত হইয়াছিলেন এবং আসিবার সময়ে অনেক সংস্কৃত ও তিব্বতীয় হস্তলিখিত পুঁথি সংগ্রহ করিয়া আনেন। এই যাত্রায় শরৎচন্দ্র লাঞ্চনজঙ্ঘা বা কাঞ্চনজঙ্ঘার উত্তরপূর্ব্বদিকের অনেক অজ্ঞাত প্রদেশ সম্বন্ধে সন্ধান লন। তাঁহার প্রথম বারের যাত্রাপথের পরিচয় ও অভিজ্ঞতার কথা বাঙ্গালা সরকার পুস্তকাকারে প্রকাশ করিয়াছিলেন। স্যার এ্যালফ্রেড ক্রফট্ ঐ গ্রন্থের একটী অতি সুন্দর ভূমিকা লিখিয়া দিয়াছিলেন।

 ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে শরৎচন্দ্র দ্বিতীয়বার তিব্বত-অভিযান করেন। এইবারও তাঁহার বন্ধু উগায়েনগিয়াৎসু সঙ্গে ছিলেন। তাঁহারা এ যাত্রায় পলটি বা পালতি নামক হ্রদের জরিপ করেন ও অল্প কিছুকালের জন্য লাশাও গিয়াছিলেন। তাঁহার পূর্ব্বে ১৮৭৬ এবং ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দে যথাক্রমে নইনসিং ও কিষণ সিং লাশা গমন করেন। নইনসিং লাশা ও তাহার আশেপাশের জমি জমার একটা জরিপও করেন।

 লাশা হইতে শরৎচন্দ্র ইয়ালুং আসেন। এই ইয়ালুং অধিত্যকায়ই তিব্বতীয়দের প্রথম সভ্যতার সূত্রপাত হয়। ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে তিনি ভারতবর্ষে ফিরিয়া আসেন। এই যাত্রায় তিনি এক বৎসর দুই মাস কাল তিব্বতে ছিলেন।

 শরৎচন্দ্রের লিখিত নানা তথ্য সম্বলিত তিব্বত-ভ্রমণ বাঙ্গালা গভর্ণমেণ্ট দুইখানি বিবরণী পুস্তকে প্রকাশ করেন। একখানির নাম লাশা ভ্রমণের বিবরণ; অপরখানি হইতেছে পলতি হ্রদ, লোকা, ইয়ালুং এবং সেতিয়ার বিবরণী[] এবং গভর্ণমেণ্ট এই বিবরণী ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দ পর্য্যন্ত গোপনীয় দলিলপত্রের সামিল করিয়া অপ্রকাশিত রাখেন। পরে উহা হইতে তিব্বতীয় নৃতত্ত্ব, জাতিতত্ত্ব, ভাষা-পরিচয় ইত্যাদি সম্পর্কিত কিছু কিছু তথ্য বিলাতের ‘কনটেমপোরেরি রিভিউ’ নামক পত্রিকায় ছাপা হয়। উহার পাঁচ বৎসর পরে ‘নাইনটিনথ্ সেঞ্চুরি’ নামক বিখ্যাত পত্রিকায়ও উহার কিছু কিছু ছাপা হইয়াছিল।

 ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ভারতসরকার কয়েকজন লোককে পুনরায় তিব্বতে পাঠাইবার সঙ্কল্প করেন। সে সময়ে শরৎচন্দ্রেরও উক্ত অভিযানের মনোনীত নেতা কলম্যান ম্যাকলের সঙ্গে পুনরায় তিব্বত যাওয়ার কথা ছিল। যাত্রার পূর্ব্বে আলাপ ও আলোচনার জন্য শরৎচন্দ্র কয়েক মাস চীনের রাজধানী পিকিং সহরে ছিলেন। তাঁহাকে সেখানকার লোকেরা বলিত—‘কা-চি-লামা বা কাশ্মীরদেশীয় লামা’। শরৎচন্দ্র লামা উগায়েনগিয়াৎসু ও তাঁহার প্রিয় ভৃত্য ফুরচঙ্গকে লইয়া কত তুঙ্গ গিরিশিখর, কত বরফাবৃত উপত্যকা, কত নির্ঝর ও নদী অতিক্রম করিয়া যে তিব্বত পর্য্যটন করিয়াছিলেন তাহা উপন্যাসেরই মত মনোরম। যেদিন তিনি সর্ব্বপ্রথম লাশার মন্দিরসমূহ ও তথাকার মঠের চূড়া দেখিয়াছিলেন, সেদিন তাঁহার চিত্ত আনন্দে ভরিয়া গিয়াছিল। যে পলটি হ্রদের কথা বলিলাম, এই পলটি হ্রদ তাঁহার পূর্ব্বে আর কোন পর্য্যটকের চক্ষে পড়ে নাই। শরৎচন্দ্র ক্রফট্ সাহেবের বন্ধুত্ব ও স্নেহ স্মরণ করিয়া এই হ্রদটির নাম দিয়াছিলেন—ক্রফট্ ইয়ামডো। ইয়ামডো শব্দের অর্থ হ্রদ।

 ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে তিব্বত হইতে ফিরিয়া আসিয়া শরৎচন্দ্র সাহিত্যচর্চ্চায় মনোনিবেশ করেন এবং বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁহার ন্যায় সুপণ্ডিত ও একজন অসাধারণ শ্রমশীল ব্যক্তি খুব কমই দেখা যায়।

 শরৎচন্দ্র ১৮৮২ সালে পলটি হ্রদের পরিমাণ সম্বন্ধে যে জরিপ করেন পরবর্ত্তী কালে ঐ হ্রদের চারিদিকে ঘুরিয়া ফিরিয়া যাঁহারা জরিপ করিয়াছিলেন তাঁহারাও শরৎচন্দ্রের জরিপকে প্রায় নির্ভুল বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। পলটি হ্রদের জরিপ ছাড়া, শরৎচন্দ্র লোব্রাক বা মানসসরোবরের নিকটবর্ত্তী উপত্যকা প্রদেশেরও জরিপ করিয়াছিলেন।

 গভর্ণমেণ্ট ভারতের এই কৃতী সন্তানকে রায়-বাহাদুর, সি, আই, ই প্রভৃতি উপাধি ভূষণে ভূষিত করিয়া সম্মান প্রদর্শন করেন। শরৎচন্দ্রের স্থাপিত “বৌদ্ধ-শাস্ত্র প্রচার সমিতি” দ্বারা বৌদ্ধ-সাহিত্যের যথেষ্ট আলোচনা হইয়াছিল। তাঁহার সঙ্কলিত তিব্বতীয় ও ইংরাজী ভাষার অভিধান তাঁহাকে অমর করিয়া রাখিবে। তাঁহার ন্যায় তিব্বতীয় ভাষার সাহিত্য, ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বে সুপণ্ডিত ব্যক্তি ভারতবর্ষে অতি কমই আছেন।

 শরৎচন্দ্র বাল্যকালে প্রথম পড়াশুনা আরম্ভ করেন গ্রামস্থ পাঠশালায়। পরে চট্টগ্রাম ইংরাজী স্কুলে ভর্ত্তি হন। চট্টগ্রাম হইতে এণ্ট্রান্স পাশ করিয়া তিনি কলিকাতায় আসিয়া প্রেসিডেন্সী কলেজের পূর্ত্ত বিভাগে ভর্ত্তি হন। শরৎচন্দ্র যে সকল ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক তথ্য সম্বলিত গ্রন্থাদি সংগ্রহ করিয়া ভারতবর্ষে ফিরিয়া আসেন তাহার দ্বারা দেশের প্রাচীন ইতিহাস উদ্ধারের পথ সুগম হইয়াছে।

 শরৎচন্দ্র সিকিম রাজ্যের অন্তর্গত জঙ্গরি নামক স্থান হইতে যাত্রা করিয়া কাঞ্চনজঙ্ঘা গিরিশ্রেণী অতিক্রম করিয়া নেপাল রাজ্যের ইয়ামপাঠশালে উপনীত হন। উক্ত নগর তাম্বুর নদীর তীরদেশে অবস্থিত। এই স্থান হইতে তিনি কাঞ্চনজঙ্ঘা গিরিশ্রেণীর পশ্চিম পার্শ্বস্থ দুর্গম গিরিপথ অতিক্রম পূর্ব্বক গিয়ানসুর নামক গ্রামের নিকটবর্ত্তী তাসিচোডিং নামক মঠে উপনীত হন। সেখান হইতে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্ত্তী দুরারোহ চাথাংলা গিরিসঙ্কট অতিক্রম করিয়া জেমু নদীর মালভূমিতে উপনীত হন, এখানে সেই ভ্রমণ-বৃত্তান্ত বিবৃত হইল।

কাঞ্চনজঙ্ঘা গিরিশ্রেণী পরিক্রমণ

 ১৭ই জুন, ১৮৭৯। আজ সকাল বেলা আটটার সময় আমরা দার্জ্জিলিং হইতে সিকিমের অন্তর্গত জঙ্গরি নামক স্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম। বেলা দশটার সময় ৯,০০০ হইতে ১২,০০০ ফিট উঁচু পার্ব্বত্য উপত্যকায় আসিলাম। এপথে জোঁকের ভয় নাই। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য অতি মনোরম। তাহার প্রধান কারণ হইতেছে কুসুম-সুষমা। একদিকে যেমন রোডোডেনড্রোন (Rho-do-dendron) বা রক্তদ্রোণ পুষ্পগুচ্ছের লাল রঙের শোভা, তেমনি এই অধিত্যকার বুকে কত বিভিন্ন জাতীয় সবুজ পত্রাবলী শোভিত তরুশ্রেণী যে দেখিলাম তাহা আর কতইবা বলিব। দুঃখ হইল যে উদ্ভিদ্-বিদ্যা সম্বন্ধে আমার কোনও জ্ঞান নাই। বাখিল নামক স্থান ও জঙ্গরির মধ্যে আমাদের সঙ্গে ডক্টর ইংলিশ (Dr. Inglis) নামক একজন ভদ্রলোকের সাক্ষাৎ হইল। তিনিও দার্জ্জিলিং হইতে জঙ্গরি দেখিতে চলিয়াছেন। সঙ্গীয় কুলিদের অবাধ্যতার দরুন এবং পথপ্রদর্শকের অনভিজ্ঞতার ফলে তাঁহাকে পথে বিশেষ ক্লেশ পাইতে হইয়াছে। ডক্টর ইংলিশ আমাকে বলিলেন, তাঁহার জমিদারি নিউজিল্যাণ্ডে যাইবার পূর্ব্বে হিমালয় ভ্রমণের ইচ্ছা হইয়াছে তাই তিনি এ-অঞ্চলে বেড়াইতে বাহির হইয়াছেন। আমি তাঁহাকে আমার পক্ষে যতটুকু সাহায্য করা সম্ভবপর ছিল তাহা করিয়াছিলাম, তেমন ভাবে তাঁহাকে সাহায্য করিতে না পারায় বিশেষ মনঃদুঃখের কারণ হইয়াছিল। অপরাহ্ন পাঁচটার সময় আমরা জঙ্গরি পৌঁছিলাম। এখানে এক গোয়ালার বাড়ীতে আশ্রয় লইয়াছিলাম।

 জঙ্গরির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আমাকে অভিভূত করিয়াছিল। অধিত্যকাদেশ শ্যামল শস্যে পরিপূর্ণ। লতা, গুল্ম, তরুশ্রেণী সমুদয়ই ফুলে ফুলে শোভাময়। চমরী গোরুগুলি নিশ্চিন্ত মনে অধিত্যকার শ্যামল চারণ-ক্ষেত্রে চরিয়া বেড়াইতেছে। সন্ধ্যার শীতল বায়ু ধীরে ধীরে বহিতেছে। অস্তগামী সূর্য্যের গোলাপী আভা দূরবর্ত্তী তুষারাবৃত শৃঙ্গরাজির উপর পড়িয়া এই সুন্দর অধিত্যকা প্রদেশটিকে অপরূপ লোহিত বর্ণসুষমায় সুরঞ্জিত করিয়া দিয়াছে। দূরে তুষারমুকুটে শোভমান কাঞ্চনজঙ্ঘা, আর আমার দক্ষিণে দেখিতে পাইতেছিলাম শ্বেত তুহিনে মণ্ডিত কাবুর গিরিশ্রেণী। আর বাম দিকে শোভা পাইতেছে তুষারবিমণ্ডিত কাঙ্গলার পর্ব্বতে শৃঙ্গরাজি। আমাদের পশ্চাৎ দিক দিয়া রাথোঙ্গ নদী দিনরাত্রি কলরবে গিরিপথ প্রতিধ্বনিত করিয়া দক্ষিণ দিকের গিরিপথে বহিয়া চলিয়াছে। আমরা এখানে একদিন ছিলাম।

 ১৯শে জুন। আজ বেলা দশটার সময় জঙ্গরি ছাড়িলাম। চারিদিকে এমন গভীরভাবে কুয়াসায় ঢাকিয়া ফেলিয়াছে যে আমরা সূর্য্য যে আকাশে উঠিয়াছে তাহাই বুঝিতে পারি নাই। কিন্তু আমাদের পথপ্রদর্শক আমাদিগকে তাঁহার পরিচিত পথ দিয়া লইয়া চলিলেন।

 বেলা একটার সময় আমরা রাথোঙ্গ নদী পার হইলাম। নদীর উপরে ছোট ছোট তক্তা দিয়া তৈরি সেতু ছিল। নদী পার হইয়া আমরা পশ্চিম দিকে নেপাল সীমান্তের দিকে চলিলাম। পথের দুই দিকে রক্তদ্রোণ গাছের সারি। গাছগুলি ফুলে ফুলে অপূর্ব শোভা ধারণ করিয়াছে। কিছু দূর যাইতেই বৃষ্টির আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলাম। বেলা তিনটার সময় তিগিয়ালা নামক স্থানে পৌঁছিলাম। এ-স্থানের উচ্চতা হইবে ১৪,৮০০ ফিট। এখানে ঝড়-বৃষ্টির আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষার জন্য একটি প্রকাণ্ড গুহার মধ্যে গিয়া আশ্রয় লইলাম। এই গুহার মধ্যে আমাদের তিন জন তিব্বতীয়ের সহিত সাক্ষাৎ হইল। তাঁহারা বলিলেন, সিংবিয়ার নামক নেপালী গিরিপথে প্রবেশ করিবার পক্ষে আমাদের আর কোনও বাধার কারণ নাই। থানাদার বাধা দেওয়ার সঙ্কল্প পরিত্যাগ করিয়াছে। এ-সংবাদে যারপর নাই আনন্দ লাভ করিলাম। গুহার ভিতরে বসিয়াও বাহিরের তীব্র বায়ুর গর্জ্জন, বৃষ্টি ও তুষারপাতের অবিশ্রান্ত শব্দ শুনিতেছিলাম। ঠাণ্ডা কন্‌কনে বাতাসের তীব্রতা গুহার মধ্যে বসিয়াও অনুভব করিতেছিলাম। এখানে পাহাড়ের গায়ে তরুলতা-গুল্মের কোনও চিহ্ন নাই। সারারাত্রি দারুণ অসুবিধার ভিতর দিয়া কাটাইতে হইল।

 ২০শে জুন। আজ খুব সকালে যাত্রা করিলাম। সকালবেলার নির্ম্মল আকাশ ও সূর্য্যের প্রসন্ন দীপ্তি চিত্ত পুলকিত করিয়াছিল। আমরা এইবার যে অধিত্যকা পাইলাম, তাহা সবুজ সুন্দর ঘাসে অতি মনোরম শোভা ধারণ করিয়াছে। আমরা ক্রমে ক্রমে রাথোঙ্গ নদীর প্রধান শাখাটি ছাড়িয়া গিরিশিখরে আরোহণ করিতে আরম্ভ করিলাম। আমরা যখন কাঙ্গলা গিরিশৃঙ্গের পাদদেশে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি, তখন সূর্য্যের প্রখর কিরণে বিশেষ কষ্ট হইতেছিল। আমার সঙ্গী লামা ও আমি সবুজ রঙের চশমা পরিলাম। আর আমাদের কুলি এবং পথপ্রদর্শক তাহাদের চোখের কোণ কালো রঙে চিত্রিত করিল। খানিক দূর চলিয়া গায়ের গরম কোটটা খুলিয়া ফেলিয়া কুলির হাতে দিলাম। আমার পথপ্রদর্শক অতি দ্রুত চলিতেছিল, আমিও তাহার সহিত সমপদক্ষেপে অগ্রসর হইতেছিলাম। আমাকে পথপ্রদর্শক বারবার সতর্ক করিয়া দিতেছিল—সাবধানে পা ফেলিবেন, পা পিছলাইলে আর রক্ষা নাই, হাজার হাজার ফিট নীচের গভীর খাতে গিয়া পড়িতে হইবে।

 এক মাইল পথ ক্রমাগত বরফের উপর দিয়া চলিতে হইল। সম্মুখে কতকগুলি স্তূপাকৃত প্রস্তরখণ্ডের মধ্যে একটি নিশান উড়িতেছিল। পথ-প্রদর্শক বলিল উহা নেপাল ও সিকিমের সীমান্ত রেখা নির্দ্দেশ করিতেছে। আমরা এখানে খানিকক্ষণ বিশ্রাম করিলাম। তারপর আবার পথ চলা শুরু হইল। আবার প্রায় এক মাইল পথ তুষারাচ্ছন্ন পিচ্ছিল সঙ্কটময় পথে অগ্রসর হইতে হইয়াছিল। পাহাড়ের উপর হইতে বরফ গড়াইয়া পড়িতেছিল। এই ভীষণ সঙ্কটময় গিরিসঙ্কটের মধ্য দিয়া ইয়ামচু নামে পার্ব্বত্য নদী বহিয়া আসিয়াছে। আমাদের পথপ্রদর্শক বলিল—এই নদী অতিশয় বেগশালিনী, প্রতি বৎসর সেতু ভাঙ্গিয়া কত মানুষ ও পশ্বাদির যে মৃত্যু ঘটে তাহা নির্দ্দেশ করা সুকঠিন। নদী বহিয়া চলিয়াছে কোন্ সে আদি যুগ হইতে তাহা কে বলিবে? বরফ-গলা অতি শীতল জলে পূর্ণা, বেগবতী এই নদীকে ভয়ের চক্ষে দেখিলাম। এই প্রলয়ঙ্করী গিরি-নদীকে নেপালি ও ভুটিয়ারা পূজা করিয়া থাকে।

 এই ভাবে চলিতে চলিতে আবার একটি অধিত্যকার দিকে অগ্রসর হইলাম। অবতরণ পথটি ছিল বড়ই বন্ধুর। পথপ্রদর্শক আমাকে হাত ধরিয়া নিরাপদ স্থানে লইয়া আসিল। কুলিরা সকলে বিশ্রাম করিতে বসিল। কাঙ্গালাপর্ব্বতশ্রেণীর এই দিকের পাহাড়গুলি লাল বেলেপাথরে গঠিত। আমরা এখান হইতে আরও পাঁচ মাইল পথ চলিয়া একটি বিস্তৃত সমতল ভূমিতে আসিলাম। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য অতি রমণীয়। নানা শ্যামল তরুশ্রেণী এখানে শোভা পাইতেছে। সবুজ ঘাসে অধিত্যকাটি শোভাময়। এই মনোরম স্থানটির নাম কুর-পা-বা কার্পু। এখান হইতে কিছু দূরে ইয়ামপাঠসালে নামক একটি গ্রামে গিয়া আশ্রয় লইলাম। এখানে দীর্ঘকায় বহু দেবদারু তরু শোভা পাইতেছিল। তা ছাড়া রোডোডেনড্রেন, জুনিপার, বার্চ এবং লার্চ জাতীয় তরুশ্রেণী চারিদিকে বিদ্যমান ছিল। সন্ধ্যার সময় আমরা একটি সরাইয়ে যাইয়া পৌঁছিলাম। লামা উগায়েনগিয়াৎসু এখানে আসিয়া অসুস্থ হইয়া পড়িলেন। পথপ্রদর্শক আমাদের খাওয়ার জন্য দু’টি ভাত রাঁধিয়াছিল। আর মাখন দিয়া চা তৈরি করিয়াছিল। সারা দিনের কঠিন পরিশ্রমের পর এইরূপ আহারে শরীর অনেকটা সুস্থ হইয়াছিল। আমরা এখানে একদিন বিশ্রাম করিয়া পরের দিন অতি প্রত্যূষে আবার যাত্রা কারম্ভ করিলাম।

 ২২শে জুন। আমরা ইয়ালুং নদী পার হইয়া একটি দুরারোহ চড়াইয়ে উঠিতে লাগিলাম। এই চড়াইটি প্রায় ২,৫০০ ফিট খাড়া হইবে। বেলা দ্বিপ্রহরের সময় আমরা পাহাড়ের উপর উঠিলাম। এই গিরিশৃঙ্গটির নাম চুঞ্জারমা। চুজারমা গিরিশৃঙ্গের উপর দুইটি ছোট ছোট হ্রদ আছে। বড়টির বেড় ৫০০ ফিটের বেশী হইবে না। ইয়ালুং নদী এবং মাতারাচু নদীর মধ্যবর্ত্তী স্থানে আমাদের চারিটি অতি কঠিন চড়াই পার হইতে হইয়াছিল। উহার মধ্যে মির্কেন-লা, পাঙ্গোলা হইতেছে সব চেয়ে উঁচু। উহাদের উচ্চতা ১২,০০০ হইতে ১৪,০০০ ফিটের কম হইবে না।

 আমরা এই গিরিশৃঙ্গ কয়টি উত্তীর্ণ হইয়া একটি অতি সুন্দর গ্রামে আসিয়া পৌঁছিলাম। ছোট একটি নদী গ্রামের মধ্য দিয়া বহিয়া গিয়াছে। তিন দিকে পর্ব্বতশ্রেণী মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে। রক্তদ্রোণ, জুনিপার, দেবদারু প্রভৃতি তরুশ্রেণীর গভীর বন গাঢ় শ্যামল শোভায় শোভা পাইতেছে। আমাদের পথপ্রদর্শক তাঁহার বন্ধু একজন স্থানীয় “সেরপা”র (নেপালি বা ভুটিয়া কৃষক) সহিত পরিচয় করিয়া দিলেন। তিনি আমাদিগকে তাঁহার বাড়ীতে লইয়া গেলেন। আমার পোষাক-পরিচ্ছদ, লামা টুপি, এবং আমার আর্য্যজনোচিত আকৃতি দেখিয়া তাঁহারা আমাকে ‘পাবু’ বা নেপালি নামা বলিয়া মনে করিয়া লইয়াছিলেন। আমি কে, কোথা হইতে আসিতেছি, এ-সকল বিষয়ে কোনও প্রশ্ন না করিয়া ‘সোর-পা’ আমাকে তাঁহাদের বাস-গৃহের মধ্যে চমরী গোরুর রোমে নির্ম্মিত অতি সুন্দর আসনখানিতে বসাইয়া অতি বিনীতভাবে অভিবাদন করিলেন। গ্রামের লোকেরা আমাকে কৌতূহলভরে দেখিতে লাগিল। আমার নাম, জাতি, ভ্রমণের উদ্দেশ্য ইত্যাদি সম্পর্কে কেহ একটি প্রশ্নও করিল না। সঙ্গীয় লামা উগায়েনগিয়াৎসু তাহাদের মনের ভাব বুঝিতে পারিয়াছিলেন, তাই আমাকে ‘বাবু’ বা ‘লামা’ নামে সম্বোধন না করিয়া ‘পাবু লামা’ নামে সম্বোধন করিতে লাগিলেন।

 ২৩শে জুন। এই গ্রামটির নাম গিয়ানসুর। এখানে একটি বৌদ্ধ মঠ আছে। কাম্বাচান্ নদীর দক্ষিণ তীরে তাসিচোডিং নামক মঠটি অবস্থিত। এই বিহারে ৮০ জন শ্রমণ বাস করেন। পূর্ব্ব নেপাল ও সিকিমের মধ্যে ইহা একটি প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ মঠ। এখানকার গ্রন্থশালায় বৌদ্ধ-ধর্ম্ম-গ্রন্থাবলী সযত্নে সংগৃহীত রহিয়াছে। লামাদের মাথায় বড় চুল, কানে দীর্ঘ কর্ণ-বলয়, কতকটা ভারতের আদি যুগের বৌদ্ধ শ্রমণদের মত। আমি এবং লামা উগায়েনগিয়াৎসু দুইজনে একটি একটি করিয়া দুইটি টাকা মঠে প্রণামী দিলাম। সন্ধ্যাবেলা প্রধান লামা আমাদিগকে তাঁহার আশ্রমে নিমন্ত্রণ করিলেন। গরম মাখন চা, প্রচুর সিদ্ধ গোল আলু, মূলা এবং শালগম ইত্যাদির ব্যঞ্জন খাইতে দিলেন। অনেক দিন পরে এ-সমুদয় প্রিয় খাদ্যদ্রব্যাদি পাইয়া পরম পরিতোষ লাভ করিয়াছিলাম। প্রধান লামা আমাদিগকে বুদ্ধদেবের প্রতি ভক্তিমান্ থাকিতে উপদেশ দিলেন। লামা উগায়েনগিয়াৎসু বলিলেন—“আমাদের হিমালয়ের এই অঞ্চল সম্পর্কে কোনরূপ অভিজ্ঞতা নাই। আপনি যদি আমাদিগকে সাহায্য করেন। তবে একান্ত বাধিত হইব।” প্রধান লামা আমাদিগকে সাহায্য করিতে প্রতিশ্রুতি দিলেন। তাঁহার এই সদাশয়তার জন্য আমরা তাঁহাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিলাম। আমি লামার সহিত কথা বলিবার সময় নেপালী ভাষা এবং তিব্বতীয় ভাষা উভয় ভাষায়ই কথা বলিয়াছিলাম। লামা আমাকে ‘পাবু লামা’ বলিয়াই মনে করিয়াছিলেন। আমি অপ্রাসঙ্গিকভাবে আমার নাম ধাম ইত্যাদির কোনও পরিচয় দেন নাই। যাঁহার যেমন মনে হইয়াছে তিনি আমাকে সেইরূপ ভাবিয়া লইয়াছেন।

 ২৪শে জুন। আজ গ্রামের লোকেরা আমাদের মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য নিমন্ত্রণ করিয়াছিল। ভেড়ার মাংস, রুটি, আলু সিদ্ধ, বিবিধ ব্যঞ্জন এবং উত্তেজক পানীয় ‘মোরওয়া’ও আমাদের দেওয়া হইয়াছিল। আমরা বৃত্তাকারে ভোজনে বসিয়াছিলাম। আমি চীনদেশের একটি সুশ্রী কম্বল দ্বারা সারা দেহ আবৃত করিয়া বেশ আরাম করিয়া বসিয়াছিলাম। আমি বড় একটা কথা বলি নাই। আমার হইয়া লামা উগায়েনগিয়াৎসুই উত্তর দিতেন। আমি শুধু মাঝে মাঝে—“লা-লা-সো, থুগ-জে-ছে,” অর্থাৎ হাঁ—মশাই আপনাদের বিশেষ দয়া, এইরূপ দুই একটি কথা বলিয়াছি। লামা সব শেষে ভাত ও ভেড়ার মাংস আনিলেন। রান্না অতি উপাদেয় হইয়াছিল। আমরা প্রধান লামাকে দুইজনে পুনরায় দুইটি টাকা প্রণামীস্বরূপ দিয়া ‘সেরপার’ বাড়ী ফিরিয়া আসিলাম।

 ২৫শে জুন। আজ তাসিচোডিং মঠের দ্বিতীয় লামা আমাদের নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন। আমরা তাঁহাকেও দুই জনে দুইটী টাকা নমস্কারি দিলাম। গ্রামের লোকেরা একটি সভা করিয়া আমাদের তিব্বত-যাত্রা-পথে যাহাতে কোনরূপ অসুবিধা না হয় সেজন্য সাহায্য করিতে মনোযোগী হইলেন। ফুরচঙ্গ নামে গিয়ানপুর মঠের একজন শ্রমণকে আমাদের পথপ্রদর্শকরূপে সঙ্গে দিলেন! এই লোকটি গ্রামের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা বলবান্ ও শক্তিশালী। আমাদের সঙ্গীয় আগের কুলিদের বিদায় দিয়া এখানে নূতন কুলি নিযুক্ত করা হইল। গিয়ানসুর গ্রামটি কাঙ্গচান্ নামক নদীর তীরে অবস্থিত। সাধারণের বিশ্বাস এই নদীটি কাঞ্চনজঙ্ঘার নিম্নতম কোনও গিরিশৃঙ্গ হইতে উৎপত্তি লাভ করিয়াছে।

 পরদিন প্রত্যূষে বেলা সাতটার সময় গিয়ানসুর ছাড়িলাম। এবং কাঙ্গচান্ নদীর তীর ধরিয়া পথ চলিতে লাগিলাম। সহজ সুন্দর পথ। প্রভাত-সূর্য্যের প্রসন্ন কিরণে চারিদিক সমুজ্জ্বল।

 বেলা চারিটার সময় কাম্বাচেন্ বা কাঙ্গ-পো-চেন নামক একটি গ্রামে আসিলাম। এখানকার উচ্চতা প্রায় ১৩,৬০০ ফিট। গ্রামে প্রবেশ করিবার পথে নদীর স্রোতোজলে চালিত একটি যবের কল দেখিলাম। এখানকার সর্ব্বত্র যবের চাষ হইয়া থাকে। স্থানীয় বাড়ীঘরগুলি কাঠের তৈয়ারী। প্রস্তরখণ্ডের সাহায্যে কাঠগুলি আটকান হয়। জানালাগুলি খুবই ছোট। এজন্য ঘরের ভিতরে আলো বড় একটা প্রবেশ করে না। স্থানীয় লোকেরা অনেকটা সময় বাহিরেই কাটায়, ঘরে বড় একটা থাকে না। বাহিরে দরজার কাছে আগুন জ্বালাইয়া রাখে। আমরা সৌভাগ্যক্রমে কাঙ্গ-চান্ গিরিশৃঙ্গের উদ্দেশ্যে গিয়ানসুর এবং কাম্বাচান্ গ্রামবাসীদের পূজা ও উৎসব দেখিতে পাইয়াছিলাম। বন্দুক ছোড়া, কুস্তী-খেলা তীর নিক্ষেপ প্রভৃতি এই উৎসবের প্রধান অঙ্গ। ইহা অনেকটা বিখ্যাত “ওলিম্পিক্‌” ক্রীড়ার ন্যায়। আমরাও ঐ সকল ক্রীড়া-কৌতুকে যোগদান করিলাম এবং মল্লদিগকে সাধ্যানুরূপ পুরস্কৃত করিলাম।

 সেদিন বিকেলবেলা আমরা একজন পত্র-বাহকের মারফৎ জানিতে পারিলাম যে তিব্বত-সীমান্তের রাজকর্ম্মচারী, কাংবাচীনের দিকে আসিতেছেন। কাজেই যেন কোন বণিক্‌কে বা পর্য্যটককে তিব্বতের পথে অগ্রসর হইতে না দেওয়া হয়। তিব্বতে যাইবার পথটি হইতেছে চেন্‌মোর গিরিপথ। ঐ চেন্‌মোর গিরিপথে যাইতেই নিষেধ করিয়াছেন। গিয়ানসুর গ্রামের মঠাধ্যক্ষ লামা আমাদিগকে এই সংবাদ জানাইয়াছেন এবং ইহাও লিখিয়াছেন যে আমাদের পক্ষে উচিৎ হইবে অতি প্রত্যূষে অগ্রসর হওয়া। নচেৎ অগ্রসর হইবার পক্ষে বাধা পাওয়া স্বাভাবিক। গিয়ানপুর মঠের লামার এইরূপ বন্ধু-প্রীতি আমাদিগকে মুগ্ধ করিয়াছিল।

 ২৬শে জুন। আমরা অল্প রাত্রি থাকিতেই কাংবাচান্ গ্রাম ছাড়িলাম। তাম্বুর নদীর বাম তীরবর্ত্তী পথ ধরিয়া চলিতে লাগিলাম। কিছুদূর যাইয়া একটি পর্ব্বতশৃঙ্গে আরোহণ করিতে আরম্ভ করিলাম। পথটি ছিল বেশ ভাল এবং চড়াইও ছিল সহজ। আমরা যেমন উপরে উঠিতে লাগিলাম তেমনি দেখিতে পাইলাম দক্ষিণে ‘কাঙ্গ চান’ গিরিশ্রেণী শোভা পাইতেছে, আর বামে তুষারমণ্ডিত কাঙ্গপাচান্ গিরিশৃঙ্গ অপূর্ব্ব শ্রীশোভিত। কাঙ্গপাচান্ হইতে তিন মাইল দূরে আমরা একটি জলপ্রপাতের কাছে আসিলাম। জলপ্রপাতটি অতি সুন্দর। এই প্রপাতের জল স্থানীয় অধিবাসীরা অতি পবিত্র বলিয়া মনে করে। তাহারা এই জলপ্রপাতের নাম দিয়াছে ‘ক্ষান-দুম্-চু’ বা পরীদের জলপ্রপাত। এই প্রপাতের স্বচ্ছ শুভ্র সলিলরাশি ঝম্ ঝম্ ঝর্ ঝর্ শব্দে নিম্নস্থিত শিলাখণ্ডে পতিত হইয়া এবং সূর্য্য কিরণে উল্লসিত হইয়া শত শত রামধনুর সৃষ্টি করিতেছিল। কথিত আছে ভারতের প্রধান অষ্ট ঋষি, এই প্রপাতের পবিত্র সলিলে[] অবগাহন করিয়া ইহার জলের পবিত্রতার কথা প্রচার করেন। প্রপাতের তিনটি ধারা বজ্র নিনাদে শিলারাশি সমাকীর্ণ পর্ব্বত-নিম্নে পতিত হইয়া গিরিরন্ধ্র-পথে অদৃশ্য হইতেছে। আমরা প্রপাতের যে ধার দিয়া চলিলাম, সেখানকার প্রশস্ততা ১৮ ফিটের কম হইবে না। আর অনুমান প্রায় সহস্র ফিট উচ্চ হইতে সলিলধারা নিম্নে পতিত হইতেছে। যে বিরাট পর্ব্বত-শ্রেণী হইতে এই জলপ্রপাতের উৎপত্তি, যে অবিন্যস্ত বন্ধুর শিলাস্তূপের মধ্য দিয়া ইহার অশ্রান্ত পতন ও যে বনরাজি সমাকীর্ণ শ্যামল পার্ব্বত্য অধিত্যকার মধ্যবর্ত্তী গিরিসঙ্কট পথে ইহার ভূপতিত জলধারার অবাধ গতি তাহা বাস্তবিকই বিস্ময়কর।

 আমাদের অদ্যকার যাত্রাপথটি ছিল পরম রমণীয় সবুজ তৃণ পরিশোভিত। শ্যামল অধিত্যকার মধ্য দিয়া পথ। পথের দুইধারে নানাজাতীয় পুষ্পের বর্ণ-সুষমা আমাদের চিত্তকে অপূর্ব্ব আনন্দে অভিষিক্ত করিয়াছিল।

 বেলা দ্বিপ্রহরে রামথাং নামক একটি ক্ষুদ্র পল্লী প্রান্তের এক গোয়ালঘরে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম করিয়া সামান্য জলযোগ করিলাম। তারপর আবার পথ চলা শুরু হইল। অপরাহ্ন ৫টার সময় আমরা জোরগু-ওগো নামক স্থানের একটি পার্ব্বত্য গুহার মধ্যে আশ্রয় লইয়াছিলাম। গুহাটি ৪ ফিট দীর্ঘ, ৩ ফিট চওড়া এবং ৩ ফিট উঁচু ছিল। এ-গুহার মালিক একটি পার্ব্বত্য শৃগাল—ওয়ামো বা ওয়া। বেচারা ওয়াকে গৃহহারা করিয়া আজ আমরা তাহার গুহায় অতিথি হইলাম। ওয়ার গায়ের লোম বেশ বড় হয় এবং তা বেশ চড়া দামে বিক্রয় হইয়া থাকে। জোরগু-ওগোর উচ্চতা সমুদ্র তটরেখা হইতে প্রায় ১৮,৮০০ ফিট। ঐ সময়ে তাপমান ছিল ৩০° ডিগ্রী। আমি এখানে চা প্রস্তুত করিলাম। এবং কোনরূপে জনার খাইয়া কিয়ৎ পরিমাণে ক্ষুধা দূর করিলাম। রাঁধিবার কাঠ কোথায় মিলিবে যে দুইটি ভাত রাঁধিয়া খাইব? রাত্রি আরম্ভ হইবার সঙ্গে সঙ্গে বাহিরে ঝটিকার তীব্র আর্ত্তনাদ শুনিতে পাইতেছিলাম। সে শব্দের বিরাম ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে তুষারপাতও আরম্ভ হইল। দেখিতে দেখিতে পর্ব্বতশ্রেণী, আকাশমণ্ডল, চতুর্দ্দিক তুষারময় হইয়া গেল। বাহিরে বাতাসের তীব্র গর্জ্জন ও তুষারপাতের শব্দ শুনিতেছিলাম। লামা উগায়েনগিয়াৎসু এবং আমি কোন রকমে কম্বল মুড়ি দিয়া সেই শৃগালের গর্ত্তেই শুইয়া পড়িলাম। সঙ্গের কুলিরা বাহিরে উন্মুক্ত আকাশতলে আমার ওয়াটারপ্রুফ কাপড় এবং ছাতা কয়টির আশ্রয়ে অতিবাহিত করিল। গুহার মাঝখানটি ছিল অসমতল ও প্রস্তরাকীর্ণ, তাই সকালবেলা ঘুম ভাঙ্গিলে পর পৃষ্ঠদেশে অত্যন্ত বেদনা অনুভব করিলাম।

 ২৭শে জুন। ঠিক প্রভাত নয়, উষার প্রথম আলোক-রেখা আকাশ প্রান্তে কেবল ফুটিয়া উঠিয়াছে, ঠিক্ সেই সময়ে আমরা আবার যাত্রা আরম্ভ করিলাম। পথে কোথাও সামান্য তৃণগুল্ম বা উদ্ভিদের চিহ্ন নাই। ঊষার স্তিমিত আলোকে দেখিলাম, তখনও চারিদিক তুষারময় এবং তখনও তুষারপাত হইতেছিল। তুষার-কণাগুলি বায়ুবেগে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইতেছিল।

 দক্ষিণে ও বামে যেদিকে দৃষ্টিপাত করি, সে দিকেই দেখিতে পাইতেছিলাম—অদ্রিমালার শুভ্র অভ্রভেদী শৃঙ্গনিচয়, একটির পর একটি কোন্ অজানা দেশে গিয়া মিশিয়াছে। তুষার-ঝটিকার ক্ষণমাত্রও বিরাম নাই। আমরা সমুদ্রসমতা হইতে আনুমানিক ১৯,০০০ ফিট উচ্চ পর্ব্বতশৃঙ্গ মধ্যস্থ পথ ধরিয়া চলিতেছি।

 পথ-প্রদর্শক বলিলেন, এখন আমরা চিরস্থায়ী তুষাররাশির শেষ প্রান্তে আসিয়া পৌঁছিয়াছি। আমাদের দক্ষিণে ও বামে চিরতুষারাচ্ছন্ন হিমারণ্য। এই তুষারাচ্ছন্ন গিরিপথে আমরা অতি কষ্টে ক্রমশঃ উপরে উঠিতে লাগিলাম। কিছুদূর অগ্রসর হইবার পর দেখিতে পাইলাম, তুষারগিরিশ্রেণী উত্তর হইতে উত্তর-পশ্চিম দিকে চলিয়া গিয়াছে। উপত্যকা ভূমি তুষার-স্তূপে সমাবৃত। এ সকল তুষার স্তূপের কোনটিই পঞ্চাশ ফুটের কম নহে। আমার মনে হইল আমরা যেন তুষার-সমুদ্রের মধ্য দিয়া যাইতেছি, আর এই তুষার স্তূপসমূহ যেন সমুদ্রের তরঙ্গ। এই বিরাট তুষার-রাজ্যের তিন মাইল পথ দুঃসহ ক্লেশ সহ্য করিয়া অতিক্রম করিবার পর আমি ক্লান্ত ও শ্রান্তদেহে ভূমিতলে বসিয়া পড়িলাম। বায়ুমণ্ডলের লঘুতা বশতঃ আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের অত্যন্ত কষ্ট বোধ হইতেছিল। আমরা এখন ১৯০০০ ফুটেরও কিছু উর্দ্ধে উঠিয়াছিলাম। এই সুদীর্ঘ ও দুরারোহ পথ অতিবাহনে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস যেন বন্ধ হইয়া যাইতেছিল। সূর্য্যকিরণে উদ্ভাসিত তুষাররাশির ঔজ্জ্বল্যে আমাদের চক্ষু যেন ঝলসাইয়া যাইতেছিল, নেত্রপীড়া অনুভব করিতেছিলাম। আমি সবুজ বর্ণের চশমা পরিলাম, তবু অসোয়াস্তি বোধ করিতেছিলাম। আমার জীবনে আমি এইরূপ শোচনীয় অবস্থায় কোনদিন পড়িয়াছি বলিয়া মনে হয় না। লামা উগায়েনগিয়াৎসুর স্থূল কলেবর, কাজেই তাঁহার অবস্থা আমার অপেক্ষাও শোচনীয় হইয়া পড়িয়াছিল। তিনি পথশ্রমে একান্ত কাতর হইয়া আমার পাশে বসিয়া পড়িলেন। আমরা প্রায় অর্দ্ধঘণ্টা কাল এইরূপ শোচনীয় অবস্থায় তুষাররাশির উপর পড়িয়া রহিলাম। অবশেষে লামা আমাদিগের পথপ্রদর্শক ফুরচঙ্গকে বলিলেন, যদি সে আমাকে কিছুদূর স্কন্ধে করিয়া লইয়া যায়, তাহা হইলে তিনি তাহাকে প্রচুর পুরস্কার দিবেন। পুরস্কারের প্রত্যাশায় ফুরচঙ্গ আমাকে স্কন্ধে করিয়া অর্দ্ধ ক্রোশ পথ লইয়া গেল। তথায় বড় বেশী তুষার ছিল না। আমাকে নামাইয়া দিয়া ফুরচঙ্গ পুনরায় নীচে গিয়া মালপত্র সব লইয়া আসিল।

 এইবার একটু আরাম বোধ করিলাম কিন্তু হিমালয়ের এই নিভৃত তুষারাবৃত শৃঙ্গের উপরত আর বসিয়া থাকিলে চলিবেনা, তাই আবার আমরা চলিতে আরম্ভ করিলাম। সন্ধ্যা ছয় ঘটিকার সময়ও আমরা আমাদের গন্তব্য স্থানে পৌছিতে পারিলাম না। কাছে এমন স্থান কোথাও নাই যে রাত্রির মত আশ্রয় লাভ করিতে পারি। জল নাই, গাছপালা নাই, লোকালয় নাই, পল্লী নাই, মানুষ নাই, কোথায় গিয়া আশ্রয় লইয়া রাত্রি কাটাইব, তাহাই হইল ভাবনার কথা।

 এদিকে তুষারপাতের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র শীতল বায়ু বেগে বহিতেছিল। তুষারাচ্ছন্ন ভূমিতলে মুক্ত আকাশতলে ত আর শুইয়া থাকা সম্ভবপর নহে। আমরা একান্ত শঙ্কাকুল চিত্তে চলিতে লাগিলাম। অন্ধকার হইয়াছে, শুধু তুষারের শুভ্রদীপ্তি-বিভাসিত ক্ষীণ আলোকে পথ দেখিয়া চলিতেছিলাম। রাত্রি সাতটার সময় আমরা একটা প্রকাণ্ড শিলাস্তূপের কাছে আসিলাম। আমাদের পথপ্রদর্শক বলিল, রাত্রিতে এই প্রস্তর স্তূপের স্থানচ্যুত হইবার সম্ভাবনা নাই। রাত্রিতে তুষার গলিবে না। তবে আমাদের সূর্য্যোদয়ের পূর্ব্বেই এস্থান পরিত্যাগ করা শ্রেয়ঃ। আমরা বরফের উপরই কম্বল বিছাইয়া শয্যা রচনা করিলাম। কাল সারাদিন অনাহারে কাটাইয়াছি, তবু একেবারেই ক্ষুধা ছিল না। ক্লান্তিবশতঃ ঘুমাইয়া পড়িলাম।

 ২৮শে জুন। সূর্য্যোদয়ের পূর্ব্বেই যাত্রা আরম্ভ করিলাম। দিগন্তবিস্তৃত তুষার-সমুদ্র। প্রস্তর স্তূপ, গাছপালা, কিছুই দেখা যাইতেছিল না। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের অত্যন্ত কষ্ট হইতে লাগিল। এক পা চলি, আবার বসিয়া পড়ি বা শুইয়া পড়ি। হাঁটু পর্য্যন্ত বরফাবৃত পথে বরফরাশি ঠেলিয়া চলিতে হইতেছে। পা দুইটি একেবারে অবশ হইয়া গিয়াছিল। এইরূপ অতি শোচনীয় শারীরিক অবস্থায়ও আমি প্রাণপণে অগ্রসর হইতে চেষ্টা করিলাম। কিন্তু পারিতেছিলাম না। আমার অবস্থা দেখিয়া ফুরচঙ্গ আমাকে আবার কাঁধে করিয়া লইয়া চলিল। তাহাকে আমি আমার সবুজ চশমাটি পরিতে দিলাম। আর আমি অবসন্নভাবে চোখ বুজিয়া তাহার স্কন্ধদেশে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলাম। এইভাবে প্রায় এক মাইল পথ চলিয়া আমরা জোন্-সাং-লা পর্ব্বতশৃঙ্গের পদতলে আসিয়া পৌঁছিলাম। এখানে তুষার নয় ইঞ্চির বেশী গভীর ছিল না। আমি এইবার আস্তে আস্তে চলিতে লাগিলাম। ফুরচঙ্গ তাহার মালপত্র আনিবার জন্য আবার নীচে নামিয়া গেল। সূর্য্য এ-সময়ে পশ্চিম দিকের গিরিশ্রেণীর অন্তরালে পড়ায় আমাদের চলিতে একটু সুবিধা হইয়াছিল। চলিতে পা পিছলাইয়া পড়িতেছিল, তবু চলিতেছিলাম। আবার এদিকে খুব জোরে তুষার পাত হইতেছিল। সন্ধ্যার প্রাক্কালে প্রায় ছয় ঘটিকার সময় আমরা একটি গুহা পাইলাম। গুহাটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে বেশ বড়। খাড়াইও ৬ ফুটের কম নহে। আমাদের পথপ্রদর্শক বলিল,—আমরা দুর্গম তুষার-গিরিপথ উত্তীর্ণ হইয়া আসিয়াছি। ক্রমশঃ আমাদের পথ সুগম ও সহজ হইবে। আমরা গুহার মধ্যে কম্বল বিছাইয়া শুইয়া পড়িলাম। বরফের স্তূপের উপর বিছানা পাতিতে হইল। গুহার ছাতের ফাঁক দিয়া বিন্দু বিন্দু জলাকারে বরফ গলিয়া পড়িয়া ক্লেশদায়ক হইয়াছিল। কাঠ কোথায়? আর কাঠ থাকিলেই বা কিভাবে আগুন জ্বালাইতাম! আমরা এইবার নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্ত্তী দুরারোহ সুদুর্গন চাথাংলা নামক তুষারাবৃত গিরিসঙ্কট অতিক্রম করিয়া জেমু নদীর মালভূমিতে উপস্থিত হইয়াছি। চাথাংলা গিরিবর্ত্ম অতিক্রম কালে যে কিরূপ দুঃসহ ক্লেশ ও অনশনের যন্ত্রণা সহ্য করিতে হইয়াছিল তাহা আমাদের লিখিত এই বিবরণী হইতেই সকলে উপলব্ধি করিতে পারিবেন। চাথাংলা গিরিবর্ত্মের উচ্চতা কোন কোন স্থানে সমুদ্র তটরেখা হইতে প্রায় ২০,০০০ ফিট উচ্চ হইবে।

 ২৯শে জুন। আজ প্রত্যূষে আমদেের উৎরাই বা নিম্নাবতরণ আরম্ভ হইল। প্রায় ছয় ঘণ্টা কাল দুর্গম গিরিসঙ্কট-পথে অবরোহণ করিতে করিতে আমরা ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত তুষার স্তূপের মধ্যে কিছু কিছু সবুজ তৃণগুল্মাচ্ছাদিত দুই একটি গিরিশ্রেণী দেখিতে পাইলাম। বেলা এক ঘটিকার পর একটি পার্ব্বত্য নদী উত্তীর্ণ হইয়া গিয়ামি-থো-থো নামক এক গ্রামে আসিলাম। এই গ্রামটি একটি সুন্দর পার্ব্বত্য অধিত্যকায় অবস্থিত। নদীটির নামও গিয়ামি-থো-থো। ঐ নদীর পার হইয়া আমরা বন্ধুর পার্ব্বত্য পথে কিয়দ্দূর অগ্রসর হইবার পর জেমি নদীর তীরে আসিলাম। এই জেমি নদী কাঞ্চনজঙ্গার উত্তর দিকের শৃঙ্গরাজির চরণতল ধৌত করিয়া ক্রমাগত নিম্নাবতরণ করিতে করিতে অবশেষে তিস্তা নদীর সহিত গিয়া মিলিত হইয়াছে। জেমি নদীর তীরবর্ত্তী উপত্যকায় একটি ঘাসের শীষও দেখা গেল না। নদীর তীর ধরিয়া আমরা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। এইখানে কিছুদূর যাইবার পরই আমরা দেখিতে পাইলাম, অদূরস্থিত এক উপত্যকা ভূমিতে চমরী গাভী ও লম্বা লোমবিশিষ্ট মেষ ও ছাগ চরিতেছে। আমাদের পথপ্রদর্শক এখানে আসিয়া অত্যন্ত ভীত হইল। এই ডোক গিরিপথের রক্ষী প্রহরীর প্রতি আদেশ আছে যদি কেহ এই পথে তিব্বত সরকারের বিশেষ অনুমতি ব্যতীত অগ্রসর হয়, তবে এখানকার রক্ষী প্রহরী ঐরূপ যাত্রীদের যথাসর্ব্বস্ব বাজেয়াপ্ত করিতে পারে। এজন্য সরকার তাহাকে অপরাধী করিবে না। আমাদের এই পথের ‘ছাড়পত্র’ ছিল না। পথপ্রদর্শক ইহা বিশেষভাবে জানিয়াও আমাদিগকে বিপন্ন করিয়াছিল। নিরুপায় আমরা, আমরা আর কি করিব তাড়াতাড়ি একটি গুহার মধ্যে গিয়া লুকাইলাম। সন্ধ্যার সময় অতি সংগোপনে বাহির হইয়া নদী পার হইলাম। জেমি নদীটি বেশ বড় এবং তিনটি স্রোতোধারায় বিভক্ত হইয়া বহিয়া চলিয়াছে। আমরা নদী পার হইয়া একটি দুরারোহ গিরিশৃঙ্গে আরোহণ করিলাম। সেদিন ছিল শুক্লপক্ষ। শুক্লপক্ষের উজ্জ্বল চন্দ্রকিরণে দেখিতে পাইলাম দক্ষিণে ও বামে এক বিস্তৃত মালভূমি আর তাহার দুইদিকে দুইটি গিরিশ্রেণী বিরাজমান। ঐ মালভূমির উপর তুষার অতি অল্পই দেখা গেল। গিরিশ্রেণী তুষারাবৃত এবং বৃক্ষলতাহীন মরুর মত দেখা যাইতেছিল। আমরা মুক্ত গগনতলে মাটির উপরে কম্বল বিছাইয়া শুইয়া পড়িলাম। উপরে চন্দ্রকিরণোজ্জ্বল নীল আকাশ, নিম্নে তুষারমৌলি অভ্রভেদি গিরিশৃঙ্গ, দক্ষিণে ও বামে বিস্তৃত মালভূমি। আমাদের কিন্তু এইখানে গভীর নিদ্রা-সুখে রজনী অতিবাহিত হইল।

 ৩০শে জুন। সকালবেলা যাত্রা শুরু করিলাম। আমাদের পথ দুর্গম না হইলেও একেবারে সহজগম্যও ছিল না। তিন দিন অনশনে থাকার জন্য আমরা অত্যন্ত ক্লান্ত ও অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিলাম। ক্রমাগত আট মাইল পথ চলিয়া আমরা নিরিমলা নামক চোরতেনে আসিয়া পৌঁছিলাম। এখানকার বিচিত্র দৃশ্য দেখিয়া আনন্দে অভিভূত হইলাম। পর্ব্বতের পর পর্ব্বত সার বাঁধিয়া চলিয়াছে। সবগুলিই তুষারাবৃত। এ-সমুদয় গিরিশ্রেণীর অন্তরাল দিয়া দেখা যাইতেছিল দূরবর্ত্তী তিব্বতের বিস্তৃত মালভূমি ও নির্ম্মল নীল আকাশ। দূরে দূরে বিশাল তুষারক্ষেত্রের বিরাট দৃশ্যও দেখা যাইতেছিল। আমি ফুরচঙ্গকে সঙ্গে লইয়া তাহার সাহায্যে এখানকার সর্ব্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গের উপর আরোহণ করিলাম। এখান হইতে আমার কল্পনারাজ্যের বাস্তব স্বপ্ন তিব্বতের উচ্চ মালভূমি দেখিতে পাইয়াছিলাম। উত্তর দিকে চাহিয়া দেখিলাম, নিরভ্র নির্ম্মল নীল আকাশের নীচে তিব্বতের মালভূমির বুকের গিরিশৃঙ্গসমূহ দেখা যাইতেছে। আমি যে পর্ব্বতশৃঙ্গের উপর আরোহণ করিয়াছিলাম তাহার নাম লাপৎসা বা ওবো। উহার উপরে শিলাগঠিত একটি ‘স্তূপ’ ছিল। উহা ভারতীয় বৌদ্ধদের কীর্ত্তিচিহ্ন। স্তূপের উপর নানা পতাকা উড়িতেছে। আমি এই স্তূপের সন্নিকটে ভক্তিভরে মাথা নত করিয়া শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রকাশ করিলাম। লামা উগায়েনগিয়াৎসু একটি পতাকা খুঁটির সহিত বাঁধিয়া দিলেন। আমরা এই পবিত্র ভূমিতে অর্দ্ধ ঘণ্টা কাল বিশ্রাম করিয়া তিব্বতের মালভূমির দিকে অবতরণ করিতে লাগিলাম। বেলা তিনটার সময় একটি হ্রদের তীরে আসিলাম। সূর্য্য ক্রমশঃ ভারতবর্ষের সীমান্তরেখায় অবতরণ করিতেছিল। তাহার রক্তিম জ্যোতিঃতে চারিদিকে লোহিতাভা ফুটিয়া উঠিয়াছিল। হ্রদের স্বচ্ছ নীলাভ জলে প্রত্যেকটি পর্ব্বতশৃঙ্গ ও আকাশের বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন শুভ্র মেঘমালা প্রতিফলিত হইয়াছিল। হ্রদটি ডিম্বাকার—দৈর্ঘ্যে /মাইল ও ২৫০ গজ প্রশস্ত হইবে। এই হ্রদ হইতে নিমানদীর উৎপত্তি হইয়াছে। আমরা হ্রদের তীরে বসিয়া চিনি সহযোগে ভুট্টা খাইয়া খানিকটা তৃপ্তি বোধ করিলাম। আবার আমাদের যাত্রা শুরু হইল।

 পথের দুই দিকে মরুসদৃশ্য তৃণগুল্মবিহীন গিরিশ্রেণী। আমরা প্রায় পাঁচ মাইল পথ চলিয়া “সূর্য্যদেবের চৈত্য” (Chaitya of the Sun) নামক স্থানে আসিলাম। এখানে তীর্থ-যাত্রীদের ও লামাদের বিশ্রামের জন্য পাথরের দুই একটি বাড়ী আছে। এখানে অনেক খোদিত লিপিসম্বলিত স্তূপও দেখিলাম। এই চৈত্যটি ভারতীয় বৌদ্ধ শ্রমণদের কীর্ত্তি। সেই কবে কোন্ আদি যুগে বৌদ্ধ শ্রমণেরা এখানে আসিয়া এই চৈত্যটি নির্ম্মাণ করিয়া গিয়াছেন, এখনও তাহা ভারতীয়দের কীর্ত্তি-গৌরব ঘোষণা করিতেছে। তিব্বতের নানা প্রদেশ হইতে এবং চীন ও মোঙ্গোলিয়া হইতে প্রতি বৎসর এই পবিত্র স্থানে তীর্থ-যাত্রিগণের আগমন হইয়া থাকে। এখানে আমরা একজাতীয় গুল্ম দেখিলাম, তাহাতে অসংখ্য বেগুনি রংয়ের ফুল ফুটিয়া আছে। এই ফুলগুলির মৃদু মধুর সৌরভে চারিদিক সুরভিত করিয়াছিল। ফুরচঙ্গ আস্তে আস্তে হামাগুড়ি দিয়া মঠের ভিতর প্রবেশ করিয়াছিল। সে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, মঠের মধ্যে লোকজন কেহই নাই। মঠ হইতে ফুরচঙ্গ কিছু কাঠ ও শুষ্ক গোময় সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিল। ছয়টার সময় আমরা ১৭,০০০ হাজার ফিট উচ্চ পর্ব্বতশৃঙ্গে রান্না চড়াইয়া দিলাম। এবং তিন দিনের ক্লান্তি ও অবসাদের পর পেট ভরিয়া অন্নাহার করিলাম। সন্ধ্যার অব্যবহিত পরে আবার পথ চলিতে আরম্ভ করা গেল। যে পথে তোঙ্গরিজং ও কামবাজোংয়ের দুই দিকের পথের সহিত গিয়া মিলিত হইয়াছে, আমরা সেই পথ ধরিয়া চলিলাম। সোজা পথে চলিলে ধরা পড়িয়া বিপন্ন ও বন্দী হওয়ার আশঙ্কায়ই আমাদিগকে এই পথে যাইতে হইয়াছিল। আমরা যদি ধরা পড়িতাম, তাহা হইলে জাম্‌বাজোঙ্গে বন্দী-ভাবে থাকিতে হইত। আজ আবহাওয়া ছিল অতি চমৎকার। আকাশ ছিল মেঘশূন্য উজ্জ্বল নীল। পথের দুইধারে একজাতীয় কণ্টকগুল্মে অসংখ্য ফুল ফুটিয়াছিল। তাহাদের সৌরভে পথটি সুরভিত হইয়াছিল। এই স্থানের বৃক্ষলতাদি সবই সুগন্ধময়। ইহাদের সুগন্ধে এই স্থান আমোদিত হইতেছে বলিয়াই বোধ হয় এ স্থানের নাম গন্ধমাদন হইয়াছে।

 হিমালয়ের এই উত্তর দিকের পর্ব্বতশ্রেণীর মধ্যে নানাজাতীয় প্রস্তর ও খনিজ দ্রব্যাদি দেখিতে পাওয়া যায়। অভ্র, স্ফটিকশিলা, কৃষ্ণশিলা কত কি দেখিলাম, কিন্তু শ্লেট পাথর কোথাও দেখি নাই। রাত্রি দ্বিপ্রহরে আমরা বহু গিরি, নদী উত্তীর্ণ হইয়া থিকোঙ্গ বা থিবোঙ্গ নামক একটি গ্রামে আসিয়া উপনীত হইলাম। আমরা এখানে নিঃশঙ্কচিত্তে পরমানন্দ মনে মুক্ত আকাশতলে কম্বল জড়াইয়া সুনিদ্রায় রাত্রি কাটাইলাম। আমাদের দক্ষিণ দিকে শুভ্র-তুষার-মুকুট পরিশোভিত অগণিত গিরিশৃঙ্গ শোভা পাইতেছিল। আর বাম দিকে থিবোঙ্গের নিকটবর্ত্তী গিরিশ্রেণী প্রহরীর মত দাঁড়াইয়াছিল। সম্মুখ ভাগে দেখিতেছিলাম দিগন্তপ্রসারিত মধ্যতিব্বতের গিরিশৃঙ্গরাজি।

 ১লা জুলাই। আজ অতি প্রত্যূষে যাত্রা আরম্ভ করিলাম। পথে নিমা নদী দ্বিতীয় বার পার হইতে হইল। প্রায় এক মাইল পথ অগ্রসর হইয়াছি, এমন সময় দূরে ঘণ্টাধ্বনি শোনা গেল। আমাদের মনে হইল কোনও পর্য্যটকদল আসিতেছে। একটু পরেই পথিকদের সহিত দেখা হইল। তাহারা সংখ্যায় ছিল মাত্র চার জন। এই পথিকেরা সার নামক স্থানের দিকে যাইতেছে। আমাদিগকে এই যাত্রীদল নানারূপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে আরম্ভ করিল, আমরা কোথা হইতে আসিয়াছি? আমাদের দেশ কোথায়? কোথায় আমরা যাইব ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। ফুরচঙ্গ পথিকদের প্রশ্নের উত্তর দিল। তাঁহারা আমাকে একজন ‘সারপা লামা’ বলিয়া ধরিয়া লইল এবং তাহারা বলিল যে নেপালের পথে আমাকে দেখিয়াছে।

 থিকোঙ্গ গ্রামটি—নিমা নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। গ্রামের নিম্নস্থ উপত্যকা তরু গুল্মহীন ঊষর মরুভূমির মত। গ্রামখানি প্রায় আট ফিট উচ্চ প্রস্তর প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। বাড়ী ঘরগুলির ছাত সমতল। পাথরের তৈয়ারী এবং প্রত্যেক ঘরের কোণেই মন্ত্র-তন্ত্র সম্বলিত কাগজ ও কাপড়ের টুকরা সংযুক্ত নিশান। প্রত্যেক বাড়ীর সম্মুখেই ছোট এক একটি বাগান। বাগানে নানা জাতীয় পার্ব্বত্য-কুসুম ফুটিয়া শোভা পাইতেছে। গ্রামের বাহিরের ক্ষেতে যবের চাষ হয়। নদীর মুখ হইতে খাল কাটিয়া আনিয়া ক্ষেতে জল দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। থিকোঙ্গ গ্রামের দূর পশ্চিমে সার, টিঙ্কিজোঙ্গ নামে কয়েকটি গ্রাম দেখা যায়। উত্তর-পশ্চিম দিকে সিকিমরাজ্যের তিব্বতীয় জমিদারী দোব্‌তা অবস্থিত।

 চোমিতি-দোঙ্গ নামক হ্রদের চতুষ্পার্শ্ববর্ত্তী স্থান দোব্‌তা নামে পরিচিত। চোমিতিদোঙ্গ হ্রদের জল সুমিষ্ট এবং এই জল মানুষ, পশু প্রভৃতি সকলে পান করিয়া পরিতৃপ্ত হইয়া থাকে। হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ হইতে একটি ক্ষুদ্রকায়া পার্ব্বত্য নদীর উৎপত্তি হইয়াছে। হ্রদের তীরে তাশি-শে-পা নামক গ্রামে একজন ধনী তিব্বতীয়ের একটি চারিতল বাড়ী আছে। ঐ বাড়ীতে চৌষট্টিটি জানালা রহিয়াছে। একদিন পশুপাল চরাইতে চরাইতে হ্রদের তীরস্থ এক নিভৃত স্থান হইতে সে বহু গুপ্তধন পাইয়া ধনশালী হইয়া উঠে এবং বৃহৎ প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা নির্ম্মাণ করিয়া বাস করিতে থাকে।

 চোমিতি হ্রদের সম্বন্ধে একটি অলৌকিক কাহিনী প্রচলিত আছে। যেখানে এখন এই বৃহৎ ও সুন্দর হ্রদটি বিদ্যমান, পূর্ব্বে ঐ স্থানে ছিল একটি সুমিষ্ট সলিল-ধারা-পূর্ণ উৎস। সেই প্রস্রবণের অধিকারিণী ছিলেন এক নাগকন্যা। মরুভূমির ন্যায় ঊষরক্ষেত্র-পরিবেষ্টিত এই একটি মাত্র সুমিষ্ট সলিলপূর্ণ প্রস্রবণ বিদ্যমান থাকায় পথিকেরা, নিজেরা যেমন ইহার জল পান করিয়া তৃষ্ণা নিবারণ করিত, তেমনি পশ্বাদিরও এই প্রস্রবণই ছিল একমাত্র জল পানের অবলম্বন। একবার এক বণিক শতাধিক পশুপাল লইয়া এ স্থানে আসেন। তিনি প্রস্রবণের উৎক্ষিপ্ত ধারা হইতে জল সংগ্রহ করিলেন, কিন্তু পরে উহা যথারীতি পাথর দিয়া ঢাকা দিতে ভুলিয়া গেলেন। এদিকে সঙ্গীয় পশুপাল প্রস্রবণের জল পান করিয়া জল প্রায় নিঃশেষ করিয়া ফেলিল এবং তাহাদের খুরের দ্বারা আঘাত করিয়া যে সামান্য জল ছিল তাহাও কর্দ্দমাক্ত করিয়া পানের অযোগ্য করিল। নাগকন্যা তাহার প্রিয় প্রস্রবণের এইরূপ শোচনীয় অবস্থা দেখিয়া অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইলেন এবং ঐ উৎসটিকে সমুদ্রে পরিণত করিতে ইচ্ছা করিলেন। নাগকন্যার স্বামী ছিলেন ভারতীয় প্রধান বৌদ্ধ আচার্য্য ফা-দাম-পাই-সাঙ্গ (Pha-dam-Pai-sange)। তিনি এইরূপ কার্য্য হইতে পত্নীকে নিবৃত্ত করিতে চেষ্টা করিলেন কিন্তু তাহাতে কোনও সুফল হইল না। নাগকন্যা ক্ষুদ্র প্রস্রবণের সহিত সমুদ্রের সংযোগ সাধন করিলেন, তাহারই ফলে ক্ষুদ্র উৎস হইতে হইল এই সুবৃহৎ হ্রদের সৃষ্টি।

 আমরা যে ভারতীয় আচার্য্যের কথা বলিলাম, তিনি তোঙ্গরিজঙ্গ মঠের প্রতিষ্ঠাতা। সেই মঠের মধ্যে আচার্য্যের ও তাঁহার পত্নী নাগকন্যার প্রতিমূর্ত্তি রহিয়াছে। ঐ মঠে প্রবেশ করিয়া ইঁহাদের মূর্ত্তি দেখিতে হইলে তিব্বতীয় এক টঙ্কা (ভারতীয় ৷৵৹ আনার সমতুল্য) দক্ষিণা দিতে হয়। থিকোঙ্গে আমাদের ঘোড়া মিলিল না। এখন ঘোড়াতে যাওয়াই সুবিধাজনক। আমরা থিকোঙ্গ হইতে টাঙ্গ-লাঙ্গ নামক একটি গ্রামে আসিলাম। বেশ বড় গ্রাম। প্রায় ৩০০ শতটি বাড়ী আছে। ছোট একটি নদী গ্রামের মধ্য দিয়া প্রবাহিত। নদীর দুই পাশে যবের ক্ষেত। এখানকার চমরী গোরুগুলি দেখিতে যেমন সুশ্রী, তেমনি সুস্থ ও সবল। মাঠে অনেক গাভী, ভেড়া ও ছাগল চরিতেছে। গ্রামে প্রবেশের পথে দুইটি বেশ উচ্চ চৈত্য দেখিলাম। গ্রামের মধ্যে একটি মঠে বুদ্ধদেবের মূর্ত্তি রহিয়াছে। ফুরচঙ্গ আমাদিগকে তাহার পরিচিত এক গৃহস্থের বাড়ী লইয়া গেল। বাড়ীর গৃহিণী আমাদিগকে চা এবং যবের তৈরি খাদ্য দিলেন। আমাদের রাত্রিতে থাকিবার জন্য একটি ছোট ঘর দেওয়া হইল। ঘরটি ১০ ফিট দীর্ঘ এবং ৮ ফিট প্রশস্ত হইবে। ঘরের মেজে ধূলাবালিতে পূর্ণ ছিল। এক কোণে ছিল অগ্নি জ্বালিবার চুল্লি। আমি এই ধূলাবালিভরা নোংরা ঘরে থাকিতে পারিলাম না। আমার শ্বাসপ্রশ্বাস যেন বন্ধ হইয়া আসিতেছিল। অন্য একটি ভাল ঘর দেওয়ায় আমরা নিরাপদে আশ্রয় গ্রহণ করিলাম। আমরা কেবলমাত্র বিছানা পাতিয়া একটু বিশ্রাম সুখ ভোগের আয়োজন করিতেছি, অমনি দলে দলে ভিক্ষুক আসিয়া বিরক্ত করিতে লাগিল এবং গ্রামের কৌতূহলি দর্শকেরা আসিয়া আমাদিগকে সন্ত্রস্ত করিয়া তুলিল। একটি পুরুষ ও স্ত্রীলোক বাঁশী বাজাইয়া গান করিতে আরম্ভ করিল। তাহাদের গানের মর্ম্ম হইতেছে—আমাদের যাত্রাপথ যেন শুভ হয়। আমি প্রত্যেককে চারি আনা করিয়া বকশিস্ দিয়া বিদায় করিলাম। অবশেষে দর্শন দিলেন চান্‌কু। চান্‌কু হইতেছে তিব্বতের ক্ষুদ্রাকার চিত্র-ব্যাঘ্র। তিব্বতীয় ম্যাষ্টিফ বা ব্যাঘ্রাকৃতি কুকুরেরই মত প্রায় দেখিতে। এই চান্‌কুটি বেশ পোষ মানিয়াছিল। তাহার মালিকের ইঙ্গিতে চান্‌কু আমাদের অনেকবার ‘সেলাম’ করিল। বাড়ীর কর্ত্তা চান্‌কুর মালিককে বাড়ী হইতে তাড়াইয়া দিল। চিতা বাঘকে তিব্বতীয়েরা ঘৃণিত জীব বলিয়া মনে করে।

 ২রা জুলাই। আজ এখান হইতে তিনটি টাট্টু-ঘোড়া ভাড়া করিয়া রওয়ানা হইলাম। আমরা কাল যে গৃহস্থের বাড়ীতে অতিথি হইয়াছিলাম, তাহাকে জনপ্রতি এক টাকা ঘর ভাড়া দিয়া বিদায় হইলাম।

 আমাদের পথে দুইটি নদী পড়িয়াছিল। নদী দুইটির পার দিয়া পথ থাকায় পথ চলিতে কোনও অসুবিধা হয় নাই। আমরা গ্রামের পর গ্রাম উত্তীর্ণ হইয়া সন্ধ্যার প্রাক্কালে টারগে নামক একটি গ্রামে আসিলাম। গ্রামের এক দিকে একটি বিহার আছে। বিহারটির নাম সাডিং গোম্পা। এখানে পথের ধারে যাত্রীদের থাকিবার জন্য একটি ধর্ম্মশালা আছে। এ-ধর্ম্মশালাটি বেশ বড়, ঘরগুলিও ভাল! কাজেই রাত্রিতে বেশ আরামেই কাটাইয়াছিলাম। এখান হইতে দক্ষিণ দিকে কাম্বাজঙ্গ দুর্গ দেখিতে পাওয়া যায়। দুর্গটি এক উচ্চ পর্ব্বতশৃঙ্গের উপর অবস্থিত।

 ৩রা জুলাই। অতি প্রত্যূষে যাত্রা করিলাম। পথে একটি নদীর ধারে রান্না করিয়া খাওয়া দাওয়া সারিয়া মধ্যাহ্ন বেলা আবার যাত্রা সুরু করিলাম এবং বেলা প্রায় দুই ঘটিকার সময় ডোক্‌পা নামক একটি সহরে আসিলাম। এখানে প্রায় ৬০০ শতটি পরিবার আছে। ইহারা চাষ বাস করিয়া জীবনধারণ করে। প্রত্যেকটি বাড়ীর চারিদিকে মাটির বা পাথরের দেওয়াল। ঘরগুলি পাথরের বা কাঁচা ইটের তৈয়ারী। এখানে গোরু, ভেড়া, ছাগল প্রভৃতি অতি অল্প মূল্যে বিক্রয় হয়। ফুরচঙ্গ তাহার ঘোড়া হইতে নামিয়া হাতে একটা ধারালো লম্বা খুরকি ও লাঠি লইয়া সহরের দিকে চলিল, কিছু ভেড়ার মাংস সংগ্রহ করিয়া আনিতে। তাহাকে দেখিয়া তিব্বতীয় ব্যাঘ্রাকৃতি কুকুরগুলি ভীষণ চীৎকার করিতে করিতে ছুটিয়া আসিল, কিন্তু ফুরচঙ্গ তাহার লাঠি দিয়া তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিল। আমরা এ সহরের লোকদের নিকট শুনিলাম যে আমাদের গন্তব্য পথে দস্যু—ডাকাতের ভয় আছে। সেইজন্য আমি আমার পিস্তলে গুলি ভরিয়া লইলাম, লামা তাহার তরবারি কোমরে ঝুলাইলেন এবং পিস্তলও ঠিক্ করিয়া লইলেন।

 বেলা তিনটার সময় আমাদের উৎরাই আরম্ভ হইল। একটি সমতলক্ষেত্রে আসিলাম। ঊষর সমতল প্রান্তরের উত্তরপূর্ব্ব দিকে দিগন্ত বিস্তারিত তুষারমৌলি গিরিশ্রেণী। এই ঊষর সমতল ক্ষেত্রটি তিন মাইল প্রশস্ত এবং দৈর্ঘ্য কত তাহা বলা সুকঠিন। আমরা এই প্রান্তরের অর্দ্ধেকটা পথ মাত্র আসিয়াছি, এমন সময় ভীষণ ঝড় আসিল। ঝড়, বৃষ্টি, মেঘগর্জ্জনে, বজ্রনির্ঘোষে ও বিদ্যুৎস্ফুরণে আমরা অত্যন্ত বিপন্ন হইয়া পড়িলাম। আমার গাত্রবস্ত্র সমুদয় বৃষ্টির জলে ভিজিয়া গিয়াছিল। তবু ঘোড়া ছুটাইয়া দিলাম। এইভাবে ছুটিতে ছুটিতে লুক্‌রি নামক একটি গ্রামে আসিলাম। গ্রামের বাহিরে একটি গোয়ালঘর ছিল সেখানেই আশ্রয় লইলাম। গ্রাম্য রাখালদেরও ফিরিবার সময় হইয়াছিল, কিন্তু সেই দিকে লক্ষ্য না করিয়া ঘরের মেজে যে শুষ্ক গোময় সাজানো ছিল, তাহার উপরেই বিছানা পাতিলাম এবং রান্না-বান্না করিয়া পরম পরিতোষসহকারে ভোজন করিলাম।

 বেলা পাঁচটার সময় রাখাল তাহার পালের প্রায় ৫০০ শত ভেড়া লইয়া আসিল। সঙ্গীয় কুলিরা তাহাকে আমাদের পরিচয় দিলে পর সে আমাদিগকে কোনরূপ বিরক্ত না করিয়া বিশ্রাম করিতে বলিল। আগের দিন রাত্রিতে দস্যুরা তাহার পালের অনেক ভেড়া চুরি করিয়া লইয়া গিয়াছে। কিছুকাল পরে একদল তিব্বতীয় মহাজন আমাদের ঘরের প্রায় আশী হাত দূরে তাঁবু ফেলিলেন। সন্ধ্যার সময় স্যাদালিঙ্গ-পা নামক একজন তিব্বতীয়ের নানা গল্প ও হাস্য-কৌতুকাভিনয় দেখিয়া পরমানন্দে অতিবাহিত করিয়াছিলাম।

 ৫ই জুলাই। আজ আমরা দূর হইতে তিব্বতের বিখ্যাত রিগোম্পা বিহার দেখিতে পাইয়াছিলাম। ঐ মঠে প্রায় ৩০০ শত লামা বাস করেন। মঠের অনতিদূরে তামার নামে একটি সহর আছে। ঐ সহরে অনেকগুলি চৈত্য রহিয়াছে। এবেলা চারিটার সময় আমরা নাম-বু-ডঙ্গলা গিরিপথ ধরিয়া অগ্রসর হইলাম। তখনও বরফ পড়া থামে নাই। সন্ধ্যার পূর্ব্বে গিরিপথ উত্তীর্ণ হইয়া একটি নদীর পারে আসিলাম। স্থানের উচ্চতা সমুদ্রতটসমতা হইতে ১৩,৫০০ ফিট হইবে। রাত্রিতে ভয়ানক শীত পড়িয়াছিল। আর সারা রাত্রি হিমকণা বর্ষণ করিতে করিতে বাতাস গর্জ্জন করিতে করিতে ছুটিয়াছিল।

 ৬ই জুলাই। অতি প্রত্যূষে যাত্রা আরম্ভ করিলাম। লা গিরিশৃঙ্গ হইতে উৎরাই বড় কঠিন ছিল। আমরা ঘোড়া হইতে নামিয়া পায়ে হাঁটিয়া চলিয়াছিলাম। সন্ধ্যার সময় আমরা লা-জঙ্গ নামক একটি গ্রামে আসিলাম। টারগি-চূবা চূথা-চূ নামক নদীর তীরে গ্রামটি অবস্থিত। আমরা অন্যান্য যাত্রীদলের সহিত এই গ্রামে রাত্রি কাটাইলাম।

 ৭ই জুলাই। সকালে উঠিয়া ঘোড়ায় চড়িয়া রওয়ানা হইলাম। আমরা পথে মঠের পর মঠ এবং অনেক লামা ও জিলঙ্গ বা সন্ন্যাসীর দেখা পাইলাম। তাহারা উজ্জ্বল মূল্যবান পোষাক পরিয়া পথ চলিয়াছে। তাহাদের মধ্যে অনেকে ঘোড়ায় চড়িয়াছিল। বেলা সাতটার সময় গয়ালা পর্ব্বতশৃঙ্গের কাছাকাছি আসিলাম। এখান হইতে যে বিস্তৃত সমতল ভূমি দেখা যাইতেছিল, তাহারই শেষ প্রান্তে তাসিলুমপোর বিহার অবস্থিত। এখান হইতে পশ্চিম দিকে নার্থাঙ্গ বিহার দেখা যাইতেছিল। নীল পর্ব্বতশ্রেণীর প্রান্তভাগে নার্থাঙ্গ মঠের শ্বেত প্রাচীর ও স্তম্ভ অপূর্ব্ব শোভা বিস্তার করিতেছিল। আমাদের পদতলবাহিনী পিনাম-নিয়াঙ্গ-চু নদীর রজতশুভ্র-সলিল-ধারা সূর্য্য কিরণে ঝলসিত হইতেছিল। ক্রমে আমরা উচ্চ গিরিপথ হইতে সমতল ভূমিতে নামিয়া আসিলাম। এখান হইতে তাশিলুনপো মঠের দৃশ্য অতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হইতেছিল। এই স্থানে মঠের প্রধান লামা-পানচাঙ্গ-রিন্‌পো-চির বাসস্থান তাশিলুনপো শব্দের অর্থ হইতেছে “পর্ব্বত-শ্রেষ্ঠ।” দূর হইতে মনে হইতেছিল তাশিলুনপো যেন একটি সুবর্ণগিরি।

 আমরা অশ্বারোহণে মনের আনন্দে অগ্রসর হইতে লাগিলাম এবং দিলি নামক গ্রামে আসিলাম। দিলি তাশিলুন-পোর নিকটবর্ত্তী একটী ক্ষুদ্র গ্রাম। এখানে প্রায় ৩০০টি বাড়ী আছে এবং স্থানীয় অধিবাসীরা সমৃদ্ধিশালী। আমরা এই গ্রামের ইয়াঙ্গচানপুটি নামক একজন ভদ্রমহিলার বাড়ীতে প্রাতর্ভোজন সমাপন করিলাম। তাঁহার স্বামী অতি সজ্জন ও অতিথি-বৎসল, তিনি আমাদিগকে সুমিষ্ট ভাষণে স্বাগত করিলেন এবং বিবিধ উপাদেয় খাদ্য দ্বারা পরিতৃপ্ত করিলেন। আমরা তাঁহাদের পতি ও পত্নীর সদয় ব্যবহারের জন্য বিদায় কালে সাদর সম্ভাষণ জানাইলাম। তাঁহারা আমাদের রওয়না হইবার সময় পুনরায় চা পান করাইয়া তবে বিদায় দিলেন।

 আমাদের তাশিলুনপোর পথে অনেক লামা, অনেক বণিকের সহিত সাক্ষাৎ হইল। তাঁহারা সকলেই অশ্বারোহণে চলিয়াছেন। তাঁহাদের সঙ্গে চলিয়াছে অসংখ্য চমরী গোরু এবং গর্দ্দভ-পৃষ্ঠে বোঝাই নানা মালপত্র।

 অতি দ্রুত অশ্বচালনা করিয়া অবশেষে আমাদের অভীপ্সিত সুবর্ণবিহার দ্বারে আসিয়া উপনীত হইলাম। আমাদের দুর্গম পথযাত্রা শেষ হইল। বিধাতা আমার বহুদিনের আকাঙ্ক্ষিত বাঞ্ছা পূর্ণ করিলেন।


  1. Narrative of o Journey of Lhasa and Narrative of a Journey Round Lake Palti (yamdok), and in Lhoks, Yarlung and Satya.
  2. The eight Indian saints, called in Tibet Rig-zin-gye, and the famous Tang-seng-gyupa, the Vyasa of the Buddhists, are said to have bathed in the water of this fall, and it is in consequence regarded as the holiest river in this part of the Himalayas. Journal of the Buddhis Text and Anthropological Society. Edited by Sarat Chandra Das, C.I.E., Vol. VII, 1899, Part I, page 11.