হিমালয়-অভিযান/দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশের তিব্বত-যাত্রা
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশ
হিমালয়-অভিযান
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান-অতীশের তিব্বত-যাত্রা
ত্রিশ বৎসর পূর্ব্বে যখন প্রথম দার্জ্জিলিং বেড়াইতে গিয়াছিলাম, তখন সেখানে বিখ্যাত তিব্বত-পর্য্যটক শরৎচন্দ্র দাস মহাশয় বাস করিতেছিলেন। আমি তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইয়া দেখিলাম, তিন জন তিব্বতীয় লামা সেখানে বসিয়া আছেন। শরৎবাবুর সহিত পরিচিত হইলে পর তিনি তিব্বতীয় ভাষায় ঐ লামা তিনজনকে কি বলিলেন বুঝিলাম না, তবে দেখিলাম তাঁহারা আমার প্রতি চাহিয়া অতি বিনীতভাবে মস্তক নত করিয়া অভিবাদন করিলেন। আমি একটু বিস্মিত হইলাম। আমার বয়স তখন অল্প, এমন কোনও কৃতিত্ত্বও নাই যে আমার প্রতি এই তিব্বতীয় লামারা এতটা শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতে পারেন।
শরৎবাবু আমার মনোভাব বুঝিতে পারিয়াছিলেন, তাই হাসিয়া বলিলেন—‘আপনি বিক্রমপুরের অধিবাসী, লামাদিগকে আমি সে পরিচয় দিয়াছি বলিয়াই তাঁহারা দীপঙ্করের স্বদেশবাসী বলিয়া আপনাকে এইরূপ শ্রদ্ধার সহিত অভিবাদন করিলেন। আমাকেও সুদূর তিব্বত ও চীন প্রবাসে দীপঙ্করের স্বদেশবাসী বলিয়া সকলেই অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান করিয়াছেন। শরৎ বাবুর মুখে এই কথা শুনিয়া বাঙ্গালাদেশের অধিবাসী বলিয়া আমার হৃদয় গর্ব্বে ও আনন্দে পূর্ণ হইল।
সেই কবে কত শত বৎসর পূর্ব্বে একজন মানুষের মত মানুষ আমাদের দেশে জন্মগ্রহণ করিয়া হিমালয়-অভিযান করিয়াছিলেন, যাঁহার কীর্ত্তি-কথায় সমস্ত বাঙ্গালী ও ভারতবাসী গৌরব বোধ করিতেছে।
বাঙ্গালাদেশের প্রাচীন ইতিহাসে-বৌদ্ধজগতে দীপঙ্কর বিশেষ প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। কবির কথায় তাঁহার সম্বন্ধে বলা যাইতে পারে:
“বাঙ্গালী অতীশ লঙ্ঘিল গিরি তুষারে ভয়ঙ্কর,
জ্বালিল জ্ঞানের প্রদীপ-তিব্বতে বাঙ্গালী দীপঙ্কর।”
আমাদের দুর্ভাগ্য তাই দীপঙ্করের নামও ভুলিতে বসিয়াছি।
দীপঙ্করের কথা বলিতে যাইয়া তাঁহার জীবনী-লেখক শরৎচন্দ্র লিখিয়াছেন—“যে মহাপুরুষ তিব্বতের আদি ও শ্রেষ্ঠ ধর্ম্মপাল মহাত্মা ব্রহ্মতনের দীক্ষাগুরু, যাঁহার নাম শুনিবামাত্র প্রধান লামা ও চীনের সম্রাট্ আজিও সসম্ভ্রমে আসন পরিত্যাগ করিয়া উদ্দেশে প্রণাম করিয়া থাকেন, তিন বঙ্গদেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। সার্দ্ধ আট শত বৎসর পরে এ-কথা স্মরণ করিলেও ক্ষীণ প্রাণ বাঙ্গালীর দুর্ব্বল হৃদয় এক অপূর্ব্ব বলে বলীয়ান্ হইয়া উঠে; তখনই বর্ত্তমান বঙ্গভূমি ছাড়িয়া মন সহসা অতীত বঙ্গের সেই অমরাবতীতে উপস্থিত হয় এবং অধঃপতিত দেশের দুরবস্থা ভুলিয়া ভূত সৌভাগ্যের সেই দেবোদ্যানে বিচরণ করিতে থাকে।”
আমরা বৌদ্ধ-গ্রন্থাদি হইতে জানিতে পারি যে দীপঙ্কর আনুমানিক ৯৮০ কিংবা ৯৮২-৯৮৩ খ্রীষ্টাব্দে বাঙ্গালাদেশের বিক্রমপুর বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সেকালে প্রাচীন বিক্রমপুর নগরীর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। দীপঙ্কর যে অংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন—সে অংশ বজ্রযোগিনী নামে আখ্যাত ছিল। ‘দেশাবলীবিবৃতি’ নামে একখানি সপ্তদশ শতাব্দীর সংস্কৃত ভৌগোলিক গ্রন্থে বজ্রযোগিনীকে ‘বরদযোগিনী’ নামে অভিহিত করা হইয়াছে। এবং সমগ্র ঢাকা জেলাকেই বরদযোগিনী দেশান্তর্ভুক্ত রূপে বর্ণনা করা হইয়াছে। লোকে সাধারণতঃ এখনও মুখে মুখে বজ্রযোগিনী না বলিয়া বলে—বদরযোগিনী বা বরদযোগিনী।[১]
দীপঙ্করের পিতার নাম ছিল কল্যাণশ্রী এবং তাঁহার মাতার নাম ছিল প্রভাবতী। বাল্যকালে পিতামাতা তাঁহার নাম রাখিয়াছিলেন চন্দ্রগর্ভ। দীপঙ্কর যখন বালকমাত্র তখন তাঁহার শিক্ষার জন্য জেতারি নামে একজন অবধূতের নিকট প্রেরণ করা হয়। জেতারির নিকট দীপঙ্কর বর্ণ শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।
দীপঙ্কর তাঁহার আত্মকথা বলিতে যাইয়া বলিয়াছেন—“আমাদের দেশে (ভারতে) রাজা এবং রাজবংশীয় লোকেরা বাস করেন। সে সময়ে বাঙ্গলাদেশে ভূ-ইন্দ্রচন্দ্র নামে এক জন রাজা রাজত্ব করিতেন। রাজবংশীয়দের দেহে রাজরক্ত থাকিলেও তাঁহারা রাজ্য বা সিংহাসনের অধিকারী নহেন। আমি রাজবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলাম। আমার পিতা গৃহস্থ উপাসক ছিলেন তাঁহার দুই পত্নী ছিলেন। একজন ব্রাহ্মণী এবং আর একজন ছিলেন ক্ষত্রিয়াণী। আমি ব্রাহ্মণীর গর্ভে জন্ম লাভ করিয়াছিলাম। আমার মাতা বিদুষী মহিলা ছিলেন। তিনি শৈশবকালে আমাকে বেদ সম্বন্ধে শিক্ষা দান করিয়াছিলেন।” কাজেই দীপঙ্করের বাল্য জীবনের প্রাথমিক শিক্ষা যে উত্তমরূপে তাঁহার মাতার নিকট হইতে হইয়াছিল তাহা আমরা দীপঙ্করের নিজের উক্তি হইতে বুঝিতে পারিতেছি।
দীপঙ্করের বাল্য জীবনেই তাঁহার প্রতিভার পরিচয় পাওয়া গিয়াছিল। যেমন বয়স বাড়িতে লাগিল, তেমনি তাঁহার প্রতিভারও বিকাশ পাইতে লাগিল। জেতারি তাঁহার অদ্ভুত মেধা ও গভীর অভিনিবেশ দর্শনে চমৎকৃত হইয়াছিলেন। উনিশ বৎসর বয়সে দীপঙ্কর ওদন্তপুরী বিহারের আচার্য্য পরম পণ্ডিত শীলরক্ষিতের নিকট হইতে ভিক্ষুব্রতে দীক্ষা লাভ করেন।
অল্প সময় মধ্যেই দীপঙ্কর অনেকগুলি হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শন সম্বন্ধে অসাধারণ পাণ্ডিত্য লাভ করেন। তাঁহার যশঃ দেশবিদেশে বিস্তৃতি লাভ করিল। দীপঙ্করের সঙ্গে তর্ক করিয়া তাঁহাকে পরাস্ত করিবার জন্য পণ্ডিতেরা সব ভারতের নানা প্রদেশ হইতে আসিতে লাগিলেন। কিন্তু কেহই তাঁহাকে তর্কে পরাস্ত করিতে না পারিয়া ‘অবনত মস্তকে’ দেশে প্রত্যাগমন করিতেন। দীপঙ্করের বয়স যখন পঁচিশ বৎসর তখন তিনি একজন প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক ব্রাহ্মণকে তর্কযুদ্ধে পরাজিত করিয়া অসীম গৌরব লাভ করিয়াছিলেন। ইহার পরেই দীপঙ্কর ওদন্তপুরী বা ওদন্তপুরের বৌদ্ধাচার্য্য শীলরক্ষিতের নিকট হইতে “শ্রীজ্ঞান” উপাধি লাভ করেন। একত্রিশ বৎসর বয়সে তিনি ভিক্ষু আশ্রমের শ্রেষ্ঠ সম্মান লাভ করেন। অতঃপর দীপঙ্কর মগধের প্রসিদ্ধ ও পারদর্শী বৌদ্ধ আচার্য্যগণের নিকট সমগ্র বৌদ্ধশাস্ত্র সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করেন।
ভিক্ষু হইবার পর দীপঙ্কর বিক্রমশীলা বিহারে যাইয়া আশ্রয় লাভ করেন। সেখানে অল্প দিনের মধ্যেই সকলের নিকট প্রধান পণ্ডিত বলিয়া বিবেচিত হইয়াছিলেন। তাঁহার জ্ঞান-তৃষ্ণা দিন দিনই বাড়িতে লাগিল। নানা বিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করিয়াও তাঁহার জ্ঞানস্পৃহা নিবৃত্ত হইল না, বরং দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। আরও অধিক শিক্ষা লাভের জন্য এবং ধর্ম্ম সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য তাঁহার চিত্ত ব্যাকুল হইল। কিছুতেই যেন তিনি অন্তর মধ্যে তৃপ্তি লাভ করিতে পারিতেছিলেন না।
সে সময়ে সুবর্ণদ্বীপ (ব্রহ্মদেশ) বৌদ্ধ ধর্ম্মের শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করিয়াছিল। চন্দ্রকীর্ত্তি সেখানকার প্রধানতম আচার্য্য ছিলেন। বৌদ্ধধর্ম্ম শাস্ত্র সম্বন্ধে তিনি ছিলেন মনীষী ব্যক্তি। দীপঙ্কর অবশেষে তাঁহার নিকট যাইতে সঙ্কল্প করিলেন। এবং এক শুভদিনে একখানি বৃহৎ নৌকা বা সেকালের জাহাজে আরোহণ করিয়া কয়েকজন বণিকের সঙ্গে সুবর্ণদ্বীপের দিকে যাত্রা করিলেন। ভীষণ সমুদ্রবক্ষে প্রকাণ্ড তরণী প্রচণ্ড ঝটিকা ও তুফানের মধ্য দিয়া ভাসিয়া চলিল। পথিমধ্যে নানা বাধা বিঘ্ন ঘটিল, অবশেষে প্রায় তের মাস সমুদ্রের জলে ভাসিতে ভাসিতে পরে তাঁহাদের তরণীখানি আসিয়া সুবর্ণদ্বীপের উপকূলে উপস্থিত হইল। দীপঙ্করের মনোবাসনা পূর্ণ হইল।
দীপঙ্কর দীর্ঘ দ্বাদশ বৎসর কাল সুবর্ণদ্বীপে থাকিয়া, সেখানকার প্রচলিত বৌদ্ধধর্ম্ম সম্বন্ধে বিবিধ জ্ঞানলাভ করিয়া তথাকার বৌদ্ধধর্ম্মের সংস্কার করেন। অভীষ্ট বিষয়ে সিদ্ধিলাভ করিয়া তিনি পুনরায় কতকগুলি বণিকের সহিত একখানি বৃহৎ অর্ণবযানে আরোহণ করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন। আসিবার সময় পথে তিনি একে একে তাম্রদ্বীপ ও অরণ্য-দ্বীপ প্রভৃতি দেখিয়া আসিয়াছিলেন।
দেশে ফিরিয়া আসিলে পর মগধের বৌদ্ধেরা দীপঙ্করের পাণ্ডিত্যে, ধর্ম্মজ্ঞানে ও চরিত্র-প্রভাবে মুগ্ধ হইয়া তাঁহাকে সাদরে বরণ করিয়া লইলেন। রাজা নয়পাল তাঁহার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হইয়া তাঁহাকে বিক্রমশীলা বিহারের অধ্যক্ষ নিযুক্ত করিলেন। তখন নালন্দার চেয়েও বিক্রমশীলা বিহারের খ্যাতি ও প্রতিপত্তি অধিক ছিল। অনেক বড় বড় লোক, অনেক বড় বড় পণ্ডিত, বিক্রমশীলা হইতে লেখাপড়া শিখিয়া শুধু ভারতবর্ষে নয়, তাহার বাহিরেও বিদ্যা ও ধর্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন। বিক্রমশীলা বিহারের রত্নাকর-শান্তি একজন খুব তীক্ষ্ণবুদ্ধি নৈয়ায়িক ছিলেন। প্রজ্ঞাকরমতি, কাশ্মীর-নিবাসী রত্নবজ্র, গৌড় নিবাসী জ্ঞানশ্রীমিত্র প্রভৃতি বহু সংখ্যক গ্রন্থকার ও পণ্ডিতের নাম বিক্রমশীলার মুখ উজ্জ্বল করিয়া রাখিয়াছিল। এরূপ বিহারের অধ্যক্ষ হওয়া সৌভাগ্যের কথা। দীপঙ্কর অনেক সময় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সঙ্গে তর্ক ও বিচারে প্রবৃত্ত হইতেন ও তাহাতে জয়লাভ করিতেন।
তিব্বতীয় ভাষায় রচিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের (অতীশের) জীবন-চরিত হইতে জানা যায় যে নয়পালের রাজত্বকালে “কর্ণ” রাজ্যের রাজা মগধ আক্রমণ করেন। নয়পাল দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে বিক্রমশীলা বিহারের অধ্যক্ষ নিযুক্ত করিয়াছিলেন। প্রথম যুদ্ধে গৌড়সেনা ‘কর্ণ’ রাজ্যের সেনা কর্ত্তৃক পরাজিত হইয়াছিল এবং শত্রুগণ রাজধানী পর্য্যন্ত অগ্রসর হয় কিন্তু পরে নয়পাল জয়লাভ করেন। অবশেষে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের যত্নে উভয় পক্ষের মধ্যে মৈত্রী স্থাপিত হইয়াছিল।
দীপঙ্কর যখন বিক্রমশীলা বিহারের অধ্যক্ষ হইলেন সে সময়ে সেখানে ৫৭ জন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত বাস করিতেন। বিক্রমশীলা বিহার যেরূপ বৃহৎ ছিল, তেমনি তাহার ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত চমৎকার। এই বিহারের সম্মুখস্থিত প্রাচীর গাত্রের দক্ষিণদিকে নাগার্জ্জুনের মূর্ত্তি চিত্রিত ছিল এবং বাম পার্শ্বে স্বয়ং দীপঙ্করের মূর্ত্তি অঙ্কিত ছিল। ইহা হইতে আমরা বুঝিতে পারি যে দীপঙ্করকে তৎকালের প্রসিদ্ধ পণ্ডিতগণ, নাগার্জ্জুনের সহিত সমান মর্য্যাদা দিতে পরাঙ্মুখ হইতেন না। এবং তিনি সাধারণের নিকট কিরূপ সম্মানিত ছিলেন তাহাও ইহা হইতে জানিতে পারা যায়। সেই বিহারের আর এক দিকের প্রাচীর গাত্রে প্রাচীন কালের পণ্ডিতগণের আলেখ্য অঙ্কিত ছিল, এবং সিদ্ধাচার্য্যগণের মূর্ত্তির চিত্রও তাহাতে ছিল।
দীপঙ্কর যখন বিক্রমশীলা বিহারে বাস করিতেন সে সময়ে তিনি বিহার ও মন্দিরের চাবি নিজের কাছে রাখিতেন। অতীশের আঠারোটী চাবি রক্ষা করিতে হইত। ইহা হইতে মনে হয় যে সে সময়ে অষ্টাদশটি বিহার ও মন্দির বিক্রমশীলা বিহারের অন্তর্ভূত ছিল। দীপঙ্কর আঠারোজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে অধ্যাপনার জন্য এক একটি স্বতন্ত্র শ্রেণী-বিভাগ করিয়া দিয়াছিলেন।
বিক্রমশীলা বিহারের অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করিবার পরও তাঁহাকে কার্য্যোপলক্ষ্যে মধ্যে মধ্যে বিভিন্ন বিহারে যাতায়াত করিতে হইত বলিয়া মনে হয়। অন্ততঃ সোমপুরী বিহারে কিছুদিনের জন্য তিনি বাস করিয়াছিলেন বলিয়া অনুমিত হয়। তেঙ্গুরের ক্যাটালগ হইতে তাহার আভাস পাওয়া যায়।
এই সময়ে হিমালয়ের উত্তর প্রান্তে সুদূর তিব্বতে দীপঙ্করের অমরত্ব লাভের পথ ধীরে ধীরে পরিষ্কৃত হইতেছিল। সমগ্র বৌদ্ধশাস্ত্রে গভীর পারদর্শিতা এবং বৌদ্ধজগতে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিয়াও তিনি কখন স্বপ্নেও ভাবেন নাই যে, একদা তিব্বতের অধিপতি লামাও তাঁহাকে “অতীশ” (সর্ব্বশ্রেষ্ঠ) বলিয়া পূজা করিবেন। তৎকালে থোলিং নগরে লামার প্রধান রাজপীঠ ছিল। তাঁহার রাজত্বকালে তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম্মের বিশেষ উন্নতি সাধিত হইয়াছিল। তিনি বৌদ্ধনীতির সংস্কার করিবার অভিপ্রায়ে ভারতের প্রধান প্রধান বৌদ্ধ বিহারে কতিপয় নবীন সন্ন্যাসীকে পাঠাইয়া দিলেন। তাঁহারা কাশ্মীর প্রভৃতি নানাস্থানে বৌদ্ধশাস্ত্র শিক্ষা করিয়া অবশেষে বিক্রমশীলায় উপনীত হইলেন। তথায় দীপঙ্করের যশোগৌরব তাঁহাদের শ্রুতিগোচর হওয়াতে তাঁহারা স্বদেশে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া রাজ-সকাশে তাঁহার সমস্ত বিবরণ নিবেদন করিলেন। রাজার কৌতূহল দ্বিগুণ বাড়িয়া উঠিল। এইরূপ অদ্বিতীয় বৌদ্ধ আচার্য্যকে তিব্বতে আনয়ন করিবার জন্য তিনি নিতান্ত ব্যগ্র হইলেন এবং প্রভূত সুবর্ণ ও একশত পরিচারকের সহিত একজন বিশ্বস্ত রাজপুরুষকে মগধে প্রেরণ করিলেন। পথিমধ্যে অসীম কষ্ট ও যাতনা সহ্য করিয়া, রাজদূত বিক্রমশীলায় উপনীত হইল এবং দীপঙ্করের সম্মুখে সেই প্রকাণ্ড স্বর্ণপিণ্ড স্থাপন করিয়া রাজার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করিল। দীপঙ্কর তাঁহাদের প্রস্তাবে সম্মত হইলেন না। শত শত অনুনয়-বিনয়, সহস্র প্রলোভন সেই তেজস্বী মহাপুরুষকে ভুলাইতে পারিল না। দীপঙ্কর কিছুতেই তিব্বতে যাইতে চাহিলেন না। তিনি বিনীতভাবে বলিলেন—“আমার সোণার দ্বারা কোনও প্রয়োজন নাই। আমি সোণা দিয়া কি করিব?” তিনি আরও বলিলেন, “আমাকে দুইটী কারণে তোমরা তিব্বতে লইয়া যাইতে চাহিতেছ—প্রথমতঃ সুবর্ণ প্রাপ্তির লোভ, দ্বিতীয়তঃ সিদ্ধদেবতারূপে পরিগণিত হইবার জন্য—ইহার একটির প্রতিও আমার আকর্ষণ নাই। কাজেই আমি আমার তিব্বত-যাত্রার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলিয়া মনে করি না।” রাজদূত দীপঙ্করের এইরূপ উক্তি শুনিয়া বিষণ্ণ মনে স্বদেশে ফিরিয়া গেল।
রাজা লামা জে-সে-হোড রাজদূতের মুখে দীপঙ্করের সমস্ত বিবরণ শুনিয়া দীপঙ্করকে আনিয়া তিব্বতের ধর্ম্ম-সংস্কার করিবার জন্য অতি মাত্রায় আগ্রহান্বিত হইয়াছিলেন। রাজা জে-সে-হোড বৃদ্ধ ছিলেন। তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্র চ্যাং-চুব রাজপদ গ্রহণ করিলেও তিনি সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুর ন্যায়ই জীবন যাপন করিতেন।—চ্যাং-চুব রাজা হইয়াই এক ধর্ম্মসভার আহ্বান করিলেন। সেই সভায় তিব্বতের ঐ অঞ্চলের যত সব ধার্ম্মিক শ্রমণগণ আসিয়া মিলিত হইলেন। রাজা তাঁহাদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন,—“আপনারা প্রত্যক্ষভাবে দেখিতে পাইতেছেন যে আমাদের দেশে ধর্ম্মের বিশেষ অবনতি হইয়াছে। ভিক্ষুদের মধ্যে মতভেদ চলিতেছে। স্বর্গত মহারাজ ধর্ম্মের সংস্কারের জন্য পূর্ব্বে যে তেরোজন পণ্ডিত আনাইয়াছিলেন তাঁহারাও এখানে ধর্ম্ম-সংস্কার সম্বন্ধে কোনও কার্য্য করিতে পারেন নাই। এইরূপ স্থলে যেরূপেই হয়, স্বর্গীয় মহারাজার আদেশ প্রতিপালন করিতে হইবে। এ বিষয়ে আপনাদের মতামত ব্যক্ত করুন। উপস্থিত শ্রমণগণ সকলেই নৃপতি চ্যাং-চুবের এই ন্যায়সঙ্গত প্রস্তাব সমর্থন করিলেন।
এই সভায় বিনয়ধর নামক একজন বৌদ্ধ শ্রমণ উপস্থিত ছিলেন। ইনি পূর্ব্বেও কয়েক বৎসর ভারতবর্ষে বাস করিয়াছিলেন। সংস্কৃত ভাষার সহিত ইঁহার পরিচয় ছিল। বিনয়ধরের বয়স তখন সাতাইশ বৎসর মাত্র ছিল। রাজা চ্যাং-চুব বা বানচুর বিনয়ধরকে বলিলেন—“তুমি পূর্ব্বে ভারতবর্ষে বাস করিয়াছ। সে দেশের উষ্ণ জলবায়ুর সহিত তুমি পরিচিত, অতএব তুমিই দীপঙ্করকে তিব্বতে আনয়ন করিবার জন্য গমন কর। যদি তিনি একান্তই না আসেন তবে তাঁহার পরবর্ত্তী যিনি শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া আসিও।”
বিনয়ধর পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি নির্জ্জনে মঠে বসিয়া ধর্ম্মশাস্ত্র পাঠ করা এবং ধ্যান-ধারণার ভিতর দিয়া জীবন অতিবাহিত করাই শ্রেয়ঃ জ্ঞান করিয়াছিলেন, কাজেই তাঁহার ইচ্ছা ছিল না যে ভারতবর্ষে আসেন। কিন্তু নৃপতি চ্যাং-চুব বিশেষ ভাবে অনুজ্ঞা দেওয়ায় তিনি রাজাদেশ পালন করিতে বাধ্য হইলেন। রাজা তাঁহার সহিত এক শত জন অনুচর দিতে চাহিলেন, কিন্তু বিনয়ধর মাত্র পাঁচটি সঙ্গী লইলেন। রাজা তাঁহাকে অনেক স্বর্ণ দিলেন। সেই স্বর্ণের মধ্য হইতে কতক দীপঙ্করকে উপঢৌকন স্বরূপ, কতক বিনয়ধরের পারিশ্রমিক, কতক বিনয়ধরের যাতায়াতের ব্যয় বাবদ এবং কতক একজন দোভাষীর জন্য।
বিনয়ধর নানারূপ ক্লেশ সহ্য করিয়া দুর্গম পার্ব্বত্য-পথে ভারতের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। তাঁহাদের দস্যুতস্করের হাতে বিড়ম্বিত হইয়া এবং নানা বাধা-বিঘ্ন অতিক্রমপূর্ব্বক বিক্রমশীলা বিহারে আসিতে হইয়াছিল।
সে সময়ে বিনয়ধরের অধ্যাপক তিব্বত দেশীয় গ্যায়ৎসো তথায় অবস্থান করিতেছিলেন। বিনয়ধর দীপঙ্করকে তিব্বতে লইয়া যাইবার জন্য বিক্রমশীলা আসিয়াছেন সে কথা তাঁহার নিকট বলিলেন। তখন গ্যায়ৎসো তাঁহাকে বলিলেন যেএকথা এই বিহারের কাহারও নিকট কোন ক্রমেই এখন প্রকাশ করিবেন না। কেন না দীপঙ্কর এই বিহারের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত। তিনি এই বিহার পরিত্যাগ করিয়া যান তাহা এখানকার কাহারও অভিপ্রেত নহে। আপনারা এই বিষয়টি গোপন রাখিয়া এই বিহারে অবস্থান করুন এবং মহাস্থবির রত্নাকরকে যথোপযুক্ত স্বর্ণ দক্ষিণা প্রদান পূর্ব্বক এই বিহারের শিষ্যরূপে অবস্থান করিতে থাকুন। তারপর যদি আপনাদের ব্যবহার দ্বারা মহাস্থবিরকে সন্তুষ্ট করিতে পারেন তাহা হইলে আপনাদের পক্ষে অতীশের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া মনোগত অভিপ্রায় ব্যক্ত করিবার সুযোগ ও সুবিধা হইবে। বিনয়ধর গ্যাৎসোর পরামর্শ গ্রহণ করিলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিক্রমশীলা বিহারের অধ্যাপকগণের প্রীতি আকর্ষণ করিতে পারিলেন।
বিক্রমশীলা বিহারে এক মহাসভার অধিবেশন হইল। সেখানে প্রায় আট হাজার ভিক্ষু সমবেত হইয়াছিল। সেই অধিবেশনে বিনয়ধর তেজঃপুঞ্জ কলেবর দীপঙ্করকে দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। তারপর কয়েকদিন পরে সুযোগক্রমে দীপঙ্করের নিকট ভক্তি-প্রণত-মস্তকে, বিনয়সহকারে তাঁহাদের রাজার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন।
দীপঙ্কর ধৈর্য্যসহকারে সব কথা শুনিলেন। তিব্বত অঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম্মের নানা অবনতির বিষয় অবগত হইয়া তাঁহার হৃদয় দ্রবীভূত হইল।
দীপঙ্করের তিব্বত-যাত্রা
এইবার দীপঙ্কর মনঃস্থির করিয়া তিব্বত-যাত্রা করিতে উদ্যোগী হইলেন। প্রথমে তিনি বিক্রমশীলা বিহারের মহাস্থবির-রত্নাকরের নিকট বলিলেন—“আমি তিব্বতীয় শিষ্যগণের সহিত তীর্থদর্শনে যাইবার সঙ্কল্প করিয়াছি। আপনি আমার প্রত্যাগমন পর্য্যন্ত সুস্থ ও সবল থাকেন ইহাই ভগবান্ তথাগতের নিকট প্রার্থনা করিতেছি।” রত্নাকরও তাঁহার সহিত তীর্থ-যাত্রার অভিলাষী হইলেন। রত্নাকরের এই কথায় দীপঙ্কর নীরব রহিলেন। রত্নাকর বলিলেন—“দীপঙ্কর, আমি তোমার মনোভাব বুঝিতে পারিয়াছি। তুমি অষ্ট পুণ্যস্থান দেখিবার ছল করিয়া বিনয়ধর (নাগ-চো), গ্যায়ৎসো এবং তাঁহাদের সঙ্গী অন্য পাঁচজন শ্রমণের সহিত তিব্বত-যাত্রার অভিলাষী হইয়াছ। একবার আমি তোমার যাইবার পক্ষে বাধা স্বরূপ হইয়াছিলাম। এইবারও যদি তোমার যাইবার কথা কোনরূপে নৃপতির কর্ণে গিয়া পৌঁছায় তাহা হইলে তোমার যাওয়া সম্ভবপর হইবে না বিশেষ এই দুইজন তিব্বতীয় ভিক্ষুরও জীবন সংশয়াপন্ন হইবে। কিন্তু আমি ইঁহাদিগকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করিয়াছি, অতএব ইঁহাদের প্রতি কোনরূপ বিরুদ্ধাচরণ করা কর্ত্তব্য নহে। তারপর ইঁহারা তিব্বতীয় মহারাজার নিকট হইতে যে মহদুদ্দেশ্যের বার্ত্তা লইয়া এখানে উপস্থিত হইয়াছেন এইরূপ স্থলে আমি সংশয়াপন্ন হইয়া পড়িয়াছি, কি করিব তবে আমি তিন বৎসরের জন্য তোমাকে যাইতে দিতে পারি।”
মহাস্থবির রত্নাকরের এই অভিপ্রায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিক্রমশীলা বিহারের সর্ব্বত্র প্রচারিত হইল। বিহারের ভিক্ষুগণ, অধ্যাপকগণ সকলেই দীপঙ্করের তিব্বত-যাত্রা সম্পর্কে বিরোধী হইয়া দাঁড়াইলেন। কিন্তু দীপঙ্করের প্রাণে নবীন উৎসাহ উদ্দীপিত হইয়া উঠিয়াছিল। তিব্বতের মৃত মহারাজার বৌদ্ধধর্ম্মের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তির কথা স্মরণ করিয়া তাঁহার হৃদয় উদ্বেলিত হইয়াছিল। তিনি তিব্বত-যাত্রার জন্য আয়োজন ও উদ্যোগ করিতে আরম্ভ করিলেন। তিব্বতের রাজার প্রেরিত স্বর্ণ, দীপঙ্কর চারিভাগে বিভক্ত করিয়া তাহার একভাগ দিলেন বিক্রমশীলার অধ্যাপকদিগকে, অপর একভাগ দিলেন স্থবির রত্নাকরের হাতে, তৃতীয় ভাগ তিনি বজ্রাসন বিহারের সাহায্যার্থে প্রেরণ করিলেন আর চতুর্থ ভাগ রাজভাণ্ডারে দেওয়ার জন্য যথোপযুক্ত উপদেশ দিলেন এবং বলিয়া দিলেন যেন এই স্বর্ণ বৌদ্ধ ভিক্ষু সম্প্রদায়ের কল্যাণার্থ ব্যয়িত হয়।
তারপর আসিল একদিন বিদায় মুহূর্ত্ত। সে সময়ে বিক্রমশীলা বিহারের শ্রমণগণ অধ্যাপকগণ ও শিষ্যগণ সকলে অশ্রুপূর্ণলোচনে দীপঙ্করের দিকে চাহিয়া রহিলেন। দীপঙ্কর সেই স্তব্ধ ও শোকাকুল জনতার দিকে চাহিয়া ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িলেন।
দীপঙ্করের মনে পড়িল—বিক্রমশীলা বিহারের শত স্মৃতি। মনে পড়িল প্রতিদিন প্রত্যূষে তিনি যখন বিহারের বাহিরে আসিতেন, তখন ভিখারী বালকগণ করুণ-নয়নে তাঁহার দিকে চাহিয়া ছোট ছোট হাতগুলি বাড়াইয়া বলিত, “বাবা, ভিক্ষা দে! বাবা ভিক্ষা দে!” মনে পড়িল কিরূপ ন্যায়নিষ্ঠার সহিত তিনি এই বিহারের প্রধান আচার্য্য রূপে শাসনদণ্ড পরিচালনা করিয়াছিলেন। এমন কি দিবাকরচন্দ, রামপাল প্রভৃতির ন্যায় শিষ্যদিগকেও বিক্রমশীলা বিহার হইতে তাঁহাদের অপরাধের জন্য বিতাড়িত করিতে তিনি ইতস্ততঃ করেন নাই।
আজ সেই কীর্ত্তিক্ষেত্র বিক্রমশীলা বিহার পরিত্যাগ করিয়া গমন করিতে তাঁহার প্রাণে যে কত বড় ক্লেশ বোধ হইতেছিল, তাহা সহজেই বুঝিতে পারা যায়।
দীপঙ্কর বুঝিতে পারয়িাছিলেন যে বিহারের শ্রমণগণ, শিষ্যগণ, কেহই তাঁহাকে তিব্বতের ন্যায় দুর্গম প্রদেশে যাইতে দিতে সম্মত হইবেন না। এই জন্যই “অষ্ট মহাস্থান”[২] দেখিবার ছল হিমালয়-অভিযান করিয়া তাঁহাকে বিহার হইতে বাহির হইতে হইয়াছিল। তাঁহার এই তীর্থযাত্রা যে তিব্বত-যাত্রা তাহা বিক্রমশীলা বিহারের সকলেই কিন্তু বুঝিতে পারিয়াছিল। কাজেই তাঁহার যাত্রাকালে সকলের প্রাণেই একান্ত গভীর বেদনা ও দুঃখ সঞ্চারিত হইয়াছিল। কিন্তু মহাপ্রাণ দীপঙ্কর তাঁহার বয়স ও পথের দারুণ ক্লেশের কথাও বিস্মৃত হইলেন, যখন তাঁহার মনে পড়িল পবিত্র বৌদ্ধধর্ম্মের তিব্বতে কি দারুণ অবনতিই না হইয়াছে! তখন তাঁহার মনে হইল—ধর্ম্মপ্রাণ রাজ-সন্ন্যাসী জে-সে-হোড্ তাঁহাকে তিব্বতে নিবার জন্য ব্যর্থ মনোরথ হইয়াই প্রাণ-বিসর্জ্জন দিয়াছেন।
দীপঙ্করের তিব্বত-যাত্রাকালে তাঁহার বয়স কত ছিল, সে বিষয়ে বিভিন্নরূপ মত দেখিতে পাওয়া যায়। কাহারও কাহারও মতে তিনি ১০৪২ খ্রীঃ অঃ ৫৯ বৎসর বয়সে তিব্বত-যাত্রা করেন।[৩] এল. এ. ওয়াডেল [L. A. Waddell] সাহেবের মতে দীপঙ্কর ১০৩৮ খ্রীঃ অঃ তিব্বতে গমন করেন। সে সময়ে তাঁহার বয়স ৫৮-৫৯ বৎসর ছিল। রক্হিল সাহেবও দীপঙ্কর ৫৯ বৎসরে তিব্বতে গমন করেন সেই কথা বলিয়াছেন। তবে তাঁহার হিসাব মানিয়া লইতে হইলে দীপঙ্করের জন্ম ৯৮৩ খ্রীঃ অঃ হইয়াছিল বলিয়া মানিয়া লইতে হয়। কিন্তু আমরা তিব্বতের ইতিহাস এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণের লেখা হইতে সুস্পষ্টভাবে জানিতে পারিতেছি যে দীপঙ্কর ৫৯ বৎসর বয়সে অর্থাৎ আসন্ন ষাট বৎসর বয়সে তিব্বত-যাত্রা করেন তাহাই প্রামাণিক রূপে পাইতেছি। তাঁহার জন্মের বৎসর স্বর্গত শরৎচন্দ্র দাসের মতে ৯৮০ খ্রীঃ অঃ। ইহাই এতদিন কিন্তু প্রামাণিকরূপে গৃহীত হইয়াছিল। অতীশের জন্ম ৯৮২ বা ৯৮৩ খ্রীঃ অঃ হউক না কেন, তিনি যে ৫৯ বৎসর বয়সে তিব্বত-যাত্রা করেন, সে বিষয়ে আমাদের কোনও সন্দেহের কারণ নাই। তবে কোন সময়ে গিয়াছিলেন, তাহা লইয়াই তর্ক উপস্থিত হয়। আমাদের মনে হয় অধিকাংশ লেখকই যখন অতীশ ১০৪২ খ্রীঃ অঃ তিব্বত গমন করিয়াছিলেন বলিয়া বলিতেছেন, তখন আমরাও ১০৩৮ খ্রীঃ অঃ এর পরিবর্তে ১০৪২-৪৩ খ্রীঃ অঃ তিনি তিব্বত গিয়াছিলেন সে কথাই প্রামাণিক বলিয়া গ্রহণ করিলাম।
অতীশের তিব্বত-যাত্রার সঙ্গী হইলেন পণ্ডিত ভূমিসঙ্ঘ, বীর্য-চন্দ্র, নাগ-ছো, গ্যায়ৎসো এবং অনেক অনুচর ও ভৃত্যমণ্ডলী তাঁহারা যাত্রাপথে প্রথমে মিত্রবিহারে আসিলেন। সেই বিহারের শ্রমণগণ এই যাত্রীদলকে পরম সমাদর সহকারে অভ্যর্থনা করিলেন। তাঁহারা অতীশকে শ্রদ্ধা ও ভক্তিসহকারে অভিনন্দন জ্ঞাপন করিলেন। এই বিহার হইতেই তাঁহারা তিব্বতের উদ্দেশ্যে চলিতে লাগিলেন। গ্যায়ৎসোর সঙ্গে ছিল দুইজন ভৃত্য, নাগ-ছোর সহিত ছিল ছয়জন এবং অতীশের সঙ্গে ছিল কুড়িজন অনুচর। তাঁহারা চলিতে চলিতে ক্রমে ভারতের সীমান্ত প্রদেশে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সেখানে একটি ছোট বিহার ছিল—সেই বিহারের শ্রমণগণ সঙ্ঘবদ্ধভাবে অতীশ এবং তাঁহার সঙ্গিগণকে পরম শ্রদ্ধার সহিত আশ্রমের অতিথিরূপে গ্রহণ করিলেন। ভারতের সীমান্ত প্রদেশস্থিত এই শ্রমণগণ আপনাদের মধ্যে এইরূপ আলোচনা করিতেছিলেন: “যদি অতীশের এই তিব্বত-যাত্রা আমরা প্রতিরোধ করিতে পারিতাম, তাহা হইলে খুবই ভাল হইত, কেননা আমরা ইহা বিশেষভাবে উপলব্ধি করিতেছি যে অতীশের ন্যায় একজন মহাপণ্ডিতের ভারতবর্ষ হইতে প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষ হইতে বৌদ্ধধর্ম্মের গৌরবসূর্য্য অস্তমিত হইবে। অতএব আমাদের কর্ত্তব্য হইতেছে মহাপণ্ডিত আচার্য্য অতীশকে তাঁহার তিব্বত-যাত্রার অভিপ্রায় হইতে নিবৃত্ত করা। আবার সঙ্ঘের অন্যান্য শ্রমণেরা বলিলেন: “বিক্রমশীলা বিহারের আচার্য্যগণ যখন তাঁহাকে নিবৃত্ত করিতে পারেন নাই তখন আমাদের এইরূপ চেষ্টা করা সম্পূর্ণ যুক্তিবিরুদ্ধ।”
বিহারের শ্রমণগণ অশ্রুপূর্ণ-লোচনে অতীশ ও তাঁহার সঙ্গিগণকে পর্ব্বতে আরোহণ করিতে দেখিলেন।
অতীশ এবং তাঁহার সঙ্গিগণ ভারতের সীমান্ত প্রদেশ অতিক্রম করিয়া তীর্থিকদের গন্তব্যস্থল অতি পবিত্র একটি বিহারে আসিয়া পৌঁছিলেন। সেস্থানে অতীশের মতাবলম্বী পঞ্চদশজন বৌদ্ধাচার্য্য বাস করিতেছিলেন। এই আশ্রমের আচার্য্যগণ তাঁহার সহিত পরিচিত হইয়া আপনাদিগকে ধন্য মনে করিলেন। সারাদিন অতীশের সহিত তাঁহারা ধর্ম্মালোচনা করিলেন। অতীশ তাঁহাদিগকে এইরূপ সরলভাবে বৌদ্ধধর্ম্মের নিগূঢ় তত্ত্ব সমুদয় বুঝাইয়া দিলেন যে সেই আশ্রমবাসী শ্রমণগণ অতীশের পাণ্ডিত্য ও অমায়িক ব্যবহারে একান্ত প্রীত হইয়া প্রত্যেকে তাঁহাকে একটি ছত্র উপহার দিলেন। তাঁহারা অতীশের সহিত একান্ত অনুগতের মত ব্যবহার করিয়াছিলেন।
এই স্থান পরিত্যাগ করিয়া তাঁহারা ক্রমশঃ পার্ব্বত্য-পথে চলিতে লাগিলেন। এই পথে অনেক তীর্থিকেরাও তাঁহাদের সঙ্গী ছিল। তীর্থিকদলের মধ্যে শৈব, বৈষ্ণব, কপিলাশ প্রভৃতি নানা সম্প্রদায়ের লোক ছিল, তাহারা বৌদ্ধধর্ম্ম-বিদ্বেষী ছিল। ইহারা তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম্মের প্রচার ও সংস্কারের পক্ষপাতী ছিল না। এই তীর্থিকদলের মধ্যে কেহ কেহ অতীশকে হত্যা করিতে উদ্যোগী হইয়াছিল। একবার তাহারা আঠারো জন দুর্দ্দান্ত দস্যুকে এই কার্য্যে প্ররোচিত করে, কিন্তু সেই দস্যুগণ অতীশের সৌম্য, শান্ত ও জ্যোতিষ্মান্ মুখশ্রী দেখিয়া এমনভাবে অভিভূত হইয়া পড়িল যে, তাহাদের হাতের অস্ত্র হাতেই রহিয়া গেল—প্রস্তর মূর্ত্তির মত সকলে নির্ব্বাক্ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। অতীশ কিছুদূর অগ্রসর হইয়া বলিলেন—‘আমার এই হতভাগ্য দস্যুদের জন্য দুঃখ হইতেছে!’ এইরূপ বলিয়া তিনি মাটির উপর কয়েকটি মুর্ত্তি অঙ্কিত করিয়া যেমন মন্ত্রোচ্চারণ করিলেন অমনি নির্ব্বাক্ ও অচল দস্যুদল আবার বাক্শক্তি লাভ করিল এবং চলিতে সক্ষম হইল।
একদিন পথিমধ্যে এক স্থানে অতীশ দেখিতে পাইলেন, তিনটি কুকুরের বাচ্চা শীতে জড়সড় হইয়া কষ্ট পাইতেছে। কেহ তাহাদের দিকে ফিরিয়াও তাকাইতেছে না। অতীশ কুকুরের বাচ্চা তিনটিকে তুলিয়া তাঁহার গাত্রাবরণের মধ্যে লইলেন এবং বলিলেন—‘আহা! বাছারা, তোমরা বড় কষ্ট পাইতেছ!’ এই কথা বলিয়া তিনি পুনরায় পথ চলিতে আরম্ভ করিলেন। এমনি ছিল তাঁহার দয়া ও মহত্ত্ব।
এ স্থানের রাজা (জমিদার) এই যাত্রীদলের প্রতি অত্যন্ত দুর্ব্ব্যবহার করিয়াছিলেন। অতীশের সহিত চন্দন কাষ্ঠের নির্ম্মিত একটি ছোট টেবল্ (table) ছিল। রাজা দীপঙ্করের নিকট সেই টেবলটি অভদ্রভাবে দাবী করিলেন। অতীশ বলিলেন: “আমি তিব্বতের রাজাকে উপহার দিবার জন্য এই টেবলটি লইয়া যাইতেছি। আমি ইহা কোন প্রকারেই হস্তান্তরিত করিতে পারিব না। রাজা ইহাতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইলেন এবং তাঁহাকে বিপন্ন করিবার জন্য পথে এক দস্যুদলকে পাঠাইয়া দিলেন, যেন তাহারা পরদিন প্রত্যূষে অতীশ ও তাঁহার সঙ্গিগণ যেমন এ পথ দিয়া যাইবেন, সে সময়ে তাঁহাদিগকে আক্রমণ করিয়া সমুদয় দ্রব্যাদি লুণ্ঠন করে এবং তাঁহাদের প্রাণনাশ করে।
পরদিন প্রত্যূষে রাজা যেমন যাত্রীদলের নিকট হইতে বিদায় লইয়া গেলেন, তখন দীপঙ্কর তাঁহার সঙ্গিগণকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন—“তোমরা সতর্ক থাকিবে। আজ পথে পাহাড়িয়া দস্যুরা আসিয়া আমাদিগকে আক্রমণ করিবে।” তাহাই হইল,—কিন্তু অতীশের মন্ত্র-প্রভাবে তাহাবা নির্ব্বাক্ভাবে যন্ত্রচালিত পুতুলের ন্যায় চলিয়া গেল।
এইবার তাঁহারা নেপালের নিকটে আসিয়া পৌঁছিলেন। দূর হইতে পুণ্য পীঠস্থানের আর্য্য স্বয়ম্ভুর মন্দির দেখিয়া তাঁহাদের মন ও প্রাণ আনন্দে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল। তাঁহারা সকলে একটি শাখা-প্রশাখা-বিশিষ্ট শ্যামল-পত্ররাজি-শোভিত বিরাট বৃক্ষের নীচে শিবির সন্নিবেশ করিলেন। এইখানে ভারবাহী জন্তুর পৃষ্ঠ হইতে মালপত্র নামানো হইল। আর্য্য-স্বয়ম্ভুরমন্দির দর্শনে দীপঙ্করের প্রাণ এতদূর আনন্দে বিভোর হইয়াছিল যে তিনি অপলকনেত্রে সেইদিকে তাকাইয়াছিলেন। অতীশ বৃক্ষের শীতল ছায়ায় উপবেশন করিলেন। তাঁহার দক্ষিণ দিকে গ্যায়ৎসো এবং বাম দিকে বসিয়াছিলেন তাঁহার ভ্রাতা বিজয়চন্দ্র। আর মধ্যস্থলে একটি উচ্চ আসনে বসিয়াছিলেন রাজসন্ন্যাসী মহারাজা ভূমিসঙ্ঘ। এই ভূমিসঙ্ঘ অতীশের প্রিয়তম শিষ্য।
এস্থানের নৃপতি অতীশকে সদলবলে রাজসম্মানে অভ্যর্থনা করিলেন। তাঁহার ও তদীয় সঙ্গিগণের সর্ব্ববিধ সুব্যবস্থার জন্য রাজকর্ম্মচারীদিগের উপর ভার দিলেন। মগধের শ্রেষ্ঠ আচার্য্যকে নৃপতি অনন্তকীর্ত্তি অনেকদূর হইতেই পরম সমাদরে অভ্যর্থনা করিয়া রাজপ্রাসাদে আনিয়া তাঁহার থাকিবার সর্ব্ববিধ সুব্যবস্থা করিলেন। তিনি নিজে সম্মুখে উপবেশন করিয়া আচার্য্য অতীশের উপদেশাবলী শ্রবণ করিয়া আপনাকে ধন্য মনে করিতে লাগিলেন।
এই স্থানে গ্যায়ৎসো কঠিন রোগে আক্রান্ত হইলেন। গ্যায়ৎসোকে আরোগ্য করিবার সমুদয় চেষ্টাই ব্যর্থ হইল। একদিন গভীর রাত্রিতে গ্যায়ৎসোর মৃত্যু হইল। অতীশের অনুচরগণ অতিগোপনে রাত্রিকালেই নদীর তীরে লইয়া যাইয়া তাঁহার দেহের সৎকার করিল। পরদিন প্রত্যূষে যাত্রাকালে গ্যায়ৎসোর পরিত্যক্ত শয্যাভ্রব্যাদি একটা ডুলির মধ্যে এমনভাবে সাজানো হইল যেন লোকে মনে করে যে পীড়িত গ্যায়ৎসো ডুলিতে চড়িয়া যাইতেছেন। পাছে নেপাল সরকার কোনরূপ অনুসন্ধান করিয়া তাঁহাদিগকে বিপন্ন করে এজন্যই তাঁহারা এরূপ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। নতুবা অনাবশ্যকভাবে যাত্রা-পথে বিলম্ব ও বিঘ্ন ঘটিত।
নেপালে অবস্থান কালে অতীশ, নৃপতি নয়পালকে একখানি উপদেশপূর্ণ লিপি প্রেরণ করেন। ঐ লিপিখানি ‘বিমলরত্নলেখ’ নামে পরিচিত। অতীশ তাঁহার সঙ্গীয় দ্বিভাষীর সাহায্যে ঐ সুন্দর উপদেশপূর্ণ পত্রখানি তিব্বতীয় ভাষায় অনূদিত করিয়াছিলেন। এইবার পুনরায় অতীশ ও তাঁহার সহযাত্রীগণ নেপাল পরিত্যাগ করিয়া তিব্বত-যাত্রা করিলেন।
অতীশ ও তাঁহার অভিযাত্রীদল যখন তিব্বতে প্রবেশ করিলেন, তখন তাঁহারা দেখিতে পাইলেন রাজা চ্যাং-চুবের প্রেরিত একশত অশ্বারোহী পুরুষ কারুকার্য্য-পরিশোভিত শ্বেতপরিচ্ছদে সজ্জিত হইয়া অতীশ ও তাঁহার সঙ্গিগণকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য উপস্থিত হইয়াছেন। ইহারা চারিজন সৈন্যাধ্যক্ষের নেতৃত্বাধীনে আসিয়াছিল। তাঁহাদের নাম লাওয়াংপো, লা-লো দোই, লা-সিরাব এবং লা-শে-জোন্ ইঁহাদের প্রত্যেকের হাতে ছিল ষোলটি করিয়া বর্শা। বর্শার উপরে ছিল শ্বেতপতাকা। অশ্বারোহীদের প্রত্যেকের হস্তে ছিল, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শ্বেতপতাকা এবং কুড়িটি শ্বেত সাটিনের ছত্র। ইঁহারা বিবিধ বাদ্যযন্ত্র সহযোগে চারিদিক নিনাদিত করিয়া—“ওঁ মণিপদ্মে হুম” এই পবিত্র মন্ত্র গান করিতে করিতে মগধের বিখ্যাত আচার্য্য দীপঙ্করকে রাজা চ্যাং-চুবের নামে আসিয়া প্রণতি পূর্ব্বক সাদর অভিনন্দন জ্ঞাপন করিলেন। সেদিনকার সেই অভিনন্দন, তিব্বতীয়দের ভক্তি-প্রণত ভাব অতীশের চিত্তকে বিশেষরূপে মুগ্ধ করিয়াছিল। তাঁহার হৃদয় তখন আনন্দে অভিষিক্ত হইয়াছিল এবং তাঁহার এই তিব্বত আগমন যে এইভাবে সার্থক হইতে চলিয়াছে তাহা হৃদয়ঙ্গম করিয়া তিনি পুলকিত হইয়াছিলেন। তিব্বতের গুজে নামক স্থানেই তাঁহাকে এইরূপ অভ্যর্থনা করা হইয়াছিল।
এই গুজেতেই অতীশ সর্ব্বপ্রথম চা পান করেন। তিনি গুজেতে আসিয়া পৌঁছিলে পর এবং বিশ্রামাদি করিবার সময়ে গুজের অভিনন্দনকারীগণ তাঁহার নিকট তিব্বতীয় রীতিতে চা প্রস্তুত করিয়া উপস্থিত করিলেন এবং বলিলেন—“মহাত্মন্! আপনি যদি অনুমতি করেন তবে আপনাকে আমাদের দেশের এই স্বর্গীয় পানীয় পান করিবার জন্য অনুরোধ করিতেছি। অতীশ বলিলেন,—“এই পানীয়ের কি নাম? তোমরা যার এত সুখ্যাতি করিতেছ?” তিব্বতীয়েরা বলিলেন,—“মহাত্মন্! ইহার নাম চা। এই গাছের ছাল খাইতে নাই, কিন্তু ইহার পাতা চূর্ণ করিয়া উষ্ণ জলে ভিজাইয়া পান করিতে হয়। এই পানীয়ের অনেক কিছু গুণ রহিয়াছে।” অতীশ তাহাদের কথা শুনিয়া বলিলেন—“এমন উত্তম পানীয় নিশ্চয়ই তিব্বতীয় ভক্ত শ্রমণগণের প্রার্থনার ফলে বিধাতা দান করিয়াছেন। আমি ইহা পান করিয়া তৃপ্তি লাভ করিলাম।”
গুজে হইতে এই যাত্রীদল একে একে নানাস্থান অতিক্রম করিয়া [ডোক্] নামক স্থানে আসিলেন। এই স্থানটী মানসসরোবর নামক হ্রদের অল্প দূরে অবস্থিত। এই স্থানে দলে দলে গ্রামবাসিগণ আসিয়া অতীশকে বিবিধ উপহার দিয়া পরিতুষ্ট করিতে লাগিল। ডোক্ নামক স্থানে প্রাতর্ভোজন ইত্যাদি সমাপন করিয়া তাঁহারা মানসসরোবরের তীরে আসিয়া পৌঁছিলেন। মানস সরোবরের নির্ম্মল নীলাভ সলিলরাশি এবং চারিদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখিয়া দীপঙ্কর এতদূর মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে তিনি এই স্থানে এক সপ্তাহকাল অবস্থান করেন। এই স্থানের সৌন্দর্য্য তাঁহার চিত্তশতদল নবারুণদীপ্তিতে বিকশিত করিয়া তুলিয়াছিল। অতীশ যখন মানসসরোবরের তীরে বাস করিতেছিলেন, ঠিক সেই সময়ে নাগ-ছোও এখানে আসিয়া তাঁহার সহিত মিলিত হইলেন। অতীশ একদিন যখন মানস সরোবরের পবিত্র জলের মধ্যে দণ্ডায়মান হইয়া পিতৃ-পুরুষগণের উদ্দেশ্যে তর্পণ করিতেছিলেন, সে সময়ে নাগ-ছো জিজ্ঞাসা করিলেন—“আপনি জলে দাঁড়াইয়া কি করিতেছেন?” অতীশ বলিলেন,—“আমি পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করিতেছি, ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব প্রভৃতি দেবতার উদ্দেশ্যে স্তুতি জানাইয়া পিতৃ-পুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করিতেছি। কেন তোমাদের তিব্বতীয়দের মধ্যে কি তর্পণের রীতি প্রচলিত নাই?” নাগ-ছো কহিল—“হাঁ আমাদের দেশে মঞ্জুশ্রী দেবী এবং অন্যান্য দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে অর্চ্চনা করিবার মন্ত্র রহিয়াছে।” অতীশ নাগ-ছোকে তর্পণের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে বিবিধ উপদেশ প্রদান করিলেন।
অতীশ মানস-সরোবরের তীর পর্য্যন্ত আসিয়া পৌঁছিয়াছেন, ইতিমধ্যেই এই সংবাদ দিকে দিকে প্রচারিত হইয়াছিল। মানস সরোবরের তীরবর্ত্তী তিনটি প্রদেশ হইতে দলে দলে লোক তাঁহাকে দর্শন করিবার জন্য আসিতে লাগিল। তিব্বতের ধর্ম্মবিপ্লবের ও অবনতির যুগে ভারতীয় শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতের আগমন তাহাদের নিকট এক নূতন উৎসাহ ও আনন্দের প্রেরণা আনিয়া দিয়াছিল।
এ সময়ে অতীশকে রাজধানীতে লইয়া যাইবার জন্য ৩০০ শত অশ্বারোহী আসিয়া উপস্থিত হইল। ইহারা সকলেই শ্বেত-পরিচ্ছদ পরিহিত ছিল। তিন শতাব্দী পূর্ব্বে আচার্য্য শান্তিরক্ষিতকে যেমন তিব্বতীয়েরা অভ্যর্থিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন—অতীশকেও তেমনি শ্রদ্ধা ও প্রীতির সহিত পরম ভক্তি-সহকারে আজ আবার রাজার অনুচরবর্গ অভ্যর্থনা করিতে লাগিলেন। তাঁহারা অতীশকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন,—“হে পরম প্রবীণ, ভারতীয় শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, দেবতা যেমন ভক্তের প্রার্থনায় ভক্তের বাঞ্ছা পূর্ণ করিবার জন্য আসিয়া দর্শন দেন, তেমনি হে মহাপ্রাণ মহাপুরুষ, আপনি তিব্বতীয়গণের সনির্ব্বন্ধ অনুরোধে দয়া করিয়া তিব্বতে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। আপনি ‘চিন্তামণি’,—আপনি পরশমণি, যাহার স্পর্শে লৌহও স্বর্ণ হয়, যাহার নিকট প্রার্থনা করিলে কোন কিছুই অপূর্ণ থাকে না! তেমনি জানি আপনি আমাদের প্রার্থনা পূর্ণ করিবার জন্যই এখানে আসিয়াছেন। আমরা জানি, আমাদের এই দেশ ধর্ম্ম সম্বন্ধে হীন—যে ধর্ম্ম-গৌরবে ভারত গরীয়ান্, সে ধর্ম্ম গৌরব আমাদের নাই তবু আমাদের দেশের প্রতি বিশ্বপ্রকৃতির অশেষ রূপ করুণা-ধারা বর্ষিত হইয়াছে। আমাদের দেশে সূর্য্যের প্রখর প্রতাপ নাই, আমাদের দেশ শীতল ও শান্তিপ্রদ। আমাদের দেশে নীল-সলিলপূর্ণ হ্রদ এবং নির্ঝরিণী রহিয়াছে অসংখ্য। তিব্বতের জলবায়ু মানুষকে সজীব করিয়া তোলে। তিব্বতের পার্ব্বত্য প্রদেশ পর্ব্বতান্তরালে অবস্থিত বলিয়া শীতের প্রখরতা সেখানে উপলব্ধি হয় না। সেখানকার উষ্ণতা শরীর ও মনকে কর্ম্মঠ এবং উৎসাহী করিয়া থাকে।
হে প্রধান পণ্ডিত! যখন আমাদের দেশে বসন্ত ঋতুর সমাগম হয়, তখন খাদ্যের কোনওরূপ অপ্রাচুর্য্য থাকে না। তখন আমাদের দেশে জননী লক্ষ্মীর শুভদৃষ্টিতে সমুদয় শস্যক্ষেত্র স্বর্ণশস্য-সম্ভারে পরিপূর্ণ হয়। শরৎ ঋতুতে তিব্বতের প্রকৃতি সবুজ সৌন্দর্য্যে হাস্যময়ী হয়। মাঠে মাঠে, বনে-বনে পর্ব্বতে-পর্ব্বতে শ্যামলশ্রী উদ্ভাসিত হইয়া উঠে। হে পরম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত! আমাদের দেশ প্রত্যেক বিষয়েই শ্রেষ্ঠ। আমাদের জন্মভূমি আমাদের নিকট সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠতম। আজ আপনার শুভাগমনে আমাদের দেশ পবিত্র হইয়াছে। আপনি আমাদের রাজার পক্ষ হইতে আমাদের মুখে সর্ব্বপ্রথম সাদর স্বাগত-বাণী শ্রবণ করুন। যদিও আমাদের বৃদ্ধ নৃপতি লা-জে-শে হোড্ পরলোক গমন করিয়াছেন, তথাপি আমাদের বর্ত্তমান নৃপতি চ্যাং-চুব অতিশয় বিচক্ষণ ও ধর্ম্মপরায়ণ ব্যক্তি। তিনি প্রজাদের কল্যাণের জন্য, ধর্ম্মের সংস্কারের জন্য, হে মহানুভব ভারতীয় শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত! আপনাকে আমাদের তিব্বতে আনয়ন করিয়াছেন। আপনি যখন আমাদের দেশে শুভাগমন করিয়াছেন, তখন নিশ্চয়ই আপনার মহৎ উপদেশে আমরা ধন্য হইব। আমাদের নৃপতি যেমন আপনার শুভাগমনে প্রীতিলাভ করিয়াছেন, তেমনি আমরা সকলে আপনার আদেশ ও উপদেশ মান্য করিয়া কৃতার্থ হইব। তিব্বতের গৌরব ও প্রতিষ্ঠা পুনরায় সর্ব্বত্র ব্যাপ্ত হইবে, আমরাও দীর্ঘ জীবন লাভ করিয়া আপনার মহিমাগীতিতে ধন্য হইব।”
এইবার অতীশ রক্ষীদল-পরিবেষ্টিত হইয়া চ্যাং-চুবের রাজধানী থোলিং নগরের দিকে অগ্রসর হইলেন। তাহারা ‘লো আ, লোমা, লোলা লোলা’ ইত্যাদি গীতরবে চারিদিক মুখরিত করিতে করিতে চলিল।
অতীশের বয়স প্রায় ষাট বৎসর হইলেও তাঁহার শারীরিক সৌন্দর্য্য, মধুর হাস্যময় মুখমণ্ডল, স্নেহপূর্ণ ব্যবহার সঙ্গিগণকে প্রীতিমুগ্ধ করিয়াছিল। এই দেব-প্রকৃতির ভারতীয় পণ্ডিতকে দেখিয়া তিব্বতীয় অনুচরবৃন্দ পরম প্রীতি ও আনন্দ লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার সহাস্য মুখমণ্ডল হইতে সংস্কৃত শ্লোকের আবৃত্তি বড় মধুর শুনাইত। তিনি চলিবার সঙ্গে সঙ্গে সর্ব্বদা বিবিধ মন্ত্র উচ্চারণ করিতে করিতে চলিতেন। এই যে অজ্ঞাত দুর্গম গিরিপথে চলিতেছেন, বৃদ্ধ বয়সে বিবিধ ক্লেশ সহ্য করিতেছেন তবু সকলের সঙ্গে সুমিষ্টভাবে কথাবার্ত্তা বলিতেছেন,—“অতি ভালো! অতি ভালো! অতি ভালো! অতি মঙ্গল! অতি ভালো হে! মহাকরুণিকা তারা! শাক্যমুনি দেখ!” এই কয়েকটি কথা প্রতি নিয়ত তাঁহার মুখ হইতে উচ্চারিত হইতেছিল।
চ্যাং-চুবের প্রেরিত লোকজনের প্রতি প্রশংসমান দৃষ্টিতে চাহিয়া অতীশ বলিতেছিলেন—“এই রাজকর্ম্মচারিগণ আনন্দে ও হাস্য-কৌতুকে গন্ধর্ব্ব-নৃপতি প্রমোদকেও হার মানাইয়াছে। ইহারা দেখিতে রক্ষ জাতীয় যক্ষ সদৃশ। সত্য সত্যই হিমাবৎ প্রদেশ অবলোকিতেশ্বর দেবের লীলানিকেতন। তাঁহারই কৃপাবলে তিব্বতীয়দের ন্যায় দুর্দ্ধর্ষ প্রকৃতির ‘পার্ব্বত্যজাতীয় লোকেরা’ মহদ্ধর্ম্মের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। এই দুর্দ্দান্ত জাতীয় লোকেরা দেখিতে কদাকার ও ভীষণাকৃতি হইলেও ইহাদের প্রকৃতি দিব্য বিনয়পূর্ণ এবং ভক্তি অনুগত। ইহারা সত্য সত্যই দেব অবলোকিতেশ্বরের অনুগত সেবক। মনে হইতেছে ইহাদের যিনি নৃপতি, তাঁহার প্রভাব ও প্রতিপত্তি নিশ্চয়ই দেবরাজ ইন্দ্রতুল্য হইবে।”
থোলিংয়ের পথে
এই ভাবে আনন্দ-অভিযান করিতে করিতে দীপঙ্কর যখন রাজধানী থোলিংয়ের নিকটবর্ত্তী হইলেন, তখন নৃপতি চ্যাং-চুবের প্রধান অমাত্য ওয়ান্ চুগ্ অতীশকে অভ্যর্থনা করিতে আসিলেন। মন্ত্রী ওয়াংচুগ্ অতীশের দুইখানি হস্ত নিজ হস্তমধ্যে ধারণ করিয়া বলিলেন,—“হে প্রভু! আমরা আপনাকে রাজনির্দ্দেশ মত অভ্যর্থনা করিতে অগ্রসর হইয়াছি। আপনি বৌদ্ধধর্ম্মের তত্ত্বজ্ঞ মহাপুরুষ। আপনি দয়া করিয়া আমাদের দেশে আগমন করিয়া আমাদিগকে ধন্য করিয়াছেন। আপনি দারুণ পথ-ক্লেশ সহ্য করিয়াও যে আমাদিগকে মুক্তি-পথের সন্ধান দেখাইতে আসিয়াছেন, সেজন্য আমাদের কৃতজ্ঞতাপূর্ণ সাদর অভিনন্দন গ্রহণ করুন।” মন্ত্রী এই কথা বলিয়া একটি চিত্র-পট (Tapestry) উপহার দিলেন। ঐ পটে অবলোকিতেশ্বর দেবের মূর্ত্তি অঙ্কিত ছিল। এই পটটি প্রায় চল্লিশ হস্ত পরিমিত দীর্ঘ ছিল। এবং উহা অতি সুন্দরভাবে স্বর্ণ সূত্র দ্বারা কারুকার্য্যখচিত ছিল।
রাজা চ্যাং-চুবের নিকট, দীপঙ্কর তিব্বতে আসিয়া পৌঁছিয়াছেন এই সংবাদ যাওয়া মাত্র ন্যাহারি নামক স্থানের লোকেরা দলে দলে তাঁহাকে দেখিতে আসিতে লাগিল। এই ভারতীয় পণ্ডিত তিব্বতীয়গণের একমাত্র আলোচনার বিষয় হইয়া দাঁড়াইলেন। প্রত্যেক গ্রামবাসী, প্রত্যেক নাগরিকের মুখেই এই মহাপণ্ডিতের কথা শুনা যাইতে লাগিল। উচ্চ, নীচ এবং সাধারণ জনগণেরও তাঁহার মুখে ম্যা-ফ্যাম্ বা মানস সরোবরের বিষয় অবগত হইবার জন্য আগ্রহ দেখা গেল। রাজা যে মহামানবকে তিব্বতে আনয়ন করিবার জন্য এত অর্থব্যয় করিলেন, যাঁহাকে আনিবার চেষ্টায় বহু লোকের অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হইতে হইয়াছে, না জানি সেই শ্রেষ্ঠ ভারতীয় পণ্ডিত কিরূপ দেখিতে, কিরূপ তাঁহার পাণ্ডিত্য, কিরূপ তাঁহার বাক্য ও উপদেশ। এইরূপ ব্যগ্রভাব যে জনসাধারণের পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, সে-কথা সহজেই বুঝিতে পারা যায়। রাজা চ্যাং-চুব ও তাঁহার কর্ম্মচারীদের প্রমুখাৎ দীপঙ্করের সম্বন্ধে নানা বিষয়ে জানিবার জন্য কৌতূহলি হইয়াছিলেন।
রাজা চ্যাং-চুব যখন ব্যগ্রভাবে দীপঙ্করের বিষয় জানিবার জন্য উৎসুক হইয়াছিলেন, ঠিক্ সেই সময়ে তাঁহার মন্ত্রী লা-লোদাই দশজন অশ্বারোহী শরীররক্ষীসহ নৃপতিসকাশে আসিয়া উপনীত হইলেন এবং বলিলেন, “মহারাজ! যে মুহূর্ত্তে বহু শাস্ত্র-বিশারদ পণ্ডিত দীপঙ্কর নেপালের পাল্পা নামক স্থানে আসিয়া পৌছিয়াছিলেন, সে সময়ে নেপালের মহারাজা অতি বিপুলভাবে তাঁহাকে সম্বর্দ্ধনা করেন, এমন কি তাঁহার পুত্র পর্য্যন্ত অতীশের নিকট দীক্ষিত হইয়া ‘দেবেন্দ্র’ নামে অভিহিত হইয়াছেন। অতীশের সহিত সমগ্র পশ্চিম ভারতের একজন রাজ-শ্রমণও আসিয়াছেন, তাঁহার নাম ভূমিসঙ্ঘ। ভূমিসঙ্ঘ নানা গুণে গুণান্বিত, সসাগরা ধরণীর মহারাজচক্রবর্ত্তী সম্রাট হইবার যোগ্য। ধর্ম্মের জন্য পৃথিবীর সমুদয় বিলাস-সুখ ও ধনৈশ্বর্য্যের মায়া পরিত্যাগ করিয়া, তিনি জ্ঞানী মহাপুরুষ দীপঙ্করের নিকট দীক্ষা লাভ করিয়া শ্রমণ-ব্রত গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি অতীশের একান্ত অনুগত বলিয়াই আমাদের তিব্বতে আগমন করিয়াছেন। মানস সরোবরের তীর পর্য্যন্ত প্রায় ৪২৫ জন নেপাল-রাজ-অনুচর দীপঙ্করের অনুগামী হইয়াছিলেন। সেখানে হাজার হাজার কৃষকও রাখালেরা আসিয়া মহামতি দীপঙ্করকে বন্দনা করিয়া গিয়াছে এবং তাঁহাকে দর্শন করিয়া ধন্য হইয়াছে।”
মন্ত্রীর মুখে দীপঙ্কর তাঁহার যাত্রা-পথে যে সর্ব্বত্র বিশেষভাবে সম্মানিত হইয়াছেন এমন কি নেপাল-রাজও যে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন ইহাতে নৃপতি অত্যন্ত প্রীতিলাভ করিলেন। দীপঙ্কর যখন থোলিং রাজদরবারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, তখন স্বয়ং নৃপতি এবং রাজদরবারের সকলে দণ্ডায়মান হইয়া অতীশকে অভ্যর্থনা করিলেন। কিন্তু একজন বৃদ্ধ লামা দীপঙ্করকে দণ্ডায়মান হইয়া অভ্যর্থনা করিলেন না, সম্ভবতঃ বার্দ্ধক্যের দরুনই তিনি দণ্ডায়মান হইতে পারেন নাই। এই বৃদ্ধ লামার নাম ছিল, রিন্-চেন্-জং-পো। রিন্-চেন্-জং-পোর প্রতি এক সময়ে রাজা কর্ত্তৃক তিব্বতের পুরাণ এবং রং প্রদেশের উপর ধর্ম্মনেতৃত্ব ভার প্রদত্ত হইয়াছিল। রিন্-চেন্-জংপো তিব্বতের ঐ সকল প্রদেশে অনেক মঠ, মূর্ত্তি ও বিদ্যাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন এবং বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তাঁহার শিষ্যগণ মধ্যে দশজন সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপন্ন হইয়াছিল। এবং তাহারা “লোচবা” বা দ্বিভাষী নামে পরিচিত ছিল। রিন্-চেন্-জংপো সংস্কৃত ও তিব্বতীয় ভাষায় একখানি অভিধান প্রণয়ন করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রতিষ্ঠাপিত তান্ত্রিক ধর্ম্মাচার তিব্বতে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। গল্প আছে যে একবার রিন্-চেন্-জংপো একটা দুরন্ত দৈত্যকে দমন করিয়াছিলেন।
দীপঙ্করের সহিত রিন্-চেন্-জংপোর যখন প্রথম সাক্ষাৎ হইল তখন তাঁহার বয়স ছিল ৮৫ বৎসর। দীপঙ্কর তাঁহার বয়ঃকনিষ্ঠ, এজন্য রিন্-চেন্-জংপো ভারতীয় পণ্ডিতকে দণ্ডায়মান হইয়া অভ্যর্থনা করিলেন না, কিন্তু পরে দীপঙ্করের মুখে পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিবিধ দেবতাগণের স্তোত্র প্রভৃতি শুনিয়া তিনি একান্ত মুগ্ধ হইলেন। সর্ব্বোপরি দীপঙ্করের তাঁহার প্রতি বিনয়-পূর্ণ ব্যবহার তাঁহাকে একান্ত মুগ্ধ করিল। অবশেষে বৃদ্ধ রিন্-চেন্ং-জংপোও বিনীতভাবে দীপঙ্করের নিকট দণ্ডায়মান হইয়া সম্মান প্রদর্শন করিলেন। বৃদ্ধ রিন্-চেন্-জংপো ৯৫ বৎসর বয়সে পরলোক গমন করেন।
এই ভাবে তিব্বত-রাজ দীপঙ্করকে পরম সমাদরের সহিত আপনার দেশে অভ্যর্থনা করিয়া লইলেন। রাজা, প্রজাদের প্রতি এইরূপ অনুজ্ঞা প্রচার করিলেন যে: “তাহাদের দীপঙ্করের আদেশ ও উপদেশ অনুযায়ী ধর্ম্মপথে পরিচালিত হইতে হইবে।” ভারতীয় পণ্ডিতগণের মধ্যে দীপঙ্কর যে অতি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তাহা তিনি সহজেই বুঝতে পারিলেন। রাজা দীপঙ্করের বিদ্যাবত্তা ও বিবিধ গুণ দেখিয়া তাঁহাকে জো-বো-জে অর্থাৎ প্রভুস্বামী বা স্বামী ভট্টারক উপাধি প্রদান করিলেন।
দীপঙ্কর থোলিং উপনীত হইয়া তিব্বতে মহাযান মত প্রচার করিলেন। এবং তাঁহার প্রস্তাবিত মত সম্বন্ধে বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়া প্রকাশ করিলেন। তিনি ক্রমশঃ তিব্বতের ধর্ম্ম-সংস্কারে প্রবৃত্ত হইয়া অল্প সময়ের মধ্যেই তাহার সংস্কার করিতে সমর্থ হইলেন। অতীশের চেষ্টা ও যত্নে তিব্বতের লুপ্তপ্রায় বৌদ্ধধর্ম্মের গরিমা পুনরায় ফিরিয়া আসিল।
দীপঙ্করের উপদেশানুসারে চলিয়া তিব্বতীয় লামারা বৌদ্ধধর্ম্মের প্রকৃত মর্ম্ম কি তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। অতীশ প্রায় বারো বৎসর কাল তিব্বতে বাস করেন, এই সময়ের মধ্যে তিনি তিব্বতের বিভিন্ন প্রদেশে পর্য্যটন করিয়া বৌদ্ধধর্ম্মের পবিত্রতা এবং প্রকৃত ধর্ম্মতত্ত্ব জনগণ মধ্যে প্রচারিত করিয়াছিলেন। তাঁহার উপদেশ, ধর্ম্ম-জীবন, গ্রন্থ প্রণয়ন ইত্যাদি এবং অমানুষিক কঠোর পরিশ্রমের কাজ দেখিয়া তিব্বতবাসী তাঁহাকে দেবতার ন্যায় শ্রদ্ধা ও ভক্তি করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। দীপঙ্কর কিভাবে তিব্বতবাসীদিগের মধ্যে ধর্ম্ম প্রচার করিয়া নৈতিক উন্নতি ও মঙ্গল বিধান করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, সে কথা সর্ব্বজনবিদিত।
লাশার নিকটবর্ত্তী ন্যাথাং নামক স্থানে ১০৫৩ খ্রীঃ অঃ ৭২ বা ৭৩ বৎসর বয়সে তাঁহার মৃত্যু হয়। এই গ্রামটি নেতাং নামে পরিচিত। কেহ কেহ এই স্থানের নাম নের্তাম্ বলেন। চীনারা বলে ই-তাং। এসিয়ার সর্ব্বত্র, তিব্বতের প্রসিদ্ধ স্থান সমূহে যেখানে যেখানে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচলিত আছে সেই সেই স্থানে তিনি দেবতার ন্যায় পূজা পাইয়া আসিতেছেন। সকলের হৃদয়-মন্দিরে তাঁহার স্মৃতি পরম শ্রদ্ধার সহিত ভক্তির পুষ্পাঞ্জলি লাভ করিয়া আসিতেছে। তিব্বতের বৌদ্ধধর্ম্মের অন্যতম ধর্ম্মনেতা ব্রোমতোনের ছিলেন তিনি ধর্ম্মাচার্য্য।
দীপঙ্কর বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন। এবং তিনি একশতটি মহাযান ধর্ম্ম-সম্পর্কিত উপদেশ দিয়াছেন। এখানে আমরা তাঁহার লিখিত কতিপয় পুস্তকের নাম দিলাম (১) বোধিপথপ্রদীপ, (২) চর্য্যা-সংগ্রহ-প্রদীপ, (৩) মধ্যমোপদেশ, (৪) সংগ্রহগর্ভ, (৫) মহাযান পথসাধন-বর্ণ সংগ্রহ, (৬) মহাযান-পথ-সাধন-সংগ্রহ, (৭) দশকুশল-কর্ম্মোপদেশ, (৮) গুরুকর্ম্মবিভঙ্গ, (৯) সূত্রার্থ সমুচ্চয়োপদেশ, (১০) সপ্তকবিধি, (১১) গুরুক্রিয়াক্রম, (১২) সরঙ্গতায়দশ। দীপঙ্কর নয়পালকে উপদেশপূর্ণ যে পত্র লেখেন, তাহা ‘বিমলরত্ন-লেখা’ নামে পরিচিত। তিব্বতে দীপঙ্কর ক-দং নামক বৌদ্ধসম্প্রদায়ের সৃষ্টি করিয়াছিলেন।
অতীশের সমাধি-মন্দির গ্রো-ম নামে পরিচিত। নাম নামক গ্রামের যে স্থানে অতীশের সমাধি-মন্দিরটি অবস্থিত, সে স্থানটি অতি নির্জ্জন। যে দীপঙ্কর তিব্বতীয়দের ধর্ম্ম-সংস্কারের জন্য জীবন আহুতি দিয়াছিলেন, তাহারা কিন্তু অতীশের সমাধি-মন্দিরটি রক্ষার দিকে একান্ত উদাসীন। ওয়াডেল সাহেব অতীশের সমাধি-মন্দিরটি দেখিয়া লিখিয়াছেন:—“আমি নাম গ্রামে দীপঙ্করের সমাধি-মন্দিরটির ধ্বংসপ্রায় অবস্থা দেখিয়া অবাক হইলাম। যে ধর্ম্মপ্রাণ সাধু মহাত্মা তিব্বতের ধর্ম্ম-সংস্কারের জন্য সুদূর তিব্বতের নির্জ্জন প্রান্তরে জীবন বিসর্জ্জন দিলেন, দুঃখের কথা তিব্বতীয়েরা কিনা তাঁহার সমাধি-ভবনটিকে রক্ষা করিবার প্রতি একান্ত উদাসীন। যে গৃহের মধ্যে অতীশের দেহাবশেষ রক্ষিত, তাহা একটা গোলা-ঘরের ন্যায় কক্ষ মাত্র। বাহিরের দিক্টা পীতবর্ণানুরঞ্জিত, উহার চারিদিকে কতকগুলি প্রাচীন উইলো তরু মাথা তুলিয়া একটি বীথি রচনা করিয়াছে। মন্দিরটির আকার অনেকটা চুরতেনের মত। উহার উচ্চতা ১৪ ফিট, পরিধিও তদনুরূপ। ইহার উপরটা বালিচুণের কাজ করা এবং মন্দিরের প্রাচীরের গাত্র অপটু চিত্রকরের অঙ্কিত কয়েকটি বুদ্ধ এবং অতীশের নিজেরও কয়েকটি চিত্র দ্বারা শোভিত রহিয়াছে। দীপঙ্করের চিত্রে দেখিতে পাওয়া যায় তিনি পদ্মাসনে বসিয়া আছেন। নিম্নভাগে শ্বেত হস্তী, শ্বেত ছত্র প্রভৃতি পবিত্র সপ্ত চিহ্ন রহিয়াছে। ছয় জন অশিক্ষিত লামার উপর এই সমাধি-মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের ভার রহিয়াছে। ইহারা সমাধিমন্দিরের ২০০ শত গজ দূরে একটি তরুলতা-গুল্মহীন প্রস্তরাকীর্ণ পর্ব্বতের নিম্নভাগে বাস করে। এই ছয়জন লামার মধ্যে মাত্র একজন সামান্য-ভাবে কিছু লিখিতে পড়িতে জানে। এখানকার পর্ব্বত-গাত্রে খোদিত মূর্ত্তি ও নিকটবর্ত্তী স্থানের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য্য রীতি দেখিয়া মনে হয় যে অতীশ ও তাঁহার সঙ্গিগণ এই স্থানের কাছাকাছি কোথাও হয়ত বা বাস করিতেন।”
দীপঙ্কর ন্যা-থ্যাং নামক স্থানে একটি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। ন্যা-থাং লাশা হইতে অল্প দূরে অবস্থিত। ন্যা-থাংয়ের বিহারটি বর্ত্তমান সময়েও বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়া আসিতেছে। এখানে এখনও প্রায় পঞ্চাশ জন লামা বাস করেন। আজ পর্য্যন্ত বংশপরম্পরাগতভাবে তিব্বতীয় গল্পপ্রিয় বৃদ্ধগণ ও লামাগণ ভারতীয় মহাপুরুষ দীপঙ্কর ও তাঁহার সঙ্গিগণের মহানুভবতার কথা বলিয়া থাকেন।
- ↑ Desavalivivriti written by Jaganmohana Pandita, under the patronage of vijjala Bhupatia Chauhan Raja of 4 parganas round Patna in the 17th century.......Varadayogini desa-nirnaya. It calls the district of Dacca as Varadayogini. It begins: অথ বরদযোগিনী দেশ বর্ণনন্ ইত্যাদি।
- ↑ বৌদ্ধদের অষ্ট ‘মহাস্থান’ বা তীর্থস্থান হইতেছে (১) লুম্বিনী উদ্যান (বর্ত্তমানে নেপাল তরাইস্থিত রুমিনদেই) বুদ্ধদেব যেখানে জন্মগ্রহণ করেন। (২) বুদ্ধগয়া এইস্থানে বুদ্ধ বুদ্ধত্ব (সম্যক্ সম্বুদ্ধ) লাভ করিয়াছিলেন। গয়া সহর হইতে ছয় মাইল দূরে বুদ্ধগয়া অবস্থিত। (৩) মৃগদাব (Deer-park, বর্ত্তমান সারনাথ)। বুদ্ধদেব ‘সম্যক্ সম্বুদ্ধ’ এই পদ প্রাপ্তির পর ধ্যানযোগে জানিতে পারিলেন যে এক্ষণে তাঁহার বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির পূর্ব্বেকার পাঁচজন শিষ্য মৃগদাবে (সারনাথে) আছেন। ইহা জানিয়া তিনি সারনাথে আসিয়া আপনার ধর্ম্মোপদেশ প্রথমে ঐ পাঁচজনকে প্রদান করেন। বুদ্ধদেবের জীবনের এই ঘটনা “ধর্ম্মচক্রপ্রবর্ত্তন” নামে প্রসিদ্ধ। কেননা এইখানেই তিনি তাঁহার সেই পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদিগকে বৌদ্ধধর্ম্মে দীক্ষা দিয়াছিলেন। সারনাথের প্রাচীন নাম ‘ইসিপতন মিগদাব।’ সারনাথের মাটি খুঁড়িয়া অনেক প্রাচীন কীর্ত্তি আবিষ্কৃত হইয়াছে। এখানে একটি যাদুঘরও প্রতিষ্ঠাপিত হইয়াছে। (৪) কুশীনারা (বর্ত্তমান কাশিয়া বা কুশীনগর) ইহা মল্লদিগের নগর ছিল। মল্লদের শালবনে বুদ্ধদেব মহাপরিনির্ব্বাণ লাভ করিয়াছিলেন। (৫) জেতবন-শ্রাবস্তীর নিকট (বর্ত্তমান সাহেৎ মাহেৎ) এখানে বুদ্ধদেবের অলৌকিক লীলা-মাহাত্ম্য প্রকাশিত হইয়াছিল। (৬) বৈশালী (বসার) এখানে একটি হনুমান বুদ্ধদেবকে ভোজন করাইয়াছিল। (৭) সাঙ্কাস্য (বর্ত্তমানে সাঙ্কিসা) এখানে তিনি বিমান হইতে অবতরণ করেন। (৮) রাজগৃহ, বর্ত্তমান রাজগীর—এখানে তিনি একটি বন্য হস্তীকে দমন করিয়াছিলেন।
- ↑ Antiquities of Tibet, Pt. I, by A. H. Francke, pp. 50-52. In A.D. 1013, the Indian Pandit Dharmapala came to Tibet with several of his disciples, and in 1042 the famous ATISHA, a native of Bengal, who is known in Tibet as Jo-Vo-rje or Jo-Vo-rtishe, also came here. The Life of Buddha. Translated by W. W. Rockhill, p. 227, 1884.