বিষয়বস্তুতে চলুন

হিমালয়-অভিযান/পণ্ডিত কিষণ সিংহ

উইকিসংকলন থেকে

পণ্ডিত কিষণ সিংহ

তিব্বত ও মোঙ্গোলিয়া-অভিযান

[অনেকে মনে করেন আমাদের ভারতবর্ষের লোকেরা কেহই কোনরূপ দুঃসাহসিক অভিযান করেন নাই। ইহা আমাদের অজ্ঞতার কারণ মাত্র। পণ্ডিত কিষণ সিংহ ভারতের একজন সাহসী অভিযানকারী। তিনি জরীপ বিভাগের একজন কর্ম্মচারী ছিলেন। ১৮৭৯-১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দ পর্য্যন্ত তিনি তিব্বত ও মোঙ্গোলিয়া অভিযান করেন। প্রণ্ডিত নয়ান সিংহ, কিষণ সিংহের পূর্ব্বে ১৮৭৩-১৮৭৪-৭৫ বীষ্টাব্দে সর্ব্বাগ্রে হিমালয়-অভিযান করেন। এবং মধ্য তিব্বতে ১৮৭৪ খ্রীষ্টাব্দে একটি হ্রদ আবিষ্কার করিয়াছিলেন। তাঁহার কথা প্রসঙ্গক্রমে আমরা এই প্রবন্ধে লিপিবদ্ধ করিয়াছি। আমরা ভারতীয় জরীপ বিভাগ হইতে প্রকাশিত কিষণ সিংহের অভিযান বিবরণ হইতে এই হিমালয়-অভিযান প্রকাশ করিলাম।]

তিব্বতের পথে

 আমি ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দের ২৪শে এপ্রিল তারিখ, তিব্বত গমন করিব বলিয়া দার্জ্জিলিং ছাড়িলাম। সঙ্গে চলিল আমার ভৃত্য চাম্বেল আর একজন লোক, তার নাম গঙ্গারাম। গঙ্গারামকে সরকার বাহাদুর এই অভিযানে আমার সঙ্গী হইবার জন্য নিযুক্ত করিয়াছিলেন। সন্ধ্যার একটু আগে তিস্তা নদীর পারে আসিয়া পৌঁছিলাম। তিস্তা নদীর দুই তীরের প্রাকৃতিক শোভা যে কিরূপ সুন্দর তাহা সকলেই জানেন। পরদিন আমরা কালিম্পোং আসিলাম। এখানে একটী ছোট বাজার বসে। মাত্র ১৫।২০ টী দোকান ঘর। প্রতি রবিবার হাট মিলে। আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিষ-পত্র সংগ্রহের নিমিত্ত এখানে তিন দিন অপেক্ষা করিতে হইয়াছিল। আমরা চলিয়াছি অজানা দুর্গম দেশের দিকে। কাজেই পথে খাদ্যদ্রব্যাদি মিলিবে কিনা সে-বিষয়ে কিছুই জানিতাম না; এজন্য এখান হইতেই কিছু কিছু আবশ্যক মত খাদ্যদ্রব্য বা রসদ সংগ্রহ করিয়া লইলাম। ২৯শে এপ্রিল কালিম্পোং ছাড়িলাম। পথে পড়িল পিডাং নামে একটি ছোট গ্রাম। এখান হইতে আরও ছোটবড় দুই একটী গ্রাম ছাড়াইয়া ১লা মে তারিখে চুমাকেন্ নামে একটী গ্রামে আসিলাম। এখানে আসিয়া ভয়ানক বৃষ্টি পাইলাম। বৃষ্টির জন্য সে-দিন আর রওনা হইতে পারিলাম না; পরের দিন রওনা হইয়া তিনটী ছোট বড় গ্রামে বিশ্রাম করিয়া ৬ই মে তারিখে জিলেপ নামে উচ্চ পর্ব্বত শৃঙ্গ উত্তীর্ণ হইয়া আসিলাম নাথাং নামক একটী গ্রামে।

 এই গ্রামটী উচ্চ পর্বত শৃঙ্গের উপর অবস্থিত। তখন বরফ পড়িতে আরম্ভ করিয়াছিল—তিনদিন যাবত বরফ পড়া আর থামিল না। এই জন্য এই তিন দিন আমাদের নাথাং থাকিতে হইল। ১০ই মে তারিখ আমরা আসিলাম ইউক্। এ জায়গাটিতে প্রচুর ঘাস দেখিতে পাইলাম। এখানে তিব্বতের সীমা আরম্ভ হইল। অনেক গ্রামের লোকেরা তাহাদের চমরী গোরুর পাল লইয়া এখানে আসে। অক্টোবর, নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাস পর্য্যন্ত তাহারা উচ্চ পর্ব্বত শৃঙ্গের উপরে যে বিস্তৃত সমতল ভূমি রহিয়াছে তাহাতে তাহাদের পশু চারণ করিয়া থাকে। ১২ই মে আমরা বোদ্‌না নামে একটী গিরিপথ দিয়া চলিতে লাগিলাম। সারাপথ বরফে ঢাকিয়া গিয়াছিল কোন কোন জায়গায় বরফ ছিল প্রায় তিন ফিট গভীর। আমরা লান্‌ট নামক গ্রামে আসিয়া আশ্রয় লইলাম! এখানে একজাতীয় চীর গাছ হয় তাহা হইতে বেশ উৎকৃষ্ট জ্বালানী কাঠ পাওয়া যার—ঘাসও জন্মে প্রচুর পরিমাণে।

 ১৩ই মে। আমরা রিন্‌চেন্‌গ্যাং নামক একটা পার্ব্বত্য গ্রামে আসিলাম। গ্রামটা বেশ বড় প্রায় ত্রিশখানি বাড়ী আছে। এখানে একটি গোম্‌-পা বা গুম্ফা দেখিলাম। গোম্‌পাটি গ্রাম হইতে প্রায় ৫০০ ফিট উচ্চে হইবে। এই গোম্‌পার বা মঠের ভিতরে দশ বারোটি প্রকোষ্ঠ ছিল, তাহাতে কয়েকজন লামা বাস করিতেছিলেন। তাঁহারা শুধু ধর্ম্মপুস্তক পড়িয়া এবং মন্ত্র আওড়াইয়াই সময় কাটান। এই গ্রামটির নীচ দিয়া আমো নামক পার্ব্বত্য নদী বহিয়া যাইতেছে। ভূটানের দিক হইতে এই পার্ব্বত্য নদীটি বহিয়া আসিয়াছে এখানে লোকের তেমন বাস নাই, কেননা যায়গাটি অনুর্ব্বর। এই গ্রামে সামান্য রকমের কিছু কিছু আলুর চাষ হয়। আমরা দুই দিন মাত্র এইখানে ছিলাম।

 ১৬ই মে। আমরা ওখান হইতে আমো নদীর পারের পথ ধরিয়া চুম্‌বি আসিলাম। সিকিম এবং দৈন্‌জুঙ্গ নামক স্থানের রাজা গ্রীষ্মকালে এখানে বাস করেন। একটা চারিকোণ চত্বরে কয়েকটি তেতালা পাকাবাড়ী। তাহার চারিদিকে লাল পাথরের প্রাচীর। দুইটি বড় বড় দরজা আছে। একটি উত্তর দিকে অন্যটি দক্ষিণ দিকে। চুম্‌বিতে নদীর উপর একটি কাঠের পুল আছে। পুলটি ৪০ ফিট লম্বা হইবে। চুম্‌বি হইতে তিন মাইল উত্তর-পশ্চিম-কোণে দুইটি নদীর সঙ্গমস্থল। একটি আসিয়াছে উত্তর-পশ্চিম দিকের পর্ব্বতশ্রেণীর মধ্য দিয়া অপরটী আসিয়াছে উত্তর-পূর্ব্ব দিক হইতে। এই দুই নদীর মিলিত সলিলধারাই আমো নদী নামে পরিচিত। আমরা নদী দুইটির সঙ্গমস্থলের শোভা দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলাম। সুন্দর দৃশ্য। দুই দিকে বিরাট পর্ব্বতশ্রেণী, শ্যামল চীর গাছের সারি। আর সেই পাহাড়ের দেওয়াল-ঘেরা পথের মধ্য দিয়া নদী বহিয়া যাইতেছে—কি তার প্রবল উচ্ছ্বাস!

 এই নদীর পথে চলিতে চলিতে একটি গ্রাম পাইলাম। গ্রামটির নাম গ্যালিঙ্গখা—ছোট গ্রাম, মাত্র চল্লিশখানি বাড়ী। নদীর ডাহিন দিকে রূপাখা নামক গ্রামে একটি গোম্‌পা আছে। সেই গোম্‌পার নাম—দোংক্যার। ১৮ই মে—আজ আমরা ফারি আসিলাম।

 ফারিতে একটী ছোট দুর্গ আছে। পাহাড়টী অন্যান্য পাহাড় হইতে বিচ্ছিন্ন। একটী মাত্র শৃঙ্গ। শৃঙ্গের উচ্চতা ১২০০ ফিটের বেশী হইবে না। দুর্গের নীচে—প্রায় ২০০ ফিট নীচেই বিস্তৃত শ্যামল প্রান্তর। দুর্গের নীচ হইতে উহা চারি মাইল পর্য্যন্ত বিস্তৃত; এ যায়গায় জ্বালানিকাঠ পাওয়া যায় না। একমাত্র গোময়ই জ্বালানিকাঠের পরিবর্ত্তে ব্যবহৃত হয়। এখাকার সমতল ভূমি হইতে এবং পাহাড়ের উপর হইতে তিব্বতীয়দের জেমো-লা-রি নামক পবিত্র গিরিশৃঙ্গ দেখা যায়। জেমো-লা-রি; চুমুলহারি নামে পরিচিত। ঐখানে ত্রিকোণমিতি জরিপ বিভাগের একটি অফিস আছে। এখান হইতে বারো মাইল দূরে চুচান্ নামে উৎস বা প্রস্রবণ অবস্থিত। এই প্রস্রবণের জলের রোগ নিবারণ করিবার শক্তি অসাধারণ বলিয়া খ্যাতি আছে। এখানকার স্থানীয় লোকেরা চিকিৎসকের ধার বড় একটা ধারে না। তাহারা কাহার কোনও পীড়া হইলে এখানকার এই প্রস্রবণের জলে স্নান করিয়া এবং জল পান করিয়াই রোগমুক্ত হয় বলিয়াই বিশ্বাস করে। অতি বড় দুরারোগ্য ব্যাধিও নাকি এই জলে সপ্তাহকাল মাত্র স্নান করিলেই নিরাময় হয়।

 এখানে দুইজন জংপো থাকেন। জংপো মানে দুর্গরক্ষক। ইঁহারা লাশা হইতে নিযুক্ত হন। তাঁহাদের কাজ, কর আদায় করা। পণ্যদ্রব্যের পরিমাণ ও মূল্যের অনুপাতে শতকরা দশ ভাগের এক ভাগ কর আদায় করিবার রীতি আছে! জংপোরা ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয়বিধ বিচার করেন। গঙ্গারামের কঠিন পীড়া হওয়ায় আমাদের এখানে প্রায় তিন মাস কাল থাকিতে হইয়াছিল।

 ১৬ই আগষ্ট—আজ ফারি ছাড়িয়া ছুটিয়া নামক স্থানে আসিলাম। এখান হইতে কয়েকটি ছোট ছোট পাহাড় উত্তীর্ণ হইয়া ১৭ই তারিখে তুনা গ্রামে আসিলাম। গ্রামটি ছোট, মাত্র দশ ঘর লোক এখানে বাস করে। সেখানে রাত্রি কাটাইয়া পরের দিন ১৮ই আগষ্ট কা-লা-সার গ্রামে আসিলাম। বেশ বড় গ্রাম। ষাটখানা বাড়ী। সারা পথে চাষবাসের কোনও চিহ্ন দেখি নাই, এখানে কিন্তু চাষবাস দেখা গেল। তুন গ্রামের ১৮ মাইল রাস্তার ঠিক ডান দিকে রাম বা বাম নামে একটি হ্রদ আছে। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি হইতে এই হ্রদের জল জমিয়া বরফে পরিণত হয়। নভেম্বর মাসে বরফ এমন কঠিন হয় যে জলের কোন গতিই আর থাকে না। ফেব্রুয়ারী মাসে কতক কতক অংশের বরফ গলিয়া যায়। কালাসহরের কাছাকাছি পশ্চিমদিকে আর একটি সুন্দর হ্রদ আছে, হ্রদটির নাম কালা। কালাসার গ্রামের লোকেরা এই হ্রদে আসিয়া মাছ ধরে। হ্রদটি তেমন গভীর নয়, কাজেই জাল দিয়া সহজেই মাছ ধরা যায়। ইহারা একরকমের জাল ব্যবহার করে, তাহা চারজনে টানিয়া তুলিতে হয়। এই জালে প্রচুর মাছ আসে। মাছ ধরিয়া ইহারা সূর্য্যের কিরণে শুকাইয়া লয়, তারপর বাজারে বিক্রয় করে। এই শুক্‌নো মাছ খুব বেশী পরিমাণে বিক্রয় হয়।

 আমরা ১৯শে আগষ্ট স্যামাডা নামক একটি ছোট গ্রামে আসিলাম। ড্যাগ্‌কারপো নামক গ্রাম হইতে স্যামাডা পর্য্যন্ত পথটুকু বড় সুন্দর। বিস্তৃত সমতল মাঠ, কোথাও চড়াই বা উৎরাই নাই। ২০শে আগষ্ট—আজ রাঙ্গিগো আসিলাম। পথে একটি উষ্ণ-প্রস্রবণ দেখিয়াছিলাম।

 ২১শে আগষ্ট গিয়াংৎসি আসিলাম। ছোট সহর। নিয়ং নদীর দক্ষিণ তীরে সহরটি অবস্থিত। পূর্ব্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি দুইটি পাহাড়ের উপর গিয়াংৎসি সহরটি শোভা পাইতেছে। পশ্চিম দিকের পর্ব্বতটির সহিত উত্তর দিকের একটি পর্ব্বতশ্রেণী সংযুক্ত রহিয়াছে। পূর্ব্বদিকের পর্ব্বতটি নীচের সমতল ভূমি হইতে ৩০০ ফিট উঁচু হইবে। এই পাহাড়টির উপর ফারির ন্যায় একটি বড় দুর্গ আর পশ্চিম দিকের পাহাড়টির উপর একটি গোম্‌পা আছে। সেই গোম্‌পাতে ৫০০ পাঁচ শত লামা বাস করেন। এই গোম্‌পাতে একটি চুরতান্ আছে। তিব্বতিয়েরা চুরতানকে বলে প্যানগোন্ চুরতান্। তাহাদের কাছে ইহা একটি প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান। চুরতান বলিতে কি বুঝায় তাহা বলিতেছি,—চুরতান্ বা চিয়োরতিন—এক রকমের রঙিন অট্টালিকা। কোনটি বড় হয় কোনটি বা ছোট হয়। মাঝখানকার বাড়ীটির উপরে সুবর্ণগোলক বা অর্দ্ধচন্দ্র শোভা পায়। এই মন্দিরের মধ্যে ধর্ম্মগ্রন্থ, মূর্ত্তি এবং বিভিন্ন দেবদেবীর পূজোপকরণ সজ্জিত থাকে।

 গিয়াংৎসি একটি বাণিজ্য-প্রধান স্থান। এখানে নাম্বা নামে একপ্রকার পশমি কাপড় তৈরি হয়। এখানকার বাজার বেশ বড়। নেপালি ও চীনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই এখানে স্থায়ীভাবে বাস করেন। আমাদের পণ্যদ্রব্যাদি বিনিময়ের জন্য এখানে প্রায় এক সপ্তাহ কাল ছিলাম। স্যামাডা হইতে গিয়াংসি পর্য্যন্ত পথটুকু আদবেই ভাল নয়। বন্ধুর এবং প্রন্তরাকীর্ণ

 ২৮শে আগষ্ট—আজ উপ্‌সি গ্রামে আসিলাম। এখানে চীনাদের একটি বড় রকমের গিয়াংখাং বা চৈনিক আবাস রহিয়াছে। গিয়াংৎসি হইতে এখানে আসিতে আমাদের কোনও ক্লেশ হয় নাই, কেননা পথটি বেশ ভাল ছিল। একেবারে সমতল, কাজেই পথ চলিতে কোনও ক্লেশ হয় নাই।

 ৩১শে অগষ্ট—আমরা ন্য্যাংকরৎসি নামক গ্রামে আসিলাম। ইহার কাছেই বিখ্যাত পাল্‌তি হ্রদ। আমি এ পর্য্যন্ত পথে কোথাও আর এত বড় হ্রদ দেখি নাই। এই হ্রদটির আকার কতকটা অশ্বখুরের মত। একটি ছোট পর্ব্বতকে ঘিরিয়া এই হ্রদটি শোভা পাইতেছে। পাহাড়ের উপর একটি দেব-মন্দির। মন্দিরটির নাম—দোরজি-ফ্যামো। শুনিলাম পাহাড়ের উপরে বসতি আছে। হ্রদের মধ্যে অনেক মাছ। এই হ্রদের মাছের লাশা সহরে খুব আদর। জমাট বরফের ছিদ্রপথে বর্শি দিয়া এই হ্রদের মাছ ধরিতে হয়!

 ১লা সেপ্টেম্বর—আজ রওয়ানা হইয়া আমরা দুই একটি গ্রামে বিশ্রাম করিয়া কাম্‌পাপরৎসি আসিলাম। পথে কায়রা নামে গিরিপথ উত্তীর্ণ হইতে হইয়াছিল। ৩রা সেপ্টেম্বর—আমরা স্যাম্পো বা ব্রহ্মপুত্র নদীর দক্ষিণ তীরে আসিলাম। আমরা চ্যাকসাম গ্রামের কাছাকাছি স্যাম্পো পার হইলাম। প্রস্তরাকীর্ণ দুর্গম পথ। নদীর পার অতি ভয়ঙ্কর। পুলটি অদ্ভুত রকমের। দুই দিকে দুইটি শক্ত ঝুলানো দড়ির সঙ্গে তক্তা বাঁধা। তক্তাগুলি ৩×১ ফুট লম্বা ও চওড়া হইবে। এগুলি লম্বালম্বিভাবে ঝুলানো দড়ির সঙ্গে বাঁধা বলিয়া একসঙ্গে একজনের বেশী লোক চলিতে পারে না। লোহার শিকল দুই দিকেই স্তূপীকৃত শিলা রাশির মধ্যে খুব শক্ত করিয়া প্রোথিত কাষ্ঠদণ্ডের সহিত বাঁধা বলিয়া স্থানচ্যুত হইবার সম্ভাবনা অতি অল্প। পুলটির দৈর্ঘ্য হইবে প্রায় ১০০ পা। এইভাবে ব্রহ্মপুত্র পার হইয়া ৪ঠা সেপ্টেম্বর—নেতাং আসিলাম। নেতাং কিচু নদীর দক্ষিণ পারে অবস্থিত। নদীটি প্রায় একশো পা চওড়া হইবে। ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর তারিখ লাশা বা নিষিদ্ধ নগরীতে পৌঁছিলাম। এখানে আমাদের সঙ্গে যা কিছু পণ্যদ্রব্য ছিল সব বেচিয়া ফেলিলাম এবং মোঙ্গোলিয়া যাত্রার আয়োজন করিতে লাগিলাম। জীবনে যে লাশা নগরী দেখিব বলিয়া কোন দিন ভাবি নাই, আজ তাহাই দেখিলাম।

লাশার কথা—মোঙ্গোলিয়া যাত্রা

 লাশাতে বেশ আরামে দিনগুলি কাটিতে লাগিল। মোঙ্গোলিয়ায় যাইবার সঙ্গী যাত্রীদলের অপেক্ষায় এখানে ছিলাম। একদিন শুনিলাম যে শীঘ্রই একটি দল মোঙ্গোলিয়ায় যাইবেন। আমি যেমন শুনিলাম, অমনি গার্পোনের বা সর্দ্দারের নিকট যাইয়া কবে কখন ঐ যাত্রীদল রওনা হইবে সে কথা জিজ্ঞাসা করিলাম। কিন্তু গার্পোন কোন খাঁটি সংবাদ দিলেন না। তিনি বলিলেন— সম্ভবতঃ ফেব্রুয়ারী মাসে ইহারা রওনা হইবে। আমি গার্পোনকে বলিলাম আমাকে দিন ও সময়টা ঠিক্ করিয়া বলিলে ভাল হয়। কিন্তু তিনি সে বিষয়ে কোনও উত্তর না দিয়া বলিলেন—“জানেন, কোন দিন তারিখ ঠিক করে বলা যেতে পারে না। পথে পদে পদে বিপদ, দস্যু-ডাকাতের ভয় অত্যন্ত বেশি। তারা সকল সময়ই খোঁজ করে কখন কোন যাত্রীদল লাশা ছেড়ে রওনা হয়েছে। ডাকাত-দলের ঐসব গুপ্তচরেরা দলের সর্দ্দারকে খবর দেয় এজন্য অনেক দলই নিরাপদে গন্তব্য স্থানে পৌঁছিতে পারে না।” তাঁহার কথা শুনিয়া অবস্থাটা বেশ ভাল করিয়াই বুঝিলাম!— অবশেষে নভেম্বর মাসে সর্দ্দার অন্য একদল বণিককে এবং আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। আমরা তাঁহার কাছে গেলে বলিলেন—আমার সঙ্গে যে সর্দ্দারের পরিচয় আছে তিনি শীঘ্রই মোঙ্গোলিয়া যাইতে পারেন কিন্তু তাঁহার লাশাতে ৫০০ তামিমাস কুশ বা কুর ১৫৬ ভারতীয় মুদ্রা ঋণ আছে। যদি আমরা তাহার সেই ঋণের টাকাটা লাশা ছাড়িবার পূর্ব্বে পরিশোধ করিয়া দিতে পারি তাহা হইলে তিনি আমাদের সঙ্গী হইতে পারেন। একথা শুনিয়া আমরা একটু চিন্তিত হইয়া পড়িলাম কিন্তু আর কোন উপায়ও ছিল না। একজন পাকা, অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে সঙ্গীরূপে না পাইলে এইরূপ দুর্গম পথের অভিযানে অগ্রসর হওয়াও সঙ্গত নয়। আমরা অগত্যা তাঁহার ঋণের টাকা শোধ করিয়া দিলাম। এইবার সর্দ্দার বলিলেন—আর তিন চার মাস পরে সে রওনা হইতে পারিবে, আমার অন্য কোন উপায় ছিল না, কাজেই লাশাতে তাহার যাত্রার দিনের জন্য অপেক্ষা করিতে হইল।

 আগষ্ট মাসে মোঙ্গোলিয়া হইতে একজন সওদাগর আসিলেন তাঁহার অর্দ্ধেক সঙ্গীদল শীঘ্রই মোঙ্গোলিয়ায় ফিরিয়া যাইবে। আমি তাঁহার কাছে আমার অভিপ্রায় বলা মাত্রই তিনি আমাকে তাঁহার সঙ্গী করিতে প্রস্তুত হইলেন। ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর লাশা আসিয়াছিলাম আর ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দের ১৭ই সেপ্টেম্বর লাশা ছাড়িয়া মোঙ্গোলিয়ার দিকে রওনা হইলাম।

 আমি যে এক বৎসর লাশায় ছিলাম সে সময়ে আমি মোঙ্গোলীয়দের ভাষা শিখিতেছিলাম। জুন, জুলাই মাসে বায়ুমান যন্ত্রের দ্বারা তিব্বতের বায়ুর অবস্থা সম্বন্ধে অনুসন্ধান করিতেছিলাম।

 এইবার লাশার কথা বলিব। লাশা সহরটির বেড় প্রায় ছয় মাইল হইবে। সহরের চারিদিকে উচ্চ পর্ব্বতশ্রেণী মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে, আর তার মাঝখানে একটী প্রায় সমতল ভূমির মধ্যে লাশা সহরটী অবস্থিত। যে নদীর দক্ষিণ তীরে সহরটী অবস্থিত তাহার নাম ‘কিচু’। সহরের মাঝখানে একটী উচ্চস্থানে ঝিয়ো নামে বিরাট মন্দির বিরাজিত। মন্দিরটী চতুষ্কোণ। মন্দিরের ছাদটী সোনার পাতে মোড়া। উহার ভিতর অনেক মূর্ত্তি আছে তবে দুইটি মূর্ত্তি প্রধান—একটীর নাম শাক্যমুনি এবং আরেকটীর নাম পালদেন্‌লামো বা ভারতের কালীমাতা। গল্প আছে শাক্যমুনি ভারতবর্ষ হইতে এখানে বেড়াইতে আসিয়াছিলেন। মূর্ত্তি দুইটীরই গায়ে নানা অলঙ্কার। সোনা ও মূল্যবান প্রস্তর দ্বারা অলঙ্কার সব তৈরি। এই মন্দিরের কাছে বিচারালয়, থানা এবং ধনাগার। মন্দির এবং এই সব অফিস আদালতের চারিদিক বেড়িয়া একটী প্রশস্ত রাজপথ—চওড়া প্রায় ৩০ ফিট! এই রাস্তার দুই ধারে তিব্বতের চীনের, নেপালের, কাশ্মীরের এবং আজীমাবাদের (পাটনার) সওদাগরদের নানা দোকান-পাট। এখানে ভানাগশীয়, তুম্‌শীকাং এবং রামোচী নামক এই তিনটী রাস্তায় বিদেশী সওদাগরেরা আসিয়া বাস করেন। ওয়াংদুশিগা নামে একটী প্রকাণ্ড চত্ত্বরে বা চকের মত স্থানে প্রতিদিন সকালে বাজার মিলে। বাজারে সকল প্রকার জিনিষ-পত্রই পাওয়া যায়।

 সহরের পশ্চিম দিকে একটী পাহাড়ের উপর লাশার মেডিক্যাল স্কুল অবস্থিত। উহার নাম চিয়াক্‌পোরি। এখানে ৩০০ দাবা বা ছাত্রকে পড়িতে দেখিলাম। এখানে পড়ার সময়ের কোন ঠিক নাই কিন্তু তাহাদের পড়াশুনা শেষ হইলেই চাকরী পায়। এই চাকরী প্রধান শিক্ষকের অনুরোধে কিংবা নিজেদের চেষ্টা যত্নে ছাত্রেরা যোগাড় করিয়া নেয়। এই বিদ্যালয়ে নানারকম ঔষধপত্র রাজা রাজকর্ম্মচারীদের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকে। স্কুলের উত্তর দিকে পাহাড়ের নীচে রাজার বাড়ী। রাজাকে তিব্বতীয়েরা বলে গিয়ালবো। রাজবাড়ীর উত্তর-পূর্ব্ব দিকে একটি বৃহৎ দুর্গ অবস্থিত। একটী স্বতন্ত্র ও উন্নত পর্ব্বতশিখরের উপর পোটালা বা চাই নামে একটী প্রাসাদ আছে। ঘুরাণো সিঁড়ি বাহিয়া উহার উপরে উঠিতে হয়। এইখানে তীব্বতীয়দের সর্ব্বপ্রধান ধর্ম্মগুরু লামা বা কিয়ামকুংরিংবোচি লামাই হইতেছেন তিব্বতের সর্ব্বে-সর্ব্বা। তাঁহার মৃত্যু নাই। তিনি অমর, কেবল তাঁহার আত্মা এক দেহ ছাড়িয়া অন্য দেই অবলম্বন করে মাত্র। অর্থাৎ তাঁহার মৃত্যু অর্থে কায়া পরিবর্ত্তন। যখন তাঁহার মৃত্যু হয় তখন তাঁহার মৃতদেহ একটা কফিনের ভিতর পুরিয়া কয়েকদিন রাখিয়া তবে সমাধি দেওয়া হয় এবং তাহার উপরে ধাতু-নির্ম্মিত একটা ফাঁপা স্তম্ভ দাঁড় করাইয়া রাখে। ঐ স্তম্ভটী সোনার পাতে মোড়া থাকে। এইরূপ স্তম্ভের নাম কুতাং, দেখিতে যেন একটী ছোটখাট চুরতান্।

 একজন লামার মৃত্যুর ঠিক্ এক বৎসর পরেই নূতন লামার আবির্ভাব হয়। তাঁহার আবির্ভাব, নানা অদ্ভুত অদ্ভুত কাহিনীতে পূর্ণ। যখন কোন পরিবারে বিশেষ লক্ষণযুক্ত নবীন শিশু লামার আবির্ভাব হয়, তখন সে সংবাদ শিশুর পিতামাতা নিকটবর্ত্তী রাজকর্ম্মচারীকে জানাইলে খুব জোর অনুসন্ধান চলে। কর্মচারীদের অনুসন্ধানে যখন সত্য সত্যই শিশুটিকে লামার গুণবিশিষ্ট বলিয়া মনে হয় তখন তাহারা সেই সংবাদ গিয়ালবো বা রাজাকে দেন। গিয়ালবো হইতেছেন লাশার বা তিব্বতের শাসন-সংরক্ষণের কর্ত্তা। তৎক্ষণাৎ মৃত লামার দাস-দাসী ও কর্ম্মচারীরা সেই বাড়ী ছুটিয়া আসেন, নানারূপ পরীক্ষা চলিতে থাকে। তাহাদের পরীক্ষার পর যদি শিশুটি সত্য সত্যই শুভ লক্ষণযুক্ত বলিয়া বিবেচিত হয়, তখন রাজ্যের প্রধান কর্ম্মচারীরা শিশুর জন্মস্থানে গমন করিয়া তাহাকে ও তাহার পিতামাতাকে সহরের কাছাকাছি একটি গোম্‌পাতে স্থানান্তরিত করেন। তারপর এক শুভদিনে বিশেষ ধুমধামের সহিত পোটালা দুর্গে আনা হয়। এই শিশু লামা বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে তাহার উপর রাজ্যের ধর্ম্মসংক্রান্ত ও বিবিধ বিচার ব্যবস্থার ভার দেওয়া হয়। যদি একটির অধিক সব-লক্ষণ প্রাপ্ত শিশুর কথা জানিতে পারা যায়, তাহা হইলে তখনই হয় মুস্কিল। সূর্ত্তি খেলিয়া ঠিক্ করিতে হয়।

 লাশা সহরের উত্তরে একটি অতি বৃহৎ চুরতান্ আছে। এই চুরতান্‌টির নাম গিয়াংবুংমোচি। গিয়াংবুংমোচি তিব্বতীয় বীর ছিলেন। তিনি একা (১০০,০০০ একলক্ষ) শত্রু নিধন করিয়া দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করিয়াছিলেন। এই শত্রু হইতেছে চীনারা। তাঁহার বীরত্বের স্মৃতিকে অমর করিয়া রাখিবার জন্য দেশবাসী এই চুরতানটি নির্মাণ করিয়াছেন। এই চুরতানের কাছে রাসোচি-ঝিয়ো নামে একটি দেবস্থান আছে।

 বৎসরের প্রথম দিন ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝামাঝি তিব্বতীয়দের নূতন বৎসর আরম্ভ হয়। তখন খুব উৎসব হইতে থাকে। সে সময়ে তিব্বতীয়েরা বিশ্বাস করেন যে সমুদয় দেবদেবীরা লাশাতে আসেন। তখন মস্ত বড় মেলা বসে। নানাস্থান হইতে লোক আসে। কেহ আসে দেবদর্শনে, কেহ বা আসে শুধু দর্শকরূপে তামাসা দেখিতে। সব দাবা এবং তাহাদের দলপতি লামারা লাশা আসেন। সকলে মিলিয়া দেশকে শত্রুর আক্রমণ হইতে সুরক্ষিত করিবার জন্য দেবতার নিকট প্রার্থনা করেন। ইহাদের আসা যাওয়া এবং খাদ্যাদির ব্যয়ভার রাজসরকার বহন করেন। এ-সময়ে সহরের শাসন-ভার গ্রহণ করে দ্রিফাং গোমপার লামা। তাঁহার ইচ্ছাই আইনে পরিণত হয়। তিনি যেরূপ ইচ্ছা এবং যাহাকে ইচ্ছা শাস্তি দিতে পারেন। ছোট ছোট অপরাধে গুরুতর শাস্তির বিধান হয়। এজন্য ভয়ে ভয়ে ধনী-বাসিন্দারা সহর ছাড়িয়া গ্রামে চলিয়া যান, পাছে সামান্য অপরাধের দায়ে পড়িয়া ধন, মান সমুদয় হারাইতে হয় এই ভয়ে। সহরের গরীব জনসাধারণ অবশ্য সহরেই থাকে। সাধারণতঃ সহরের লোকেরা নোংরাভাবে বাস করে, কিন্তু এ-সময় নূতন কাপড় পরে, বাড়ী-ঘরে চূণকাম করে, এই ভয়ে পাছে তাহাদের অপরিচ্ছন্নতার দরুন সাজা পাইতে হয়। সেংরাল, দ্রিফাংরা, গ্যালদেন্, গোম্‌পা প্রভৃতি মঠের লামারা যে কয়দিন সহরে বাস করেন, সে কয়দিন রাজসরকারের অর্থে কিংবা ধনীব্যক্তিদের অর্থ ব্যয়ে তাঁহাদের সব ব্যয় নির্ব্বাহ হয়।

নববর্ষের উৎসব

 নববর্ষের দ্বিতীয় দিবসেও এক প্রকার খেলা প্রদর্শিত হয়। তাহার পনেরো দিন পরে, চিয়াঙ্গা চিঙ্গোপো চিয়াপো নামে একটি উৎসব সম্পন্ন হইয়া থাকে।

 পরের মাসে আর একটি উৎসব হয়। সেই উৎসবের নাম চোংজু সৈওয়াং। এ-সময়ে লামা গ্রাম হইতে একজন তিব্বতীয়কে ডাকিয়া পাঠান। তাহার মুখের একদিকে কালো অপর দিকে সাদা রং মাখানো হয় যেমন আমাদের দেশে চূণ-কালি মাখানোর কথা শুনা যায়। এইরূপ সাদা-কালো রং মাখাইয়া পরে তাহাকে চামড়ার একটা জামা পরানো হয়। তারপর তাকে সহর হইতে স্যামেই নামে একটি গ্রামে পাঠান হয়। এই স্যামেই বা সেতাং নামক স্থানে তাঁহার প্রায় এক বৎসর থাকিতে হয়। সেখানকার একটি গোম্‌পায় তাহার সাতদিন বাস করিবার রীতি। সেই গোম্‌পার নাম মৃত্যু-তোরণ। ঐ গোম্পা বা গোম্ফার ভিতর অজগর সাপের খোলস এবং বন্যজন্তুর চর্ম্ম এবং নানা ভীষণাকার রাক্ষস ও দৈত্যের মূর্ত্তি থাকে। এমন ভাবে সেই ভীষণ গুহাটি ভয়াবহ জীবজন্তুর মৃতদেহে ও বিবিধ মূর্ত্তিতে পূর্ণ থাকে যে একটা ঐরূপ গুহার মধ্যে এক সপ্তাহ কাল বাস করা বস্তুতঃই বিপজ্জনক। এই সাতদিন কিন্তু এই লোকটির থাকে অসাধারণ ক্ষমতা। সে যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারে। এ-সময়ে লামাদের কাছ হইতেই প্রচুর ভিক্ষা মিলে। কেননা সে যে দেশের মঙ্গলের জন্য জীবন দিতে পারে, তাহার এই সাহসিকতার দৃষ্টান্ত হইতেই যে তাহা সপ্রমাণ হয়। পূর্ব্বে এই সব কার্য্যে যাহারা নিয়োজিত হইত, তাহাদের অনেকেরই মৃত্যু হইত, এখন আর তাহা হয় না। নির্দ্দিষ্ট সময়ের পরেই আবার সে ফিরিয়া আসে।

 তিব্বতের শাসন-বিধান এইরূপ: বড় লামা একজন গিয়ালবো (রাজা) ইনিও লামা। চারিজন কর্ম্মাধ্যক্ষ এবং পাঁচজন সদস্য লইয়া তাঁহার শাসন-পরিষদ গঠিত। লামা হইতেছেন তিব্বতের সর্ব্বপ্রধান শাসনকর্ত্তা। বিশেষ দরকারি বিষয়ে তাঁহার পরামর্শ গ্রহণ করা হইয়া থাকে। যেমন আপীল ইত্যাদি। তাঁহার মীমাংসাই চরম সিদ্ধান্ত। গিয়ালবো হইতেছেন তাঁহার প্রধান মন্ত্রী; তার পরে কর্ম্মচারীরা প্রধান প্রধান লামাদের ভিতর হইতে নির্ব্বাচিত হইয়া থাকেন, ইহাদিগকে বলে লিঙ্গস্।

 সহরের আর একটি ব্যবস্থা বেশ ভাল। নানা দেশের লোকেরা ব্যবসায়-বাণিজ্যের জন্য ওখানে থাকে, কাজেই ঝগড়াবিবাদ, মারামারি, কাটাকাটি যে হইবে তাহাও ত স্বাভাবিক। এইরূপ স্থলে কে বিচার করিবে? প্রত্যেক দেশের লোকদের মধ্য হইতেই একজন সর্দ্দার নিযুক্ত করা হয়, সেই সর্দ্দারই নিজ নিজ দেশীয়দের মধ্যে কোনরূপ গোলমাল হইলে তাহার মীমাংসা করিয়া দেন। সহরের মধ্যে চুরি, ডাকাতি প্রায়ই লাগিয়া আছে। চোরেরা ও ডাকাতেরা চোরাই মাল নেপালী সওদাগরদের সাহায্যে সরাইয়া থাকে।

 অন্যান্য পাহাড়িয়া জাতীয়দের মত তিব্বতীয়দের আচার ব্যবহারও অনেকটা একপ্রকারের। এখানকার বিবাহের ব্যবস্থা ইত্যাদি অদ্ভুত রকমের। এক পরিবারের পাঁচ ভাই হয়ত একটি স্ত্রীলোককেই বিবাহ করিল। এখানে তিন রকমের বিবাহ প্রচলিত।

 তিব্বতে, তিন রকমের ভাষার ব্যবহার আছে। খাম-কাই বা খাম ভাষা, লাশার পূর্ব্বদিকের খামদেশের লোকেরা ব্যবহার করে বলিয়াই ইহার নাম হইয়াছে খাম। বোধ কাই ভাষা,—ই-ৎসঙ্গ দেশের লোকেরা ব্যবহার করে। দোয়াগকাই ভাষা ব্যবহার করে নাগরি, খোরশান্ প্রভৃতি অঞ্চলের অসভ্য যাযাবরেরা। লাশাতে বোধ্‌কাই ভাষারই সমধিক প্রচলন!

এই ভাষাই হইতেছে রাজভাষা বা সহুরে ভাষা। এই ভাষাতেই তিব্বতীয় ধর্ম্মগ্রন্থাদি লিখিত হইয়াছে।

 এ-দেশীয় লোকের প্রধান খাদ্য হইতেছে সাত্তু বা ভাজি, ভাত, মাছ, ছাগল ও অন্যান্য প্রাণীর মাংস। লোকে চা খুব বেশী পান করে। চাং নামে একপ্রকার পানীয় ইহাদের মধ্যে অত্যন্ত প্রিয়। বার্লি‌ বা ‘নির’ সঙ্গে নানারূপ মসলা মিশাইয়া এই পানীয় তৈরি করে এবং কয়েক দিন পর্য্যন্ত মাটির বড় বড় জালার ভিতর বদ্ধ করিয়া পরে উহা ব্যবহার করে। ইহা একপ্রকার উত্তেজক পানীয় বিশেষ।

 লাশার জলবায়ু খুব ভাল। কোনরূপ সংক্রামক ব্যাধির কথা ইহারা জানে না। সে প্রায় চল্লিশ বৎসর আগে ১৮৩৮-৩৯ খ্রীষ্টাব্দে একবার লাশাতে বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব হয়, তাহাতে অনেক লোকের মৃত্যু হইয়াছিল। এজন্য এখানকার লোকেরা বসন্ত রোগকে অত্যন্ত ভয়ের চক্ষে দেখে। তাহারা মনে করে এ পীড়ার কোন ঔষধ নাই, ইহার কোন চিকিৎসাও নাই। বসন্ত রোগের প্রতিষেধক টিকা দেওয়ার কথা ইহারা জানে না। যাহারা জানে তাহারাও বিদেশীয়দের কাছে টিকা লইতে অনিচ্ছুক।

 তিব্বতে, গম, (নি) সরিবা (নিকাং) দার্ভ (এক প্রকার শস্য) আলু, মূলা, গাজর প্রভৃতি জন্মে।

 তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম্ম প্রচলিত। এখানে দুই শ্রেণীর বৌদ্ধধর্ম্ম প্রবর্ত্তিত। একটির নাম নাংবা এবং অপরটির নাম চিবা বা বৈস্‌বু (গেন্‌বো)। নিংবাদের মধ্যে আবার নিংমা, সাকিয়া, গাবা, এবং গিলুপা নামে কয়েকটি শাখা-প্রশাখা আছে। লামাদের মৃতদেহ ব্যতীত সকলের শবই ধোতো নামক একটি পর্ব্বতের উপর লইয়া যায় এবং শব টুকরা টুকরা করিয়া কাটিয়া আত্মীয় স্বজনেরা চিল, শকুনি প্রভৃতির উদ্দেশ্যে ছুঁড়িয়া ফেলে।

 এখানে সম্ভ্রান্তবংশীয়দের পদমর্য্যাদা বংশানুক্রমিক। লাশাতে সান্‌দু, ফোটাং, দিউরিং, সেটা, ভান্দিশিয়া, রাগাশিয়া, লালু, টোক, পোটিখাংসা প্রভৃতি বহু সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাস।

মোঙ্গোলিয়া-যাত্রা

 ১৭ই সেপ্টেম্বর ১৮৭৯। আজ লাশা ছাড়িয়া মোঙ্গোলিয়ার দিকে রওয়ানা হ‍ইলাম। আমাদের যাত্রীদলে ছিলাম ১৫০ জন লোক। তাহাদের মধ্যে ষাট জন ছিল মোঙ্গোলিয়ার অধিবাসী স্ত্রী ও পুরুষ। আর বাকী সব তিব্বতীয়। আমরা ভারতীয় এক দলে ছয় জন। লাশার রামোচিঝিয়ো মন্দিরের তিনপোয়া মাইল দূরে একটি অতি সুন্দর বাগান আছে। বাগানটির নাম দাব্চিলিঙ্গা। বাগানটি দেখিবার মত বটে। আমরা বাগান ছাড়িয়া কতকটা দূরে আসিয়া একটি ছোট দুর্গ পাইলাম। এই দুর্গে কয়েকজন চীনা সৈনিক বাস করে। দুর্গের কাছেই কুচকাওয়াজের ময়দান। উহার নাম দ্যাবচি। এখানে প্রতি বৎসর দুইদিন তিব্বতীয় সৈনিকেরা রণ-কৌশল প্রদর্শন করিয়া থাকে। দ্যাবচি হইতে এক মাইল দূরে সেরং-রা-গোম্‌পা নামে একটি মঠ। এখানে প্রায় ৫,৫০০ দ্যাবা বাস করে। ইহাদের সর্ব্ববিধ ব্যয়-ভার লাশার রাজসরকার বহন করেন। এই স্থান হইতে দুই মাইল দূরে আমরা একটি ছোট নদী পার হইলাম। এই নদীটি পেন-পো-গো গিরিপথ হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছে। দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হইয়া নদীটি কিছুতে যাইয়া মিশিয়াছে। ইহার অতি কাছে প্যারিসাগা নামে একটি ছোট গ্রাম। মাত্র পাঁচখানি কুঁড়ে ঘর। আর পেন-পো-গো পাহাড়ের উপর কিচাং গোম্‌পা বা মন্দির।

 এই ভাবে আমরা ছোট ছোট নদী নালা পার হইয়া অবশেষে লিংবুজোঙ্গ নামে একটি ধ্বংসপ্রায় দুর্গের কাছে আসিলাম। সে রাত্রির মত সেখানেই বিশ্রাম করিলাম। এখানকার পথ বেশ ভাল। চার মাইল পর্য্যন্ত পথ ত খুবই ভাল ছিল। তার পরের পথটি ছিল প্রস্তরাকীর্ণ ও বন্ধুর কিন্তু ‘চড়াইতে’ তেমন কোন কষ্ট হয় নাই! এখানে ঘোড়া ও গোরুর খাদ্য ঘাস প্রচুর পরিমাণে মিলিয়াছিল।

 ১৮ই সেপ্টেম্বর। আজ পথ বড় বিশ্রী। খাড়া উঁচু পাহাড়! পথ নাই, কেবল পাথর আর পাথর। অতি কষ্টে দুই মাইল ‘চড়াই’ উঠিয়া পেন্‌লো-গা গিরিপথে আসিলাম। এই পর্ব্বতশ্রেণী পূর্ব্বমুখী চলিয়াছে। উচ্চতা হইবে ১৬,৩২০ ফিট। কোন গাছপালা নাই। পাহাড়গুলি একজাতীয় ছোট তৃণে ঢাকা। এই বন্ধুর পার্ব্বত্যপথ দিয়া আমরা প্রায়  / মাইল নামিয়া একটি নদীর পারে আসিলাম। নদীটি রাস্তাকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া বাঁ-দিকে বহিয়া গিয়াছে। আরও ৫ মাইল পথ চলিয়া আমরা অনেকটা নীচে একটা ছোট গ্রামে আসিলাম। গ্রামের নাম ব্যাঁয়া। গ্রাম হইতে প্রায়  / মাইল দূরে দুইটি মন্দির দেখিলাম। একটির নাম ল্যাঙ্গোটা গোম্‌পা অন্যটির নাম নালোন্দা গোম্‌পা। এখানে ১০০ জন দ্যাবা থাকেন।

 ব্যাঁয়া গ্রাম হইতে তিন মাইল দূরে ফেম্‌বু-চু নদী পার হইলাম। নদীটি মাত্র  / ফিট গভীর এবং পনেরো হাত চওড়া। পশ্চিম দিক্ হইতে বহিয়া আসিয়াছে। এখান হইতে প্রায় কুড়ি মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে কিছু নদীর সহিত মিলিয়া গিয়াছে। আমরা পথ ধরিয়া চলিতে চলিতে প্রায় তিন মাইল দূরে নদী পার হইয়া দেবুংসিগা নাইমর নামক গ্রামে আসিলাম। গ্রামে কুড়িখানি ঘর রহিয়াছে। আজ রাত্রি এখানেই ছিলাম। গ্রামটি বেশ সুন্দর। চাষ-বাস বেশ আছে। এখানকার কৃষকেরা উৎপন্ন দ্রব্যাদি লাশাতে বিক্রয় করে। কৃষিক্ষেত্রে জল-সেচনের জন্য ফেমবু চু এবং আরও ছোট ছোট নদী হইতে নালা কাটিয়া আনা হইয়াছে।

 ১৯শে সেপ্টেম্বর। আমরা ডেবুন্‌সিগা ছাড়িয়া নদীর কিনারায় কিনারায় উত্তরদিকে চলিতে চলিতে একটী গ্রামে আসিলাম। গ্রামটি ছোট। গ্রামে মাত্র পঞ্চাশ ঘর লোক আছে। এ-গ্রাম হইতে তিনপো মাইল দূরে একটি দুর্গ আছে,—দুর্গটির নাম লাংদাবজন্। এখানে দুইজন জঙ্গপো বাস করেন। ইঁহাদের উপর পেস্‌পোপট্টি হইতে পেনপো-গো পর্য্যন্ত যে গিরিপথ আছে তাহার রক্ষণাবেক্ষণের ভার আছে, আমরা এখান হইতে প্রায় আড়াই মাইল দূরে চা-গিরিপথের নিকট আসিলাম। আসিবার পথে প্রায় আধ মাইল উঁচুতে একটি পার্ব্বত্য নির্ঝরিণী দেখিতে পাইয়া ছিলাম। সেখান হইতে প্রায় তিন মাইল পথ আমাদের চড়াই উঠিতে হয়। এই পথ মোটেই ভাল ছিল না। আমরা অতি ভীষণ চড়াই উত্তীর্ণ হইয়া তবে চা-গিরিপথে আসিয়া পৌঁছিতে পারিয়াছিলাম।

 এই পর্ব্বতের উচ্চতা হইবে প্রায় ১৫৮৪০ ফিট। পর্ব্বতশ্রেণী পশ্চিমদিক হইতে আসিয়াছে। এইখানে আমরা কয়েকটি পার্ব্বত্য নদীর সাক্ষাৎ পাইয়াছিলাম। চা হইতে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে আসিয়া তালুংগোম্‌পা বা মাংতাঙ্গে আসিলাম। এইখানে তিব্বতের প্রসিদ্ধ লামা মারিংবোচি বাস করেন। প্রায় তিনশত লামাও এখানে থাকেন! রাস্তাঘাট প্রস্তরময়!

 ২০শে সেপ্টেম্বর। আমাদের তাঁবু যেখানে ছিল সেখান হইতে মাত্র ৩০০ পা দূরে তালুংচু নামে একটি নদী বহিয়া যাইতেছিল। নদীটি ৩০।৩৫ হাতের বেশী চওড়া নয়, গভীরতাও দুই হাতের বেশী হইবে না। তালুংচু উত্তর-পূর্ব্বমুখে প্রবাহিত হইয়া কীচু নদীর সহিত মিলিত হইয়াছে। এখান হইতে প্রায় ছয় মাইল দূরে ফোনডু নামক দুর্গ অবস্থিত। সেখানে পঞ্চাশখানি বাড়ী হইবে। এই দুর্গ, তিনটি নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। নদী তিনটিই বেশ খরস্রোতা।—ইহাদের নাম যথাক্রমে রোং, মিগি এবং তালুং। রোং বেশ বড় নদী, প্রায় ৪০ হাত চওড়া হইবে। ইহার আবার দুইটি শাখা নদী আছে, একটির নাম দ্যাম। এই নদীটি তিব্বতের দ্যাম্ জেলা হইতে বহিয়া আসিয়াছে। অন্যটির নাম লানি। লানি গিরিপথ দিয়া ইহা প্রবাহিত হইয়া আসিয়া ফোন্‌ডু দুর্গ হইতে প্রায় তিন মাইল দূরে দ্যাম নদীর সহিত মিলিত হইয়াছে। নিন্‌চিন্-থ্যাংলাহা পর্ব্বতশ্রেণী হইতে আর একটি নদী বহিয়া আসিয়াছে, এই নদীটি স্যাংগহাং জেলার মধ্য দিয়া অত্যন্ত বেগে প্রবাহিত হইয়া ভালুংচুর সহিত মিলিত হইয়াছে। দুর্গের কাছে এই তিনটী নদীর সঙ্গমস্থলের কিছু আগে একটী লোহার পুল আছে। পুলটী প্রায় ৮০ হাত লম্বা হইবে। বর্ষার সময় নৌকা ছাড়া নদী পারাপার চলে না। এখানকার নৌকা কাঠের কাঠামোর উপর চমরী গোরুর চামড়া দিয়া মুড়িয়া তৈয়ার করা হয়। আমরা দুর্গের কাছে পর্ব্বতের যে মাপ লইয়াছিলাম তাহা হইতে দেখা গেল যে সমুদ্র-সমতা হইতে উহার উচ্চতা ১৩,৩৪০ ফিট হইবে।

 আমরা এখান হইতে কেবলই চড়াই উঠিতে লাগিলাম। এই পথে, পথ বলিয়া কিছুই নাই—পাহাড়ের গায়ে গায়ে যে পথ চলিয়াছে তাহা গ্রামবাসীদের চলার জন্যই হইয়াছে। সেই পথেই প্রায়  / মাইল চড়াই উঠিয়া আমরা চ্যামচুনাং নামক গ্রামে আসিলাম। এই গ্রামটি যেন স্বপ্নরাজ্যের নিঝুমপুরী। কোন লোকজন নাই। নীরব নির্জ্জন পথ—এমন জনপ্রাণী-হীন কোন গ্রাম আর পূর্ব্বে বড় বেশী চোখে পড়ে নাই। গ্রামটী মিগি নদীর দক্ষিণ পারে অবস্থিত—ঘাস এবং জ্বালানী কাঠ এখানে খুব পাওয়া গেল—প্যাদাম্ নামে এক জাতীয় চীরতরু এখানে সংখ্যায় অনেক দেখিলাম। পথ যেমন বন্ধুর, তেমনি সঙ্কীর্ণ, তবে এখান হইতে অনেকটা আগে পথ বেশ চওড়া এবং সমতল পাইয়াছিলাম। নালুং জেলা চ্যা গিরিপথ হইতে ফোন্‌ডু দুর্গ পর্যন্ত বিস্তৃত। মিগি নদীর দক্ষিণ পারে দক্ষিণ পূর্ব্ব দিকে যে রাস্তা চলিয়া গিয়াছে এবং ফোন্‌ড়ু দুর্গ ও চ্যানচুনাং পর্য্যন্ত যে ভূভাগ তাহাকে বলে ফোন্‌ডু জেলা।

 ২১শে সেপ্টেম্বর। আজ আমরা আরও দূরে প্রায় দুই মাইল হইবে একটী ছোট গ্রামে আসিলাম। গ্রামটীর নাম চিওমু-ল্যাকাং। এখানে একটী ছোট মন্দির দেখিলাম,—মন্দিরটির নামও চিওমুল্যাকাং। এই ছোট গ্রামখানি মিগি নদী ও আর একটী অনামা নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত। এখান হইতে পাঁচ মাইল দূরে একটী খুব বড় গোম্‌-পা আছে—সেখানে প্রায় দুইশত জন দ্যাবা বাস করেন। আমরা এই পথে এই শেষ চাষবাস দেখিলাম। অনেক ছোট ছোট নদী ও নালা পার হইয়া তিন মাইল দূরে মোর্ণিও গিরিপথে আসিলাম। আমরা দেখিলাম স্ফুটনাঙ্ক ১৪,৯৬০ ফিটে দাড়াইয়াছে।

 এই গিরিপথটী আমাদের বেশ মনোরম মনে হইয়াছিল। যেমন সৌন্দর্য্য তেমনি চড়াই উৎরাইতে উঠিতে নামিতেও অসুবিধা ছিল না। আমরা এখান হইতে আধ মাইল দূরে লানিতেসাম নামক একটী গ্রামে রাত্রি কাটাইলাম। এইস্থানে দেখিলাম পাহাড়ের ঢালু গায়ে প্রায় পঞ্চাশটী তাঁবু খাটানো। একদল অসভ্য যাযাবর লোক আসিয়া এই গ্রামে আশ্রয় লইয়াছে। ট্যাসাম নামে লাশার একজন সরকারী কর্ম্মচারী এই যাযাবর জাতিদের গতিবিধি লক্ষ্য করেন। ইহাদের কাছ হইতে লাশা সহরে ঘোড়া এবং চমরী গোরু চালান দেওয়া হয়। ট্যাসাম তাঁহার কার্য্যের জন্য লাশার রাজসরকার হইতে কোনরূপ বেতন পান না। তাহার পরিবর্ত্তে তাঁহাকে কিছু জমি-জমা দেওয়া হয়। যাযাবরেরা এখানকার জমিতে নিজেদের চমরী গোরু এবং ঘোড়া, খচ্চর ইত্যাদি বিনা শুল্কে চরাইতে পারে। ট্যাসামের দায়িত্ব বড় কম নয়। যে সকল গোরু ও পণ্যদ্রব্যাদি এই পথে লাশা যাইবে, পথে যাহাতে উহাদের কোনরূপ দুর্ঘটনা না ঘটিতে পারে সে দায়িত্বটা সম্পূর্ণভাবে ইহাদের হস্তে ন্যস্ত রহিয়াছে। আমরা যাযাবর জাতিদের তাঁবুগুলি দেখিলাম। এক অদ্ভুত রকমের চমরী গোরুর কালো রঙের কর্কশ চামড়া দিয়া তাঁবুগুলি ছাওয়া। তবে বৃষ্টি বাদল এবং বরফের আক্রমণ হইতে এইগুলি নিরাপদ। এ সময়ে খুব বরফ পড়িতেছিল— চারিদিকের পাহাড়, পর্ব্বত এবং আমাদের তাঁবুর কাছটা প্রায় এক ফুট গভীর বরফে ঢাকিয়া গিয়াছিল। জ্বালানী কাঠ এবং পশুর খাদ্য পাওয়া দুরূহ হইয়াছিল

 ২২শে সেপ্টেম্বর। আজ আমরা লানিটেসাম হইতে লানি গিরিপথে আসিলাম। চড়াই  / মাইল, কিন্তু বেশ সহজ ছিল। গিরিপথের মধ্যে আমরা যে স্ফুটনাঙ্ক লইয়াছিলাম তাহা হইতে দেখা গেল এই স্থানের উচ্চতা ১৫, ৭৫০ ফিট। লানি গিরিবর্ত্ম অতি সুন্দর। এই পর্ব্বতশ্রেণী পূর্ব্ব দিক হইতে পশ্চিম দিকে চলিয়া গিয়াছে। পূর্ব্ব দিকে চাহিলে যে অপূর্ব্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখিতে পাওয়া যায় তাহা চোখে না দেখিলে ভাষায় বুঝাইয়া বলা যাইতে পারে না। অতি দূরে দূরে চিরস্থায়ী শুভ্র-তুষারমণ্ডিত গিরিশৃঙ্গগুলি শোভা পাইতেছে, তাহাদের দণ্ডে দণ্ডে রূপ পরিবর্ত্তন হইতেছে, তাহাতে চিত্তকে অপূর্ব্ব সৌন্দর্য্য-সাগরে ডুবাইয়া দেয়। একটা গিরিনদী এই গিরিপথ দিয়া দক্ষিণ দিকে নামিয়া গিয়াছে—তাহার চঞ্চল গতি এবং কোন কোন স্থানে জলপ্রপাতের সৃষ্টি, আমাদের মন আনন্দে অভিভূত করিয়াছিল।

 আমরা এখান হইতে দ্যামে চুচাম্‌ নামক স্থানে আসিলাম। এখানে একটা উষ্ণ প্রস্রবণ আছে। এখানকার লোকেরা প্রতি বৎসর দুইবার করিয়া এই প্রস্রবণের জলে স্নান করে। এই কুণ্ডটি ২১ ফিট লম্বা এবং দুই ফিট গভীর হইবে—সকল সময়ই উষ্ণ জলে পূর্ণ থাকে; এই কাঁচা কুণ্ডের ভিতর স্নানার্থীরা গলা পর্য্যন্ত ডুবাইয়া রাখে, কপাল দিয়া যখন ঘাম বাহির হইতে থাকে সে সময় তাহারা প্রস্রবণের জল হইতে উঠিয়া আসে এবং একটা মোটা কম্বলে সারা শরীরটা ঢাকিয়া কয়েক মিনিটের জন্য শুইয়া থাকে, তারপর তাহারা একপ্রকার দেশীয় উত্তেজক পানীয় কিংবা কিছু খাবার খায়। এই উষ্ণ প্রস্রবণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মাইল দূরে আরখোরসেন্ নামে এক গ্রামে তিনটী কাঁচা বাড়ী আছে। এ বাড়ী কয়টি পর্য্যটকদের ব্যবহারের জন্য, আর একটী খোরসেনের জন্য। এখানে “খোরসেন” কথাটার অর্থ বুঝাইয়া বলিতেছি। খোর বা খোরলো—খোরীয় শব্দটা ঢাকের মত একটা গোলাকার পদার্থকে বুঝায়। ঐটী কাগজের তৈয়ারী লাল রংএর খুব পাতলা চামড়া দিয়া মোড়া। তাহার গায়ে তিব্বতীয়দের মন্ত্র লেখা আছে। সেইটী হইতেছে ‘ওঁ মণি পদ্মে হুঁ’—এই অক্ষর কয়টী সোণালী রংএ কিংবা লাল রংএ খুব বড় বড় করিয়া লেখা থাকে। কাগজের বেড়ের গায়েও এই মন্ত্র লিখিত থাকে। ইহার ভিতর দিয়া একটী লৌহ শলাকা ফুড়িয়া দিয়া খাড়া করিয়া রাখা হয় এবং উহার সঙ্গে একটা দড়ি বাঁধিয়া দেওয়া হয় তারপর উহা ঘুরানো হইতে থাকে। ইহাদের বিশ্বাস এই খোর সর্ব্বদা ঘুরানো অবস্থায় রাখিতে পারিলে খুব পুণ্য হয়।

 আমরা এই স্থান হইতে খানিকটা উত্তর-পূর্ব্ব দিকে এবং খানিকটা দক্ষিণ-পূর্ব্ব দিকে যাইয়া দ্যাম্ উপত্যকায় আসিলাম। চারিদিকে বড় বড় পাহাড় সব মাথা উঁচু করিয়া আছে আর মধ্যখানে এই সুন্দর উপত্যকাটী অবস্থিত। ইহার দৈর্ঘ্য হইবে প্রায় ১৫ মাইল এবং চওড়াও হইবে প্রায় ৫ মাইল। ছোট একটী নদী নাম তার দ্যাম্, বিশ হাত চওড়া এবং ২ ফিট গভীর, কল্‌কল্ করিয়া এই উপত্যকার মধ্য দিয়া অশ্রান্ত গতিতে বহিয়া চলিয়াছে। এই নদীটি রোং নদীর একটী শাখা। আমাদের তাঁবুর কাছ হইতে তিন মাইল পশ্চিমে একখানি পাকা বাড়ী আছে। সেই বাড়ীতে চিগের অর্থাৎ দ্যাম্ উপত্যকার শাসনকর্ত্তা লম্বরদার মহাশয় বাস করেন। এখানেও যাযাবরদের প্রায় ২০০ কালো কালো তাঁবু দেখিলাম—ইহারা এখন গোরু, ঘোড়া, চমরু, ছাগল ইত্যাদি চরাইয়া বেড়াইতেছে। ইহাদের মধ্যে কেহ কেহ ব্যবসায়বাণিজ্যও করে। বল্ নামে এক প্রকারের সোডা এবং লবণ ইহারা তেংরীনোর হ্রদের তীর হইতে লইয়া আসে এবং তাহার বদলে লাশা হইতে কাপড় এবং খাদ্য শস্য লইয়া বাড়ী ফিরে। ইহা ছাড়া তাহারা চমরী গোরু, ছাগল, ভেড়া, টাটুঘোড়া, মাখন এই সকলের বিনিময়েও বেশ পয়সা রোজগার করে।

 আমাদের সঙ্গে এ-পর্য্যন্ত যে যাযাবরদের দেখা হইল তাহারা সকলেই তিব্বতীয়। দেখিতে খুবই বলিষ্ঠ, যুদ্ধ করিতে ভালবাসে,—ইহারা লাশা রাজসরকারের প্রজা। এই পার্ব্বত্য উপত্যকা পশুর চারণক্ষেত্ররূপে বিশেষ প্রসিদ্ধ। এখানকার যিনি প্রধান লামা তাঁহার তিনশত ঘোটকী আছে। এই ঘোটকীগুলি চীপোন্ নামে আস্তাবলের মালিক বা সহিসের অধীনে প্রতিপালিত হইতেছে। গ্রীষ্মকালে প্রত্যেক দিন ঘোটকীগুলির দুধ দোহান হয়। সেই দুধ হইতে এক প্রকার পানীয় প্রস্তুত হয়—এই উৎকৃষ্ট পানীয় বা মাদক দ্রব্য লামারা ব্যবহার করিতে পারেন। তাহাও সকল লামা পারেন না। একমাত্র প্রধান লামাই পারেন। এখান হইতে দুই দিনের পথ হইবে টেংরীনোর হ্রদ বা নাম হ্রদ। আর সেই হ্রদের তীর হইতে উত্তর দিকে দশ দিনের পথ চলিলে দেখিতে পাওয়া যায় নানা জাতীয় অসভ্য ও বর্ব্বর মানুষদের দেশ (Wild people) এই বন্য মানুষেরা দুর্গম গিরিশৃঙ্গে বাস করে। ইহাদের কাছে যাওয়া বড় নিরাপদ নয় আর সম্ভবপরও নয় বলিয়াই শুনিলাম। আমরা খোরসেনে দুই দিন ছিলাম। এই সুন্দর উপত্যকার উচ্চতা হইবে ১৪,৪৬০ ফিট, অক্ষাংশ ৩০° ৩০′ ৫৫″।

 ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৮৭৯। আজ আরখোরসেন্ ছাড়িলাম। চারি মাইল,  / এবং  / মাইল পথে একে একে চারিটী নদী পার হইলাম। এই নদী চারিটি দক্ষিণ-পশ্চিম দিক্ হইতে বহিয়া আসিয়াছে। সম্মুখেই চিয়োক্‌চি গিরিপথ। এই পথটির চড়াই তেমন কঠিন নহে। নামিতেও তেমন অসুবিধা হয় নাই। পথে এক জায়গায় চারটি অরক্ষিত “চূরতান্” দেখিয়াছিলাম। এই গিরিপথ দ্যাম জেলার উত্তর সীমায় অবস্থিত। ক্রমাগত ২৩ মাইল পথ চলিলাম। পথে লাইচু নদী পার হইয়াছিলাম। এই নদী টেঙ্গরি হ্রদ হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। ২৩ মাইলের কাছাকাছি আসিয়া দূরে পোটামোলাম গিরিশৃঙ্গ দেখিলাম। তাহার মাথায় চিরতুষার শ্রেণী শোভা পাইতেছে। পথ বেশ ভালই ছিল। আমরা লাইচু নদীর বাম তীরে রাত্রি কাটাইবার জন্য তাঁবু গাড়িলাম।

২৬শে সেপ্টেম্বর।—আজ চব্বিশ মাইল পথ চলিলাম। পথে মিগি নদী পার হইতে হইল। জলের গভীরতা  / ফিট, নদীর চওড়া হইবে ৫০ হাত। উত্তর দিক্ হইতে এই নদীটি বহিয়া আসিয়াছে। এই পথে খান্‌সা নামে একটি চিরতুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গ দেখিয়াছিলাম। আমরা নদীর তীরে তৃণাচ্ছাদিত ভূমিতে তাঁবু ফেলিলাম। অদূরে একটি গিরিবর্ত্ম। কাছাকাছি নানা বিভিন্ন দেশের অধিবাসীদের তাঁবুও পড়িয়াছে।

 ২৭শে সেপ্টেম্বর। আমরা আজ বেশ সমতল ও প্রশস্ত পথ ধরিয়া ১৯ / মাইল পথ আসিলাম। ইউ নামে একটি নদী পার হইলাম। এই সুন্দর নদীটী আমরা যে পথ ধরিয়া চলিয়াছিলাম, সেই পথ হইতে অল্প কিছু দূরের একটী হ্রদ হইতে জন্মলাভ করিয়াছে। ইউ নদী খানিকটা উত্তরাভিমুখে চলিয়া গিয়া নাগচু বা নাগা নদীর সহিত মিলিত হইয়াছে। নদীর তীর হইতে চারি মাইল দূরে ইউ গিরিপথ। যে হ্রদ হইতে নদীর উৎপত্তি, শুনিলাম সেই হ্রদটির বেড় হইবে প্রায় ৩২ মাইল, এবং চওড়া হইবে ৮ মাইল। আমরা কিন্তু এই হ্রদটি দেখিবার সুযোগ করিয়া উঠিতে পারি নাই। এখান হইতেও দুইটি চিরতুষারাবৃত পর্ব্বতশৃঙ্গ দেখিলাম। একটির দূরত্ব এস্থান হইতে প্রায় ৩৭ মাইল, অপরটির দূরত্ব হইবে প্রায় ৪০ মাইল।

 ২৮শে সেপ্টেম্বর।  / মাইল পথ চলিয়া একটা সোজা চড়াই পার হইলাম। সম্মুখে পড়িল খোরশেন্ গিরিবর্ত্ম। এই গিরিবর্ত্ম হইতেছে শাংসুং জেলার উত্তর সীমা। এখানে যাযাবর জাতির প্রায় ৫০০ শত তাঁবু পড়িয়াছে দেখিলাম। ১৪ / মাইল পথ পার হইলে পর আমরা নাগা নদী পার হইয়া তাহার বাঁ পারে আসিলাম। এখানে নদীর গভীরতা হইবে  / ফিট আর চওড়া হইবে ৪০ পা। এইবার আমরা নিরাপদে খোরশেনে আসিলাম। রাত্রি এখানেই কাটিল। এখান হইতে একটি পথ বরাবর শিনিফুং বা শিলং চলিয়া গিয়াছে। শিনিংফু চীনসম্রাজ্যের অন্তর্ভূত একটি বেশ বড় সহর। কোকোনার হ্রদ হইতে ঐ সহরের দূরত্ব হইবে প্রায় ৬০ মাইল। আমরা একটা ঘোরা পথে চলিলাম। আমাদের এ যাওয়ার উদ্দেশ্য শিয়াবদনে গোমপাতে পৌঁছান। কেননা আমাদের রসদ ফুরাইয়া আসিয়াছিল, ঐখান হইতে রসদাদি কিছু সংগ্রহ করিয়া লওয়ার প্রয়োজন।

 ২৯শে সেপ্টেম্বর। প্রায় পাঁচ মাইল পথ চলিয়া আমরা হোর জেলায় আসিলাম। এখান হইতে প্রায় এক মাইল দূরে শিয়ার-দেন গোমপায় আসিয়া পৌঁছিলাম। এই গোমপায় একশত জন দ্যাবা বাস করেন। গোমপার চারিদিকে প্রায় দেড়শত ঘর এবং তাঁবু দেখিলাম। এখানে জং-পোংএর থাকিবার জন্য বেশ বড় বাড়ী আছে। শিয়াবদীন গোমপা নাগচুখা জেলায় অবস্থিত। ঘাস এখানে প্রচুর মিলিল, এই জেলায় প্রায় তিন হাজার যাযাবরদের শিবির আছে। এখানে এমন কতকগুলি জাতি আছে, যাহাদের চুরি, ডাকাতি করাই হইতেছে ব্যবসায়।

 এখানে শীত খুব বেশী। ১,৪৯৩০ ফিট উচ্চ পর্ব্বতের অধিত্যকাদেশে এই গোমপা অবস্থিত। এখানে খাওয়া দাওয়ার জিনিষ পত্র বেশ পাওয়া যায়। তিব্বতদেশীয় রূপার টাকা এ অঞ্চলে চলে। এখানকার টাকা দুই প্রকারের হয়। একটির নাম “চ্যাঞ্জা পৌলাং”। চ্যাঞ্জা পৌলাং হইতেছে পুরানো রকমের টাকা। ইহার ওজন / তোলা। আর এক শ্রেণীর টাকার গায়ে শাসনকর্ত্তার নাম খোদিত। ওজন / তোলা। এই দুই রকমের টাকারই কিন্তু দাম সমান। ভারতীয় মুদ্রার ৷৵৹ আনার সমান। ইহার নাম “টঙ্কা”। টাকার বদলিতে টাকা খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিয়া দেওয়া হইয়া থাকে। ভারতীয় মুদ্রারও প্রচলন গাছে। আমরা শিয়াবদীন গোম্‌পায় তিন দিন কাটাইয়াছিলাম।

 ২রা অক্টোবর। শিয়াবদীন গোম্‌পা হইতে পাঁচ মাইল দূরে থাইগার লা গিরিপথ পাইলাম। আমাদের এই পথে চলিতে তেমন ক্লেশ হয় নাই। এই গিরিপথের দুই মাইল উত্তরে মোরা নামে একটি হ্রদ অবস্থিত। হ্রদটির দৈর্ঘ্য ২ মাইল এবং চওড়া  / মাইল! এই হ্রদের চারিদিকের সমতল ভূমিতে বর্ব্বর যাযাবর জাতিদের বাস। হ্রদের পূর্ব্ব দিক্ দিয়া একটা রাস্তা ত্যা-চিয়েং-লু চলিয়া গিয়াছে। ঐখানে মস্ত বড় চায়ের বাজার। আমরা এই গিরিপথ হইতে একটু দূরে সরিয়া রাত্রি কাটাইলাম।

দস্যু-ভয়

 ৩রা অক্টোবর।  / মাইল পথ চলিয়া আমরা নির্ব্বিঘ্নে খোরশেনে আসিলাম। আমরা এখানে আসিয়া শুনিলাম জামা জেলা হইতে একদল অশ্বারোহী দস্যুদল তেঙ্গরিনোর হ্রদের দিক হইতে লুঠতরাজ করিয়া এদিকে আসিতেছে। তাহাদের সঙ্গে ১০০ শত টাট্টু ঘোড়া, ৩০০ শত চমরী গোরু, ৫,০০০ হাজার ভেড়া ও ছাগল রহিয়াছে। আমরা এই দুর্দ্দান্ত পার্ব্বতীয় দস্যুদের হাত হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য তাহাদের নির্দ্দিষ্ট গন্তব্য পথ হইতে দূরে থাকিবার জন্য তাড়াতাড়ি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হইলাম। প্রায় দুই মাইল পথ অতি দ্রুত চলিয়া আমরা একটি মোঙ্গোলিয় বাণিজ্যযাত্রঈ দলের কাছে আসিলাম। আমরা পূর্ব্বে এই দলের সহযাত্রী ছিলাম। ইহারা পশুচারণের জন্য পশ্চাতে পড়িয়াছিলেন। দস্যুদল চলিয়া গেলে পর পুনরায় বেলা চারিটার সময় আমাদের যাত্রা শুরু হইল। প্রায়  / মাইল পথ চলিয়া সোজা পথ পরিলাম। সে পথেও প্রায়  / মাইল চলিয়া আমরা একটী পাহাড়ের পায়ের তলায় আসিলাম। এখান হইতে প্রায় ৪০ মাইল দূরে বোরাটিং ৯৮ / তে সুতোদাম পারাবজ্ নামে একটি তুষারাবৃত পর্ব্বতশৃঙ্গ দেখিতে পাইলাম।

 ৪ঠা অক্টোবর। প্রায় পাঁচ মাইল পথ চলিয়া একটি নদী পার হইলাম। নদীটির গভীরতা  / ফিট, চওড়া মাত্র ১২ পা। উত্তর-পশ্চিম দিক হইতে বহিয়া আসিয়াছে।  / মাইল দূরে আমরা ত্যাৎস্যং গিরিবর্ত্ম পার হইলাম। এই গিরিবর্ত্মটী নাগচুখা এবং জামা জেলার সীমা নির্দ্দেশ করিতেছে। জামাতে প্রায় ১,৫০০ যাযাবরদের শিবির রহিয়াছে। এই জেলার শাসনকর্ত্তা হইতেছে চীনা আম্‌বান্‌রা। উহারা সিনিংফুতে থাকে।

 ৫ই অক্টোবর জিয়ারোতে আসিলাম। এখানকার উচ্চতা ১৪,৫৪০ ফিট।

বর্ব্বরের দেশে

 ৬ই, ৭ই অক্টোবর। ক্রমাগত চলিতে চলিতে ৮ই অক্টোবর ট্যাঙ্গি পর্ব্বতশ্রেণীর কাছে আসিলাম। এখান হইতে নিকটে ও দূরে চিরতুষারাবৃত কয়েকটা পর্ব্বতশৃঙ্গ দেখিতে পাইলাম। আমরা অতি কষ্টে ট্যাঙ্গা গিরিপথ দিয়া চলিতে লাগিলাম। পথটি প্রায় দুই ফিট্‌ গভীর বরফে ঢাকা ছিল। সম্ভবতঃ পূর্ব্বদিন রাত্রিকালে বরফ পড়িয়া এইরূপ অবস্থা হইয়াছে। ট্যাঙ্গা পর্ব্বতশ্রেণী বিশেষ দীর্ঘ। পশ্চিম দিক্ হইতে পূর্ব্ব দিকে বিস্তৃত রহিয়াছে। এবং এই গিরিশ্রেণীর গায়ে অনেক চিরতুষারাবৃত পর্ব্বতশৃঙ্গ দেখিতে পাওয়া যায়। জাগরা জেলার ইহা উত্তর সীমা। এ অঞ্চলে প্রায় ১,০০০ হাজার যাযাবরদের শিবির আছে।

 ট্যাঙ্গা গিরিবর্ত্ম হইতে প্রায় ১০০ একশত মাইল দূরে আম্‌দো জেলা। ঐখানে মাঝে মাঝে পার্ব্বত্য অসভ্য যাযাবরেরা বাস করে। কিন্তু উত্তর ও পশ্চিম প্রদেশে এক অসভ্য ও বর্ব্বর জাতীয় লোকের বাস। ইহারা কাপড় পরিতে জানে না! পশু-চর্ম্ম পরিধান করে। এই বন্য মানুষেরা বন্যপশু শিকার করিয়া তাহারই কাঁচা মাংস খায় এবং তাহারই চর্ম্ম পরিধান করে। সময় সময় আগুনে মাংস একটু মাত্র ঝলসাইয়া পরম তৃপ্তির সহিত ভোজন করিয়া থাকে। তাহারা শাক্‌সব্জী খায় না। রাঁধা জিনিষ খাইতে দিলেও খায় না, উহা খাইলে তাহারা অসুস্থ হইয়া পড়ে। ইহাদের আকৃতি অতি ভীষণ। এই অসভ্যেরা চামড়ার তৈরি তাঁবুতে বাস করে।

 দাম এবং জাগরা জেলার লোকেরা মোটামুটি মাংস ও সাত্তু খাইয়া জীবন ধারণ করে। এ অঞ্চলে গাছপালা কিছুই জন্মে না। চমরী গোরুর এবং বন্য পশুর শুষ্ক পুরীষই হইতেছে এখানকার একমাত্র অগ্নি জ্বালাইবার উপাদান। ঘাস এখানে প্রচুর মিলে। এই দেশের উত্তর দিকে জনমানবের বসতি নাই। এমন কি অতি বড় বর্ব্বর জাতীয় লোকেরাও সেখানে বাস করে না। স্ফুটনাঙ্ক দ্বারা গণনা করিয়া দেখিলাম এখানকার উচ্চতা হইতেছে ১৬,৩৮০ ফিট।

 এখানে অনেক বন্যজন্তুর বাস। তাহাদের মধ্যে ডোং, বন্য চমরী গোরু, একো-বন্য মৃগ। গোয়া-স্যামোয়ের আকৃতিবিশিষ্ট হরিণ, বন্য ছাগল, নেন্ বা বন্য পার্ব্বত্য ভেড়া, সিয়াঙ্ক ন্যাকড়ে বাঘ, হ্যাগি এক জাতীয় শৃগাল, ঈ,—বন্য বিড়াল, কিলুয়াং বুনো গাধা।

 রিগোং—খরগোষ। আবোরা ল্যাজবিহীন ইন্দুর, ডেমো ধূসর ভল্লুক। ডেমোর আবার অন্য একটি জাতি আছে তাহার নাম মাইড্। ইহাদের পা দুইটি ঠিক্ মানুষের মত। এই জাতীয় ভালুকেরা ভয়ানক হিংস্র হইয়া থাকে। অনেক সময় ইহাদিগকে মানুষের মত সোজা হইয়া চলিতে দেখা যায় এবং ঐভাবে সোজা হইয়া মানুষের মত পথ চলিয়া মানুষকে কাছে পাইলেই আক্রমণ করে। রাত্রিকালে এই দুর্গম স্থানে তিন ফিট গভীর বরফ পড়িয়াছিল। এই যায়গাটি ছিল অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল। বন্য-পশুর আক্রমণের ভয়ও যেমন, তেমনি দস্যু-ডাকাতদের আক্রমণের আশঙ্কাও বড় একটা কম ছিল না। এই জন্য আমরা দশজন, দশজন করিয়া এক একটি দল বাঁধিয়া সারা রাত্রি পাহারা দিয়াছিলাম।

 ৯ই অক্টোবর। আমরা আবার যাত্রা আরম্ভ করিলাম। মাত্র ছয় মাইল পথ গিয়াছি, এইরূপ সময়ে একদল অশ্বারোহী দস্যুর সঙ্গে পথে সাক্ষাৎ হইল। তাহারা সংখ্যায় ছিল মাত্র পাঁচজন। দস্যু কয়জন আমাদের কাছে আসিয়া পড়িলে আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহারা কোথা হইতে আসিয়াছে? দস্যুরা বলিল যে তাহারা জাগরা অঞ্চল হইতে আসিতেছে। এই দস্যুদল আমাদের সঙ্গীয় পশুদল অপহরণ করিবার জন্য অনেক দূর পর্য্যন্ত অনুসরণ করিল, কিন্তু তাহারা আমাদের সতর্কতার জন্য কৃতকার্য্য হইতে পারিল না। তারপর তাহারা ব্যর্থমনোরথ হইয়া অন্য দিকে চলিয়া গেল।

 আমরা প্রায় পনেরো মাইল পথ চলিয়া একটি হ্রদের কাছে আসিলাম। হ্রদটির বেড় হইবে প্রায় ৭ মাইল। আমরা হ্রদের কাছ দিয়াই চলিলাম। হ্রদের বুকে সুন্দর স্বচ্ছ নীল জল, ঢল ঢল করিতেছে। হ্রদের নিকট হইতে আমাদের প্রায় দুই মাইল অন্তর দিয়া  / মাইল পথের পর একটি গিরিপথ উত্তীর্ণ হইতে হইল। এ পর্য্যন্ত অনেকটা সমতল পথ দিয়া চলিতেছিলাম, ক্রমে পথটি উচ্চ হইতে হইতে দিব্য অল্প একটু ‘চড়াই’য়ে পরিণত হইল। একটু উঠিয়াই অপর একটি গিরিবর্ত্ম পার হইলাম। এইবার কিন্‌হাপচিগা নামক স্থানে আসিলাম। আমরা এখানে রাত্রির জন্য আশ্রয় গ্রহণ করিলাম।

 পরদিন সূর্য্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই যাত্রা করিলাম। ১০ই তারিখ ১৪ / মাইল পথ হাঁটিয়া সেদিনের মত বিশ্রামের ব্যবস্থা করিলাম। এখানকার দৃশ্য ছিল পরম রমণীয়। মাত্র চব্বিশ মাইল দূরে দুইটি চিরতুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গ অপূর্ব্ব সৌন্দর্য্য বুকে লইয়া দাঁড়াইয়াছিল। কি সুন্দর দৃশ্য! আকাশ ছিল নির্ম্মল নীল। চারিদিকের বিস্তৃত সৌন্দর্য্যের মধ্যে এখানকার গিরিশৃঙ্গগুলি আমাদিগকে আকর্ষণ করিতেছিল।

লবণের নদী

 ১১ই অক্টোবর, ১৮৭৯। সাড়ে চারি মাইল মাত্র পথ চলিয়াই একটি ছোট নদী পার হইলাম। নদীটির নাম দি-চূ বা থোক্‌থো। নদীটির কাছেই একটি ছোট সুন্দর হ্রদ। হ্রদের জল যেমন স্বচ্ছ তেমনি মিষ্টি। আমরা এই হ্রদের তীরে রাত্রি কাটাইলাম। এখানে আসিয়া আর কোন দিকেই পথ পাইতেছিলাম না। এ সময়ে আমাদের অভিযাত্রীদলকে কয়েকজন মোঙ্গোলীয় পথ-প্রদর্শক পথ দেখাইয়া লইয়া চলিল। তাহারা এক একটি গিরিশৃঙ্গ দেখিয়া কোন্ দিকে কোন্ পথে অগ্রসর হইতে হইবে তাহা চিনিতে পারিয়াছিল।

 ১১ই অক্টোবর। আড়াই মাইল মাত্র পথ চলিয়া আসিবার পরই আমরা প্রায় ষোল মাইল দূরে দুইটি তুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গ দেখিতে পাইলাম। অতি চমৎকার দৃশ্য। নীল আকাশের গায়ে ধবল-তুষার-বিমণ্ডিত গিরিশৃঙ্গের শোভন সৌন্দর্য্য না দেখিলে বুঝাইয়া বলা যাইতে পারে না। পর্ব্বত শৃঙ্গ দুইটির মনোরম শোভা দেখিতে দেখিতে চলিলাম। কিছু দূর যাইয়াই ম্যারাস্ নদীর সাক্ষাৎ মিলিল। এই নদীটি টেঙ্গরিনোর হ্রদ হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছে এবং চীনদেশের বহুস্থানকে উর্ব্বর করিয়া বহিয়া চলিয়াছে। এই নদীটি এখানে সপ্ত শাখায় বিভক্ত হইয়া সাত দিকে বহিয়া গিয়াছে। প্রত্যেকটি শাখাই ৪০ হাতের বেশী চওড়া হইবে না। এই বৃহত্তম নদীটি তাহার মধ্যস্থ দ্বীপ ইত্যাদি সহকারে ৮০০ পায়ের বেশী প্রশস্ত হইবে। তবে গভীরতা তেমন বেশী নাই। তিন ফিটের অধিক গভীরতা কোথাও নাই। শাখা নদীগুলির তীর কর্দ্দমময়। আমাদের একটা ঘোড়ার নদী পার হইবার সময় বুক পর্য্যন্ত ডুবিয়া গিয়াছিল। কোনরূপে আমরা তাহাকে উদ্ধার করিতে পারিয়াছিলাম।

 নদীর পার একরকম কাঁটা-গুল্মে ঢাকা ছিল। তিব্বতীয়েরা ইহাদিগকে ‘তারু’ বলে। এই গুল্মগুলি এক ফুট পরিমাণ উঁচু হয়। নদীর পারেই জন্মিয়া থাকে। এই নদী এইখানে তিব্বত ও চীন সীমান্তরেখা নির্দ্দিষ্ট করিয়া দিয়াছে। আমরা উচ্চতার পরিমাণ করিলাম। স্ফুটনাঙ্কে দেখিলাম উচ্চতা হইবে ১৪,৬৬০ ফিট্‌। আমরা চলিতে চলিতে একটি গিরিপথ পাইলাম। এই পথটি বেশ একটু কঠিন চড়াই। গিরিবর্ত্মটি পার হইয়া পাঁচ মাইল পথ চলিয়া প্রায় ৩৭ মাইল দূরে আবার একটি তুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গ দেখিতে পাইলাম। আমরা বুখমাঙ্গনি নামক একটি স্থানে রাত্রির মত বিশ্রাম করিলাম। আমরা যতই নদীর বাঁ পার দিয়া চলিতেছি, ততই মিষ্টি জল আর পাইতেছি না। আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, এই পথের গিরিশৃঙ্গের উপর কিংবা সমতল ভূমিতে কোথাও গাছ-পালা কিছুই নাই। তবে একপ্রকার ঘাস জন্মে। চমরী গোরুর পুরীষই একমাত্র জ্বালানী কাঠের কাজ করে।

 ১৩ই অক্টোবর। আজ উলাঙ্গমিরস্ নামে একটি বড় নদী পার হইলাম। এখানে নদী প্রায় ১,২০০ হাত প্রশস্ত হইবে। গভীরতাও  / ফিটের ন্যূন নহে। উচ্চতাও হইবে ১৪,৬৪০ ফিট্‌ এখান হইতে আমরা কাগ্‌চিনার নামক স্থানে আসিয়া তাঁবু খাটাইলাম। এখানে অনেকগুলি সুমিষ্ট জলপূর্ণ কুণ্ড পাইলাম। আজ আমাদের পথটি ছিল অতি সুন্দর। দুই দিকে পর্ব্বতশ্রেণী দেয়ালের মত বহিয়া চলিয়াছে, আর সমতল ভূমির মধ্য দিয়া প্রশস্ত পথ।

 ১৪ই অক্টোবর। ১০ / মাইল পথ চলিয়া আমরা চ্যাচু নামক লবণের নদীর কাছে আসিলাম। এই নদীটি উত্তর-পশ্চিম দিক্ হইতে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত। আমরা এই পথে চলিতে চলিতে  / মাইল দূরে পুনরায় চ্যাচু নদী পার হইলাম। জল একেবারে লবণাক্ত, মুখে দেওয়া যায় না।

 নদীটি ১০ পায়ের বেশী চওড়া নয়, গভীরতাও তিন ফুটের অধিক নহে। এই নদীটি দুঙ্গাবুড়া পর্ব্বতশ্রেণী হইতে বহিয়া আসিয়াছে। এখান হইতে ১৭ মাইল দূরে একটা তুষারাবৃত-গিরিশৃঙ্গ দেখিতে পাওয়া যায়। আমরা এই পথে আরও  / মাইল অগ্রসর হইয়া দুঙ্গাবুড়া পাহাড়ের নীচে বিশ্রাম করিবার ব্যবস্থা করিলাম। এখানে প্রায় এক ফুট পরিমাণ বরফ পড়িয়াছিল। পথটী বেশ ভাল, সে কথা আগেই বলিয়াছি।

 ১৫ই অক্টোবর।  / মাইল পথ চলিয়া আমরা চাচু বা লবণের নদীর সহিত আর একটী নদীর সঙ্গমস্থলে পৌছিলাম। আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে নদীর সঙ্গমস্থলের জল বেশ সুস্বাদু। আমরা এখান হইতে ৭ মাইল মাত্র পথ চলিয়া দুঙ্গবুড়ান্যাডামো নামক স্থানে অবস্থান করিলাম। আমাদের এখানে দুই দিন থাকিতে হইয়াছিল, কেননা দুই রাত্রি ক্রমাগত বরফ পড়ায় পথঘাট সব ঢাকিয়া গিয়াছিল সেই জন্য পথঘাটের চিহ্ন একেবারে লুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। দুইদিন পরে বরফ পড়া একটু কমিলে পর পথের কিছু কিছু চিহ্ন দেখা গেল! কিন্তু সে পথ প্রস্তরাবৃত ও সংকীর্ণ ছিল।

 ১৭, ১৮ এবং ১৯শে অক্টোবর। এই তিন দিন ক্রমান্বয়ে পথ চলিয়া আমরা কোকোশিলি নামক স্থানে আসিয়া পৌঁছিলাম। এখানকার উচ্চতা হইবে প্রায় ১৩,৪৩০ ফিট। এ সময়ে দিনরাত্রি সমান ভাবে বরফ পড়িতেছিল। আমরা এখানে বাধ্য হইয়া দুই দিনের জন্য আট্‌কা পড়িয়া গেলাম। আমাদের সঙ্গীয় পশুগুলি বরফের জন্য বিশেষ কষ্ট পাইতেছিল। এজন্য আমাদের সহযাত্রী বণিকগণের সহিত অগ্রসর হইবার সুযোগ ছিল না। এখানে দস্যু-ডাকাতের উপদ্রব ছিল না সেজন্য আমরা এই দারুণ তুষারপাতের মধ্য দিয়া অগ্রসর হওয়া অপেক্ষা এক স্থানে অবস্থান করাই সঙ্গত মনে করিয়াছিলাম। তিনটী ঘোড়ার পীড়া হইয়াছিল—দুইটী বাঁচিয়া উঠিল, একটি মারা গেল।

 ২১শে অক্টোবর। সাত মাইল পথ চলিয়া আমরা একটা হ্রদের কাছে আসিলাম। হদের জল প্রায় অর্দ্ধেক পরিমাণ জমিয়া বরফ হইয়া গিয়াছিল, বাকী জলটা বেশ সুমিষ্টই ছিল। আমরা হ্রদের পারেই রাত্রিটা কাটাইয়া দিলাম।

 ২২শে অক্টোবর প্রায়  / মাইল পথ চলিতে চলিতে আমরা একটা ছোট হ্রদের ধারে আসিলাম। আমাদের সহিত এই হ্রদের তীরে একদল মোঙ্গোলীয় বণিকদলের সহিত সাক্ষাৎ হইল—তাহারা লাশা যাইতেছিল। এই দলে স্ত্রী পুরুষ প্রায় ১৫০ লোক ছিল। ৬০টি উট ও ১০০টি ঘোড়া ছিল। আমরা তাহাদিগকে আমাদের দলের কথা জিজ্ঞাসা করায় প্রথমে দেখে নাই বলিল, পরে থাকার করিল যে মাচু নদীর পারে তাহারা দলটি দেখিয়াছে, তবে উহা পশুপাল বলিয়া মনে করিয়াছিল। আমাদের কথা শুনিয়া তাহারা বলিল যে তাহা হইলে নিশ্চয়ই উহা বণিক্‌যাত্রীর দল হইবে।

 এই পথের একটা বিশেষত্ব এই দেখিলাম যে যাত্রীদল পরস্পরের প্রতি পরস্পর বিশেষ সহানুভূতিশীল! একদল অন্য এক বিপন্ন দলকে সর্ব্বদাই সাহায্য করিতে প্রস্তুত। আমাদের এই যাত্রীদল নানাভাবে সাহায্য করিতে আসিলেন। প্রচুর পরিমাণে খাদ্যদ্রব্যাদি দিতে চাহিলেন, আমরা ইঁহাদের নিকট হইতে মাত্র পাঁচ সের সাত্তু লইয়াছিলাম।

 বেলা প্রায় দ্বিপ্রহরের সময় মা-চু বা চুমার নদীর তীরে আসিলাম। হ্রদ হইতে ইহা মাত্র  / মাইল দূরে অবস্থিত। আমরা নদী পার হইবার জন্য খেয়া নৌকার খোঁজ করিতে লাগিলাম কিন্তু কোথাও তাহার সন্ধান মিলিল না।

 নদীটীর জল প্রায় আধাআধি জমিয়া বরফ হইয়া গিয়াছিল। তবে উহার উপর দিয়া মালপত্র, ঘোড়া ও লোকজন লইয়া পার হইবার মত বরফ কঠিন না হওয়ায় আমরা একটা চিন্তায় পড়িয়া গেলাম! কি ভাবে পার হইব তাহাই হইল চিন্তার বিষয়।

যাযাবরের দেশ

 আমরা ২৭শে অক্টোবর তারিখ, এগার মাইল দূরে যাইয়া নদী পার হইলাম। নদী পার হইয়া অল্প একটু পরেই আমাদের চড়াই উত্তীর্ণ হইতে হইল, এই পথটি ছিল প্রায় এক মাইল দীর্ঘ। এই ভাবে চলিতে চলিতে প্রায় আট মাইল দূরে একটি বেশ বড় পাহাড়ের কাছে আসিলাম, এই পাহাড়ের নীচে অনেকটা যায়গা জুড়িয়া সমতলক্ষেত্র। এখানে মোঙ্গোলিয় যাযাবরেরা বৎসরের অনেকটা সময় পশুচারণের জন্য আসিয়া বাস করে। এই জায়গাটির নাম আমথূন্। এই স্থানটীর শোভা অতি চমৎকার। দুইটী নদীর সঙ্গমস্থলে আমথূন অবস্থিত। একটি নদীর নাম নৈচিগোল।

 আমরা এখানে আজিকার মত তাঁবু গাড়িলাম। আজ আমাদের দিনটি নানা অসুবিধার মধ্য দিয়া কাটিয়া গেল। আমাদের সঙ্গে যে সকল ভারবাহী পশু ছিল তাহার কয়েকটি মারা যাওয়ায় আমাদের বাকী জিনিষপত্র অতি কষ্টে সঙ্গের অল্প সংখ্যক পশুগুলি বহন করিয়া আনিতেছিল। অর্দ্ধেকের বেশী জিনিষপত্র পশ্চাতে পড়িয়া ছিল। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের পূর্ব্বের পরিচিত একদল যাত্রীর সহিত সাক্ষাৎ হইল, তারা লাশা যাইতেছিল কিন্তু পথে অতিরিক্ত বরফ পড়ার জন্য অগ্রসর হইতে না পারায় ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইয়াছে।

 আমরা এখানে এক জাতীয় জ্বালানী কাঠ পাইলাম। এক অদ্ভুত ধরণের কাঁটা গাছ হইতে এই জ্বালানী কাঠ পাওয়া যায়, গাছগুলি ছয় ফিট উঁচু এবং সারা গা কাঁটায় ঢাকা। ঘাসও প্রচুর পাইয়াছিলাম। আমরা লাশা হইতে এতদিন পর্য্যন্ত উত্তর দিকে চলিয়াছিলাম, এইবার পূর্ব্ব দিকে চলিতে লাগিলাম।

 ২৮শে অক্টোবর। আমরা  / মাইল চলিয়া নৈচি নামক স্থানে আসিলাম। এখানে যাযাবরদের দশটি তাঁবু দেখিলাম। জাগরা হইতে নৈচি পর্য্যন্ত সারা দেশটায় কোথাও কোন লোকজনের বসতি নাই। মোঙ্গোলিয়দের তাঁবুর গড়ন একটু বিচিত্র রকমের।

 তাঁবুগুলির মাঝটা একটা গম্বুজের মত দেখায়, কাঠের কাঠামোর উপর তাঁবুগুলি সাজানো হইয়া থাকে। এই কাঠামো নানা ভাগে বিভক্ত থাকে। তাঁবুর ভিতরে একটি কামরা প্রস্তুত হয়। তাঁবু খুলিয়া ফেলিবার পর সেই কাঠামোর কাঠগুলি যখন সাজানো হয় তখন এক বোঝা লাঠির মত দেখায়। তাঁবুর উপরের দিকে মাঝখানটায় খানিকটা খোলা থাকে, সেই খোলা পথ দিয়া রান্না-বান্নার ধোঁয়া বাহির হইয়া যায়। তাঁবুর কাপড় এক রকমের কর্কশ পশমী জাতীয়। সেই কাপড়কে দ্বিংজ বা পিংজ বলে। তাঁবুর কাপড় কাঠের কাঠামোর সঙ্গে এমন শক্ত করিয়া বাঁধা থাকে যে উহা কোনরূপেই খুলিয়া যায় না।

 সব তাঁবুতেই বেশী কামরা থাকে না। যাহাদের অবস্থা বেশ ভাল তাহারাই তাঁবুর ভিতরটা কয়েকটা কামরায় ভাগ করিয়া নেয়। তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করিবারও মাত্র একটি দরজা বা কপাট। কাঠের তৈয়ারী অর্থাৎ টুকরা টুকরা কাঠের ফালি দড়ি দিয়া বাঁধা থাকে। মোঙ্গোলীয়রা তাঁবুর ভিতরেই রান্না-বান্না করে। পুরুষ ও স্ত্রীলোক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে সহ সব এক সঙ্গে থাকে। মাঝারি রকমের একটি তাঁবু তৈরি করিতে মাত্র বারো টাকা খরচ পড়ে।

নৈচি উপত্যকা

 এইবার নৈচি উপত্যকার কথা বলিতেছি। এই স্থানটি ত্যাচিনারি জেলার একটী মহকুমা। এই উপত্যকাটির দৈর্ঘ্য হইবে প্রায় পঞ্চাশ মাইল, চওড়া মাত্র তিন মাইল। চারিদিক বেড়িয়াই ছোট ছোট পাহাড়। কোন পাহাড়ের শৃঙ্গই বরফে ঢাকা নহে। এখানে বরফ পড়িলেও বরফ জমিয়া থাকে না, গলিয়া যায়। এই উপত্যকার মধ্য দিয়া নৈচি নদী বহিয়া চলিতেছে। এই নদীর শাখা বড় বেশী নাই। অনেকগুলি উৎস হইতে এবং ঝরণা হইতে ইহার জল আসে। জমি অধিকাংশই সমতল, তবে নদীর প্রবাহের দরুন কোথাও কোথাও অসমতল এবং বন্ধুর। তাহার কারণ নদীর স্রোতের জন্য পাহাড়ের মাটী কাটিয়া ঐরূপ হইয়াছে। এই সুন্দর উপত্যকাটি শ্যামল শস্য-সম্ভারে পরিপূর্ণ। নানা প্রকার চাষবাস এখানে দেখিলাম। চমরী গোরু, ভেড়া, মোঙ্গোলিও ছাগল, উট প্রভৃতি অনেকগুলি তৃণপূর্ণ ক্ষেত্রে মনের আনন্দে চরিয়া বেড়াইতেছিল। এখানে আসিলে মনে হয় না যে আমরা তিব্বতের দুর্গম পথের যাত্রী। এই পথে আসিতে আসিতে প্রকৃতির নানারূপ বৈচিত্র্যপূর্ণ শোভা, সৃষ্টির অপূর্ব্ব মাধুর্য্য দেখিয়া মুগ্ধ হইতেছিলাম। উপত্যকার পূর্ব্ব দিক দিয়া নৈচি নদী বেশ বিস্তৃতভাবে বহিয়া যাইতেছিল, সেখানে নদীর চওড়া ছিল অত্যন্ত বেশী। এই উপত্যকায় অসভ্য যাযাবরেরা বাস করে। তাহারা সব সময়ই যে এখানে থাকে তাহা নহে, আমরা যখন এখানে আসিয়াছিলাম সে সময়ে এখানে দশটি তাঁবু পড়িয়াছিল। তাঁবুগুলি কি প্রকার সে কথা পূর্ব্বেই বেশ পরিষ্কারভাবে বলা হইয়াছে। প্রত্যেক তাঁবুতে ছয়জন করিয়া লোক বাস করিতেছিল।

 যাযাবরেরা এই বিস্তৃত উপত্যকার নানা স্থানে বাস করে। ইহারা কখনও বরাবর এক স্থানে তাঁবু গাড়িয়া বাস করে না। যখন যেখানে বেশী পরিমাণ পশুর খাদ্য এবং উর্ব্বর ভূমি দেখিতে পায় সেখানেই ইহারা চলিয়া যায়। এইভাবে এই বিস্তৃত উপত্যকার নানা স্থানে ইহাদের ঘুরিয়া ফিরিয়া বাস করিতে দেখা যায়। ইহাদের প্রধান খাদ্য হইতেছে দুগ্ধ এবং অর্দ্ধসিদ্ধ মাংস। ইহারা ভাত ও গম বড় একটা খায় না। সময় সময় প্রায় একশো মাইল দূরবর্ত্তী কোরলুক জেলা হইতে যে গম আমদানী হয় তাহাই কিছু কিছু খায়। অন্যান্য মোঙ্গোলিয়দের মত ইহারাও বেশ অতিথিবৎসল। আমরা ইহাদের নিকট হইতে বেশ ভাল ব্যবহার পাইয়াছিলাম। এই যাযাবরদের জীবন-যাত্রা অতি সহজ। সকালে উঠিয়া দুগ্ধ দোহন করে। ঘোড়ার দুগ্ধই ইহাদের প্রিয় খাদ্য। দুধের মধ্যে সামান্য পরিমাণে অম্ল মিশাইয়া ইহারা এক প্রকার পানীয় প্রস্তুত করে তাহার নাম ‘চেকা’।

 মোঙ্গোলিয় লোকগুলি বেশ বলিষ্ঠ এবং সুগঠিত, স্বভাবও নম্র। ইহারা বড় একটা ঝগড়া বিবাদ করিতে চাহে না। বেশ শান্তিতে জীবন-যাত্রা নির্ব্বাহ করিতেই ভালবাসে। ইহাদের বিবাহ ব্যাপারটা অতি চমৎকার। বর কনেকে দুই বৎসর পর্য্যন্ত বিবাহের জন্য অনুরোধ উপরোধ করে তারপর মতি স্থির হইলে পর উভয় পক্ষের পিতামাতাই উহাদের বাসের জন্য একটি তাঁবু প্রস্তুত করিয়া দেয়। কিছু দিন পরে একটি বড় রকমের ভোজ দিতে হয়, সেই ভোজে আত্মীয়স্বজন এবং স্বজাতীয়েরা আসিয়া মিলিত হয়। নাচ, গান ও আনন্দ উৎসবের পর বিবাহ পাকা হইল বলিয়া সমাজের সকলে মানিয়া নেয়।

 এ অঞ্চলে চমরী গোরুর সংখ্যা বড় কম। আমরা নৈচিতে পাঁচ দিন ছিলাম। তারপর রওনা হইলাম। আমাদের সহযাত্রী মোঙ্গোলিয় দল এখানে রহিয়া গেল। তাহারা বরফ পরিষ্কার হইয়া গেলে যাত্রা করিবে বলিয়া স্থির করিল। এই শিবিরে অবস্থান কালে যে স্ফুটনাঙ্ক দেখিয়াছিলাম, তাহাতে এখানকার উচ্চতা ১২,০১০ ফিট জানিতে পারিলাম।

পাহাড়ের বুকে মরুভূমি

 আমরা এখান হইতে আমাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যাদি সংগ্রহ করিলাম এবং কতকগুলি ভারবাহী জন্তু কিনিয়া লইলাম।

 ৩রা নভেম্বর। আজ পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করিলাম। প্রায় সাড়ে আট মাইল পথ চলিয়া একটা নদীর তীরে আসিয়া রাত্রির মত তাঁবু ফেলিলাম। আমরা যেখানে ছিলাম সেখান হইতে প্রায় চারি মাইল এবং ছয় মাইল দূরে দুইটী শাদা বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া দেখা গিয়াছিল।

 ৪ঠা নভেম্বর। আজ আমরা সাত মাইল পথ চলিয়া নৈচি নদীর কাছে আসিলাম। নৈচি নদীর আর একটী নাম গোল। নদীটি প্রায় চল্লিশ হাত চড়া হইবে—জল দুই ফিটের বেশী গভীর নয় কিন্তু স্রোতোধারা অত্যন্ত প্রবল। এই নদীর সঙ্গে আর একটী নদী আসিয়া মিলিয়াছে—সেই নদীর বুকে জল অতি অল্প, শুধু বড় বড় শিলার স্তূপ এদিকে ওদিকে ছড়াইয়া আছে। এখান হইতে আবার যাত্রা শুরু করিলাম এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ফাগ্‌লাগা নামক স্থানে আসিয়া পৌঁছানো গেল। চারিদিক বেড়িয়া পাহাড়—মাঝখানে এই সমতল ভূমি। এখানে অনেক যাযাবরকে দেখিতে পাইলাম। একটী গোলাকার উচ্চ জমির উপরে সারি সারি তাঁবু পড়িয়াছে। তাঁবুর সম্মুখে লোহার চুল্লিতে আগুন জ্বলিতেছে। এখানে জ্বালানি কাঠ এবং ঘাস প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।

 আমরা পরের দিন নদীর বাম তীর ধরিয়া ক্রমাগত চলিতে লাগিলাম। পথের দৃশ্য বেশ সুন্দর—দূরে দূরে উচ্চ গিরিশৃঙ্গসমূহ দেখা যাইতেছিল। তাহাদের অধিকাংশই বরফে ঢাকা। আমরা ৭ই, ৮ই এবং ৯ই নভেম্বর ক্রমাগত কখনও নদীর দক্ষিণ কখনও বা বাম তীর ধরিয়া চলিতে চলিতে একটী বিস্তৃত বালুকাময় প্রান্তরের মধ্যে আসিয়া পড়িলাম। এখানে গাছপালার চিহ্নমাত্রও দেখা গেল না। এই প্রান্তরের ভিতর দিয়াই পথ—একস্থানে দেখিলাম দুইটী নদী আসিয়া মিলিয়াছে। নদীর ভিতরে জল নাই বলিলেই চলে, বোধ হয় এই জন্যই এখানে গাছপালা কিছুই নাই। দূরে দূরে মাঝে মাঝে পথের পাশে এক প্রকার গাছ দেখিতে পাইলাম। গাছগুলি তিন ফিটের বেশী উঁচু হইবে না, এ অঞ্চলে পশুরা এই গাছের পাতা খাইয়াই কোনরূপে জীবন ধারণ করে।

 আমরা এই পথে প্রায় পাঁচ মাইল পথ চলিয়া একটী পাহাড়ের চূড়ায় আসিয়া পড়িলাম। এই পথে খানিকক্ষণ চলিলে পর পথটী ক্রমশঃ সরু হইয়া চলিল, এই পথের দুই দিকে দেওয়ালের মত পাহাড়ের সারি চলিয়াছে—এই পাহাড়ের মধ্যস্থিত গিরিপথ দিয়া চলিতে চলিতে মাঝে মাঝে যখন পাহাড় ছাড়া খোলা জায়গায় আসিয়া পৌঁছিতাম তখন দেখা যাইত বহুদূর বিস্তৃত মরুভূমি পড়িয়া আছে। এই মরুভূমি উত্তরে এবং পশ্চিমে অনেক দূর চলিয়া গিয়াছে—কোথায় তাহার শেষ তাহা আমরা বলিতে পারিব না। পূর্ব্বদিকেও মরুভূমি রহিয়াছে কিন্তু তাহা তেমন বিস্তৃত নয় বলিয়া মনে হইল। আমরা সন্ধ্যা হইবার একটু আগে নৈচি নদীর দক্ষিণ তীরে তাঁবু ফেলিলাম। রাত্রিটা এই বিজন মরুদেশের সীমান্তে কাটাইয়া দিব বলিয়াই স্থির করিলাম। আমাদের সঙ্গের পশুগুলির অবস্থা অতি শোচনীয় হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাদের খাইবার কিছুই ছিল না। পূর্ব্বে পথে যে গাছের উল্লেখ করিয়াছি সেই গাছের পাতা কিছু কিছু খাইয়া তাহারা প্রাণ বাঁচাইয়াছিল বটে কিন্তু এখানে সেই গাছেরও অভাব।

হ্রদের দেশে

 ১০ই নভেম্বর। আজ প্রায় সাড়ে ছয় মাইল পথ চলিয়া আমরা একটি বিস্তৃত প্রান্তরে আসিয়া পড়িলাম। প্রান্তরটি আমাদের একান্ত সৌভাগ্যবশতঃ তৃণরাজি পরিপূর্ণ এবং এ অঞ্চলের স্বাভাবিক ছোট ছোট গাছপালায় ভরা ছিল। সেজন্য পশুদের খাদ্য ও জ্বালানি কাঠের কোনও অভাব হয় নাই। আমরা শুনিলাম এখান হইতে পাঁচ মাইল দূরে মোঙ্গোলীয় যাযাবরেরা বাস করে। জায়গাটির নাম গোলমো। গোলমো ঘন বনে পরিপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। সেই বনটী ছয় মাইল প্রশস্ত এবং একশত মাইল দীর্ঘ হইবে। এই বনের গাছগুলিকে মোঙ্গলীয়রা হুম্বু, হার্ম্মো এবং চাক বলে। এই তিন জাতীয় গাছই বনের মধ্যে দেখিতে পাওয়া যায়। গাছগুলি ছয়-সাত ফিটের বেশী উঁচু হয় না। হর্ম্মো গাছে এক প্রকার কালো বা লাল ফল হয়। এই ফল দেখিতে মন্দ নয়, অনেকটা কিস্‌মিস্‌ বা মনাক্কার মতন গন্ধবিশিষ্ট। নভেম্বর মাসে এই ফল সংগ্রহ করা হয়। খাবার জন্য এবং বাণিজ্য বেসাতি করিবার জন্যই উহা সংগৃহীত হইয়া থাকে। এই বনের সর্ব্বত্র খুব লম্বা ঘাসে ঢাকা। গোটা পঞ্চাশেক তাঁবু এই বনভূমিতে পড়িয়াছিল। এখানে আমরা যে মোঙ্গোলীয় যাযাবরদের দেখিলাম তাহারা সকলেই বেশ মোটাসোটা এবং শক্তিশালী। ইহাদের ওষ্ঠ বেশ পুরু এবং গায়ের রঙ পীতাভ। ইহাদের ধনসম্পদ হইতেছে গৃহপালিত পশু; যেমন—ভেড়া, ছাগল, উট টাট্টু ঘোড়া এবং গোরু। এই ভেড়াগুলি দেখিতে অদ্ভুত রকমের। ইহাদের লেজ খুব মোটা। এখানে যে গোরুগুলি দেখিলাম তাহারা দেখিতে অনেকটা ভারতবর্ষের পার্ব্বত্য অঞ্চলের গোরুর মতন, তবে ইহাদের গায়ে খুব লম্বা লম্বা লোম আছে। গায়ের রঙ অনেকটা ধূসর। যাযাবরদের প্রধান খাদ্য হইতেছে সিদ্ধ-করা মাংস, দুধ, মাখন ও সাত্তু। কোরলুক নামক স্থান হইতে ইহারা সাত্তু সংগ্রহ করে। মোঙ্গোলীয়দের মধ্যে ইট চায়ের (brick tea) ব্যবহার খুব বেশী। এখানকার জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ এবং বিশেষ স্বাস্থ্যকর। বর্ষাকালে এখানকার মাটী আর্দ্র থাকে আর লবণের মত এক প্রকার শাদা নির্য্যাস গাছের গোড়ার দিক হইতে বাহির হয়। তাহার ফলে বর্ষাকালে এখানকার গাছপালা মরিয়া যায়। সে-সময়ে নানাপ্রকার পোকাও দেখিতে পাওয়া যায়, বিশেষ করিয়া মশা এত বেশী হয় যে বাস করা ক্লেশকর হইয়া উঠে।

 আমরা যে পথ ধরিয়া এইস্থানে আসিয়া পৌঁছিলাম সেই পথটি এখান হইতে পূর্ব্ব দিকে চলিয়া গিয়াছে। নৈচি নদী মরুভূমির ভিতর দিয়া প্রায় চল্লিশ মাইল পথ প্রবাহিত হইয়া অবশেষে একটী হ্রদের জলে আপনাকে মিলাইয়া দিয়াছে। হ্রদটির নাম হারানোর বা দেউলাৎসান হ্রদ। এই হ্রদটির পরিধি প্রায় ষাট মাইল হইবে। এই হ্রদ হইতে কোনও নদী বাহির হয় নাই। এই হ্রদের জল লবণাক্ত। এখান হইতে প্রায় একশত মাইল উত্তর-পশ্চিমে হাজির নামক স্থান। তৈচিনার জেলার সর্দ্দার ঝাসা এখানে বাস করেন। হাজিরে বহু লোকের বাস। প্রায় পাঁচশত শিবির আছে এবং এখানকার কোনও কোনও অধিবাসী বেশ ধনী। তাহাদের পাঁচশত টাট্টু ঘোড়া এবং পাঁচ হাজারের উপর ছাগল এবং ভেড়া আছে। তৈচিনা জেলার বর্ব্বর অধিবাসীরা হাজির হইতে প্রায় ১৫০ শত মাইল পশ্চিমে বাস করে। তাহারা যেখানে বাস করে তাহার অল্প দূরেই এক বিস্তৃত সমতলভূমি, উহার বিস্তার প্রায় ১৫০ মাইল হইবে। কোনও লোকজনের বসতি সেখানে নাই। ঐ বিজন সমতলক্ষেত্রের পূর্ব্ব দিকে খোটান অবস্থিত।

 খোটানে তাঁথাস্ নামক এক জাতীয় লোক বাস করে। ইহারা মাথায় শাদা পাগড়ি বাঁধে। তাঁথাস্‌রা সময়ে সময়ে শিকার করিবার জন্য এই বিস্তীর্ণ সমতলভূমি পার হইয়া যাযাবরদের দেশে আসে। তখন তাহারা যাযাবরদের শিবিরেই বাস করিয়া থাকে। এখানে শোনা গেল প্রায় ছয় বৎসর পূর্ব্বে সাতজন তাঁথাস্ নিরীহ যাযাবরদের শিবিরে আসিয়া আশ্রয় লইয়াছিল—কিছুদিন থাকিবার পর একদিন রাত্রিকালে তাহারা সেই যাযাবরদিগকে কাটিয়া ফেলিয়া তাহাদের গৃহপালিত পশু ইত্যাদি লইয়া পলাইয়া গিয়াছিল। এই দুর্ঘটনার পর হইতে মোঙ্গোলীয় যাযাবরেরা এই বিজন প্রান্তরের সীমান্ত প্রদেশে বাস করে না।

 মোঙ্গোলীয় স্ত্রীলোকেরা কোনরূপ অলঙ্কার পরে না বলিলেই চলে। তাহারা পায়ের গোড়ালি পর্য্যন্ত ঝুলিয়া পড়ে এইরূপ একপ্রকার পোষাক পরে। স্ত্রী ও পুরুষ সকলেই পশ্‌মী কাপড় ব্যবহার করে। বন্য পশুর লোম এবং চামড়া হইতে ইহারা নিজেদের পরিধেয় বস্ত্রাদি প্রস্তুত করে। স্ত্রী লোকেরাই সাধারণতঃ স্বামী এবং পুত্র কন্যাদের জন্য কাপড় বুনিয়া থাকে। মোঙ্গোলীয় পুরুষেরা লাশা এবং চীনের সহিত ব্যবসায়-বাণিজ্য করে। ইহাদের নমস্কার করিবার রীতি বড় চমৎকার। তাহারা সমপদবীযুক্ত এবং অতিথি—অভ্যাগতদের দেখিতে পাইলে সম্মুখের দিকে দুই হাত বিস্তার করিয়া বলে: ‘আমুর ভ্যাইনু’! অর্থাৎ সব ভাল ত? যাযাবরদের অত্যন্ত অতিথিবৎসল দেখিলাম। কোনও বণিক যাত্রীদল উপস্থিত হইতে না হইতেই যাযাবরেরা তাহাদের ঘিরিয়া ফেলিয়া নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলি জিজ্ঞাসা করে: ‘তোমাদের শরীর ভাল তো? নির্ব্বিঘ্নে তোমাদের যাত্রা শেষ হইয়াছে তো?’ ইহা ছাড়া তাহারা বণিক যাত্রীদলের প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাহাদের সহিত থাকিবার জন্য আমন্ত্রণ করে এবং চা, মাখন, দুধ, মাংস এবং চীন দেশ হইতে আনীত একপ্রকার তেলেভাজা পিঠা দ্বারা অতিথি-সৎকার করে। আমরা গোলমোতে দশ দিন অবস্থান করিলাম। আমার সেক্সটাণ্ট (Sextant) যন্ত্রের একখানি কাচ আলগা হইয়া যাওয়ায় দুশ্চিন্তার কারণ হইয়াছিল।

 ২১শে নভেম্বর। আমরা যাযাবরদের শিবির ছাড়িয়া রওনা হইলাম এবং প্রায় সাড়ে সাত মাইল পথ চলিয়া একটা ছোট নদী পার হইলাম। এই পথের দক্ষিণ দিকে দুইটি উচ্চ পুর্ব্বতশৃঙ্গ দেখা গেল। উহাদের দূরত্ব প্রায় পনেরো মাইল হইবে। আরও পাঁচ মাইল পথ চলিয়া আমরা হারথুথেল নামক স্থানে পৌঁছিলাম। এখানে যাযাবরদের প্রায় কুড়িটি শিবির আছে। আমরা একটা প্রাচীন দুর্গও দেখিতে পাইলাম। দুর্গটী বেশ পুরাতন—উহার দেওয়াল কাদামাটীর তৈরি। শোনা গেল যাযাবরেরা এই দুর্গটী বা মাটীর দেওয়াল ঘেরা স্থানটী এক সময়ে শত্রুদের আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য প্রস্তুত করিয়াছিল।

 আমরা আজ রাত্রি এখানেই কাটাইলাম। আবার সেই বনের ভিতরের পথ দিয়াই আমাদের অগ্রসর হইতে হইল। এই পথে প্রচুর ঘাস—আর জ্বালানী কাঠের কোনও অভাবই ছিল না।

 ২১শে নভেম্বর। আমরা সাড়ে ছয় মাইল পথ চলিয়া থুগ্‌থি নামক স্থানে আসিলাম। এখানেও যাযাবরদের পঞ্চাশটী শিবির ছিল। এখানের আশেপাশে কোনও নদী বা ঝর্ণা না থাকায় স্থানীয় লোকেরা কূপের জল ব্যবহার করে। কূপগুলি তেমন গভীর নয়—অল্প একটু মাটি খুঁড়িলেই জল পাওয়া যায়। দুইটী ঘোড়া মারা যাওয়ায় আমাদের এখানে দুইদিন বাধ্য হইয়াই থাকিতে হইয়াছিল।

 আমরা ২৫শে নভেম্বর, দালা নামক স্থানে আসিলাম। এস্থানে চমৎকার প্রস্রবণের জল পাওয়া গেল। এখান হইতে আরও দশ মাইল পথ চলিয়া চুগু নামক স্থানে আসিলাম। এখানে একটী নদী বহিয়া চলিয়াছে। নদীটি উত্তরে মরুভূমির দিকে প্রবাহিত হইয়া আপনার স্রোতোধারা মরুভূমির বুকে মিলাইয়া দিয়াছে। চুগুতে রাত্রিটা কাটানো গেল। পরদিন আবার যাত্রা সুরু হইল—পথে কোনও প্রস্রবণ বা নদী দেখিতে পাইলাম না। অনেক দূরে কতকগুলি শিবির দেখা গেল—ঐগুলি বর্ব্বর যাযাবরদের বলিয়া অনুমান করিলাম। ইহারা নদী বা প্রস্রবণের আশে-পাশে ছাড়া কোথাও শিবির স্থাপন করে না। পরের দিন প্রায় বারো মাইল পথ চলিয়া আমরা ধানাহোথো নামক একটী স্থানে আসিলাম। এখানে যাযাবরদের বাস করিবার মাত্র দুইটী শিবির দেখা গেল।

 ২৭শে নভেম্বর। আমরা প্রায় চার মাইল পথ চলিবার পর একটী নদী পার হইলাম। নদীটী দক্ষিণ দিক হইতে আসিয়াছে। আরও কিছুদূর যাইবার পরে কতকগুলি ঝর্ণা পাইলাম। এই ঝর্ণা গুলির জল যেমন স্বচ্ছ তেমনি সুপেয়। এই পথে আরও প্রায় সাড়ে পাঁচ মাইল পথ চলিবার পর আর একটী নদী পড়িল—এই নদীটি উত্তর পূর্ব্ব দিক হইতে বহিয়া আসিয়াছে। নদীর জল লবণাক্ত এবং নদীর পারে খণ্ড খণ্ড অনেক লবণের চাপ দেখিতে পাইলাম। এইরূপ লবণ এ-দেশের লোকেরা ব্যবহার করে। আমি এ-স্থানের আশে-পাশে কোনও লবণের পাহাড় বা খনির কথা শুনি নাই। আরও সওয়া তিন মাইল পথ চলিয়া আমরা তেনগিলিক নামক একটী স্থানে আসিলাম। এই স্থানটী দুইটী নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। একটী নদীর কথা পূর্ব্বে বলিয়াছি—সেই নদীটি দক্ষিণ-পূর্ব্ব দিক হইতে বহিয়া আসিয়াছে। অপর নদীটীর নাম বলিতে পারিলাম না। এই জায়গাটী দেখিতে বড়ই সুন্দর। দশটি কাঁচা বাড়ী এবং একশতটী তাঁবু দেখিতে পাইলাম। এখানে শস্যক্ষেত্রও আছে। প্রতি বৎসর বার্লির চাষ হয়। এখানকার উচ্চতা সাত হাজার সাত শত কুড়ি ফিট হইবে। বাইগোল নদী পূর্ব্ব দিক হইতে প্রবাহিত হইয়া তেনগিলিক্ নামক সমতল ক্ষেত্রের মধ্য দিয়া উত্তর দিকে চলিয়া আসিতেছে। তারপরে উহা মরুভূমির বালুকারাশির মধ্যে বিলীন হইয়া গিয়াছে। নৈচিতে যে মোঙ্গোলীয় যাত্রীদল আমাদিগকে ফেলিয়া আসিয়াছিল এখানে তাহাদের সাক্ষাৎ পাইলাম। এই বণিকদল এ-অঞ্চলের অধিবাসী। অল্পদূরেই ইহাদের বাড়ী, কাজেই ইহারা আমাদের নিকট হইতে বিদায় লইয়া স্ব-স্ব গৃহাভিমুখে চলিয়া গেল। কেবল মাত্র দুইজন তিব্বতীয় আমাদের কাছে রহিল। আমরা কয়েকদিন এইস্থানে থাকিব বলিয়া স্থির করিলাম কেননা সঙ্গের পশুগুলি অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল। তারপর আমাদের রসদের মধ্যে সাত্তু একেবারেই ফুরাইয়া গিয়াছিল। আমরা মোঙ্গোলিয়ায় কোন জল-যন্ত্র দেখিতে পাইলাম না, কিন্তু ছোট ছোট হস্তচালিত যন্ত্র দেখিতে পাইলাম। সেগুলি হোইদুথার নামক স্থান হইতে আনীত হাল্কা রকমের লাল পাথরের দ্বারা তৈরি।

 আমাদের এখানে আসিবার দুই দিন পরে কয়েকজন পরিচিত কাফিলা বন্ধু আমাদিগকে বলিলেন যে এখান হইতে এক দুপুরের পথ দূরে দক্ষিণ দিকের পাহাড়গুলিতে বেশ ভাল শিকার মিলে। অনেক রকমের বন্য পশু পাওয়া যায়। তাহাদের মাংস খাইতেও যেমন সুস্বাদু তেমনই তাহাদের গায়ের চামড়াও অত্যন্ত মূল্যবান। আমরা চার পাঁচ দিন দল বাঁধিয়া বেশ মনের আনন্দে শিকার করিলাম। সৌভাগ্যক্রমে শিকারও বেশ ভাল মিলিয়াছিল। কয়েকটী চমরী গোরু এবং বন্য গাধা আমরা শিকার করিয়াছিলাম। শিকারে বেশ আনন্দ পাইয়াছিলাম।

দস্যুর কবলে

 আমরা পাঁচদিন পর শিকার হইতে ফিরিলাম এবং স্থির করিলাম পরের দিন সকাল বেলা অর্থাৎ ৫ই ডিসেম্বর প্রাতে এই স্থান পরিত্যাগ করিব। পরের দিন যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইতেছি এমন সময়ে চিয়ামো-গোলোক জাতীয় প্রায় দুই শত অশ্বারোহী দস্যু আমাদিগকে আক্রমণ করিতে আসিল। আমরা এইরূপ অতর্কিত আক্রমণের আশঙ্কা করি নাই, কাজেই কি যে করিব সহসা ভাবিয়া ঠিক করিতে পারিলাম না। তাড়াতাড়ি উহাদের আক্রমণ-গতি প্রতিরোধ করিবার জন্য স্থানীয় লোকদের সহিত পরামর্শ করিয়া অল্প সময়ের মধ্যে যতটা সম্ভব প্রস্তুত হইলাম।

 প্রথমতঃ দূর হইতে উভয় পক্ষেই বন্দুক ছোঁড়াছুঁড়ি হইল কিন্তু দস্যুদল তাহাতে নিরস্ত না হইয়া অতি দ্রুত বর্শা ও তরবারি লইয়া আমাদের দিকে ছুটিয়া আসিতে লাগিল। আমাদের গুলিতে দস্যুদলের একজন নিহত হইয়াছিল কিন্তু তাহারা সেদিকে কোন লক্ষ্য না করিয়া অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে আমাদের উপর আসিয়া পড়িল। আমাদের এমন ক্ষমতা ছিল না যে হাতাহাতি করিয়া আত্মরক্ষা করিতে পারি। তারপর লোকসংখ্যায়ও অত্যন্ত অল্প ছিলাম। সুতরাং প্রাণ বাঁচাইবার জন্য আমরা জিনিষ-পত্র সব ফেলিয়া পলায়ন করিলাম। দস্যুদল আসিয়া আমাদের তাঁবুগুলি আক্রমণ করিল। জিনিষপত্র সব ছিন্ন ভিন্ন এবং লুঠ-পাট করিয়া লইয়া গেল। আমাদের যথাসর্ব্বস্ব ইহারা আত্মসাৎ করিয়াছিল। দস্যুরা এইভাবে লুণ্ঠন করিয়া চলিয়া যাইবার পর স্থানীয় অধিবাসীরা এবং অদূরবর্ত্তী শিবিরের সব যাযাবরেরা আসিয়া আমাদের সাহায্য করিবার জন্য উপস্থিত হইল। দস্যুরা যে পথে গিয়াছিল আমরা সেই পথ ধরিয়া চলিতে লাগিলাম। সন্ধ্যা পর্য্যন্ত এইরূপ অনুসন্ধান চলিল কিন্তু তাহাতে কোনও ফল হইল না। পরের দিন আমাদের অনুসরণের ফলে কিছু সুফল হইয়াছিল। প্রায় পঞ্চাশটী ঘোড়া ফিরিয়া পাওয়া গেল। তাহাদের অধিকাংশই ছিল খোঁড়া এবং কাজের অনুপযুক্ত। দস্যুরা ঐসব অক্ষম কাজের অনুপযুক্ত ঘোড়াগুলি লইয়া যাওয়া অনাবশ্যক মনে করিয়াই বোধ হয় পথে ছাড়িয়া দিয়াছিল।

 এখান হইতে যাত্রীদল সব বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। মোঙ্গোলীয়রা যে যাহার বাড়া চলিয়া গেল তাহা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। তিব্বতীয়দের মধ্যে কেহ কেহ আর অগ্রসর হওয়া সঙ্গত মনে না করিয়া লাশার দিকে ফিরিয়া গেল। কেহ কেহ তেঙ্গেলিকেই রহিয়া গেল। আমরা এখানে আমাদের তিব্বতীয় ভৃত্যদের বিদায় দিলাম কারণ তাহাদের আর কোন প্রয়োজন ছিল না। আবার নূতন পথে যাত্রার ব্যবস্থা করিতে প্রবৃত্ত হইলাম।

মোঙ্গোলীয়দের দেশে

 ১৩ই ডিসেম্বর। নানা গোলমালের ভিতর দিয়া এ কয়দিন কাটিয়া গেল। তিনটি বলদ ভাড়া করিয়া আবার যাত্রা আরম্ভ করিলাম। তেঙ্গেলিকের কয়েকজন বন্ধু পথে যাহাতে আমাদের কোনও অসুবিধা না হয় সেজন্য কিছু মাংস, মাখন এবং খাদ্যদ্রব্যাদি দিলেন—এমন কি জিনিষপত্রাদি বাঁধিয়া লইবার জন্য চামড়ার দড়িও দিয়াছিলেন। এইবার বেশ উপযুক্ত ব্যবস্থা করিয়া যাত্রা শুরু করা গেল। প্রায় ছয় মাইল পথ চলিয়া হাড়োরি নামক একটি জায়গায় আসিলাম। এখানে যাযাবরদের বারোটি শিবির ছিল। আমরা এখানে একদিন থাকিতে বাধ্য হইলাম, কারণ কথা ছিল যে বলদগুলির মালিকেরা এখানে আসিয়া আমাদের সঙ্গী হইবে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মত তাহারা আসিয়া পৌঁছিল না।

 ১৫ই ডিসেম্বর। আমরা আবার চলিতে আরম্ভ করিলাম। ক্রমাগত উত্তর দিকে চলিতে লাগিলাম। এই ভাবে কয়েক মাইল যাইবার পর দেখা গেল দূরে একটা পাহাড়ের নীচে মোঙ্গোলীয়রা কাঁচা দেওয়াল দিয়া অনেকটা জায়গা ঘিরিয়া রাখিয়াছে। এখান হইতে প্রায় তিন চার মাইল দূরে চারিটি গিরিশৃঙ্গ নজরে পড়িল। এই শৃঙ্গগুলির চূড়ায় শাদা বরফ এক অপূর্ব্ব সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি করিয়াছে। প্রায় তেরো মাইল পথ চলিয়া দেবাসুথা নামক একটি জায়গায় আসিয়া রাত্রি কাটাইলাম। এখানে চারিটি যাযাবর পরিবার তাঁবু ফেলিয়া বাস করিতেছিল। আমরা যে পথে আসিতেছিলাম সেই পথ বালুকাকীর্ণ ছিল।

সোণার পাখী

 ১৬ই, ১৭ই এবং ১৮ই তারিখ এ কয়দিন আমাদের বাইগোল নদীর তীর ধরিয়া চলিতে হইয়াছিল। নদীর জল কোথাও দুই ফিটের বেশী গভীর নয়। এই নদী দশ হাতের বেশী প্রশস্ত হইবে না। শোনা গেল বাইগোল নদী ক্রমাগত উত্তর-পশ্চিম দিকে বহিয়া যাইয়া অবশেষে কোন্ অজানা মরুভূমির বুকে মিলাইয়া গিয়াছে। আমাদের কাছে কিন্তু এবারকার পথটি বেশ ভালই লাগিয়াছিল, কেননা—এইবার পথের দুইদিকে ছিল বন-জঙ্গল। আর ছোট ছোট পাখীর ঝাঁক দেখিয়াছিলাম অসংখ্য। আমি একটি পাখীর কথা বলিতেছি সেই পাখীর মত পাখী তিব্বত ও মোঙ্গোলিয়ার পথে আর কখনও দেখি নাই। এই পাখীটি ‘স্বর্ণ-জীবঞ্জিব’ (Golden Pheasant) পাখীর মত। এই পথে বনের ধারে আমি কিন্তু বহু সংখ্যক এই জাতীয় পাখী দেখিয়াছিলাম।

 আমরা এই সুন্দর বনপ্রদেশে দুই দিন দুই রাত্রি অতিবাহিত করিয়াছিলাম। চারিদিকের দৃশ্য যেমন সুন্দর তেমনই এ-স্থানের নীরবতাও আমাদিগকে পুলকিত করিয়াছিল। কোনও হিংস্র জন্তুর ভয় এখানে ছিল না কাজেই সবুজ ঘাসের বিস্তৃত মাঠের মধ্যে গোরুগুলি মনের সুখে চরিয়া বেড়াইতেছিল।

 আমরা ১৮ই তারিখে এইস্থান ছাড়িয়া দক্ষিণ-পূর্ব্ব দিকে চলিতে লাগিলাম। পথের মধ্যে অনেক নদী পড়িল। এইসব নদী আমাদের পার হইতে হইয়াছিল। নদীর জল লোণা—কোন নদীই তেমন গভীর নহে। কোথাও দুই তিনটি নদী আসিয়া একসঙ্গে মিলিত হইয়াছে কিন্তু একটির জলও সুমিষ্ট নহে। এইজন্য যাযাবরেরা বড় একটা এখানে আসিয়া বাস করে না। কেননা যোজনের পর যোজন পথ চলিলেও পানীয় জল পাইবার কোনও সম্ভাবনা নাই।

 শীতকালের কথা বলিতেছি। শীতের সময় যখন বরফে চারিদিক ঢাকিয়া ফেলে সে সময়ে বরফের নীচ হইতে যা কিছু সামান্য সুমিষ্ট জল পাওয়া যায় তাহাই হয় শীতের দিনের এই পথের যাত্রীদের একমাত্র পানীয় সম্বল। এখানকার নদীগুলিও ক্রমাগত পশ্চিম দিকে বহিয়া চলিয়া অবশেষে মোঙ্গোলিয়ার দিকে কোন্ এক অজ্ঞাত মরুভূমির বালুকারাশির মধ্যে আপনাদের স্রোতোধারা হারাইয়া ফেলিয়াছে। আমরা এই পথে চলিতে চলিতে একটি ছোট নদী পার হইয়া এক অনুচ্চ গিরিবর্ত্মে আসিয়া পৌঁছিলাম।

হ্রদের তীরে

 গিরিপথ পার হইয়া প্রায় দুই মাইল দূরে একটি সমতল ভূমিতে রাত্রিকালে বিশ্রাম করিলাম। এখানে কোনও ঘাস বা মিষ্ট জল পাওয়া গেল না, কিন্তু জ্বালানী কাঠের গাছ ছিল প্রচুর। এই জায়গাটির নাম তাইচিনার। এখানে দেখিলাম পূর্ব্ব হইতে পশ্চিম দিকে একটি গিরিশ্রেণী চলিয়া গিয়াছে। এই পর্ব্বতশ্রেণীর গোড়ার দিকটা বালুকাময় আর এই পর্ব্বতশ্রেণীর একটা বিশেষত্ব এই যে ইহার মধ্যদিকের শৃঙ্গগুলি বেশ উঁচু। এই গিরিশ্রেণীর একদিকে তাইচিনার জেলা এবং অন্য দিকে কোরলুক জেলা।

 ১৯শে ও ২০শে ডিসেম্বর। আমরা প্রায় সাড়ে চৌদ্দ মাইল পথ চলিয়া চাকাননামাগা নামক স্থানে আসিলাম। এইখানে একটি হ্রদের দক্ষিণ তীরে আমরা তাঁবু ফেলিলাম। এই হ্রদটির নাম থোসুনোর বা টোসুন। হ্রদটির দৈর্ঘ্য বারো মাইল এবং প্রস্থ হইবে প্রায় আট মাইল। এই হ্রদের জল লবণাক্ত এবং গন্ধকে পরিপূর্ণ। আমাদের তাঁবুর কাছে একটি উষ্ণপ্রস্রবণ ছিল—উহার জল উৎক্ষিপ্ত হইয়া হ্রদের জলের সহিত গিয়া মিশিয়াছে। আমাদের পানের এবং রন্ধনের জন্য হ্রদের উপরিভাগে যে বরফ ছিল তাহা হইতে জল সংগ্রহ করিতাম। আমরা যে স্থানে তাঁবু ফেলিয়াছিলাম সেখান হইতে চারিদিকে চারিটি পথ চলিয়া গিয়াছে। একটি তাইচিনারের দিকে অন্যটি জুন জেলার দিকে, আর দুইটি হ্রদের পূর্ব্ব এবং পশ্চিম তীর দিয়া হোয়দুথারা এবং গোবির দিকে চলিয়া গিয়াছে। অপরটি গিয়াছে কোর্লুক জেলার অভিমুখে। কোর্লুক জেলা যাযাবরদের কাছে বিশেষ প্রিয়। কেননা এই জেলাই হইতেছে তাহাদের খাদ্যভাণ্ডার। আমাদের তাঁবুর চারিদিকে জ্বালানী কাঠের গাছ ছিল প্রচুর—গাছগুলি দেখিতে আকারে ছোট! মাঠে কিন্তু তৃণ একেবারেই ছিল না। আমরা এখানে এক রাত্রি ছিলাম। এখানকার পথ বেশ ভাল কিন্তু বর্ষার সময়ে বৃষ্টির দরুন সবটা পথ কাদায় ঢাকিয়া ফেলে। বিশেষতঃ যে নদীগুলির কথা পূর্ব্বে বলিয়াছি সেই নদীগুলির লবণাক্ত জল একেবারে তীর ছাপাইয়া পথঘাটের উপর আসিয়া পড়ে।

 আমরা কোরলুক্ হ্রদের তীরে আসিলাম। এই হ্রদটি দৈর্ঘ্যে দশ মাইল এবং প্রস্থে প্রায় চার মাইল হইবে। গোবির কাছে অনেক যাযাবরদের তাঁবু দেখিলাম। তাঁবুর সংখ্যা একশতের কম হইবে না। আমরা একদিন গোবির দিকে যাইবার পথে একজন তিব্বতীয়ের দেখা পাইলাম। সে লোকটি ঐস্থানে একা বাস করিতেছিল, কাজেই আমাদিগকে পাইয়া তাহার খুব আনন্দ হইল। এই লোকটির বাড়ী ছিল গোঁয়েৎসি। সে কোরলুক্ অঞ্চলে বিবাহ করিয়া এখানকারই স্থায়ী অধিবাসী হইয়া গিয়াছে। সে আমাদিগকে বলিল যে গ্রীষ্মকাল আসার পূর্ব্ব সময় পর্য্যন্ত আমাদের এখানে থাকাই ভাল, তাহা হইলে সে সেই সময়ে আমাদের সঙ্গী হইতে পারে ও যাত্রার পক্ষে নানাভাবে সাহায্য করিতেও প্রস্তুত আছে। আমরা এখানে প্রায় তিন মাস ছিলাম।

হ্রদের বুকে দ্বীপ

 গোবির দক্ষিণ-পূর্ব্ব দিকে প্রায় কুড়ি মাইল দূরে গোলমো নামক একটি ছোট গ্রামে কতকগুলি মোঙ্গোলিয় যাযাবর বাস করিতেছিল। আমাদের সহিত ইহাদের অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ ঘনিষ্ঠ পরিচয় হইয়া গেল। যাযাবরেরা আমাদের সহিত অত্যন্ত ভদ্র ব্যবহার করিয়াছিল।

 এখানে একটী বেশ বড় হ্রদ আছে উহা সু-ওনবো বা নীল হ্রদ নামে পরিচিত। সুন্দর হ্রদটি। ইহার বুকের নীল জলে ছোট ছোট ঢেউগুলি সূর্য্য কিরণে হীরার মত জ্বলিতেছিল। হ্রদটি খুব বড়, ইহার পরিধি প্রায় ২৮০ মাইল হইবে। স্থানীয় লোকেরা, হ্রদের নাম দিয়াছে সোনিং[] অর্থাৎ হ্রদের হৃদয়। এই হ্রদের মধ্যে একটি বেশ বড় দ্বীপ আছে। দ্বীপটি দেখিতে চমৎকার। এই দ্বীপের মধ্যে একটি গোম্ফা আছে। সেই গোম্ফার মধ্যে প্রায় কুড়িজন সন্ন্যাসী বাস করেন। ঐ দ্বীপের ভিতর একটি আশ্চর্য্য ব্যাপার এই যে সেখানে সুমিষ্ট জলের একটি প্রস্রবণ রহিয়াছে। সেজন্য আশ্রমবাসীদের পানীয় জলের কোনও অসুবিধা হয় না। এই আশ্রমের অধিবাসীরা শীতের চারি মাস বাহির হইতে খাদ্য দ্রব্যাদি সংগ্রহ করিয়া আনেন। সে সময়ে হ্রদের জল একেবারে বরফে পরিণত হয় সেজন্যই তাঁহারা তীরে যাতায়াত করিতে পারেন। এই হ্রদে প্রচুর মাছ আছে, সেই মাছ ধরিয়া মোঙ্গোলিয় জেলেরা নিকটবর্ত্তী স্থানে বিক্রয় করে। হ্রদের পারে প্রচুর পরিমাণে লবণ পাওয়া যায়। বণিকেরা এখান হইতে লবণ সংগ্রহ করিয়া দেশ-বিদেশে বিক্রয় করিয়া অনেক লাভ করে। হ্রদের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে কুকুমবাম নামে আর একটি বৃহৎ গোম্ফা আছে। সেই গোম্ফার কাছাকাছি একস্থানে প্রায় তিন হাজার মঠ আছে।

দস্যু-ডাকাতের দেশ

 মোঙ্গোলিয় বৌদ্ধদের নিকট এই স্থান একটি পবিত্র তীর্থস্থান রূপে পরিচিত। বৌদ্ধদের কাছে এই হ্রদটি এতদূর পবিত্র যে মোঙ্গোলিয়রা এই হ্রদের চারি পার প্রদক্ষিণ করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ বলিয়া মনে করে। হ্রদের দক্ষিণ তীরে বহু চোর-ডাকাতের বাস। যাত্রিগণ ঐ স্থান প্রদক্ষিণ করিতে গিয়া অনেক সময় দস্যুদের হাতে প্রাণ হারাইয়া থাকে। এই হ্রদের তীর হইতে প্রায় একশত মাইল দূরে টাঙ্কার বা ডোঙ্কির নামে একটি স্থান ব্যবসায়-বাণিজ্যের জন্য বিশেষ প্রসিদ্ধ। হ্রদের আরও পূর্ব্বদিকে আলাসা নামক একটি স্থানে কার্পেট বা গালিচা বুনান হয়। কার্পেটের জন্য ঐ স্থানটি বিখ্যাত। চীন-সম্রাটের এক জামাতা এই অঞ্চলের শাসনকর্ত্তা।

 মোঙ্গোলিয়েরা বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী এবং লাশা সহরকে তাহারা তাহাদের শ্রেষ্ঠ পুণ্যপীঠ এবং বিদ্যাকেন্দ্র বলিয়া মনে করে। লাশার তিনটি গোম্ফার প্রধান লামা তিনজন বিদ্যার্থীকে গিসী (Learned) বা পণ্ডিত উপাধি দিয়া থাকেন। সেই তিনটী গোম্ফার নাম হইতেছে সেরন্-রা, রেণ্-ফুং এবং গ্যাদেন্। গিসী বা পণ্ডিত উপাধি লইতে ছাত্রদের কঠোর পরিশ্রম করিতে হয়। ক্রমাগত বারো বৎসর কাল বিশেষ মনোযোগ সহকারে বৌদ্ধধর্ম্মশাস্ত্র অধ্যয়ন না করিলে কেহই এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারে না। সে সময়ে ছাত্রদের বৌদ্ধদর্শন এবং বিবিধ আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া-কর্ম্ম ইত্যাদি সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ করিতে হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলে পর উত্তীর্ণ ছাত্রদের কয়েকটী অনুষ্ঠান করা আবশ্যক হইয়া পড়ে। একটি হইতেছে গোম্ফার শ্রমণদিগকে বা সন্ন্যাসীদিগকে ভোজ দেওয়া। এই ভোজের পর প্রত্যেক গোম্ফায় সংবাদ পাঠান হয়, তদনুযায়ী ‘গিসী’ উপাধিধারী শ্রমণেরা পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করেন। ‘গিসী’ উপাধিধারী লামারা তিব্বতে এবং মোঙ্গোলিয়াতে বিশেষ সম্মানিত হইয়া থাকেন। তাঁহারা বিবাহ করিতে পারেন না।

 এ-অঞ্চলের মোঙ্গোলিয়েরা ট্যান্‌জেন গোম্ব নামে একজন বীরপুরুষের কাহিনী বলিয়া অতিশয় গর্ব্ব অনুভব করিয়া থাকে। ইনি দেশের শত্রু সিলিং এবং আলাসার অধিবাসীদিগকে পরাজিত করিয়া চীনের সম্রাট পর্য্যন্ত হইতে পারিয়াছিলেন এবং তাঁহারই বংশধরেরা নাকি এখনও চীনদেশের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত আছেন।

 ২৮শে ফেব্রুয়ারী। ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দ। আমরা এই স্থান হইতে ক্রমাগত চলিতে চলিতে অবশেষে ২রা এপ্রিল তারিখ ওবো নামক স্থানে আসিলাম। এখানে মোঙ্গোলিয়েরা মাটির ঢিপি তৈরি করিয়া তাহার উপর কয়েকটা নিশান পুঁতিয়া রাখিয়াছে, ঐ স্থানে তাহারা পূজা করে। এখান হইতে প্রায় সাড়ে তের মাইল দূরে সিরথ্যাং নামক স্থানে আসিলাম। সিরথ্যাং একটি তৃণাচ্ছাদিত বিস্তৃত সমতল ভূমি। উহার চারিদিক ঘিরিয়া বালির স্তূপ। এই সমতল ভূমিটি দৈর্ঘ্যে কুড়ি মাইল এবং প্রস্থে সতেরো মাইল হইবে। এই বিস্তীর্ণ ভূ-খণ্ডের মধ্যে অনেকগুলি সুমিষ্ট পানীয় জলের প্রস্রবণ থাকায় জলের কোনও অভাব হয় না। এখানে কয়েকটি ছোট ছোট লোণা জলে ভরা পুকুর থাকায় অধিবাসীদের লবণের জন্য ভাবিতে হয় না। দুইটি হ্রদও এখানে দেখিলাম, একটি উত্তর-পূর্ব্ব দিকে আর একটি দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। দুইটির আকারই একরূপ। চার মাইল দৈর্ঘ্য এবং আড়াই মাইল প্রস্থ। হ্রদ দুইটিতে প্রচুর পরিমাণে মৎস্য আছে। এখানে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত প্রায় তিনশতটি তাঁবু রহিয়াছে। শীতের সময় উহাদের সংখ্যা হ্রাস পায়। তখন পঞ্চাশটির বেশী তাঁবু এখানে থাকে না। শীতকালে এখানকার লোকেরা ত্রিশ মাইল দূরবর্ত্তী একটি পার্ব্বত্য উপত্যকায় গমন করিয়া আশ্রয় গ্রহণ করে। সেই উপত্যকাটি উর্ব্বর এবং শ্যামল-তরুলতা-গুল্ম পরিশোভিত বলিয়া খাওয়া দাওয়ার এবং পশুদের তৃণ পাইবার পক্ষে কোনও অসুবিধা হয় না।

বন্যজাতির দেশ

 সিরথ্যাংয়ের উত্তর দিকে যে পর্ব্বতশ্রেণী দেখিতে পাওয়া যায় সেখানে অনেক বন্যজাতি বাস করে। তাহাদের গায়ের রং কাল, শরীর সুগঠিত এবং তাহাদিগকে দেখিলে মনে হয় না যে তাহাদের খাওয়া দাওয়া সম্পর্কে কোনরূপ অসুবিধা আছে। এই বন্যজাতীয় লোকেরা কাপড় পরে না। পশুর চামড়া পরে। ইহারা ঘরে কিংবা তাঁবুতে বাস করে না। পাহাড়ের গুহায় কিংবা গাছের নীচে অথবা বড় বড় শিলাস্তূপের আড়ালে বাস করে। ইহারা এতদূর অসভ্য ও বর্ব্বর যে শিকার করিবার মত অস্ত্রশস্ত্রও ইহাদের নাই। এই বুনোরা ঝরণার ধারে শিকার করিবার জন্য মাটিতে শুইয়া গোপনে আড়ি পাতিয়া তীক্ষ্ণ-দৃষ্টিতে শিকারের অপেক্ষা করে এবং যখন কোন শিকার দেখিতে পায় তখন অতিশয় ক্ষিপ্রতার সহিত তাহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া মারিয়া ফেলে। বুনোরা না খায় এমন জন্তু নাই। এমন কি ইন্দুর, টিক্‌টিকি, গিরগিটি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীর মাংস খাইতেও ইহারা দ্বিধা করে না।

 এই বুনোরা এত দ্রুত চলিতে পারে যে একজন ঘোড়সোয়ার অতি দ্রুত ঘোড়া চালাইয়াও উহাদিগকে ধরিতে পারে না। ইহারা কোনও সভ্য লোককে দেখিলেই ভয়ে পলাইয়া যায়। এই বর্ব্বর লোকেরা চকমকির সাহায্যে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে এবং তাহারা যে সকল পশু-পক্ষী মারে তাহাদিগকে অগ্নিতে ঝল্‌সাইয়া লইয়া খাইয়া ফেলে। ইহারা সময় সময় পাথরের অগ্রভাগ ছুঁচালো করিয়া তাহা দিয়া বন্যপশু শিকার করে। সময় সময় ইহারা গোচারণ ক্ষেত্র হইতে ভেড়া, ছাগল প্রভৃতি চুরি করিয়া লইয়া যায় তবে সে খুব বেশী করে না।

 এই অঞ্চলে শ্যামোয় চমরি গোরু, নেকড়ে বাঘ, খরগোশ, ধূসর ভালুক, ব্যাকট্রিয়া দেশীয় উট এবং ঘোড়া প্রভৃতি জীবজন্তু বন্য অবস্থায় বিচরণ করিতে দেখিতে পাওয়া যায়। এ-সম্বন্ধে এখানকার লোকেরা একটি মজার গল্প বলে। একবার মোঙ্গোলিয় সৈন্যেরা লাশার রাজসরকারকে কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিদ্রোহী রাজাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করিবার জন্য যাইবার সময় এই পথে তাহাদের কতকগুলি উট ও ঘোড়া ছাড়া পড়িয়াছিল। এই সব বন্য উট ও ঘোড়া সেই সৈন্যবাহিনীর সঙ্গীয় উট ও ঘোড়ার বংশধর। এমন কি এ স্থানের মোঙ্গোলীয় অধিবাসীরাও আপনাদিগকে সেই সব সৈন্যদের বংশধর বলিয়া পরিচয় দিতে গর্ব্ব বোধ করে। এ-স্থানের বন্যপশু শিকার করিবার জন্য অনেকে এখানে আসিয়া থাকেন কেন-না ঐ সব জন্তুর চামড়া এবং মাংস দুই-ই কাজে লাগে। ঘোড়া শিকার বড় একটা হয় না ইহার কারণ এই যে ঘোড়ার মাংস কিংবা চামড়া শিকারীদের কাজে লাগে না।

 মোঙ্গোলিয়ার এই অঞ্চলে বৎসরে তিন বারের বেশী বৃষ্টি হয় না। এদেশের আকাশের গায়ে বজ্র ও বিদ্যুতের খেলা দেখিতে পাওয়া যায় না। বরফও বেশী পড়ে না।

বিপদ-বরণ

 এ অঞ্চলে ফেব্রুয়ারী মাস হইতে জুন মাস পর্য্যন্ত অনবরত, প্রায় প্রতিদিনই ধূলির ঝড় বহিয়া থাকে; সে সময়ে এই প্রদেশে বাস করা অসম্ভব হইয়া পড়ে। আমরা এখান হইতে জেম্বি আসিলাম। জেম্বিতে প্রায় তিন মাস ছিলাম। এখানে মাটির দেওয়াল ঘেরা একটি বাড়ীর মধ্যে লামা বাস করেন। লামাকে এস্থানের অধিবাসীরা অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। সকলেই তাঁহার উপদেশ মত চলাফেরা করে। যদিও এখানকার লোকেরা চাষবাস করে না তবু তাহাদের অবস্থা মোটের উপর ভাল। সকলেই কিছু না কিছু ব্যবসায়-বাণিজ্য করিয়া অর্থ উপার্জ্জন করে। ছাগল, ভেড়া, গোরু, ঘোড়া, উট এবং ভেড়ার লোমের বিনিময়ে তাহারা সাইতু, নাই চি এবং নাহুলি প্রভৃতি স্থান হইতে খাদ্যদ্রব্যাদি সংগ্রহ করে। ইহাদের বাসন বা আসবাবপত্র চীনদেশ হইতে আসে। অন্যান্য মোঙ্গোলিয়দের মত ইহাদের খাদ্য একই প্রকারের। এখানকার স্ত্রী-পুরুষের পোষাকও প্রায় এক ধরণের। লম্বা পাজামা, আর গায়ের জামা আমাদের দেশের চোগার মত দেখিতে। এইসব গায়ের জামা ও পরিবার পাজামা প্রভৃতি চামড়া ও পশম দিয়া তৈরি হয়। আমরা ইহাদের নিকট বেশ ভাল ব্যবহারই পাইয়াছি। এখানকার লামার সহিত কেহ সাক্ষাৎ করিতে গেলে তাঁহার নিকট হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া তাঁহাকে ‘খাতক’ নামক বস্ত্র উপহার দিতে হয়।

 আমাদের সঙ্গে যে সামান্য পরিমাণ পণ্যদ্রব্য ছিল তাহা অতি সহজেই এখানে বিক্রী হইয়া গেল। আমাদের সঙ্গী গঙ্গারাম এখান হইতে আমাদের সঙ্গে যাইতে চাহিল না। সে শুনিয়াছিল চীনের সম্রাটের সঙ্গে হুহুদের অর্থাৎ চীনের মুসলমানদের যুদ্ধ বাঁধিয়াছে। গঙ্গারাম বলিল সে এ অঞ্চলেই কয়েক বৎসর থাকিয়া যাইবে। আমার সঙ্গী চ্যাম্বলকেও আমার সহিত যাহাতে সে না যায় সে জন্য তাহাকে নানাভাবে কু-পরামর্শ দিতেছিল। এমন কি আমিও যাহাতে না যাই সে-বিষয়ে তাহার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। একদিন আমি আমার শিবিরে আসিয়া দেখিলাম চ্যাম্বেল অনুপস্থিত। অনুসন্ধানে জানিলাম, গঙ্গারাম তাহাকে কোনও দূরবর্ত্তী স্থানে পাঠাইয়া দিয়াছে। ঐ সুযোগে গঙ্গারাম দুইটি ঘোড়া, তিনটি ছোট তাঁবু, একটি ছোট দূরবীণ এবং প্রায় দেড়শত টাকা মূল্যের রৌপ্য দ্রব্যাদি লইয়া পলায়ন করিয়াছে। পরের দিন আমি তাঁবুতে আসিয়া চ্যাম্বেলকে দেখিতে পাইলাম, সে সত্য সত্যই হারাণ ছাগলগুলি লইয়া ফিরিয়া আসিয়াছিল। আমাদের একজন বন্ধু এই সংবাদে অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন এবং বলিলেন যে তিনি লামাকে বলিয়া গঙ্গারামকে ধরিবার ব্যবস্থা করিয়া দিতে পারেন। এ-সময়ে আমাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হইয়া পড়িয়াছিল। আমাদের নিকট পঞ্চাশ টাকার অধিক মূল্যের জিনিষ পত্র কিছুই ছিল না। সৌভাগ্যবশতঃ একদল বণিক লামাকে দেখিবার জন্য এখানে আসেন। তাঁহাদের নিকট শুনিলাম গঙ্গারামের সহিত পথে তাঁহাদের দেখা হইয়াছিল, সে এই যাত্রীদলের নিকট বলিয়াছে যে ঘোড়া দুইটি বিক্রয় করিয়া মাস তিনেক পরে সে আবার ফিরিয়া আসিবে। আমরা একান্ত নিরুপায় ও নিরাশ হইয়া পড়িলাম। আর যে তাহাদের সহিত দেখা হইবে তাহারও কোন সম্ভাবনা রহিল না। কি করিব নিরুপায় হইয়া এখানে আমরা পাঁচ মাস ছাগল ও ঘোড়া চরাইতাম। কিন্তু এ-কাজ ভাল লাগিতেছিল না। শেষটায় স্থির করিলাম, যে সামান্য সম্বল আছে তাহা দ্বারা যতদিন চলিবে চলুক পরে না হয় ভিক্ষা করিয়া পথ চলিব।

 ৩রা জানুয়ারী (১৮৮১ খ্রীঃ অঃ)। এখানকার কয়েকজন লোক ছাগল এবং ভেড়া প্রভৃতির বিনিময়ে খাদ্য-শস্য-সংগ্রহ করিবার জন্য সাইতু যাইতেছিল। আমরাও আমাদের মনিবের অনুমতি লইয়া তাহাদের সঙ্গী হইলাম। মনিবটি অত্যন্ত ভদ্রলোক। তিনি প্রায় চল্লিশ টাকা মূল্যের একটি ঘোড়া দিলেন এবং পথে যাহাতে কোনরূপ ক্লেশ না হয় সে জন্য প্রচুর গরম কাপড় এবং খাদ্যের সংস্থান করিয়া দিলেন।

 আমরা প্রায় সাড়ে তিন মাইল পথ চলিয়া একটি ছোট নদী পার হইলাম। পূর্ব্বে যে দুইটি হ্রদের কথা বলিয়াছি এই নদীটি সেই হ্রদের সহিত মিলিত হইয়াছে। আমরা এখান হইতে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে একটি তুষারাবৃত পর্ব্বত-শ্রেণী দেখিতে পাইলাম, এই পর্ব্বত-শ্রেণীর নাম অমন-দা-পারো। সিরথ্যাংএর লোকেরা মনে করে এই স্থানে তাহাদের রক্ষকদেবতা শিবডাগ্ বাস করেন।

 আমরা এই ভাবে পথ চলিতে চলিতে অনেক নদী এবং গিরিপথ উত্তীর্ণ হইয়া অবশেষে ৮ই জানুয়ারী সাইতুতে আসিয়া পৌঁছিলাম। মোঙ্গোলিয়েরা এই স্থানকে সাচু বলে। নদীর দক্ষিণ পারে সাইতু অবস্থিত। সাইতু সহরটি বেশ বড়। উহার পরিধি প্রায় ছয় মাইল হইবে। বিশেষ যত্ন করিয়া যে সহরটি তৈরি তাহা নহে, সহরের বাহিরটা রৌদ্রে শুকানো ইট দিয়া চারিদিকে ঘিরিয়া রাখা হইয়াছে। এখানকার পানীয় জল এবং অন্যান্য ব্যবহার্য্য জল নদী হইতেই লোকে সংগ্রহ করে। সাইতুর বাজারটি বেশ বড়। বাজারের মধ্য দিয়া একটি রাস্তা রহিয়াছে। রাস্তার দুইদিকে বাড়ী ঘর। বাড়ীগুলির ছাদ, দেওয়াল সবই রৌদ্রে শুকান ইট দিয়া প্রস্তুত। কোন কোন বাড়ীতে অনেকগুলি ঘর আছে, সেই সব ঘরে বণিকেরা এবং অন্যান্য ভ্রমণকারীরা আশ্রয় গ্রহণ করে। এই স্থানে চাকর-বাকরদের থাকিবার স্বতন্ত্র ঘর আছে। সাইতুর বাজার,সহর এবং দুর্গের সমুদয় বাড়ীঘর লইয়া এখানকার বাড়ীর সংখ্যা ২০০০ এরূপ হইবে।

 সাইতুর লোকেরা বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী। তিব্বতে যেমন ধর্ম্মের গোঁড়ামি আছে এখানে সেইরূপ কোন গোঁড়ামি নাই। ইহাদের মধ্যে কোনরূপ জাতিভেদ নাই।

 এখানে একটি ভেড়ার বদলে ভারতীয় মুদ্রা ১।০ পাঁচসিকা পাওয়া যায়। এ স্থানে মসুর, মটর প্রভৃতি ডালের চাষ হয়। চাউল এখানে অত্যন্ত দুর্ম্মূল্য। ইয়ারকন্দ হইতে এখানে চাউল বিক্রয়ের জন্য আসে। সাইতুতে অল্প মূল্যে প্রচুর পরিমাণে শাকসব্জি এবং ফলমূল পাওয়া যায়। ফলের মধ্যে আপেল, নাস্‌পাতি, শসা, তরমুজ, পেয়ারা, মালবেরি, বাদাম, মূলা, আলুবখ্‌ড়া, ভূত, আখ্‌রোট, গাজর, শালগম, সরিষা প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে মিলে। এদেশে আখের চাষ হয় না। তবে উত্তর দেশ হইতে এক প্রকার খাদ্য আসে যাহা মধু-পিষ্টক নামে অভিহিত হয়। এখানে এক প্রকার কার্পাসের চাষ হয় তাহার তূলা হইতে যে সূতা প্রস্তুত হয় তাহা দিয়া মোটা কাপড় প্রস্তুত হইয়া থাকে। সম্প্রতি চীন সম্রাটের একজন কর্ম্মচারী এখানে আসিয়া রেশমের বা পশমী কাপড় প্রস্তুত করিবার ব্যবস্থা করিয়া দিয়া গিয়াছেন। এখানকার খাদ্যের মধ্যে প্রধান খাদ্য হইতেছে রুটি, তরকারি, শাক ভাজা, মাংস এবং দুধ। ভেড়া, এবং মুরগী প্রায় প্রত্যেক বাড়ীতেই লোকে পালে। কেন-না এদেশের লোকের কাছে মুরগীর মাংস ও ভেড়ার মাংস বিশেষ প্রিয় এবং প্রধান খাদ্য বলিয়া বিবেচিত হয়।

 সাইতুর জলবায়ু বেশ ভাল কতকটা ইয়ারকন্দের মত। এখানকার লোকেরা মোঙ্গোলিয়দের মত মোটা কিম্বা বলিষ্ঠ নহে। এখানকার পুরুষ ও মেয়েরা নীল, কাল এবং শাদা রংয়ের পোষাক পরে। শোক-প্রকাশের জন্য শাদা পোষাক ব্যবহৃত হয়। শীতের সময় কি স্ত্রী, কি পুরুষ সকলেই তূলায় ভর্ত্তি জামা পরে। স্ত্রীলোকেরা মাথার চুল উল্টাইয়া বাঁধিয়া পেছনের দিকে ঝুলাইয়া দেয়। মেয়েরা সাধারণতঃ পা-জামার মত পোষাক পরে। এদেশের মেয়েদের পা খুব ছোট, কাহারও ছয় ইঞ্চির বেশী লম্বা পা দেখা যায় না। মেয়েদের বয়স যখন তিন বৎসর হয় তখন তাহাদের গলায় এক সের ওজনের একটা লৌহ শিকল ঝুলাইয়া দেওয়া হয়। তাহাদের বয়স পাঁচ বৎসর হইলে পা এমন শক্ত করিয়া বাঁধিয়া দেয় যে পায়ে ঘা হয়। এজন্যই উহাদের পা স্বাভাবিক আকার ধারণ করে না। পায়ে প্রায়ই ঘা থাকে। এ-দেশের স্ত্রীলোকেরা এজন্য পুরুষের কাছে কখনও পা বাহির করে না।

 আমরা এখানে প্রায় দশ দিন থাকিয়া যেদিন এখান হইতে রওনা হইলাম সেদিনই সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবে একটা বিপদ ঘটিল। ১৮৮১ খ্রীঃ ১৮ই জানুয়ারী। আজ আমরা থোর-কোথ নামক স্থানের দিকে কয়েকজন বণিকের সঙ্গে রওনা হইয়া কেবল কয়েক মাইল পথ আসিয়াছি এমন সময় একজন অশ্বারোহী আমাদিগকে সাইতুর শাসনকর্ত্তার নিকট ফিরাইয়া নিল।

 শাসনকর্ত্তা আমাদিগকে প্রশ্ন করিলেন, আমরা কে? কোথা হইতে আসিয়াছি এবং কি প্রয়োজন? তিনি আমাদিগকে চোর কিম্বা বিদেশী গোয়েন্দা মনে করিয়াছিলেন। তিনি আমাদের প্রতি এই আদেশ দিলেন যে আমরা যতদিন পর্য্যন্ত আমাদের ব্যবহার দ্বারা তাঁহাকে সন্তুষ্ট করিতে না পারিব ততদিন আমাদিগকে ঐখানে বন্দী থাকিতে হইবে। তিনি আমাদিগকে স্থানীয় একজন ধনী ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে রাখিয়া দিলেন।

 এ-দেশে ঘোড়া ক্রয় করা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ বলিয়া আমরা আমাদের সঙ্গীয় ঘোড়াটিকে বিক্রয় করিয়া দিলাম। কেন-না কতদিন পর্য্যন্ত বন্দী অবস্থায় থাকিতে হইবে সে-বিষয়ে ত কিছুই জানিতাম না। আমরা এখানে জীবিকা নির্ব্বাহের জন্য ফল বিক্রয়ের ব্যবসায় আরম্ভ করিলাম। এদেশে একপ্রকার অদ্ভুত পীড়া দেখিলাম। তাহার নাম “বাম্”। এই ব্যারামে পায়ে এক প্রকার লাল লাল চাকা চাকা দাগ হয়। ইহার বেদনা এত দূর যন্ত্রণাদায়ক হয় যে কেহ এইরোগে আক্রান্ত হইলে সে আর দাঁড়াইতেও পারে না, পথ-চলা ত দূরের কথা। আমি এই ব্যারামে যে কষ্ট পাইয়াছিলাম তাহা বলিয়া বোঝান কষ্টকর। রোগের প্রথম হইতে ইহার চিকিৎসা না করিলে পা দু’খানি চিরদিনের মত অচল হইয়া পড়ে। আমি মূলার রস ব্যবহার করিয়া বেশ ভাল ফল পাইয়াছিলাম। প্রায় সাত মাস পরে আমাদের একজন পরিচিত তিব্বতীয় বন্ধু সির্‌থ্যাংয়ের নিকটবর্ত্তী কুথোং নামক স্থানের এক সহস্র দেবমূর্ত্তি দেখিবার জন্য আসিয়াছিলেন। তিনি আমরা যে ধনী ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে ছিলাম তাঁহার সহিত পরিচিত ছিলেন। তাঁহার সাহায্যে আমরা তিব্বতে ফিরিয়া যাইবার অনুমতি লাভ করিলাম এবং সাতদিন পরে ১৫ই আগষ্ট জেম্বি ফিরিয়া আসিলাম।

 আমরা ফিরিবার পথে নানা গ্রাম, গোম্ফা এবং অনেক ছোট ছোট সহর দেখিয়াছিলাম। সে-সকলের সবিস্তারে বর্ণনা করিবার আবশ্যক করে না।

 ১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দ ৪ঠা অক্টোবর। আমরা বহু পর্য্যটনের পরে অবশেষে জিংচো নামক স্থানের গোম্ফার কাছে আসিলাম। এখান হইতে ক্রমাগত গিরিসঙ্কট পথে চলিতে চলিতে ১২ই নভেম্বর তারিখ দার্জ্জিলিং প্রত্যাবর্ত্তন করিলাম। আমরা যে পথে তিব্বতের ভিতর দিয়া মোঙ্গোলিয়া গিয়াছিলাম ফিরিবার সময় কিন্তু সে-পথে আসি নাই। এই পথে আমাদের যথেষ্ট ক্লেশ ভোগ করিতে হইয়াছিল। কেন-না সারা পথে বরফ পড়িয়া পথচলা অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছিল। এ-জন্য অনেক সময় আমরা ইচ্ছানুরূপ পথ চলিতে পারি নাই। আমরা তাচিয়েন্ নামক ছোট সহরে আসিলে দুইজন খ্রীষ্টিয় ধর্ম্মযাজক আমাদের সহজ ও সুগম পথ নির্দ্দেশ করিয়া বিশেষভাবে সাহায্য করিয়াছিলেন।

 এইরূপে নানা বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া পণ্ডিত কিষণ সিংহের তিব্বত ও মোঙ্গোলিয়া ভ্রমণ শেষ হইয়াছিল।


  1. The lake is about 280 miles in circumference—Record of survey of India volume III, page 2547.