বিষয়বস্তুতে চলুন

হিমালয়-অভিযান/লালার তিব্বত যাত্রা

উইকিসংকলন থেকে

লালার তিব্বত-যাত্রা

 লালা নামক একজন পার্ব্বত্য অধিবাসীর হিমালয় অভিযানকাহিনী এইবার বলা হইতেছে। লালা ছিরমূর নামক একটি পার্ব্বত্য গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। ১৮৭৫-৭৬ খ্রীষ্টাব্দে লালা দক্ষিণ পূর্ব্ব তিব্বতের দুর্গমপথে অভিযান করিয়াছিলেন। আমরা সগৌরবে ভারতীয় এই বীর অভিযানকারীর বিবরণ প্রকাশ করিতেছি।

 ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে মার্চ্চ মাসে ছিরমূর পল্লীর অধিবাসী লালা দার্জ্জিলিং হইতে সিকিমের পথে তিব্বত-যাত্রা করেন। প্রথমে তিনি সিগাৎসী নামক স্থানের কাম-পা বা তিব্বতীয় সীমান্তের একটি দুর্গের কাছে আসিয়া পৌঁছিয়াছিলেন। সেখান হইতে তিনি তিব্বতের প্রধান নদী সাংপোর তীরবর্ত্তী পথ অবলম্বন করিয়া ৫০ মাইল পর্য্যন্ত পর্য্যটন করিয়া পালতি হ্রদের নিকটে আসিয়া উপনীত হন। এখান হইতে পুনরায় সাংপো নদীর পারে পারে চলিতে চলিতে সিতাং আসেন। এই পথ ধরিয়া আসামের মধ্য দিয়া তিব্বতে গমন করিতে চেষ্টা করেন কিন্তু মনতনগোঙ্গ নামক স্থানে আসিয়া বাধা পাইলেন। এজন্য তাঁহাকে পুনরায় সিগাৎসি ফিরিয়া আসিতে হইয়াছিল। লালা পুনরায় সিগাৎসি হইতে যাত্রা আরম্ভ করিয়া গিয়াংৎসী আসেন। সেখান হইতে কালাসার, ফারি এবং চুম্বি (সিকিমের রাজার গ্রীষ্মাবাস) হইয়া জেলিপলা উত্তীর্ণ হইয়া ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দে দার্জ্জিলিং প্রত্যাবর্ত্তন করেন।

 লালা এই অভিযানে একটি কম্পাস বা দিগদর্শন ও একটি সেক্সটাণ্ট যন্ত্র মাত্র সঙ্গে লইয়াছিলেন। প্রথম যাত্রায় লালা অসামান্য কষ্টসহিষ্ণুতা এবং অভিযানকারীর উপযুক্ত পর্য্যবেক্ষণ শক্তির বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করিয়াছিলেন। সঙ্গের পকেট ঘড়ি, থার্মোমিটার ইত্যাদির সাহায্যে লালা পর্ব্বতশৃঙ্গের উচ্চতার পরিমাপ পর্য্যবেক্ষণ করিয়াছিলেন।

 দার্জ্জিলিং হইতে যাত্রা করিয়া প্রথমে লালা থাংগো নামক গ্রামে আসেন এই গ্রামটি সিকিমের দক্ষিণ সীমান্ত প্রদেশে অবস্থিত। ডক্টর হুকার ১৮৪৮-৪৯ খ্রীষ্টাব্দে এই পথে সিকিম গিয়াছিলেন। হুকার ঐ অঞ্চলে পরিভ্রমণ কালে যে মানচিত্র প্রস্তুত করিয়াছিলেন তাহাতে লালা কোন্ কোন্ গ্রাম, দুর্গ, নদী ও পর্ব্বতশ্রেণী উত্তীর্ণ হইয়া তিব্বতে গিয়া পৌঁছেন তাহা নির্দ্দিষ্ট আছে। কাংরা-লামা বা লেচেন গিরিপথ পর্য্যন্ত পথের পরিচয় হুকারের তৈয়ারী মানচিত্রখানি হইতে বেশ সুস্পষ্টভাবে জানিতে পারা যায়। এইজন্য লালার অভিযান-পথ সম্পর্কে কোনরূপ সন্দেহ করিবার কারণ বিদ্যমান নাই। সিগাৎসি, গিয়াংৎসি এবং সিতাংএর পথে লালার পুর্ব্বেও কয়েকজন অভিযানকারী যাতায়াত করায় এই পথের সম্বন্ধে লালা যেরূপ বর্ণনা করিয়াছেন তাহা যে অসত্য নহে তাহাই প্রমাণিত হইয়াছে। পণ্ডিত নৈনসিং ১৮৬৫-১৮৭৪ খ্রীষ্টাব্দে তোয়াং আসেন। লালাও তখন তোয়াং আসিয়াছিলেন। এই পথের বর্ণনা উভয়েরই একরূপ।

 লালা যখন কাঙ্গরা-লামালা হইতে কামপার (দুর্গের) তিন মাইল দূরে আসেন তখন একদল ঘোড়সোয়ার আসিয়া তাঁহাকে বন্দী করিয়া দুর্গের অধিনায়ক জোঙ্গপোনের নিকট লইয়া গিয়াছিল। জোঙ্গোপন লালাকে দুর্গের বাহিরে একটি ঘরে পনেরো দিন কয়েদ করিয়া রাখিয়াছিলেন। তাঁহার প্রতি কোনরূপ শারীরিক নির্য্যাতন না হইলেও তাঁহাকে মৌখিক নানাপ্রকার ভীতি প্রদর্শন করা হইয়াছিল। এখানে তাঁহার আসিবার উদ্দেশ্য, কোথায় সে যাইবে, কি তাঁর প্রয়োজন ইত্যাদি নানা বিষয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া তাঁহাকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিল। সিগাৎসির শাসন-কর্ত্তাও তাঁহাকে তিন দিন নজরবন্দী রাখেন ও পরে একজন রক্ষীর লালার প্রতি সন্দেহ হওয়ায় জোঙ্গপোন লালাকে পাঁচ মাস কাল সিগাৎসিতে বন্দী করিয়া রাখিয়াছিলেন। তবে এই বন্দী অবস্থায় তাঁহার যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিল, লালা ইচ্ছানুরূপ নগরের নানা স্থানে বেড়াইতে পারিতেন। এই ভাবে সিগাৎসির নানা ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণীর লোকের সহিত আলাপ পরিচয় হওয়ায় লালা স্থানীয় বিবিধ প্রয়োজনীয় সংবাদ সংগ্রহ করিতে পারিয়াছিলেন। এ সময়েই লালা স্থানীয় বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার তাসিলুনপো সম্বন্ধে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করিতে সক্ষম হন। পাঁচ মাস পরে একদল বণিক আশ্বিন মাসে সিগাৎসি আসিলে পর লালা সেখান হইতে মুক্তি লাভ করেন এবং পুনরায় যাত্রাপথে অগ্রসর হইতে পারিয়াছিলেন।

 ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে লালা সিগাৎসি পরিত্যাগ করেন। সেখান হইতে সাংপো নদীর তীরে অবস্থিত জাগ্‌সা নামক গ্রামে আসেন। এখানে একটি লোহার পুল আছে। এই লোহার সেতুটি পার হইলে দেখা যায় যে দুই দিকে দুইটি পথ গিয়াছে। একটি চলিয়াছে লাশার দিকে অপরটী চলিয়াছে চকসামচোরি নামক স্থানে। এই স্থানে সাংপো নদীর স্রোতোধার নানাভাবে বিভক্ত হইয়া গভীর গর্জ্জন করিতে করিতে বহিয়া চলিয়াছে।

 জাগ্‌সা হইতে লালা দক্ষিণ পূর্ব্বাভিমুখে যাইয়া ইয়া-সিক নামক একটি হ্রদের কাছে আসেন। এই হ্রদটির সম্পর্কে তিনি অনেক নূতন কথা বলিয়াছেন। লালা বলেন যে এই হ্রদটির মধ্যে একটি ছোট দ্বীপ আছে। সেই দ্বীপের সহিত মূল ভূভাগের একটি সংযোজক সেতু রহিয়াছে। সেই পথে লোকজন যাতায়াত করে এবং পশুরাও বিচরণ করিয়া থাকে। এখানে চারিদিকে বনরাজি-শোভিত পর্ব্বতশ্রেণী থাকায় পাহাড়ের অধিত্যকা প্রদেশে পালে পালে পশুদের বিচরণ করিতে দেখা যায়। ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দে নৈনসিং যখন এ-অঞ্চলে আসেন তখন তিনিও এই স্থানের বর্ণনা লালার অনুরূপই করিয়াছেন।

 এই হ্রদের তীর হইতে লালা উত্তর দিকে অগ্রসর হইতে থাকেন এবং সাংপো নদীর দক্ষিণ তীর ধরিয়া সিতাং পর্য্যন্ত আসেন ও সোমি নামক স্থানে অল্প কয়েক দিন অবস্থান করেন। এইখানকার লোকজনেরা ও তিব্বত-সরকারের প্রহরীরা লালাকে সতর্ক করিয়া দেন যে সাংপো নদীর পথ ধরিয়া তাহার ন্যায় একজন নিঃসঙ্গ পর্য্যটকের পক্ষে অধিক দূর অগ্রসর হওয়া সঙ্গত হইবে না। কেননা ঐপথে দস্যুদলের ভয় খুবই বেশী। ঐখানে যেমন দুর্দ্দান্ত দস্যুদলের আশঙ্কা তেমনি পার্ব্বত্য দুর্দ্দান্ত অধিবাসীদেরও বাস, কাজে কাজেই ঐ পথে পদে পদে জীবন-নাশের সম্ভাবনা। এইরূপ স্থলে লালা কি করিবেন? তিনি দক্ষিণ দিকে চলিতে লাগিলেন এবং কারকাংয়ের পথে অগ্রসর হইলেন। তাঁহার ইচ্ছা ছিল ঐ পথ ধরিয়া আসাম হইয়া ফিরিয়া আসিবেন। পণ্ডিত নৈনসিং ১৮৭৩-৭৫ সালে এই পথ ধরিয়া তিব্বত গিয়াছিলেন। লালা থোয়াং পৌঁছিবা মাত্রই তিব্বত সরকারের লোকেরা তাঁহাকে বন্দী করিয়া এক মাস আটক রাখে। সৌভাগ্যবশতঃ একজন তিব্বতীয় রাজপুরুষের কৃপায় অবশেষে তিনি মুক্তি পাইয়াছিলেন। এই ভাবে বার বার বন্দী হওয়ায় তাঁহার যাত্রাপথে বহু বাধা জন্মায়। তিনি আর অধিক দূর অগ্রসর না হইয়া পুনরায় সিগাৎসির পথে ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ্চ মাসে দার্জ্জিলিং ফিরিয়া আসিতে যত্নবান হইলেন।

 লালার প্রত্যাবর্ত্তন পথেও তাঁহাকে পুনরায় ফারি নামক স্থানে একমাসকাল বন্দী অবস্থায় থাকিতে হইয়াছিল। এখানে একজন চীন দেশীয় রাজকর্ম্মচারির অনুকম্পায় তিনি মুক্তি লাভ করেন।

 লালার এই অভিযানের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বিষয় হইতেছে—গিয়ামসেনা নামক হ্রদের কথা। লালা এই হ্রদের তীরে বসিয়া একটি আশ্চর্য্য ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। প্রতি পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট অন্তর হ্রদের গর্ভ হইতে বজ্রধ্বনির ন্যায় এক শব্দ শুনিতে পাওয়া যায়। লালা প্রায় চারি ঘণ্টাকাল এই হ্রদের তীরে বসিয়াছিলেন—এই চারি ঘণ্টাকালই তিনি বার বার ঐরূপ ভাবে হ্রদের ভিতর হইতে বজ্র-নির্ঘোষের ন্যায় শব্দ শুনিতে পাইয়াছিলেন। আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে এই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে হ্রদের বুকের সলিলরাশির কোনরূপ আবর্ত্তন বা তরঙ্গ-উচ্ছ্বাস দেখা যায় নাই। স্থানীয় একজন রক্ষী বা চৌকী লালাকে বলিয়াছিল যে হ্রদের তলাকার জমাট বরফস্তর ভাঙ্গিবার দরুনই উপর হইতে এইরূপ শব্দ শোনা যায়। যদি বরফ ভাঙ্গার জন্যই ঐরূপ শব্দ হয় বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায় তাহা হইলে হ্রদের উপরিভাগে বরফকে ভাসমান অবস্থায় দেখা যাইত, কিন্তু হ্রদের জলের উপর এরূপ কোনও বরফ কোন কালেই দেখা যায় না বলিয়াও প্রহরী লালাকে বলিয়াছিল।

 ১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ্চ মাসে লালা তাঁহার প্রথম তিব্বত-অভিযান শেষ করিয়া দার্জ্জিলিং প্রত্যাবর্ত্তন করেন এবং ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে তিনি দ্বিতীয় বারের মত তিব্বত-অভিযান করিয়াছিলেন।