বিষয়বস্তুতে চলুন

হুতোম প্যাঁচার নক্সা (দ্বিতীয় ভাগ)/দুর্গোৎসব

উইকিসংকলন থেকে

দুর্গোৎসব।

 দুর্গোৎসব বাঙ্গলা দেশের পরব, উত্তর পশ্চিম প্রদেশে এর নাম গন্ধও নাই; বোধ হয়, রাজা কৃষ্ণচন্দরের আমল হতেই বাঙ্গলায় দুর্গোৎসবের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। পূর্ব্বে রাজা রাজড়া ও বনেদি বড় মানুষদের বাড়ীতেই কেবল দুর্গোৎসব হতো, কিন্তু আজ কাল পুঁটে তেলিকেও প্রিতিমা আনতে দ্যাখা যায়; পূর্ব্বকার দুর্গোৎসব ও অ্যাখনকার দুর্গোৎসবে অনেক ভিন্ন।

 ক্রমে দুর্গোৎসবের দিন সংক্ষেপ হোয়ে পড়লো; কৃষ্ণনগরের কারিকরেরা কূমারটুলী ও সিদ্ধেশ্বরীতলা জুড়ে বসে গ্যাল, জায়গায় জায়গায় রংকরা পাটের চুল, তবলকীর মালা, টীন ও পেতলের অসুরের ঢাল তলওয়ার, নানা রঙ্গের ছোবান প্রিতিমের কাপড় ঝুলতে লাগলো; দর্জ্জিরা ছেলেদের টুপী, চাপকান ও পেটী নিয়ে দরোজায় দরোজায় ব্যাড়াচ্চে; “মধু চাই!” “শাঁকা নেবে গো।” বোলে ফিরিওয়ালারা ডেকে ডেকে ঘুচ্চে। ঢাকাই ও শান্তিপুরে কাপুড়ে মহাজন, আতরওয়ালা ও যাত্রার দালালেরা আহার নিদ্রে পরিত্যাগ করেছে। কোন খানে কাঁসারীর দোকানে রাশীকৃত মধুপকের বাটী, চুমকী ঘটী ও পেতলের থালা ওজোন হচ্চে। ধূপ ধুনো, বেণে মসলা ও মাথাঘসার এক‍্ষ্ট্রা দোকান বসে গ্যাছে। কাপড়ের মহাজনেরা দোকানে ডবল পর্দা ফেলেচে; দোকান ঘর অন্ধকার প্রায়, তারি ভেতরে বসে যথার্থ পাইলাভে বউনি হচ্চে। সিঁদুরচুপড়ী, মোম্বাতি, পিঁড়ে ও কুশাসনেরা অবসর বুঝে দোকানের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার ধারে অ্যাকুভক্টের উপর বার দিয়ে বসেচে। বাঙ্গাল ও পাড়াগেঁয়ে চাকরেরা আরশী, ঘুনসী, গিল‍্টির গহনা ও বিলাতি মুক্তো অ্যকচ্যেটেয় কিনচেন; রবরের জুতো, কম্‌ফরটর, ষ্টিক্ ও ন্যাজওয়ালা পাগড়ী অগুন্তি উঠ‍্চে; ঐ সঙ্গে বেলোয়রি চূড়ী, আঙ্গিয়া, বিলিতি সোণার শীলআংটী ও চুলের গার্ড চ্যেনেরও অসঙ্গত খদ্দের। এত দিন জুতোর দোকান ধূলো ও মাকড়সার জালে পরিপূর্ণ ছিল, কিন্তু পূজোর মোর্সমে বিয়ের কনের মত ফেঁপে উঠ‍্ছে; দোকানের কপাটে কাই দিয়ে নানা রকম রঙ্গিণ কাগজ মারা হয়েছে, ভেতরে চেয়ার পাড়া, তার নীচে অ্যাক টুকরো ছেঁড়া কারপেট। সহরের সকল দোকানেরই শীতকালের কাগের মত ছেহাবা ফিরেচে। যত দিন ঘুনিয়ে আস‍্চে, ততই বাজারের কেনা ব্যাচা বাড়ছে, ততই কল‍্কেতা গরম হয়ে উঠছে। পল্লীগ্রামের টুলো অধ্যাপকেরা বৃত্তি ও বার্ষিক সাদ‍্তে বেরিয়েচেন, রাস্তায় রকম রকম তরবেতর চেহারার ভিড় লেগে গ্যাছে।

 কোন খানে খুন, কোন খানে দাঙ্গা, কোথায সিঁদ চুরী, কোন খানে ভট্টাচার্য্য মহাশযের কাছ থেকে দু ভরি রূপো গাঁটকাটায় কেটে নিয়েচে; কোথাও মাগির নাকে থেকে নথটা ছিঁড়ে নিয়েচে; পাহারাওয়ালারা শশব্যস্ত, পুলীশ বদ মাহিশ পোরা, চোরেরা পূজোর মোর্শমে দেদার কারববি ফ্যালাও কচ্চে। “লাগে তাক্ না লাগে তুক্কো” “কিনিতো হাতী, লুটীত ভাঙার” তাদের জপমন্ত্র হযেছে; অনেকে পার্ব্বণের পূর্ব্বে শ্রীঘরে ও বাঙ্কুলে বসতি কচ্চে; কারো পুজোয় পাথরে পাঁচ কিল; কারো সর্ব্বনাশ! ক্রমে চতুর্থী এসে পড়‍্লো।“

 এবার অমুক বাবুর নতুন বাড়ীতে পুজার ভারি ধূম। প্রতিপদাদি কল্পের পর ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা বিদায় আরম্ভ হয়েচে, আজও চোকে নাই—ব্রাহ্মণ পণ্ডিতে বাড়ী গিশগিশ কচ্চে। বাবু দেড়ফিট উচ্চ গদির উপোর তসর কাপড় পরে বার দিয়ে বসেচেন, দক্ষিণে দেওয়ান টাকা ও সিকী আধুলীর তোড়া নিয়ে খাতা খুলে বসেচেন, বামে হবীশ্বর ন্যায়লঙ্কার সভাপণ্ডিত অনবরত নশ্য নিচ্চেন ও নাসানিঃসৃত রঙ্গিণ কফ জল জাজিমে পুঁচ্চেন। এ দিকে জহুরী জড়ওয়া গহনার পুঁটুলী ও ঢাকাই মহাজন ঢাকাই শাড়ীর গাঁট নিয়ে বসেচে, মুন‍্সি, মোশাই, জামাই ও ভাগনে বাবুরা ফর্দ্দ কচ্চেন, সামনে কতকগুলি প্রিতিমে ফ্যালা দুর্গাদায়গ্রস্ত ব্রাহ্মণ, বাইযের দালাল, যাত্রার অধিকারী ও গাইয়ে ভিক্ষুক “যে আজ্ঞা” “ধর্ম্ম অবতার” প্রভৃতি প্রিয়বাক্যের উপহার দিচ্চেন। বাবু মধ্যে মধ্যে কারেও অ্যাক আধটা আগমনী গাইবার ফরমাস কচ্চেন। কেও খোস গল্প ও অন্য বড় মানুষের নিন্দাবাদ করে বাবুর মনোরঞ্জনের উপক্রমণিকা কচ্চেন,—আসল মত‍্লব দ্বৈপযান হ্রদে রয়েচে, উপযুক্ত সময়ে তীরস্থ হবে। আতরওয়ালা, তামাকওয়ালা, দানাওয়ালা ও অন্যান্য পাওনাদর মহাজনরা বাইরে বারণ্ডায় ঘুচ্চে— পূজো যায় তথাচ তাদের হিসেব নিকেস হচ্চে না। সভাপণ্ডিত মহাশয় সবপটে পিরিলীর বাড়ীর বিদেয় নেওয়া ও বিধবাদলের এবং বিপক্ষপক্ষের ব্রাহ্মণদের নাম কাট্‌চেন; অনেকে তাঁর পা ছুঁয়ে দিব্বি গালচেন যে, তাঁরা পিরিলীর বাড়ী চেনেন না, বিধবা বিয়ের সভায় যাওয়া চুলোয় যাক, গত বৎসর শয্যাগত ছিলেন বল্লেই হয়। কিন্তু বাণের মুখের জেলেডিঙ্গির মত তাঁদের কথা তল্ হয়ে যাচ্চে, নামকাটাদের পরিবর্ত্তে সভাপণ্ডিত আপনার জামাই, ভাগনে, নাতজামাই দৌত্তব ও খুড়তুতো ভেয়েদের নাম হাসিল কচ্চেন; এ দিগে নামকাটারা বাবু ও সভাপণ্ডিতকে বাপোন্ত করে পৈতে ছিঁড়ে গালে চড়িয়ে শাঁপ দিয়ে উঠে যাচ্চেন। অনেক উমেদারের অনিয়ত হাজ‍্বের পর বাবু কাকেও “আজ যাও” “কাল এসো” “হবে না” “এবার এই হলো” প্রভৃতি অনুজ্ঞায় আপ্যায়িত কচ্চেন=হজুরী সরকারের হেক্‌মত দ্যাখে কে, সকলেই শশব্যস্ত, পূজার ভারি ধূম!

 ক্রমে চতুর্থীর অবসান হলো, পঞ্চমী প্রভাত হলেন— ময়রারা দুর্গোমোণ্ডা ও আগতোলা সন্দেশের ওজন দিতে আরম্ভ কল্লে পাঁঠার রেজিমেণ্টকে বেজিমেণ্ট বাজারে প্যারেড্ কত্তে লাগলো, গন্ধবেণেরা মস‍্লা ও মাথাঘসা বেঁধে বেঁধে ক্লান্ত হয়ে পড়‍্লো। আজ সহরের বড় রাস্তায় চলা ভার; মুটেরা প্রিমিয়মে মোট বইচে, দোকানে খদ্দের বসবার স্থান নাই। পঞ্চমী এইরূপে কেটে গ্যাল। আজ ষষ্ঠি, বাজারের শেষ কেনা বেচা, মহাজনের শেষ তাগাদা, আশার শেষ ভরসা। আজ আমাদের বাবুর বাড়ীরও অপুর্ব্ব শোভা, সব চাকর বাকর নতুন তক‍্মা, উর্দ্দী ও কাপড় পোরে ঘুরে বেড়াচ্চে, দরজার দুই দিগে পূর্ণকুম্ভ ও আম্রসার দেওয়া হয়েছে, ঢুলীরা মধ্যে মধ্যে রোশনচৌকী ও শানাইয়ের সঙ্গে বাজাচ্চে, জামাই ও ভাগনে বাবুরা নতুন জুতো ও নতুন কাপড় পোরে ফররা দিচ্চেন, বাড়ীর কোন বৈঠক খানায় আগমনী গাওনা হচ্চে, কোথাও নতুন তাস জোড়া পরকান হচ্চে, সমবয়সী ও ভিক্ষুকের ম্যালা লেগেছে, আতরের উমেদারেরা বাবুদের কাছে শিশি হাতে করে সাত দিন ঘুচ্চে, কিন্তু বাবুদের এমনি অনবকাশ যে দুফোঁটা আতর দানের অবসর হচ্চে না।

 এ দিকে সহরের বাজারের, মোড়ে ও চৌরাস্তায় ঢুলী ও বাজন্দারের ভীড়ে সেঁদোনো ভার। রাজপথ লোকারণ্য; মালীরা পথের ধারে পদ্ম, চাঁদমালা, বিল্লীপত্তর ও কুঁচোফুলের দোকান সাজিয়ে বসেচে; দইয়ের ভার মণ্ডার খুলী ও লুচী কচুবীর ওড়ায় রাস্তা জুড়্যে গ্যেছে; রেও ভাট ও আমাদের মত ফলারেরা মিমো করে নিচ্ছে-কোথা যায়?

 ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় সহরে প্রিতিমার অধিবাস হয়ে গ্যাল, কিছু ক্ষণ ঢোল ঢাকের শব্দ থাম্‌লো, পূজো বাড়ীতে ক্রমে “আনবে” “করবে” এটা কি হোল” কত্তে কত্তে যষ্ঠীর শর্ব্বরী অবসন্না হলো, সুখতাবা মৃদু পবন আশ্রয় করে উদয় হলেন, পাখিরা প্রভাত প্রত্যক্ষ করে ক্রমে ক্রমে বাসা পরিত্যাগ কত্তে আরম্ভ কল্লে; সেই সঙ্গে সহরের চারি দিগে বাজ‍্না বাদ্দি ব্যেজে উঠ‍্লো, নবপত্রিকার স্নানের জন্য কর্ম্মকর্ত্তারা শশব্যস্ত হলেন—ভাবুকের ভাবনায় বোধ হতে লাগলো, য্যান সপ্তমী কোরমাকান নতুন কাপড় পরিধান করে হাঁস‍্তে হাঁস‍্তে উপস্থিত হলেন।

 এদিকে সহরের সকল কলাবউয়েরা বাজনা বাদ্দি করে স্নান কত্তে বেরুলেন, বাড়ীর ছেলেরা কাঁশর ও ঘড়ী বাজাতে বাজাতে সঙ্গে সঙ্গে চল্লো—এ দিকে বাবুর কলাবউয়েরাও স্নানের সরঞ্জাম বেরুলো, আগে আগে কাড়া নাগরা, ঢোল ও সানাইদারেরা বাজাতে বাজাতে চল্লো, তার পেছনে নতুন কাপড় পোরে আশা শোঁটা হাতে বাড়ীর দরওনেরা, তার পশ্চাৎ কলাবউ কোলে পুরোহিত, পুঁতি হাতে তন্ত্রধারক, বাড়ীর আচার্য্য বামুন, গুরু ও সভাপণ্ডিত, তার পশ্চাৎ বাবু, বাবুর মস্তকে লালসাঠিনের রূপোর রাম ছাতা ধরেচে, আশে পাশে ভাগ‍্নে, ভাইপো ও জামাইয়েরা, পশ্চাৎ আমলা ফযলা ও ঘরজামাইয়ে ভগিনীপতিরা, মোসাহেব ও বাজেদল, তাব শেষে নৈবিদ্দ, লাণ্টন ও পুষ্পপাত্র, শাঁক ঘণ্টা ও কুশাসন প্রভৃতি পূজার সরাঞ্জাম মাথায় মালীরা। এইপ্রকার সরঞ্জামে প্রসন্নকুমার ঠাকুর বাবুর ঘাটে কলাবউ নাওয়াতে চল্লেন, ক্রমে ঘাটে পৌঁছলে কলাবউয়ের পূজো ও স্নানের অবকাশে হজুরও গঙ্গার পবিত্র জলে স্নান করে নিয়ে স্তব পাঠ কত্তকত্তে অনুরূপ বাজনা বাদ্দির সঙ্গে বাড়িমুকো হলেন।

 পাঠকবর্গ। এ সহরে আজ, কাল দুচার এজুকেড্ ইয়ংবেঙ্গাল ও পৌতলিকাতার দাস হয়ে পুজো আচ্ছা করে থাকেন ব্রাহ্মণ ভোজনের বদলে কতকগুলি দিল‍্দোস্ত মদে ভাতে প্রসাদ পান, আলাপি ফিমেল ফ্রেণ্ডেরাও নিমন্ত্রিত হয়ে থাকেন, পূজোরো কিছু রিফাইণ্ড কেতা। কারণ অপর হিন্দুদের বাড়ী নিমন্ত্রিত প্রদত্ত প্রণামীটাকা পুরোহিত ব্রাহ্মনেরই প্রাপ্য, কিন্তু এঁদের বাড়ী প্রণামীর টাকা বাবুর অ্যাকৌউণ্টে ব্যাঙ্কে জমা হয়; প্রতিমের সামনে বিলিতী চরবীর বাতী জ্বলে ও পূজোর দালানে জুতো নিয়ে ওঠ‍্বার অ্যালাওযেন্‌স থাকে। বিলেত থ্যাকে অর্ডর দিয়ে সাজ্ আনিয়ে প্রতিমে সাজান হয়—মা দুর্গা মুকুটের পরিবর্ত্তে বনেট্ পরেন, শ্যাণ্ডউইচের শেতল খান্ আর কলাবউ গঙ্গাজলের পরিবর্ত্তে কাৎলীকরা গরম জলে স্নান করে থাকেন, শেষে সেই প্রসাদী গরম জলে কর্ম্মকর্ত্তার প্রাতরাশের টি ও কফি প্রস্তুত হয়।

 ক্রমে তাবৎ কলাবউয়েরা স্নান করে ঘরে ঢুক‍্লেন। এ দিকে পূজাও আরম্ভ হলো, চণ্ডীমণ্ডপে বারকোসের উপর আগাতোলা মোণ্ডাওয়ালা নৈবিদ্দ সাজান হলো, সঙ্গীত বুঝে চেলীর শাড়ী, চিনীর থাল, ঘড়া, চুম‍্কীঘটী ও সোণার লোহা; নয় ত কোথাও সন্দেশের পরিবর্ত্তে গুড় ও মধুপর্কের বাটীর বদলে খুরী ব্যবস্থা। ক্রমে পূজো শেষ হলো; ভক্তরা অ্যাতক্ষণ অনাহারে থেকে পূজোর শেষে প্রতিমারে পুষ্পাঞ্জলি দিলেন, বাড়ীর গিন্নিরা চণ্ডী শুনে জল খেতে গ্যালেন; কারো বা নবরাত্তির। আমাদের বাবুর বাড়ীর পূজোও শেষ হলো প্রায়, বলিদানের উদ্‌যোগ হচ্চে; বাবু মায় ষ্টাফ্ আদুড়গায়ে উঠানে দাঁড়িয়েচেন, কামার কোমোর বেঁধে প্রতিমের কাচ্ থেকে পূজোও প্রতিষ্ঠা করা খাঁড়া নিয়ে কাণে আশীর্ব্বাদী ফুল গুঁজে হাড়কাটের কাছে উপস্থিত হলো, পাশ্ থ্যেকে অ্যাক্ জন মোসাহেব “খুটী ছাড়! খুটী ছাড়!” বোলে চেঁচিয়ে উঠলেন, গঙ্গজালের ছড়া দিয়ে পাঁঠাকে হাড়কাটে পূরে দিয়ে খীল এঁটে দেওয়া হলো, অ্যাক্ জন পাঁঠার মুড়ি ও আর অ্যাক্ জন ধড়টা ট্যেনে ধল্লে—অমনি কামার জয় মা! মা গো! বোল্যেকোপ, তুল্লে, বাবুরাও সেই সঙ্গে জয় মা! মা গো! বলে প্রতিমের দিকে ফিরে চেঁচাতে লাগলেন—ছপ্ কোরে কোপ পড়ে গ্যাল—গীজা গীজা গীজা গীজা, নাক টুপ্ টুপ্‌ টুপ্, গীজা গীজা গীজা গীজা, নাক টুপ্ টুপ্ টুপ্ শব্দে ঢোল, কাড়ানাগরা ও ট্যাম‍্টেমী ব্যেজে উঠ‍্লো; কামার শরাতে সমাংস করে দিলে পাঁঠার মুড়ির মুখ চ্যেপে ধরে দালানে পাঠানা হলো, এদিকে অ্যাক‍্জন মোসাহেব সন্তর্পণে খর্পরেপ শরা আচ্ছ্বাদন কর্যে প্রতিমের সম্মুখে উপস্থিত কল্পে, বাবুরা বাজনার তরঙ্গের মধ্যে হাত্তালী দিতে দিতে ধীরে ধীরে চণ্ডীমণ্ডপে উঠলেন—প্রতিমার সাম‍্নে দানের সামগ্রী ও প্রদীপ জ্বেলে দেওয়া হলে আরতি আরম্ভ হলো, বাবু স্বহস্তে ধবল গঙ্গাজল চামর বীজন কত্তে লাগ‍্লেন,ধূপ ধুনোর ধোঁয়ে বাড়ি অন্ধকার হয়ে গ্যাল, এইরূপে আধঘণ্টা আরতীর পর শাঁক ব্যেজে উঠলো, সবাবু সকলে ভূমিষ্ট হয়ে প্রণাম করে বৈঠকখানায় গ্যালেন। এদিকে দালানে বামুনরা নৈবিদ্দ নিয়ে কাড়াকাড়ি কত্তে লাগলো। দেখ‍্তে দেখ‍্তে সপ্তমীও ফুরালো। ক্রমে নৈবিদ্দ বিলি, কাঙ্গালী বিদায় ও জলপান বিলানোতেই সে দিনের অবশিষ্ট সময় অতিবাহিত হয়ে গ্যাল, বৈকালে চণ্ডীর গানওয়ালারা খানিক্ ক্ষণ আসর জাগিয়ে বিদায় হলো— জগা স্যাকরা চণ্ডীর গানের প্রকৃত ওস্তাদ ছিল, সে মরে যাওয়াতেই আর চণ্ডীর গানের প্রকৃত গায়ক নাই; বিশেষত এক্ষণে শ্রোতাও অতিদুলর্ভ হয়েছে।

 ক্রমে ছটা বাজ‍্লো, দালানের গ্যাসের ঝাড় জ্বেলেদিয়ে প্রতিমার আরতী আরম্ভ করে দেওয়া হলো এবং মা দুর্গার শেতলের জলপান ও অন্যান্য সরঞ্জামও সেই সময় দালানে সাজিয়ে দেওয়া হলো—মা দুর্গা যত খান বা না খান, লোকে দেখে প্রশংসা কল্লেই বাবুর দশটাকা খরচের সার্থকতা হবে। এদিকে সন্ধ্যার সঙ্গে দর্শকের ভিড় বাড়তে লাগ‍্লো, বাঙ্গাল দোকান‍্দার, ঘুস‍্কী ও খান‍্কী ক্ষুদে ক্ষুদে ছেলে ও আদ‍্বইসি ছোঁড়া সঙ্গে খাতায় খাতায় প্রতিমে দেখ‍্তে আস‍্তে লাগ‍্লো। এদিকে নিমন্ত্রিতেরা সেজে গুঁজে এসে টনাৎ করে অ্যাক‍্টা টাকা ফ্যেলে দিয়ে প্রণাম কল্লে, অমনি পুরুত অ্যাক‍্ছড়া ফুলের মালা নেমন্তন্নের গলায় দিয়ে টাকাটা কুড়িয়ে ট্যাকে গুঁজ‍্লেন, নেমন্তন্নেও হন্ হন্ করে চলে গ্যালেন। কল‍্কেতা সহরের এই একটি বড় আজ‍্গুবি কেতা অনেক স্থলে নিমন্ত্রিতে ও কর্ম্মকর্ত্তায় চোরে কামারের মত সাক্ষাৎ ও হয় না, কোথাও পুরোহিত বলে দ্যান “বাবুরা ওপরে, ঐ সিঁড়ি মসাই জান্‌না। “কিন্তু নিমন্ত্রিত য্যান চিরপ্রচলিত রীতি অনুসারেই” আজ্ঞে না আরো পাঁচ জায়গায় যেতে হবে থাক্” বলে টাকাটি দিয়েই অমনি গাড়িতে ওঠেন কোথাও যদি কর্ম্মকর্ত্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়; তবে গীরগীটের মত উভয়ে অ্যাক‍্বার ঘাড় নাড়ানাড়ি মাত্র হয়ে থাকে―সন্দেশ, মেঠাই চূলোয় যাক্, পান তামাক মাথায় থাক্, প্রায় সর্ব্বত্রই সাদর সম্ভাষণেরও বিলক্ষণ অপ্রতুল―দুই অ্যাক্ জায়গায় কর্ম্মকর্ত্তা জরির মছলন্দ প্যেতে, সাম‍্নে আতরদান, গোলাপ‍্পাস সাজিয়ে পয়সার দোকানের পোদ্দা রের মত বসে থাকেন। কোন বাড়ীর বৈঠকখানায় চোহেলের রৈ রৈ ও হৈ চৈয়ের তুফানে নেমন্তন্নেদের সেঁদুতে ভরসা হয় না-পাছে কর্ম্মকর্ত্তা তোড়ে কামড়ান। কোথায় দরজা বন্ধ, বৈঠকখানা অন্ধকার, হয় ত বাবু ঘুমুচ্চেন, নয় বেরিয়ে গ্যাছেন, দালানে জন মানব নাই, নেমন্ত্তন্নে কার সমুখে যে প্রণামী টাকাটি ফ্যেল‍্বেন ও কি কর‍্বেন, তা ভেবে স্থির কত্তে পারেন না, কর্ম্মকর্ত্তার ব্যাভার দ্যেখে প্রতিমে পর্য্যন্ত অপ্রস্তুত হন। অথচ এ রকম নিমন্ত্রণ না কল্লেই নয়। এই দরুণ অনেক ভদ্র লোক আজ কাল আর “সামাজিক„ নেমন্তন্নে স্বয়ং জান না, ভাগ্‌নে বা ছ্যেলে পুলের দ্বারাতেই ক্রিয়ে বাড়ির পুরুতের প্রাপ্য কিম্বা বাবুদের ওৎকরা টিকা টি পাঠিয়ে দ্যান কিন্তু আমাদের ছ্যেলে পুলে না থাকায় স্বয়ং গমনে অসমর্থ হওয়ায় স্থির করেছি, এবার অবধি প্রণামীর টাকায় পোষ্টেজ্ ষ্টাম্প কিনে ডাকে পাঠিয়ে দেবো, ত্যামন ত্যামন আত্মীয় স্থলে (সেফ্ অ্যারাইভ্যালের জন্য) রেজে ষ্টরী কবে পাঠান যাবে; যে প্রকারে হোক্, টাকাটি পৌঁছনো নে বিষয়। অধ্যাপক ভায়ারা এ বিষয়ে অনেক সুবিদে করে দিয়েচেন, পূজো ফুরিয়ে গেলে তাঁরা প্রণামীর টাকাটি আদায় কত্তে স্বয়ং ক্লেশ নিয়ে থাকেন, নেমন্তন্নের পূর্ব্ব হতে পূজোর শেষে তাঁদের আত্মীয়তা আরো বৃদ্ধি হয়, অনেকের প্রণামী চাইতে আসাই পূজোর প্রূফ্।

 মনে করুন, আমাদের বাবু বনেদী বড় মানুষ; চাইল সতন্তর, আরতীর পর বানারসী জোড় পব্যে সভাসদ সঙ্গে নিয়ে দালানে বার দিলেন, অম‍্নি তক‍্মাপরা বাঁকা দরওয়ানেরা তলয়ার খুলে পাহারা দিতে লাগলো; হরকরা, হুঁকোবরদার, বিবির বাড়ীর বেহারা ও মোসাহেবরা জোড়হস্ত হয়ে দাঁড়ালো কখন কি ফরমাস হয়। বাবুর সামনে অ্যাক্‌টা সোনার আল‍্বোলা, ডাইনে অ্যাক্‌টা পান্নাবসান ফুরসি, বাঁয়ে অ্যাক্‌টা হীরে বসান টোপদার গুড়গুড়ি ও পেছনে অ্যাক‍্টা মুক্তোবসান পেঁচুয়া পড়‍্লো; বাবু আঁস্তাকুড়ের কুকুরের মত ইচ্ছা অনুসারে আসে পাশে মুখ দিচ্চেন ও আড়ে আড়ে সাম‍্নে বাজেলোকের ভিড়ের দিকে দেখ‍্চেন— লোকে কোন‍্টার কারিগরীর প্রশংসা কচ্চে; যে রকমে হোক্, লোক‍্কে দ্যাখান চাই যে, বাবুর রূপো সোণার জিনিস্ অঢেল, অ্যামন কি, বসাবার স্থান থাক‍্লে আরো দুটো ফুরসি বা গুড়গুড়ী দ্যাখান যেতো। ক্রমে অনেক অনাহুত ও নিমন্ত্রিত জড় হতে লাগ‍্লেন, বাজেলোকে চণ্ডীমণ্ডপ পুরে গ্যাল, জুতো চোরে সেই লাঙ্গাতলওযারের পাহারার ভেতরথ্যেকেও দু ঝুড়ী জুতো সরিয়ে ফেল্লে। কচ্ছপ জলে থ্যেকেও ডাঙ্গাস্থ ডিমের প্রতি যেমন মন রাখে, সেইরূপ অনেকে দালানে বসে বাবুর সঙ্গে কথাবার্ত্তার মধ্যে আপনার জুতোর ওপোরও নজর রেখেছিলেন; কিন্তু ওঠার সময দ্যাখেন্ যে, জুতোরাম কচ্ছপের ডিমের মত ফুটে সরেচেন, ভাঙ্গা ডিমের খোলার মত হয় ত অ্যাক‍্পাটি ছেঁড়াচটি পড়ে আছে।

 এ দিকে দেখ‍্তে দেখ‍্তে গুড়ুম্ করে নটার তোপ্ পড়ে গ্যাল; ছেলেরা “বোমকালী কলকেত্তাওয়ালী” বোলে চেঁচিয়ে উঠলো। বাবুর বাড়ী নাচ, সুতরাং বাবু আর অধিক ক্ষণ দালানে বোস‍্তে পাল্লেন না, বৈঠকখানায় কাপড় ছাড়‍্তে গ্যালেন, এ দিকে উঠানের সমস্ত গ্যাস জ্বেলে দিয়ে মজ‍্লিসের উদযোগ হতে লাগলো, ভাগ‍্নেরা ট্যাসল দেওয়া টুপী ও পেটী পোরে ফপরদালালী কত্তে লাগ‍্লেন। এ দিকে দুই অ্যাক‍্জন নাচের মজলিসি নেমন্তন্নে আস‍্তে লাগ‍্লেন। মজ‍্লিসে তরফা নাবিয়ে দেওয়া হলো। বাবু জরি ও কালাবৎ এবং নানাবিধ জড়ওয়া গহনায় ভূষিত হয়ে ঠিক্ একটি “ইজিপ্‌সন্ মমী” স্যেজ্যে মজ‍্লিসে বার দিলেন―বাই সারঙ্গের সঙ্গে গান করে সভাস্থ সমস্তকে মোহিত কত্তে লাগ্‌লেন।

 নেমত্তুন্নেরা নাচ্ দেখ‍্তে থাকুন,বাবু ফররা দিন্ ও লালচোকে রাজা উজীর মারুন—পাঠকবর্গ অ্যাক‍্বার সহরটার শোভা দেখুন—প্রায় সকল বাড়ীতেই নানা প্রকার রং তামাসা আরম্ভ হয়েচে। লোকেরা খাতায় খাতায় বাড়ি বাড়ি পূজো দ্যেখে ব্যাড়াচ্চে। রাস্তায় বেজায় ভীড়! মাড়ওয়ারি খোট্টার পাল, মাগির খাতা ও ইয়ারের দলে রাস্তা পুরে গ্যাচে। নেমন্তন্নের হাত লাঠনওয়ালা, বড় বড় গাড়ীর সইসেরা প্রলয় শব্দে পইস্ পইস্ কচ্চে, অথচ গাড়ী চালাবার বড় বেগতিক। কোথায় সকের কবি হচ্চে, ঢোলের চাটি ও গাওনার চীৎকারে নিদ্রাদেবী সে পাড়া থেকে ছুটে পালিয়েচেন, গানের তানে ঘুমন্তো ছোলেরা মার কোলে ক্ষণে ক্ষণে চম‍্কে উঠচে। কোথাও পাঁচালী আরম্ভ হয়েচে, বওয়াটে পিল্ ইয়ার ছোকরারা ভরপুর নেশায় ভোঁ হয়ে ছড়া কাট‍্চেন ও আপনা আপনি বাহোবা দিচ্চেন; রাত্তির শেষে শ্রাদ্ধ গড়াবে,অবশেষে পুলিশে দক্ষিণা দেবে। কোথায় যাত্রা হচ্চে, মণিগোঁসাই সং এসেচে, ছেলেরা মণিগোঁসায়ের রসিকতায় আহ্লাদে আটখানা হচ্চে, আসে পাশে চিকের ভেতর মেয়েরা উঁকী মাচ্চে, মজলিসে রাম মসাল জ্বল‍্চে, বাজে দর্শকদের বাতকর্ম্ম ও মসালের দুর্গন্ধে পূজোবাড়ীতে তিষ্ঠন ভার, ধূপ ধূনোর গন্ধও হার মেনেচে। কোন খানে পূজোবাড়ীর বাবুরাই খোদ মজ‍্লিস রেখেচেন―বৈঠকখানায় পাঁচো ইয়ার জুটে নেউল নাচানো, ব্যাং নাপানো, খ্যামটা ও বিদ্যাসুন্দর আরম্ভ করেচেন; অ্যাক্ অ্যাক্ বারের হাঁসির গরবায় সিয়াল ডাকে ও মদন আগুণের তানে―দালানে ভগবতী ভয়ে কাঁপ্‌চেন, সিঙ্গি চোরাকে কামড়ান পরিত্যাগ করে ন্যাজ গুটিয়ে পলাবার পথ দেখচে, লক্ষ্মী সরস্বতী শশব্যস্ত! এ দিকে সহরের সকল রাস্তাতেই লোকের ভিড়, সকল বাড়ীই আলোময়।

 এই প্রকারে সপ্তমী, অষ্টমী ও সন্ধিপূজো কেটে গ্যালো। আজ নবমী; আজ পূজোর শেষ দিন; এত দিন লোকের মনে যে আহলাদটী জোয়ারের জলের মত বাড়‍্তে ছিল, আজ সেইটির একেবারে সারভাটা।

 আজ কোথাও জোড়া মোষ, কোথাও নববুটাই পাঁটা, শুপারি, আক, কুমড়ো,মাগুরমাছ ও মরীচ বলিদান হয়েচে; কর্ম্মকর্ত্তা পাত্র টেনে পাঁচোইয়ারে জুটে নবমী গাচ্চেন ও কাদা মাটি কচ্চেন, ঢুলীর ঢোলে সঙ্গত হচ্চে উঠানে লোকারণ্য; উপর থেকে বাড়ীর মেয়েরা উকীনবমী মেরে দেখ‍্চেন। কোথাও হোমের ধূমে বাড়ী অন্ধকার হয়ে গেচে, কার সাধ্য প্রবেশ করে―কাঙ্গালী, ব্যেওভাট ও ভিক্ষুকের পুজোবাড়ী ঢোকা দূরে থাকুক, দরজা হতে মসাগুলো পর্য্যন্ত ফিরে যাচ্চে। ক্রমে দেখ‍্তে দেখ‍্তে দিনমণি অস্ত গ্যালেন, পূজোর আমোদ প্রায় সম্বৎসরের মত ফুরালো! ভোরাও ওক্তে ভয়বোঁ রাগিণীতে অনেক বাড়ীতে বিজয়া গাওনা হলো। ভক্তের চক্ষে ভগবতীর প্রতিমা পরদিন প্রাতে মলিন মলিন বোধ হতে লাগ‍্লো, শেষে বিসর্জ্জনের সমারোহ সুরু হলো,—আজ নিরঞ্জন।

 ক্রমে দেখ‍্তে দেখ‍্তে দশটা ব্যেজে গ্যাল; দইকড়মা ভোগ দিয়ে প্রতিমার নিরঞ্জন করা হলো, আরতীর পর বিসর্জ্জনের বাজনা বেজে উঠলো, বামুনবাড়ীর প্রতিমারা সকালেই জলসই হলেন। বড় মানুষ ও বাজে জাতির প্রতিমা পুলিশের পাশ মত বাজ‍্না বাদ্দির সঙ্গে বিসর্জ্জন হবেন —এ দিকে এ কাজ সে কাজে গির্জ্জার ঘড়িতে টুং টাং টুং টাং করে দুপুর বেজ্যে গ্যাল, সূর্য্যের মৃদু তপ্ত উত্তাপে সহর নিম্‌কী রকম গরম হযে উঠ‍্লো, এলোমেলো হাওয়ায় রাস্তার ধূলো ও কাকর উড়ে অন্ধকার করে তুল্লে। বেকার কুকুর গুলো দোকানের পাটাতনের নীচে ও খানার ধারে শুয়ে জিব‍্বাইর করে্য হাঁপাচ্চে, বোজাই গাড়ির গরুগুলোর মুক্‌দে ফ্যানা পড়‍্চে―গাড়োয়ান ভয়ানক চীৎকারে “শালার গরু চলে না” বলে ন্যাজ মল্‌চে ও পাঁচনবাড়ি মাচ্চে; কিন্তু গরুর চাল্ বেগড়াচ্চে না, বোঝাইয়ের ভরে চাকা গুলি কোঁ কোঁ শব্দে রাস্তা মাতিয়ে চলেচে। চড়াই ও কাক গুলো বারাণ্ডা, আল‍্সে ও নলের নীচে চক্ষু মুদে বসে আছে। ফিরিওয়ালারা ক্রমে ঘরে ফিরে যাচ্চে, রিপুকর্ম্ম ও পরামাণিক্‌রা অনেক ক্ষণ হলো ফিরেচে, আলু পটোল। ঘি চাই। ও তামাকওয়ালা কিছুক্ষণ হলো ফিরে গ্যাছে। ঘোল চাই মাখন চাই। ভয়সা দই। ও মালাই দইওয়ালারা কড়ি ও পয়সা গুন্তে গুন্তে ফিরে যাচ্চে, অ্যাখন কেবল মধ্যে মধ্যে পাণিফল! কাগোজ বদোল। পেয়ালা পিরিচ—বিলাতী খেলেনা বর্ত্তন চাই পেয়ালা পিরিচ। ফিরিওয়ালাদের ডাক শোনা যাচ্ছে—নৈবিদ্দি মাথায় পুজো বাড়ির লোক, পূজুরী বামুন, প্যটো ও বাজন্দার ভিন্ন রাস্তায় বাজে লোক নাই। গুপুস্ করে একটার তোপ পড়ে গ্যাল। ক্রমে অনেক স্থলে ধূমধামে বিষর্জ্জনের উদ্যোগ হতে লাগলো।

 হায়! পোত্তলিকতা কি শুভ দিনেই এস্থলে পদার্পণ করেছিল; অ্যাতো দেখে শুনে মনে স্থির জ্যেনেও আমরা তারে পরিত্যাগ কত্তে কত কষ্ট ও অসুবিধা বোধ কচ্চি ছ্যেলে ব্যালা যে পুতুল নিয়ে খেলোঘর পেতেছি, বৌ বৌ খেলেচি ও ছ্যেলে মেয়ের বে দিয়েচি, আবার বড় হয়ে সেই পুতুলকে পরমেশ্বর বলে পূজো কচ্চি, তাঁর পদাপর্ণে পুলকিত হচ্চি ও তাঁর বিসর্জ্জনে শোকের সীমা থাক্‌চে না শুধু আমরা ক্যেন—কত কত কৃতবিদ্যা বাঙ্গালী সংসারের ও জগদীশ্বরের সমস্ত তত্ত্ব অবগত থেকেও হয় ত সমাজ না হয় পরিবার পরিজনের অনুবোধে পুতুল পূজে আমোদ প্রকাশ করেন, বিসর্জ্জনের সময় কাঁদেন ও কাদারক্ত মেক্যে কোলাকূলী করেন,“কিন্তু নাস্তিকতায় নামলিখিয়ে বনে বসে থাকাও ভাল, তবু “জগদীশ্বরঅ্যাক‍্মাত্র“এটিজ্যেনে আবার পুতুল পূজায় আমোদ প্রকাশ করা উচিত নয়।

 ক্রমে সহরের বড় রাস্তা চৌমাথা লোকারণ্য হয়ে উঠলো বেশ্যালয়ের বারাণ্ডা আলাপিতে পূরে গ্যাল, ইংরাজি বাজ‍্না, নিশেন, তুরুক্‌সোয়ার ও সার্জ্জন সঙ্গে প্রতিমার রাস্তায় বাহার দিয়ে ব্যাড়াতে লাগলেন—তখন” কার্ প্রতিমা উত্তম” “কার্ সাজ ভাল“”কার্ সরঞ্জাম সরেস” প্রভৃতির প্রশংসারই প্রয়োজন হচ্চে, কিন্তু হায়। “কার‍্ভক্তি সরেস“কেউ সে বিষয়ে অনুসন্ধান করে না—কর্ম্মকর্ত্তাও তার জন্য বড় কেয়ার করেন না। এ দিকে, প্রসন্নকুমার বাবুর ঘাট ভদ্দর লোক গোচের দর্শক, খুদে খুদে পোসাক করা ছেলে, মেয়ে ও ইস্কুলবয়ে ভরে গ্যাল। কর্ম্ম কর্ত্তারা কেউ কেউ প্রতিমে নিয়ে বাচ‍্খেলিয়ে ব্যাড়াতে লাগ‍্লেন— আমুদে মিন্‌সে ও ছোঁড়ারা নৌকোর ওপোর ঢোলের সঙ্গতে নাচ‍্তে লাগলো। সৌখীন বাবুরা খ্যাম‍্টা ও বাই সঙ্গে করে বোট্, পিনেস্ ও বজরার ছাতে বার দিয়ে বস‍্লেন -মোসাহেব ও ওস্তাদ চাকরেরা কবির সুরে দু অ্যাক্‌টা ব’দার গান গাইতে লাগ‍্লো।

” বিদায় হও মা ভগবতি এ সহরে এসো নাকো আর।
দিনে দিনে কলিকাতার মর্ম্ম দেখি চমৎকার॥
জষ্টিসেবা ধর্ম্মঅবতার, কায়মনে কচ্চেন সুবিচার।
এ দিকে ধূলোর তরে রাজপথেতে চেঁচিয়ে চেয়ে চলা ভায়॥
পথে হাগা মোতা চল‍্বে না, লহোরের জল তুল‍্তে মানা;
লাইসেন্সটেক‍্স মাথটচাঁদা, পাইখানায় বাসিময়লা রবেনা।
হেল‍্থ অফিসর, সেতখানার মেজেষ্টর,
ইন্‌কমের আসেসর সাল্লে সবারে
আবার গবর্ণরের গুয়ে দৃষ্টি সৃষ্টিছাড়া ব্যাবহার।
অসহ্য হতেছে মা গো। অসাধ্যবাস করা আর।
জীয়ন্তে এই তো জ্বালা মা গো।
মলেও শান্তি পাবে না,
মুখাগ্নির দফা রফা কলেতে কর্ব্বে সৎকার।
হুতোম দাস তাই সহর ছেড়ে আস‍্মানে করেন বিহার॥

 এ দিকে দেখ‍্তে দেখ‍্তে দিনমণি য্যান সম্বৎসরের পুজোর আমোদের সঙ্গে অস্ত গ্যালেন। সন্ধ্যাবূধ বিচ্ছেদ বসন পরিধান করে দ্যাখা দিলেন। কর্ম্মকর্ত্তারা প্রতিমা নিরঞ্জন করে, নীলকণ্ঠ শঙ্কচীল উড়িয়ে “দাদা গো“দিদি গো” বাজনার সঙ্গে ঘট নিয়ে ঘরমুকো হলেন। বাড়ীতে পৌঁছে চণ্ডীমণ্ডপে পূর্ণ ঘটকে প্রণাম করে শান্তিজল নিলেন, পরে কাঁচা হলুদ ও ঘট জল খেয়ে পরস্পর কোলাকুলী কল্লেন। অবশেষে কলাপাতে দুর্গানাম লিখে সিদ্ধি খেয়ে বিজয়ার উপসংহার হলো। ক দিন মহাসমারোহের পর আজ সহরটা খাঁ খাঁ কর্ত্তে লাগ‍্লো―পৌতলিকের মন বড়ই উদাস হলো, কারণ লোকের যখন সুখের দিন থাকে, তখন সেটীর তত অনুভব কত্তে পারা যায় না, যত সেই সুখের মহিমা দুঃখের দিনে বোঝা যায়।