বিষয়বস্তুতে চলুন

হুতোম প্যাঁচার নক্সা (দ্বিতীয় ভাগ)/রামলীলা

উইকিসংকলন থেকে


রামলীলা।

 দুর্গোৎসব অ্যাক বছরের মত ফুরুলো। ঢুলীরা নায়েক বাড়ী বিদেয় হয়ে শুঁড়ীর দোকানে রং বাজাচ্চে। ভাড়া করা ঝাড়েরা মুটের মাথায় বাঁশে ঝুলে টুনু টুনু শব্দে বালাথানায় ফিরে যাচ্ছে। জজ্‌মেনে বামুনের বাড়ীর নৈবিদ্দির আলো চাল ও পঞ্চ শস্য শুকুচ্চে, ব্রাহ্মণী ছেলে কোলে করে কার্টি নিয়ে কাগ তাড়াচ্চেন। সহরটা থম্ থমে। বাসাডেরা আজো বাড়ী হতে ফেরেন্ নি, আফিস্ ও ইস্কুল খোল বার আরো চার পাঁচ দিন বিলম্ব আছে।

 যে দেশের লোকের যে কালে যে প্রকার হেম্মত থাকে, সে দেশে সে সময় সেই প্রকার কর্ম্মকাণ্ড, আমোদ প্রমোদ ও কার কারবার প্রচলিত হয়। দেশের লোকের মনই সমাজের লোকোমোটিবের মত, ব্যবহার কেবল ওদেরকর্কের কাজ করে। দেখুন, আমাদের পুর্ব্ব পুরুষেরা বঙ্গভূমি প্রস্তুত করে মল্লযুদ্ধে আমোদ প্রকাশ কত্তেন, নাটক ত্রোটকের অভিনয় দেখ‍্তেন, পরিশুদ্ধ সঙ্গীত ও সাহিত্যের উৎসাহ দিতেন; কিন্তু আজ কাল আমরা বারোইয়ারিতলায়, নয় বাড়ীতে, বেদেনীর নাচ ও “মদন আগুণের” তানে পরিতুষ্ট হচ্চি, ছোট ছোট ছেলে ও মেয়েদের অনুরোধ উপলক্ষ করে, পুতুল নাচ, পাঁচালী ও পচা খেঁউড়ে আনন্দ প্রকাশ কচ্চি, যাত্রা ওয়ালাদের “ছকুবাবু ও” সুন্দরের “সং নাবাতে হুকুম দিচ্চি। মল্ল যুদ্ধের তামাসা “দ্যাখ বুল্ বুল্ ফাইট” ও “ম্যাড়ার লড়াবে” পর্যবসিত হয়েছে। আমাদের পূর্ব্ব পুরুষেরা পরস্পর লড়াই করেচেন, আজকাল আমরা সর্ব্বদাই পরস্পরের অসাক্ষাতে নিন্দাবাদ করে থাকি, শেষে অ্যাক‍্পক্ষের “খেঁউড়ে” জিত ধরাই আছে।

 আমাদের এই প্রকার অধঃপতন হবে না ক্যান? আমরা হামা দিতে আরম্ভ করেই ঝুমী, চুষী ও শোলার পাখীতে বর্ণপরিচয় করে থাকি, কিছু পরে ঘুড়ি, লাটিম, লুকোচুরী ও বৌ বৌ খ্যালাই আমাদের যুবত্বের এন‍্ণ্টন্‌স কোর্শ হয়, শেষে তাস্, পাশা ও বড়ে টিপে মাত্ করে ডিগ্রী নিয়ে বেরুই। সুতরাং ঐ গুলি পুরোনো পড়ার মত কেবল চিরকাল আউড়ে আস‍্তে হয়; বেশীর ভাগ বয়সের পরিণামের সঙ্গে ক্রমশ কতকগুলি আনুসঙ্গিক উপসর্গ উপস্থিত হয়।

 রামলীলা এদেশের পবর্ নয়—এটি প্রলয় খোট্টাই। কিছুকাল পূর্ব্বে চানকের সেপাইদের দ্বারা এই রামলীলার সূত্রপাত হয়, পূর্ব্বে তারাই আপনা আপনি চাঁদা করে চানকের মাঠে রামবাবণের যুদ্ধের অভিনয় কত্তো; কিছুদিন এরকমে চল্যে, মধ্যে একবারে রহিত হয়ে যায়। শেষে বড়রাজারের দুচার ধনী খোট্টার উদ্যোগে ১৭৫৭ শকে পুনর্ব্বার “রামলীলা” আরম্ভ হয়। তদবধি এই বার বৎসর, রামলীলার ম্যালা চলে আশ্চে। কল‍্কেতায় আর অন্য কোন ম্যালা নাই বলেই অনেকে রমলীলায় উপস্থিত হন। এদের মধ্যে নিষ্কর্ম্মা বাবু, মাড়ওয়ারি খোট্টা, বেশ্যা ও বেণেই অধিক।

 পাঠকবর্গ মনে করুন, আপনাদের পাড়ার বনেদী বড়মানুষ ও দলপতি বাবু দেড়ফিট উচ্চ গদির ওপোর বার দিয়ে বসেছেন। গদির সামনে বড় বড় বাক্‌স ও আয়না পড়েছে,বাবুর প্রকাণ্ড আল‍্বোলা প্রতি টানে শরদেব মেঘের মত শব্দ কচ্চে, আর মুষ্ক ও মুসর্ব্বব মেশান ইরাণী তামাকের খোস‍রে বাড়ী মাত্‌ করেচে। গদির কিছু দূরে অ্যাক‍্জন খোট্টা সিদ্ধির মাজুম, হজ্মীগুলি ও পালংতোড় প্রভৃতি “কুয়ৎকি চিজ্” রুমালে বেঁধে বসে আচেন। তিনি লক্ষ্ণৌয়ের অ্যাক জনসম্পন্ন জহুরীর পুত্র, এক্ষণে সহরেই বাস, হয়ত বছর কতক হলো আফিমের তেজমন্দি খ্যালায় সর্ব্বস্বান্ত হয়ে বাবুব অবশ্য পোষ্য হয়েচেন। মনে করুন, তাঁর অনেক প্রকার হাকিমী ঔষধ জানা আছে, সিদ্ধি সম্পর্কীয় মাজুমও উত্তম রকম প্রস্তুত কত্তে পারেন; বিশেষত বিস্তর বাই, কথক ও গানে ওযালীর সহিত পরিচয় থাকায় আপন হেক্‌মত ও হুনুরিতে আজ‍্কাল বাবুর দক্ষিণ হস্ত হয়ে উঠেচেন। এঁর পাশে ভবানী বাবু ও মিসুয়ার্স আর্টফুল ডজর‍্স উকীল সাহেবদের হেড‍্কেরাণী হলধর বাবু। ভবানীবাবু ঐ অঞ্চলের অ্যাকজন বিখ্যাত লোক, আদালতে ভারি মাইনের চাকরি করেন, এ সওয়ায় অন্তঃশিলে কোম্পানির কাগজের দালালী, বড় বড় রাজা রাজড়ার আমমোক্তারী ও মকদ্দমার ম্যানেজারি করা আছে। অ্যামন কি, অনেকেই স্বীকার করে থাকেন যে, ভবানীবাবু ধড়িবাজিতে উমেশ হতে সরেস ও বিষয় কর্ম্মে জয়কৃষ্ণ হতেও জবর। ভবানীবাবুর পার্শ্বস্থ হলধরও কম নন্—মনে করুন,হলধর উকীলের বাড়ীর মকদ্দমার তদ্বিরে, ফ্যের ফন্দিতে ও জাল জালিয়াতে প্রকৃত শুভঙ্কর। হলধরের মোচা গোঁপ, মুসকের মত ভুঁড়ি, হাতে ইষ্টিকবচ, কোমরে গোট ও মাদুলি,সরু ফিন্‌ ফিনে সাদা ধুতি পরিধান তার ভিতরে অ্যক্‌টা কাচ, কপালে টাকার মত অ্যাক্‌টা রক্তচন্দনের টিপ ও দাঁতে মিসি-চাদরটা তাল পাকিয়ে কাঁদে ফেলে অনবরত তামাক খাচ্চেন ও গোঁপে তা দিয়ে য্যান বুদ্ধি পাকাচ্চেন―অ্যামন সময় বাবুর মজ‍্লিসে ফলহরি বাবু ও রামভদ্দর বাবু উপস্থিত হলেন, ফলহরি ও রামভদ্দরকে দেখে বাবু সাদর সম্ভাষণে বসালেন, হুঁক্বাবরদার তামাক দিয়ে গ্যাল, বাবুরা শ্রান্তি দূর করে তামাক্ খ্যেতে খ্যেতে একথা সে কথার পর বল্লেন “মশাই আজ রামলীলার বড় ধুম।” আজ্ শুনলেম লক্ষাণের শক্তিশেল হবে, বিস্তর বাজী পুড়বে, এখানে আসবার সময় দেখলেম ওপাড়ার রামবাবুব চৌঘুড়ি গ্যাল। শম্ভুবাবু বগীতে লক্ষ্মীকে নিয়ে যাচ্চেন—আজ্‌ বেজায় ভীড়। মশাই যাবেন না? তখনি ভবানীবাবু এই প্রস্তাবের পোষকতা করেন— বাবু ও ও রাজী হলেন—অমনি “ওরে! ওরে। কোন্ হ্যায় রে! কোন্ হ্যায়।” শব্দ পড়ে গ্যাল; আসে পাশে “খোদাবন্ধ” ও “আজ্ঞা যাইয়ে” প্রতিধ্বনি হতে লাগ‍্লো—হরকরাকে হুকুম হলো বড় ব্রিজ‍্কা ও বিলাতি জুড়ি তইরি কত্তে বল। শীগ‍্গির।

 ঠাওরাণ্, য্যান এ দিকে বাবুর ব্রীজ‍্কা প্রস্তুত হতে লাগ‍্লো, পেয়ারের আবদালীরা পাগ‍্ড়ী ও তক‍্মা পরে আয়নায় মুখ দেখচে। বাবু ড্রেসিংরুমে ঢুকে পোসাক্‌ পচ্চেন চার পাঁচ জন চাকরে পড়ে চাল্লীশ রকম প্যাটনের ট্যাসল দেওযা টুপি ও সাটীনের চাপকান পায়জামা বাছুনি কচ্চে। কোন্‌টা পল্লে বড় ভাল দ্যাখাবে বাবু মনে মনে এই ভাব‍্তে ভাব্‌তে ক্লান্ত হচ্চেন, হয় ত অ্যাকটা জামা পরে আবার খুলে ফেল্লেন। অ্যাকটা টুপি মাথায় দিয়ে আয়নায় মুখ দেখে মনে ধচ্চে না; আবার আর একটা মাথায় দেওয়া হচ্চে, সেটাও বড় ভাল মানাচ্চে না এই অবকাশে অ্যাক‍্জন মোসাহেবকে জিজ্ঞাসা কচ্চেন, ক্যামন হে এটা কি মাথায় দেবো? মোসাহেব সব দিক্ বজায় রেখে “আজ্ঞা পোসাক্ পল্লে আপনাকে জ্যামন খোলে সহরের কোন শালাকে অ্যামন খোলে না” বল্‌চেন, বাবু এই অবসরে আর অ্যাক্‌টা টুপি মাথায় দিয়ে জিজ্ঞাসা কচ্চেন,“এটা ক্যামন? মোসাহেব  “আজ্ঞে অ্যামন আর কারো নাই“বলে; বাবুর গৌরব বাড়াচ্চেন ও মধ্যে মধ্যে “আপরুচি খানা ও পররুচি পিন্না” বয়েদটা নজির কচ্চেন। এই প্রকার অনেক তর্ক বিতর্ক ও বিবেচনার পর, হয়ত অ্যাক্‌টা বেয়াড়া রকমের পোশাক পরে, শেষে পোমেটম, ল্যাভেণ্ডার ও আতর ম্যেখে আংটী চেন ও ইষ্টিক বেচে নিয়ে দুঘণ্টার পর বাবু ড্রেসিংরুম হতে বৈটকখানায় বার দিলেন। হলধর, ভবানী, রামভদ্দর প্রভৃতি বৈটকখানাস্থ সকলেই আপনাদের কর্ত্তব্য কর্ম্ম বলেই য্যান” আজ্ঞে পোসাকে আপনাকে বড় খুলেচে” বলে নানা প্রকার প্রশংসা কত্তে লাগ‍্লেন, কেউ বল্লেন, হজুর” একি গিদ‍্সনের বাড়ির তইরি না? কেউ ঘড়ির চেন, কেউ আংটী ও ইষ্টিকের অনিয়ত প্রশংসা কত্তে আরম্ভ কল্লেন।

 মোশাহেবদের মধ্যে যাঁদের কাপড় চোপড় গুলি, বাবুর ব্রিজ‍্কা ও বিলাতী জুড়ির যোগ্য নয়, তাঁরা বাবুর প্রসাদি কাপড় চোপর পরে, কানে আতরের তুলো গুঁজে, চেহারা খুলে নিলেন, প্রসাদি পোসাক পরে মোশাহেবদের আর আহ্লাদের সীমা রইলো না। মনে হতে লাগলো“বাড়ির কাছের উঠ‍্নোওয়ালা মুদি মাগি ও চেনা লোকেবা য্যান দেখতে পায়, আমি ক্যামন পোশাকে হুজুরের সঙ্গে যাচ্চি” কিন্তু দুঃখের বিষয় এই, যে অনেক মোসাহেব সর্ব্বদাই আক্ষেপ করে থাকেন যে, তাঁরা যখন বাবুদের সঙ্গে বড় বড় গাড়ী ও ভাল কাপড় চোপড় পরে বেরোন্ তখন কেউ তাঁদের দেখুতে পান না, আর গাম্‌ছা কাঁদে করে বাজার কত্তে বেরুলেই সকলের নজরে পড়েন।

 এ দিকে টুং টাং টুং টাং করে মেকাবী ক্লাকে পাঁচটা বাজ্লো “হজুর গাড়ি হাজির” বলে হরকরা হুজুরে প্রোক্লেম কল্লে, বাবু মোশাহেবদের সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে উঠ‍্লেন―বিলাতী জুড়ি কৌচম্যানের ইঙ্গিতে টপাটপ্‌ টপাটপ্ শব্দে রাস্তা কাঁপিয়ে বাবুকে নিয়ে বেরিয়ে গ্যাল।

 এ দিকে চাকরেরা “রাম বাঁচলুম” বলে কেউ বাবুর মছলন্দে গড়িয়ে পড়লো, কেউ হজুবের শোনাবাঁদান হুকোটা টেনে দেখ‍্তে লাগ‍্লো―অনেকে বাবুর ব্যবহারের কাপোড় চোপড় পরে ব্যাড়াতে বেরুলো, সহরের অনেক বড়মানুষের বাড়ি বাবুদের সাক্ষাতে বড় আঁটা আঁটী থাকে, কিন্তু তাঁদের অসাক্ষাতে বাড়ির অনেক ভাগ উদোম্‌ এলো হয়ে পড়ে।

 ক্রমে বাবুর ব্রিজ‍্কা চিতপুর রোডে এসে পড়‍্লো। চিতপুর রোডে আজ‍্ গাড়ি ঘোঁড়ার অসম্ভব ভিড়। মাড়ওয়ারী খোট্টা ও বেশ্যারা খাতায় খাতায় ছক্কড় ও কেরাঞ্চীতে রামলীলা দেখ‍্তে চলেচে যাঁরা যোত্রহীন, তাঁরাও সকের অনুরোধ অ্যাড়াতে না পেরে হেঁটেই চলেচেন―কল‍্কেতা সহরের এই একটা আজব্ গুণ যে, মজুর হতে লক্ষপতি পর্য্যন্ত সকলের মনে সমান শক্। বড় লোকেরা দানসাগরে যাহা নির্ব্বাহ কর্ব্বেন, সামান্যলোককে ভীক্ষা বা চুরী পর্যন্ত স্বীকার করেও কায় ক্লেশে তিলকাঞ্চনে সেটীর নকল কত্তে হবে।

 আন্দাজ করুন, য্যান এ দিকে ছক্কড় ও বড় বড় গাড়ীর গড়িতে রাস্তার ধুলো উড়িয়ে সহর অন্ধকার করে তুল্লে। সূর্য্যাদেবও সমস্ত দিন কমলিনীর সহবাসে কাটিয়ে সুরতপরিশ্রান্ত নাগরের মত ক্লান্ত হয়ে শ্রান্তি দূর করবার জন্যই য্যান অস্তাচল আশ্রয় কল্লেন; প্রিয়সখী প্রদোষের পিছে পিছে অভিসারিণী সন্ধ্যাবধূ ধীরে ধীরে সতিনী সর্ব্বরীর অনুসরণে নির্গতা হলেন; রহস্যজ্ঞ অন্ধকার সমস্ত দিন নিভৃতে লুকিয়ে ছিলো, অ্যাখন পাকিদের সঙ্কেত বাক্যে অবসর বুঝে ক্রমশ দিক্‌সকল আচ্ছাদিত করে নিশানাথের নিমিত্ত অপূর্ব্ব বিহারস্থল প্রস্তুত কত্তে আরম্ভ কল্লে। এদিকে বাবুর ব্রিজ‍্কা রামলীলার রঙ্গভূমিতে উপস্থিত হলো। রামলীলার রঙ্গভূমি, রাজা বাহাদুরের বাগান খানি পুর্ব্বে সহরের প্রধান ছিল, কিন্তু কুলপ্রদীপ কুমারদের কল্যাণে আজ‍্কাল প্রকৃত চিড়িয়াখানা হয়ে উঠেছে। পূর্ব্বে রামলীলা ঐ রাজা বদ্দিনাথ বাহাদুরের বাগানেতেই হতো; গত বৎসর হতে রহিত হয়ে রাজা নরসিংহ বাহাদুরের বাগানে আরম্ভ হয়েছে। নরসিংহ বাহাদুরের ফুলগাছের উপর যার পর নাই শক্ ছিল এবং চিরকাল এই ফুলগাছের উপাসনা করেই কাটিয়ে গ্যাচেন, সুতরাং তাঁর বাগান সহরের শ্রেষ্ঠ হবে বড় বিচিত্র নয়। অ্যামন কি অনেকেই স্বীকার করেচেন যে, গাছেরপারি পাট্যে রাজা বাহাদুরদের বাগান কোম্পানীর বাগান হতে বড় খাট ছিল না কিন্তু বর্ত্তমান কুমার বাহাদুর পিতার মৃত্যুর মাসেকের মধ্যে বাগান খানি অয়রান করে ফেল্লেন; বড় বড় গাছগুলি উপড়ে বিক্রি করা হলো, রাজা বাহাদুরের পুরাতন জুতো পর্য্যন্ত পড়ে রইলো না, যে প্রকারে হোক্ টাকা উপার্জ্জন করাই কুমার বাহাদুরের মতে কর্ত্তব্য কর্ম্ম। সুতরাং শেষে এই শ্রেষ্ঠ বাগান রামলীলার রঙ্গভূমি হয়ে উঠ‍্লো, ঘরে বাইরে বানর নাচ‍্তে নাগ‍্লো, সহরে শোরোত্ উঠলো এবার বদ্দিনাথের বদলে রাজা নরসিংহের বাগানে “রামলীলা” কিন্তু এবার গাড়ি ঘোড়ার টিকিট রাজা বদ্দিনাথের বাগানে রামলীলার সময় টিকিট বিক্রি করা পদ্ধতি ছিল না, রাজা বাহাদুর ও অপর বড়মান‍্সে বিলক্ষণ দশ টাকা সাহার্য্য কত্তেন তাতেই সমুদায় খরচ ক‍্লিয়ে উঠ‍্তো। কিন্তু রাজা বদ্দিনাথ বৃদ্ধাবস্থায় দুতিন বৎসর হলো দেহত্যাগ করায় রাজকুমার সুবৃদ্ধি বাহাদুরেবা বাগান খানি ভাগ করে নিলেন, মধ্যে দেইজি পাঁচিল পড়‍্লো সুতরাং অন্য বড় মানুষেরাও রামলীলায় তাদৃশ উৎসাহ দ্যাখালেন না, তাতেই এবার টিকিট করে কতক টাকা তোলা হয়। বল তে কি, কলিকাতা বড় চমৎকার সহর। অনেকেই রং তামাসায় অপব্যয় কত্তে বিলক্ষণ অগ্রসর, টিকিট সত্তে ও রামলীলার বাগান গাড়ি ঘোড়া ও জনতায় পরিপূর্ণ লোকের বেজায় ভীড়।

 এ দিকে বাবুর ব্রিজ‍্কা জনতার জন্য অধিক দূর যেতে পাল্লে না, সুতরাং হজুর দল বল সমেত পায়দলে ব্যাড়ানোই সঙ্গত ঠাউরে গাড়ি হতে নেবে ব্যাড়াতে ব্যাড়তে রঙ্গভূমির শোভা দেখতে লাগ‍্লেন।

 রঙ্গভূমির গেট হতে রামলীলার রণক্ষেত্র পর্য্যন্ত দুসারি দোকান বসেচে, মধ্যে মধ্যে নাগরদোলা খুচ্চে―গোলাবিখিলী, খেলেনা, চনেচুর ও চিনের বাদম প্রভৃতি ফিরিওয়ালাদের চিৎকার উঠ‍্চে। ইয়ারের দল খাতায় খাতায় প্যারেড করে ব্যাড়াচ্চে, রাঁড়, খোট্টা, বাজে লোক ও বেণের দলই বারো আনা। রণক্ষেত্রের চার দিকে ব্যেড়ার ধারে চার পাঁচ থাক্ গাড়ির সার, কোন গাড়ির ওপোর অ্যাক‍্জন শৌখিন ইয়ার দুচার দোস্ত ও দুই একটি মেয়েমানুষ নিয়ে মজা কচ্চেন। কোন খানির ভেতোরে চিনে কোট ও চুলের চ্যেনওলা চার জোন ইয়ার ও একটী মেয়ে মানুষ, কোন খানিতে গুটি কত পিল ইয়ার টেক্কা জ্যাঠা ইস্কুলের বই বেচে পয়সা সংগ্রহ করে গোলাবি খিলি ও চরসে মজা লুটচে। কতকগুলি গাড়ি নিছক্ খোট্টা মারওয়ারী ও মেড়ুয়াবাদী, কতকগুলি খোসপোশাকি বাবুতে পূর্ণ।

 আমাদের হজুর এই সকল দেখ‍্তে দেখ‍্তে থম্নুমল বাবু হাত ধরে ক্রমে রণক্ষেত্রের দরজায় এসে পৌঁছিলেন—সেথায় বেজায় ভীড়। দশ বারোজন চৌকীদার অনবরত সপাস‍্প্ করে বেত মাচ্চে, দু জন সার্জ্জন সবলে ঠেলে রয়েছে তথাপি রাখ্তে পাচ্চে না থেকে থেকে “রাজা রামচন্দ্রঙ্গীকা জয়”! বলে খোট্টারাও রণক্ষেত্রের মধ্যহতে বানরেরা চেঁচিয়ে উঠচে। সকলেরি ইচ্ছা, রামচন্দ্রের মনোহর রূপ দেখে চরিতার্থ হবে, কিন্তু কার্ সাধ্য সহজে রামচন্দ্রের সমীপস্থ হয়।

 হুজুর অনেক কষ্টেসৃষ্টে ব্যাড়ার দ্বার পার হয়ে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করে বানরেব দলে মিস‍্লেন। রণক্ষেত্রের অন্য দিকে লঙ্কা। মনে করুন সেথায় সাজা রাক্ষসেরা ঘুরে ব্যাড়াচ্চে ও বেড়ার নিকটস্থ মালভরা গাড়ির দিকে মূকন্যেড়ে হিঁ হিঁ করে ভয় দেখাচ্চে। সাজা বানরেরা লাফাচ্চে ও গাছ পাতরের বদলে ছেঁড়া কুঁপো ও পাঁকাটি নিয়ে ছোড়া ছুড়ি কচ্চে―বাবু এই সকল অদৃষ্টচর ব্যাপার দ্যেখে যার পর নাই পরিতুষ্ট হয়ে ব্যাড়ার পাশে পাশে হাঁ করে ঘুরে ব্যাড়াতে লাগ‍্লেন, আরো দু চার জন বেণে বড় মানুষ ও ব্যাদড়া বনেদী বাবুরা ভিতরে এসে বাবুর সঙ্গে জুটে গ্যালেন, মধ্যে মধ্যে দালাল ও তুলোওয়ালা ইন্‌ফুলুয়েনসল্ রিফরম‍্ড খোট্টার দলের সঙ্গেও বাবুর সেখানে সাক্ষাৎ হতে লাগ‍্লো, কেউ “রাম রাম” কেউ “আদাব” কেউ “বন্দীগি” প্রভৃতি সেলামাল‍্কীর সঙ্গে পানের দোনা উপহার দিয়ে বাবুর অভ্যর্থনা কত্তে লাগ‍্লো; এঁরা অনেকে দুই প্রহরের সময এসেচেন, রাত্রির দশটার পর ভর পেট রামলীলে গীলে বাড়ি ফির‍বেন।

 রণক্ষেত্রের মধ্যে বাবু ও দু চার সবস‍্ক্রাইবর বড়মান‍্সের ছ্যেলেদের ব্যাড়াতে দেখে ম্যানেজর বা তাঁর আসিষ্টেণ্ট দৌড়ে নিকটস্থ হয়ে পানের দোনা উপহার দিয়ে রণ ক্ষেত্রের মধ্যস্থ দু চার কাগজের সংঙের তরজমা কবে বোজাতে লাগ‍্লেন,কত গাড়ি ও আন্দাজ কত লোক এসেচে; তার অ্যাক্‌টা মনগড়া মিমো দিলেন ও প্রত্যেক বানর ভাল্লুক ও রাক্ষসের সাজগোজের প্রশংসা কত্তেও বিস্মৃত হলেন না। বাবু ও অন্যান্য সকলে “এ দফে বড়ি আচ্ছা হুয়া আব বরস্” আব বরস্ এসি নেহি হুয়া থা” প্রভৃতি কম‍্প্লিমেণ্ট দিয়ে ম্যানেজরদের আপ্যায়িত কত্তে লাগ‍্লেন। এ দিকে বাজিতে আগুণ দেওয়া আরম্ভ হলো, ক্রমে চার পাঁচ রকম বাজে কেতার বাজী পুড়ে সে দিন রামলীলা বরখাস্ত হলো। রাম লক্ষ্মণকে আরতি করে ও ফুলের মালা দিয়ে প্রণাম করে বাজে লোকেরা জন্ম সফল বিবেচনা করে ঘরমুখো হলো। কেরাঞ্চীর ঘোঁড়ারা বাতকর্ম্ম কত্তে কত্তে বহু কষ্টে গাড়ি নিয়ে প্রস্থান কল্লে। বাবু সেই ভীড়ের ভিতর হতে অতি কষ্টে গাড়ি চিনে নিয়ে সওয়ার হলেন—সে দিনের রামলীলার এই রকমে উপসংহার হলো।

 আমাদেরো এ সকল বিষয়ে বড় শক্, সুতরাং আমরাও একখানি ছ্যাক‍্ড়া গাড়ীর পিছনে বসে রামলীলা দেখ‍্তে যাচ্ছিলেম, গাড়িখানির ভিতরে অ্যাক‍্জন ছুতোর বাবু গুটি দুই গেরম্বাবী রাঁড় ও তাঁর চার পাঁচ জন দোস্ত ছিল, খানিক্ দূর যেতে না যেতেই অ্যাক্‌টা জন্মজ্যেঠা ফচ‍্কে ছোঁড়া রাস্তা থেকে “গাড়োয়ান পিছুভারি। গাড়োয়ান পিছুভারী” বলে চেঁচিয়ে ওঠায় গাড়োয়ান “কেবে শালা” বলে সপাৎ করে অ্যাক্ চাবুক ঝাড়‍্লে। ভেতর থেকে “আবে কেরে” “ল্যে বে যা” “ল্যে বে যা” চীৎকার হতে লাগ‍্লো, অগত্যা সে দিন আর যাওয়া হলো না, মনের শক্‌ মনেই রহিলো।

 শরতের শশধর সচ্ছশ্যাম গগনমাঝে নক্ষত্রসমাজে বিরাজ কচ্চেন দেখে প্রণয়িণী রজনী মানভরে অবগুণ্ঠবতী হয়ে রয়েচেন। চক্রবাকদম্পতি কত প্রকার সাধ্য সাধনা কচ্চে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্চে না, সপত্নীর দুর্দ্দশা দর্শন করে সচ্ছসলিলে কুমুদিনী হাঁস‍্তেচে, চাঁদের চির অনুগত- চকোর চকোরী সর্ব্বরীর দুঃখে দুঃখিত হয়ে তাঁরে ভুড়ে ভর্ৎসনা কচ্চে, ঝিঝিপোকা ও উইচিংড়ারাও চীৎকার করে চকোর চকোরীর সঙ্গে যোগ দিতেচে, লম্পট শিরোমণির ব্যবহার দেখে প্রকৃতি সতী বিস্মিত হয়ে রয়েচেন, এ সময় নিকটস্থ হলে রজনীরঞ্জন বড় অপ্রস্তুত হবেন বলেই য্যান পবন বড় বড় গাছ পালায় ও ঝোপে ঝাপের আসে পাশে আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে চলেচেন। অভিমানিনী মানবতী রজনীর বিন্দু বিন্দু নয়নজল শিশিরচ্ছলে বনরাজী ও ফুলদামে অভিষিক্ত কচ্চে।

 এদিকে বাবুর ব্রিজ‍্কা ও বিলাতি জুড়ি টপাটপ্ শব্দে রাস্তা কাঁপিয়ে ভদ্রাসনে পৌঁছিল। বাবু ড্রেসিংরুমে কাপড় ছাড়‍্তে গ্যালেন, সহচরেরা বৈঠকখানায় বসে তামাক্ খেতে খেতে রামলীলার জাওর কাট‍্তে লাগ‍্লেন এবং সকলে মিলে প্রাণখুলে দুচার অপর বড় মানুষের নিন্দাবাদ জুড়ে ছিলেন। বাবুও কিছু পরে কাপড় চোপড় ছেড়ে মজলিশে বার দিলেন, গুড়ুম্ করে নটার তোপ্ পড়ে গ্যাল।

 বোধ হয়,মহিমার্ণব পাঠকবর্গের স্মরণ থাকতে পারে যে, বাবু রামভদ্দর হজুরের সঙ্গে রামলীলা দেখতে গিযেছিলেন, বর্ত্তমানে দু চার বাজে কথার পর বাবু রামভদ্দর বাবুকে দু অ্যাক‍্টা টপ্‌পা গাইতে অনুরোধ কল্লেন, রামভদ্দর বাবুর গাওনা বাজনায় বিলক্ষণ শক্, গলাখানিও বড় চমংকার, যদিও তিনি এ বিষয়ে পেসাদার নন্; কিন্তু সহরের বড় মানুষ মহলে ঐ গুণেই পরিচিত, বিশেষতঃ বাবু রামভদ্দরের আজকাল সময় ভাল, কোম্পানীর কাগজের দালালী ও গাঁতের মাল কেনার দরুণ বিলক্ষণ দশটাকা রোজগার কচ্চেন বাড়িতে নিত্য নৈমিত্তিক দোল দুর্গোৎসবও ফাঁক যায় না। বাপ মার শ্রাদ্ধ ও ছেলে মেয়ের বিয়ের সময় দশ জন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বলা আছে। গ্রামস্থ সমস্ত ব্রাহ্মণেরা প্রায় বাবুর দলস্থ। কায়স্থ ও নবশাক ও অনেকগুলি বাবুর অনুগত। কর্ম্মকাজের ভীড়ের দরুণ ভদ্দর বাবুর বারোমাস প্রায় সহরেই বাস, কেবল মধ্যে মধ্যে পাল পার্ব্বণ ও ছুটীটা আস‍্ঠায় বাড়ি যাওয়া আছে। ভদ্দর বাবুর সহরের বাদুড় বাগানের বাসাতেও অনেকগুলি ভদ্দর লোকের ছেলেকে অন্ন দেওয়া আছে ও দু চার জন বড় মানুষেও ভদ্দর বাবুরে বিলক্ষণ স্নেহ করে থাকেন। রামভদ্দর বাবু সিমলের রায় বাহাদুরের সোণার কাটি রূপার কার্টি ছিলেন ও অন্যান্য অনেক বড় মানুষেই এঁরে যথেষ্ট স্নেহ করে থাকেন, সুতরাং বাবু অনুরোধ করবামাত্র ভদ্দর বাবু তানপুরা মিলিয়ে একটী নিজ রচিত গান জুড়ে দিলেন, হলধর তবলা বাঁয়া ঠুকে নিয়ে বোলওয়াট ও ফ্যালওঘাটের সঙ্গে সঙ্গত আরম্ভ কল্লেন। রামলীলার নক্‌সা এই খানেই ফুরাইলো।