১৫১৩ সাল/অষ্টম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
Jump to navigation Jump to search


অষ্টম পরিচ্ছেদ।

 আমরা বুঝিয়াছিলাম যে সম্পাদকপ্রবর আমাদিগকে সহজে ছাড়িবেন না। আমরাও যে প্ৰস্তুত ছিলাম না তাহাও নহে। তবে শিক্ষিত লোক পদে পদে লাঞ্ছিত হইয়াও যে তাহার দুরভিসন্ধি পূর্ণ করিবার চেষ্টা ছাড়িতে পারে নাই ইহাতে বড়ই আশ্চর্য্য বোধ করিলাম। যাহা-হউক কলিকাতায় আসিয়া দেখি হরিশ আমাদের প্রতিদ্বন্দী কোম্পানীর একখণ্ড “অঙ্গীকারপত্ৰ” (articles of association) সংগ্ৰহ করিয়াছে। তাহার নিকট শুনিলাম যে সপ্তাহ খানেক হইল ঐ কোম্পানী গঠিত হইয়াছে। তাহারা এরূপ অসম্ভব প্ৰতিশ্রুতি করিয়াছে যে আমরা তাহা শুনিয়া হাস্যসম্বরণ করিতে পারিলাম না।

 যথাসময়ে রুল শুনানি আরম্ভ হইল। আমাদের কৌঁসিলী অতি বিশদভাবে বুঝাইয়া দিলেন যে প্ৰতিদ্বন্দী কোম্পানী আমাদেরই নক্সাদি চুরি করিয়াছে এবং তাহাদের উদ্দেশ্য আমাদিগের অনিষ্ট করা ভিন্ন আর কিছুই নহে। আমরা বিচারক মহাশয়কে আমাদিগের সুবর্ণ প্ৰস্তুতের উপায় দেখাইয়া দিলাম। তিনি প্ৰতিদ্বন্দী কোম্পানীকে তাহাদিগের উপায় দেখাইতে বলায় তাহারা পারিল না। সুতরাং বিচারক মহাশয় রুল ডিসচার্জ্জ করিয়া দিলেন।

 পদে পদে আমাদের অনিষ্ট চেষ্টা করিয়াও সম্পাদকপ্রবর বিশেষ কিছু করিতে সক্ষম হইলেন না। ইহাতে তাঁহার ক্ষোভের পরিসীমা রহিল না। তিনি কত কথাই যে আমাদের বিরুদ্ধে বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন তাহার ইয়ত্তা ছিল না।

 একদিন প্ৰাতে ঘরে বসিয়া সংবাদ পত্র পাঠ করিতেছি এমন সময় দরজা খুলিয়া একটী যুবক প্রবেশ করেন। তাহার পরিধানে মলিন বস্ত্র, গাত্রে একখানা ছিন্ন চাদর ও পদ নগ্ন। চেহারা দেখিয়া কিন্তু তাহাকে ভদ্রবংশজাত বলিয়া বোধ হইল। আমার প্রণাম করিয়া সে একখানি পত্র দিল।

 উহা পাঠ করিয়া দেখি যে সুধাময় বাবু তাহাকে কোন কর্ম্মে নিযুক্ত করিতে আমায় অনুরোধ করিয়াছেন। সে বিশ্বাসী ও কর্ম্মপটু ইহাও জানাইয়াছেন। আমি তাহার আপাদমস্তক ভাল করিয়া দেখিলাম।

 সহসা আমার মনে কেমন একটা সন্দেহ উপস্থিত হইল। তাহাকে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম:—

 “তোমার নাম কি?”

 “আজ্ঞে, সুন্দর লাল।”

 নাম চেহারার অনুরূপ বটে।

 “তুমি আর কোথাও কি পূর্ব্বে কর্ম্ম করিয়াছ?”

 “আজ্ঞে না।”

 “তবে তুমি কি করিয়া এখানে কার্য্য করিবে?”

 “আমি বড় গরীব। আপনাদের উপর ভরসা। আমাকে শিখাইয়া লইলেই সকল কর্ম্ম করিতে পারিব।”

 তোমার রেজেষ্টারী সার্টিফিকেট্‌ আছে?”

 “সে কি?”

 তাহাকে আইন বুঝাইয়া দিলাম। সে যেন একটু চিন্তিত হইয়া পড়িল ও পরে বলিল:—

 “তা এখানে কয়েকদিন কার্য্য করিলে আপনি দয়া করিয়া আমার নাম রেজেষ্টারী করাইয়া দিবেন। আপনি আমার মা বাপ। আমার এ সংসারে আর কেহ নাই। আমায় নিরাশ করিবেন না।”

 দেখিলাম যুবক চতুর ও বুদ্ধিমান বটে। যাহা হউক অপর এক তৃত্যকে ডাকিয়া উহাকে কাজকর্ম্ম শিখাইয়া দিতে বলিলাম। সেইদিন সন্ধ্যার সময় বন্ধুবর কোন কার্য্যোপলক্ষে আমার বাটী আসিলেন। দুই একটী কথাবার্ত্তার পর আমার হস্তে এক টেলিগ্রাম দিয়া বলিলেন:—

 “পড়”।

 দেখি তাহাতে একটীমাত্ৰ কথা লেখা:—

 “সাবধান।” প্রেরকের নাম নাই। স্থানটা দেখিলাম হাওড়া।

 বন্ধুবর জিজ্ঞাসা করিলেন:—

 “কিছু বুঝিলে কি?”

 “কিছু কিছু। আমাদের অনিষ্টের জন্য সম্পাদক-প্রবর কোন নূতন ফন্দি স্থির করিতেছেন বা করিয়াছেন। তাহাই কোন অজ্ঞাতনামা বন্ধু জানিতে পারিয়া টেলিগ্রাম দ্বারা আমাদিগকে সাবধান করিয়া দিয়াছেন।”

 “হাঁ। আমারও তাহাই বিশ্বাস। সন্দেহের একটু কারণও আছে। হরিশ প্রত্যহই, কোন নূতন সংবাদ থাক আর নাই থাক, আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আইসে। আজ চারিদিন হইল একেবারেই তাহার দেখা নাই। আমি গুপ্ত সন্ধান লইয়া জানিয়াছি যে সে সম্পাদক-প্রবরের বাটীতে নাই। কোন কার্য্যের জন্য তাহাকে বিদেশে যাইতে হইয়াছে।”

 “কথা ভাল বোধ হইতেছে না। কেন না, যদি কোন কার্য্যের জন্য তাহাকে পাঠান হইয়া থাকে, তাহা হইলে সে আমাদের সহিত সাক্ষাৎ না করিয়া যাহত না। মনের অগোচার পাপ নাই। আমার বিশ্বাস সম্পাদক উহার উপর সন্দেহ করিয়া কোথাও তাহাকে বন্দী করিয়া রাখিয়াছে।”

 “আমারও এখন এই সন্দেহ হইতেছে। অামাদের আর নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নহে। হরিশ কোথায় আছে সন্ধান লইতে হইবেই হইবে। ইহার ভিতর একটা কিছু রহস্য জাছে।”

 “নিশ্চয়ই।”

 এমন সময় সুন্দরলাল নিঃশব্দে গৃহে প্রবেশ করিল এবং কয়েকখানা সংবাদপত্র টেবিলের উপর রাখিয়া দিল। তাহাকে দেখিয়াই বন্ধুবর জিজ্ঞাসা করিলেন:—

 “এ কে?”

 “আমার নূতন ভৃত্য।”

 “উহাকে কোথায় দেখিয়াছি বলিয়া বোধ হইতেছে?”

 সুন্দরলাল বলিয়া উঠিল:—

 “আজ্ঞে, সুধাময় বাবুর বাটীতে। আমিও আপনাকে সেখানে অনেকবার দেখিয়াছি।”

 বন্ধুবর মস্তক সঞ্চালন করিয়া বলিলেন:—

 “না, অন্য কোন স্থানে। মনে হয়—হাঁ—ঠিক—তুমি কি “প্ৰভাতী” প্রেসের একজন কম্পোজিটর ছিলে না? অামার মনে হইতেছে তোমায় সেখানে দেখিয়াছি।”

 “আজ্ঞা, যদি প্রেসের কর্ম্ম জানিব তবে এখানে ভৃত্যের কার্য্য করিব কেন? আপনি বোধ হয় আমার চেহারার মত অন্য কাহাকে দেখিয়াছেন।”

 “তাহা হইতে পারে,” বলিয়া বন্ধুবর আমার সহিত অন্য কথায় প্রবৃত্ত হইলেন। সুন্দলাল তৎক্ষণাৎ চলিয়া গেল।