১৫১৩ সাল/অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ।

 গেল, এত সাধের “সোনার ভারত” গেল। কত আশা ছিল। কতই না মতলব করিয়াছিলাম। সবই ডুবিল। হা ভগবান্! তোমার ইচ্ছাই ত’ পূর্ণ হয়! তাহাই হউক।

 কলিকাতায় পৌঁছিবার দুই চার দিন পরে আমরা এক সভা আহ্বান করিলাম। সকল অংশীদারগণ উপস্থিত হইলেন। আমরা বিস্তারিত করিয়া সকল কথা তাহাদিগকে জ্ঞাপন করিলাম। হরিশ আমাদিগের কি মহৎ উপকার করিয়াছে, তাহাও বিশেষরূপে বুঝাইয়া বলিলাম। হরিশও সেখানে উপস্থিত ছিল। সকলের অনুরোধে সে তাহার কথা এইরূপভাবে বলিল:—

 “আমি বুঝিতে পারিয়াছিলাম যে ‘প্রভাতী’ সম্পাদক মহাশয় আমায় সন্দেহ করিতে আরম্ভ করিয়াছেন। একদিন একটু অসাবধানতাবশতঃ ধরা পড়িলাম। আমায় গ্রেপ্তার করিয়া তিনি তাঁহার বাটীর এক অন্ধকার ঘরে কয়েদ করিয়া রাখিলেন। আমি অনেক টাকার লোভ দেখাইয়া কারাগারের প্রহরীকে বশীভূত করিয়া একরাত্রে পলায়ন করিলাম। পরে বিপিন বাবুর বাটীতে আশ্ৰয় লই। তাহার পর পারিতোষিকের লোভে ‘প্রভাতী’ সম্পাদক মহাশয়ের এক বিশ্বস্তু কর্ম্মচারীকে বশীভূত করিয়া তাঁহার কার্য্যকলাপের সংবাদ লইতে লাগিলাম। তাহার নিকট শুনিতে পাই যে, সুন্দরলাল নামক এক ব্যক্তিকে রজনীবাবুদিগের পশ্চাতে লাগান হইয়াছে। পরে জানিতে পারিলাম যে, এক জলদস্যুর সহিত বন্দোবস্ত করিয়া তাঁহাদিগের জাহাজ ডুবাইবার বন্দোবস্ত করা হইয়াছে। সুন্দরলাল সুবিধা করিতে না পারায় এই বন্দোবস্ত করা হয়। যাহা হউক, সুন্দরলাল রজনীবাবুদিগের দৈনিক কার্য্য বিবরণী পাঠাইত। যখন সম্পাদক মহাশয় শুনিলেন যে, বাস্তবিকই আশাতিরিক্ত সুবর্ণ পাওয়া যাইতেছে, তখন আর স্থির থাকিতে না পারিয়া জলদস্যুর সহিত বন্দোবস্ত করেন। যাহা হউক, তাঁহার অভিসন্ধি জানিতে পারিয়া আমি রজনীবাবুকে সাবধান করিয়া দেই। দুঃখের বিষয় এই যে, বিস্তারিত সকল কথা তাঁহাকে জানাইতে পারি নাই; কেননা যে তারহীন বার্ত্তা প্রেরণের যন্ত্রের সাহায্যে সংবাদ পাঠাইতেছিলাম তাহা মাধববাবুর। আমাকে উহা ব্যবহার করিতে দেখিয়া তিনি কারণ জিজ্ঞাসা করেন। আমি গুপ্তকথা প্ৰকাশ করিতে ইচ্ছুক ছিলাম না। কাজেই একটা যা’ তা’ উত্তর দেই। তিনি আমায় উহা ব্যবহার করিতে নিষেধ করিলেন। অগত্যা বিস্তারিত সংবাদ পাঠাইতে পারিলাম না। পরে একদিন সুবিধা পাইয়া উহা ব্যবহার করি। কোন উত্তর না পাওয়ায় বুঝিলাম যে রজনীবাবুরা কলিকাতায় আসিতেছেন। আমার আর বিশেষ কিছু বলিবার নাই।”

 হরিশের কথাগুলি সকলেই একাগ্ৰচিত্তে শুনিলেন। তাহার বক্তব্য শেষ হইলে পর সভাপতি মহাশয় উঠিয়া আমাদিগের সকলের আন্তরিক ধন্যবাদ তাহাকে জ্ঞাপন করিলেন। তৎপরে আমাদিগের লাভ ও ক্ষতির এক হিসাব ধরা হইল। যতটা সুবৰ্ণ কলিকাতায় পাঠান হইয়াছিল—তাহার ও যতটা আমাদিগের কার্য্যস্থলে জমা ছিল, তাহার মূল্য ধরা গেল। তাহা হইতে জাহাজ প্ৰস্তুতের ব্যয়, বেতন, ইত্যাদি বাবত সমুদায় খরচ-খরচা বাদ দিয়াও প্রত্যেক অংশীদারের প্রদত্ত মূলধন উঠাইয়া লইয়াও দেখা গেল যে, আমরা নিট্ তিন লক্ষ টাকা লাভ পাইয়াছি। একজন অংশীদার প্রস্তাব করিলেন যে, ঐ টাকা অংশীদারগণের শেয়ারের মূল্যানুযায়ী তাহাদিগের মধ্যে ভাগ করা হউক। বন্ধুবর ইহাতে আপত্তি করিয়া বলিলেন:—

 “তাহা হইতে পারে না। যে সকল নিরপরাধ কর্ম্মচারীরা আমাদিগের কার্য্যে জীবন বিসর্জ্জন করিয়াছে, তাহাদিগের অসহায় স্ত্রী-পুত্ৰদিগের অন্নসংস্থাপন করিয়া দিতে আমরা লোকতঃ ধর্ম্মতঃ বাধ্য। আর এক ব্যক্তি (হরিশকে দেখাইয়া) আমাদিগের কি মহৎ উপকার করিয়াছে, তাহা বাক্যের দ্বারা প্ৰকাশ করা অসম্ভব। তাহার নিকট আমরা চিরঋণী থাকিব। ঐ ঋণ পরিশোধ হইবার নহে। তবুও আমি প্ৰস্তাব করিতেছি যে, আমাদিগের কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ তাহাকে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হউক।”

 ইহাতে কাহারও আপত্তি হইল না। সকলেই ইহা একবাক্যে অনুমোদন করিলেন। তৎপরে তাঁহার অপর প্রস্তাবও গৃহীত হইল। পর প্রস্তাব আমাদিগের দুইজনের প্রতি vote of confidence পাস করা। তাহাও সাহ্লাদে সকলে পাশ করিলেন।

 শেষ প্রস্তাব এইরূপ ছিল, “যখন নিঃসন্দেহে ইহা প্ৰমাণিত হইয়াছে যে সমুদ্ৰ হইতে সুবর্ণ উৎপাদন করা যাইতে পারে এবং যখন খরচখরচা যাদে মূলধন উঠিয়া গিয়া বিশেষ লাভ পাওয়া সম্ভব তখন ঐ কার্য্যে পুনরায় প্ৰবৃত্ত হওয়া যাউক। গুরুপ্ৰসাদ বাবুকে এ কার্য্যের ভার লইতে অনুরোধ করা যাইতেছে।”

বন্ধুবর বলিলেন তাঁহার ঐ কার্য্যে পুনঃ প্ৰবৃত্ত হইতে কোন আপত্তি নাই এবং যত শীঘ্ৰ পারেন তিনি হাসানজী কোম্পানীকে একখানি নূতন জাহাজ নির্ম্মাণ করিবার অর্ডার দিবেন। কার্য্য মনসুনের পর আরম্ভ হইবে স্থির হইল।

তৎপরে ভবিষ্যতে যাহাতে “প্ৰভাতী” সম্পাদক বা তৎসদৃশ অন্য দুষ্টলোক আমাদিগের কোন অনিষ্ট করিতে না পারে, তাহার উপায় নির্দ্ধারণ করিবার জন্য এক কমিটি গঠন করিয়া যথারীতি ধন্যবাদাদির পর সভাভঙ্গ হইল।

 

সম্পূর্ণ।

 

Printed by Gosto Behary Kayari,
at the Bani Press.
12, Chorebagan Lane,
CALCUTTA.

 

বিজ্ঞাপন
 

“১৫১৩ সাল” প্ৰণেতার আর একখানি

বৈজ্ঞানিক উপন্যাস

“কাপ্তেন মিত্র”

শ্ৰীপঞ্চমীর পর প্রকাশিত হইবে।