১৫১৩ সাল/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান


তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

 এক মাসের মধ্যে “সী গোল্ড্ সিন্‌ডিকেট্ লিমিটেড্” (Sea Gold Syndicate Ltd.) আইন অনুসারে রেজেষ্টারী হইয়া গেল। আমরা একবাক্যে বন্ধুবরকে বোর্ড অব্ ডাইরেক্‌টার্সের সভাপতি মনোনীত করিলাম। কাহারও কাহারও মতে ২৫ লক্ষ টাকা মূলধন কম বোধ হওয়ায় ৩০ লক্ষই মূলধন নির্দ্দিষ্ট হইল। অবশ্য মূলধন আবশ্যক মত কমাইবার ও বাড়াইবার ক্ষমতা আমাদের থাকিল। নিম্নলিখিত পাঁচজন ব্যক্তি ডাইরেক্‌টার্স মনোনীত হইলেন:—

শ্রীরজনীনাথ রায় (রে ব্ৰাদার্স লিমিটেডের অধ্যক্ষ)।
„ চারুকৃষ্ণ ঘোষ (ঘোষ এণ্ড সন্স্ লিমিটেডের অংশীদার)।
„ সুধাময় বল (দালাল)।
„ রমানাথ মিত্র (বেঙ্গল জীবন বীমা কোম্পানী লিমিটেডের ডাইরেক্‌টার)।
„ বিপ্রদাস ভাদুড়ী (জমীদার)।

 কলিকাতা চৌরঙ্গী অঞ্চলে আমাদের রেজেষ্টারী-কৃত আফিস্ স্থাপিত হইল। ব্যাঙ্কার্স সলিসিটার্স প্রভৃতিও যে স্থির করা হইয়াছিল, তাহা বলা বাহুল্য। প্ৰথম “কল” শতকরা ২৫ টাকা নির্দ্ধারিত ছিল। কোম্পানী রেজেষ্টারী হইবার এক সপ্তাহের মধ্যে অংশীদারগণ স্বস্ব দেয় জমা দিলেন। কালবিলম্ব না করিয়া বন্ধুবর বোম্বাইএর হাসানজী কোম্পানীকে তাঁহার বর্ণনানুযায়ী জাহাজ নির্ম্মাণ করাইবার অর্ডার দিলেন। উহার নক্সাদি বন্ধুবর নিজেই প্ৰস্তুত করিয়াছিলেন। কেহ কেহ উহা দেখিতে চাহিলে, তিনি বলিলেন যে উহার মধ্যে কতকগুলি এমন অংশ আছে, যাহা প্ৰকাশ হইলে ক্ষতি হইতে পারে। এজন্য তিনি উহা এখন দেখাইতে অস্বীকার করিলেন। কাজে কাজেই আমরা নক্সা দেখিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিলাম না।

 হাসানজী কোম্পানী ছয়মাসের মধ্যে জাহাজ প্ৰস্তুত করিয়া দেওয়ার চুক্তি-পত্ৰ সহি করিলেন। উহার কয়েকটী সর্ত্তের মধ্যে একটী এই ছিল যে ছয়মাসের পর প্রত্যেক “বিলম্ব”-দিনের জন্য ১০০০৲ টাকা তাহারা খেসারত দিতে বাধ্য থাকিবে। কিন্তু যদি চারি মাসের মধ্যে তৈয়ার করিয়া দিতে পারে, তবে ৫০০০০৲ হইতে ৭৫০০০৲ টাকা বোনাস্ পাইবে। আর যদি, তাহাদের দোষে, কোন রকমে নক্সার বিবরণ প্ৰকাশ হইয়া পড়ে, তাহা হইলে উহারা পাঁচ লক্ষ টাকা খেসারত দিতে বাধ্য থাকিবে।

 সপ্তাহে একদিন, আমরা, অর্থাৎ ডাইরেক্টররা, আফিসে অ্যাসিয়া “চলতি কার্য্য” সম্পন্ন করিতে লাগিলাম। এইরূপে প্ৰায় দুই মাস গত হইল। তাহার পর হাসানজী কোম্পানী একটী রিপোর্ট পাঠাইল, তাহাতে আমাদের আশা হইল যে চারি মাসের মধ্যে জাহাজ প্ৰস্তুত করিতে পারিবে। তখন আমরা কাপ্তেন, নাবিক প্রভৃতি নিয়োগের চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইলাম। আমাদের উৎসাহ কিরূপ বর্দ্ধিত হইয়াছিল, তাহা বৰ্ণনা করা যায় না।

 একদিন বৈকালে আমি আফিস হইতে বাটী আসিবার উদ্যোগ করিতেছি, এমন সময় বন্ধুবর অতি ব্যস্তভাবে আমার ঘরে প্রবেশ করিালেন। ব্যাপার শীঘ্রই জানিতে পারিলাম। জাহাজের নক্সার ডুপ্লিকেট, যাহা বন্ধুবরের নিকট ছিল, তাহা চুরি গিয়াছে! কি সর্ব্বনাশ! চুরি কি প্রকারে হইল, বন্ধুবর বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। মন কেমন এক রকম হইয়া গেল। তাঁহার বাসায় গেলাম। তিনি পাঠাগারে লইয়া গিয়া, একখানি চেয়ারে অামায় বসিতে বলিয়া বলিলেন:—

 “কি করিয়া চুরি হইল, বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। এই সেফ্‌টায় আমার যত প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র, টাকা কড়ি আদি খাকে। আজ প্রায় সপ্তাহ খানেক হইল ইহা খুলি নাই। কেন না, খুলিবার আবশ্যক হয় নাই। অদ্য আমার রাঘবপুরের জমীদারীর কাগজপত্র দেখার আবশ্যক হওয়ায় ইহা খুলি। তখন দেখিলাম নক্সাখানি নাই। তন্ন তন্ন করিয়া দেখিয়াছি। তুমি যদি দেখিতে ইচ্ছা কর দেখিতে পার।”

 সেফ্‌টা ভাল করিয়া দেখিলাম। বাস্তবিকই নক্সাখানি নাই। কেমন একটা অবসন্নভাব বোধ হইতে লাগিল। বন্ধুবরকে জিজ্ঞাসা করিলাম:—

 “সেফ্‌টার চাবী কোথায় থাকে?”

 “সর্ব্বদাই আমার নিকট থাকে।”

 “সর্ব্বদা যে জামা ব্যবহার কর, তাহার পকেটে তো?”

 “হাঁ।”

 “রাত্রে কি জামা গায়ে দিয়ে শোও?”

 “না। কখনও না। তখন জামা আলনায় ঝুলাইয়া রাখি।”

 “চাবি দেখি।”

 উহা মাইক্রস্‌কোপ দিয়া বিশেষ পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম, উহার যে মোমের ছাপ লওয়া হইয়াছে, এরূপ বোধ হইল না । কেন না, যখন আজ সাতদিনের মধ্যে ঐ চাবী ব্যবহার হয় নাই, তখন ছাপ লওয়া হইয়া থাকিলে উহার কোন না কোন চিহ্ণ থাকিত। বিশ্বাস হইল চাের কোন সামান্য ব্যক্তিমাত্র। বন্ধুবরকে জিজ্ঞাসা করিলাম:—

 “আচ্ছা, নক্সা চুরি গেলে বিশেষ ক্ষতি আছে কি?”

 “আছেও বটে, নাইও বটে। যদি কেহ প্ৰতিদ্বন্দিতা করিতে ইচ্ছা করে, তাহা হইলে ঐ নক্সা অনুযায়ী একখানা জাহাজ প্ৰস্তুত করিয়া লইতে পারিবে। নক্সার বা আমার আবিষ্কৃত যন্ত্রাদির পেটেন্ট লই নাই। অতএব যদি কেহ তাহা নকল করে, আমি তাহাকে আইনের আমলে আনিতে পারিব না। কিন্তু সে আমার সুবৰ্ণ প্ৰস্তুতের উপায় জ্ঞাত না থাকায়, ব্যর্থ-মনোরথ হইবে।”

 “ঐ উপায়টা কি লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছ?”

 “নিশ্চয়ই।”

 আমি হাসিয়া বলিলাম:—

 “ভাল বোধ হইতেছে না। দেখ তো সেটা চুরি গিয়াছে কি না?”

 “হাঁ, সে কে লইবে? বস, এখনই তোমায় দেখাই।”

 বন্ধুবর আর একটা সেফ্ খুলিয়া উহার অভ্যন্তরস্থ কাগজ পত্রাদি  তন্ন তন্ন করিয়া দেখিলেন। হঠাৎ তাঁহার মুখ বিবৰ্ণ হইয়া গেল।

 “সর্ব্বনাশ, তাহাও যে চুরি গিয়াছে দেখিতেছি।”

 আমি আসন হইতে লাফাইয়া উঠিয়া চীৎকার করিয়া বলিলাম:—

 “বল কি? ও চোর তবে তো সোজা নয়?”

 একটু পরে একটু প্রকৃতিস্থ হইয়া বন্ধুবর বলিলেন:—

 “যখন চুরি হইয়াছে, তখন উপায় নাই। সুখের বিষয় সুবর্ণ প্ৰস্তুতের উপায়ের বিবরণ এই ডায়ারীতে লেখা আছে। ইহা চুরি ষায় নাই। এই দেখা! ইহার উপর কিছুই লেখা নাই দেখিয়া চোর বোধ হয় এটা ছোঁয় নাই। কিন্তু এই ডায়ারী চুরি করিলেও কাহারও সুবিধা হইবে না, কেন না ইহা এমনভাবে লেখা যে, আমাভিন্ন দ্বিতীয় ব্যক্তির উহার বোধের অগম্য। যাহা হউক, এ বিষয় অনতিবিলম্বে ডায়রেক্টরদিগকে জানান উচিত। কি বল?”

 “না, এখন নয়। কেন না মানুষের মন কখন কি হয়, বলা যায় না। চাই কি তোমায় তাঁহারা সন্দেহ করিতে পারে। আর দুই চারি দিন অপেক্ষা কর। ইতিমধ্যে ভাল রকম সন্ধান করা যাউক। আমার কার্য্যের ক্ষতি হইলেও, আমি বিশেষভাবে অনুসন্ধান করিতে ক্ৰটী করিব না। চোর ধরা পড়িবে নিশ্চিত।”

 আর দুই একটা কথাবার্ত্তার পর, আমি বাড়ী ফিরিয়া আসিলাম।