বিষয়বস্তুতে চলুন

৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/দ্বিতীয় খণ্ড/একাদশ পরিচ্ছেদ

​

একাদশ পরিচ্ছেদ

বিনা মেঘে বজ্রাঘাত

ইন্‌স্ টাউন বন্দরে আমেরিকার ডাক নামিত। একখানা অতি দ্রুতগামী ট্রেণে সেই ডাক ডব্‌লিন নগরে প্রেরিত হইত। ডব্‌লিনে ডাক লইবার জন্য লিভারপুলের ষ্টীমার প্রস্তুতই থাকিত। মিঃ ফগ হিসাব করিয়া দেখিলেন, সেই পথে গেলে তিনি নির্দ্দিষ্ট কালের দ্বাদশ ঘণ্টা পূর্ব্বেই লিভারপুলে যাইতে পারিবেন, এবং অনায়াসে আটটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের সময় লণ্ডনে পৌঁছিবেন।

 রাত্রি একটার সময় হেন্‌রিয়েটা কুইন্‌স্‌টাউন বন্দরে নোঙ্গর করিল। মিঃ ফগ কাল বিলম্ব না করিয়া ট্রেণে উঠিলেন এবং পরদিন বেলা এগারটা চল্লিশ মিনিটের সময় লিভারপুলে উপনীত হইলেন।

 লিভারপুল হইতে লণ্ডন ছয় ঘণ্টার পথ। ট্রেণেরও অভাব ছিল না। মিঃ ফগ বুঝিলেন, বিজয় সুনিশ্চিত। জিয়েন আনন্দে নৃত্য করিয়া উঠিল। গোয়েন্দা ফিক্স সেই সময়ে মিঃ ফগের স্কন্ধে হস্ত স্থাপন করিয়া কহিলেন—

 “সত্যই কি আপনার নাম ফিলিয়াস্ ফগ?”

 “হাঁ।”

​ “তবে রাজার নামে আমি আপনাকে গ্রেপ্তার করলেম!”

 ফিলিয়াস্ ফগ বন্দী হইলেন। তাঁহার মস্তকে আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল! গোয়েন্দা ফিক্স তাঁহাকে কাষ্টম্‌স্‌ গৃহের কারাকক্ষে আবদ্ধ করিয়া রাখিলেন!

 যদি পুলিশে বাধা না দিত তাহা হইলে জিয়েন নিশ্চয়ই তন্মুহূর্ত্তে গোয়েন্দাকে আক্রমণ করিত। তাহার হৃদয় ক্ষোভে ভাঙ্গিয়া পড়িল। হায় হায়! সে যদি পূর্ব্বেই মিঃ ফগকে গোয়েন্দার পরিচয় দিত, তাহা হইলে ত এমন ঘটিত না! জিয়েন ভাবিতে লাগিল, মৃত্যুই আমার উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত। রাণী আউদাকে দেখিয়া মনে হইতে লাগিল তিনি যেন এইমাত্র শ্মশান-শয্যা হইতে উঠিয়া আসিলেন।

 যখন নিশ্চিন্তে বাজি জিতিয়া মিঃ ফগ গৌরবের জয়মাল্য কণ্ঠে ধারণ করিতে যাইতেছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্ত্তেই তাঁহার সর্ব্বনাশ ঘটিল! ধন, সম্পদ, যশঃ সমস্তই এক নিমিষে ভাসিয়া গেল! ফিলিয়াস্‌ ফগ ভিখারী হইলেন! হায় হায়! তখনো ৮ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট সময় ছিল। লণ্ডনে পৌঁছিতে ছয় ঘণ্টার অধিক লাগিত না! বিনামেঘে নিদারুণ বজ্রাঘাত হইল!

 মিঃ ফগ তাঁহার কারাকক্ষের মধ্যে নীরবে বসিয়া রহিলেন। তাঁহার হৃদয়মধ্যে যে তরঙ্গ খেলিতেছিল তাহা বাহিরে আত্ম-প্রকাশ করিল না। সঙ্গীরা দেখিলেন, মিঃ ফগ যেমন শান্ত, যেমন অবিচলিত, যেমন দৃঢ়, ঠিক তেমনই আছেন। এই ভীষণ দুর্ঘটনাতেও কেহ তাঁহার কোন পরিবর্ত্তন লক্ষ্য করিতে পারিল না! তবে কি তখনো তিনি ভাবিতেছিলেন যে বাজি জয় করিবেন!

 সকলেই দেথিল তিনি তাঁহার ঘড়িটা সম্মুখস্থিত টেবিলের উপর রাখিয়া একদৃষ্টে উহার দিকে চাহিয়া আছেন। যেন একমনে সেকেণ্ড, ​মিনিট প্রভৃতি গণনা করিতেছেন। তাঁহার নয়নদ্বয় তখন অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখাইতেছিল। সে নয়নে কি যে একটা ভাব প্রকাশিত হইতেছিল তাহা কেহ বলিতে পারে না। কিন্তু ইহা নিশ্চিতই যে তাহা অস্বাভাবিক এবং ভীষণ! তিনি কি তবে পলায়ন করিবার সুযোগ সন্ধান করিতেছিলেন? তাহা হইতে পারে। নতুবা আসন পরিত্যাগ করিয়া পুনঃ পুনঃ উঠিবেন কেন? তিনি কি বুঝিতে পারেন নাই যে, সে কক্ষের দ্বার—সে গৃহের গবাক্ষ ভগ্ন করিয়া পলায়ন মনুষ্য-সাধ্যাতীত!

 ঘুরিতে ঘুরিতে ক্লান্ত হইয়া ফিলিয়াস্ ফগ একখানি চেয়ারে উপবেশন করিলেন এবং পকেট হইতে রোজ নামচার পাতাখানি বাহির করিয়া পাঠ করিলেন—“২১শে ডিসেম্বর, শনিবার—লিভারপুল।”

 মিঃ ফগ তন্নিম্নে লিখিলেন—

 “৮০ দিনের দিন বেলা ১১টা ৪০ মিনিট।”

 ফিলিয়াস্ ফগ নির্ব্বাক্ হইয়া নীরবে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। কাষ্টম্‌স্‌ গৃহের ঘড়িতে টং করিয়া বেলা ১টা বাজিল। মিঃ ফগ দেখিলেন তাঁহার নিজের ঘড়ী ২ মিনিট অগ্রগামী।

 দুইটা বাজিল। যদি তখনো তিনি মুক্তি পাইতেন এবং একখানি দ্রুতগামী এক্সপ্রেস ট্রেণ ধরিতে পারিতেন, তাহা হইলেও তাঁহার জয় হইত!

 পনের মিনিট গেল—কুড়ি মিনিট গেল—অর্দ্ধঘণ্টা অতীত হইল! আর ভরসা নাই!

 অকস্মাৎ ও কিসের শব্দ হইল! ঝন্―ঝন্—ঝনাৎ! কারাকক্ষের রুদ্ধদ্বার সহসা মুক্ত হইল। রাণী আউদা গোয়েন্দা ফিক্স ও জিয়েন দৌড়াইয়া কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিলেন।

 গোয়েন্দা ব্যগ্র ভাবে কহিলেন “মিঃ ফগ, ক্ষমা করুন—ক্ষমা করুন। ভুলে আপনাকে ধরা হয়েছিল! আসল চোর ধরা পড়েছে! আপনার ​চেহারার সঙ্গে তার চেহারার মিল ছিল বলেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে! আপনি মুক্ত―আপনি মুক্ত! “

 ফিলিয়াস্ ফগ কারামুক্ত হইলেন। তিনি ধীর পদবিক্ষেপে মিঃ ফিক্সের দিকে অগ্রসর হইয়া একবার মুহূর্ত্তের জন্য তাঁহার মুখের দিকে চাহিলেন। পরক্ষণেই তাঁহার একটা ভীষণ মুষ্ট্যাঘাতে গোয়েন্দা ফিক্স কক্ষতলে পতিত হইলেন!

 বাক্য বিনিময় না করিয়া মিঃ ফগ সঙ্গিগণ সহ একখানি গাড়ীতে উঠিলেন এবং অবিলম্বে রেলষ্টেশনে উপনীত হইলেন।

 মিঃ ফগের দুর্ভাগ্য! ষ্টেশনে পৌঁছিয়াই শুনিলেন লণ্ডনের ট্রেণ ২টা ৫ মিনিটের সময় চলিয়া গিয়াছে! তখন আর কোনো ট্রেণও ছিল না!

 ফিলিয়াস্ ফগ অবিলম্বে একখানি স্পেশাল ট্রেণের বন্দোবস্ত করিলেন। ট্রেন প্লাটফরমে আসিয়া দাঁড়াইল। ফগ ড্রাইভারকে পুরস্কারের লোভ দেখাইয়া গাড়ীতে উঠিলেন।

 ড্রাইভার চেষ্টার ত্রুটি করিল না। কিন্তু ট্রেণ যখন লণ্ডনে আসিয়া পৌঁছিল তখন ষ্টেশনের ঘড়ীতে ৮টা বাজিয়া ৫০ মিনিট হইয়া গিয়াছে!

 সমস্ত পৃথ্বী পর্য্যটন করিয়া প্রত্যাবর্ত্তন করিতে ফিলিয়াস্ ফগের অবশেষে ৫ মিনিট বিলম্ব হইয়া গেল!

 তাঁহার পরাজয় ঘটিল!