বিষয়বস্তুতে চলুন

৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/দ্বিতীয় খণ্ড/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

​

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

আমেরিকার সভা

কাদশ দিবস পরে ‘জেনেরাল গ্রাণ্ট’ সান্‌ফ্রান্সিস্‌কোর সুবর্ণদ্বারে আসিয়া লাগিল। প্রভাতে মিঃ ফগ আমেরিকার তীরে পদার্পণ করিলেন, নামিয়াই শুনিলেন নিউইয়র্কের ট্রেণ সন্ধ্যার সময় ছাড়িবে। তাঁহারা একটা পান্থনিবাসে গমন করিলেন।

 সান্‌ফ্রান্সিস্‌কোর সুপ্রশস্ত রাজপথ, সুবিস্তৃত উদ্যান, উচ্চ সৌধমালা, অগণিত ধর্ম্মমন্দির সকল, রাজপ্রাসাদতুল্য গুদাম ঘর, অসংখ্য শকট, অগণিত ওম্‌নিবাস্ এবং নিয়ত ভ্রাম্যমাণ ট্রামগাড়ী প্রভৃতি জিয়েনকে লণ্ডনের কথা স্মরণ করাইয়া দিল। কে এখন বলিবে যে এই স্থানেই একদিন নরশোণিতলোলুপ দস্যু দিগের পধান কেন্দ্র ছিল। কে বলিবে যে গৃহদাহকারী হিতাহিত জ্ঞানশূন্য লুণ্ঠনকারী নরপিশাচের দল এক হস্তে পিস্তল এবং অপর হস্তে সুশাণিত ছুরি লইয়া একদিন এখানে নির্ভয়ে বিচরণ করিত। তাহাদিগকে বাধা দিবার কেহ ছিল না, ধৃত করিবার কেহ ছিল না—তাহাদিগের সম্মুখে পড়িলে মুক্তি লাভেরও উপায় ছিল না!

 সান্‌ফ্রান্সিস্‌কো এখন বাণিজ্য-কেন্দ্র। আমেরিকা, ইউরোপ, চীন, ভারতবর্ষ প্রভৃতি কত দেশের লোক সান্‌ফ্রান্সিস্‌কোতে বাস করিতেছে। রাজপথ সর্ব্বদা কোলাহল-চঞ্চল—নাগরিকগণ সর্ব্বদা কর্ম্মে ব্যস্ত।

 মিঃ ফগ যে পান্থশালায় উঠিলেন তাহা বেশ পরিচ্ছন্ন। সেখানে কোনো ​দ্রব্যেরই অভাব ছিল না। প্রাতরাশের পর তিনি রাণী আউদাকে লইয়া ইংরাজ কন্‌সালের আফিসে গমন করিলেন। ছাড়পত্রখানিতে কন্‌সালের স্বাক্ষর লইবার আবশ্যক ছিল। জিয়েন কহিল, “শুনেছি আমেরিকার রেলপথে অনেক দস্যু-তস্করের ভয় আছে। তাহারা চলন্ত ট্রেণে লুণ্ঠন করে। গোটাকতক রিভলভার কিনে নিলে হয়।”

 মিঃ ফগ কহিলেন, “ইচ্ছা হয় কিনতে পার। পথে হয় ত কোন আবশ্যকই হবে না।”

 মিঃ ফগ কিয়দ্দূর অগ্রসর হইতেই অকস্মাৎ রাজপথে ফিক্স গোয়েন্দার সহিত সাক্ষাৎ হইল। তাঁহাকে দেখাইয়া ফগ কহিলেন, “বড় আশ্চর্য্যের কথা ত আমরা এক জাহাজেই এসেছি, অথচ আপনার সঙ্গে জাহাজে একটা দিনও দেখা হয়নি!”

 গোয়েন্দা পূর্ব্বকথা উল্লেখ করিয়া কৃতজ্ঞতা জানাইলেন এবং কহিলেন “আপনার মত লোকের সঙ্গে একত্রে ভ্রমণ করা সৌভাগ্যের কথা। আমিও কার্য্যের খাতিরে ইউরোপেই যাচ্ছি। যদি বাধা না থাকে, আমরা এক সঙ্গেই যেতে পারি।”

 “সে কি কথা! আপনার সঙ্গে ভ্রমণ করা ত আমারই সৌভাগ্যের কথা। বেশ ত, আমরা একত্রেই ইউরোপে যাব।”

 ফিক্সের উদ্দেশ্য সফল হইল।

 তাঁহারা মণ্টোগুমরী স্ট্রীট্‌ দিয়া গমন করিতেছিলেন। সম্মুখেই দেখিলেন বিপুল জনতা। সে জনস্রোত ভেদ করিয়া সম্মুখে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। তথায় কেহ বা চীৎকার করিতেছে, কেহ বা প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মুদ্রিত বিজ্ঞাপন লইয়া ছুটাছুটি করিতেছে। কোথাও নিশান উড়িতেছে, কোন স্থানে বা শতকণ্ঠে জয়ধ্বনি নিনাদিত হইতেছে! কেহ বলিতেছে “জয় কামের্‌ফিল্ড”, কেহ বা বলিতেছে “মডিবয়ের জয় হোক্।”

​ গোয়েন্দা ফিক্স ব্যাপার দেখিয়া অনুমান করিলেন, এ নিশ্চয়ই কোনো রাজনৈতিক সভা। তাই তিনি কহিলেন, “আসুন, আমরা সরে পড়ি। এখানে দাঁড়ালে হয় ত একটা বিপদ্ ঘটিতে পারে।”

 মিঃ ফগ সম্মত হইলেন। তিনিও কহিলেন, “রাজনৈতিক হিসাবে আঘাত করিলেও লাগে। চলুন সরাই যাক্।

 তখন অন্যদিকে যাইবার আর উপায় ছিল না। তাঁহারা মটোগুমারি স্ট্রীটের প্রান্ত সীমায় অবস্থিত একটী মঞ্চের কতকগুলি সোপানশ্রেণী আরোহণ করিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের সম্মুখেই আর একটী প্রকাণ্ড মঞ্চ ছিল। সেই জনসঙ্ঘ তখন মঞ্চের দিকে অগ্রসর হইতেছিল। মিঃ ফগ ভাবিলেন, হয় ত আমেরিকার জাতীয় অধিবেশনের সভাপতি নিযুক্ত হইবেন, কিম্বা কোন প্রাদেশিক শাসনকর্ত্তা মনোনীত হইবেন—এ সভা সেই জন্যই আদ্ভুত হইয়া থাকিবে।

 কোলাহল বাডিয়া উঠল। মুষ্টি বন্ধ সহস্র বাহু উর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত হইল, যেন সকলে হস্ত উত্তোলনপূর্ব্বক মনোনয়নে সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছিল। সেই জন-সমুদ্র দুলিতে লাগিল—কাঁপিতে লাগিল। পতাকাগুলি ঊর্দ্ধে উঠিবামাত্র লোকে উহা ছিন্ন করিয়া সহস্র খণ্ড করিতে লাগিল! কত টুপী পদস্পর্শে বিচূর্ণিত হইয়া গেল!

 ফিক্স কহিলেন, “এ নিশ্চয়ই রাজনৈতিক সভা, নহিলে এমন হয় না!”

 “তা’ হ’তেও পারে।”

 “আমার বোধ হয় অনারেবল মিঃ কামের্‌ফিল্ড এবং অনারেবল মিঃ মডিবয় এখানেই আছেন।”

 দেখিতে দেখিতে গণ্ডগোল কোলাহল গর্জ্জন অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাইল। সেই বিশাল জনস্রোতঃ ভীষণ চঞ্চল হইল। সবলে নিক্ষিপ্ত বুট্ এবং ​জুতা চারিদিকে ছুটিতে লাগিল! অবিরাম মুষ্টির আঘাত চলিতে আরম্ভ হইল! রিভল্‌ভারের শব্দও যে কর্ণে না আসিতেছিল তাহা নহে। মিঃ ফগ সঙ্গিগণ সহ যে স্থানে ছিলেন, একদল নাগরিক মারামারি করিতে করিতে সেই দিকে অগ্রসর হইল।

 গোয়েন্দা কহিলেন,—“চলুন এখান থেকেও সরা যাক্। যদি এদের মধ্যে ইংলণ্ডের কোনো কথা হয় আর আমাদের ইংরাজ বলে’ চিন্‌তে পারে, তা’ হ’লে দুই এক ঘা আমাদের পিঠেও পড়তে পারে।”

 ফিলিয়াস্ ফগ কেবল বলিতে যাইতেছিলেন, “একজন ইংরাজ কি—” তাঁহার মুখের কথা মুখেই থাকিল। গণ্ডগোল এতই বৃদ্ধি পাইল যে কে কাহার কথা শুনিবে। নাগরিকগণ সমুদ্রগর্জ্জনের ন্যায় গর্জ্জন করিতে লাগিল। মুষ্টিপ্রহারের ত বিরামই ছিল না! একজন বলিষ্ঠ পুরুষ মিঃ ফগের মস্তক লক্ষ্য করিয়া ভীম বেগে যষ্টি উঠাইল। যদি গোয়েন্দা ফিক্স আপনার দেহে সে আঘাত না লইতেন, হয় ত ফিলিয়াস্ ফগ বিশেষরূপে আহত হইতেন। যষ্টির আঘাতে মিঃ ফিক্সের টুপী চূর্ণ হইয়া গেল।

 ফগ ঘৃণাভরে কহিলেন,—“ওরে নীচাশয় ইয়াঙ্কি!”

 রক্তরাঙ্গা শ্মশ্রুবিশিষ্ট আমেরিকান উত্তর দিল, “রে ইংরাজ পশু! মনে থাকে যেন, আবার আমাদের দেখা হবে!”

 “আচ্ছা বেশ—যখন ইচ্ছা।”

 “তোমার নাম কি?”

 “ফিলিয়াস্ ফগ। তোমার?”

 “কর্ণেল ষ্ট্যাম্প প্রক্টর।”

 উন্মত্ত নাগরিকগণ কাহারো জন্য অপেক্ষা করিতেছিল না। ফিক্স গোয়েন্দা তাহাদিগের ধাক্কায় ভূশয্যা গ্রহণ করিলেন! তাহাকে মথিত ​করিয়া নাগরিকগণ চলিয়া গেল। কেহ কাহারো দিকে ফিরিয়াও চাহিল না।

 গোয়েন্দা সৌভাগ্যবশতঃ অল্প আঘাতেই নিষ্কৃতি পাইলেন। তাঁহার পরিচ্ছদাদি শতখণ্ডে ছিন্ন হইয়া গেল। রাণী আউদাকে রক্ষা করিতে গিয়া মিঃ ফগের অবস্থাও তদ্রূপই হইয়াছিল। তাঁহারা তখন পান্থশালায় প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া পুনরায় নূতন পরিচ্ছদ ক্রয় করিলেন।

 জিয়েন ইতিপূর্ব্বেই ১২ টী ছয়-নালা রিভল্‌ভার ও তদুপযুক্ত গুলি লইয়া পান্থনিবাসে আসিয়া অপেক্ষা করিতেছিল। ফিক্স গোয়েন্দাকে দেখিয়াই তাহার ভ্রূ কুঞ্চিত হইয়া উঠিল। কিন্তু সে যখন শুনিল যে তাঁহার জন্যই মিঃ ফগ বিশেষরূপে আহত হইতে হইতে বাঁচিয়া গিয়াছেন, সে তখন অনেকটা শান্ত হইল। দেখিল, ফিক্স গোয়েন্দার সহিত জাহাজে তাহার যেরূপ বন্দোবস্ত হইয়াছিল, গোয়েন্দা সেইরূপই কার্য্য করিতেছেন।

 সান্ধ্যভোজ শেষ করিয়া তাঁহারা ট্রেণে যাইয়া উঠিলেন। গাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিতে করিতে মিঃ ফগ কহিলেন, “সেই আমেরিকান্‌টার সঙ্গে আর দেখা হল না। ইংরাজকে অপমান করার প্রতিশোধ দিতে আর একবার তার সন্ধানে আমাকে এ দেশে আস্‌তে হ’বে।”

 গোয়েন্দা ফিক্স মনে মনে হাসিলেন। ভাবিলেন, “একবার ইংলণ্ডে গেলে হয়, তা’ হ’লে আর তোমাকে ফিরতে হ’বে না! আমি তবে সঙ্গে আছি কেন।”

 একজন রেলের কুলিকে নিকটে দেখিয়া মিঃ ফগ জিজ্ঞাসা করিলেন,—“আজ অত গোলযোগ হ’ল কিসের?”

 “একটা সভা হচ্ছিল।”

 “কি? কোন সেনাপতি মনোনীত হচ্ছিলেন বুঝি?”

​ কুলি হাসিয়া কহিল, “না—না। বাপ্‌রে সে কি আর একটা সহজ কথা! এখানে একজন বিচারক মনোনীত হচ্ছিলেন।”

 আর অধিক কথা বলিবার সময় ছিল না। ট্রেণ ছাড়িল।

 নিউইয়র্ক হইতে সান্‌ফ্রান্সিস্‌কো পর্য্যন্ত যে রেলপথ কত বন কত প্রান্তর কত শৈলশ্রেণী অতিক্রম করিয়া, শৈলগুহা ভেদ করিয়া নির্ম্মিত হইয়াছিল, তাহার দৈর্ঘ্য ৩৭৮৬ মাইল। এই সুদীর্ঘ পথ গমন করিতে এককালে অন্ততঃ ছয় মাস লাগিত। সেই ছয় মাসের পথ এখন এক সপ্তাহে দাঁড়াইয়াছে।

 যে গাড়ীতে সঙ্গিগণ সহ মিঃ ফগ প্রবেশ করিলেন, তাহা একখানি দীর্ঘ ওম্‌নিবস্ গাড়ী। গাড়ীর ভিতর আর অন্য কোন কক্ষ ছিল না। উভয় পার্শ্বে যাত্রীদিগের বসিবার ব্যবস্থা এবং মধ্যস্থল দিয়া গমনাগমনের পথ। সেই পথেই চলন্ত ট্রেণেও এক গাড়ী হইতে অন্য গাড়ীতে যাতায়াত করা যাইত। দুইখানি গাড়ীর মধ্যবর্তী স্থান অতি অল্পই ছিল। ট্রেণেই বসিবার কক্ষ, চুরুট খাইবার কামরা, আহারের কক্ষ প্রভৃতি সমস্তই ছিল। পুস্তক পত্রিকা ভোজ্য পেয় প্রভৃতি ট্রেণে কিছুরই অভাব ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে একটা ক্ষুদ্র মুদ্রাযন্ত্র পর্য্যন্ত চলিয়াছিল। সেই মুদ্রাযন্ত্র হইতে সংবাদপত্রও প্রচারিত হইত!

 ট্রেণের বসিবার আসনগুলি এইরূপ কৌশলে প্রস্তুত ছিল যে, তাহাদের পশ্চাতের অংশগুলি খুলিয়া দিলেই চমৎকার শয্যা বাহির হইত। সেই শয্যাগুলি পরিচ্ছন্ন ও কোমল আস্তরণে আচ্ছাদিত। তাহার উপর কোমল উপাধান! কেহ কাহাকেও দেখিতে না পায় সেই জন্য আবার প্রত্যেক শয্যার সঙ্গেই পর্দ্দার ব্যবস্থাও ছিল। যে গাড়ীতে যতগুলি শয্যা, সেই গাড়ীতে তাহার অধিক যাত্রী থাকিবার রীতি ছিল না। এই শয্যা রচনা করিবার এবং রচিত শয্যা খুলিয়া দিবার জন্য স্বতন্ত্র ​কর্ম্মচারীর বন্দোবস্ত ছিল। তাহারা রাত্রি ৮টার সময় শয্যা খুলিয়া দিত এবং প্রভাতে বন্ধ করিয়া রাখিত!

 সময় মত সেই কর্ম্মচারী আসিয়া শয্যা বাহির করিয়া দিল। যাত্রিগণ একে একে শয়ন করিলেন। কালিফোর্নিয়ার স্বর্ণ-ভূমির উপর দিয়া ট্রেণ তখন হু হু করিয়া চলিতেছিল।