৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/দ্বিতীয় খণ্ড/চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ
চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ
“আউদা—প্রাণাধিকে—”
বে কি সত্যই মিঃ ফগ আসিলেন? সকলে সবিস্ময়ে চাহিয়া দেখিলেন সত্যই ফিলিয়াস্ ফগ আসিয়াছেন!
পাঠকদিগের বোধ হয় স্মরণ আছে যে সেইদিন রাত্রি ৮টা ৫ মিনিটের সময়—অর্থাৎ মিঃ ফগের লণ্ডনে আসিবার প্রায় ২৫ ঘণ্টা পর—জিয়েন বিবাহের বন্দোবস্ত করিবার জন্য পুরোহিতের নিকট প্রেরিত হইয়াছিল।
পুরোহিতের বাটীতে যাইয়া জিয়েন শুনিল, তিনি বাহিরে গিয়াছেন। সে তাঁহার অপেক্ষায় প্রায় ২০ মিনিট বসিয়া রহিল।
৮টা ৩৫ মিনিটের সময় জিয়েন উন্মত্তের ন্যায় পুরোহিতের গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইল। দৌড়াইতে দৌড়াইতে তাহার টুপী পথিমধ্যে কোথায় পড়িয়া গেল! তাহার সহিত ধাক্কা লাগিয়া কয়েকজন পথিক রাজপথে আছাড় খাইয়া পড়িল এবং চিৎকার করিয়া তাহার উদ্দেশে গালাগালি দিতে লাগিল! জিয়েনের সে দিকে লক্ষ্য ছিল না। দৌড়—দৌড়―দৌড়! সে প্রাণপণে দৌড়াইতেছিল,―
তিন মিনিটের মধ্যে জিয়েন গৃহে আসিয়া উপনীত হইল এবং নিরুদ্ধ নিশ্বাসে মিঃ ফগকে কহিল,―
“বিবাহ হ’তে পারে না।”
“হ’তে পারে না—কেন?”
“কাল হ’তে পারে না”
“কেন?”
“কাল রবিবার।”
“না—সোমবার।”
“আজ শনিবার।”
“শনিবার? হ’তেই পারে না!”
“আজ শনিবার—শনিবার। আপনার ভুল হয়েছে। আমরা নির্দ্দিষ্ট সময়ের ২৪ ঘণ্টা পূর্ব্বেই এসেছি! আর ১০ মিনিট মাত্র সময় আছে। আপনি উঠুন!
জিয়েন মিঃ ফগকে আর কথা কহিতে দিল না। সবলে তাঁহার হস্ত ধারণ করিয়া টানিয়া লইয়া চলিল। মিঃ ফগ উর্দ্ধশ্বাসে ছুটিলেন। রাজপথে আসিয়া একখানি গাড়ীতে উঠিয়া চালককে কহিলেন,―
“জলদি চালাও পল্মল্—হাজার টাকা বখশিস্!”
নক্ষত্রবেগে গাড়ী ছুটিল। দুইটা কুক্কুর গাড়ীর নীচে পড়িয়া মরিয়া গেল—পাঁচ খানা বিপরীত গামী গাড়ী ধাক্কা লাগিয়া উল্টাইয়া পড়িল! মিঃ ফগ বলিতে লাগিলেন, “চালাও চালাও—হাজার টাকা বখশিস্!”
৮টা ৪৫ মিনিটের সময় গাড়ী আসিয়া সংস্কার-সমিতির দ্বারদেশে থামিল। মিঃ ফগ গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন।
ফিলিয়াস ফগের ন্যায় সুদক্ষ হিসাবী পর্য্যটকের কেন এরূপ ভুল হইল? তিনি কি দিবস গণনা করিতেই ভুল করিয়াছিলেন? ইহার উত্তর অত্যন্ত সহজ। তিনি অজ্ঞাতে অল্পে অল্পে মোটের উপর ২৪ঘণ্টা সময় অগ্রবর্ত্তী হইয়াছিলেন। লণ্ডন হইতে যাত্রা করা অবধি বরাবর তিনি পূর্ব্বমুখেই আসিতেছিলেন, কাজেই মোটের উপর একদিন বাড়িয়াছিল। তিনি যদি পশ্চিমাবর্ত্তনে পৃথ্বী পর্য্যটন করিতেন তাহা হইলে তাঁহাকে একদিন পশ্চাদ্বর্ত্তী হইতে হইত।
বরাবর পূর্ব্বমুখে যাইতে যাইতে তিনি ক্রমেই দক্ষিণ মেরুর নিকটবর্ত্তী হইতেছিলেন। কাজেই দিনগুলি প্রত্যেক ডিগ্রীতে ৪ মিনিট করিয়া ছোট হইতেছিল। সুতরাং ৬০ ডিগ্রীতে মোটের উপর ২৪ ঘণ্টা ছোট হইয়াছিল। মিঃ ফগ সেই জন্যই ২৪ ঘণ্টা কাল অগ্রবর্ত্তী হইয়াছিলেন।
অন্যভাবে বলিতে গেলে, বলিতে হয়, মিঃ ফগ পূর্ব্বদিকে অগ্রসর হইতে হইতে মোটের উপর সূর্য্যদেবকে ৮০ বার মধ্যাহ্ন গগনে দর্শন করিয়াছিলেন। অথচ সেই কাজের মধ্যে তাঁহার বন্ধুগণ লণ্ডনে বসিয়া ৭৯ বার দেখিয়াছিলেন! ইহাতেই একদিনের গোলযোগ ঘটিয়াছিল।
বিজয়লক্ষ্মী অবশেষে ফিলিয়াস্ ফগের কণ্ঠেই জয়মাল্য অর্পণ করিলেন। তিনি বাজি জয় করিয়া তিন লক্ষ টাকা পাইয়াছিলেন বটে, কিন্তু এই অদ্ভুত পর্য্যটন ব্যাপারে তাঁহার প্রায় সমুদয় অর্থই ব্যয়িত হইয়াছিল। যাহা অবশিষ্ট ছিল, মিঃ ফগ তাহা ফিক্স গোয়েন্দা ও জিয়েনকে সমান ভাগে ভাগ করিয়া দিলেন। গোয়েন্দার উপর তাঁহার কোন বিদ্বেষভাব ছিল না।
জিয়েনের অংশ হইতে মিঃ ফগ গ্যাসের দাম কাটিয়া লইতে বিস্মৃত হইলেন না। কারণ তাহার অনবধানতাবশতঃ গ্যাস ১৯২০ ঘণ্টা অনর্থক জ্বলিয়াছিল!
বাজি জয় করিবার পর মিঃ ফগ রাণী আউদাকে কহিলেন, “আমাদের বিবাহের প্রস্তাবে কি আপনি এখনো সম্মত আছেন?”
“এ কথা আমারই জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল। প্রথম যখন বিবাহের কথা হয় তখন আপনি একেবারে নিঃসম্বল ছিলেন, এখন আপনি ধনসম্পদে বিজয়গৌরবে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত।”
“এ ধন-সম্পদ সমস্তই আপনার। আপনি যদি বিবাহের প্রস্তাব না করতেন তা হ’লে জিয়েনও পুরোহিতের কাছে যেত না, আমার ভ্রমও ধরা পড়ত না।”
রাণী আউদা আবেগভরে কহিলেন, “মিঃ ফগ—প্রিয়তম”—প্রেমপূর্ণ কণ্ঠে ফিলিয়াস ফগ ডাকিলেন, “আউদা-প্রাণাধিকে।”
ইহার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুভোদ্বাহ সুসম্পন্ন হইয়া গেল। জিয়েন কন্যা সম্প্রদান করিয়া কৃতার্থ হইল।