বিষয়বস্তুতে চলুন

৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/দ্বিতীয় খণ্ড/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

​

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

গোয়েন্দার শিক্ষালাভ

ঘাই বন্দরে কি ঘটিয়াছিল পাঠকগণ তাহা সহজেই অনুমান করিতে পারিবেন। তঙ্কাদিরির সঙ্কেত দেখিতে পাইয়া, তাহার কামানের ধ্বনি শুনিয়া ডাকজাহাজ থামিল। মিঃ ফগ মাঝি বুন্‌স্‌বিকে প্রতিশ্রুত অর্থাদি প্রদান করিয়া অবিলম্বে জাহাজে যাইয়া উঠিলেন এবং ১৪ই তারিখে ইয়োকোহামায় পৌঁছিলেন।

 ইয়োকোহামায় পৌঁছিয়াই কর্ণাটিক জাহাজে যাইয়া শুনিলেন, জিয়েন নামক একজন ফরাসী সেই জাহাজেই ইয়োকোহামা আসিয়াছে। সেই দিন রাত্রেই মিঃ ফগের সান্‌ফ্রান্সিস্‌কো যাত্রা করিবার কথা। তিনি ইয়োকোহামার কন্‌সাল্ আফিসে গিয়া জিয়েনের সন্ধান করিলেন। হঠাৎ যদি সাক্ষাৎ হয় এই মনে করিয়া নগরের নানা রাজপথে ভ্রমণ করিয়া বেড়াইলেন। যখন অনেক চেষ্টাতেও ভৃত্যের কোনো সংবাদ পাওয়া গেল না, তখন তিনি ও রাণী আউদা দুঃখিত চিত্তে জাহাজে প্রত্যাবর্ত্তন করিতেছিলেন। পথিমধ্যে বাজীকরের মণ্ডপ-সান্নিধ্যে বহুলোক-সমাগম দেখিয়া, ক্রীড়াদর্শনমানসে তথায় গিয়াছিলেন। সুদীর্ঘ নাসা এবং পক্ষবিশিষ্ট ভক্তবৃন্দের মধ্যে যে জিয়েনও থাকিতে পারে, আদৌ তাঁহার এ ধারণা ছিল না। তিনি নিশ্চিন্ত চিত্তে ক্রীড়া দর্শন করিতেছিলেন।

 জগন্নাথের রথ প্রস্তুত করিতে করিতে জিয়েন দেখিল, অদূরে মিঃ ফগ ও রাণী আউদা দর্শকদিগের মধ্যে বসিয়া রহিয়াছেন। সে আর স্থির ​থাকিতে পারিল না। তাহার দীর্ঘনাসা নড়িয়া উঠিল এবং অকস্মাৎ স্থানচ্যুত হইল! একটা নির্ভর-স্তম্ভ ভাঙ্গিবামাত্রই সেই বৃহৎ রথও মুহূর্ত্তে খসিয়া পড়িয়াছিল।

 রাণী আউদার নিকট জিয়েন তাহার প্রভুর সমুদ্রযাত্রার কাহিনী শ্রবণ করিল। সে আরও শুনিল যে ফিক্স নামে একজন ইংরাজ ভদ্রলোকও তাঁহাদিগের সঙ্গেই ইয়োকোহামায় আসিয়াছেন। গোয়েন্দার নাম শুনিয়া জিয়েন কিছুমাত্র চাঞ্চল্য প্রকাশ করিল না। সে ভাবিল উপযুক্ত সময়ে সমস্তই প্রকাশ করিয়া দিবে। আত্মকাহিনী বর্ণনকালে সে শুধু বলিল যে অহিফেন তাহাকে অচৈতন্য করাতেই তাহার এত দুর্দ্দশা ঘটিয়াছে। মিঃ ফগ সমস্ত শুনিয়া কৃপাপরবশ হইয়া তাহাকে পরিচ্ছদাদি ক্রয় করিবার অর্থ প্রদান করিলেন।

 ফিক্স গোয়েন্দাও ‘জেনেরাল গ্রাণ্ট’ জাহাজেই ছিলেন। ইয়োকোহামা পৌঁছিয়াই তিনি দেখিলেন সেই প্রত্যাশিত পরোয়ানা বিলাত হইতে আসিয়াছে। কিন্তু তাহার বলে তখন আর মিঃ ফগকে ধৃত করিবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না! ইংরাজের রাজ্যের বাহিরে আসামীকে ধরিতে হইলে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন। সাধারণ গ্রেপ্তারী পরোয়ানায় কোন ফল হয় না। বিশেষ ব্যবস্থা করিবার সময় তখন ছিল না। ফিক্স ভাবিলেন, “যাহোক্ পরোয়ানা ত এসেছে, এখানে না হয় দস্যুকে না-ই ধরিলাম, ইংলণ্ডে যাওয়ামাত্রই ধরিব। তখন কে রাখে দেখিব। সেখানে যেতে যেতেই মিঃ ফগ বোধ হয় অবশিষ্ট অর্থ খরচ করে ফেল্‌বেন! তার আর উপায় কি। ফগ যাহাতে সত্বর ইংলণ্ডে যেতে পারেন এখন তারই ব্যবস্থা করতে হ’বে।”

 যখন মিঃ ফগ জিয়েনকে লইয়া জাহাজে উঠেন, ফিক্স গোয়েন্দা তখনই উঠিতেছিলেন। তিনি সবিস্ময়ে দেখিলেন, অদ্ভুত পক্ষবিশিষ্ট ​জিয়েনও সেই জাহাজেই উপস্থিত! তিনি তাড়াতাড়ি নিজের কামরায় প্রস্থান করিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁহাকে সেই রজনীতেই জিয়েনের সম্মুখে আনিয়া উপস্থিত করিল!

 তাঁহাকে দেখিবামাত্রই জিয়েন আর বাক্যব্যয় না করিয়া তাঁহার কণ্ঠ চাপিয়া ধরিল এবং মুহুর্ম্মুহুঃ মুষ্ট্যাঘাত করিতে লাগিল! নিদারুণ প্রহারে গোয়েন্দা ফিক্স জাহাজের ডেকের উপর পতিত হইলেন। নাবিক এবং যাত্রীদিগের মধ্যে অনেকে চতুর্দ্দিকে দাঁড়াইয়া হো হো করিয়া হাসিতে লাগিল!

 মিঃ ফিক্স যখন কাতর কণ্ঠে কহিলেন, “আর কেন জিয়েন, ঢের হয়েছে।” তখন জিয়েন তাঁহাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিল,—

 “হাঁ, এখনকার মত হয়েছে বটে।”

 “এস তবে, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।”

 “কিন্তু—”

 “আমি এখন যা বল্‌বো, তা’ তোমার মনিবের মঙ্গলের জন্যই বল্‌বো জান্‌বে।”

 “বেশ!”

 উভয়ে জাহাজের অন্য দিকে গমন করিলেন। মিঃ ফিক্স বলিতে লাগিলেন,—

 “তুমি ত আমাকে খুব শিক্ষা দিলে দেখছি। বেশ ভালই। এমন যে ঘটরে তা’ কতকটা আমার জানাই ছিল। কিন্তু আমার কথাগুলো এখন মন দিয়ে শোন। এতদিন পর্য্যন্ত আমি মিঃ ফগের বিরুদ্ধাচরণ করেছি। কিন্তু এখন থেকে আমি তাঁর পক্ষাবলম্বন কর্‌বো।”

 “তা’ হ’লে দেখছি আপনি এখন বিশ্বাস করেন যে আমার প্রভু নির্দ্দোষ?”

​ “না—তা’ নয়। আমার এখনো বিশ্বাস তিনিই দস্যু! অত ব্যস্ত হ’য়ো না―আমি বলি শোন। মিঃ ফগ যতদিন ইংরাজ-রাজত্বের মধ্যে ছিলেন, ততদিন আমি তাঁকে আটক কর্‌তে অনেক চেষ্টা করেছি। তাঁর পেছনে বোম্বাইয়ের পুরোহিতদের আমিই লাগিয়েছিলেম, হংকংএ আমিই তোমাকে হতজ্ঞান করে রেখেছিলেম। মিঃ ফগ সেই জন্যই ইয়োকোহামার জাহাজ ধরতে পারেন নাই।”

 জিয়েন শুনিতে শুনিতে ক্রোধে অগ্নি-শর্ম্মা হইতেছিল। সে তাঁহার অজ্ঞাতে মুষ্টিবদ্ধ করিল। তাহার নয়নদ্বয় জ্বলিতে লাগিল। গোয়েন্দা কহিলেন,―

 “রাগ করো না—ঠাণ্ডা হ’য়ে কথা শোন। আমার বোধ হচ্ছে মিঃ ফগ এখন ইংলণ্ডে ফিরবেন। আমিও তাঁর অনুসরণ করবো। কিন্তু তিনি যাতে নির্ব্বিঘ্নে ইংলণ্ডে যেতে পারেন, আমাকে সেই চেষ্টাই করতে হ’বে। ইংলণ্ডেই জানা যাবে তিনি দোষী কি নির্দ্দোষ! ততদিন তুমিও যেমন তাঁর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, আমিও তাই।”

 ফিক্স গোয়েন্দা এরূপ দৃঢ়ভাবে কথাগুলি বলিলেন যে জিয়েনের বিশ্বাস হইল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,―

 “কেমন জিয়েন, তবে আজ থেকে আমরা বন্ধু!”

 “বন্ধু! কখনো না! আমরা বন্ধু ত হ’তেই পারি না। তবে আজ থেকে আমরা মিঃ ফগের সহযোগী। কিন্তু একটা কথা—যে মুহূর্ত্তে দেখবো আপনি তাঁর অনিষ্ট-চেষ্টায় অঙ্গুলি হেলনমাত্র করেছেন, সেই মুহূর্ত্তেই আপনার ঘাড় মুচড়ে ভেঙ্গে দিব। আমি যে তা’ পারবো সে পরিচয় বোধ হয় একটু আগেই পেয়েছেন! এ কথা যেন মনে থাকে।”

 স্থির ভাবে গোয়েন্দা কহিলেন, “তাই, বেশ তাই হ’বে।”

​ উভয়ে তখন জাহাজের ভিন্ন দিকে গমন করিলেন। ‘জেনারেল গ্রাণ্ট’ বেশ দ্রুতগামী ছিল। মিঃ ফগ হিসাব করিয়া দেখিলেন যে তিনি ২রা ডিসেম্বর সান্‌ফ্রান্সিস্‌কো, ১১ই নিউইয়র্ক এবং ২০শে লণ্ডনে পৌঁছিতে পারিবেন।

 প্রশান্ত মহাসাগর—নামেও প্রশান্ত, কার্য্যেও তাহাই ছিল। অচঞ্চল বারিরাশি ভেদ করিয়া ‘জেনারেল গ্রাণ্ট’ ঘণ্টায় ১২।১৩ মাইল করিয়া চলিতে লাগিল। আরোহিগণ নিরুদ্বেগে পান ভোজন ও নিদ্রায় মনোনিবেশ করিল। উল্লেখযোগ্য বিশেষ কোন ঘটনা জাহাজে ঘটিল না। যাহা কিছু ঘটিয়াছিল, তাহাও রাণী আউদার হৃদয়ে, পৃথিবীর সহিত তাহার বিশেষ সম্বন্ধ ছিল না।

 সে কোমল হৃদয় ক্রমেই মিঃ ফগের দিকে অলক্ষিতে আকৃষ্ট হইতেছিল। সে আকর্ষণের কারণ যে শুধু কৃতজ্ঞতা, রাণী আউদা তাহা ভাবিলেও সকলে স্বীকার করিবে না। কৃতজ্ঞতা অপেক্ষাও অনেক অধিক শক্তিশালী কি একটা ভাব কি একটা আকর্ষণ যেন রাণী আউদাকে ক্রমেই ফগের পক্ষপাতিনী করিয়া তুলিতেছিল। মিঃ ফগের হৃদয়ে কোন চাঞ্চল্য উপস্থিত হইয়াছিল কি না তাহার প্রমাণ নাই।

 জাহাজ যেমন চলিতেছিল, চলিতেই লাগিল।