বিষয়বস্তুতে চলুন

৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/দ্বিতীয় খণ্ড/দশম পরিচ্ছেদ

​

দশম পরিচ্ছেদ

বোমা ফাটিল না

ন্‌রিয়েটা জাহাজের নাবিকদিগের সহিত পোতাধ্যক্ষের বিশেষ সদ্ভাব ছিল না। মিঃ ফগ জাহাজে উঠিয়াই তাহা বুঝিতে পারিলেন। তাহাদিগের দুঃখে সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়া এবং প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিতরণ করিয়া ফগ দুই একদিন মধ্যেই নাবিকদিগকে বশ করিয়া ফেলিলেন।

 যেমন করিয়াই হউক জাহাজখানি যাহাতে লিভারপুল যায় তাহা করিতেই হইবে! মিঃ ফগ নাবিকদিগের সাহায্যে পোতাধ্যক্ষকে তাঁহার কক্ষমধ্যে বন্দী করিয়া রাখিলেন এবং নিজেই লিভারপুলের দিকে জাহাজ চালাইতে লাগলেন!

 তাঁহার কার্য্য দেখিয়া ফিক্স গোয়েন্দা হতজ্ঞান হইলেন। তিনি পরিতাপ করিতে লাগিলেন, ‘হায়, কেন এই দস্যুর সঙ্গে আসিলাম! ফিলিয়াস্ ফগ কখনো লিভারপুলে যাইতেছে না। ফগ নিশ্চয়ই একজন জল-দস্যু—আপনার গুপ্ত আড্ডায় যাইতেছে! সেখানে না জানি কত বিপদই ঘটিবে!”

 মিঃ ফগ যেরূপ ভাবে জাহাজ চালাইতে লাগিলেন, তাহাতে বোধ হইল তিনি নৌবিদ্যায় অতিমাত্র দক্ষ। জিয়েন অবাক্‌ হইয়া গেল! নাবিকগণ ​নুতন অধ্যক্ষের সদ্ব্যবহারে ও অর্থে এতই প্রীত হইয়াছিল যে প্রাণপণে আপন আপন কর্ত্তব্য সম্পাদন করিতে লাগিল।

 জাহাজ অবাধে চলিতে লাগিল। হেন্‌রিয়েটা দ্রুতগামী বটে। ১৩ই পর্য্যন্ত কোনো বাধাবিঘ্ন ঘটিল না। সেই দিনই ঝড়ের লক্ষণ সকল দেখা গেল। রাত্রিতে এমন শীতল বাতাস বহিল যে, কাহার সাধ্য কক্ষের বাহিরে আইসে। কিন্তু নাবিকগণ তখনো কর্ত্তব্যপালন করিতেছিল―নূতন অধ্যক্ষ অম্লানবদনে আপনার নির্দ্দিষ্ট স্থানে থাকিয়া জাহাজ চালাইতেছিলেন।

 ঝড় উঠিল। আটলাণ্টিক মহাসাগরের ঝড় অতি প্রবল। মিঃ ফগ পাল নামাইলেন। হেন্‌রিয়েটা কাঁপিতে কাঁপিতে দুলিতে দুলিতে তরঙ্গের উপর গড়াইতে গড়াইতে নক্ষত্রবেগে ছুটিতে লাগিল। তিনি জাগজের গতি শিথিল করিলেন না। এক এক সময় মনে হইতে লাগিল, হেনরিয়েটা আর থাকিবে না! এই ডুবিল—এইবার নিশ্চয় ডুবিল!

 “চালাও চালাও—বাষ্পনলের মুখ যেমন খোলা আছে, তেমনি থাকুক—জাহাজের গতি যেন মন্দ না হয়।” নবীন অধ্যক্ষের নির্ভীক আদেশ ধ্বনিত হইল।

 মিঃ ফগ কিছুতেই জাহাজের গতি মন্দ করিলেন না। ভীমকায় শৈল প্রমাণ তরঙ্গগুলি জাহাজের ডেকের উপর আসিয়া পড়িতে লাগিল। ডেক-বিধৌত করিয়া নাবিক দিগকে সিক্ত করিয়া ডেকে যে সকল দ্রব্যাদি ছিল তৎসমুদায় ভাসাইয়া লইয়া তরঙ্গের উপর তরঙ্গ এক দিক্‌ হইতে অপর দিকে গড়াইয়া যাইতে লাগিল। নুতন পোতাধ্যক্ষের আদেশ, “চালাও—চালাও—জাহাজ যেন কোন মতে শিথিলগতি না হয়!”

 অদ্য ১৬ই ডিসেম্বর। অদ্য ৭৫ দিন পূর্ণ হইল। এখনো আটলাণ্টিক মহাসাগরের পথে অনেক দূর যাইতে হইবে। জিয়েন ভাবিতে লাগিল, যদি জাহাজের বাষ্প কমিয়া না যায়, তাহা হইলে হয়ত হেন্‌রিয়েটা ​আটলাণ্টিক মহাসাগর অতিক্রম করিতে পারিবে। দুর্ভাগ্য মিঃ ফগের সঙ্গে সঙ্গেই ছিল। হেন্‌রিয়েটার কলের অধ্যক্ষ আসিয়া সংবাদ দিল,—“কয়লা ফুরাইয়া আসিয়াছে!”

 মিঃ ফগ কহিলেন, “তুমি ঠিক জান?”

 “হাঁ, ঠিক জানি। যেদিন থেকে আমরা জাহাজ ছেড়েছি, সেইদিন থেকেই সমানে আগুন রেখেছি। লিভারপুলে যাবার মত অত কয়লাও জাহাজে ছিল না। আমরা বোর্ভোঁ যাবার মত কয়লা নিয়েছিলাম।” ফগ নিশ্চিন্তভাবে আদেশ দিলেন, “আচ্ছা যাও—যতক্ষণ কয়লা চলে, পূরা দমে চালাও। আমি ভেবে দেখি কি করা যেতে পারে।”

 এঞ্জিনিয়ার প্রস্থান করিল।

 জিয়েন এই আকস্মিক বিপদের সংবাদে একান্ত বিচলিত হইল এবং সহানুভূতি-লাভের প্রত্যাশায় মিঃ ফিক্সের নিকট এ সংবাদ জ্ঞাপন করিল। ফিক্স কহিলেন, “জাহাজ যে লিভারপুল যাচ্ছে এ কথা কি তুমি বিশ্বাস কর?”

 “করি।”

 “তুমি একটা মস্ত বোকা দেখছি!”

 ১৮ই তারিখে এঞ্জিনিয়ার পুনরায় আসিয়া কহিল, “কয়লায় আর চলে না!” মিঃ ফগ তখনো একান্ত অবিচলিত। তিনি জিয়েনকে আদেশ কারলেন, “হেন্‌রিয়েটার বন্দী অধ্যক্ষকে এখানে আন।”

 জিয়েন পোতাধ্যক্ষকে লইয়া আসিল। তিনি ক্ষুধিত ব্যাঘ্রের মত মিঃ ফগের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলেন। যেন একটা ভীষণ বোমা সহসা তথায় পতিত হইল, এখনই ফাটিয়া সর্ব্বনাশ ঘটাইবে!

 নিকটে আসিয়াই অধ্যক্ষ বজ্র-গম্ভীর স্বরে মিঃ ফগকে জিজ্ঞাসা করিলেন—

​ “আমরা এখন কোথায় আছি?”

 “লিভারপুল থেকে ৭৭০ মাইল দুরে।”

 উত্তর শুনিয়াই অধ্যক্ষের আপাদ-মস্তক জ্বলিয়া উঠিল। তিনি গর্জ্জন করিয়া কহিলেন,—

 “তবে রে জলদস্যু!”

 “মশায়, আমি ত আগেই বলেছিলাম লিভারপুল চলুন।”

 অধ্যক্ষ আরো ভীষণ কণ্ঠে কহিল,—

 “দস্যু কোথাকার!”

 মিঃ ফগ শান্তভাবে বলিলেন,—

 “আপনার জাহাজখানা আমার কাছে বিক্রয় করুন।”

 “কখনো না।”

 “যদি বিক্রয় না করেন তা’ হ’লে আমি বাধ্য হয়েই জাহাজখানা পুড়িয়ে ফেলবো!”

 “কি! আমার জাহাজ পোড়াবেন?”

 “পোড়াব বই কি? অন্ততঃ উপরকার যা’ কিছু কাঠের জিনিষ আছে সবই পোড়াতে হবে। জাহাজের কয়লা ফুরিয়েছে! আমার ত যাওয়া চাই!”

 অধ্যক্ষ পরুষকণ্ঠে কহিলেন, “আমার জাহাজ পোড়াবেন! জাহাজের দাম কত জানেন? নগদ একলাখ টাকা!

 “এই নিন, আমি দেড় লাখ দিচ্ছি!” মিঃ ফগ অবিলম্বে কতকগুলি ব্যাঙ্কনোট কুপিত অধ্যক্ষের পকেটের মধ্যে ফেলিয়া দিলেন।

 নগদ দেড় লক্ষ মুদ্রা! অধ্যক্ষের হৃদয়মধ্যে তরঙ্গ উঠিল। রোষ, ক্ষোভ, অসন্তোষ সমস্তই মুহূর্ত্তে ভাসিয়া গেল। তিনি দেখিলেন, হেন্‌রিয়েটার বয়স প্রায় বিংশবর্ষ অতিক্রম করিয়াছে। ইহার পরিবর্ত্তে যদি ​এত অর্থ হস্তগত হয় তবে আর চিন্তা কি। অধ্যক্ষ সম্মত হইলেন কোমল কণ্ঠে কহিলেন,―

 “খোলটা বোধ হয় আমারই থাকবে?”

 “হাঁ। খোল এবং এঞ্জিন আপনার। কেমন রাজি ত?”

 “রাজি।”

 জিয়েন ও ফিক্স গোয়েন্দা অবাক্! কি ভয়ানক কথা! চক্ষের নিমেষে দেড় লক্ষ মুদ্রা উড়িয়া গেল—অথচ জাহাজের খোল এবং কল অধ্যক্ষেরই রহিল! গোয়েন্দার দৃঢ় বিশ্বাস হইল ইংলণ্ডের ব্যাঙ্ক হইতে নিশ্চয়ই সাড়ে আটলক্ষ টাকা চুরি হইয়াছে। মিঃ ফগই সেই দস্যু!

 অধ্যক্ষ নোটগুলি গণনা করিয়া পকেটে রাখিলে পর মিঃ ফগ কহিলেন, “কাপ্তান! আমার কার্য্যে বিস্মিত হবেন না। যদি আমি ২১শে ডিসেম্বর লণ্ডনে পৌঁছিতে না পারি, তা হ’লে তিন লক্ষ মুদ্রার বাজি হারব। আপনি ত জানেন আমি নিউইয়র্কে লিভারপুলের জাহাজ ধরতে পারি নাই। আপনিও প্রথমে আমাকে লিভারপুল নিয়ে যেতে সম্মত হলেন না—”

 বাধা দিয়া কাপ্তান বলিলেন, “আমি ত ভালই করেছিলাম। যদি বাধা না দিতাম তা হ’লে কি আর আজ দেড় লাখ টাকা পাই! তবে কি জানেন কাপ্তান—”

 আমার নাম ফগ। তবে জাহাজখানা এখন আমার?”

 “নিশ্চয়ই আপনার। ওর যত কাঠ-পাট আছে সবই আপনার।”

 “উত্তম। অনুগ্রহ করে কাঠ গুলো সব কাটতে আরম্ভ করুন।”

 জাহাজের শুষ্ক কাষ্ঠগুলি তখন কয়লার পরিবর্ত্তে ব্যবহৃত হইতে লাগিল। সেই দিনই হেন্‌রিয়েটার কামরাগুলি, ডেকের কতকাংশ এবং পশ্চাতের ডেক প্রভৃতি পুড়িয়া ভস্ম হইয়া গেল!

​ পরদিন ১৯শে ডিসেম্বর। সে দিন জাহাজের মাস্তুল এবং দীর্ঘকাঠ গুলি সমস্তই দগ্ধ করা হইল! নাবিকগণ প্রাণপণে জাহাজ চালাইতে লাগিল। জিয়েন বিপুল উৎসাহে একাই দশজনের কাঠ কাটিতে আরম্ভ করিল। মিঃ ফগ আদেশ দিলেন,—

 “চালাও চালাও—জাহাজ চালাও!”

 পরদিন হেন্‌রিয়েটার উপরাংশের যাহা কিছু কাঠ সমস্তই নিঃশেষিত হইল—কেবল খোলটি মাত্র অবশিষ্ট রহিল! আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিভারপুলে যাওয়াই চাই! নারিকগণ যথাশক্তি চেষ্টা করিতে লাগিল।

 দূরে কুইন্‌স্ টাউনের আলোক দেখিয়া কাপ্তেন কহিলেন, “মিঃ ফগ, আমি ত আর কোনো ভরসা দেখি না? এই সবে আমরা কুইন্‌স্‌ টাউন ছাড়ছি। এখনো অনেক দূর যেতে হবে। আপনার গ্রহ অপ্রসন্ন―কি করবো বলুন!”

 মিঃ ফগ বলিলেন, “ওই যে আলোকমালা দেখা যাচ্ছে, ওই কি কুইন্‌স্‌ টাউনের আলোক?”

 “হাঁ।”

 “আমরা কতক্ষণে বন্দরে যেতে পারবো?”

 “তিনটার আগে নয়। জোয়ার চাই।”

 কোনরূপ চাঞ্চল্য প্রকাশ না করিয়া মিঃ ফগ কহিলেন, “তবে এখন অপেক্ষা করা যাক্‌।”