৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/দ্বিতীয় খণ্ড/দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
রাণী আউদা
ণ্ডনে পৌঁছিয়া ফিলিয়াস্ ফগ আপনার গৃহে প্রস্থান করিলেন, ক্লাবে গেলেন না। এই সুদীর্ঘ পর্য্যটন নির্ব্বিঘ্নে সম্পন্ন করিয়া, শতবাধা শতবিঘ্ন অনায়াসে অতিক্রম করিয়া শেষ মুহূর্ত্তে অপরের দোষে পরাজয় যে কি ভীষণ মর্ম্মচ্ছেদী তাহা অন্যে বুঝিতে পারিবে না। কিন্তু মিঃ ফগ ধৈর্য্য অবলম্বন করিলেন। তাঁহার যথাসর্ব্বস্ব তখন বারিংএর গদিতে গচ্ছিত ছিল। সে অর্থ তখন আর তাঁহার নহে, উহা তখন সংস্কার-সমিতির সদস্যদিগের। খরচ-পত্র বাদে তাঁহার হস্তে যাহা কিছু সামান্য অর্থ ছিল, মিঃ ফগ দেখিলেন তাহা লইয়াই কোন প্রকারে জীবন যাপন করিতে হইবে।
তিনি তাঁহার গৃহের একটী কক্ষ রাণী আউদার জন্য ছাড়িয়া দিলেন।
জিয়েন শুনিয়াছিল অনেক সময় এরূপ দুর্দ্দশায় পতিত হইলে নিরাশ মানব আত্মহত্যা করিয়া সকল যন্ত্রণার হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করে। পাছে মিঃ ফগ তেমন একটা কিছু করিয়া বসেন এই জন্য সে সর্ব্বদা সতর্ক থাকিতে লাগিল।
তাহার কক্ষের গ্যাসের আলোক তখনো জ্বলিতেছিল, সে আর কাল বিলম্ব না করিয়া বাতিটা নির্ব্বাপিত করিল।
ক্রমে রাত্রি আসিল। রজনী গভীরা হইল। সকলেই শয়ন করিলেন। মিঃ ফগ নিদ্রা গিয়াছিলেন কি না কেহ বলিতে পারে না। রাণী আউদা সমস্ত রাত্রি ভাবিয়া জাগিয়া কাঁদিয়া কাটাইয়াছিলেন। আর জিয়েন? সে অনুরক্ত ভৃত্যের ন্যায় প্রভুর দ্বারদেশে বিনিদ্র-নয়নে বসিয়া ছিল।
পরদিন প্রভাতে মিঃ ফগ ভৃত্যকে ডাকিয়া কহিলেন; “রাণী আউদার প্রাতরাশের বন্দোবস্ত কর। বলে এসো আজ সন্ধ্যার সময় আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
জিয়েনের হৃদয় তখনো বেদনায় মথিত হইতেছিল। তাহার কর্ত্তব্যবুদ্ধি তাহাকে কেবলই বলিতে লাগিল ‘রে হতভাগ্য! তোর দোষেই ত সোনার সংসার শ্মশান হ’লো! মিঃ ফগকে আগে একটু সতর্ক করলেই ত এমন ঘটিত না।’ জিয়েন আর নীরব থাকিতে পারিল না। বাষ্পনিরুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, “প্রভু, আপনার দুর্দ্দশার জন্য আপনি আমাকে অভিসম্পাত করুন। আমার দোষেই ত—”
গম্ভীর অথচ শান্ত কণ্ঠে মিঃ ফগ উত্তর করিলেন, “আমার দুর্দ্দশার জন্য আমি কাহাকেও দোষী করি না। তুমি আপনার কাজে যাও।”
জিয়েন প্রস্থান করিল এবং রাণী আউদার নিকট যাইয়া সকল কথা নিবেদন করিতে করিতে দুঃখে বালকের মত রোদন করিতে লাগিল। কহিল, “আমি কিছুতেই প্রভুর মন শান্ত করতে পারলেম না। আপনি একটু বুঝিয়ে বল্লে তিনি হয়ত শুনবেন।”
“তুমি বল্লে না, আজ সন্ধ্যার সময় তিনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন বলেছেন?”
“হাঁ তাই ত তিনি বলেছেন। বোধ হয় আপনার ইংলণ্ডে থাকা সম্বন্ধেই কথা হবে।”
“তা হ’তেও পারে।”
জিয়েন কার্য্যান্তরে বিদায় হইল। রাণী আউদা নীরবে অশ্রু বিসর্জ্জন করিতে করিতে নিজের ও মিঃ ফগের বিষয় চিন্তা করিতে লাগিলেন। মিঃ ফগের পরাজয়ের সকল দোষ নিজের উপর আরোপ করিয়া তিনি আরো বেদনা-পীড়িত হইলেন। মনে মনে ভাবিলেন মিঃ ফগের উপর একটা বোঝার মত না থাকিলে, ফগ হয়ত অবলীলাক্রমে বাজি জয় করিতে পারিতেন। তাঁহার জন্যই ত বোম্বাইয়ের পথে দুই দিন বিলম্ব হইয়াছিল!
মিঃ ফগ সেদিন আর সংস্কার-সমিতিতে গেলেন না। কেনই বা যাইবেন? তিনি সমস্ত দিন কক্ষদ্বার রুদ্ধ করিয়া আপনার ভবিষ্যৎ কর্ত্তব্য স্থির করিতেছিলেন। জিয়েন মুহূর্ত্তের জন্যও সে রুদ্ধদ্বার ত্যাগ করিল না। কক্ষমধ্যে সামান্য একটু শব্দ হইবা মাত্রই সে উৎকর্ণ হইয়া শুনিতেছিল—বুঝি বা কোন দুর্ঘটনা ঘটিল। দ্বারসংলগ্ন তালার ছিদ্রপথে সে মধ্যে মধ্যে গৃহের ভিতর দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া মিঃ ফগকে দেখিয়া লইতেছিল।
ক্রমে সন্ধ্যা হইল। সাড়ে সাতটার সময় মিঃ ফগ রাণী আউদার কক্ষমধ্যে আসিয়া প্রজ্বলিত অগ্নির পার্শ্বে একখানি চেয়ারে উপবেশন করিলেন। যে দিন তিনি আপন গৃহদ্বার রুদ্ধ করিয়া, কত আশা কত উৎসাহ হৃদয়ে লইয়া পৃথিবী-পর্য্যটনে বহির্গত হইয়াছিলেন, সে দিনও তিনি যেমন ছিলেন—পর্য্যটনে পরিশ্রান্ত ভগ্নহৃদয় বিনষ্টসর্ব্বস্ব মিঃ ফগ আজিও ঠিক তেমনিই দেখাইতেছিলেন। তেমনি ধীর—তেমনি স্থির—তেমনি শান্ত—শৈলসদৃশ তেমনি অটল!
কিছুক্ষণের জন্য নীরব থাকিয়া তিনি রাণী আউদাকে কহিলেন—“আপনাকে ইংলণ্ডে এনে বড় অপরাধ করেছি। সে জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করছি।”
আউদার হৃদয় অতিমাত্র চঞ্চল হইয়া উঠিল। মিঃ ফগের মুখে―তাঁহার জীবনদাতা রক্ষাকর্ত্তার মুখে―মার্জ্জনা ভিক্ষা? তিনি কোন প্রকারে হৃদয়বেগ রুদ্ধ করিয়া কহিলেন, “কে ক্ষমা ক’রবে? আমাকে বল্ছেন?”
“আমার আর একটু বলতে বাকি আছে—অনুগ্রহ করে’ শুনুন। আমি যখন আপনাকে এখানে আসতে বলি, তখন আমার অর্থের অভাব ছিল না। আমি ভেবেছিলাম সেই অর্থের একাংশ আপনার জন্য ব্যয় করবো। আপনি তা’ হ’লে স্বাধীনভাবে স্বচ্ছন্দে থাকতে পারতেন। আপনি ত জানেন এখন আমার সব গেছে!”
“মিঃ ফগ, আমি সবই জানি। আপনার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভারি বোঝার মত আসাটাই আমার অন্যায় হয়েছে! আমিই সে জন্য আপনার নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করছি। আমিই ত আপনার ক্ষিপ্রগতির অন্যতম বাধা ছিলাম। পথে আপনার কত বিলম্বই না ঘটিয়েছি। তা না হ’লে আজ কি এমন দুর্দ্দশা হয়! আমি তপ্ত অনলে পুড়ে মরছিলেম—সেই ছিল ভাল!”
“আপনার জন্য আমার একদিনও বিলম্ব ঘটে নাই। সে জন্য আপনি দুঃখিত হবেন না। আপনি ভারতবর্ষে নির্ব্বিঘ্নে থাকতে পারতেন না। একবার যারা আপনাকে জীবন্তে বন্ধ করতে চেয়েছিল, তারাই আবার আপনাকে খুঁজে বাহির করতো!”
“আপনি পরম দয়ালু, তাই সেই বিপদ্ থেকে আমাকে উদ্ধার ত করেইছিলেন, অপরিচিত দেশে এসে আমি যাতে স্বাধীনভাবে সুখে দিন কাটাতে পারি, তারও আবার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন?”
“চেয়েছিলাম সত্য, কিন্তু আমার অদৃষ্ট সব ওলট-পালট করে’ দিলে! যা হোক্ আমার যা কিছু এখনো আছে তাই আমি আপনার হাতে দিতে চাই।”
“তা হলে আপনার কি করে’ চলবে?”
“আমার জন্য ভাববেন না। আমার অভাব কিসের?”
“আপনি বোধ হয় আপনার ভবিষ্যতের দিকে তেমন করে তাকাচ্ছেন না?”
“আমি সকল অবস্থাকেই যে চক্ষে দেখতে অভ্যস্ত, আমার ভবিষ্যৎকেও সেই চক্ষেই দেখছি।”
আপনার কোন অসুবিধা বা অভাব হয়, আপনার বন্ধু-বান্ধবেরা তেমন কিছু আপনাকে করতে দিবেন কেন?”
“আমার কোন বন্ধু-বান্ধব নাই।”
“না থাকতে পারে। আত্মীয়-স্বজন?”
“এখন আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজনও নাই।”
“মিঃ ফগ, আপনার জন্য আমার বড় দুঃখ হচ্ছে। জীবনে একা―এ বড় কষ্টের কথা! দুঃখের অশ্রুটী মুছিয়ে দিতে পারে এমন কি আপনার কেউ নাই?”
“না।”
“লোকে কথায় বলে, দুঃখের বোঝা নেবার যদি অংশীদার থাকে তা হ’লে, সে বোঝা যতই কেন ভার হোক্ না, অনায়াসে ঘাড়ে নিতে পারা যায়।”
“আমিও সে কথা শুনেছি।”
রাণী আউদা সহসা আসন ত্যাগ করিয়া উঠিলেন এবং আপন দক্ষিণ কর বাড়াইয়া দিয়া বলিলেন, “মিঃ ফগ, একাধারে আত্মীয়া এবং বন্ধু পেতে কি আপনার সাধ হয়? আপনি কি আমায় স্ত্রী বলে গ্রহণ করবেন?”
মিঃ ফগও আসন ত্যাগ করিয়া উঠিয়াছিলেন। তাঁহার ওষ্ঠদ্বয় ঘন ঘন কম্পিত হইতে লাগিল— নয়নদ্বয় অসাধারণ ঔজ্জ্বল্য লাভ করিল। আউদা তাঁহার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন। সে দৃষ্টির ভিতর দিয়া রমণীর প্রেম, বাঞ্ছিতের জন্য সর্ব্বস্ব দানের সুদৃঢ় পণ যেন ফুটিয়া বাহির হইতেছিল। সে দৃষ্টি কত কোমল কত সুন্দর কত সরল।
মিঃ ফগ আর আউদার দিকে চাহিতে পারিলেন না। তাঁহার, নয়নদ্বয় মুদ্রিত হইয়া আসিল। তাঁহার কণ্ঠ বাক্য বিস্মৃত হইল। কিছুক্ষণ পরে ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে কহিলেন, “রাণী আউদা, ধর্ম্ম সাক্ষী করে বলতে পারি, আমি আপনাকে প্রাণাপেক্ষা অধিক ভালবাসি। জীবনে মরণে আমি আপনার।”
* * * *
মিঃ ফগ ডাকিলেন, “জিয়েন!”
জিয়েন কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিয়াই সমস্ত বুঝিতে পারিল। তখনো মিঃ ফগ আবেগপূর্ণ হৃদয়ে আপন করমধ্যে রাণী আউদার সুকোমল কর রক্ষা করিতেছিলেন। ফিলিয়াস্ ফগ ডাকিলেন, “জিয়েন!”
“আজ্ঞা।”
“মেরিলি বোন গির্জ্জার পুরোহিতকে এখনই বিবাহের সংবাদটা দিতে হবে। এখনো বেশী রাত হয় নি।”
হৃষ্টচিত্তে জিয়েন কহিল, “এ সংবাদের কি আর সময় অসময় আছে! এই ত সবে ৮টা বেজে পাঁচ মিনিট। কাল সোমবার। কালই কি বিবাহ হবে?”
মিঃ ফগ আউদার দিকে চাহিলেন।
ব্রীড়া-বিনম্র ভাবে রাণী উত্তয় দিলেন, “তাই হোক্।”
জিয়েন মুক্ত মৃগের ন্যায় ক্ষিপ্রচরণে পুরোহিতের নিকট গমন করিল।