৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/দ্বিতীয় খণ্ড/সপ্তম পরিচ্ছেদ
সপ্তম পরিচ্ছেদ
কর্ত্তব্য-পালন
রোহীদিগের মধ্যে অনেকেই আহত হইয়াছিল। কিন্তু কাহারো আঘাত তত সাংঘাতিক ছিল না। মৃতের সংখ্যাও যে খুব অধিক ছিল তাহা নহে। কর্ণেল প্রক্টর একটু বেশী আঘাত পাইয়াছিলেন। অন্যান্য আহত যাত্রীদিগের সহিত কর্ণেলকেও শুশ্রূষার জন্য ষ্টেশনে লইয়া যাওয়া হইল।
রাণী আউদা এবং ফিলিয়াস্ ফগ একেবারেই আহত হইয়াছিলেন না। ফিক্স গোয়েন্দার হস্তের মাংস খানিকটা কাটিয়া গিয়াছিল মাত্র। কিন্তু জিয়েনকে পাওয়াই গেল না! রাণী আউদা তাহার জন্য রোদন করিতে লাগিলেন। মিঃ ফগ যেমন প্রস্তরগঠিতবৎ দণ্ডায়মান ছিলেন সেইরূপই রহিলেন। তাঁহার চক্ষে পলক পর্য্যন্ত পড়িতেছিল না।
তখনো দূরে দুই একজন পলায়মান সিয়োক্স দস্যু দেখা যাইতেছিল। তুষারস্পর্শে শুভ্র রেলপথের উভয় পার্শ্ব রক্তরঞ্জিত হইয়া সেই লোমহর্ষণ হত্যা কাহিনীর কথা স্মরণ করাইয়া দিতেছিল—গাড়ীর চাকাগুলির সঙ্গে তখনো খণ্ড খণ্ড নিষ্পিষ্ট নরমাংস ঝুলিতেছিল!
রাণী আউদা কাতর দৃষ্টিতে ফগের দিকে চাহিলেন। সে দৃষ্টিত্ব অর্থ বুঝিতে ফগের মুহূর্ত্ত মাত্র বিলম্ব হইল না। তিনিও এতক্ষণ নিজ কর্ত্তব্যপথ স্থির করিতেছিলেন। রাণী আউদার দিকে চাহিয়া কহিলেন, “জীবিত হোক বা মৃত হোক আমি জিয়েনকে খুঁজিয়া বাহির করিবই করিব।”
রাণী আউদার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ হইয়া গেল। তিনি আবেগভরে মিঃ ফগের করমর্দ্দন করিলেন। তাঁহার বিন্দু বিন্দু নয়নবারি সুগোল মুক্তার ন্যায় মিঃ ফগের হস্তের উপর পতিত হইতে লাগিল।
ফিলিয়াস্ ফগ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিলেন, যে প্রকারেই হউক ভৃত্যের সন্ধান না করিয়া যাইবেন না। তাহাতে যদি সর্ব্বস্বও যায়, তিনি তাহাও স্বীকার করিবেন। তিনি বেশ জানিতেন যে একদিন মাত্র বিলম্ব ঘটিলেই আর নিউইয়র্কে যাইয়া জাহাজ পাইবেন না। নিউইয়র্কে জাহাজ ধরিতে না পারিলে বাজীতে তাহার পরাজয় সুনিশ্চিত। কিন্তু তিনি কখনো কর্ত্তব্যপালনে পরাঙ্মুখ ছিলেন না। ভৃত্যের অনুসন্ধান, তিনি বর্ত্তমান অবস্থায় তাঁহার প্রধান কর্ত্তব্য বলিয়া মনে করিলেন।
ফোর্টকিয়ার্ণি একটী ক্ষুদ্র দুর্গ। দুর্গের সৈন্যগণ বন্দুকের শব্দ ও কোলাহল শুনিয়া ইতিপূর্ব্বেই ষ্টেশনে আসিয়াছিল। তাহাদিগের অধিনায়ককে সম্বোধন করিয়া মিঃ ফগ বলিলেন, “মহাশয় তিন জন যাত্রীর কোন সন্ধানই নাই!”
“তারা মরে গেছে না কি?”
“মরুক আর দস্যুর হস্তে বন্দীই হোক তাদের সন্ধান করতেই হবে। আপনি কি সৈন্য নিয়ে দস্যুদের অনুসরণ করতে চান?”
সেনাপতি কহিলেন, “সে বড় বিষম কথা! তারা যে পালাতে পালাতে কোথায় যাবে তার ঠিকানা কি? আমি কি আর দুর্গটী অরক্ষিত অবস্থায় রেখে যেতে পারি। কে জানে যে সুবিধা পেলে’ দস্যুরা এসে দুর্গই আক্রমণ করবে না!”
মিঃ ফগ বলিলেন, “কিন্তু ম’শায় তিনটী লোকের যে প্রাণ যায়!”
“তা ঠিক। কিন্তু তিন জনের জন্য কি আমি ৫০ জনের জীবন বিপদাপন্ন করিতে পারি! দস্যুর আক্রমণে অনেকেরই ত প্রাণ গিয়েছে। তার উপায় কি বলুন!”
“৫০ জনের জীবন বিপদাপন্ন করতে পারেন কি না তা জানি না, কিন্তু আমার বোধ হয়, আপনার করাই উচিত।”
কাপ্তান তীব্রস্বরে কহিলেন, “আমায় আমার কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্য বুঝিয়ে দিতে পারে এমন লোক ত আমি এখানে দেখি না!”
অনুত্তেজিত কণ্ঠে ফগ কহিলেন, “আচ্ছা বেশ। আমি তা হ’লে একাই যাব!”
মিঃ ফিক্সের নিকট ফগের একা যাওয়ার প্রস্তাবটী ভালো লাগিল না। এতদূর অনুসরণ করিয়া কি তিনি শেষে দস্যুকে হারাইবেন! তিনি কহিলেন,—
“আপনি একাই দস্যুদের অনুসরণ কর্তে চান? না—না―তা হবে না।”
আপনি কি বলতে চান, যার জন্য আমরা আজ প্রাণ পেয়েছি, সেই অনুগত অকুতোভয় জিয়েনকে শত্রুকবলে ফেলেই আমি চলে যাব? তা’ কখনো হবে না। আমি নিশ্চয়ই তার খোঁজ কর্তে যাব।”
মিঃ ফগের কথা সেনাপতির হৃদয় স্পর্শ করিল। তিনি বলিলেন, “আপনাকে আর একা যেতে হবে না। আপনি দেখছি বীরপুরুষ।”
তিনি তখন সৈন্যদিগকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, “আমি ৩০ জন লোক চাই। কে কে যাবে এস।”
তাহারা সকলেই বীর—সকলেই নিকটে দণ্ডায়মান থাকিয়া সেনাপতির সহিত মিঃ ফগের কথা শুনিতেছিল। আসন্ন যুদ্ধের সম্ভাবনায় এবং একজন বীরের জীবনরক্ষা করিবার বীরোচিত আগ্রহে তাহাদিগের হৃদয় জ্বলিতেছিল। আহ্বান মাত্রেই তাহারা সকলেই অগ্রসর হইল। সেনাপতি তন্মধ্যে ৩০ জনকে যাত্রার জন্য আদেশ করিলেন। একজন স্থির ধীর বৃদ্ধ কর্ম্মচারী তাহাদিগের নায়ক-পদে বৃত হইলেন।
মিঃ ফগ কৃতজ্ঞ হৃদয়ে বলিলেন, “সেনাপতি মশায়, আপনাকে ধন্যবাদ।”
গোয়েন্দা ফিক্স অগ্রসর হইয়া কহিলেন, “আমাকে কি সঙ্গে নেবেন না?”
“আপনার যা ইচ্ছা করতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি রাণী আউদার রক্ষার ভার নিতেন, তা’হ’লেই আমার বেশী উপকার হ’ত। কি জানি, যদি আমার কোনো বিপদই ঘটে—”
গোয়েন্দার মুখ বিবর্ণ হইয়া উঠিল। এত শ্রমে এত বিপদের ভিতর দিয়া তিনি এতদিন যাহার অনুসরণ করিতেছেন, আজ কি না তাহাকে একা ছাড়িয়া দিতে হইতেছে—নয়নের অন্তরাল করিতে হইতেছে! গোয়েন্দা তীব্র দৃষ্টিতে মিঃ ফগের দিকে চাহিলেন। দেখিলেন সে বদনে কুটিলতার চিহ্নমাত্রও নাই। মিঃ ফগের নিতান্ত সরল দৃষ্টির নিকটে পরাজয় মানিয়া ফিক্স গেয়েন্দা রাণী আউদার রক্ষাভার গ্রহণ করিলেন।
ফিলিয়াস্ ফগ তাঁহার অর্থপূর্ণ ব্যাগটী রাণী অউদার হস্তে সমর্পণ করিয়া অগ্রসর হইলেন এবং যাত্রাকালে সৈন্যদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন,—
“বন্ধুগণ! যদি আমরা বন্দীদের উদ্ধার করতে পারি, তাহ’লে আমি আপনাদের ১৫০০০৲ হাজার টাকা পুরস্কার দিতে অঙ্গীকার করছি!”
যতক্ষণ দেখা গেল রাণী আউদা সেই ক্ষুদ্র বীরদলকে দেখিতে লাগিলেন। তাহারা নয়নপথ হইতে অন্তর্হিত হইলে পর তিনি বিশ্রামকক্ষে প্রবেশপূর্ব্বক হতাশ হৃদয়ে উপবেশন করিলেন এবং মিঃ ফগের সাহস, মহত্ত্ব, দয়া প্রভৃতির কথা চিন্তা করিতে লাগিলেন। মিঃ ফগ তাঁহার নিকট দেবতার পূজা পাইলেন।
গোয়েন্দা ফিক্স তখন বাহিরে একখানি আসনে বসিয়া ভাবিতেছিলেন, ‘আমি কি গাধা! আমার পকেটে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাখানা থাকতে আমি দস্যুটাকে ছেড়ে দিলাম! আর কি সে ফিরে আসবে? বোধ হয় না। সে আমাকে নিশ্চয়ই ফাঁকি দিয়েছে।’
তিনি কখনো ভাবিতে লাগিলেন, ‘যাই, আমিও তার অনুসরণ করি। বরফের উপর পদচিহ্ন দেখেই পথ চিনে নিতে পারবো। কিন্তু যেতে যেতেই ত আরো বরফ পড়বে। পদচিহ্ন ত তা’হ’লে আর থাকবে না!’ গোয়েন্দা তাই অবশেষে সে সঙ্কল্প ত্যাগ করিয়া বৃশ্চিকদষ্টবৎ ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।
দেখিতে দেখিতে বেলা ৩ টা বাজিল। চারিদিক্ তখন তুষারসমাচ্ছন্ন হইয়াছিল। প্রবল বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে তুষার তূলার ন্যায় উড়িয়া ষাইতেছিল। অকস্মাৎ ট্রেণের বংশীধ্বনি শ্রুত হইল! সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল একটা অস্পষ্ট ছায়া যেন অগ্রসর হইতেছে। ছায়া ক্রমে কায়া লাভ করিল এবং অবশেষে ট্রেণের এঞ্জিনে পরিণত হইল।
জিয়েন যে এঞ্জিন ট্রেণ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছিল তাহা অনেক দূর পর্য্যন্ত দ্রুতবেগে গমন করিলে পর যখন বাষ্প ফুরাইয়া আসিল, কয়লার অভাবে অগ্নির উত্তাপ হ্রাস প্রাপ্ত হইল, তখন ধীরে ধীরে থামিয়া গেল। আহত ড্রাইভারের ইতিমধ্যে জ্ঞানসঞ্চার হইয়াছিল। সে তখন সকল অবস্থা বুঝিতে পারিল। বিপদ্ তুচ্ছজ্ঞান করিয়া সে পুনরায় অগ্নি প্রজ্বালিত করিল এবং বিচ্ছিন্ন ট্রেণখানির সন্ধানলাভের আশায় পুনরায় বিপরীত দিকে আসিতে লাগিল। এত অধিক তুষারপাত হইতেছিল যে, সামান্য কয়েক হস্ত মাত্র দূরেই আর কিছু দেখা যাইতেছিল না। ফোর্ট কিয়ার্ণি ষ্টেশন অতিক্রম করিয়া চলিয়া না যায় ড্রাইভার এইজন্য ঘন ঘন বংশীধ্বনি করিতেছিল।
এঞ্জিন আসিতে দেখিয়া যাত্রীরা পুলকিত হইল। যখন বিযুক্ত ট্রেণ পুনরায় এঞ্জিনের সহিত সংযুক্ত হইল, তখন আউদা গার্ডকে বলিলেন;—
“গাড়ী কখন্ ছাড়বে?”
“এখনই।”
“কিন্তু বন্দীরা—আমার হতভাগ্য সঙ্গীরা—”
“তা বলে ত আমি বসে’ থাকতে পারি না। আমি ৩ ঘণ্টা পিছিয়ে পড়েছি।”
“সান্ফ্রান্সিস্কো থেকে আবার কখন্ গাড়ী আস্বে?”
“কাল সন্ধ্যার সময়।”
“তা হলে ত বড় দেরি হবে দেখছি আপনি কি থাকতে পারবেন না?”
“অসম্ভব! যদি যেতে হয় তবে আসুন, আর বিলম্ব করবেন না।”
“আমি যাব না!”
আহত আরোহিগণ সকলেই গাড়ীতে উঠিয়া বসিল। ট্রেন ছাড়িয়া গেল।
ইতিপূর্ব্বেই যখন ট্রেণ পাইবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না, মিঃ ফিক্স তখন দস্যুকে ধরিবার সকল আশা ত্যাগ করিয়া ট্রেণ পাইলেই চলিয়া যাইবেন স্থির করিয়াছিলেন। কিন্তু সত্য সত্যই যখন যাইবার সুযোগ ঘটিল তখন আর তিনি গেলেন না। ভাবিলেন, দেখা যাক্, আবার ত ট্রেণ পাওয়া যাইবে।
যেমন তুষারপাত হইতেছিল, তেমনি হইতে লাগিল। যেমন দারুণ শীতল বাতাস বহিতেছিল, তেমনি বহিতে লাগিল। সন্ধ্যা হইল; সন্ধ্যাসমাগমে সেই ভীষণ নীরবতা আরো অধিক ভীষণ হইয়া উঠিল! রাণী আউদা কত রকম আশঙ্কা করিতে লাগিলেন। তিনি মধ্যে মধ্যেই বিশ্রামকক্ষের বাহিরে আসিয়া প্ল্যাটফরমের প্রান্তসীমা পর্য্যন্ত অগ্রসর হইয়া সঙ্গীদিগের জন্য ব্যাকুল আগ্রহে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। সেই জনহীন প্রান্তর নীরব—অবিরাম তুষারপাতের জন্য দৃষ্টিও অধিক দূর চলিতেছিল না। এইরূপে ঘর এবং বাহির করিতে করিতেই রাণী আউদার রজনী প্রভাত হইয়া গেল। প্রভাতে আকাশের অবস্থা কথঞ্চিৎ পরিবর্ত্তিত হইল বটে, কিন্তু মিঃ ফগের কোন সংবাদ পাওয়া গেল না। রাণী আউদা এবং মিঃ ফিক্স উভয়েই অত্যন্ত ব্যস্ত হইলেন। সৈনিকদিগের জন্য সেনাপতি ক্রমশঃই চিন্তিত হইতে লাগিলেন। ভাবিলেন, তাহার ত গিয়াছেই—তাহাদের রক্ষার জন্য আর সৈন্য প্রেরণ করা বাতুলতা মাত্র!
ক্রমে বেলা অধিক হইতে লাগিল। সেনাপতির চিন্তাও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। অবশেষে তিনি দুর্গের অবশিষ্ট সৈন্য পাঠাইয়া দিতেই সঙ্কল্প করিলেন। সৈনগণ প্রস্তুত হইল।
সহসা দূরে বন্দুকের শব্দ পাওয়া গেল। সৈন্যগণ হর্ষোৎফুল্ল হইয়া বন্ধুদিগের সহিত মিলিত হইবার জন্য ক্ষিপ্র পদে অগ্রসর হইল।
অল্পক্ষণ মধ্যেই মিঃ ফগ, জিয়েন এবং অন্যান্য সকলে ষ্টেশনে আসিয়া উপনীত হইলেন।
কিয়ার্ণি ষ্টেশন হইতে ১০ মাইল দূরে দস্যুদিগের সহিত তাঁহাদিগের সাক্ষাৎ হইয়াছিল। তাঁহারা দূর হইতে দেখিলেন, জিয়েন ও অপর দুইজন বন্দী বিপুল বিক্রমে দস্যুদিগের উপর নিপতিত হইয়াছে এবং জিয়েনের সুপরিচালিত অব্যর্থ সবল মুষ্ট্যাঘাতে তিনজন দস্যু আহত হইয়া ধরা-শয্যা গ্রহণ করিয়াছে! এমন সময় মিঃ ফগ সসৈন্যে তথায় উপস্থিত হইয়া বন্দীদিগকে উদ্ধার করিলেন।
জিয়েন ষ্টেশনে আসিয়াই মিঃ ফিক্সকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ট্রেণ কোথায়?” তাহার ভরসা ছিল তাঁহাদিগকে এইরূপ বিপদের মধ্যে রাখিয়া ট্রেণ কখনই ছাড়া হইবে না।
মি: ফিক্স বিষণ্ণভাবে কহিলেন, “ট্রেণ নাই—চলে গেছে।”
মিঃ ফগ নিতান্ত শান্ত চিত্তে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আবার কখন গাড়ী পাওয়া যাবে?”
“সন্ধ্যার পূর্ব্বে আর নয়।”
ফিলিয়াস্ ফগ উত্তর শুনিয়া কেবল কহিলেন, “তাই ত!”