বিষয়বস্তুতে চলুন

৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/প্রথম খণ্ড/অষ্টম পরিচ্ছেদ

​

অষ্টম পরিচ্ছেদ

মঙ্গোলিয়া অর্ণবপোত

য়েজ হইতে এদেন বন্দর ঠিক ৩১০ মাইল। সাধারণ জাহাজ ১৩৮ ঘণ্টাতেই এই পথ অতিক্রম করিতে পারে। কিন্তু মঙ্গোলিয়া যেরূপ বেগে অগ্রসর হইতেছিল তাহাতে সকলেই বুঝিয়াছিল যে নির্দ্দিষ্ট দিনের অনেক পূর্ব্বেই জাহাজ গন্তব্য স্থানে পৌঁছিবে।

 ব্রিন্দিসি হইতে যে সকল আরোহী জাহাজে উঠিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই ভারতবর্ষে আসিতেছিলেন। কেহ বা কলিকাতায় যাইবেন, কেহ বা বোম্বাই থাকিবেন। ভারতবর্ষের পেনিন্‌সুলার রেল পথ খোলা হইয়াছিল বলিয়া তখন আর লঙ্কা ঘুরিয়া কলিকাতায় যাইতে হইত না। যাত্রীদিগের মধ্যে সামরিক ও অন্যান্য বিভাগের উচ্চপদস্থ অনেক রাজকর্ম্মচারী ছিলেন। জাহাজে বন্দোবস্তের কোনো ত্রুটি ছিল না। প্রভাতে প্রাতরাশ, অপরাহ্ন দুইটায় জলযোগ, সাড়ে পাঁচটায় সান্ধ্যভোজ, ৮টায় নৈশ আহার। নানাবিধ সুন্দর সুন্দর ভোজ্য ও পেয় মঙ্গোলিয়ার ভোজনাগারে খানার টেবিলে শোভা পাইত। রমণীগণ দিবসে দুইবার করিয়া বেশ পরিবর্ত্তন করিতেন। নৃত্য ও গীতে মঙ্গোলিয়া জাহাজ মুখরিত হইয়া উঠিত।

 লোহিত সাগর বড় চঞ্চল ও প্রারই তরঙ্গসমাকুল। যখনই প্রবহমান বেগশালী বায়ু আসিয়া জাহাজকে স্পর্শ করিত তখনই মঙ্গোলিয়া কাঁপিত, ​দুলিত, তরঙ্গে তরঙ্গে নৃত্য করিত। কাহার সাধ্য দাঁড়াইয়া থাকে! পিয়ানোর কোমল মধুর স্বর-লহরী তখন নীরব হইত, রমণীর লীলাচঞ্চল চরণ সংঘাতে তখন আর নৃত্যশালা কম্পিত হইত না। কিন্তু মঙ্গোলিয়া পোত সেই তুফান ঠেলিয়া তরঙ্গ ভাঙ্গিয়া নক্ষত্রবেগে ছুটিতেছিল।

 সম্মুখে তরঙ্গভঙ্গময় অনন্ত সমুদ্র, নৃত্যশীল তরঙ্গের শিরে নৃত্যশীল অর্ণবপোত। চারিদিকে জলোচ্ছ্বাস—অবিরাম বিকট জলভঙ্গরব, মধ্যে মধ্যে বেগশালী পবনের ভীষণ হাহাধ্বনি―ফিলিয়াস্ ফগ কি এই সকল দেখিয়া হতাশ হইতেছিলেন? তাঁহার চরিত্র সেরূপ ছিল না। যদি বা কখনো মুহূর্ত্তের জন্য এ সকল চিন্তা তাঁহার হৃদয়ে আসিত, কিন্তু বাহিরে উহা প্রকাশিত হইত না। কিছুই তাঁহাকে বিচলিত করিতে পারিত না।

 তিনি কদাচিৎ জাহাজের ডেকের উপর আসিতেন, কদাচিৎ উচ্ছৃঙ্খল অথচ সুন্দর লোহিত সাগরের দিকে চাহিয়া দেখিতেন; মানব ইতিহাসের কোন্ পৃষ্ঠা এই সাগরের কাহিনীর সহিত বিজড়িত থাকিয়া গৌরবময় হইয়াছিল কদাচিৎ সে চিন্তা তাঁহার হৃদয়ে স্থান পাইত। কোন্ অতীত যুগের কোন্ বিরাট ঘটনা, যাহা পৃথিবীর ইতিহাসের কায়া পরিবর্ত্তিত করিয়াছিল, যাহা লোহিত সাগরকে চিরস্মরণীয় ও চিররমণীয় করিয়া রাখিয়াছে, তাহা কদাচিৎ তাঁহার চিন্তার বিষয়ীভূত হইত।

 দূরে নীলাকাশের গাত্রে যে সকল নগর আলেখ্যবৎ প্রতিভাত হইত, কদাচিৎ তিনি সে দিকে চাহিয়া দেখিতেন। ষ্ট্রাবো, এরিয়ান, আর্টিমিডরাস, প্রভৃতি প্রাচীন পর্য্যটকগণ যে ভীষণ আরব্য সাগরের ভীষণ বর্ণনা করিয়া যাত্রীদিগের ভীতি ও চিন্তার কারণ ঘটাইয়া গিয়াছেন, যে আরব্য সাগর অতিক্রম করিবার পূর্ব্বে এককালে শঙ্কিত নাবিকগণ সমুদ্র-দেবতার ​পূজা না করিয়া কখনো জাহাজ ছাড়িত না—ফিলিয়াস্ ফগ সে বিষয়েও নিতান্ত নিশ্চিন্ত ছিলেন। এমন কি মঙ্গোলিয়া পোত পূর্ব্ববৎ দ্রুতবেগে যাইতেছে কি তুফানে শ্লথগতি হইয়াছে সে চিন্তাও তাঁহার হৃদয়ে স্থান পাইত না।

 ফিলিয়াস্ ফগ কি তবে তাঁহার কক্ষমধ্যে বদ্ধ থাকিয়া কার্য্যহীন সময় নিদ্রায় অতিবাহিত করিতেন? তাহা নহে। জাহাজেই তাঁহার তিন জন সঙ্গী জুটিয়াছিল। তাঁহারাও ফিলিয়াসেরই ন্যায় তাসক্রীড়ায় মত্ত ছিলেন। মঙ্গোলিয়া কম্পিতই হউক আর তরঙ্গের শিরে নৃত্যই করুক; ফিলিয়াসের তাহাতে কিছু আসিয়া যাইত না। তিনি নিরূপিত সময়ে ভোজন করিতেন এবং সঙ্গিত্রয়ের সঙ্গে হুইষ্ট খেলিতেন। তাঁহার সময় কাটিতে সময় লাগিত না।

 জিয়েনও বেশ স্বচ্ছন্দ চিত্তেই সময় অতিবাহিত করিতেছিল। চতুর্দ্দিকের নানা দৃশ্যাবলী, উচ্ছ্বসিত সাগরের উদ্দাম লীলা-ভঙ্গ এবং জাহাজের সুস্বাদু ভোজ্য ও পেয়ঃ প্রভৃতি তাহাকে সর্ব্বদা পরিতৃপ্ত রাখিত। তাহার মনে মনে বিশ্বাস হইয়াছিল বোম্বাই গেলেই তাহাদিগের ভ্রমণব্যাপার পরিসমাপ্ত হইবে, নতুবা এ অস্বাভাবিক পর্য্যটন আর কতদিন চলিতে পারে!

 জাহাজের ডেকে পাদচারণ করিতে করিতে জিয়েন দেখিল তাহার সুয়েজের সেই সজ্জন বান্ধবটীও একজন সহযাত্রী। তাঁহাকে দেখিয়াই সে কহিল—

 “আমি ত আপনাকে সুয়েজে দেখেছি না? সেখানে আপনি অনুগ্রহ করে আমার জন্য কত শ্রম করেছিলেন।”

 “ও তাই ত! তুমিই ত সেই! সেই মাথা-পাগলা ইংরেজ ভদ্রলোকের ফরাসী ভৃত্য—কেমন না?”

​ “হাঁ। আপনি ঠিকই ধরেছেন মিষ্টার—”

 গোয়েন্দা কহিলেন, “আমার নাম ফিক্স।”

 “মিঃ ফিক্স, জাহাজে আপনাকে দেখে বড় সন্তুষ্ট হলেম। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”

 “তোমাদেরই মত বোম্বাই নগরে।”

 “বেশ বেশ ভালই হ’ল। আপনি কি আর কখনো বোম্বাই গিয়েছিলেন?”

 “আমি প্রায়ই যাই। পি এণ্ড ও কোম্পানীর আমি একজন এজেণ্ট।”

 “ও তা’ হলে দেখছি আপনি নিশ্চয়ই ভারতবর্ষ বেশ চিনেন!”

 আত্মগোপন করিয়া গোয়েন্দা কহিলেন, “হাঁ কতকটা জানি বৈ কি?”

 পৃথিবীর মধ্যে ভারতবর্ষ একটা আশ্চর্য্য দেশ। কেমন নহে কি?”

 “খুব আশ্চর্য্য দেশ। সেখানে কত মস্‌জেদ, কত মিনার, কত মন্দির আছে। কত বাঘ, কত সাপ, কত ফকির, আর কত নর্ত্তকী সেখানে দেখতে পাওয়া যায়।”

 “বটে! বটে!”

 “তোমরা বোধ হয় ঘুরে ফিরে দেশটা একবার দেখেই যাবে?”

 “আমার ত তাই ইচ্ছা। ৮০ দিনে পৃথিবী পরিভ্রমণ করার দোহাই দিয়ে সমস্ত জীবনটা কি এই রকম করে জাহাজ থেকে রেল-গাড়ীতে আর রেলগাড়ী থেকে জাহাজে লাফিয়ে লাফিয়ে কাটানো যায়! এ সব কুস্তি আর বেশী দিন চল্‌বে ব’লে বোধ হয় না। ভরসা হয় বোম্বাই গেলেই সব থেমে যাবে।”

 “মিঃ ফগ ভাল আছেন ত?”

 “ধন্যবাদ। তিনি বেশ সুস্থ আছেন। আমিও ভালই আছি। ​আমি ঠিক রাক্ষসের মত খাচ্ছি। সমুদ্রের হাওয়ায় বোধ হয় ক্ষুধা বাড়ায়।”

 “কৈ তোমার মনিব ত কখনো ‘ডেকে’ আসেন না!”

 “না। তাঁর কোন বিষয়েই কৌতূহল নাই।”

 “মিষ্টার জিয়েন, আমার বোধ হয় এই ৮০ দিনে পৃথিবী-পরিভ্রমণের ব্যাপারটা একটা ভাণ মাত্র। এর অন্তরালে বিশেষ কোনো একটা গুরুতর বিষয় লুকানো আছে। হয়ত কোনো রাজনৈতিক ব্যাপারও হ’তে পারে। কি বল?”

 “শপথ ক’রে বল্‌তে পারি, আমি এ সব কথার কিছুই জানি না। জানার জন্য আমার কোন আগ্রহও নাই।”

 সে দিনের মত কথাবার্ত্তা এইখানেই সমাপ্ত হইল। কিন্তু পরে সুযোগ পাইলেই ফিক্স গোয়েন্দা এই ফরাসী ভৃত্যের নিকট হইতে সংবাদ সংগ্রহ করিতে চেষ্টা করিতেন। সে জন্য তিনি মধ্যে মধ্যেই জিয়েনকে দুই এক গ্লাস মদ্যপান করিবার নিমিত্ত নিমন্ত্রণ করিতেন। জিয়েন ভাবিত, বাঃ, লোকটা কি অমায়িক—এমন ভদ্রলোক দেখা যায় না।

 জাহাজ যেন চলিতেছিল চলিতেই লাগিল। ওই অদূরে ভগ্ন জীর্ণ প্রাচীরবেষ্টিত মোসা নগর। প্রাচীরের উপর দিয়া কতকগুলি খর্জ্জুর বৃক্ষ শির উত্তোলন করিয়া সমুদ্র দর্শনে আত্মহারা। দূরে অতি বিস্তীর্ণ কফির ক্ষেত্র। মোসার দিকে চাহিলে মনে হয় যেন ইহার আকৃতি একটা প্রকাণ্ড চা’র পেয়ালা ও রেকাবের মত।

 দ্রুতগামী মঙ্গোলিয়া মোসা ছাড়িল, বেবেলমণ্ডেব ছাড়িল, এদেন বন্দরের উত্তরে অবস্থিত ষ্টীমার পইণ্ট ছাড়িল। তখনো বোম্বাই ১৬৫০ মাইল। ১৫ই তারিখে এদেন বন্দরে না আসিয়া মঙ্গোলিয়া ১৪ই ​সন্ধ্যাকালেই তথায় পৌছিয়াছিল। ফিলিয়াস্ ফগ মোটের উপর ১৫ ঘণ্টা সময় হাতে পাইলেন।

 ষ্টিমার পইণ্টে অবতরণ করিয়া ফিলিয়াস্ ফগ ছাড়পত্র স্বাক্ষর করাইয়া আনিলেন। গোয়েন্দা ফিক্স অলক্ষিতভাবে তাঁহার পশ্চাদনুসরণ করিতে ছাড়িল না।

 সন্ধ্যা ছয়টার সময় জাহাজের নোঙ্গর উঠিল। মঙ্গোলিয়া বিপুল ভারত মহাসাগরে ভাসিতে ভাসিতে বোম্বাই অভিমুখে যাত্রা করিল। তখনো বোম্বাই বন্দর ১৬৮ ঘণ্টার পথ ছিল।

 আকাশ নির্ম্মল ও উজ্জ্বল। ধীরে বায়ু বহিতেছিল। মঙ্গোলিয়ার কাপ্তান সুযোগ বুবিয়া পাল তুলিয়া দিলেন। কলে ও পালে জাহাজের বেগ বর্দ্ধিত হইয়া উঠিল। জাহাজের কম্পন থামিল। রমণীগণ পুনরায় বেশভূষা করিয়া নৃত্যগীতে মন দিলেন। মরালের মত জল কাটিরা মঙ্গোলিয়া অগ্রসর হইল।