বিষয়বস্তুতে চলুন

৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/প্রথম খণ্ড/দশম পরিচ্ছেদ

​

দশম পরিচ্ছেদ

বিপদে কিউনি

গাড়ীতে ফিলিয়াস্ ফগ তাঁহার ভৃত্যকে লইয়া উঠিয়াছিলেন, সেই গাড়ীতেই জেনেরল্ সার ফ্রান্সিস্ ক্রোমাটি ছিলেন। মঙ্গোলিয়া জাহাজে ইঁহার সহিতই মিঃ ফগ হুইষ্ট খেলিতেন। সার ফ্রান্সিস্ সিপাহী যুদ্ধের সময় যথেষ্ট বীরপণার পরিচয় দিয়াছিলেন। তাঁহার জীবনের অধিকাংশ কাল ভারতবর্ষেই কাটিয়াছিল। তিনি ইতিপূর্ব্বেই মিঃ ফগের পাগলামী লক্ষ্য করিয়াছিলেন। তাঁহার রকম-সকম দেখিয়া অনেক সময় সার ফ্রান্সিসের সন্দেহ হইত, বুঝি এই রক্তমাংসের দেহের ভিতর প্রাণ নাই—যে হৃদয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করিতে সর্ব্বদা লালায়িত, বুঝি ফিলিয়াসের দেহে সে হৃদয় নাই। কর্ম্মক্ষেত্রে ফ্রান্সিসের সহিত কত রকম লোকের সম্বন্ধ ঘটিয়াছিল, কিন্তু মিঃ ফগের মত লোক তিনি আর কখনও দেখেন নাই।

 ট্রেণ যেমন চলিতেছিল, তেমনি চলিল। তাঁহারা দেখিতে দেখিতে পশ্চিমঘাট পর্ব্বতমালার গুহাগুলি অতিক্রম করিলেন। কথাপ্রসঙ্গে সার ফ্রান্সিস্‌ কহিলেন―

​ “আর কিছুদিন আগে হ’লে আপনাকে বিফলমনোরথ হ’তে হ’তো—৮০ দিনে পৃথ্বী-ভ্রমণ সম্ভব হ’তো না।”

 “কেন?”

 ঘাটপর্ব্বতমালার পাদদেশ পর্য্যন্তই তখন রেল ছিল। তারপর আর রেলপথ ছিল না। তখন সেখান থেকে পাল্কীতে কিম্বা অশ্বারোহণে যেতে হতো।”

 “ও সব সামান্য বিঘ্নে আমার যে বিশেষ কিছু অসুবিধা হ’তো তা বোধ হয় না। পথে যে মধ্যে মধ্যে বাধাবিঘ্ন এসে উপস্থিত হ’বে, সেটা ত জেনে শুনেই বেরিয়েছি।”

 “যা হোক্‌ মিঃ ফগ, আজই ত আপনার সব গিয়েছিল আর কি। আপনার চাকরটাই সব মাটি করতে বসেছিল!” যখন এই সকল কথা হয়, তখন জিয়েন একখানা কম্বল জড়াইয়া নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাইতেছিল। সার ফ্রান্সিস্ বলিতে লাগিলেন,—

 “ব্রিটিশ-রাজত্বে এ সব অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর বলে গণ্য হয়। এ দেশের প্রজাসাধারণের ধর্ম্মবিশ্বাসের উপর যা’তে আঘাত লাগে, ইংরাজের আমলে তেমন কিছু ঘটতে পারে না। আজ যদি আপনার চাকরটী ধরা পড়তো―”

 “তা হ’লে আর কি হ’তো বলুন। এ দেশের আইন অনুসারে না হয় তার দণ্ড হ’তো, দু’দিন পরই সে আবার ইউরোপে ফিরে যেত। চাকরের জন্য কি আর আমাকে পর্য্যন্ত এখানে আট্‌কে বসে থাকতে হতো! তা নয়। আমি তা হ’লে একাই চলে যেতেম।”

 ক্রমেই রজনী গভীরা হইতে লাগিল—সকলে নিদ্রিত হইয়া পড়িলেন। ট্রেণ যেমন তীরবেগে যাইতেছিল, তেমনি চলিল।

 প্রভাত—অতি সুন্দর প্রভাত। মেঘশূন্য নির্ম্মল নীল আকাশ ​সূর্য্য-কিরণে হাসিতেছে। দূরে ধূসরবর্ণ গিরিশ্রেণী মেঘের ন্যায় শোভা পাইতেছে। রেলপথের উভয় পার্শ্বে সুবিস্তৃত কর্ষিত ভূমি―মধ্যে মধ্যে দুইকখ এানি খণ্ড গ্রাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের বৈচিত্র্য ঘটাইতেছে মাত্র। কোথাও বা গ্রামপ্রান্তে অবস্থিত দুই একটী ক্ষুদ্র মিনার বা মন্দিরের চূড়া ক্ষণেকের জন্য দেখা যাইতেছে। গোদাবরী নদীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাখাপ্রশাখাগুলি বান্দেশের এই বিশাল প্রান্তর ধৌত করিরা নানাস্থান দিয়া বহিয়া চলিয়াছে।

 জিয়েন মনোযোগের সহিত চতুর্দ্দিক্ দেখিতে লাগিল। এই কি সেই নদীমেখলা কাননকুন্তলা শৈলকিরীটিনী ভারতভূমি? ওই কি তাহার বাতান্দোলিত তরঙ্গায়িত শ্যাম সমুদ্র? ওই না দূরে দূরে কফি, তূলা ও লবঙ্গের ক্ষেত্র দেখা যাইতেছে। না, এ বুঝি ভারতবর্ষ নহে! সে দেখিতে লাগিল, কোথাও সুদীর্ঘ তালবৃক্ষগুলি উন্নতশিরে দণ্ডায়মান রহিয়াছে। এঞ্জিনের মুখনিঃসৃত কুণ্ডলীকৃত মসিবর্ণ ধূমরাশি তাহাদের মস্তক স্পর্শ করিয়া ক্ষণিকের জন্য আবৃত করিয়া—উড়িয়া যাইতেছে। কোথাও বা হরিৎ ক্ষেত্রের মধ্যে মনোহর গৃহগুলি চিত্রলেখাবৎ শোভা পাইতেছে, কোথাও বা পরিত্যক্ত ধর্ম্মমন্দিরগুলি ভারতীয় স্থাপত্যের জীর্ণ জয়পতাকা শিরে বহন করিয়া এখনও মৌনে দণ্ডায়মান রহিয়াছে। কোন স্থানে রেলপথ দুর্ভেদ্য কাননভূমি অতিক্রম করিয়া চলিয়াছে। ভীষণকায় শার্দ্দূল, বিষাক্ত সর্পাদি রেলগাড়ীর অবিরাম ঘর্ঘর নিনাদে ভীত হইয়া এদিক ওদিক্ পলায়ন করিতেছে, কোন স্থানে দুই একটী সুবৃহৎ মাতঙ্গ উন্নতশুণ্ড হইয়া দূর হইতে দ্রুতগামী গাড়ীর দিকে চাহিয়া রহিয়াছে।

 ট্রেণ তখন মল্লিগ্রাম প্রদেশ অতিক্রম করিতেছিল। শক্তিপূজার নরশোণিতে আর্দ্র হইয়া যে ভূমি একদিন শাক্তদিগের নিকট পবিত্র ​হইয়াছিল, ইহা সেই ভূমি। ওই সুদূরে ইলোরার ভুবনবিখ্যাত মন্দিরাদির উন্নত শৈলশৃঙ্গ তপ্ত তপনকিরণে ঝলসিতেছে। এই বুঝি ঔরঙ্গাবাদ। এখানেই একদিন শাহান্‌শাহ বাদশাহ ঔরঙ্গজেব রাজধানী নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন। এই প্রদেশেই ত একদিন ঠগীসর্দ্দার ফেরিঙ্গিয়া পাশবরাজ্য বিস্তার করিয়াছিল। এমন একদিন ছিল, যখন এ অঞ্চলের প্রতি গ্রামে, প্রতি ক্ষেত্রে, প্রতি অরণ্যে ঠগীহস্তে নিহত বালক যুবক বৃদ্ধ, এমন কি রমণীর পর্য্যন্ত মৃতদেহ পতিত থাকিতে দেখা যাইত। ইংরাজের শাসনে ঠগীদিগের সে ভীষণ অত্যাচার এখন একেবারেই বিলুপ্ত হইয়াছে।

 বেলা সাড়ে বারটা বাজিল। ট্রেন বহরমপুর ষ্টেশনে আসিয়া দাঁড়াইল। ঝুঁটা মতি বসানো এক জোড়া চটি জুতা ক্রয় করিয়া জিয়েন একটু গর্ব্বভরে তাহার নগ্নপদ আবৃত করিল!

 মালাবারের দুর্ঘটনার পর হইতেই জিয়েনের মতি ফিরিয়াছিল। বোম্বাই আসিবার পূর্ব্ব পর্য্যন্ত তাহার বিশ্বাস ছিল, এ বিকট ভ্রমণ সেই স্থানেই শেষ হইবে। কিন্তু ভারতবর্ষের চিত্তাকর্ষক দৃশ্যাবলী তাহার সুপ্ত পর্য্যটন-স্পৃহাকে পুনরায় জাগ্রত করিয়া দিল। তাহার যৌবনের উদ্দাম ভাব সকল পুনর্ব্বার আসিয়া দেখা দিল। সে এখন বিশ্বাস করিল যে তাহার প্রভুর বাজী ধরার কাহিনী সম্পূর্ণ সত্য। যেমন করিয়াই হউক ৮০ দিনের মধ্যে পৃথিবী ঘুরিয়া আসিতেই হইবে। সে জন্য ফিলিয়াস্ ফগ অপেক্ষা এখন তাহার চিন্তাই অধিক হইল। ঠিক সময় মত যাওয়া যাইবে ত? পথে ত কোন বিঘ্ন ঘটিবে না? কোন কারণে বিলম্ব হইবে না ত? বাজীটা জয় করিতে পারিলে কত গৌরব! পূর্ব্বদিন যে তাহার নির্ব্বুদ্ধিতার জন্যই সমস্ত নষ্ট হইতে বসিয়াছিল, সেই কথা স্মরণ করিয়া এখন তাহার হৃৎকম্প হইতে লাগিল। কোন ষ্টেশনে একটু অধিক​ক্ষণ ট্রেণ দাঁড়াইলেই জিয়েন বিরক্ত হইতে লাগিল! সে অবশেষে ট্রেণের ড্রাইভারকে পর্য্যন্ত উদ্দেশে গালি দিতে আরম্ভ করিল এবং মনে মনে বলিতে লাগিল, আমার মনিবও যেমন—ড্রাইভারকে কিছু দিলেই ত সে আরও বেগে গাড়ী চালাইত!

 ২২শে তারিখ প্রভাত ৮ টার সময় ট্রেণ আসিয়া রোখাল হইতে ১৫ মাইল দূরে থামিয়া গেল। গার্ড সাহেব চীৎকার করিয়া কহিল নাম—নাম—গাড়ী থেকে নাম এখানে বদল হইবে।”

 ফিলিয়াস্ ফগ এ কথার তাৎপর্য্য বুঝিতে না পারিয়া সার ফ্রান্সিসের মুখের দিকে চাহিলেন। জিয়েন মুহূর্ত্তমধ্যে অবতরণ করিয়া সংবাদ আনিল, ট্রেণ আর চলিবে না—পথ নাই।

 সার ফান্সিস্ বলিলেন, “তুমি কি বল্‌ছো! ট্রেণ আর চল্‌বে না মানে কি?”

 “আমি বল্‌ছি যে ট্রেণ আর এক হাতও যাবে না!” কথা শুনিয়াই ফিলিয়াস্ ফগ ও জেনেরল ক্রোমাটি অবতরণ করিলেন এবং সম্মুখেই গার্ডকে দেখিয়া জেনেরল সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন―

 “আমরা কোথায় এসেছি?”

 খোল্‌বি গ্রামে!”

 “এখানে এতক্ষণ দাঁড়াবার কারণ কি?”

 “ওদিকে এখনো রেলপথ প্রস্তুত হয় নাই।”

 “প্রস্তুত হয় নাই! সে কি কথা?”

 “এখান থেকে এলাহাবাদ ৫০ মাইল। এ ৫০ নাইল রেলপথ এখনো হয় নাই। এলাহাবাদ থেকে আবার ট্রেণ পাওয়া যাবে।”

 “আমরা ত সংবাদপত্রে দেখেছি লাইন শেষ হয়ে গেছে।”

 “তার আর আমি কি কর্‌ব বলুন। সংবাদপত্রের সেটা ভুল!”

​ সার ফ্রান্সিস্ ক্রমশঃ কুপিত হইতেছিলেন। তিনি রুক্ষস্বরে কহিলেন, “লাইন হয় নাই, অথচ বরাবর কলিকাতার টিকিট দেওয়া হ’ল কেন?”

 “টিকিট ত বরাবরই দেওয়া হচ্ছে। সকলেরই এটা জানা আছে যে যাত্রীরা নিজেদের বন্দোবস্তে খোল্‌বি থেকে এলাহাবাদ যায়!”

 গার্ডের কথা শুনিয়া সার ফান্সিসের ক্রোধ সীমা অতিক্রম করিল। যদি পারিত তাহা হইলে জিয়েন অবিলম্বে গার্ড সাহেবকে উত্তম মধ্যম লাগাইয়া দিত, কিন্তু ফিলিয়াস্ ফগের দিকে চাহিবার সাহসই তাহার ঘটিল না!

 ফিলিয়াস্ ফগ কহিলেন, “সার ফ্রান্সিস্ চলুন। যেমন করেই হোক্‌ এলাহাবাদ ত যেতে হ’বে। দেখা যাক্ কোন উপায় হয় কি না।”

 “এখন আর কি বন্দোবস্তই বা করা যাবে? এখানে যত বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা দেখ্‌ছি, আপনার বাজীর এখানেই শেষ হ’বে বোধ হচ্ছে!”

 “ও কিছু নয়! ওর জন্য ভাব্‌বেন না! বিলম্ব যে হ’বে সেটা আগেই ভেবে রেখেছি।”

 সার ফ্রান্সিস্ সবিস্ময়ে কহিলেন—“লাইন যে প্রস্তুত হয় নাই, সেটা কি তবে আগেই আপনার জানা ছিল?”

 “না—তা ছিল না। তবে আমার যাত্রাপথে যে অনেক বাধাবিপত্তি এসে দাঁড়াতে পারে, সে সম্বন্ধে আমার কখনো সন্দেহ ছিল না।”

 “কলিকাতার ট্রেণ ধরতে না পারলে যে এখন আপনার সর্ব্বস্ব যায়!”

 “ট্রেণ ধরতে পার্‌ব বৈ কি। ২৩শে দ্বিপ্রহরের আগে কলিকাতা থেকে হংকংএর জাহাজ ছাড়বে না। আজ ত কেবল ২২শে। এখনো অনেক সময় আছে!”

 এমন স্থির নিশ্চিন্ত উত্তরের আর প্রত্যুত্তর ছিল না! অন্যান্য যাত্রীরা ​অনেকেই ইহা জানিত যে খোল্‌বি হইতেই গাড়ী বদল করিতে হয়। প্রত্যেকেই নিজের নিজের বন্দোবস্ত রাখিয়াছিল। কাহারও অশ্ব, কাহারও শিবিকা, কাহারও বা গো-শকট অপেক্ষা করিতেছিল। যাত্রীরা আপন আপন যান-বাহন লইয়া প্রস্থান করিল। মিঃ ফগ এবং সার ফ্রান্সিস্ কোন প্রকার যানই পাইলেন না! ফিলিয়াস্ ফগ কহিলেন, “যখন কোন যান নাই, তখন আর উপায় কি? আমি হেঁটেই যাব!”

 জিয়েন এই কথা শুনিয়া তাহার অকর্ম্মণ্য ঝক্‌ঝকে চটি জুতার দিকে চাহিয়া একটা অর্থপূর্ণ মুখভঙ্গী করিল।