৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/প্রথম খণ্ড/পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
গোয়েন্দার চিন্তা
ঙ্গুন পোত মঙ্গোলিয়ার মতই দ্রুতগামী ছিল। কিন্তু আরোহীদিগের থাকিবার বন্দোবন্ত মঙ্গোলিয়াতেই ভাল ছিল। যাহাতে রাণী আউদার কোনরূপ অসুবিধা না হয়, সেজন্য মিঃ ফগ বিশেষ বন্দোবস্ত করিলেন।
আউদা ক্রমে ক্রমে ফিলিয়াস্ ফগের সহিত বিশেষ পরিচিতা হইয়া উঠিলেন। তাঁহার প্রাণরক্ষাকর্ত্তা বলিয়া সর্ব্বদাই কৃতজ্ঞতা জানাইতেন। একদিন রাণী আউদা কথাপ্রসঙ্গে কহিলেন যে, বোম্বাইয়ের শ্রেষ্ঠ বণিক্ স্যার জেম্সেট্জি জিজিভয়ের সহিত তাঁহার আত্মীয়তা আছে। স্যার জেম্সেট্জির ভাগিনেয় হংকংএ থাকেন। আউদা তাঁহারই আশ্রয়ে যাইতে চাহেন। কিন্তু তিনি আউদাকে গ্রহণ করিবেন কি না কে জানে। যদি গ্রহণ না করেন, তাহা হইলে নিজের দশা যে কি হইবে সেই চিন্তাতেই আউদা অত্যন্ত ব্যাকুলা হইয়াছিলেন। মিঃ ফগ কহিলেন, “সে জন্য চিন্তা কি, সবই ঠিক হ’য়ে যাবে।”
রেঙ্গুন জাহাজে সমুদ্র-যাত্রার প্রথম ভাগটা বেশ স্বচ্ছন্দেই কাটিয়া গেল। ওই অনতিদূরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ। ওই তাহাদের রমণীয় স্যাডল্ লিকের ২৪০০ ফিট উচ্চ শৃঙ্গ সগর্ব্বে শির উত্তোলন করিয়া দণ্ডায়মান রহিয়াছে। জাহাজখানি বেলাভূমির অতি নিকট দিয়া যাইতে লাগিল। সম্মুখে অনন্তবিস্তারি বনশ্রেণী—তাল, খর্জ্জুর, শেগুন প্রভৃতি বৃক্ষের সারি। সেই কাননের পশ্চাদ্ভাগে গিরিশিখরগুলি তরঙ্গের পর তরঙ্গের মত দেখাইতেছিল।
দেখিতে দেখিতে রেঙ্গুন পোত আন্দামান পশ্চাতে ফেলিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল। গোয়েন্দা ফিক্স তখন কোথায় ছিলেন?
তিনি যখন দেখিলেন, শিকার সত্য সত্যই পলায়ন করিল, তখন অনন্যোপায় হইয়া বিলাতের পরোয়ানা হংকংএ পাঠাইবার উপদেশ দিয়া রেঙ্গুন জাহাজেই হংকং যাত্রা করিলেন। পাছে জিয়েনের সহিত জাহাজের উপর তাঁহার সাক্ষাৎ ঘটে, এই ভয়েই তিনি অতি সাবধানে থাকিতে লাগিলেন। তিনি দেখিলেন, জাহাজ যখন সিঙ্গাপুরে অধিকক্ষণ থাকিবে না, তখন হংকংই তাঁহার শেষ ভরসার স্থল। দস্যুকে হংকংএ ধরিতে না পারিলে আর ধরা যাইবে না। হংকং এর পরই ত চীন, জাপান এবং আমেরিকা। সাধারণ একখানা গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাহিরে চলিবে না। এ সকল স্বাধীন দেশে দস্যুকে ধরিবার জন্য বিশেষ পরোয়ানা আনাইতেও অনেক সময় লাগিবে। ততদিন ফিলিয়াস্ ফগ কোথায় যে লুক্কায়িত হইবেন তাহা কে বলিতে পারে!
গোয়েন্দা ফিক্স বড় বিপদেই পড়িলেন। তিনি ভাবিতে লাগিলেন, ‘আমার যত কল কৌশল সবই ত প্রয়োগ করিয়াছিলাম। বোম্বাই এবং কলিকাতা দুই স্থানেই পরাজিত হইয়াছি। হংকংএ যদি দস্যুকে ধরিতে না পারি, তাহা হইলে আমার সুনাম পর্য্যন্ত কলঙ্ক-মলিন হইবে। যেমন করিয়াই হউক, হংকংএ উদ্দেশ্য সাধন করিতেই হইবে। জিয়েনকে কি সকল কথা প্রকাশ করিয়া বলিব? বলিলে সে হয় ত দস্যুর সঙ্গ ত্যাগ করিয়া আমাকেই সাহায্য করিবে।’
‘কি করি? বলি—কি বলিব না? এ যে বড় বিষম সমস্যা! যদি জিয়েন তাহার প্রভুকে সকল কথা বলিয়া দেয়! তবেই ত আমার সকল শ্রম পণ্ড হইল! না—নিতান্ত দায়ে না ঠেকিলে কোন কথা প্রকাশ করা হইবে না।’
‘মিঃ ফগের সঙ্গিনীটীই বা কে? আগে ত ইহাকে দেখি নাই। বোম্বাই হইতে কলিকাতার পথে ইনি জুটিয়াছেন বলিয়া বোধ হয়। স্ত্রীলোকটী সুন্দরী বটে। বুঝি ইঁহার জন্যই মিঃ ফগ টাকা চুরি করিয়া পলাইতেছেন! এখন ঠিক বুঝিয়াছি। টাকা চুরি করিয়া এই স্ত্রীলোকটীকে লইয়া মিঃ ফগ দেশত্যাগী হইতেছেন।’
‘স্ত্রীলোকটী কি বিবাহিতা? তা’ হউক বা না হউক, আমার তাহাতে কিছু আসিয়া যায় না। মিঃ ফগ যে ইঁহাকে হরণ করিয়া লইয়া যাইতেছেন, ইহাতে ত আর সন্দেহ নাই। এই ত বেশ সুযোগ জুটিয়াছে! রমণী-অপহরণের জন্য মিঃ ফগকে আটকাই না কেন!’
‘কি বিপদ্! রেঙ্গুন জাহাজ যে আবার একদম হংকং যাইবে। মিঃ ফগ যেমন জাহাজ হইতে জাহাজে, রেল হইতে রেলে, ঝম্পপ্রদান করিতে করিতে চলিয়াছেন, হংকংএ কি তিনি বেশী বিলম্ব করিবেন? ভরসা ত হয় না।’
‘এক কাজ করা যাউক। সিঙ্গাপুর হইতে হংকংএর পুলিশকে তারে খবর পাঠাই। তাহারা প্রস্তুত থাকিলেই যেমন জাহাজ হংকংএ যাইবে, অমনি মিঃ ফগ ধৃত হইবেন। কিন্তু আগে জিয়েনকে ‘ধাপ্পা’ দিয়া ভিতরের সংবাদটা নিতেই হইতেছে।’
এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে ফিক্স গোয়েন্দা জাহাজের ডেকের উপর আসিয়া দেখিলেন জিয়েন তথায় পাদচারণ করিতেছে। তাহাকে দেখিবামাত্রই গোয়েন্দা বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিয়া সম্মুখে যাইয়া কহিলেন, “এ কি, রেঙ্গুন জাহাজে তুমি যে?”
“মিঃ ফিক্স! আপনিও যে দেখছি এখানে! সেই বোম্বাইতে আপনার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছিল―না? আপনিও কি পৃথ্বী-পর্য্যটনে বেরিয়েছেন না কি?”
“না—ও সব খেয়াল আমার নাই। আমি কিছুদিন হংকং এ থাক্বো ভাবছি।”
“ও তাই না কি! আপনাকে ত এতদিন ডেকের উপর দেখতে পাইনি। সেই কবে আমরা কলিকাতা ছেড়েছি—”
“আমার একটু অসুখ হয়েছিল তাই বাহিরে আসিনি। কি জান, এই বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগর এ দু’টো আমার সয় না। তা যাক্। তোমার মনিব কেমন আছেন?”
“তিনি ভালই আছেন। ঠিক্ ঠাক্ সময় মত তাঁর সব কাজ হয়ে যাচ্ছে। মিঃ ফিক্স, আপনি বোধ হয় জানেন না যে এখন আমাদের সঙ্গে একটী মহিলা আছেন।”
গোয়েন্দা আত্মগোপন করিয়া কহিলেন, “মহিলা? সুন্দরী যুবতী! কৈ না? অনেকদিন তোমাদের সঙ্গে দেখা নাই, আমি আর কেমন করে’ জান্ব বল।”
জিয়েন তখন গোয়েন্দার নিকট আদ্যোপান্ত সমস্ত বর্ণনা করিতে লাগিল। মালাবার মন্দিরে তাহার দুর্দ্দশা, খোল্বিতে হস্তী ক্রয়, পিল্লাজির মন্দিরে সতীদাহ, কলিকাতার বিচারশালায় বিচার ও দণ্ড—এ সমস্তই সে গোয়েন্দা ফিক্সের নিকট একে একে বর্ণনা করিল। ফিক্স গোয়েন্দা ইহার কতক কতক ভালই জানিতেন। তথাপি অজ্ঞতার ভাণ করিয়া বিশেষ মনোযোগের সহিত সমস্ত শুনিলেন এবং মধ্যে মধ্যে সহানুভূতি দেখাইয়া করিলেন,―
“মিঃ ফগ কি এখন এই মহিলাটীকে ইউরোপে নিয়ে যাবেন না কি?”
“না—তা’ কেন? সে কি কখনো সম্ভব? হংকংএ রাণী আউদার আত্মীয় আছেন। আমরা তাঁরই কাছে ওঁকে রাখতে চাচ্ছি। শুনেছি তিনি হংকং এর একজন বড় মহাজন।”
সকল কথা শুনিয়া গোয়েন্দার মন দমিয়া গেল। তিনি হতাশ হৃদয়ে ভাবিলেন ‘এ পথে দেখছি কিছু হবে না।’ তারপর প্রকাশ্যে বলিলেন, “এস এক গ্লাস জিন্ খাওয়া যাক্—অনেক দিন পর দেখা হ’ল!” জিয়েন হর্ষ প্রকাশ করিয়া কহিল, “চলুন—দুইএক গ্লাস জিন ভিন্ন আর রেঙ্গুন জাহাজে কি করে’ সময় কাটানো যাবে!”