৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/প্রথম খণ্ড/পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
অসম্ভব সংঘটন
দৃষ্ট সঙ্গে সঙ্গে থাকে। ফিলিয়াস্ ফগের অদৃষ্টও তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে ছিল, ফিক্স গোয়েন্দার অদৃষ্টও তাঁহার সঙ্গ ছাড়া হয় নাই। ভবিষ্যতের গর্ভে কি নিহিত রহিয়াছে, তাহা কে বলিতে পারে?
পি এণ্ড ও কোম্পানীর যতগুলি জাহাজ ছিল, তাহার মধ্যে মঙ্গোলিয়াই সর্ব্বাপেক্ষা অধিক দ্রুতগামী। আজ ২৯শে অক্টোবর—বুধবার। সুয়েজ বন্দরে মঙ্গোলিয়া জাহাজের আসিবার দিন। জাহাজের প্রতীক্ষায় জাহাজ-ঘাটে লোকারণ্য হইয়াছে। সকলের মুখেই এক কথা—“ওই আসিল, ওই আসিল।”
জাহাজের জন্য অপেক্ষা করিতে করিতে শ্রান্ত হইয়া দুইটি ভদ্রলোক সেই জনতা ঠেলিয়া জেটীর ধারে পাদচারণ করিতেছিলেন। ইঁহাদের মধ্যে একজন সুয়েজের ইংরাজ কন্সাল। তাঁহার সঙ্গীটি অপেক্ষাকৃত খর্ব্বকায় ও শীর্ণ। তাঁহার নয়নদ্বয় তীক্ষ্ণবুদ্ধিব্যঞ্জক, উজ্জ্বল ও চঞ্চল। কিসের যেন একটা চিন্তা তাঁহাকে এতই অধীর করিয়াছিল যে, তিনি ক্ষণমাত্রও এক স্থানে স্থির থাকিতে পারিতেছিলেন না। ইনিই গোয়েন্দা পুলিশ ফিক্স—ব্যাঙ্কের নোট-চোর ধরিবার জন্য সুয়েজ বন্দরে প্রেরিত হইয়াছিলেন।
আগতপ্রায় জাহাজের অপেক্ষায় জেটীতে যে সমস্ত লোক অপেক্ষা করিতেছিল, মিঃ ফিক্স বিশেষ মনোযোগের সহিত তাহাদের প্রত্যেকের মূর্ত্তি অবলোকন করিতেছিলেন। ইনিই কি সেই চোর! না ইনি নহেন। উনি বুঝি—না উনিও ত নহেন! ফিক্স বিশেষ ব্যস্ত হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। ব্যাঙ্ককর্ত্তৃপক্ষদিগের প্রতিশ্রুত পুরস্কারের লোভ তাঁহাকে উৎসাহিত করিতে লাগিল। তিনিও অন্যের ন্যায় ব্যাকুল আগ্রহে মঙ্গোলিয়া জাহাজের জন্য অপেক্ষা করিতে করিতে তাঁহার সঙ্গীকে কহিলেন,—“আপনি তবে বল্তে চান, মঙ্গোলিয়ার কখনো দেরি হয় না?”
“না, কখনো দেরি হয় না। মঙ্গোলিয়া কাল সৈয়দ বন্দর ছেড়েছে। অত বড় একখানা জাহাজের কাছে সুয়েজের এই খালটা আর কতটুকু পথ? ঠিক নির্দ্দিষ্ট সময়ের আগে জাহাজ পৌঁছিলে সরকার বাহাদুর প্রত্যেকবার ৩৭৫৲ টাকা পুরস্কার দিয়ে থাকেন। আমি ত জানি, মঙ্গোলিয়াই সর্ব্বদা সে পুরস্কার পায়।”
“মঙ্গোলিয়া কি বরাবর ব্রিন্দিসি থেকে আসে?”
“হাঁ! ভারতবর্ষের ডাক ব্রিন্দিসিতেই জাহাজে উঠে। শনিবার বিকাল পাঁচটায় জাহাজ ছেড়েছে—এই এলো ব’লে। আপনি বেশী ব্যস্ত হবেন না। আচ্ছা, মনে করুন, ব্যাঙ্ক-দস্যু যদি জাহাজে থাকেই, আপনি দস্যুর চেহারার যে বর্ণনা পেয়েছেন, তা থেকেই কি তাকে চিনে নিতে পারবেন? আমার ত সন্দেহ হয়।”
“চেহারা কি! আমার মন তাকে চিনিয়ে দিবে। চোখে না দেখে যেমন কখন কখনও গায়ের গন্ধে মানুষ চেনা যায়, এও ঠিক তেমনি। এ বয়সে আমি হাজার হাজার চোর দেখলেম। যদি সে এই জাহাজে থাকে, তা হ’লে আমাকে আর ফাঁকি দিতে হবে না!”
“উঃ! এ একটা মস্ত চুরি! ভগবান্ করুন, আপনি যেন দস্যুকে ধরতে পারেন।”
“মস্ত বলে’ মস্ত! এমন চুরি ক’টা হয়? ভাবুন দেখি, নগদ সাড়ে আট লক্ষ টাকা! এ কি কম কথা! যদি ধরতে পারি তা হ’লে পুরস্কারও পাব অনেক। এমন সুযোগ জীবনে ক’বার ঘটে? আজকাল যে কেমন হয়েছে, এমন জাঁহাবাজ চোর আর বড় দেখতে পাওয়া যায় না। এখন কেবল ছেঁচ্ড়া চোরের দিন হয়েছে—দু’টাকা, চারটাকা পেলেই তারা খুসি।”
“আপনার কথাগুলো বড় উত্তেজনা পূর্ণ। আপনি যদি ধরতে পারেন, তা হ’লে ত ভালই হয়। কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে—কাজটা বড় সহজ হবে না। আপনি যার চেহারার বর্ণনা পেয়েছেন, হয় ত হ’তে পারে, তিনি আদৌ চোর নন। সে চেহারা হয় ত একজন নির্দ্দোষী সাধু ভদ্রলোকের।”
“কি জানেন, বড় বড় চোরেরা বাহিরে ঠিক সাধু-সজ্জনের মতই থাকে। দস্যুর মত চেহারা যার, সে কি আর সাহস ক’রে চুরি করতে পারে? চেহারা দেখেই যে লোকে আগে তাকেই সন্দেহ করবে। ভণ্ড সাধুতার জীর্ণ আবরণ উন্মোচন করাই ত আমাদের কাজ। কাজটা খুব কঠিন বটে, কিন্তু ওতেই ত বাহাদুরী!”
এ দিকে জেটীর উপর লোকসমাগম বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইল। নানা দেশের নাবিক, মহাজন, ভারবাহী মুটে-মজুর প্রভৃতি সমবেত হইতে লাগিল।
দিনটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ছিল। লবণাম্বুস্পর্শশীতল মন্দ মন্দ পবন ধীরে ধীরে পূর্ব্বদিক্ হইতে বহিতেছিল। দুরে নগরমধ্যবর্ত্তী গম্বুজগুলির চূড়া তপনকিরণে ঝক্মক্ করিতেছিল। ধীবরদিগের সহস্র সহস্র ক্ষুদ্র তরণী লোহিত সাগরমধ্যে বিন্দুবৎ প্রতীয়মান হইতেছিল। প্রাচীন প্রথায় গঠিত দুই একখানি অর্ণবপোতও যে সেই বিন্দুগুলির সন্নিকটে না ছিল, তাহা নহে।
জেটীর ঘড়িতে সাড়ে দশটা বাজিয়া গেল।
ফিক্স নিতান্ত বাগ্র হইয়া কহিলেন, “না—এ জাহাজ আর আজ আস্বে না দেখছি।”
কন্সাল কহিলেন, “আর বেশ বিলম্ব নাই।”
“সুয়েজে কতক্ষণ নোঙ্গর করবে?”
“ঘণ্টা চারেক। এই খানেই জাহাজে কয়লা তোলে। সুয়েজ থেকে এডেন বন্দর ১৩১০ মাইল—বুঝতেই পারছেন, কত কয়লা প্রয়োজন।”
“সুয়েজ থেকেই বুঝি বরাবর বোম্বাই যায়?”
“হাঁ, একদমে বোম্বাই―পথে আর কোথাও দাড়ায় না।”
ফিক্স কহিলেন, “তাই ত! দস্যু যদি এই পথেই মঙ্গোলিয়া জাহাজে এসে থাকে, তা হ’লে ইংরাজ পুলিশকে ফাঁকি দেওয়ার মতলবে সে সুয়েজেই নামবে। তারপর এখান থেকে দিনেমার কি ফরাসীদের কোন একটা নিকটবর্ত্তী উপনিবেশে যাবার চেষ্টা করবে। ভারতবর্ষ ইংরাজের রাজত্ব। সেখানে গেলে যে কোন সুবিধা হবে না, তা সে বিলক্ষণই জানে।”
“লোকটা যে তেমন চালাক চতুর, আমার তা’ বোধ হয় না। চালাক হ’লে সে এতদূর আসবে কেন? লণ্ডনেই ত লুকিয়ে থাকা সহজ।”
কন্সাল এই কথা বলিয়া নিজ কর্ম্মস্থানে প্রস্থান করিলেন। তাঁহার কথায় গোয়েন্দার চিন্তা আরও বাড়িয়া উঠিল।
অবিলম্বে অদূরে ঘন ঘন তীব্র বংশীধ্বনি শ্রুতিগোচর হইল। যে যেখানে ছিল, সকলেই উর্দ্ধশ্বাসে জেটীর দিকে ছুটিল। তীরের নৌকাগুলি মুহূর্ত্তমধ্যে নোঙ্গর তুলিয়া বাঁধন খুলিয়া মঙ্গোলিয়া জাহাজের দিকে অগ্রসর হইল। ঠিক এগারটার সমন্ন মঙ্গোলিয়া নির্দ্দিষ্ট স্থানে নোঙ্গর নিক্ষেপ করিয়া হু হু শব্দে বাষ্প উদ্গীরণ করিতে লাগিল।
জাহাজে অনেক যাত্রী ছিল। কেহ কেহ জাহাজে থাকিয়াই চতুর্দ্দিকের মনোরম দৃশ্যাবলী দর্শন করিতে লাগিল, কেহ বা তরী আরোহণে তীরে আসিল। ফিক্স গোয়েন্দা অতি যত্নে প্রত্যেক আরোহীকে দেখিতে লাগিলেন। তিনি যখন এইরূপে ব্যাঙ্ক-দস্যুর সন্ধানে ব্যস্ত, তখন একজন যাত্রী জনতা ঠেলিয়া নিকটে আসিয়া তাঁহাকেই জিজ্ঞাসা করিল, “ম’শায়, বল্তে পারেন কন্সাল আফিস্টা কোথায়?” কথা কহিতে কহিতে আগন্তুক পকেট হইতে একখানি ছাড়-পত্র বাহির করিয়া বলিল, “আমি তাঁর সহি নিতে চাই।”
ফিক্স গোয়েন্দা ছাড়-পত্রখানি লইয়া পাঠ করিলেন। তাঁহার হস্ত কম্পিত হইতে লাগিল। কি অসম্ভব সংঘটন! ইহা যে সেই দস্যুরই ছাড়-পত্র? ইহাতে পত্রাধিকারীর আকৃতির যে বর্ণনা রহিয়াছে, দস্যুর আকৃতিও যে সেইরূপ! ফিক্স আগন্তুকের দিকে চাহিয়া কহিলেন—“এটা ত তোমার ছাড়-পত্র নয়?”
“না। এটা আমার মনিবের।”
“তিনি কোথায়?”
“জাহাজে আছেন।”
“তাঁকেই কন্সাল আফিসে যেতে হবে, তুমি গেলে চলবে না।”
“তিনি না গেলে কি চলবেই না?”
“না।”
“আফিস্টা কোথায়?”
অদূরে একটী গৃহ দেখাইয়া গোয়েন্দা কহিলেন “ওই যে সম্মুখের মোড়টা—ওইখানে।”
“তা হ’লে আমি যাই, মনিব ম’শায়কেই আনিগে।”
আগন্তুক পুনরায় জাহাজে প্রত্যাবর্ত্তন করিল।