বিষয়বস্তুতে চলুন

৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/প্রথম খণ্ড/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

​

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

সুয়েজ বন্দরে

ক্স গোয়েন্দা কাল বিলম্ব না করিয়া কন্‌সালের নিকট যাইয়া কহিলেন—

 “আমি আপনাকে বিরক্ত ক’রছি ব’লে ক্ষমা ক’রবেন। নোট-চোর যে মঙ্গোলিয়া জাহাজে আছে, আমি তার বিশেষ প্রমাণ পেয়েছি।”

 তখন উভয়ের মধ্যে অনেক কথাবার্ত্তা হইল। আগন্তুকের সহিত সাক্ষাৎ, ছাড়-পত্র দর্শন প্রভৃতি সকল কথাই তিনি কন্‌সালের নিকট বর্ণনা করিলেন। কন্‌সাল কহিলেন—“উত্তম। তা হ’লে সে এখানেই আস্‌ছে। একটা পাপিষ্ঠের মুখদর্শন ক’রতে হ’বে ব’লে আমি দুঃখিত নই; কিন্তু সত্যই যদি সে চোর হয়—আর আপনি যেমন ব’লছেন, তাতে ত তাকে চোর ব’লেই বোধ হচ্ছে—তা হ’লে সে কখনো এখানে আসবে না। কোন্ দস্যু ইচ্ছা করে যে, তার পলায়ন-পথের রেখা বর্ত্তমান থাকে। ছাড়পত্রে দস্তখৎ নিয়েই বা কি হবে—আজকাল ত আর দরকার হয় না।”

 “যদি তার কিছুমাত্র বুদ্ধি থাকে, তা হ’লে সে নিশ্চয়ই এখানে আস্‌বে।”

​ “কেন? তার ছাড়-পত্রখানা পাঁচজনকে দেখাতে না কি?”

 “তা বৈ কি? দস্যুর পলায়নপথ নিষ্কণ্টক করা আর ভালমানুষকে অনর্থক জঞ্জালে ফেলা—এ ছাড়া ছাড়পত্রের আর কি কোনো উপকারিতা আছে, ব’লতে পারেন? এর ছাড় পত্রখানা যে ঠিকই আছে, তাতে আমার সন্দেহ নাই। ভরসা করি, আপনি ওতে স্বাক্ষর ক’রবেন না।

 “কেন? যদি পত্রে কোন গোলযোগ না থাকে, তা হ’লে আমাকে ত বাধ্য হয়েই স্বাক্ষর ক’রতে হবে।”

 “তা হোক্‌। আমি যতক্ষণ লণ্ডন থেকে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা না পাচ্ছি, ততক্ষণ ত দস্যুকে এখানে আট্‌কে রাখতে হবে।”

 “মিঃ ফিক্স, সেটা হ’ল আপনার কাজ। আপনি তার ব্যবস্থা ক’রবেন কিন্তু আমার—”

 কন্‌সালের মুখের কথা মুখেই রহিয়া গেল। উভয়ে শুনিলেন দ্বারে করাঘাত হইল। করাঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই ভৃত্য আসিয়া দুই জন অপরিচিত লোককে তথায় রাখিয়া প্রস্থান করিল। ইহাদের মধ্যে একজন একখানা ছাড়-পত্র লইয়া স্বাক্ষর করিবার জন্য কন্‌সাল সাহেবের হস্তে প্রদান করিলেন। কন্‌সাল ছাড়-পত্রখানি বিশেষরূপে পরীক্ষা করিতে লাগিলেন, এ দিকে গোয়েন্দা ফিক্স এক কোণে নীরবে বসিয়া আগন্তুকের কেশাগ্র হইতে জুতার অগ্রভাগ পর্য্যন্ত অত্যন্ত আগ্রহের সহিত নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। ছাড়পত্র পাঠ করিয়া কন্‌সাল কহিলেন—“আপনার নাম ফিলিয়াস্ ফগ?”

 “হাঁ।”

 “এই লোকটি কি আপনার ভৃত্য?”

 “হাঁ। ওর বাড়ী ফরাসী দেশে। নাম জিয়েন পাসে পার্ত্তুত।”

 “আপনি লণ্ডন থেকে আস্‌ছেন?”

​ “হাঁ, লণ্ডন থেকে।”

 “কোথায় যাবেন?”

 “বোম্বাই।”

 “আপনি বোধ হয় জানেন, এ সব কথা না জিজ্ঞাসা করলেও চল্‌তো। ছাড়-পত্রখানা দেখলেই যথেষ্ট হতো।”

 “তা আমি জানি। আমি যে সুয়েজে এসেছি, আপনার স্বাক্ষর নিয়ে তার প্রমাণ রাখতে চাই।”

 “আচ্ছা, বেশ।”

 কন্‌সাল দ্বিরুক্তি না করিয়া উহাতে স্বাক্ষর করিলেন। মিঃ ফগ তাহার পাওনা-গণ্ডা বুঝাইয়া দিয়া অভিবাদন করিয়া প্রস্থান করিলেন। জিয়েন প্রভুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিয়া গেল।

 ফিক্স গোয়েন্দা ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন―

 “এখন আপনার কি মনে হয়?

 “চেহারা দেখে ত মনে হয় লোকটা নিতান্ত ভালমানুষ।”

 “তা হ’তে পারে। সে কথা হচ্ছে না। আপনার কি বোধ হয় না এই গম্ভীর প্রকৃতির ভদ্রলোকটীর মূর্ত্তি সেই দস্যুর মূর্ত্তির সঙ্গে ঠিক-ঠাক মিলে যাচ্ছে?”

 “হাঁ মিল্‌ছে বৈ কি। কিন্তু সব সময় চেহারার বর্ণনা”―গোয়েন্দা বাধা দিয়া কহিলেন, “সে আমি দেখে নিচ্ছি। আমার বোধ হয় প্রভু অপেক্ষা ভৃত্যের কাছে ঘেঁসা অনেকটা সহজ হবে। লোকটাও যখন ফরাসী, তখন কিছুতেই মুখ খুঁজে থাক্‌তে পারবে না। তবে আমি বিদায় হই। এখনই আবার আস্‌ছি।”

 ফিক্স গোয়েন্দা অবিলম্বে জিয়েনের সন্ধানে বহির্গত হইলেন।

 কন্‌সালের অফিস হইতে বহির্গত হইয়া মিঃ ফগ জেটীতে প্রত্যাবর্ত্তন ​করিলেন এবং ভৃত্যকে কতকগুলি কার্য্যের ভার দিয়া তরণীযোগে জাহাজে গমন করিলেন।

 ফিলিয়াস্ ফগের রোজনামচার খাতায় ২রা অক্টোবর হইতে ২১ ডিসেম্বর পর্য্যন্ত প্রত্যেক দিনের জন্য নির্দ্দিষ্ট স্থান ছিল। কোন্ মাসে কোন্ তারিখে কোন্ বারে কোন্ সময়ে তাঁহাকে প্যারিস, ব্রিন্দিসি সুয়েজ, বোম্বাই প্রভৃতি প্রধান প্রধান স্থানগুলিতে পৌঁছিতে হইবে সেই খাতায় তাহা লিখিত ছিল। কোন্ স্থানে পৌছিতে নির্দ্দিষ্ট সময় অপেক্ষা কত অধিক বা কত অল্প সময় লাগিল, তিনি তাহাও লিখিয়া রাখিতেছিলেন।

 ফিলিয়াস্‌ ফগ জাহাজে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া তাঁহার খাতা বাতির করিলেন। তাহাতে লেখা ছিল;—

 ২রা অক্টোবর, বুধবার সন্ধ্যা ৮টা ৪৫ মিনিটের সময়―লণ্ডন ত্যাগ।

 বৃহস্পতিবার প্রভাত ৮টা ৪০ মিনিটের সময়―প্যারিস।

 শুক্রবার ৪ঠা অক্টোবর, প্রভাত ৬টা ৩৫ মিনিটের সময়—মণ্ট সিনেইএর পথে তুরীন নগরে আগমন।

 শুক্রবার প্রভাত ৭টা ২০ মিনিটের সময়—তুরীন পরিত্যাগ।

 শনিবার ৫ই অক্টোবর অপরাহ্ন ৪টার সময়—ব্রিন্দিসি।

 শনিবার অপরাহ্ন ৫টার সময়—মঙ্গোলিয়া জাহাজে যাত্রা।

 খাতার পৃষ্টায় মিঃ ফগ লিখিলেন—বুধবার ৯ অক্টোবর বেলা ১১টার সময় সুয়েজ বন্দরে আগমন। এ পর্য্যন্ত মোট ১৫৮ ১/২ ঘণ্টা অথবা ৬ ১/২ দিন লাগিয়াছে।