৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/প্রথম খণ্ড/ষোড়শ পরিচ্ছেদ
ষোড়শ পরিচ্ছেদ
দে দোল্—দে দোল্!
দিনের পরও রেঙ্গুন জাহাজে জিয়েনের সহিত গোয়েন্দার অনেকবার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। রকম-সকম দেখিয়া গোয়েন্দা আর তাহার নিকট হইতে সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা করিলেন না।
জিয়েন ভাবিতে লাগিল, ‘আমরাও যেখানে যাই, ফিক্সকেও সেই খানেই দেখিতে পাই। ব্যাপারখানা কি! মিঃ ফিক্স নিশ্চয়ই সংস্কারসমিতির প্রেরিত গুপ্তচর। মিঃ ফগ সত্য সত্যই দেশ ভ্রমণ করছেন কি না, তাই গোপনে দেখে যাচ্ছে।’
জিয়েনের বড় রাগ হইল। ফিলিয়াস্ ফগের ন্যায় সজ্জনের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গুপ্তচর প্রেরণ! সে মনে মনে বলিল, ‘ইহার জন্য সংস্কারসমিতির সঙ্গে বোঝা-পড়া করতে হ’বে।’ পাছে মিঃ ফগ দুঃখিত হন সেই জন্য সে তাঁহার নিকট কিছু প্রকাশ করিল না।
রেঙ্গুন তাহার নির্দ্দিষ্ট সময়ের ১২ ঘণ্টা পূর্ব্বেই সিঙ্গাপুরে নোঙ্গর করিয়া কয়লা তুলিতে লাগিল। মিঃ ফগ রাণী আউদাকে সঙ্গে লইয়া নগরভ্রমণে বাহির হইলেন।
গোয়েন্দাও তাঁহাদের পশ্চাদনুসরণ করিলেন। জিয়েন ইহা দেখিল, দেখিয়া হাসিল। বেলা ১১টার সময় সিঙ্গাপুর হইতে জাহাজ ছাড়িল। তখনো হংকং ১৩০০ মাইল দূর। এতদিন পর্য্যন্ত আকাশ বেশ ভালই ছিল। সহসা অল্প অল্প তুফান আরম্ভ হইল। জাহাজের কাপ্তান পাল টানিয়া দিলেন। রেঙ্গুন গুণমুক্ত সায়কের মত অগ্রসর হইতে লাগিল।
মধ্যে মধ্যেই ফিক্সের সহিত জিয়েনের সাক্ষাৎ হইত। একদিন কথোপকথন করিতে করিতে গোয়েন্দা কহিলেন,―
“হংকংএ পৌঁছিবার জন্য তোমরা বড় বেশী ব্যস্ত হয়েছ বলে বোধ হয়?”
“হাঁ, একটু হয়েছি বৈ কি।”
“মিঃ ফগ বুঝি সেখানে ইয়োকোহামার জাহাজ ধরবেন?”
“হাঁ। সেই জন্মই তিনি উদ্বিগ্ন হয়েছেন।”
“পৃথ্বী-ভ্রমণের এই ব্যাপারটা কি তুমি সত্য সত্যই বিশ্বাস কর?”
“করি বৈ কি। কেন, আপনি কি করেন না?”
“মোটেই না।”
“আপনি ত দেখছি বড় ধূর্ত্ত!”
জিয়েনের কথা শুনিয়া ফিক্স গোয়েন্দা একটু বিচলিত হইলেন। ভাবিলেন, ‘আমি যে গোয়েন্দা এ কথা কি তবে প্রকাশ হ’য়ে পড়েছে না কি?’
সে দিনের মত তিনি আর সাহস করিয়া অন্য কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলেন না।
জিয়েন ছাড়িবার পাত্র ছিল না। কথা প্রসঙ্গে অন্য একদিন সে নিজেই জিজ্ঞাসা করিল, “মিঃ ফিক্স, হংকং এর পর কি আর আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে না?”
কিছু বিব্রত হইয়া ফিক্স কহিলেন, “হাঁ―তা’ কি জান, এখনাই সে কথা ঠিক বল্তে পারা যায় না।” প্রত্যুত্তরে জিয়েন কহিল, “আপনি যদি বরাবর আমাদের সঙ্গে থাকেন তা’ হ’লে আমার বড় আনন্দ হ’বে। কোম্পানীর কর্ম্মচারীর পক্ষে কি অর্দ্ধপথেই থেমে যাওয়া ভাল দেখাবে? গোড়ায় বলেছিলেন, আপনি শুধু বোম্বাই পর্য্যন্তই আসবেন। এখন ত দেখছি প্রায় চীনে এসে পড়েছেন। আমেরিকা ত আর বেশী দূর নয়। আর আমেরিকা থেকে পা বাড়ালেই ত ইউরোপ!”
গোয়েন্দা তখন নিতান্ত বিব্রত হইয়া জিয়েনের দিকে তীব্র কটাক্ষ পাত করিলেন। জিয়েন কথাটী বলিয়া নিতান্ত সরলভাবে হাসিতে লাগিল। সে হাসিতে হাসিতে বলিল, “এ ব্যবসায়ে আপনার বেশ দু’ পয়সা থাকে। কেমন না?”
অবিচলিত ভাবে ফিক্স উত্তর করিলেন, “হাঁ, কখন-কখনো কিছু থাকেও, আবার থাকেও না। আমাদের কাজেরও একটা মরসুম আছে। মরসুমের সময় একরকম মন্দ চলে না। তবে আমার যাতায়াতের খরচ-পত্র কিছু নিজের লাগে না।” জিয়েন আর একটু হাসিয়া কহিল, “সেটা ত বেশ বোঝাই যাচ্ছে।”
মিঃ ফিক্স আর কোনো কথা না কহিয়া নিজের কামরায় প্রত্যাবর্ত্তন করিলেন। সহস্র চিন্তা তাঁহাকে আকুল করিয়া তুলিল।
ইতিপূর্ব্বেই অল্প অল্প তুফান আরম্ভ হইয়াছিল। এখন তাহা প্রবল-হইয়া উঠিল। প্রতিকূল বাতাসে রেঙ্গুনের গতি অপেক্ষাকৃত শিথিল হইয়া পড়িল। মিঃ ফগ সেই চঞ্চল জলরাশির দিকে চাহিয়া দেখিলেন, কিন্তু তাঁহার বদনে চিন্তার রেখা মাত্র লক্ষিত হইল না। জিয়েন অত্যন্ত অস্থির হইয়া উঠিল। যদি তাহার ক্ষমতা থাকিত, তাহা হইলে সে পবনদেবকে তীব্র কষাঘাত করিতে ছাড়িত না। সে রেঙ্গুন জাহাজের নাবিকদিগকে যথাশক্তি সাহায্য করিতে লাগিল। তাহার কর্ম্মপটুতা দেখিয়া সকলে বিস্মিত হইয়া গেল।
দে দোল্—দে দোল্! প্রবল তরঙ্গের আঘাতে রেঙ্গুন দুলিয়া দুলিয়া কাঁপিতে লাগিল। মিঃ ফিক্স মনে মনে অত্যন্ত প্রীত হইলেন। তিনি পবনদেবকে ডাকিয়া বলিতে লাগিলেন, ঝড় যেন থামে না। তিনি জানিতেন, আর দুই একদিন এইরূপ চলিলেই রেঙ্গুন সময় মত হংকংএ পৌঁছিতে পারিবে না—ইয়োকোহামার জাহাজ ছাড়িয়া চলিয়া যাইবে! জিয়েন যখন একান্ত উদ্বিগ্ন হইয়া তাহাদের বিপদের কথা মিঃ ফিক্সকে জানাইল, তথন তিনি মৃদু মৃদু হাস্য করিয়া সমবেদনা জ্ঞাপন করিলেন!
ঝড় অবশেষে থামিল বটে, কিন্তু রেঙ্গুনপোত নির্দ্দিষ্ট সময়ের ২৪ ঘণ্টা পর যাইয়া বন্দরে পৌঁছিল! ইয়োকোহামার জাহাজ বুঝি ছাড়িয়া গিয়াছে। তবে উপায়? জিয়েন বড় অধীর হইল। কি দুঃসংবাদ না জানি শুনিতে হইবে, এই শঙ্কায় সে বন্দরের আড়কাঠিকে কিছু জিজ্ঞাসা করিতে সাহস পাইল না। রাণী আউদা মিঃ ফগের বিপদে অত্যন্ত দুঃখিতা হইলেন। কিন্তু মিঃ ফগ যেন পাষাণ-গঠিত। তিনি একান্ত নিরুদ্বেগে কঠিলেন, “কোন চিন্তা নাই।” আড়কাঠিকে জাহাজের উপর দেখিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “ইয়োকোহামার জাহাজ কি চলে গেছে?”
“না—যায় নাই। জাহাজের বয়লার খারাপ ছিল বলে যেতে পারে নাই।”
“কখন্ যাবে?”
“কাল সকালে জোয়ার এলেই ছাড়বে।”
“জাহাজের নাম কি?”
“কর্ণাটিক।”
“ধন্যবাদ”
আড়কাঠি বিদায় হইতেছিল, জিয়েন আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া তাহার কর মর্দ্দন করিয়া কহিল, “আপনি অতি ভাল মানুষ―আপনাকে ধন্যবাদ।” জিয়েনের ইচ্ছা হইতেছিল সে আড়কাঠিকে বুকে জড়াইয়া ধরে। অকস্মাৎ একজন অপরিচিত লোকের নিকট এইরূপে প্রশংসিত হইবার কোন কারণ বুঝিতে না পারিয়া আড়কাঠি বিস্মিত হইল এবং কারণ অনুসন্ধানের জন্য অপেক্ষা না করিরা শিশ্ দিতে দিতে জাহাজ হইতে নৌকায় অবতরণ করিল। বেলা ১টার সময় রেঙ্গুন-পোত জেটীতে আসিয়া লাগিল।
এবার মিঃ ফগের শুভাদৃষ্ট তাঁহাকে রক্ষা করিল। তিনি যদি কর্ণাটিক জাহাজ ধরিতে না পারিতেন তাহা হইলে পরবর্ত্তী পোতের জন্য তাঁহাকে ৮ দিন অপেক্ষা করিতে হইত! মিঃ ফগ দেখিলেন তাঁহার ২৪ ঘণ্টা বিলম্ব হইয়াছে, কিন্তু সে জন্য বিশেষ কোন ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল না। যে জাহাজ ইয়োকোহামা হইতে সান্ ফ্রান্সিস্কো যাতায়াত করিত, হংকংএর জাহাজ না পৌঁছিলে তাহার ছাড়িবার নিয়ম ছিল না। যদিও এই ৩৫ দিনে তিনি ২৪ ঘণ্টা পিছাইয়া পড়িলেন বটে, কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগর পার হইতেই সেটুকু সারিয়া লইবার ভরসা করিলেন।
জাাজ জেটীতে লাগিবামাত্রই তিনি রাণী আউদাকে লইয়া হংকংএর একটী পান্থনিবাসে গমন করিলেন এবং তথায় জিয়েনকে তাঁহার পরিচর্য্যায় নিযুক্ত করিয়া স্বরং সার জেম্সেট্জি জিজিভয়ের ভাগিনেয়ের অনুসন্ধানে বহির্গত হইলেন।
আউদার দুরদৃষ্ট! তাঁহার দেখা মিলিল না। তিনি তখন হংকংএ থাকিতেন না। দিনেমার বণিক্দিগের সহিত তাঁহার কারবার অধিক ছিল বলিয়া, দুইবৎসর পূর্ব্বেই চীন হইতে হলাণ্ডে প্রস্থান করিয়াছিলেন। সেইখানেই থাকিতেন।
সংবাদ শুনিয়া রাণী আউদার বাক্যস্ফুর্ত্তি হইল না। তিনি কপোলদেশে হস্ত বিন্যস্ত করিয়া চিন্তামগ্ন হইলেন। তাঁহার বদনমণ্ডল পাণ্ডুর হইয়া উঠিল। অবশেষে ধীরে ধীরে কম্পিতকণ্ঠে কহিলেন, “মিঃ ফগ, এখন আমার উপায়!”
“চলুন ইউরোপে যাওয়া যাক্।”
“আপনার ঘাড়ের উপর একটা ভারি বোঝার মত আমি আর কত দিন থাক্বো।”
“কিছু না―কিছু না! জিয়েন―!”
“আজ্ঞা।”
“কর্ণাটিক জাহাজে যেয়ে তিনখানা টিকেট কিনে রাখ।”
জিয়েন অবিলম্বে প্রস্থান করিল।