৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ/প্রথম খণ্ড/সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
গোয়েন্দার কাণ্ড
কং একটী দ্বীপমাত্র। ১৮৯৩ সালে ন্যান্কিনের সন্ধিসূত্রে হংকং ইংরাজের অধিকারে আসিয়াছিল। ইংরাজের ঔপনিবেশিক স্পৃহা অল্পকাল মধ্যেই হংকংকে একটী ইউরোপীয় নগরে পরিবর্ত্তিত করিয়া দিল। ক্যাণ্টন নদীর মুখেই দ্বীপটী অবস্থিত। চৈনিক বাণিজ্যের অধিকাংশ পণ্য সম্ভারই এই পথে যাতায়াত করিত। তাই অল্প সময়েই হংকং বন্দর একটা শ্রেষ্ঠ বন্দররূপে প্রতিষ্ঠালাভ করিল। দেখতে দেখিতে জেটী, চিকিৎসালয়, মালগুদাম, গির্জ্জা, কর্ম্মশালা প্রভৃতি হংকংএর সৌন্দর্য্য বাড়াইয়া তুলিল। প্রশস্ত রাজপথগুলি নগরের গৌরবস্বরূপ শোভা পাইতে লাগিল।
জিয়েন পান্থশালা হইতে বিদায় হইয়া তাহার কোটের দুই পকেটে দুই হস্ত দিয়া নগর সন্দর্শন করিতে করিতে অগ্রসর হইল। ক্যাণ্টন নদীর মুখে ভিক্টোরিয়া বন্দরে নানাদেশের বিশালকায় অর্ণবপোত সকল ভাসিতেছিল। রাণিজ্যপোত, রণতরী, ধীবরদিগের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরণী, সেম্পা, তঙ্কা প্রভৃতি কত প্রকারের জলযান বন্দরে অপেক্ষা করিতেছিল। কুসুমসজ্জিত তরণী পর্য্যন্ত সেই নদীর মুখে ভাসমান উদ্যানের ন্যায় শোভা পাইতেছিল।
যে বন্দর হইতে কর্ণাটিক পোত ছাড়িবার কথা ছিল জিয়েন তথায় যাইয়া উপনীত হইল। দেখিল, ফিক্স গোয়েন্দা চিন্তাকুলচিত্তে জেটীর উপর ভ্রমণ করিতেছেন। জিয়েন হাস্য করিয়া আপন মনে বলিল, “সংস্কারসমিতির পক্ষে এটা শোভা পায় না!”
তখনো বিলাতের পরোয়ানা আসিয়া পৌঁছিয়াছিল না। নিকট ভবিষ্যতে উহা আসিবার সম্ভাবনাও ছিল না। হংকংএ দস্যু ধৃত না হইলে তাহাকে ধরিবারও আর সুযোগ ছিল না। সুতরাং গোয়েন্দার হৃদয়মধ্যে যে কি ভীষণ চিন্তাতরঙ্গ উদ্বেলিত হইতেছিল, কি বিষম অস্থিরতা যে তাঁহাকে ব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিল, তাহা সহজেই অনুমেয়। জিয়েন সে দিকে লক্ষ্য না করিয়া হাসিয়া কহিল, “কি মিঃ ফিক্স, আপনিও কি তবে আমাদের সঙ্গেই আমেরিকা যাচ্ছেন?”
দন্তে দন্তে ঘর্ষণ করিয়া ফিক্স কহিলেন,—
“হাঁ যাচ্ছি বৈ কি।”
উচ্চ হাস্য করিয়া জিয়েন বলিল, “তা’ বেশ ত আসুন না। আমি ত আগেই জানি, আপনি আমাদের ছাড়তে পারবেন না! আসুন―আসুন টিকেট কেনা যাক্।”
উভয়ে তখন টিকেটঘরে গিয়া ৪ খানি টিকেট লইল। কেরাণী জানাইলেন, জাহাজের আবশ্যক সংস্কার শেষ হইয়াছে। প্রভাতে জাহাজ ছাড়িবার কথা ছিল বটে, কিন্তু সে সময় পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। জাহাজ সেই সন্ধ্যাকালেই ছাড়া হইবে।
“বেশ তা’তে আর অসুবিধা কি, যাই―মনির ম’শায়কে খবর দিগে,” এই বলিয়া জিয়েন অগ্রসর হইল। মিঃ ফিক্স দেখিলেন, ‘হয় এখনই—না হয় এ জীবনে আর নহে।’ তিনি একটী দুঃসাহসিক পন্থা অবলম্বন করিলেন। রাজপথে বাহির হইয়া জাহাজ ঘাটের নিকটে একটী দোকান দেখিয়া তিনি কহিলেন, “এস জিয়েন, কিছু জলযোগ করা যাক।” জিয়েনের তাহাতে বিশেষ আপত্তি ছিল না। উভয়ে দোকানে প্রবেশ করিলেন।
দোকানটী বেশ বড়। তাহার একটা সুসজ্জিত বৃহৎ কক্ষের একপার্শ্বে একটা সুবিস্তৃত শয্যা রচিত ছিল। জিয়েন দেখিল কতকগুলি লোক সেই শয্যার উপর নিদ্রামগ্ন। প্রায় ৩০ জন লোক ছোট ছোট টেবিলের চতুর্দ্দিকে বসিয়া কেহ বিয়র, কেহ বা পোর্টার, কেহ বা ব্র্যাণ্ডি, কেহ বা অন্যপ্রকার সুরা পান করিতে করিতে গল্প করিতেছিল। অনেকে আবার রক্তাভ মৃত্তিকার সুদীর্ঘ নলে গোলাপজলে সিক্ত অহিফেনের ধূমপানে ব্যস্ত ছিল। যাহারা অহিফেন-ধূমপানে হতজ্ঞান হইয়া টেবিলের নিম্নে পতিত হইতেছিল, পরিচারকগণ তাহাদিগকে সযত্নে তুলিয়া সেই সুবিস্তৃত শয্যার উপর রক্ষা করিতেছিল।
মিঃ ফিক্স অবস্থা দেখিয়াই বুঝিলেন যে তাঁহারা চীন দেশের একটী গুলির আড্ডায় আসিয়াছেন। নরসমাজে যত প্রকার কদভ্যাস বর্ত্তমান আছে, তন্মধ্যে অহিফেন-সেবনই সর্ব্বাপেক্ষা অনিষ্টকারী। আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, তখন এই বদভ্যাস চীনের রাজপ্রাসাদ হইতে দরিদ্রের পর্ণকুটীরে পর্য্যন্ত বিস্তার লাভ করিয়া একটী সমগ্র জাতিকে দুর্ব্বল ও অকর্ম্মণ্য করিয়া তুলিয়াছিল! এমন কি রমণীরা পর্য্যন্ত ইহার কবল হইতে মুক্তি পাইয়াছিল না!
মিঃ ফিক্সের আদেশে দুই বোতল পোর্ট সুরা আসিল। তাঁহারা পান করিতে লাগিলেন। ধীরে ধীরে বোতল নিঃশেষিত হইতে লাগিল, ধীরে ধীরে গল্পের স্রোত চলিতে লাগিল। জিয়েনের হঠাৎ মনে হইল কর্ণাটিক জাহাজ ছাড়িবার সময় পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। সে উঠিল। কহিল―
“জাহাজ সন্ধ্যার সময় ছাড়বে। মনির মশায়কে খবর দিতে হবে। আমি উঠি।”
তাহাকে বাধা দিয়া গোয়েন্দা কহিলেন, “আহা আর একটু বসো না। এত তাড়াতাড়ি কি― এখনো ঢের সময় আছে।”
“কেন? কিছু দরকার আছে কি?”
“তোমার সঙ্গে একটা গুরুতর কথা আছে।”
“গুরুতর কথা! কি কথা? আজ ত সময় নাই, কাল শুনলেই চল্বে। আপনিও ত কর্ণাটিকেই যাবেন।”
“কাল শুনলে চল্বে না—আজই শুনতে হবে। আর একটু বসো! কথাটা তোমার মনিবের সম্বন্ধেই।”
জিয়েন তীব্র দৃষ্টিতে গোয়েন্দার মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, “আমার প্রভুর সম্বন্ধেই! কি কথা—”
সে পুনরায় একখানি চেয়ারে উপবিষ্ট হইল। আবার মদ্য আসিল। আবার উভয়ে পান করিলেন। মিঃ ফিক্স জিয়েনের বাহুমূল স্পর্শ করিয়া অনুচ্চস্বরে কহিলেন,—
“আমি যে কে তা’ বোধ হয় তুমি বুঝতে পেরেছ?”
“কতকটা পেরেছি বৈকি।”
“তবে আর কি। এখন আমি সব কথাই তোমাকে খুলে বল্তে পারি।”
“আমি যখন আপনাকে চিনে ফেলেছি, তখন আর বলতে বাধা কি—বলে ফেলুন। কিন্তু আমি আগেই জানিয়ে রাখি তাঁরা আপনাকে পাঠিয়ে মিছামিছি কেবল হয়রাণ করছেন।”
“এতেই বেশ বোঝা যাচ্ছে, টাকাটা যে কত, সে খোঁজ তুমি রাখ না।”
“রাখি না! রাখি বৈ কি। তিন লক্ষ টাকা।”
ফরাসীর বাহু সজোরে ঝাঁকাইয়া দিয়া মিঃ ফিক্স কহিলেন, “তিন লক্ষ কি হে! সাড়ে আট লক্ষ!”
“কি বল্লেন—সাড়ে আট লক্ষ! তবে কি মিঃ ফগ সাড়ে আট লক্ষ টাকার বাজী ধরেছেন! তা’ হ’লে দেখছি এখানে সময় নষ্ট করা আমার নিতান্তই অন্যায় হচ্ছে।”
জিয়েন পুনরায় উঠিয়া দাঁড়াইল। মিঃ ফিক্স তাহাকে টানিয়া বসাইয়া বলিতে লাগিলেন,—
“বুঝেছ—৩।৪ লাখ নয়—সাড়ে আট লাখ! এই যে ব্রাণ্ডি আছে—আর একটু খাও না।”
জিয়েন পুনরায় পান করিল। গোয়েন্দা কহিলেন—
“সাড়ে আট লক্ষ—বুঝেছ ত! আমি যদি সফলকাম হই তা’লে আমি ত্রিশ হাজার পাব। তুমি যদি আমাকে সাহায্য কর, তাহলে তোমাকেও তিন হাজার দিব।”
“আপনাকে সাহায্য করবো!” গোয়েন্দার দিকে উন্মত্তের ন্যায় চাহিয়া উচ্চস্বরে জিয়েন কহিল, “আপনাকে সাহায্য করবো!”
“হাঁ আমাকেই সাহায্য করবে। যাতে মিঃ ফগের এখানে কয়েক ঘণ্টা বিলম্ব হয় তাই করতে হ’বে!
“আপনি বলেন কি মশায়? আমার প্রভুর পশ্চাতে গোয়েন্দা পাঠিয়েও কি তাঁদের তৃপ্তি হয় নি! এখন আবার তাঁরা প্রভুর যাত্রাপথটীও বিঘ্নসঙ্কুল করে’ দিতে চান? ছি ছি! ধিক্ তাঁদের!
“তোমার কথা ত আমি বুঝতে পারছিনে।”
“এর চেয়ে ছোট নজর আর নাই। তাঁরা ত দেখছি তা’ হ’লে রাহাজানি করে’ মিঃ ফগের পকেট মারতেও পারেন!”
“আমরা ত ঠিক তাই-ই করতে চাই!”
অগ্নিতুল্য ব্রাণ্ডি ক্রমেই জিয়েনকে উত্তেজিত করিতেছিল। সে কহিল, “তা হ’লে ত দেখছি এ একটা ভয়ানক ষড়যন্ত্র! কেমন তাই নয় কি? নিশ্চয়ই তাই! তাঁরাই আবার বন্ধু বলে’―ভদ্রলোক বলে’ পরিচয় দেন!
ফিক্স বড় গোলমালে পড়িলেন। জিয়েন বলিতে লাগিল, “এঁরাই বন্ধু! এঁরাই আবার সংস্কার-সমিতির সদস্য! মিঃ ফিক্স আপনি কি জানেন না যে আমার প্রভু অতি সাধু সদাশয় মহৎ লোক। তিনি যে বাজী ধরেছেন, সদুপায়েই তা’ জিতে নেবেন।”
জিয়েনের দিকে এক দৃষ্টে চাহিয়া মিঃ ফিক্স কহিলেন, “আমি যে কে তা’ কি তুমি কিছু বুঝতে পেরেছ?”
“আপনি আর কে! সংস্কার-সমিতির একজন গোয়েন্দা! আমার মনিবকে পদে পদে বাধা দিতেই এতদূর পর্য্যন্ত এসেছেন। আমি ত অনেক দিনই আপনাকে চিনেছি, কিন্তু মনে দুঃখ পাবেন বলে মিঃ ফগের কাছে এ কথা ভাঙ্গি নাই।”
ফিক্স তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিলেন, “তা’ হলে তিনি এর বিন্দুবিসর্গও জানেন না?”
ব্রাণ্ডির গ্লাসটা এক নিশ্বাসে শেষ করিয়া জিয়েন কহিল, “কিছু মাত্র না।”
গোয়েন্দা ফিক্স দুই হস্তে চক্ষুর্দ্বয় আবৃত করিয়া ক্ষণিকের জন্য আপন কর্ত্তব্য চিন্তা করিলেন। তিনি দেখিলেন, জিয়েন নিতান্ত সরল। সে নিশ্চয়ই ব্যাঙ্ক-দস্যুতায় মিঃ ফগের সহযোগী ছিল না। গোয়েন্দ ভাবিল যদি তাই হয়, তা’ হ’লে অবশ্যই সে আমাকে সাহায্য করবে। অধিকক্ষণ চিন্তা করিবার সময়ও আর তখন ছিল না। যেমন করিয়া হউক মিঃ ফগকে হংকংএ ধরিয়া রাখাই তখন একান্ত প্রয়োজন হইয়াছিল। তিনি কহিলেন, “শোন—তুমি যা’ ভাবছ, আমি তা’ নই।”
বিস্মিত হইয়া জিয়েন কহিল, “সে কি!”
“লণ্ডন পুলিশের বড় কর্ত্তা আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি একজন গোয়েন্দা পুলিশ!”
“আপনি গোয়েন্দা পুলিশ!”
“বিশ্বাস হচ্ছে না? এই তার প্রমাণ দেখ।” ফিক্স মুহূর্ত্ত মধ্যে তাঁহার নিয়োগ-পত্র প্রভৃতি বাহির করিয়া সেই কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় নিরুদ্ধবাক্ ফরাসীর সম্মুখে ধরিয়া বলিতে লাগিলেন, “বাজী ধরার একটা মিথ্যা-কাহিনী রচনা করে মিঃ ফগ তোমাকেও ঠকিয়েছেন, আর সংস্কার-সমিতির সদস্যদেরও ফাঁকি দিয়েছেন! তুমি যাতে কিছু বুঝতে না পেরে তাঁর সহায়তা কর, এটাও তাঁর একটী মতলবের মধ্যে।”
“কেন? তাঁর লাভ কি?”
“লাভ?―এই দেখ না, গত ২৮শে সেপ্টেম্বর ইংলণ্ডের ব্যাঙ্ক থেকে সাড়ে আট লক্ষ টাকা চুরি যায়। সৌভাগ্যক্রমে দস্যুর মুর্ত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। মিঃ ফগের সঙ্গে সে মূর্ত্তির ঠিক মিল আছে!”
হস্তদ্বারা টেবিলে সজোরে আঘাত করিয়া জিয়েন কহিল, “এ হ’তেই পারে না―এ কথা একেবারে অসম্ভব! আমার মনিবের মত একজন সজ্জন পৃথিবীতে দুর্লভ।”
“তুমি তার কি জানবে! যেদিন মিঃ ফগ এই একটা পাগলামীর খেয়াল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, তুমি ত সবে সেই দিনই তাঁর কর্ম্মে নিযুক্ত হয়েছিলে। মনে করে’ দেখ দেখি সে দিন তাঁর সঙ্গে কি ছিল। কোন জিনিষ-পত্র ছিল কি? কেবল ছিল একটা কার্পেটব্যাগ আর তার মধ্যে কতকগুলো ব্যাঙ্ক নোট! এখনো কি তুমি বলতে চাও যে তিনি একজন সাধু পুরুষ?”
যন্ত্রচালিতবৎ জিয়েন কহিল, “হাঁ হাঁ, তার পর!”
“দস্যুর সহযোগী বলে’ তুমিও কি গ্রেপ্তার হ’তে চাও?”
জিয়েন উভয় হস্তে আপন মস্তক চাপিয়া ধরিল, সমস্ত পৃথিবী যেন তাহার সম্মুখে ঘুরিতে লাগিল। তাহার বাক্য-স্ফুর্তি হইল না। সে ফিক্স গোয়েন্দার দিকে চাহিতে পর্য্যন্ত পারিল না। ভাবিতে লাগিল, ‘কি অসম্ভব কথা! ফিলিয়াস্ ফগ একজন দস্যু! সেই অকুতোভয় মহৎ ব্যক্তি―রাণী আউদার সেই বীর রক্ষাকর্ত্তাও একজন চোর! না―না―অসম্ভব। কিন্তু বাহ্য অবস্থা যে সমস্তই তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ দিচ্ছে! তা দিক, এ কথা অবিশ্বাস্য—ইহা একান্ত অসম্ভব! জিয়েন ইহা বিশ্বাস করিতে পারিল না। সে অর্দ্ধাবরুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, “আপনি আমাকে কি করতে বলেন?”
“আমি এতদূর পর্য্যন্ত মিঃ ফগের অনুসরণ করেছি। লণ্ডন থেকে আমি যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছি, আজও সেখানা হস্তগত হয় নাই। যাতে মিঃ ফগ হংকং থেকে যেতে না পারেন, তোমাকে তাই করতে হবে।”
“কিন্তু আমি—”
বাধা দিয়া ফিক্স কহিলেন, “যদি পার, ব্যাঙ্কের প্রতিশ্রুত পুরস্কারের অর্দ্ধেক তোমার।”
“কখনো না। আমাকে দিয়ে এ কাজ হবে না।” জিয়েন উন্মত্তের ন্যায় উঠিতে চেষ্টা করিল কিন্তু পারিল না। বিবশ হইয়া পুনরায় চেয়ারে বসিয়া পড়িল! “মিঃ ফিক্স!” সে বিজড়িত কণ্ঠে কহিল, “মিঃ ফিক্স! আপনার কথা যদি সত্যও হয়—আপনি যে দস্যুর সন্ধানে ফিরছেন, মিঃ ফগই যদি সে দস্যু হ’ন―আপনার কথা হাজার বার সত্য হ’লেও আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না। আমি এখনো বলছি, তিনি নির্দ্দোষ—তিনি সাধু―তিনি মহৎ। আমি আজও তাঁর নূন খাচ্ছি, বিশ্বাসহন্তা হ’তে পারব না।”
“তা’ হ’লে তুমি অসম্মত?”
“নিশ্চয়ই অসম্মত।”
“বেশ ভাল। তা হ’লে আমাদের মধ্যে যে সব কথাবার্তা হ’ল, সে সব ভুলে যাও। এস, তার চিহ্নস্বরূপ আর এক গ্লাস করে’ খাওয়া থাক।”
সুরা তখন জিয়েনকে বিবশ করিয়াছিল। ফিক্স স্থির করিলেন যে উপায়েই হউক ভৃত্যকে আর প্রভুর নিকটে যাইতে দেওয়া হইবে না। টেবিলের উপরেই অহিফেনপূর্ণ সেই রক্তাভ নলগুলি পড়িয়াছিল! মিঃ ফিক্স কিন্তু তাহারই একটা তুলিয়া লইয়া জিয়েনের হস্তে দিলেন। সুরাপ্রমত্ত্ব জিয়েন কয়েকবার নলে টান দিবামাত্রই অচেতন হইয়া কক্ষতলে পতিত হইল। মিঃ ফিক্স সেই হতচেতন জিয়েনের মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন “যা’ হ’ক এত দিনে পেয়েছি! কর্ণাটিক জাহাজ ছাড়ার সময় যে বদল হয়েছে সে কথা আর মিঃ ফগ জানতে পাচ্ছে না!”