‘পার্টিসন’-প্রহেলিকা
⚞⚟ ⚞⚟ ⚞⚟ ⚞⚟ ⚞⚟ ⚞⚟
‘পার্টিসন’-প্রহেলিকা
(‘বঙ্গবাসী’ হইতে পুনর্ম্মুদ্রিত)।
কলিকাতা।
৩/৪ নং গৌরমোহন মুখার্জির ষ্ট্রীট্
মেট্কাফ্ প্রেসে মুদ্রিত
২০১ নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট
বেঙ্গল মেডিকেল লাইব্রেরী হইতে
প্রকাশিত।
⚞⚟ ⚞⚟ ⚞⚟ ⚞⚟ ⚞⚟ ⚞⚟
মূল্য দুই আনা মাত্র।
‘পার্টিসন’-প্রহেলিকা।
পার্টিসন হয় নাই কি?
আমরা বলিতেছি, বঙ্গের পার্টিসন (বিভাগ) হইয়াছে; রাজপুরুষেরা বলিতেছেন, হয় নাই। ঢাকার বক্তৃতায় লর্ড কর্জ্জন বলিয়াছিলেন—‘The subject, however, that is chiefly filling your minds is evidently that of the so called partition of Bengal, although that is not exactly the phrase that I should employ.’। অর্থাৎ বঙ্গ সম্বন্ধে লর্ড কর্জ্জন যাহা করিবার প্রস্তাব করিয়াছিলেন, তাহাকে পার্টিসন বলিলে তাঁহার মতে ঠিক কথা বলা হয় না। কেন ঠিক কথা বলা হয় না, তিনি বুঝাইয়া দেন নাই। বঙ্গবিভাগের পর সে দিন বিলাতের এক সভায় বঙ্গের বিভাগ সম্বন্ধে আলোচনা হইয়াছিল। সেই সভার সভাপতি ভারতের ভূতপূর্ব্ব ইষ্টেট সেক্রেটরী লর্ড জর্জ হামিল্টন বলিয়াছিলেন যে বঙ্গ সম্বন্ধে যাহা করা হইয়াছে তাহাকে পার্টিসন শব্দে অভিহিত করিলে লোককে ভুল বুঝান হয়, কারণ বঙ্গের পার্টিসন করা হয় নাই, বঙ্গে কেবল একপ্রস্ত কর্ম্মচারীর পরিবর্ত্তে দুইপ্রস্ত কর্ম্মচারীর ব্যবস্থা করা হইয়াছে। পার্টিসন শব্দ কেন ঠিক নয়, লর্ড কর্জ্জন তাহা বুঝান নাই, কিন্তু লর্ড জর্জ হামিল্টন বুঝাইয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন যে পোলাণ্ড দেশকে তিন ভাগ করিয়া ঐ তিনটীভাগ যেমন তিনটী ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের সহিত সংযুক্ত করিয়া দেওয়া হইয়াছিল, বঙ্গ সম্বন্ধে যখন তেমন কিছু করা হয় নাই, তখন বঙ্গের নূতন ব্যবস্থাকে বঙ্গের পার্টিসন বলা যাইতে পারে না। কিন্তু পোলাণ্ডের যে প্রণালীর পার্টিসন হইয়াছিল যে বিভাগ ঠিক সে প্রণালীর নয় তাহাকে পার্টিসন বলিলে কেন ভুল হয় রাজপুরুষেরা অনুগ্রহ করিয়া তাহা বুঝাইয়া দিবেন কি? যাদব ও মাধব দুই সহোদর একান্নে একত্র বাস করে। দুই ভায়েরই স্ত্রী পুত্ত্র কন্যা পুত্রবধূ পৌত্র পৌত্রী আছে। জ্যেষ্ঠ বলিয়া যাদব এই বৃহৎ পরিবারের কর্ত্তা—সমস্ত পরিবার তাঁহার কর্ত্তৃত্বাধীন। দাস দাসী তিনিই নিযুক্ত করেন, আবশ্যক হইলে তিনিই বরখাস্ত করেন। সংসারের একটী মাত্র তহবিল—তাঁহারই হাতে থাকে। খরচপত্রের ব্যবস্থা তিনিই করেন। ক্রমে পরিবার আরো বড় হইল, এক বাড়ীতে আর ধরে না, বৃদ্ধ যাদব ও অত বড় পরিবারের অধ্যক্ষতায় অসমর্থ হইয়া পড়িলেন। তখন দুই ভাই সংসার ও সম্পত্তি বিভক্ত করা বিহিত বিবেচনা করিলেন। দুইটী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বিভাগ করিয়া দিলেন। বাগান পুষ্করিণী চিহ্নিত করিয়া দেওয়া হইল, জমিজিরাতের সীমা নির্দ্দিষ্ট হইল, কোথাও দেওয়াল উঠিল, কোথাও পর্দ্দা পড়িল, কোথাও পিল্পে বসিল। এক ভাই পৈতৃক বাড়ী পাইলেন, আর এক ভাই বাড়ী নির্ম্মাণ করিয়া লইবার জন্য টাকা পাইলেন। তখন একটী বাড়ীর পরিবর্ত্তে দুইটী বাড়ী হইল, একজন কর্ত্তার পরিবর্ত্তে দুইজন কর্ত্তা হইল, একটী তহবিলের পরিবর্ত্তে দুইটী তহবিল হইল, এক প্রস্ত দাসদাসী কর্ম্মচারীর পরিবর্ত্তে দুই প্রস্ত দাসদাসী কর্ম্মচারী হইল—ইত্যাদি ইত্যাদি। ইহাকে চলিত কথাতেও পার্টিসন বলে, আইন আদালতের ভাষাতেও পার্টিসন বলে। বঙ্গ সম্বন্ধে ঠিক সেই রূপই করা হইয়াছে— সীমাসর্হদ্দ নির্দ্দিষ্ট করিয়া উহাকে দুইভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে, দুইভাগের দুইজন কর্ত্তা বা ছোট লাট হইয়াছেন, দুইভাগের কর্ম্মচারী প্রভৃতি দুইভাগের ছোটলাট স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ভাবে নিযুক্ত করিতেছেন, দুইভাগের দুইটী স্বতন্ত্র তহবিল হইয়াছে, দুইভাগের খরচপত্র স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ভাবে করা হইতেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে বঙ্গের সম্বন্ধে যাহা করা হইল তাহাকে বঙ্গের পার্টিসন বলিব না কেন, বলিলে দোষইবা হইবে কেন, ভুল কথাই বা বলা হইবে কেন—রাজপুরুষেরা অনুগ্রহ করিয়া এই প্রশ্নের উত্তর দিবেন কি? আর বঙ্গ সম্বন্ধে তাঁহারা যাহা করিলেন তাহাকে পার্টিসন বলিতে তাঁহারা কি জন্য এত অনিচ্ছুক তাহাও বলিয়া বাধিত করিবেন কি?
পার্টিসনের প্রয়োজনীয়তা।
পার্টিসন হইয়া গেল; গবর্ণমেণ্ট তৎসম্বন্ধে কত কথাই কহিলেন; তথাপি কিন্তু উহার প্রয়োজনীয়তা বুঝা গেল না। কেন বুঝা গেল না, সংক্ষেপে বলিতেছি।
(১) গবর্ণমেণ্ট বলেন যে বঙ্গবিহার এবং উড়িষ্যার লোক সংখ্যা এত অধিক যে একজন শাসনকর্ত্তা দ্বারা উহাদের শাসনকার্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন হইতে পারে না। আমরা কিন্তু এইরূপ বুঝি যে লোক সংখা ধরিয়া প্রধান শাসনকর্ত্তাদের কার্য্যের পরিমাণের হ্রাস বৃদ্ধি হওয়া বড় একটা সম্ভব নয়, হ্রাস বৃদ্ধি হয় কেবল গবর্ণমেণ্টের কয়েকটী বিভাগের, প্রধানতঃ পোষ্ট আপিসের এবং পুলিসের কার্য্যের। কারণ, পোষ্ট আপিসকে বাড়ী বাড়ী চিঠি বিলি করিতে হয় আর পুলীসকে প্রায় প্রত্যেক লোকের উপর নজর রাখিতে হয়। কিন্তু ডাকে চিঠির সংখ্যা বাড়িলে প্রধান শাসনকর্ত্তার কাজ বাড়ে না, বাড়ে কেবল ডাক হরকরাদের এবং ডাক বিভাগের কর্ত্তা, কেরানী ও ইনস্পেক্টরদের কাজ। আবার ডাক বিভাগটা ভারত গবর্ণমেণ্টের অধীন বলিয়া উহার জন্য বঙ্গেশ্বরকে বেশী ঝঞ্ঝাট পোহাইতে হয়ই না। তাহার পর পুলীসের কথা। লোক সংখ্যা বাড়িলে প্রহরার কাজ বাড়ে বটে। কিন্তু সেজন্য প্রধান শাসনকর্ত্তার কাজ বাড়ে না, কাজ বাড়ে পুলীসের লোকেদের। কিন্তু তজ্জন্য আর কিছুই করিতে হয় না, কেবল থানা, কনষ্টেবল, দারোগা, ইনস্পেক্টর, কেরাণীর সংখ্যা বাড়িলেই হয়। এ সকল বন্দোবস্ত করিবার জন্য উপযুক্ত লোক পুলীস বিভাগে চিরকালই আছে এবং এবারকার পুলীস সংস্কারে আরো বাড়িয়াছে। সুতরাং লোক সংখ্যা বাড়িলে পুলীস বিভাগের জন্য প্রধান শাসনকর্ত্তার ঝঞ্ঝাট বাড়িবার কথা নয়। তাহার পর আদালতের কথা। লোকসংখ্যা বাড়িলে সকল প্রকার মোকদ্দমা বাড়ে বটে। কিন্তু সেজন্যও প্রধানশাসনকর্ত্তার কাজ বাড়ে না বলিলেই হয়, বাড়ে কেবল বিচারক এবং আদালতের সংখ্যা। কিন্তু সে সব বন্দোবস্ত হাইকোর্টই প্রধানতঃ করেন। ইহাও স্বীকার করি যে লোকসংখ্যা বাড়িলে ছাত্র সংখ্যা বাড়ে, সুতরাং ইস্কুলের সংখ্যার বৃদ্ধি বশতঃ শিক্ষাবিভাগের কাজ ও বাড়ে। কিন্তু সেজন্য প্রধান শাসনকর্ত্তার ঝঞ্ঝাট বাড়ে না। কারণ শিক্ষা বিভাগের অধিকাংশ কাজ অতি সহজ আর কর্ম্মচারীর সংখ্যাও কম নয়। এইরূপ, গবর্ণমেণ্টের সমস্ত বিভাগের গঠন প্রণালীর প্রতি দৃষ্টি করিলে বুঝা যায় যে লোকসংখ্যার বৃদ্ধি বা আধিক্য বশতঃ মোটের উপর প্রধান শাসনকর্ত্তার ঝঞ্ঝাট বাড়িবার কথা নয়, এবং যদি কিছু ঝঞ্ঝাট বাড়ে, তজ্জন্য পার্টিসনের প্রয়োজন হয় না, যোগ্যতম ব্যক্তিদিগকে সেক্রেটরী নিযুক্ত করিলে এবং সেক্রেটরীর সংখ্যা কিছু বাড়াইলেই যথেষ্ট হয়। ফলকথা, ভারতে বৃটিশ শাসনপ্রণালী লোকসংখ্যামূলক প্রণালী নয়। যাহাকে patriarchal government বলে তাহাতেই লোকসংখ্যার প্রতি দৃষ্টির প্রয়োজন, লোকসংখ্যার আধিক্য হইলে তাহার অনিষ্ট হয়, তাহা ভাল চলে না। ওরূপ গবর্ণমেণ্ট বহু পূর্ব্বকালে ছিল, যেমন প্রাচীন ইহুদিদিগের মধ্যে, এখন নাই। ভারতে ইংরাজের গবর্ণমেণ্ট patriarchal government নয়। তথাপি যখন বলা যাইতেছে যে লোকসংখ্যার আধিক্য বশতঃ বঙ্গের শাসন একজন শাসনকর্ত্তার পক্ষে অসাধ্য হইয়া উঠিয়াছিল—তখন বোধ হয় বুঝিতে হইবে যে শাসনের প্রকৃতি আর পূর্ব্ববৎ নাই, autocratic হইয়া পড়িতেছে। ইহার একটু প্রমাণও পাওয়া গিয়াছে। বিলাতের যে সভার উল্লেখ করিয়াছি তাহাতে আমাদের ভূতপূর্ব্ব ছোটলাট আত্মপ্রাধান্যগর্ব্বিত সারচার্লস্ ইলিয়ট পার্টিসনের সমর্থন করিয়া বলিয়াছিলেন যে বঙ্গ এত বৃহৎ ও লোকসঙ্কুল স্থান যে তিনি উহার শাসন কার্য্যের অর্দ্ধেকের অধিক সম্পন্ন করিতে পারেন নাই। কিন্তু তিনি যেমন অতি সামান্য সামান্য, অতি অনাবশ্যক, অসংখ্য খুটিনাটি এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় পর্য্যন্ত নিজে দেখা ছোটলাটত্বের অবশ্য কর্ত্তব্য কার্য্য মনে করিতেন, তাহাতে তিনি যে তাঁহার অর্দ্ধেক কার্য্যও সম্পন্ন করিয়া গিয়াছিলেন ইহাই আশ্চর্য্য। আমাদের ঘোর সন্দেহ, বঙ্গের লোকসংখ্যার আধিক্যের জন্য উহার পার্টিসন করা হয় নাই; পূর্ব্বের আইন-সুবিচার-এবং-সুবিবেচনা মূলক শাসন প্রণালী ছাড়িয়া দিয়া autocratic প্রণালীতে শাসন করিবার অভিপ্রায়ে উহার পার্টিসন করা হইল।
(২) গবর্ণমেণ্টের মনের ভাব যেন এইরূপ যে বঙ্গরাজ্যের বিস্তার বড় বেশী বলিয়া বঙ্গের রাজধানী হইতে দূরস্থিত স্থান সকল সুশাসিত হইতে পারে না। আমরা কিন্তু এইরূপ বুঝি যে গবর্ণমেণ্টের লোকসংখ্যার কথাটারও যেমন বিশেষ কোন অর্থ নাই এই দূরত্বের কথাটারও তেমনই বিশেষ কোন অর্থ নাই। বঙ্গের যেখানেই কোন একটা ঘটনা ঘটুক উহার তদন্তাদির প্রণালী সর্ব্বত্রই এক—তদন্তে প্রথমে চৌকিদার, তাহার পর পুলীস, তাহার পর মাজিষ্ট্রেট, তাহার পর কমিশনর, সর্ব্বশেষে গবর্ণমেণ্ট। ঘটনা বঙ্গের ছোটলাটের প্রাসাদ হইতে দুই শত ক্রোশ দূরে ঘটিলে এই সুদীর্ঘ জটিল প্রণালীতে উহার তদন্ত হইবে আর দুই ক্রোশ দূরে হইলে একটা সংক্ষিপ্ত সরল প্রণালীতে উহার তদন্ত হইবে এরূপ নহে; আর দূরের তদন্তটা দূরের বলিয়া যে বিলম্বে হইবে এবং ভাল হইবে না এবং নিকটের তদন্তটা নিকটের বলিয়া যে দুই মিনিটে হইয়া যাইবে, এবং ভালও হইবে তাহাও নহে। তাই বলি, গবর্ণমেণ্টের এই দূরত্বের কথাটা আমরা বুঝিতে পারি নাই। ইংরাজের শাসন যন্ত্র যদি সেই গজনিরাজ মামুদের শাসনযন্ত্রের অনুরূপ হইত তাহা হইলে বুঝিতে পারিতাম। মনে আছে ত, সেই দরিদ্র বৃদ্ধা গজনিরাজের কাছে গিয়া অত্যাচার কাহিনী কহিলে পর গজনিরাজকে বলিতে হইয়াছিল—আমি কি করিব, অত্যাচার যে বহুদূরে ঘটিয়াছে, মা? ইংরাজের রাজ্যে অত্যাচার রাজধানী হইতে সহস্র ক্রোশ দূরে ঘটিলেও ইংরাজ রাজাকে কি বলিতে হয়—কি করিব, অত্যাচার যে বহুদূরে ঘটিয়াছে?—না তিনি বলেন, ভয় নাই, অত্যাচার আমার চোখের উপর হইলে প্রতিকার যেমন সুনিশ্চিত, সহস্র ক্রোশ দূরে হইলেও প্রতিকার তেমনি সুনিশ্চিত? ইংরাজের শাসন প্রণালীতে প্রত্যেক জেলা যেন অনেকটা করিয়া autonomy সম্পন্ন বা অনন্যসাপেক্ষ। তাই জিজ্ঞাসা না করিয়া থাকিতে পারিলাম না, ইংরাজের শাসন যন্ত্রের গঠনের গুণে দূরত্ব নিকটত্বের প্রভেদ যখন নাই বলিলেই হয়, তখন এই পার্টিসন ব্যাপারে তিনি দূরত্ব-নিকটত্বের কথা কহিলেন কেন, অনুগ্রহ করিয়া বুঝাইয়া দিবেন কি? জানি, দূরত্ব-নিকটত্বের কথা কহিবার কারণ লর্ড কর্জ্জন একবার দুইটী উদাহরণ দিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। ঢাকাবাসীদের ঘরের কাছে স্বতন্ত্র স্থানীয় গবর্ণমেণ্ট না থাকায় তাহাদের কত অনিষ্ট হইয়াছে তাহা তাহাদের হৃদয়ঙ্গম করাইবার অভিপ্রায়ে ঢাকার বক্তৃতায় ঢাকা কালেজ সম্বন্ধে তিনি এই কথা বলিয়াছিলেন:—
‘It cannot be doubted that if a new province were created there would be an immense development of local institutions, and that this would be a source of unqualified benefit to the people. Every one knows that, under the present system, the Dacca College has been starved; the Professors have been few and underpaid and progress has languished. I hope that a fresh start is being made there, as I said in a ceremony in which I took part yesterday; but in a new province that experiment will have an even greater prospect of success.’
ইহাতে যে উৎসবের উল্লেখ রহিয়াছে তদুপলক্ষে লর্ড কর্জ্জন ঢাকা কালেজের দুর্দ্দশার কথা একটু বিস্তৃত ভাবে কহিয়াছিলেন, যথা:—
‘Further there are no play grounds for the physical recreation of the students. * * * there is no hall or buildings as a meeting ground for intellectual intercourse, where the professors and the students can mix together and get to know each other well. Above all the most crying evil, amounting almost to a scandal in the present situation, is that more than half of the students live in wretched boarding houses in the town, many of them unlicensed and uninspected, not always kept by the best of characters, and amid insanitary and undesirable surroundings’.
লর্ড কর্জ্জনের মতে ঢাকা হইতে বঙ্গের রাজধানী কলিকাতা বহুদূরে বলিয়া ঢাকা কালেজের দূরবস্থার একশেষ হইয়াছে—কালেজকে আঁতেমারা হইতে হইয়াছে, কালেজের অধ্যাপকদিগের সংখ্যা ও কম বেতন ও অল্প হইয়াছে, কালেজের ছাত্র ও অধ্যাপকদিগের মেশামিশি স্থান নাই, কালেজের সংলগ্ন উত্তম ছাত্রাবাস নাই, ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের জিজ্ঞাস্য— হুগলী এবং কৃষ্ণনগর কলিকাতা হইতে বহুদূরে নয়, হুগলী কলিকাতা হইতে ১২ ক্রোশ মাত্র, তথাপি তথাকার কালেজদ্বয়েরও দুরবস্থার একশেষ হইল কেন?—তথাকার অধ্যাপকদিগেরও সংখ্যা এবং বেতন কম নয় কি?—সেখানে ও ছাত্র ও অধ্যাপকদিগের মেশামিশির বন্দোবস্ত আছে কি?— উহাদের সংলগ্ন উত্তম ছাত্রাবাস আছে কি? এমন কি, নিজরাজধানীস্থিত প্রেসিডেন্সি কালেজের অবস্থা আর পূর্ব্বের ন্যায় আছে কি?— সেখানেও আর পূর্ব্বের ন্যায় তত ভাল ভাল তত্ উচ্চ বেতনের অধ্যাপক আছে কি?—না, সেখানে ছাত্র এবং অধ্যাপকদিগের মেশামিশির তেমন বন্দোবস্ত আছে? সকলেই জানেন, ঢাকা কালেজের পূর্ব্ব অবস্থা এখন কার অপেক্ষা অনেক ভাল ছিল। লর্ড কজ্জন বলিয়া দিবেন কি, রাজধানী হইতে এখনকার ন্যায় দূরে থাকা সত্ত্বেও কেমন করিয়া উহার পূর্ব্বাবস্থা বর্ত্তমান অবস্থা অপেক্ষা ভাল ছিল? আর প্রেসিডেন্সি কালেজ তখন ও যেমন এখনও তেমনই নিজরাজধানীর ভিতর থাকা সত্ত্বেও এবং হুগলী কালেজও কৃষ্ণনগর কালেজ তখন ও যেমন এখনও তেমনই কলিকাতার নিকটে থাকা সত্ত্বেও তখনই বা এত ভাল ছিল কেন, এখনই বা এত মন্দ হইল কেন, লর্ড কর্জ্জন এবং ভারত গবর্ণমেণ্ট তাহা বলিয়া দিবেন কি? অন্যান্য কালেজের ন্যায় ঢাকা কালেজের বর্ত্তমান অবস্থা এমন শোচনীয় কেন, আমরা তাহা জানি। আমরা জানি, লর্ড মেয়ো যখন গবর্ণর জেনেরল তখন ভারত গবর্ণমেণ্ট উচ্চশিক্ষার ব্যয় কমাইয়া নিম্নশিক্ষার ব্যয় বাড়াইবার প্রস্তাব করেন। আমাদের শিক্ষাবিভাগের তখনকার অধ্যক্ষ মৃত মহাত্মা এটকিন্সন সাহেব সেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যেরূপ সুন্দর, যুক্তিপূর্ণ, তেজোদ্দীপ্ত, নির্ভীক মন্তব্য লিখিয়াছিলেন অনেকের বোধ হয় তাহা মনে আছে, আর লোকসাধারণে টাউনহলের বিরাট সভায় ঐ প্রস্তাবের যে প্রতিবাদ করিয়াছিলেন তাহাও বোধ হয় অনেকে জানেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নাই—গবর্ণমেণ্ট আপন প্রস্তাব পরিত্যাগ বা পরিবর্ত্তন করেন নাই। সেই জন্যই সেই সময় হইতে গবর্ণমেণ্ট উচ্চশিক্ষার ব্যয় কমাইয়া আসিতেছেন আর ঐ ব্যয় সংক্ষেপের ফলেই রাজধানীস্থিত প্রেসিডেন্সি কালেজ এবং রাজধানীর নিকটস্থ হুগলী ও কৃষ্ণনগর কালেজের ন্যায় রাজধানী হইতে দূরস্থিত ঢাকা কালেজ ও শোচনীয় অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছে। অতএব লর্ড কর্জ্জন আপন পার্টিসন প্রস্তাবের সমর্থনার্থ ঢাকা কালেজের বর্ত্তমান শোচনীয় অবস্থা কলিকাতা হইতে ঢাকার দূরতার ফল বলিয়া যে নির্দ্দেশ করিয়াছেন, তাহা সম্পূর্ণ ভ্রমাত্মক। ভ্রম ইচ্ছাকৃত, এমন কথা বলিতে পারিব না। তবে লর্ড মেয়োর সময় হইতে শিক্ষানীতির যে পরিবর্ত্তন করা হইতেছে, অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার ব্যয় যে কমান হইতেছে, তাহা যখন স্বয়ং ভারত গবর্ণমেণ্টের অনুমতিক্রমেই করা হইতেছে তখন ভারত গবর্ণমেণ্টের অধ্যক্ষ হইয়া লর্ড কর্জ্জন তাহা জানিতেন না, ইহাই বা কেমন করিয়া বিশ্বাস করা যায় বুঝিতে পারি না।
দূরত্ব-নিকটত্বের কথা কহিবার কারণ ময়মনসিংহে গিয়া লর্ড কর্জ্জন আর একটী উদাহরণ দিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। শুনুন—
‘You profess to be thoroughly satisfied with the administration of Bengal. This is a discovery which it appears to me, as a careful student of your papers, that you have only quite recently made and yet under that administration the whole of the Mymensingh District, with a population of close upon 4 millions of persons, has been left with a single British Executive officer, the Collector of this place. Orissa contains approximately the same number of inhabitants in British territory; but Orissa possesses one Commissioner, three Collectors. and other officers in proportion. The Chittagong Division is only a little more populous and is equipped on the same scale as Orissa. Do you mean to tell me that this is a satisfactory state of affairs? Do you suppose it would have been tolerated for all these years had you possessed a local Government at Dacca instead of in remote Calcutta and Darjeeling?’
এসম্বন্ধে গবর্ণমেণ্টের নিকট আমাদের কয়েকটী জিজ্ঞাস্য আছে:—
(ক) উড়িষ্যা কলিকাতা হইতে ময়মনসিংহের ন্যায় অধিক দূরে না হইলেও অধিক নিকটেও নয়, দূরেই বটে। তবে উড়িষ্যার শাসনের বন্দোবস্ত ময়মনসিংহের শাসনের বন্দোবস্ত অপেক্ষা এত ভাল হইল কেন? দূরস্থিত স্থানের শাসনের বন্দোবস্ত ভাল হইতে পারে না, ইহা কি শাসন কার্য্যের অব্যর্থ অব্যভিচারী নিয়ম বা সূত্র স্বরূপ গ্রহণ করা যাইতে পারে?
(খ) মেদিনীপুর জেলা ময়মনসিংহ জেলা অপেক্ষা কলিকাতার অনেক নিকটে, কিন্তু পরিসরে ও লোকসংখ্যায় ময়মনসিংহ অপেক্ষা নিতান্ত ছোট নয়। ময়মনসিংহের পরিসর ৬৩৩২ বর্গ মাইল, মেদিনীপুরের পরিসর ৫১৪৫ বর্গমাইল; ময়মনসিংহের লোক সংখ্যা ৩৯১৫০৬৮, মেদেনীপুরের লোকসংখ্যা ২৭৮৯১১৪। অর্থাৎ, মেদিনীপুর পরিসরে ময়মনসিংহের পাঁচ ষষ্ঠাংশের তূল্য এবং লোক সংখ্যায় দুই তৃতীয়াংশেরও বেশী। অতএব পরিসরে এবং লোক সংখ্যায় ময়মনসিংহ উড়িষ্যার প্রায় সমান বলিয়া লর্ড কর্জ্জন যখন বলিতেছেন এবং তাঁহার কথার ভাবে যখন বুঝা যাইতেছে যে উড়িষ্যায় তিন জন কালেক্টর রাখিয়া ময়মনসিংহে এক জন মাত্র কালেক্টর রাখা অতিশয় অবিবেচনার কার্য্য হইয়াছে এবং উড়িষ্যার ন্যায় ময়মনসিংহেও তিনজন কালেক্টর রাখা উচিত, তখন তিনি নিজেই বোধ হয় স্বীকার করিতে আপত্তি করিবেন না যে মেদিনীপুরে অন্ততঃ দুই জন কালেক্টর থাকা উচিত ছিল, অর্থাৎ, ময়মনসিংহের ন্যায় মেদিনীপুরের শাসনকার্য্য সম্পন্ন করিবার বন্দোবস্ত করিতেও বিষম ক্রটী করা হইয়াছে। কিন্তু একথা স্বীকার করিলে তাঁহাকে অগত্যা ইহাও স্বীকার করিতে হয় যে রাজধানী হইতে কেবল দূর প্রদেশেই যে শাসনব্যবস্থার ত্রুটী হয় তাহা নহে, রাজধানীর নিকট প্রদেশেও ওরূপ ত্রুটী হইয়া থাকে, অর্থাৎ, শাসন ব্যবস্থার সহিত রাজধানী হইতে দূরত্ব-নিকটত্বের কার্য্যকারণ সম্বন্ধ নাই বা নাও থাকিতে পারে। তবে কি এমন কথা বলা যাইতে পারে না যে, রাজধানীর নিকটস্থ স্থানেও যখন শাসনকার্য্যের সুবন্দোবস্ত হয় না তখন দূরস্থিত স্থানের শাসনকার্য্যের সুবন্দোবস্তের অভাব দূরতার জন্য না হইয়া অন্য কারণেও হইতে পারে?
(গ) এত দিন ময়মনসিংহ জেলার সুবন্দোবস্ত না হইবার কারণ কি? ময়মনসিংহ হইতে রাজধানীই যেন বহুদূরে, কিন্তু নিজ ময়মনসিংহে ত জজ মেজেষ্টর আছেন, ময়মনসিংহ এক জন কমিশনরের অধিকারভুক্তও বটে। ময়মনসিংহের শাসন ব্যবস্থা যদি এতই অসম্পুর্ণ ও অসন্তোষ জনক, তবে ঐ সকল কর্ম্মচারী ছোট লাটকে এত দিন তাহা জানান নাই কেন? তাঁহাদের না জানাইবার জন্য যদি সুবন্দোবস্ত না হইয়া থাকে তবে ময়মনসিংহের শাসনবন্দোবস্তের দোষ রাজধানী হইতে দূরতা বশতঃ ঘটিয়াছে না বলিয়া স্থানীয় কর্ম্মচারীদের অবহেলায় ঘটিয়াছে বলিলেই ঠিক কারণ নির্দেশ করা হয় না কি?
(ঘ) ময়মনসিংহ জেলা ভাঙ্গিয়া দুইটা জেলা করিবার কথা আমরা অনেক দিন হইতে, অর্থাৎ, পার্টিসন প্রস্তাবের বহুপূর্ব্ব হইতে শুনিতেছি। তবে কেন এত দিন সে কাজ করা হয় নাই, সে কাজ করিবার বাধাই বা কি ছিল? ছোট লাটের দূরে থাকা সে কাজের বাধা বলিয়া কিছুতেই বিবেচনা করা যাইতে পারেনা। জেলা ভাগ করিতে হইলে ছোটলাটের কি নিজের তদন্ত করিতে হয় না নিজে গিয়া ভাগ করিয়া দিয়া আসিতে হয় যে রাজধানী হইতে দূরতার জন্য এত দিন ময়মনসিংহের বিভাগ হইয়া উঠে নাই? ফলকথা, ঢাকা কালেজের কথাতে ও যেমন ময়মনসিংহ জেলার কথাতে ও তেমনই লর্ড কর্জ্জন লোকের চক্ষে কেবল ধূলা দিয়া জয়লাভ করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। প্রজার সহিত যুদ্ধে এমন করিয়া জয় লাভের চেষ্টা ভারতের রাজরাজেশ্বরের প্রতিনিধির নিতান্ত অযোগ্য কার্য্য হয় নাই কি?
(৩) গবর্ণমেণ্ট ঠিকই বলেন যে সুশাসনের জন্য শাসক এবং শাসিত, রাজা এবং প্রজার মধ্যে ঘনিষ্টতার যত প্রয়োজন আর কিছুরই প্রয়োজন তত অধিক নয়। গবর্ণমেণ্টের রিজলিউশনের দ্বাদশ দফায় এই মর্ম্মের কথাই আছে:—
‘The result is the creation of a new province founded upon that which is the secret of all good administration, namely, the close contact—in so far as this is possible in areas of great size—of the governors with the governed.’
কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রজার সহিত ঘনিষ্টতা করিবার সুন্দর সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রাজকর্ম্মচারীরা তাহাদের সহিত ঘনিষ্টতা করেন কৈ? ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের এলাকা এত বড় নয় যে তিনি তথাকার বহুতর প্রজার কাছে গিয়া তাহাদের সহিত সর্ব্বদা দেখাসাক্ষাৎ সদালাপাদি করিতে পারেন না। কিন্তু তিনি তাহা করেন কি? তিনি সফরে বাহির হন বটে, কিন্তু কয় খানা গ্রামের ভিতরে বেড়ান; কয় জন ব্রাহ্মণ কায়স্থ, কয় জন কুম্ভকার কর্ম্মকার, কয় জন তন্তুবায়, কয় জন কৃষকের বাড়ীতে গিয়া তাহাদের দুঃখ কষ্টের কথা শুনেন, সুখ সচ্ছন্দের সংবাদাদি লয়েন? যে গ্রামে ইস্কুল আছে বা থানা আছে বা ভাটিখানা আছে বা পশুপক্ষী শিকারের সুবিধা আছে সেই গ্রাম ভিন্ন অন্য গ্রামে প্রায়ই তাঁহার পদার্পণ হয় না। গ্রামের বাহিরে তাঁহার তাঁবু পড়ে, সেখানে যাহারই যাইবার ইচ্ছা নেই যাইতে পায় এমন নয়, কারণ চৌকিদার কনষ্টেবল পেয়দা চাপরাশি সেখানেও বিরাজ করেন, আর তাঁহাকেও গ্রামের ভিতর গিয়া গ্রামের প্রধান কি অপ্রধান কাহারো সহিত আলাপ প্রণয় করিতে দেখা যায় না। তিনি জেলার অধিকাংশ গ্রাম তন্ন তন্ন করিয়া দেখিয়া বেড়াইবেন এরূপ প্রত্যাশা করিতে পারা যায় না, যদিও বিচারকার্য্যের ভার হাতে না থাকিলে তাহাও তিনি না পারেন এমন নয়। তাঁহার প্রত্যেক গ্রাম তেমন করিয়া দেখিবার প্রয়োজন ও নাই। তিনি যদি বছরে বিশ ত্রিশ খানা গ্রাম তেমন করিয়া দেখেন তাহা হইলেই যথেষ্ট হয়— সমস্ত জেলা তাঁহার যশঃ সৌরভে ভরিয়া যায়, জেলার সমস্ত প্রজা তাঁহাকে ভালবাসিতে থাকে, গবর্ণমেণ্টের প্রতি ও তাহাদের ভক্তিভালবাসা বাড়ে এবং তাহার ফলে সুশাসন সহজ হইয়া পড়ে। মাজিষ্ট্রেট মহাশয় কিন্তু এক খানি গ্রামও তেমন করিয়া দেখেন না। সময়াভাব তাঁহার না দেখিবার প্রধান বা প্রকৃত কারণ নয়। সময়াভাব প্রকৃত কারণ হইলে মাজিষ্ট্রেটের পরিদর্শন বড় জেলা অপেক্ষা ছোট জেলায় অন্ততঃ কিয়ৎ পরিমাণে সন্তোষজনক হইত। কিন্তু তাহাই বা হয় কৈ? বর্দ্ধমান জেলার পরিসর ২৬৯৭ বর্গ মাইল এবং লোকসংখ্যা ১৫৩২৪৭৫ আর হাবড়া জেলার পরিসর মাত্র ৪৭৬ বর্গ মাইল এবং লোক সংখ্যা মাত্র ৮৫০৫১৪। কিন্তু এমন কথাত শুনা যায় না যে বর্দ্ধমান জেলার মাজিষ্ট্রেট অপেক্ষা হাবড়া জেলার মাজিষ্ট্রেট আপন জেলা বেশী ভাল করিয়া দেখিয়া বেড়ান।
কমিশনর সাহেবও সফরে যান। কিন্তু তাঁহার সফরের কায়দাকারখানা বড় বেশী। তিনি গ্রামে ত যানই না, সহরেও কেবল সরকারি আফিস আদালত ইস্কুল কালেজ জেলখানা ডাক্তারখানা আর হিসাবপত্র দেখেন, আর মাজিষ্ট্রেট মহাশয় সকল লোককে তাঁহার কাছে যাইতে দেনও না। মনে করিলে তিনি অক্লেশে অনেক গ্রাম দেখিতে পারেন, অনেক প্রজার সহিত আলাপ পরিচয় করিতে পারেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মাজিষ্ট্রেটের ন্যায় কমিশনর সাহেবেরও সেরূপ করিবার ইচ্ছা হয় না।
লেপ্টেনাণ্ট গবর্ণর বাহাদুর ও সফরে যান। কিন্তু তাঁহার সফরের কায়দাকারখানা আরও ভয়ানক। প্রজাসাধারণকে তাঁহার নিকট প্রায়ই উপস্থিত হইতে দেওয়া হয় না, প্রধান ব্যক্তিদের মধ্যেও সকলে তাঁহার নিকট যাইবার অনুমতি পান না, প্রজার দুঃখ কষ্ট ছিন্ন বস্ত্র জীর্ণ কুটীর আর কর্ত্তাদের নিজেদের অকর্ম্ম কুকর্ম্মের নিদর্শন যাহাতে তাঁহার চোখে না পড়ে আগে হইতেই তজ্জন্য বিশেষ চেষ্টা ও বন্দোবস্ত করা হয়। মুনিসিপালিটি, ডিষ্ট্রীক্ট বোর্ড প্রভৃতি যাঁহারা তাঁহাকে অভিনন্দন পত্র দিবার অধিকার পান তাঁহারাও তাঁহাকে সকল কথা বলিতে পারেন না, কমিশনর এবং মাজিষ্ট্রেট তাঁহাদিগকে যে কথাগুলি বলিতে দেন কেবল সেই কথা গুলি বলিতে পারেন। তিনি রাজধানী হইতে নিকটে গেলেও এই ব্যবস্থা, দূরে গেলেও এই ব্যবস্থা। তিনি কখনও কোন পল্লীগ্রামে, প্রকৃত চাষার গ্রামে গিয়াছেন এমন কথা আমরা শুনি নাই। কিন্তু প্রজার সহিত ঘনিষ্টতা করিবার ইচ্ছা থাকিলে অনায়াসে যাইতে পারিতেন।
আসল কথা এই, প্রজার সহিত ঘনিষ্টতা করিবার ব্যবস্থা ও সুবিধা প্রত্যেক বিভাগে এবং প্রত্যেক জেলাতেই আছে, কিন্তু ভারতের প্রজাকে চিনিবার বুঝিবার দয়া করিবার ভালবাসিবার প্রবৃত্তি ইংরাজ কর্ম্মচারীর নাই—গবর্ণর জেনেরল, গবর্ণর, লেপ্টেনণ্ট গবর্ণরদিগের ও নাই। যদি থাকিত, তাহা হইলে প্রজার সহিত রাজার, শাসিতের সহিত শাসকের ঘনিষ্টতা ঘটাইবার জন্য বঙ্গের পার্টিসনের কিছু মাত্র প্রয়োজন হইত না, জেলায় জেলায় বসিয়াই, বিভাগে বিভাগে থাকিয়াই ঘোর ঘনিষ্টতা ঘটান যাইতে পারিত। আরো বলি, ইংরাজকে আমরা চিনি, সমস্ত পৃথিবী চেনে,—ইংরাজের এমনই প্রকৃতি যে এক ইংরাজ ভিন্ন আর কাহারও সহিত ঘনিষ্টতা করিবার মানুষ তিনি নহেন। প্রজার সহিত ঘনিষ্টতা ভিন্ন সুশাসন হয় না, আর পার্টিসন ব্যতীত প্রজার সহিত ঘনিষ্টতা করিবার সুবিধা হইতে পারে না, তাই বঙ্গের পার্টিসন করা হইল—ভারত গবর্ণমেণ্ট এই যে কথাটা বলিতেছেন ইহা নিশ্চয়ই একটা ভূয়া কথা, নিশ্চয়ই তাঁহার মনের কথা নয়। ঠিক বলিলাম কি না, রাজপুরুষেরা অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কি?
(৪) গবর্ণমেণ্ট বলিতেছেন যে বঙ্গের পার্টিসন অনেক বড় বড় রাজপুরুষের অনুমোদিত। কিন্তু কোন্ কোন্ রাজপূরুষের কি কি কারণে অনুমোদিত গবর্ণমেণ্ট তাহা খুলিয়া বলিলেন না। ইংরেজ গবর্ণমেণ্ট অতি উদার অতি সুসভ্য অতি বিচক্ষণ গবর্ণমেণ্ট। তাই আমরা মনে করিয়াছিলাম যে পার্টিসনে প্রজার যখন এত আপত্তি তখন পার্টিসনের পক্ষে রাজপুরুষদের যে সমস্ত মত তিনি প্রাপ্ত হইয়াছেন তাহা বিস্তৃতভাবে প্রকাশ করিয়া প্রজার এই ব্যাপারটা বুঝিবার সুবিধা করিয়া দিবেন। কিন্তু প্রজার দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি তাহা করিলেন না। ওদিকে প্রজা কিন্তু জানিলেন যে সার চার্লস্ ষ্টিভেন্স, সার হেনরি কটন এবং বেভারিজ মহোদয়ের ন্যায় বঙ্গসম্বন্ধে অভিজ্ঞতম ব্যক্তিরা পার্টিসনের বিরোধী। কাজেই পার্টিসনের অনুকূল মতগুলি প্রকাশিত না করায় গবর্ণমেণ্টের পার্টিসন বিষয়ক অভিপ্রায় সম্বন্ধে প্রজার মনে স্বভাবতঃই যে সন্দেহ জন্মিয়াছিল স্বভাবতঃই তাহা ঘনীভূত হইল। আমরা এতকাল মনে করিয়া আসিতেছিলাম যে ইংরাজ গবর্ণমেণ্টের ন্যায় গবর্ণমেণ্টের কোন কার্য্যই লুকোছাপা ভাবে হইতে পারে না, সকল কার্য্যই ‘above board’ সম্পূর্ণ খোলাখুলি ভাবেই হইবে। আমাদের অদৃষ্ট দোষে এবার কিন্তু তাহা হইল না। এবার গবর্ণমেণ্ট অনেক কাগজপত্র, অনেক প্রয়োজনীয় কথা গোপন করিয়াই রাখিলেন। এই সেদিন বঙ্গের ব্যবস্থাপক সভায় জে চৌধুরী মহাশয় জিজ্ঞাসা করিতে চাহিয়াছিলেন, বঙ্গের শাসনভার যে একজন ছোট লাটের পক্ষে দুর্ব্বহ গবর্ণমেণ্ট তাহা কত দিন বুঝিয়াছেন। কিন্তু একথা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিতে দেওয়া হয় নাই। এইরূপ লুকোছাপা ভাব দেখিলে সকলেরই মনে—ইংরাজ বাঙ্গালী প্রভৃতি সকলেরই মনে সকল দেশেই সন্দেহ হয়। সুতরাং পার্টিসন ব্যাপারটা বুঝিতে না পারায় এবং পার্টিসনের অভিপ্রায় সম্বন্ধে সন্দিহান হওয়ায় গরীব বাঙ্গালীর যে কোন অপরাধ হইয়াছে তাহা কি গবর্ণমেণ্ট কি অপর কেহ বলিতে পারেন কি? আর পার্টিসনটা বুঝিতে না পারিয়া এবং তৎসম্বন্ধে সন্দিহান হইবার জন্য বাঙ্গালী যে এখনও তাহার বিরুদ্ধে আন্দোলন করিতেছে এবং ঘোর অসন্তুষ্ট, তাহাতেই বা বাঙ্গালীর কি অপরাধ, গবর্ণমেণ্ট বা অপর কেহ অনুগ্রহ করিয়া তাহা বুঝাইয়া দিবেন কি? ফল কথা, গবর্ণমেণ্টের ভাবভঙ্গি দেখিয়া বাঙ্গালীর দৃঢ় ধারণা হইয়াছে যে তাঁহারা ইচ্ছা করিয়াই পার্টিসনের প্রকৃত কথাগুলা প্রজাকে জানিতে দিলেন না, ইচ্ছা করিয়াই পার্টিসন ব্যাপারটা প্রজার নিকট পূর্ণ প্রহেলিকা বৎ রাখিয়া দিলেন। বাঙ্গালীর এই ধারণা অমূলক অসঙ্গত বা অযৌক্তিক হইয়াছে, কি গবর্ণমেণ্ট কি অপর কেহ এমন কথা বলিতে পারেন কি?
পার্টিসনে ধনবৃদ্ধি।
শাসনসৌকর্য্যার্থ পার্টিসন আবশ্যক, গবর্ণমেণ্টের এ কথা আমরা ভাল বুঝিলাম না। একটী গবর্ণমেণ্টের পরিবর্ত্তে দুইটী গবর্ণমেণ্ট হইলে কোথাও কোন বিষয়ে কিছু উন্নতি উৎকর্ষ বা সংস্কার হওয়া, বিশেষতঃ প্রথম প্রথম কিছু দিন, অসম্ভব নয়, হইবেও বোধ হয়। কিন্তু দুইটী গবর্ণমেণ্ট করিয়া আমাদের যে ব্যয়াধিক্য ঘটান হইল তদ্বিবেচনায় ঐরূপ একটু আধটু উন্নতি বা উৎকর্ষ গরীব বাঙ্গালীর বড় কষ্টলব্ধ মনে হইবে। গরীব বাঙ্গালী একথাও বলিতে পারে যে নূতন গবর্ণমেণ্টের জন্য বৎসর বৎসর যে রাশি রাশি টাকা ব্যয়িত হইবে তাহার কিয়দংশমাত্রে শুধু পূর্ব্ববঙ্গ নয় সমস্ত বঙ্গের ঐরূপ অনেক উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধন করা যাইতে পারিত। তবে একটা কথা আছে। গবর্ণমেণ্টের পক্ষ হইতে বলা হইতেছে যে নূতন গবর্ণমেণ্টের ফলে পূর্ব্ববঙ্গের অভূতপূর্ব্ব ধনবৃদ্ধি হইবে— আর্থিক সমৃদ্ধি খুব বাড়িবে। বাঙ্গালী অন্নের কাঙ্গাল, ধনাগম হইলে যথার্থই ধন্য হইবে, নূতন গবর্ণমেণ্টের ব্যয় যতই হউক তাহার গায়ে লাগিবে না। কিন্তু তাহা হইবে কি? হিন্দু মুসলমানের যেরূপ অদৃষ্ট তাহাতে তাহাদের আর্থিক সমৃদ্ধি হইবে মনে করিতে সাহস হয় না। আর ফুলর মহোদয় সম্প্রতি চট্টগ্রামবাসীদিগকে যে কথা বলিয়াছিলেন তাহা শুনিলে সে সাহস একেবারেই চলিয়া যায়। তিনি বলিয়াছিলেন:—
‘You are all full of hope that the turning day of your fortunes has come. I earnestly trust that these hopes may be realised and you may be assured that the new Government will take a pride in its seaport and will spare no efforts to contribute to its growth and prosperity. Chittagong will have to pay a price for its development. The approach to the town and the surrounding of the harbour are charmingly picturesque and commerce will demand greater sacrifices here than at your sister port of Karachi. Yet we must look forward unflinchingly to the day when green banks will gives way to lines of jetties, pontoons and warhouses, and when the foliage which now adorns the harbour front will be replaced by a bristling fringe of masts, funnels, and steam cranes’.
এ কথার পরিষ্কার অর্থ এই যে বঙ্গ বিভাগের ফলে পূর্ব্ববঙ্গে ইংরাজ বণিকের জয় জয়কার হইবে, ইংরাজ বণিকের ধনভাণ্ডার উথলিয়া উঠিবে। কিন্তু পূর্ব্ববঙ্গের হিন্দু মুসলমানের কি হইবে? কিছুই নয়, কেবল জন কতক চাষা ধান মারিয়া পাট বানাইয়া দু টাকার জায়গায় ন সিকে রোজগার করিবে। করিয়াও কিন্তু তাহা মদে মামলায় আর মিহিয়ানায় উড়াইয়া দিবে। জেটি, পণ্টুন, মাস্তুল, ক্রেণ, ওয়ারহৌস রহস্য আমরা অনেক দিন বুঝিয়াছি। বোম্বাই, করাচি, কলিকাতায় অনেক দিন আমরা সমৃদ্ধির ঐসকল নিদর্শন দেখিতেছি। কিন্তু ওগুলা গরীব ভারতবাসীর সমৃদ্ধির বা দুঃখদারিদ্র্য হ্রাসের নিদর্শন বলিয়া বুঝিতে পারি নাই। ওগুলা কেবল ইংরাজের সম্পদ বৃদ্ধির নিদর্শন, আমাদের কপালের দোষে ইহাই আমরা বুঝিয়াছি। অতএব পূর্ব্ববঙ্গের প্রধানতঃ এইরূপ সমৃদ্ধি সাধিবার জন্য বঙ্গের পার্টিসন হইল, একথা বলিলে গবর্ণমেণ্ট আমাদিগকে বিশেষ অপরাধী মনে করিতে পারিবেন কি?
উপসংহার।
দেখা গেল, পার্টিসনের সমর্থনার্থ গবর্ণমেণ্ট যে লোকসংখ্যার কথা কহিয়াছেন তাহা অর্থশূন্য কথা, যে দূরতার কথা কহিয়াছেন তাহাও অর্থশূন্য কথা, প্রজার সহিত যে ঘনিষ্টতা স্থাপনের কথা তুলিয়াছেন তাহা ভূয়া কথা, আর যে সমৃদ্ধি বৃদ্ধির কথা বলিতেছেন তাহা সত্য বটে, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য বশতঃ সে আমাদের সমৃদ্ধি বৃদ্ধির কথা নয়, ইংরাজ বণিকের ও ইংরাজ গবর্ণমেণ্টের সমৃদ্ধি বৃদ্ধির কথা। অতএব পার্টিসনের বিরুদ্ধে আমরা যে সকল আপত্তি করিয়াছিলাম তাহা সম্পূর্ণ অসার ও অমূলক হইলেও লর্ড কর্জ্জন ও লর্ড কর্জ্জনের গবর্ণমেণ্টের যুক্তির আলোচনার পর পরিষ্কার বুঝাগেল যে গবর্ণমেণ্ট প্রজার হিতার্থ পার্টিসন করেন নাই, আপনার সিবিলিয়ানকুলের ও বণিকবর্গের হিতার্থ করিয়াছেন।
এই লেখাটি ১ জানুয়ারি ১৯৩১ সালের পূর্বে প্রকাশিত এবং বিশ্বব্যাপী পাবলিক ডোমেইনের অন্তর্ভুক্ত, কারণ উক্ত লেখকের মৃত্যুর পর কমপক্ষে ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে অথবা লেখাটি ১০০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে ।