বিষয়শ্রেণী:নাটক

উইকিসংকলন থেকে

শব্দকল্পদ্রুম
[১]
সুকুমার রায়
  1. সুকুমার রায়

<thead> </thead> <tbody> </tbody>

প্রথম দৃশ্য _____________________________________________________________
[গুরুজির আশ্রম। হরেকানন্দ, জগাই, বেহারী, পটলা, বিশ্বম্ভর ও অন্যান্য শিষ্যেরা উপবিষ্ট]
হরেকানন্দ। দেখ্‌ জগাই, তুই বললে বিশ্বাস করবিনে-
সকলে । কেউ বিশ্বাস করবে না-
হরেকানন্দ। কাল থেকে মনটা আমার এমনি ওলটপালট করছে, সারারাত আর ঘুম হয়নি। দুপুরে একটু তন্দ্রা ভাব এয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ প্রশ্নটা তেড়ে উঠে মনের মধ্যে এমনি গুঁতো মারলে-
বেহারী । ওর একটা কবিরাজি ওষুধ আছে খুব ভালো-আয়াপানের শেকড় না বেটে-
হরেকানন্দ। দেখ্‌ বড় বেশি ওপর চালাকি কচ্চিস, এক কথায় সবকটার মুখ বন্ধ করে দিতে পারি জানিস্‌? পরশু রাত্তিরে গুরুজি নিজে আমায় ডেকে নিয়ে যেসব ভেতরকার কথা বলেছেন, জানিস্‌?
বেহারী । হ্যাঁরে পটলা, সত্যি নাকি?
পটলা । কিসের সব মিছে কথা।
বেহারী । এমন মিছে কথা কইতে পারে এই হরেটা-ছিঃ ছিঃ-রাম, রাম-
[বেহারীর সংগীত]

রাম কহ-ইয়ে রাম কহ
বলবেন না আর মশাই গো, মানুষ নয় সব কশাই গো
তলে তলে যত শয়তানী-(রাম কহ)
এই কিরে তোদের ভদ্রতা ঘ্যান ঘ্যান ক্যাঁচ ক্যাঁচ সবর্দা
ডুবে ডুবে জল খাও সব জানি (রাম কহ)

হরেকানন্দ। প্রশ্ন যখন এয়েচে, জবাব তার একটা আসবেই আসবে-তা তোমাদের ধমকানি আর চোখরাঙ্গানি, হাসি ঠাট্টা আর এয়ার্কি, এসব বেশিদিন টিঁকছে না।
বিশ্বম্ভর । হ্যাঁ হে, তর্কটা কিসের একবার শুনতে পারি কি? কিই বা প্রশ্ন হল আর তা নিয়ে মামলাটাই বা কিসের?-আচ্ছা, হরিচরণ কি বল?
হরেকানন্দ। হরিচরণ? দেখলি, আমায় হরিচরণ বলছে!-‘হরিচরণ’ কি মশাই?
নিশ্বম্ভর । তবে, ওরা যে ‘হরে হরে’ বলছিল!-
হরেকানন্দ। হরে বললেই হরিচরণ? ‘ক’ বললেই কার্তিকচন্দ্র?
জগাই । ওঁর নাম শ্রীহরেকানন্দ-
বিশ্বম্ভর । হরে কাননগু-
হরেকানন্দ। আরে খেলে যা! তুমি কোথাকার মুখ্যু হে?
বিশ্বম্ভর । আজ্ঞে, ফরাশডাঙ্গার-আপনি?
হরেকানন্দ। দেখ, এই যে ছ্যাবলামি আর ‘ডোন্ট কেয়ার’ এসব ভালো নয়। কাউকে যদি নাই মানবে, তবে এদিকে এসো টেসো না।

[হরেকানন্দের মৌনাবলম্বন-সাড়ম্বর]

বেহারী । (জানান্তিকে) দেখ্‌ পটলা-সিদিন রাত্তিরে একটা স্বপ্ন দেখেছিলুম-ক’দিন থেকে গুরুজিকে বলব বলব ভাবছি-কিন্তু এই হরেটার জন্য বলা হচ্ছে না। দেখলি না, সেদিন ওই ফকিরের গল্পটা বলতেই কিরকম হেসে উঠল-গল্পটা জমতেই দিল না।
বিশ্বম্ভর । হ্যাঁ হ্যাঁ? ফকিরের স্বপ্নটা কি হয়েছিল?
বেহারী । আ মোলো যা! মশাই, আমরা কথা কিইছি-আমনি মধ্যে থেকে অমন ধারা করছেন কেন?
বিশ্বম্ভর । ও বাবা! রো দেখি ফোঁস্‌ করে। মশাই, আমার ঘাট হয়েছে-আপনাদের কথা আপনারা বলুন-আমার ওসব শুনে টুনে দরকার নেই-


[বিশ্বম্ভরের সংগীত]

 শুনতে পাবিনে রে শোনা হবে না
এসব কথা শুনলে তোদের লাগবে মনে ধাঁধা
কেউ বা বুঝে পুরোপুরি কেউ বা বুঝে আধা।
(কেউ বা বুঝে না)
কারে বা কই কিসের কথা, কই যে দফে দফে
গাছের পরে কাঁঠাল দেখে তেল মেখ না গোঁফে
(কাঁঠাল পাবে না)
একটি একটি কথায় যেন সদ্য দাগে কামান
মন বসনের ময়লা ধুতে তত্ত্ব কথাই সাবান
(সাবান পাবে না)
বেশ বলেছ ঢের বলেছ ওইখানে দাও দাঁড়ি
হাটের মাঝে ভাংবে কেন বিদ্যে বোঝাই হাঁড়ি
(হাঁড়ি ভাংবে না)

বেহারী । আহা, রাগ করেন কেন মশাই? আমি স্বপ্ন দেখেছি বই ত নয়-আর সে স্বপ্নও এমন কিছু নয়। আমি দেখলুম, একটা অন্ধকার গর্তের মধ্যে এক সন্নিসি বসে বসে ঘড় ঘড় করে নাক ডাকছে!
বিশ্বম্ভর । বলেন কি মশাই? তারপর?
বেহারী । বাস্‌! তারপর আর কি? সে নাক ডাকছে ত ডাকছেই।
বিশ্বম্ভর । কি আশ্চর্য! আপনার গুরুজিকে জিজ্ঞেস করবেন ত-
পটলা । হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটা চেপে গেলে চলবে না দাদা-ওটা বলতে হবে-দেখিস্‌, তখন হরেটার মুখ একেবারে দিস্‌ কাইন্ড অফ স্মল হয়ে যাবে।
বিশ্বম্ভর । হ্যাঁ, বুঝলেন, বেশ একটু রঙ চং দিয়ে বলবেন।
বেহারী । আ মোলো যা! আমার স্বপ্ন আমার যেমন ইচ্ছে তেমন করে বলব।

[গুরুজির শুভাগমন । হরেকানন্দ ও বেহারীলালের যুগপৎ কথা বলিবার চেষ্টা]

হরেকানন্দ। একটা প্রশ্ন এই ক’দিন ধরে-
বেহারী । সিদিন একটা স্বপ্ন দেখলুম-
হরেকানন্দ। তার জন্য দু’দিন ধরে আর সোয়াস্তি নেই-
বেহারী । একটু নিরিবিলি যে জিজ্ঞেস করব তার ত যো নেই-
হরেকানন্দ। তাই জগাইকে আমি বলেছিলুম-
বেহারী । পটলা জানে আর এই ভাদ্রলোকটি সাক্ষী আছেন-
হরেকানন্দ। আঃ কথা বলতে দাও না-
বেহারী । কেন ওরকম করছ বল দেখি?
গুরুজী । এত গোলমাল কিসের?
বেহারী । আজ্ঞে, হরে বড় গোলমাল কচ্চে-
হরেকানন্দ। বিলক্ষণ! দেখলেন মশাই-
বেহারী । হয়েছে কি আমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলুম-
বিশ্বম্ভর । হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা সাক্ষী আছি।
বেহারী । আমি স্বপ্ন দেখলুম, অমাবস্যার রাত্তিরে একটা অন্ধকার গর্তের মধ্যে ঢুকে আর বেরুবার পথ পাচ্ছিনে। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় দেখি এক সন্নিসি-
পটলা । তার মাথায় এয়া বড় জটা-
বিশ্বম্ভর । তার গায়ে মাথায় ভস্মমাখা-তার উপর রক্ত-চন্দনের ছিটে-
বেহারী । (স্বগত) কি আপদ! স্বপ্ন দেখলুম আমি আর রঙ ফলাচ্ছেন ওঁরা!- সন্নিসিকে খাতির টাতির করে পথ জিজ্ঞেস করলুম-বললে বিশ্বাস করবেন না মশাই, সে কথার জবাবই দিলে না। বসে ঘড়ঘড়, ঘড়ঘড় করে নাক ডাকছে, ত ডাকছেই।
পটলা । সে নাক ডাকানি এক অদ্ভুত ব্যাপার-নাক ডাকতে ডাকতে সারে গামা পাধা নিসা-করে সুর খেলাচ্ছে।
বিশ্বম্ভর । হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। আর সাতটা সুরের সঙ্গে রামধনুর সাতটে রঙ একবার ইদিকে আসছে, একবার উদিকে যাচ্ছে।
বেহারী । সুরের সঙ্গে রঙের সঙ্গে না মিশে দেখতে দেখতে দেখতে দেখতে চারদিক সব ফর্সা হয়ে উঠল-আমি ত অবাক হ’য়ে হাঁ করে রইলুম।
বিশ্বম্ভর । যে বলে এটা বাজে স্বপ্ন, সে নাস্তিক!
গুরুজী । অতি সুন্দর, অতি সুন্দর! এ একেবারে ভেতরকার প্রশ্নে এসে ঠেকেছে-এতদিন বলব বলব বলেও যা বলা হয়নি, সেই কথার মূলে এসে ঘা দিয়েছে। বৎস হরেকানন্দ, তুমি স্বপ্নে যা দেখেছ, তা যথার্থই বটে।
বেহারী । ও ত স্বপ্ন দেখেনি-আমি দেখেছিলুম-
পটলা । হ্যাঁ-ওরা ত দেখেনি-আমরা দেখেছিলুম-
হরেকানন্দ। আমি ত এই বিষয়েই প্রশ্ন করব ভেবেছিলাম কিনা। ঐ যে ভেতরকার প্রশ্ন যেটা বলে বলেও বলা হচ্ছে না, আমার প্রশ্নটাই হচ্ছে তাই।
গুরুজী । হ্যাঁ, তোমরা স্বপ্নে যা দেখেছ, তা যথার্থই বটে। শব্দই আলোক। শব্দই বিশ্ব-শব্দই সৃষ্টি-শব্দই সব। আর দেখ, সৃষ্টির আদিতে এক অনাহত শব্দ ছিল, আর কিছুই ছিল না। দেখ-প্রলয়ের শেষে যখন আর কিছু থাকবে না-তখনও শব্দ থাকবে। এই যে শব্দ, এ সেই শব্দ। যাবচ্চন্দ্র দিবাকর, যে শব্দের আর অন্ত নাই, মানুষ ঘাটে ঘাটে ধাপে ধাপে যুগে যুগে প্রশ্ন করতে করতে যার কিনারা পায়নি-সেই শব্দের তুমি নাগাল পেয়েছ। একে বলে অন্তদৃষ্টি। দেখ, শব্দকে তোমরা তাচ্ছিল্য কোরো না-এই শব্দকে চিনতে পারেনি বলেই, আমি আসার আগে, যা যা কিছু করতে চেয়েছ, সব ব্যার্থ হয়ে গেছে। এই কথাটুকু বলবার জন্যই আমি এতদিন দেহ ধারন করে আছি।
বিশ্বম্ভর । হ্যাঁ হ্যাঁ-ঠিক বলেছেন। আমার মনের কথাটা টেনে বলেছেন। এ সংসার মায়াময়-সবই অনিত্য-দারাপুত্রপরিবার তুমি কার কে তোমার? সব দুদিন আছে দুদিন নেই। বুঝলেন না? আমি ছেলেবেলায় একটা পদ্য লিখেছিলুম, শুনবেন? কি না?

ভব পান্থবাসে এসে কেঁদে কেঁদে হেসে হেসে
ভুগে ভুগে কেশে কেশে, দেশে দেশে ভেসে ভেসে
কাছে এসে ঘেঁষে ঘেঁষে এত ভালোবেসে বেসে
টাকা মেরে পালালি শেষে!

গুরুজী । বেদ বল, পুরাণ বল, স্মৃতি বল, এসব কি? কতগুলো বাক্য, অর্থাৎ কতগুলো শব্দ-এই ত? এই যে সব শঙ্খ ঘন্টা মন্ত্রতন্ত্র হীং কীং ঝাড় ফুঁক নাম জপ-এসব কি? একি শব্দ নয়? সৃষ্টির গোড়াতে প্রাণ কারণ, আকাশ সব মিলে যখন হব হব কচ্ছিল, তখন যদি ‘ওম্‌’ শব্দ করে প্রণব ধ্বনি না হত, তবে কি সৃষ্টি হতে পারত? শব্দে সৃষ্টি, শব্দে স্থিতি, শব্দে প্রলয়। বেশি কথায় কাজ কি? বিষ্ণুর হাতে শঙ্খ কেন? শিবের মুখে বিষাণ কেন? হাতে তার ডমরু কেন? নারদ যখন স্বর্গে যায়, চলতে চলতে বীণা বাজায় কেন? এসব কি শব্দ নয়? আর আদিকাল হতে যে অনাহত শব্দ যোগীদের ধ্যান কর্ণে ধ্বনিত হয়ে আসছে, সে কি শব্দ নয়? আর সেই কালিন্দীর কুলে, যমুনার তীরে শ্যামের যে বাঁশরী বেজেছিল, সেও কি শব্দ নয়? এমনি করে ভেবে দেখ, যা ভাববে তাই শব্দ-শাস্ত্রে বলেছে ‘শব্দ ব্রহ্মা’-
বিশ্বম্ভর । আমাদের মতিলাল সেবার যে ভুঁইপটকা বানিয়েছিল, উঃ-তার যা শব্দ! আমি ও বিষয়ে একটা কবিতা লিখেছি শুনবেন?
হরেকানন্দ। দেখ্‌, গুরুজীর সামনে এরকম বেয়াদবি, এটা কি ভালো হচ্ছে?
বিশ্বম্ভর । ভালরে ভাল! ইনি বলছেন স্বপ্নের কথা-উনি তাঁর প্রশ্ন হাঁকাছেন, এ-ও ফোঁড়ন দিচ্ছে-ও-ও ফোঁড়ন দিচ্ছে-আর আমি কথা কইলেই যত দোষ?
বেহারী । আহা! গুরুজী আছেন যে, তাঁকে ডিঙ্গিয়ে কথা বলবে?
বিশ্বম্ভর । গুরুজীর ন্যাজ ধরে ধরেই যে ঘুরতে হবে তার মানে কি?
জগাই । ন্যাজ বলছে! গুরুজির ন্যাজ বলছে!!
পটলা । তুই থাম্‌ না, তোর ন্যাজ ত বলেনি-
গুরুজি । ওরে হতভাগা, শব্দ নিয়ে তোরা ছেলেখেলা করিস-শব্দ যে কি জিনিস আজও তোরা বুঝলিনে। কিন্ত এখন বুঝবার সময় হয়েছে। এই নাও আমার শব্দসংহিতা-এইটে এখন পড়ে নাও। ওর মাঝে আমি দেখিয়েছি যে-এক একটি শব্দ এক একটি চক্র, কেননা শব্দ তার নিজের অর্থের মধ্যে আবদ্ধ থেকে ঘুরে বেড়ায়। তাই বলা হয়েছে অর্থই শব্দের বন্ধন। এই অর্থের বন্ধনটিকে ভেঙ্গে চক্রের মুখ যদি খুলে দাও, তবেই সে মুক্তিগত শব্দ স্পাইরাল মোশান হয়ে কুন্ডুলীক্রমে ঊর্ধ্বমুখে উঠতে থাকে। অর্থের চাপ তখন থাকে না কি না। যে সঙ্কেত জানে সে ঐ কুন্ডলীর সাহায্যে করতে পারে না এমন কাজ নেই। তাই বলছি, তোমরা প্রস্তুত হও-অমাবস্যার অন্ধকার রাত্তিরে সেই সঙ্কেত মন্ত্র দিয়ে তোমাদের দেখাব, শব্দের কি শক্তি! রাতারাতি স্বর্গ বরাবর পৌঁছে দেব। পথ পথ করে ঘুরে বেড়ায়-কিন্তু শব্দ ছাড়া আর দ্বিতীয় পথ নেই।
[শিষ্যগণের উচ্ছ্বাস ও গদগদ ভাব]
[গান-ধুম কীর্তন]

তাই ফিরে তুমি আমি ধাঁধায় দিবস যামী
তাই ফিরে মহাজন পথে-পথে অনুখন
অন্ধ আঁধারে মরে নামি।।
নিজ বেগে নিজ তালে শব্দ ফেরে দেশে কালে
আপনি পথিক পথ চালায় আপন রথ
ভুবন ঘেরিল পথ জালে।
প্রাণে প্রাণে এঁকে বেঁকে পথ যায় হেঁকে হেঁকে
আপনি পথিক পথ চালায় আপন রথ
সেই পথে চল আগে থেকে।।

গুরুজি । পূর্বে পূর্বে ঋষিরা এই শব্দমার্গকে ধরে ধরেও ধরতে পারেননি। কেন? ঐ যে সন্নিসি অমাবস্যার অন্ধকার রাত্তিরে ঘড়ঘড় করে নাক ডাকছিল, কেন ডাকছিল? শব্দমার্গের সন্ধান পেয়েছে কিন্তু তার সঙ্কেতটুকু ধরতে পারেনি। ওরা যে ধরেছে সে সব শব্দের অর্থ নেই, এবং ছিল না- ঢোঁড়া শব্দ। তা করলে ত চলবে না! জ্যান্ত জ্যান্ত শব্দ, যাদের চলৎশক্তি চাপা রয়েছে, ধরে ধরে মট্‌মট্‌ করে তাদের বিষদাঁত ভাঙতে হবে। অর্থের বিষ জমে জমে উঠতে থাকবে-আর ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে কেটে ফেলব। এইজন্য তোমাদের ঐ শব্দসংহিতাখানা পরে রাখতে বলেছি।
[প্রস্থান। শিষ্যগণের ‘শব্দসংহিতা’ পাঠ]

শ্রীশ্রীগুরু প্রসাদগুণে তত্ত্বদৃষ্টি লভি
জগৎখানা ঠেকছে যেন শব্দে আঁকা ছবি।
শব্দ পিছে শব্দ জুড়ি চক্রে গাঁথি মায়া
বাক্য ফেরে ছদ্মদেহে বিশ্ব তারি মায়া।
চক্রমুখে মন্ত্র ঠুকে বাঁধন কর ঢিলা
শব্দ দিয়ে শব্দ কাটো, এই ত শব্দলীলা,
যাঁহা স্বর্গ তাঁহা মর্ত তাঁহা পাতালপুরী
সত্য মিথ্যা একই মূর্তি খেলছে লুকোচুরি!
ভালো মন্দ বিষম ধন্দ্ব কিছু না যায় বোঝা
সহজ কথায় মোচড় দিয়ে বাঁকিয়ে করে সোজা।
ভক্ত বলেন, “আদ্যিকালের সাদার নামই কালো
আঁধার ঘন জমাট হলে তারেই বলে আলো।”
শাস্ত্রে বলে “সৃষ্টি মূলে শব্দ ছিল আদি”
জগৎস্রোতে জড়ের বাঁধন শব্দে রাখে বাঁধি।
বস্তুতত্ত্ব বদ্ধ মায়া সদ্য পরিহরি
শব্দ চক্রে ঘোরে বিশ্ব সূক্ষ্ণ দেহ ধরি।
শব্দ ব্রহ্মা, শব্দ বিষ্ণু, শব্দ সরস্বতী
বিশ্বযজ্ঞ ধ্বংসশেষে শব্দে মাত্র গতি।।

<thead> </thead> <tbody> </tbody>

দ্বিতীয় দৃশ্য স্বর্গ কান্ড_____________________________________________________________
গুরুজি ।

ঘনায়েছে কলিকাল ঘেরিয়ে আঁধার জাল
পাতিয়ে প্রলয় ফাঁদ কাল রাহু ধরে চাঁদ।
ওই শোন অতি দূরে সুদূর অসুর পুরে
ভেদিয়া পাতাল তল ওই ওঠে কোলাহল;
ওই রে আঁধার ফুঁড়ি ওই আসে গুড়ি গুড়ি
ঐ এল লাখে লাখ, দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁক।।

[গান]
ওরে ভাই তোরে তাই কানে কানে কইরে
ঐ আসে ঐ আসে ঐ ঐ ঐ রে
নিঝুম রাতে ফিস্‌ফাস্‌, বাতাস ফেলে নিঃশ্বাস
স্বপ্নে যেন খোঁজে কারে কৈ কৈ কৈ রে!
আঁধার করে চলাচল স্তব্ধ দেহ রক্ত জল
শব্দ নাচে হাড়ে হাড়ে হৈ হৈ হৈ রে।
পান্ডু ছায়া অন্ধ হিম শূন্যে করে ঝিম্‌ ঝিম্‌
ঐরে গেল গা ঘেঁষে আর ত আমি নই রে।
মর্মকথা বলি শোন্‌ লাগল প্রাণে ‘কলিশন’
প্রাণপনে হেঁকে বল মা ভৈ ভৈ ভৈ রে।।
         দেবতা সবে গাত্র তোলো স্বপ্নলীলা সাঙ্গ হল
    দেখ্‌রে জেগে কান্ডটা কি সৃষ্টি বাঁধন ভাঙ্গল নাকি?
         ঈশান কোনে মেঘের পরে শব্দ তরল রক্ত ঝরে
    পান্ডু বরণ দখিনে বামে অন্ধ আঁধার শব্দ নামে।
প্রলয় বাদল রক্ত রাঙ্গা পাগল জেগেছে আগল ভাঙ্গা
উল্কা ঝলকে বিজলী ছোটে গহন শুন্যে শিহরি ওঠে।
তুহিন তিমির ধরণী গায় সভয় পবন থমকি চায়
হরষে পিশাচী পিশাচে কয় রক্ত মড়ক জগতময়।
হে অলক্ষী একি খেলা অনাহূত হেন বেলা
নৃত্য তোমার এমনি ধারা সৃষ্টিছাড়া ছন্দোহারা!
অনাদৃতে হুহুকময়ী খেয়াল তব সবর্জয়ী-
কহ আজি কেন স্কন্ধে, চাপিলে নাছোড়বন্দে।
কেন ঠাট্টা সর্বনাশী, কেন অট্টাঁধার হাসি,
কেন আজি ঘুমটি ভাঙ্গাও, অকারণে চক্ষু রাঙ্গাও?

সকলে ।

[গান]
কেন কেন কেনরে কেন কেন ?
চেঁচিয়ে কাঁচা ঘুম ভাঙ্গ কেন ?
পট্‌কা শব্দ অট্টরোল, শঙ্খ ঘন্টা ঢক্ক ঢোল
স্বর্গপুরী হদ্দ হৈল বাদ্যভান্ড হট্টগোল ।
দেবতা বিলকুল কান্দে গো তল্পিতল্পা বান্ধে গো
পাগলা রাহু একলা তেড়ে গিলতে চাহে চান্দে গো ।
   আগডুম্‌ বাগ্‌ডুম্‌ শব্দ ছায়া চিত্ত গুড়্‌ গুড়্‌ দপ্‌দপায়
দন্ত কড়্‌মড়্‌, হাড্ডি মড়্‌মড়্‌ প্রাণটা ধড়্‌ফড়্‌ সবর্দাই ।।

গুরুজি ।

কাকস্য পরিবেদনা বৎসগণ আর কেঁদ না,
গতস্য শোচনা নাস্তি যথা কর্ম তথা শাস্তি;
মিথ্যে এত কান্না কেন অলমতি বিস্তারেণ ?
অত্র এখন দেবতা সভায় ঠান্ডা হয়ে বস্‌ছে সবাই
তোমরা একটু ক্ষান্ত হও শান্ত হয়ে মন্ত্র কও ।।

[বৃহস্পতি-স্তোত্র]

এ ভাব সঙ্কট অর্ণব মন্থনে মাকুরু সংহার মাকুরু সংহার মাকুরু সংহার হে
হে গুরু গীস্পতি অষ্টম দিক্‌পতি হে গুরু রক্ষ হে হে গুরু রক্ষ হে গুরু হে ।।

[বৃহস্পতির আবির্ভাব]

বৃহস্পতি ।

মাকুরু কোলাহল ভো ভো শিষ্য হে
দরজাটুকু ছেড়ে বোসো আজকে বড় গ্রীষ্ম হে,
আসনটাকে মাড়িও না বোসোনা কেউ সোফাতে ।
তোমার গায়ে গন্ধ বড় সরে দাঁড়াও তফাতে ।
কি বলছিলে বলে ফেল নেইক আমার চাকর বাকর-
সময় কেন নষ্ট কর ক’রে মেলা বকর বকর ?
কারুর বাড়ি যজ্ঞি নাকি বংশ প্রথা চিরন্তন ?
তোমার বুঝি ছেলের ভাতে ফলার ভোজে নিমন্ত্রণ ?
তোমার বুঝি মেয়ের বিয়ে-আটকে ছিল অনেকদিন ?
যা হোক এবার উতরে গেল রয়ে সয়ে বছর তিন ।
তোমার বাড়ি শ্রাদ্ধ নাকি ? ঘর জামাইটি গেছেন মরে,
বেজায় বুঝি ভুগেছিল ডেঙ্গু জ্বরে বছর ভরে ?

সকলে ।

বিপদ কালে হ্যুপস্থিতে ঠাকুর মোদের যুক্তি দাও
ঐ চরণে শরণ নেব মরণ হতে মুক্তি দাও ।।

বৃহস্পতি ।

মরবে যে তা আগেই জানি-যেমনতর অনাসৃষ্টি
ইন্দ্র তোমার এসব দিকে একেবারেই নাইক দৃষ্টি ।
কাজে কর্মে নাইক ছিরি কচ্ছে সবাই যাচ্ছে তাই
অমৃত সে ভেজাল-গোলা দেবতাগুলো খাচ্ছে তাই ।
মড়ক সে ত হবেই এতে সর্দিগর্মি বেরিবেরি
একে একে মরবে সবাই আর বেশিদিন নেই দেরি ।
হাজার কর ডিসিনফেক্টো, হাজার কেন ওষুধ গেলো-
যা হোক তোমরা যে যার মতো উইলপত্র লিখে ফেলো ।
দেবতালীলা সাঙ্গ যদি নেহাৎ যাবে জাহান্নামে
যার যা কিছু দেবার থাকে দাও না লিখে আমার নামে !

[বীণা হস্তে নারদের প্রবেশ ও গান]

ও বীণা তুই দেখবি মজা বাদ্যি বাজা (তারে না তানা)
হেন সুযোগ মাগ্যি বড় ও বীণা তোর ভাগ্যি বড়
এত মজা আর পাবিনা পাগ্‌লা বীণা (তারে না তানা)
নাচি আমি সঙ্গে তোরি, বাহু তুলে রঙ করি
তোরে বাজাই আপনি বাজি নাচিয়ে নাচি (তারে না তানা)
লাঠালাঠি রক্ত মাটি দেখে লাগে দাঁত-কপাটি
ও বীণা তুই থাকবি তফাৎ লাগবে হঠাৎ (তারে না তানা)

বৃহস্পতি ।

কি গো ঠাকুর অলুক্ষুণে-ঝাড়তে এলে পায়ের ধুলো ?
দেখছি এবার হ্যাপায় পড়ে মরবে তবে দেবতাগুলো ।

নারদ ।

নাকে ছিপি কানে তুলো ভায়া বড় বিজ্ঞ যে
ডিঙ্গাতে চাও টপাট্টপ আমা হেন দিগগজে !

[ইন্দ্র ও অশ্বিনীর প্রবেশ]

অশ্বিনী ।

শব্দ শুনে দৌড়ে এলাম যুদ্ধটুদ্ধ লাগল কি ?
দৈত্য দেখে ভিষণ ভয়ে দেবতারা ভাগল কি ?

বৃহস্পতি ।

ওঁর কথা কেউ শুনো নাক, ঠাকুর বড় রগচটা
তাই ত ইন্দ্র তোমার হাতে, দেখছি না যে বজ্রটা ।

ইন্দ্র ।

বজ্র সেকি হেথাই আছে, গিয়েছে সে কোন্‌ চুলোয়
তার বেঁধে তায় কাজে লাগায় মর্তলোকের লোকগুলোয় ।

নারদ ।

তোমাদের খুব স্নেহ করি, কাজ কি বল সবিস্তার
এমনি উপায় বাৎলে দেব এক্কেবারে পরিষ্কার ।

বৃহস্পতি ।

একটা উপায় আছে বটে-তোমায় সেটা খুলে জানাই
হাড় ক’খানা দাও না মোদের নতুন করে বজ্র বানাই ।
তোমার হাড়ে বজ্র গড়ে পিট্‌লে পরে দমাদম্‌
একটি ঘায়ে মরবে না যে সেই ব্যাটারাই নরাধম ।
শুষ্ক হাড়ে ঘুণ ধরেছে, সূক্ষ্ণতর শক্তি তায়
জ্বলবে ভালো হাড্ডি তোমার কাজ কি বল বক্তৃতায় ?

নারদ ।

হোঁৎকামুখো গন্ডে গোদ, আমার উপর টিপ্পুনি
আমায় তুমি মরতে বল ? মরবে তুমি এক্ষুনি ।
আমার উপর চক্ষু ঠারো ? আমায় বল কুন্দুলে
মুখে মাখ জুতোর কালি-গালে লাগাও চুন গুলে ।

[কার্তিকের প্রবেশ]

কার্তিক ।

আমায় সবাই মাফ কর ভাই, হয়ে গেল আসতে দেরি
হিসেব মত পছন্দসই হচ্ছিল না চোস্ত টেরি !
গোঁফ জোড়াটা মেপে দেখি ডাইনে একটু গেছে উঠে
লাগল দেরি সামলে নিতে টেনেটুনে ছেঁটেছুঁটে ।
চাকর ব্যাটা খেয়ালশূন্য কাজে কর্মে ঢিলে দিয়ে
শেষ মুহুর্তে কাপড়খানা কুঁচিয়ে দিল গিলে দিয়ে ।

নারদ ।

তুমিই এদের ভরসা এদের তুমিই এদের কর্ণধার
তুমিই এদের ত্রাণ কর ভাই, নইলে সবাই অন্ধকার।
বলছি এদের বারে বারে, নেইরে উপায় যুদ্ধ বই
তোমরা সবাই হট্‌লে এখন, কোথায় আমি মুখ লুকাই ?

কার্তিক ।

লড়াই করে মরতে যাবে, আর ত আমার সেদিন নয়
কারে তুমি হুকুম কর, শর্মা কারো অধীন নয় ।
যে কয় জনা যুদ্ধে যাবে, ফিরবে না তার অর্ধেকও
তল্পিতল্পা বাঁধ রে ভাই, থাকতে সময় পথ দেখ।

১ ।

আমি বলি ঢের হয়েছে শান্তি বাদ্য পিটিয়ে দাও
হাঙ্গামাতে কাজ কি বাপু আপস করে মিটিয়ে দাও।

২ ।

শাস্ত্রে বলে শোন্‌ রে চাচা আপ্‌না বাঁচা আগে ভাগে-
পিট্টি খেয়ে মরবি কেন থাকলে দেহ কাজে লাগে ।

৩ ।

কিসের দাদা স্বর্গভূমি কিসের পুরী পাঁচতলা
দৈত্য যখন ধরবে ঠেসে করবে তুমি কাঁচকলা ।

৪ ।

ত্যাগ কর ভাই মিথ্যে মায়া ত্যাগ কর এ স্বর্গধাম
আর ত সবি ছাড়তে পার প্রাণটুকুরই বড্ড দাম ।

নারদ ।

কিসের এত ভাবনা তোদের মিথ্যে এত কিসের ডর ?
যুক্তি করে দেখ্‌না ভেবে ঠান্ডা হয়ে হিসেব কর ।
না হয় দুটো খস্‌বে মাথা না হয় দুটো ভাঙ্গত ঠ্যাং
তাই বলে কি ঢুকবি ভয়ে কুয়োর মধ্যে জ্যান্ত ব্যাং ?
আমরা যদি দেবতা হতুম দৈত্য দেখলে ক্যাঁক্‌ ক’রে
ঘাড়টি ধরে পিট্টি দিতুম হাড্ডি মাসে এক ক’রে ।

ইন্দ্র ।

অস্ত্র গুলো মর্চে-পড়া অনেক কালের অনভ্যাস
এমন হলে লড়বে নাকো স্বয়ং বলেন বেদব্যাস ।

নারদ ।

বিষ্টু বল আত্মাপাখি । এমন দিনো ঘটল শেষে
দৈত্য বেড়ায় বুক ফুলিয়ে দেবতা পালায় ছদ্মবেশে !
আসছি ধেয়ে ব্যাস্ত হয়ে পয়সা-কড়ি খরচ ক’রে
করলে না কেউ খাতির আমায় দাখল না কেউ গরজ় ক’রে ?
তোমরা সবাই ডুবে মরো-ইন্দ্র তোমার গলায় দড়ি
কার্তিকেয় মরবে তুমি ঐরাবতের তলায় পড়ি ।
মরব এবার দেহত্যাগে এ-ভবে আর থাকছি নেকো
ঐখানেতেই মূর্ছা যাব তোমরা সবাই সাক্ষী থেকো ।

বৃহস্পতি ।

ব্রক্ষহত্যা আমার ঘরে ও ঠাকুর তোর পারে পড়ি
মরতে চাও ত বাইরে মর আমরা কেন দায়ে পড়ি ?
অশ্বিনী গো বদ্যিমশাই দাঁড়িয়ে কেন চুপ্‌টি ক’রে ?
ঠাকুর হেথা তুলছে পটল বাঁচাও তারে যুক্তি ক’রে ।

[অশ্বিনী কর্তৃক রোগ পরীক্ষাদি]

অশ্বিনী ।

বদ্যি রাজা ধন্বন্তরি শিষ্য হয়ে স্মরণ করি
তোমার নামে মন্ত্র পড়ি হাতে নিলাম জ্যান্ত বড়ি
প্রেত পিশাচ শুদ্ধি হোক যে খাবে তার বুদ্ধি হোক ।
রুষ্ট বায়ু ক্ষান্ত হও মরা মানুষ জ্যান্ত হও
মুক্ত হবে পিত্ত দোষ নিত্য রবে চিত্ততোষ
লুপ্ত নাড়ি শক্ত বেশ উঠবে কেঁচে পক্ক কেশ ।
ঘুচবে পিলে ছুটবে বাত ফোক্‌লা মুখে উঠবে দাঁত
রাত্রি দিনে ফুর্তি রবে কার্তিকেরি মূর্তি হবে ।
কিন্তু যারা মিথ্যে কয় নাইকো যাদের চিত্তে ভয়
মিথ্যে রোগের নিত্য ভান ওষুধ তাদের মৃত্যুবাণ ।
রোগ যেথা নয় সত্যিকার তোর পরে নাই ভক্তি যার
জ্যান্ত বড়ি বিষ বড়ি কন্ঠে তাদেরর দিস্‌ দড়ি।
নয়কো যে-জন শান্তরকম হয় যেন সে জ্যান্ত-জখম-
নৃত্য কোঁদন বন্ধ রবে চক্ষু দুটি অন্ধ হবে,
জ্বলবে গরল তিক্ত ধারা নাচবে রোগী ক্ষিপ্র পারা
গন্ডে ফোঁড়া তিন্ডে বাত ভন্ডজনের মুন্ডুপাত ।
ও বড়ি তুই নিদান কর বিচার বুঝে বিধান কর
কপট রোগী খবরদার ওষুধ আমার সমঝদার ।

[নারদের গাত্রত্থান]

নারদ ।

গা-ঝিম্‌ঝিম মাথা ঘোরা এক্কেবারে কেটে গেল
মূর্ছা আমার আপনি সারে ওষুধটা কেউ চেটে ফেল ।
হায় রে হায় কলির ফেরে দেবতা গুরু কেউ ভোগ না পায়
যার লাগি লোক চুরি করে চোর ব’লে সে চোখ পাকায় ।
তোদের ভেবেই শরীর মাটি রাত্রে আমার ঘুমটি নেই
তোদের ছেড়ে জগৎ যেন ব্যাঞ্জনেতে নুনটি নেই ।
তোদের তরেই মূর্ছা গেলাম, তোদের তরেই প্রাণটি ধরি
তোরাই আমার মাথার মাণিক তোরাই আমার কলসী দড়ি ।
এই কি তোদের দেবতাগিরি এই কি সাহস জ্বলন্ত !
দুয়ো দেবতা দুয়ো ইন্দ্র দেবতাকুলের কলঙ্ক ।

[গান]

বীণা রে এই কি রে তোর সেই সনাতন দেবতা এরা

বৃহস্পতি ।

রাখ তোমার বকর বকর ভগ্ন ঢেঁকির কচকচি
মিথ্যে তুমি প্যাঁচাল পাড় বাক্য ঝাড় দশগজি ।
ঐদিকে যে বিশ্ব ডোবে বান ডেকেছে সৃষ্টিতে
লুটিয়ে গেল চুটিয়ে গেল শব্দ বাণের বৃষ্টিতে ।
অর্থহারা শব্দ ফেরে স্থাবর হতে জঙ্গমে
বিশ্বব্যাপার উধাও হল শব্দ সাগর সঙ্গমে ।
ঘূর্ণি পাকের ছন্দ জাগে গুপ্তগভীর গর্জনে
মুক্ত কৃপণ শক্তি মাতে অর্থমহিষ মর্দনে ।
আদিকালের বাদ্যি বাজে স্বর্গ মর্ত ফক্কিকার
ধাক্কা লাগে গোলকধামে রোধ করে তায় শক্তি কার ।
শব্দ ধারায় বর্ষা যেন কৃষ্ণ ভাদ্রে অষ্টমী
শীঘ্র দেখ ছিদ্র খুঁজে কার এ সকল নষ্টামী ।

গুরুজি ।

ওরে বাস্‌ রে । এমনি ব্যাপার ! আর কি আছে রক্ষে ?
আরেকটুকুন সবুর কর দখবে ধোঁয়া চক্ষে ।
মন্ত্র নাচে ছন্দ নাচে শব্দ নাচে রঙ্গে
বুকের শব্দ শোষণ করে রক্ত ধারার সঙ্গে ।
দেখবে শেষে শব্দ জমে হাত-পা হবে ঠান্ডা
শক্ত কঠিন শব্দ দিয়ে মারবে মাথায় ডান্ডা ।
অর্থ বাঁধন হুড়্‌কো ভেঙ্গে শব্দ এল পশ্চিমে
যার খুশি হয় বসে থাক আমরা দাদা বসছিনে ।

[সকলের প্রস্থান]

<thead> </thead> <tbody> </tbody>

তৃতীয় দৃশ্য _____________________________________________________________
[স্বর্গপথে সশিষ্য গুরুজি-বহু পশ্চাতে বিশ্বম্ভর]
বিশ্বকর্মা ।

আদিকাল হতে বিশ্ব ফিরে মহাচক্রপথে,
চক্রে চলে জলস্থল, চক্রে ঘোরে ভূমন্ডল-
সেই চক্রে চির গন্ডি ঘেরা শব্দ করে চলাফেরা ।
মহাকাল ফিরে শূন্য বস্তুরূপ মাগি, স্পর্শে তার শব্দ উঠে জাগি ।
অর্থ তারে চক্রপথে টানি ঘোরায় আপন ঘানি-
বাক-অর্থ দোঁহে যুক্ত নিত্য বসবাস ইতি কালিদাস ।।
আজ কেন রুদ্ধ পথ খুলে মন্ত্রাঘাত করি শব্দ মূলে
ছিন্ন করে শব্দের বাঁধন-অসাধ্য সাধন ।
কাল চক্র বূহ্য ভেদ করি ঊর্ধ্বগতি কুন্ডলীর মুক্ত পথ ধরি
জাগে ঐ নিদ্রিত অশনি হাহাকার ক্রন্দনের ধ্বনি।
অন্ধকার রাতে অঙ্গহীন শব্দের পশ্চাতে
কার তপ্ত নিশ্বাসের রুদ্ধ অভিশাপ জপিছে প্রলাপ ?

[মন্ত্রপাঠ]

হলদে সবুজ ওরাং ওটাং ইঁটপাটকেল চিৎপটাং
গন্ধগোকুল হিজিবিজি নো এড্‌মিশান ভেরি বিজি।
নন্দী ভৃঙ্গী সারে গামা নেইমামা তাই কানামামা
মুশকিল আশান উড়ে মালি ধর্মতলায় কর্মখালি
  চীনে বাদাম সর্দি কাশি ব্লটিংপেপার বাঘের মাসি।

গুরুজি । দাঁড়াও আমদের গতি যে ক্রমশঃ মন্দীভূত হয়ে আসছে, সেটা কি তোমরা অনুভব করছ?
সকলে । আজ্ঞে, ক্রমশই কমে আসছে-
গুরুজি । এও কি কোনো কারণ নির্ণয় করতে পারছ? কেউ কি পশ্চাতে পড়ে আছে?
বেহারী । আজ্ঞে, আপনার পরেই ত আমি আসছি-
হরেকানন্দ। তার পরেই আমি শ্রীহরেকানন্দ-
জগাই । তারপর আমি জগাই-
পটলা । তারপর আমি-
গুরুজি । তবে এর কারণ কি? শব্দের আকর্ষণটা বেশ অনুভব করছ কি?
পটলা । আজ্ঞে আমার বাক্য পিছন দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে।
গুরুজি । সর্বনাশ!-তবে একবার নির্বিশেষে মন্ত্রটা বেশ ক’রে উচ্চারণ ক’রে শক্তি সঞ্চার ক’রে-তারপর তাকিয়ে দেখ-কিছু দেখা যায় কি না-
সকলে । গৌ গাবৌ গাবঃ- গৌ গাবৌ গাবঃ- গৌ গাবৌ গাবঃ-
বিশ্বম্ভর । ইত্যমরঃ
সকলে । কে শব্দ করে?
পটলা । সেই লোকটা।
সকলে । সর্বনাশ! ও আবার চায় কি?
বিশ্বম্ভর । ঐ যে, তোমরা কোথায় যাচ্ছ-সেইখানে যাব।
গুরুজি । বৎস বিশ্বম্ভর, তুমি আসলেই যদি, তবে এমন পশ্চাতে পড়ে থাকছ কেন?
বিশ্বম্ভর । আজ্ঞে-বেজায় পরিশ্রম লাগছে-
গুরুজি । কেন? তুমি কি কম্যকরূপে মন্ত্রে আরোহণ করতে পার নাই? তুমি কি কোনোরূপ ভার বহন করে আনছ?
বিশ্বম্ভর । আজ্ঞে-এই শরীরটে-
গুরুজি । ও সব ছেড়ে দাও-কিছুক্ষণ ধুক্‌ধুক্‌ মন্ত্র জপ কর-ও সব স্থূল সংস্কার কেটে যাবে-

[ছাত্রগণের মন্ত্রজপ]

বিশ্বম্ভর । আমি ভাবছিলুম-
সকলে । ভাবছিলে? সর্বনাশ!-সর্বনাশ, ভেব না, ভেব না-
গুরুজি । শব্দের ঘাড়ে চিন্তা কেন চাপাচ্ছ-? ছিঃ! অমন ক’রে শব্দশক্তি ম্লান কোরো না-আমার পূর্ব উপদেশ স্মরণ কর-শব্দের সঙ্গে তার অর্থের যে সূক্ষ্ণ ভেদাভেদ আছে, সাধারন লোকে সেটা ধরতে পারে না।
সকলে । তাদের শব্দজ্ঞান উজ্জ্বল হয়নি-তারা শব্দের রূপটি ধরতে জানে না-
গুরুজি । তারা ধরে তার অর্থকে। তারা শব্দ চক্রের আবর্তের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যায়। যেমন কর্মবন্ধন, যেমন মোহবন্ধন, যেমন সংসারবন্ধন,-তেমনি শব্দবন্ধন।
সকলে । শব্দবন্ধনে পড়োনা-প’ড়োনা-
গুরুজি । শব্দকে যে অর্থ দিয়ে ভোলায়-সে অর্থপিশাচ। শব্দকে আটকাতে গিয়ে সে নিজেই আটকা পড়ে। নিজেকেও ঠকায় শব্দকেও বঞ্চিত করে। সে কেমন জান? এই মনে কর, তুমি বললে ‘পৃথিবী’-তার অর্থ করে দেখ দেখি?-সূর্যের চারদিকে ঘোরে তা বলা হল না-পৃথিবীর উত্তরে কি দক্ষিণে কি, তা বলা হল না-তার তিন ভাগ জল এক ভাগ স্থল, তা বলা হল না-তবে বলা হল কি? গোটা পৃথিবীটার সবই ত বাদ গেল। এটা কি ভাল?
বিশ্বম্ভর । আজ্ঞে না-এটা ত ভালো ঠেক্‌ছে না-তাহলে কি করা যায়?
গুরুজি । তাই বলেছিলাম-শব্দের বিষদাঁত যে অর্থ, আগে তাকে ভাঙ্গ। শুধু পৃথিবী নয়, শুধু গোল নয়, শুধু এটা নয়, শুধু ওটা নয়; আবার এটাই ওটা, ওটাই সেটা-তাও নয়। তবে কি? না সবই সব। তাকেই আমরা বলি

গৌ গাবৌ গাবঃ-
[গৌ গাবৌ গাবঃ-
হলদে সবুজ ওরাং ওটাং-ইত্যাদি]


[বিশ্বকর্মার আবির্ভাব]

বিশ্বকর্মা ।

নিঝুম তিমির তীরে শব্দহারা অর্থ আসে ফিরে
কালের বাঁধন টুঁটে দশদিক কেঁদে উঠে।
দশদিক উড়ে শব্দধূলি উড়ে যায় মোক্ষপথ ভুলি-
ভেবেছ কি উদ্ধতের হবে না শাসন? জাগে নি কি সুপ্ত হুতাশন?
বিদ্রোহের বাজেনি সানাই? শব্দ আছে প্রতিশব্দ নাই?
শব্দমুখে প্রতিলোম শক্তি এস ঘিরে কুন্ডুলীর মুখ যাও ফিরে।
শব্দঘন অন্ধকার নিত্যঅর্থভারে নামে বৃষ্টি ধারে
শব্দ যজ্ঞ হবি কুন্ড অফুরন্ত ধুম এই মারি শব্দকল্পদ্রুম।

[‘দ্রুম’ শব্দে সশিষ্য গুরুজির স্বর্গ হইতে পতন]

যবনিকা পতন

এই বিষয়শ্রণীতে বর্তমানে কোন পাতা বা মিডিয়া ফাইল নেই।