বিষয়শ্রেণী:নাটক
উইকিসংকলন থেকে
- ↑ সুকুমার রায়
<thead> </thead> <tbody> </tbody>
| প্রথম দৃশ্য | _____________________________________________________________ [গুরুজির আশ্রম। হরেকানন্দ, জগাই, বেহারী, পটলা, বিশ্বম্ভর ও অন্যান্য শিষ্যেরা উপবিষ্ট] |
|---|---|
| হরেকানন্দ। | দেখ্ জগাই, তুই বললে বিশ্বাস করবিনে- |
| সকলে । | কেউ বিশ্বাস করবে না- |
| হরেকানন্দ। | কাল থেকে মনটা আমার এমনি ওলটপালট করছে, সারারাত আর ঘুম হয়নি। দুপুরে একটু তন্দ্রা ভাব এয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ প্রশ্নটা তেড়ে উঠে মনের মধ্যে এমনি গুঁতো মারলে- |
| বেহারী । | ওর একটা কবিরাজি ওষুধ আছে খুব ভালো-আয়াপানের শেকড় না বেটে- |
| হরেকানন্দ। | দেখ্ বড় বেশি ওপর চালাকি কচ্চিস, এক কথায় সবকটার মুখ বন্ধ করে দিতে পারি জানিস্? পরশু রাত্তিরে গুরুজি নিজে আমায় ডেকে নিয়ে যেসব ভেতরকার কথা বলেছেন, জানিস্? |
| বেহারী । | হ্যাঁরে পটলা, সত্যি নাকি? |
| পটলা । | কিসের সব মিছে কথা। |
| বেহারী । | এমন মিছে কথা কইতে পারে এই হরেটা-ছিঃ ছিঃ-রাম, রাম- [বেহারীর সংগীত] রাম কহ-ইয়ে রাম কহ |
| হরেকানন্দ। | প্রশ্ন যখন এয়েচে, জবাব তার একটা আসবেই আসবে-তা তোমাদের ধমকানি আর চোখরাঙ্গানি, হাসি ঠাট্টা আর এয়ার্কি, এসব বেশিদিন টিঁকছে না। |
| বিশ্বম্ভর । | হ্যাঁ হে, তর্কটা কিসের একবার শুনতে পারি কি? কিই বা প্রশ্ন হল আর তা নিয়ে মামলাটাই বা কিসের?-আচ্ছা, হরিচরণ কি বল? |
| হরেকানন্দ। | হরিচরণ? দেখলি, আমায় হরিচরণ বলছে!-‘হরিচরণ’ কি মশাই? |
| নিশ্বম্ভর । | তবে, ওরা যে ‘হরে হরে’ বলছিল!- |
| হরেকানন্দ। | হরে বললেই হরিচরণ? ‘ক’ বললেই কার্তিকচন্দ্র? |
| জগাই । | ওঁর নাম শ্রীহরেকানন্দ- |
| বিশ্বম্ভর । | হরে কাননগু- |
| হরেকানন্দ। | আরে খেলে যা! তুমি কোথাকার মুখ্যু হে? |
| বিশ্বম্ভর । | আজ্ঞে, ফরাশডাঙ্গার-আপনি? |
| হরেকানন্দ। | দেখ, এই যে ছ্যাবলামি আর ‘ডোন্ট কেয়ার’ এসব ভালো নয়। কাউকে যদি নাই মানবে, তবে এদিকে এসো টেসো না। [হরেকানন্দের মৌনাবলম্বন-সাড়ম্বর] |
| বেহারী । | (জানান্তিকে) দেখ্ পটলা-সিদিন রাত্তিরে একটা স্বপ্ন দেখেছিলুম-ক’দিন থেকে গুরুজিকে বলব বলব ভাবছি-কিন্তু এই হরেটার জন্য বলা হচ্ছে না। দেখলি না, সেদিন ওই ফকিরের গল্পটা বলতেই কিরকম হেসে উঠল-গল্পটা জমতেই দিল না। |
| বিশ্বম্ভর । | হ্যাঁ হ্যাঁ? ফকিরের স্বপ্নটা কি হয়েছিল? |
| বেহারী । | আ মোলো যা! মশাই, আমরা কথা কিইছি-আমনি মধ্যে থেকে অমন ধারা করছেন কেন? |
| বিশ্বম্ভর । | ও বাবা! রো দেখি ফোঁস্ করে। মশাই, আমার ঘাট হয়েছে-আপনাদের কথা আপনারা বলুন-আমার ওসব শুনে টুনে দরকার নেই-
শুনতে পাবিনে রে শোনা হবে না |
| বেহারী । | আহা, রাগ করেন কেন মশাই? আমি স্বপ্ন দেখেছি বই ত নয়-আর সে স্বপ্নও এমন কিছু নয়। আমি দেখলুম, একটা অন্ধকার গর্তের মধ্যে এক সন্নিসি বসে বসে ঘড় ঘড় করে নাক ডাকছে! |
| বিশ্বম্ভর । | বলেন কি মশাই? তারপর? |
| বেহারী । | বাস্! তারপর আর কি? সে নাক ডাকছে ত ডাকছেই। |
| বিশ্বম্ভর । | কি আশ্চর্য! আপনার গুরুজিকে জিজ্ঞেস করবেন ত- |
| পটলা । | হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটা চেপে গেলে চলবে না দাদা-ওটা বলতে হবে-দেখিস্, তখন হরেটার মুখ একেবারে দিস্ কাইন্ড অফ স্মল হয়ে যাবে। |
| বিশ্বম্ভর । | হ্যাঁ, বুঝলেন, বেশ একটু রঙ চং দিয়ে বলবেন। |
| বেহারী । | আ মোলো যা! আমার স্বপ্ন আমার যেমন ইচ্ছে তেমন করে বলব। [গুরুজির শুভাগমন । হরেকানন্দ ও বেহারীলালের যুগপৎ কথা বলিবার চেষ্টা] |
| হরেকানন্দ। | একটা প্রশ্ন এই ক’দিন ধরে- |
| বেহারী । | সিদিন একটা স্বপ্ন দেখলুম- |
| হরেকানন্দ। | তার জন্য দু’দিন ধরে আর সোয়াস্তি নেই- |
| বেহারী । | একটু নিরিবিলি যে জিজ্ঞেস করব তার ত যো নেই- |
| হরেকানন্দ। | তাই জগাইকে আমি বলেছিলুম- |
| বেহারী । | পটলা জানে আর এই ভাদ্রলোকটি সাক্ষী আছেন- |
| হরেকানন্দ। | আঃ কথা বলতে দাও না- |
| বেহারী । | কেন ওরকম করছ বল দেখি? |
| গুরুজী । | এত গোলমাল কিসের? |
| বেহারী । | আজ্ঞে, হরে বড় গোলমাল কচ্চে- |
| হরেকানন্দ। | বিলক্ষণ! দেখলেন মশাই- |
| বেহারী । | হয়েছে কি আমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলুম- |
| বিশ্বম্ভর । | হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা সাক্ষী আছি। |
| বেহারী । | আমি স্বপ্ন দেখলুম, অমাবস্যার রাত্তিরে একটা অন্ধকার গর্তের মধ্যে ঢুকে আর বেরুবার পথ পাচ্ছিনে। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় দেখি এক সন্নিসি- |
| পটলা । | তার মাথায় এয়া বড় জটা- |
| বিশ্বম্ভর । | তার গায়ে মাথায় ভস্মমাখা-তার উপর রক্ত-চন্দনের ছিটে- |
| বেহারী । | (স্বগত) কি আপদ! স্বপ্ন দেখলুম আমি আর রঙ ফলাচ্ছেন ওঁরা!- সন্নিসিকে খাতির টাতির করে পথ জিজ্ঞেস করলুম-বললে বিশ্বাস করবেন না মশাই, সে কথার জবাবই দিলে না। বসে ঘড়ঘড়, ঘড়ঘড় করে নাক ডাকছে, ত ডাকছেই। |
| পটলা । | সে নাক ডাকানি এক অদ্ভুত ব্যাপার-নাক ডাকতে ডাকতে সারে গামা পাধা নিসা-করে সুর খেলাচ্ছে। |
| বিশ্বম্ভর । | হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। আর সাতটা সুরের সঙ্গে রামধনুর সাতটে রঙ একবার ইদিকে আসছে, একবার উদিকে যাচ্ছে। |
| বেহারী । | সুরের সঙ্গে রঙের সঙ্গে না মিশে দেখতে দেখতে দেখতে দেখতে চারদিক সব ফর্সা হয়ে উঠল-আমি ত অবাক হ’য়ে হাঁ করে রইলুম। |
| বিশ্বম্ভর । | যে বলে এটা বাজে স্বপ্ন, সে নাস্তিক! |
| গুরুজী । | অতি সুন্দর, অতি সুন্দর! এ একেবারে ভেতরকার প্রশ্নে এসে ঠেকেছে-এতদিন বলব বলব বলেও যা বলা হয়নি, সেই কথার মূলে এসে ঘা দিয়েছে। বৎস হরেকানন্দ, তুমি স্বপ্নে যা দেখেছ, তা যথার্থই বটে। |
| বেহারী । | ও ত স্বপ্ন দেখেনি-আমি দেখেছিলুম- |
| পটলা । | হ্যাঁ-ওরা ত দেখেনি-আমরা দেখেছিলুম- |
| হরেকানন্দ। | আমি ত এই বিষয়েই প্রশ্ন করব ভেবেছিলাম কিনা। ঐ যে ভেতরকার প্রশ্ন যেটা বলে বলেও বলা হচ্ছে না, আমার প্রশ্নটাই হচ্ছে তাই। |
| গুরুজী । | হ্যাঁ, তোমরা স্বপ্নে যা দেখেছ, তা যথার্থই বটে। শব্দই আলোক। শব্দই বিশ্ব-শব্দই সৃষ্টি-শব্দই সব। আর দেখ, সৃষ্টির আদিতে এক অনাহত শব্দ ছিল, আর কিছুই ছিল না। দেখ-প্রলয়ের শেষে যখন আর কিছু থাকবে না-তখনও শব্দ থাকবে। এই যে শব্দ, এ সেই শব্দ। যাবচ্চন্দ্র দিবাকর, যে শব্দের আর অন্ত নাই, মানুষ ঘাটে ঘাটে ধাপে ধাপে যুগে যুগে প্রশ্ন করতে করতে যার কিনারা পায়নি-সেই শব্দের তুমি নাগাল পেয়েছ। একে বলে অন্তদৃষ্টি। দেখ, শব্দকে তোমরা তাচ্ছিল্য কোরো না-এই শব্দকে চিনতে পারেনি বলেই, আমি আসার আগে, যা যা কিছু করতে চেয়েছ, সব ব্যার্থ হয়ে গেছে। এই কথাটুকু বলবার জন্যই আমি এতদিন দেহ ধারন করে আছি। |
| বিশ্বম্ভর । | হ্যাঁ হ্যাঁ-ঠিক বলেছেন। আমার মনের কথাটা টেনে বলেছেন। এ সংসার মায়াময়-সবই অনিত্য-দারাপুত্রপরিবার তুমি কার কে তোমার? সব দুদিন আছে দুদিন নেই। বুঝলেন না? আমি ছেলেবেলায় একটা পদ্য লিখেছিলুম, শুনবেন? কি না? ভব পান্থবাসে এসে কেঁদে কেঁদে হেসে হেসে |
| গুরুজী । | বেদ বল, পুরাণ বল, স্মৃতি বল, এসব কি? কতগুলো বাক্য, অর্থাৎ কতগুলো শব্দ-এই ত? এই যে সব শঙ্খ ঘন্টা মন্ত্রতন্ত্র হীং কীং ঝাড় ফুঁক নাম জপ-এসব কি? একি শব্দ নয়? সৃষ্টির গোড়াতে প্রাণ কারণ, আকাশ সব মিলে যখন হব হব কচ্ছিল, তখন যদি ‘ওম্’ শব্দ করে প্রণব ধ্বনি না হত, তবে কি সৃষ্টি হতে পারত? শব্দে সৃষ্টি, শব্দে স্থিতি, শব্দে প্রলয়। বেশি কথায় কাজ কি? বিষ্ণুর হাতে শঙ্খ কেন? শিবের মুখে বিষাণ কেন? হাতে তার ডমরু কেন? নারদ যখন স্বর্গে যায়, চলতে চলতে বীণা বাজায় কেন? এসব কি শব্দ নয়? আর আদিকাল হতে যে অনাহত শব্দ যোগীদের ধ্যান কর্ণে ধ্বনিত হয়ে আসছে, সে কি শব্দ নয়? আর সেই কালিন্দীর কুলে, যমুনার তীরে শ্যামের যে বাঁশরী বেজেছিল, সেও কি শব্দ নয়? এমনি করে ভেবে দেখ, যা ভাববে তাই শব্দ-শাস্ত্রে বলেছে ‘শব্দ ব্রহ্মা’- |
| বিশ্বম্ভর । | আমাদের মতিলাল সেবার যে ভুঁইপটকা বানিয়েছিল, উঃ-তার যা শব্দ! আমি ও বিষয়ে একটা কবিতা লিখেছি শুনবেন? |
| হরেকানন্দ। | দেখ্, গুরুজীর সামনে এরকম বেয়াদবি, এটা কি ভালো হচ্ছে? |
| বিশ্বম্ভর । | ভালরে ভাল! ইনি বলছেন স্বপ্নের কথা-উনি তাঁর প্রশ্ন হাঁকাছেন, এ-ও ফোঁড়ন দিচ্ছে-ও-ও ফোঁড়ন দিচ্ছে-আর আমি কথা কইলেই যত দোষ? |
| বেহারী । | আহা! গুরুজী আছেন যে, তাঁকে ডিঙ্গিয়ে কথা বলবে? |
| বিশ্বম্ভর । | গুরুজীর ন্যাজ ধরে ধরেই যে ঘুরতে হবে তার মানে কি? |
| জগাই । | ন্যাজ বলছে! গুরুজির ন্যাজ বলছে!! |
| পটলা । | তুই থাম্ না, তোর ন্যাজ ত বলেনি- |
| গুরুজি । | ওরে হতভাগা, শব্দ নিয়ে তোরা ছেলেখেলা করিস-শব্দ যে কি জিনিস আজও তোরা বুঝলিনে। কিন্ত এখন বুঝবার সময় হয়েছে। এই নাও আমার শব্দসংহিতা-এইটে এখন পড়ে নাও। ওর মাঝে আমি দেখিয়েছি যে-এক একটি শব্দ এক একটি চক্র, কেননা শব্দ তার নিজের অর্থের মধ্যে আবদ্ধ থেকে ঘুরে বেড়ায়। তাই বলা হয়েছে অর্থই শব্দের বন্ধন। এই অর্থের বন্ধনটিকে ভেঙ্গে চক্রের মুখ যদি খুলে দাও, তবেই সে মুক্তিগত শব্দ স্পাইরাল মোশান হয়ে কুন্ডুলীক্রমে ঊর্ধ্বমুখে উঠতে থাকে। অর্থের চাপ তখন থাকে না কি না। যে সঙ্কেত জানে সে ঐ কুন্ডলীর সাহায্যে করতে পারে না এমন কাজ নেই। তাই বলছি, তোমরা প্রস্তুত হও-অমাবস্যার অন্ধকার রাত্তিরে সেই সঙ্কেত মন্ত্র দিয়ে তোমাদের দেখাব, শব্দের কি শক্তি! রাতারাতি স্বর্গ বরাবর পৌঁছে দেব। পথ পথ করে ঘুরে বেড়ায়-কিন্তু শব্দ ছাড়া আর দ্বিতীয় পথ নেই। [শিষ্যগণের উচ্ছ্বাস ও গদগদ ভাব] তাই ফিরে তুমি আমি ধাঁধায় দিবস যামী |
| গুরুজি । | পূর্বে পূর্বে ঋষিরা এই শব্দমার্গকে ধরে ধরেও ধরতে পারেননি। কেন? ঐ যে সন্নিসি অমাবস্যার অন্ধকার রাত্তিরে ঘড়ঘড় করে নাক ডাকছিল, কেন ডাকছিল? শব্দমার্গের সন্ধান পেয়েছে কিন্তু তার সঙ্কেতটুকু ধরতে পারেনি। ওরা যে ধরেছে সে সব শব্দের অর্থ নেই, এবং ছিল না- ঢোঁড়া শব্দ। তা করলে ত চলবে না! জ্যান্ত জ্যান্ত শব্দ, যাদের চলৎশক্তি চাপা রয়েছে, ধরে ধরে মট্মট্ করে তাদের বিষদাঁত ভাঙতে হবে। অর্থের বিষ জমে জমে উঠতে থাকবে-আর ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে কেটে ফেলব। এইজন্য তোমাদের ঐ শব্দসংহিতাখানা পরে রাখতে বলেছি। [প্রস্থান। শিষ্যগণের ‘শব্দসংহিতা’ পাঠ] শ্রীশ্রীগুরু প্রসাদগুণে তত্ত্বদৃষ্টি লভি |
<thead> </thead> <tbody> </tbody>
| দ্বিতীয় দৃশ্য | স্বর্গ কান্ড_____________________________________________________________ |
|---|---|
| গুরুজি । |
ঘনায়েছে কলিকাল ঘেরিয়ে আঁধার জাল |
| সকলে । |
[গান] |
| গুরুজি । |
কাকস্য পরিবেদনা বৎসগণ আর কেঁদ না, |
| বৃহস্পতি । |
মাকুরু কোলাহল ভো ভো শিষ্য হে |
| সকলে । |
বিপদ কালে হ্যুপস্থিতে ঠাকুর মোদের যুক্তি দাও |
| বৃহস্পতি । |
মরবে যে তা আগেই জানি-যেমনতর অনাসৃষ্টি |
| বৃহস্পতি । |
কি গো ঠাকুর অলুক্ষুণে-ঝাড়তে এলে পায়ের ধুলো ? |
| নারদ । |
নাকে ছিপি কানে তুলো ভায়া বড় বিজ্ঞ যে |
| অশ্বিনী । |
শব্দ শুনে দৌড়ে এলাম যুদ্ধটুদ্ধ লাগল কি ? |
| বৃহস্পতি । |
ওঁর কথা কেউ শুনো নাক, ঠাকুর বড় রগচটা |
| ইন্দ্র । |
বজ্র সেকি হেথাই আছে, গিয়েছে সে কোন্ চুলোয় |
| নারদ । |
তোমাদের খুব স্নেহ করি, কাজ কি বল সবিস্তার |
| বৃহস্পতি । |
একটা উপায় আছে বটে-তোমায় সেটা খুলে জানাই |
| নারদ । |
হোঁৎকামুখো গন্ডে গোদ, আমার উপর টিপ্পুনি |
| কার্তিক । |
আমায় সবাই মাফ কর ভাই, হয়ে গেল আসতে দেরি |
| নারদ । |
তুমিই এদের ভরসা এদের তুমিই এদের কর্ণধার |
| কার্তিক । |
লড়াই করে মরতে যাবে, আর ত আমার সেদিন নয় |
| ১ । |
আমি বলি ঢের হয়েছে শান্তি বাদ্য পিটিয়ে দাও |
| ২ । |
শাস্ত্রে বলে শোন্ রে চাচা আপ্না বাঁচা আগে ভাগে- |
| ৩ । |
কিসের দাদা স্বর্গভূমি কিসের পুরী পাঁচতলা |
| ৪ । |
ত্যাগ কর ভাই মিথ্যে মায়া ত্যাগ কর এ স্বর্গধাম |
| নারদ । |
কিসের এত ভাবনা তোদের মিথ্যে এত কিসের ডর ? |
| ইন্দ্র । |
অস্ত্র গুলো মর্চে-পড়া অনেক কালের অনভ্যাস |
| নারদ । |
বিষ্টু বল আত্মাপাখি । এমন দিনো ঘটল শেষে |
| বৃহস্পতি । |
ব্রক্ষহত্যা আমার ঘরে ও ঠাকুর তোর পারে পড়ি |
| অশ্বিনী । |
বদ্যি রাজা ধন্বন্তরি শিষ্য হয়ে স্মরণ করি |
| নারদ । |
গা-ঝিম্ঝিম মাথা ঘোরা এক্কেবারে কেটে গেল |
| বৃহস্পতি । |
রাখ তোমার বকর বকর ভগ্ন ঢেঁকির কচকচি |
| গুরুজি । |
ওরে বাস্ রে । এমনি ব্যাপার ! আর কি আছে রক্ষে ? |
<thead> </thead> <tbody> </tbody>
| তৃতীয় দৃশ্য | _____________________________________________________________ [স্বর্গপথে সশিষ্য গুরুজি-বহু পশ্চাতে বিশ্বম্ভর] |
|---|---|
| বিশ্বকর্মা । |
আদিকাল হতে বিশ্ব ফিরে মহাচক্রপথে, |
| গুরুজি । | দাঁড়াও আমদের গতি যে ক্রমশঃ মন্দীভূত হয়ে আসছে, সেটা কি তোমরা অনুভব করছ? |
| সকলে । | আজ্ঞে, ক্রমশই কমে আসছে- |
| গুরুজি । | এও কি কোনো কারণ নির্ণয় করতে পারছ? কেউ কি পশ্চাতে পড়ে আছে? |
| বেহারী । | আজ্ঞে, আপনার পরেই ত আমি আসছি- |
| হরেকানন্দ। | তার পরেই আমি শ্রীহরেকানন্দ- |
| জগাই । | তারপর আমি জগাই- |
| পটলা । | তারপর আমি- |
| গুরুজি । | তবে এর কারণ কি? শব্দের আকর্ষণটা বেশ অনুভব করছ কি? |
| পটলা । | আজ্ঞে আমার বাক্য পিছন দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। |
| গুরুজি । | সর্বনাশ!-তবে একবার নির্বিশেষে মন্ত্রটা বেশ ক’রে উচ্চারণ ক’রে শক্তি সঞ্চার ক’রে-তারপর তাকিয়ে দেখ-কিছু দেখা যায় কি না- |
| সকলে । | গৌ গাবৌ গাবঃ- গৌ গাবৌ গাবঃ- গৌ গাবৌ গাবঃ- |
| বিশ্বম্ভর । | ইত্যমরঃ |
| সকলে । | কে শব্দ করে? |
| পটলা । | সেই লোকটা। |
| সকলে । | সর্বনাশ! ও আবার চায় কি? |
| বিশ্বম্ভর । | ঐ যে, তোমরা কোথায় যাচ্ছ-সেইখানে যাব। |
| গুরুজি । | বৎস বিশ্বম্ভর, তুমি আসলেই যদি, তবে এমন পশ্চাতে পড়ে থাকছ কেন? |
| বিশ্বম্ভর । | আজ্ঞে-বেজায় পরিশ্রম লাগছে- |
| গুরুজি । | কেন? তুমি কি কম্যকরূপে মন্ত্রে আরোহণ করতে পার নাই? তুমি কি কোনোরূপ ভার বহন করে আনছ? |
| বিশ্বম্ভর । | আজ্ঞে-এই শরীরটে- |
| গুরুজি । | ও সব ছেড়ে দাও-কিছুক্ষণ ধুক্ধুক্ মন্ত্র জপ কর-ও সব স্থূল সংস্কার কেটে যাবে- [ছাত্রগণের মন্ত্রজপ] |
| বিশ্বম্ভর । | আমি ভাবছিলুম- |
| সকলে । | ভাবছিলে? সর্বনাশ!-সর্বনাশ, ভেব না, ভেব না- |
| গুরুজি । | শব্দের ঘাড়ে চিন্তা কেন চাপাচ্ছ-? ছিঃ! অমন ক’রে শব্দশক্তি ম্লান কোরো না-আমার পূর্ব উপদেশ স্মরণ কর-শব্দের সঙ্গে তার অর্থের যে সূক্ষ্ণ ভেদাভেদ আছে, সাধারন লোকে সেটা ধরতে পারে না। |
| সকলে । | তাদের শব্দজ্ঞান উজ্জ্বল হয়নি-তারা শব্দের রূপটি ধরতে জানে না- |
| গুরুজি । | তারা ধরে তার অর্থকে। তারা শব্দ চক্রের আবর্তের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যায়। যেমন কর্মবন্ধন, যেমন মোহবন্ধন, যেমন সংসারবন্ধন,-তেমনি শব্দবন্ধন। |
| সকলে । | শব্দবন্ধনে পড়োনা-প’ড়োনা- |
| গুরুজি । | শব্দকে যে অর্থ দিয়ে ভোলায়-সে অর্থপিশাচ। শব্দকে আটকাতে গিয়ে সে নিজেই আটকা পড়ে। নিজেকেও ঠকায় শব্দকেও বঞ্চিত করে। সে কেমন জান? এই মনে কর, তুমি বললে ‘পৃথিবী’-তার অর্থ করে দেখ দেখি?-সূর্যের চারদিকে ঘোরে তা বলা হল না-পৃথিবীর উত্তরে কি দক্ষিণে কি, তা বলা হল না-তার তিন ভাগ জল এক ভাগ স্থল, তা বলা হল না-তবে বলা হল কি? গোটা পৃথিবীটার সবই ত বাদ গেল। এটা কি ভাল? |
| বিশ্বম্ভর । | আজ্ঞে না-এটা ত ভালো ঠেক্ছে না-তাহলে কি করা যায়? |
| গুরুজি । | তাই বলেছিলাম-শব্দের বিষদাঁত যে অর্থ, আগে তাকে ভাঙ্গ। শুধু পৃথিবী নয়, শুধু গোল নয়, শুধু এটা নয়, শুধু ওটা নয়; আবার এটাই ওটা, ওটাই সেটা-তাও নয়। তবে কি? না সবই সব। তাকেই আমরা বলি
গৌ গাবৌ গাবঃ- [বিশ্বকর্মার আবির্ভাব] |
| বিশ্বকর্মা । |
নিঝুম তিমির তীরে শব্দহারা অর্থ আসে ফিরে |
|
|
এই বিষয়শ্রণীতে বর্তমানে কোন পাতা বা মিডিয়া ফাইল নেই।