বিষয়বস্তুতে চলুন

সুকুমার সমগ্র রচনাবলী (প্রথম খণ্ড)/নানা গল্প/বাজে গল্প-২

উইকিসংকলন থেকে
পুণ্যলতা চক্রবর্তী, কল্যাণী কার্লেকর সম্পাদিত
(পৃ. ২০৪-২০৫)

(২)

 কলকেতার সাহেববাড়ি থেকে গোষ্ঠবাবুর ছবি এসেছে। বাড়িতে তাই হুলুস্থূল। চাকর বামুন ধোপা নাপিত দারোগা পেয়াদা সবাই বলে, “দৌড়ে চল, দৌড়ে চল।”

 যে আসে সেই বলে, “কি চমৎকার ছবি। সাহেবের আঁকা।” বুড়ো যে সরকারমশাই, তিনি বললেন, “সব চাইতে সুন্দর হয়েছে বাবুর মুখের হাসিটুকু— ঠিক তাঁরই মতন ঠাণ্ডা হাসি।” শুনে অবাক হয়ে সবাই বলল, “যা হোক! সাহেব হাসিটুকু ধরেছে খাসা।”

 বাবুর যে বিষ্টুখুড়ো তিনি বললেন, “চোখদুটো যা এঁকেছে, ওরই দাম হাজার টাকা—চোখ দেখলে, গোষ্ঠর ঠাকুরদার কথা মনে পড়ে।” শনে একুশজন একবাক্যে হাঁ-হাঁ করে সায় দিয়ে উঠলো।

 রেধো ধোপা তার কাপড়ের পোঁটলা নামিয়ে বলল, “তোফা ছবি। কাপড়খানার ইস্ত্রি যেন রেধো ধোপার নিজের হাতে করা।” নাপিত তার খুরের থলি দুলিয়ে বলল, “আমি উনিশ বছর বাবুর চুল ছাঁটছি—আমি ঐ চুলের কেতা দেখেই বুঝতে পারি, একখানা ছবির মতন ছবি। আমি যখনই চুল ছাঁটি, বাবু আয়না দেখে ঐরকম খুশি হন।”

 বাবর আহ্লাদী চাকর কেনারাম বলল, “বলব কি ভাই, এমন জলজ্যান্ত ছবি—আমি তো ঘরে ঢুকেই এক পেনাম ঠুকে চেয়ে দেখি, বাবু তো নয়—ছবি।” সবাই বলল, “তা ভুল হবারই কথা—আশ্চর্য ছবি যা হোক।”

 তারপর সবাই মিলে ছবির নাকমুখ, গোঁফদাড়ি, সমস্ত জিনিসের খুব সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আলোচনা করে প্রমাণ করলেন যে সব বিষয়েই বাবুর সঙ্গে আশ্চর্য রকম মিলে যাচ্ছে—সাহেবের বাহাদুরি বটে! এমন সময় বাবু এসে ছবির পাশে দাঁড়ালেন।

 বাবু বললেন, “একটা বড় ভুল হয়ে গেছে। কলকেতা থেকে ওরা লিখছে যে ভুলে আমার ছবি পাঠাতে কার যেন ছবি পাঠিয়ে দিয়েছে। ওটা ফেরৎ দিতে হবে।”

 শুনে সরকারমশাই মাথা নেড়ে বললেন, “দেখেছ! ওরা ভেবেছে আমায় ঠকাবে। আমি দেখেই ভাবছি অমন ভিরকুটি দেওয়া প্যাখনা হাসি—এ আবার কার ছবি।”

 খুড়ো বললেন, “দেখ না! চোখদুটো যেন উল্টে আসছে—যেন গঙ্গাযাত্রার জ্যান্ত মড়া!” রেধো ধোপা, সেও বলল, “একটা কাপড় পরেছে যেন চাষার মতো। ওর সাতজন্মে কেউ যেন পোশাক পরতে শেখে নি।” নাপিতভায়া মুচকি হেসে মুখ বেঁকিয়ে বলল, “চুল কেটেছে দেখ না—যেন মাথার ওপর কাস্তে চালিয়েছে।” কেনারাম ভীষণ খেপে চেঁচিয়ে বলল, “আমি সকাল বেলায় ঘরে ঢুকেই চোর ভেবে চমকে উঠেছি। আরেকটু হলেই মেরেছিলাম আর কি! আবার এরা বলছিল, ওটা নাকি বাবুর ছবি। আমার সামনে ও কথা বললে মুখ থুড়ে দিতুম না!” তখন সবাই মিলে একবাক্যে বলল যে, সবাই তারা টের পেয়েছিল, এটা বাবুর ছবি নয়। বাবুর নাক কি আমন চ্যাটালো? বাবুর কি হাঁসের পায়ের মতো কান? ও কি বসেছে, না ভালুক নাচছে?

সন্দেশ—১৩২৫