সোনার তরী/হিং টিং ছট্

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


 
স্বপ্নমঙ্গল

       স্বপ্ন দেখেছেন রাত্রে হবুচন্দ্র ভূপ ,
       অর্থ তার ভাবি ভাবি গবুচন্দ্র চুপ ।
       শিয়রে বসিয়ে যেন তিনটে বাঁদরে
       উকুন বাছিতেছিল পরম আদরে ।
       একটু নড়িতে গেলে গালে মারে চড় ,
       চোখে মুখে লাগে তার নখের আঁচড় ।
        সহসা মিলাল তারা , এল এক বেদে ,
      ‘ পাখি উড়ে গেছে ' ব ' লে মরে কেঁদে কেঁদে ;
       সম্মুখে রাজারে দেখি তুলি নিল ঘাড়ে ,
       ঝুলায়ে বসায়ে দিল উচ্চ এক দাঁড়ে ।
       নীচেতে দাঁড়ায়ে এক বুড়ি থুড়্‌থুড়ি
       হাসিয়া পায়ের তলে দেয় সুড়্‌সুড়ি ।
       রাজা বলে , ‘ কী আপদ! ' কেহ নাহি ছাড়ে ,
       পা দুটা তুলিতে চাহে , তুলিতে না পারে ।
       পাখির মতন রাজা করে ঝট্‌পট্‌ ,
       বেদে কানে কানে বলে — ‘ হিং টিং ছট্‌ । '
       স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
       গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।
  
     হবুপুর রাজ্যে আজ দিন ছয়-সাত
       চোখে কারো নিদ্রা নাই , পেটে নাই ভাত ।
       শীর্ণ গালে হাত দিয়ে নত করি শির
       রাজ্যসুদ্ধ বালবৃদ্ধ ভেবেই অস্থির ।
       ছেলেরা ভুলেছে খেলা , পণ্ডিতেরা পাঠ ,
       মেয়েরা করেছে চুপ — এতই বিভ্রাট ।
       সারি সারি বসে গেছে কথা নাহি মুখে ,
       চিন্তা যত ভারী হয় মাথা পড়ে ঝুঁকে ।
       ভুঁইফোঁড়া তত্ত্ব যেন ভূমিতলে খোঁজে ,
       সবে যেন বসে গেছে নিরাকার ভোজে ।
       মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া উৎকট
       হঠাৎ ফুকারি উঠে — ‘ হিং টিং ছট্‌ । '
       স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
       গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।
  
       চারি দিক হতে এল পণ্ডিতের দল —
       অযোধ্যা কনোজ কাঞ্চী মগধ কোশল ।
       উজ্জয়িনী হতে এল বুধ-অবতংস
       কালিদাস-কবীন্দ্রের ভাগিনেয়বংশ ।
       মোটা মোটা পুঁথি লয়ে উলটায় পাতা ,
       ঘন ঘন নাড়ে বসি টিকিসুদ্ধ মাথা ।
        বড়ো বড়ো মস্তকের পাকা শস্যখেত
       বাতাসে দুলিছে যেন শীর্ষ-সমেত ।
       কেহ শ্রুতি , কেহ স্মৃতি , কেহবা পুরাণ ,
       কেহ ব্যাকরণ দেখে , কেহ অভিধান ।
       কোনোখানে নাহি পায় অর্থ কোনোরূপ ,
       বেড়ে ওঠে অনুস্বর-বিসর্গের স্তূপ ।
       চুপ করে বসে থাকে বিষম সংকট ,
       থেকে থেকে হেঁকে ওঠে — ‘ হিং টিং ছট্‌ । '
         স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
       গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।
  
       কহিলেন হতাশ্বাস হবুচন্দ্ররাজ ,
      ‘ ম্লেচ্ছদেশে আছে নাকি পণ্ডিত-সমাজ ,
       তাহাদের ডেকে আনো যে যেখানে আছে —
       অর্থ যদি ধরা পড়ে তাহাদের কাছে । '
       কটাচুল নীলচক্ষু কপিশকপোল ,
       যবন পণ্ডিত আসে , বাজে ঢাক ঢোল ।
       গায়ে কালো মোটা মোটা ছাঁটাছোঁটা কুর্তি ,
       গ্রীষ্মতাপে উষ্মা বাড়ে , ভারি উগ্রমূর্তি ।
       ভূমিকা না করি কিছু ঘড়ি খুলি কয় —
      ‘ সতেরো মিনিট মাত্র রয়েছে সময় ,
       কথা যদি থাকে কিছু বলো চট্‌পট্‌ । '
       সভাসুদ্ধ বলি উঠে — ‘ হিং টিং ছট্‌ । '
      ‘ স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
       গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।
  
  
  
       স্বপ্ন শুনি ম্লেচ্ছমুখ রাঙা টকটকে ,
       আগুন ছুটিতে চায় মুখে আর চোখে ।
        হানিয়া দক্ষিণ মুষ্টি বাম করতলে
      ‘ ডেকে এনে পরিহাস ' রেগেমেগে বলে ।
       ফরাসি পণ্ডিত ছিল , হাস্যোজ্জ্বলমুখে
       কহিল নোয়ায়ে মাথা , হস্ত রাখি বুকে ,
      ‘ স্বপ্ন যাহা শুনিলাম রাজযোগ্য বটে ;
       হেন স্বপ্ন সকলের অদৃষ্টে না ঘটে ।
       কিন্তু তবু স্বপ্ন ওটা করি অনুমান
       যদিও রাজার শিরে পেয়েছিল স্থান ।
         অর্থ চাই , রাজকোষে আছে ভূরি ভূরি
       রাজস্বপ্নে অর্থ নাই , যত মাথা খুঁড়ি ।
       নাই অর্থ কিন্তু তবু কহি অকপট ,
       শুনিতে কী মিষ্ট আহা , হিং টিং ছট্‌ । '
       স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
        গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।
  
       শুনিয়া সভাস্থ সবে করে ধিক্‌ ধিক্‌ —
       কোথাকার গণ্ডমূর্খ পাষণ্ড নাস্তিক!
       স্বপ্ন শুধু স্বপ্নমাত্র মস্তিষ্ক-বিকার ,
       এ কথা কেমন করে করিব স্বীকার ।
       জগৎ-বিখ্যাত মোরা ‘ ধর্মপ্রাণ ' জাতি
       স্বপ্ন উড়াইয়া দিবে! — দুপুরে ডাকাতি!
       হবুচন্দ্র রাজা কহে পাকালিয়া চোখ —
      ‘ গবুচন্দ্র , এদের উচিত শিক্ষা হোক ।
       হেঁটোয় কণ্টক দাও , উপরে কণ্টক ,
       ডালকুত্তাদের মাঝে করহ বণ্টন । '
       সতেরো মিনিট কাল না হইতে শেষ ,
       ম্লেচ্ছ পণ্ডিতের আর না মিলে উদ্দেশ ।
       সভাস্থ সবাই ভাসে আনন্দাশ্রুনীরে ,
       ধর্মরাজ্যে পুনর্বার শান্তি এল ফিরে ।
       পণ্ডিতেরা মুখ চক্ষু করিয়া বিকট
       পুনর্বার উচ্চারিল — ‘ হিং টিং ছট্‌ । '
       স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
       গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।
  
  
        অতঃপর গৌড় হতে এল হেন বেলা
       যবন পণ্ডিতদের গুরুমারা চেলা ।
       নগ্নশির , সজ্জা নাই , লজ্জা নাই ধড়ে —
       কাছা-কোঁচা শতবার খসে খসে পড়ে ।
       অস্তিত্ব আছে না আছে , ক্ষীণ খর্বদেহ ,
       বাক্য যবে বাহিরায় না থাকে সন্দেহ ।
       এতটুকু যন্ত্র হতে এত শব্দ হয়
       দেখিয়া বিশ্বের লাগে বিষম বিস্ময় ।
       না জানে অভিবাদন , না পুছে কুশল ,
       পিতৃনাম শুধাইলে উদ্যত মুষল ।
       সগর্বে জিজ্ঞাসা করে , ‘ কী লয়ে বিচার ,
       শুনিলে বলিতে পারি কথা দুই-চার ,
       ব্যাখ্যায় করিতে পারি উলট-পালট । '
       সমস্বরে কহে সবে — ‘ হিং টিং ছট্‌ । '
       স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
       গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।
  
       স্বপ্নকথা শুনি মুখ গম্ভীর করিয়া
       কহিল গৌড়ীয় সাধু প্রহর ধরিয়া ,
      ‘ নিতান্ত সরল অর্থ , অতি পরিষ্কার ,
       বহু পুরাতন ভাব , নব আবিষ্কার ।
        ত্র্যম্বকের ত্রিনয়ন ত্রিকাল ত্রিগুণ
       শক্তিভেদে ব্যক্তিভেদ দ্বিগুণ বিগুণ ।
       বিবর্তন আবর্তন সম্বর্তন আদি
       জীবশক্তি শিবশক্তি করে বিসম্বদী ।
       আকর্ষণ বিকর্ষণ পুরুষ প্রকৃতি
       আণব চৌম্বকবলে আকৃতি বিকৃতি ।
       কুশাগ্রে প্রবহমান জীবাত্মবিদ্যুৎ
       ধারণা পরমা শক্তি সেথায় উদ্ভূত ।
       ত্রয়ী শক্তি ত্রিস্বরূপে প্রপজ্ঞে প্রকট —
       সংক্ষেপে বলিতে গেলে , হিং টিং ছট্‌ । '
       স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
       গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।
  
  
     ‘ সাধু সাধু ' রবে কাঁপে চারিধার ,
        সবে বলে — পরিষ্কার অতি পরিষ্কার ।
       দুর্বোধ যা-কিছু ছিল হয়ে গেল জল ,
       শূন্য আকাশের মতো অত্যন্ত নির্মল ।
       হাঁপ ছাড়ি উঠিলেন হবুচন্দ্ররাজ ,
       আপনার মাথা হতে খুলি লয়ে তাজ
       পরাইয়া দিল ক্ষীণ বাঙালির শিরে ,
       ভারে তার মাথাটুকু পড়ে বুঝি ছিঁড়ে ।
       বহুদিন পরে আজ চিন্তা গেল ছুটে ,
       হাবুডুবু হবু-রাজ্য নড়িচড়ি উঠে ।
       ছেলেরা ধরিল খেলা , বৃদ্ধেরা তামুক ,
       এক দণ্ডে খুলে গেল রমণীর মুখ ।
       দেশজোড়া মাথাধরা ছেড়ে গেল চট্‌ ,
       সবাই বুঝিয়া গেল — হিং টিং ছট্‌ ।
       স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
       গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।
       যে শুনিবে এই স্বপ্নমঙ্গলের কথা ,
       সর্বভ্রম ঘুচে যাবে নহিবে অন্যথা ।
       বিশ্বে কভু বিশ্ব ভেবে হবে না ঠকিতে ,
       সত্যেরে সে মিথ্যা বলি বুঝিবে চকিতে ।
       যা আছে তা নাই আর নাই যাহা আছে ,
       এ কথা জাজ্বল্যমান হবে তার কাছে ।
       সবাই সরলভাবে দেখিবে যা কিছু ,
       সে আপন লেজুড় জুড়িবে তার পিছু ।
       এসো ভাই , তোলো হাই , শুয়ে পড়ো চিত ,
       অনিশ্চিত এ সংসারে এ কথা নিশ্চিত —
       জগতে সকলি মিথ্যা সব মায়াময় ,
       স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয় ।
       স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান ,
       গৌড়ানন্দ কবি ভনে , শুনে পুণ্যবান ।


শান্তিনিকেতন
১৮ জ্যৈষ্ঠ ১২৯৯