আখ্যানমঞ্জরী (প্রথম ভাগ)/ধর্ম্মভীরুতা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
ধর্ম্মভীরুতা।

পোর্টুগালের রাজধানী লিসবন নগরে অতি নিঃস্ব এক বিধবা স্ত্রী বাস করিত। সে, ১৭৭৬ খৃষ্টাব্দে, এক দিবস রাজবাটীতে উপস্থিত হইল, এবং রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিবার প্রার্থনা জানাইল। রাজপুরুষেরা, “তোর মত লোকের রাজার সহিত সাক্ষাৎ হইবার সম্ভাবনা নাই, তুই এখান হইতে চলিয়া যা” এই বলিয়া তাড়াইয়া দিল। সে, তাহাতে ক্ষান্ত না হইয়া, প্রত্যহ যাতায়াত করিতে লাগিল, রাজপুরুষেরা প্রত্যহ তাহাকে তাড়াইয়া দিতে লাগিল।

 অবশেষে, এক দিবস, সে রাজাকে পদব্রজে গমন করিতে দেখিয়া, তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইল, এবং সম্মুখে একটি বাক্স ধরিয়া কহিল, মহারাজ। কিছুকাল পূর্ব্বে ভূমিকম্প হওয়াতে যে সকল অট্টালিকা পতিত হইয়াছিল, তাহার মধ্যে আমি এই বাক্সটি পাইয়াছি, আমি নিতান্ত দুঃখিনী, আমার ছয়টি সন্তান, অতি কষ্টে দিনপাত করি। এই বাক্সের মধ্যে যে সকল মহামূল্য বস্তু আছে, সে সমুদয় আত্মসাৎ করিলে, আমার দুরবস্থা বিমোচন হয়, আমার পুত্রেরা ধনবান্ বলিয়া গণ্য হইয়া, চিরকাল সুখে ও স্বচ্ছন্দে কাল যাপন করিতে পারে। কিন্তু, মহারাজ, এ পরস্ব, পরস্ব হরণ করা অতি গর্হিত কর্ম্ম। অপকর্ম্ম করিয়া পৃথিবীর সমস্ত সম্পত্তি পাওয়া অপেক্ষা, ধর্ম্মপথে থাকিয়া দুঃখে কালযাপন করা ভাল। আমি এই বাক্স আপনার হস্তে সমৰ্পণ করিতেছি। যে ব্যক্তি ইহার যথার্থ স্বামী তাঁহার অনুসন্ধান ও অবধারণ করিয়া তাহাকে দিবেন, আর আমি যে পরিশ্রম করিয়া, ইহা বহিষ্কৃত করিয়াছি, তজ্জন্য আমাকে কিঞ্চিৎ পুরস্কার দেওয়াইবেন।

 রাজার আদেশক্রমে, সেই স্থানেই বাক্স উদ্ঘাটিত হইল। তিনি, উহার মধ্যস্থিত রত্নসমূহের সৌন্দর্য্য দর্শন করিয়া, চমৎকৃত হইলেন, অনন্তর, সেই স্ত্রীলোককে সম্ভাষণ করিয়া কহিলেন, তুমি দুঃখিনী বটে, কিন্তু তোমার তুল্য নির্লোভ ও ধর্মপরায়ণ লোক কখনও দেখি নাই, তুমি যে ঈদৃশ মহামূল্য রত্ন সকল হস্তে পাইয়া ধর্ম্মভয়ে লোভ সংবরণ করিয়াছ, তজ্জন্য আমি তোমাকে সহস্র ধন্যবাদ দিতেছি। আজ অবধি তোমার দুরবস্থা দূর হইল, অতঃপর তোমায় এক দিনের জন্যও, কষ্ট পাইতে হইবে না। আমি তোমার ও তোমার সন্তানদিগের সমস্ত ভার গ্রহণ করিলাম।

 এই বলিয়া রাজা কোষাধ্যক্ষকে ডাকাইলেন, এবং অবিলম্বে সেই দুঃখিনী বিধবাকে বিংশতি সহস্র শিয়াস্তর[১] দিতে আদেশ করিলেন। অনন্তর, সেই রত্নসমূহের যথার্থ অধিকারীর সবিশেষ অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত, আজ্ঞা প্রদান করিয়া কহিলেন, যদি বিশিষ্টরূপ অনুসন্ধান করিয়াও প্রকৃত অধিকারীর উদ্দেশ না হয়, তাহা হইলে, এই সমস্ত রত্ন বিক্রীত হইবে, এবং বিক্রয়লব্ধ সমস্ত ধন এই বিধবা ও তাহার পুত্রেরা পাইবে।

  1. ইটালি প্রভৃতি দেশে প্রচলিত রৌপ্যমুদ্রা, মূল্য ১৮০