ঘর-পোড়া লোক (প্রথম অংশ)/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

 ওস্‌মান ও তাহার পিতাকে বিপদাপন্ন করিবার মানসে দারোগা সাহেব যাহা মনে মনে স্থির করিয়াছিলেন, কার্য্যেও তাহা পরিণত হইতেছে দেখিয়া, মনে মনে অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন।

 সেই স্থানের অনুসন্ধান আপাততঃ স্থগিত রাখিয়া হেদায়েৎ ও গ্রামের দুই চারিজন লোককে সঙ্গে লইয়া গোফুর খাঁর বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলেন।

 গোফুর খাঁ সেই সময় বাড়ীতেই উপস্থিত ছিলেন; কিন্তু ওস্‌মান সেই সময় বাড়ীতে ছিল না। গোফুর খাঁর সহিত দারোগা সাহেবের কিয়ৎক্ষণ কথাবার্ত্তা হইলে পর, ওস্‌মান আসিয়া সেই স্থানে কোথা হইতে উপস্থিত হইল। তাহাকে দেখিয়া দারোগা সাহেব কহিলেন, “আপনার উপর একটী ভয়ানক নালিশ হইয়াছে। যে পর্য্যন্ত আমি অনুমতি প্রদান না করি, সেই পর্য্যন্ত আপনি আমার সম্মুখ হইতে গমন করিবেন না।”

 ওস্‌মান। আর যদি আমি চলিয়া যাই?

 দারোগা। তাহা হইলে আপনার সহিত ভদ্রোচিত ব্যবহার করিতে আমি কোনরূপেই সমর্থ হইব না। সামান্য লোককে যেরূপ ভাবে আমরা রাখিয়া থাকি, বাধ্য হইয়া আপনাকেও সেইরূপ ভাবে আমাকে রাখিতে হইবে।

 গোফুর। আমার উপর অভিযোগ কি?

 দারোগা। আপনার আদেশ-অনুযায়ী আপনার গ্রামবাসী আপনারই প্রজা হেদায়েতের যুবতী কন্যাকে অন্যায়রূপে আজ কয়েকদিবস হইতে আপনার বাটীতে আনিয়া আবদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছে।

 গোফুর। আমার আদেশ-অনুযায়ী?

 দারোগা। প্রমাণে সেইরূপ অবগত হইতে পারিতেছি।

 গোফুর। আমি তাহাকে আবদ্ধ করিতে আদেশ প্রদান করিব কেন?

 দারোগা। বাকী খাজানা আদায় করিবার অভিপ্রায়ে।

 গোফুর। মিথ্যা কথা।

 দারোগা। সত্য মিথ্যা আমি অবগত নহি; প্রমাণে যাহা পাইতেছি, তাহাই আমি আপনাকে বলিতেছি। আর সেই প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া আমাকে ইহার প্রতিবিধান করিতে হইবে।

 গোফুর। আপনি প্রমাণ পাইতেছেন, আমার আদেশে এই কার্য্য হইয়াছে?

 দারোগা। হাঁ।

 গোফুর। আমার আদেশ প্রতিপালন করিল কে? অর্থাৎ কে তাহাকে ধরিয়া আনিল?

 দারোগা। আপনার পুত্ত্র, এবং আর তিন চারিজন লোক।

 গোফুর। সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আপনি এখন কি করিতে চাহেন?

 দারোগা। আপনি যদি সহজে সেই স্ত্রীলোকটীকে বাহির করিয়া না দেন, তাহা হইলে প্রথমতঃ আপনার বাড়ী আমি উত্তমরূপে খানাতল্লাসি করিয়া দেখিব। দেখিব, উহার ভিতর সেই স্ত্রীলোকটী পাওয়া যায়, কি না।

 গোফুর। আর যদি না পাওয়া যায়, তাহা হইলে কি হইবে?

 দারোগা। সে পরের কথা; যাহা হয়, পরে দেখিতে পাইবেন।

 ওস্‌মান। কার হুকুম মত আপনি আমাদিগের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতে চাহেন? বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিবার কোন ওয়ারেন্ট আছে কি?

 দারোগা। কাহার হুকুম মত আমি তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতে চাই, তাহা তুমি বালক, জানিবে কি প্রকারে? আমি আমার নিজের হুকুমে তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিব।

 ওস্‌মান। যদি প্রবেশ করিতে না দি?

 দারোগা। তোমার কথা শোনে কে?, আমি জোর করিয়া প্রবেশ করিব। তাহাতে যদি তুমি কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা জন্মাও, তাহা হইলে তোমায় অপর আর এক মোকদ্দমায় আসামী হইতে হইবে।

 ওস্‌মান। যাহার অনুসন্ধানের নিমিত্ত আপনারা বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিবেন, তাহাকে যদি না পাওয়া যায়, তাহা হইলে জবাবদিহি কে করিবে? আপনি করিবেন কি?

 দারোগা। যাহাকে জবাবদিহিতে আনিতে পারিবে, সে-ই জবাবদিহি করিবে।

 ওস্‌মান। আর যদি সে আপন ইচ্ছায় আমাদিগের বাড়ীতে আসিয়া থাকে?

 দারোগা। সে উত্তম কথা; সে আসিয়া আমাদিগের সম্মুখে সেই কথাই বলুক। তাহা হইলেই সকল গোলযোগ মিটিয়া যাইবে।

 গোফুর। তবে কি স্ত্রীলোকটী আমাদের বাড়ীতে আছে?

 ওস্‌মান। না, সে আমাদের এখানে আসেও নাই, বা আমাদিগের এখানে নাইও।

 দারোগা। মহাশয়! আমি আর অধিক বিলম্ব করিতে পারিতেছি না। এখন কি করিতে চাহেন, বলুন। স্ত্রীলোকটীকে কি আমার সম্মুখে আনিয়া দিবেন, না আমি বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিয়া খানাতল্লাসি করিতে আরম্ভ করিব?

 গোফুর। আমি ত বলিতেছি, সেই স্ত্রীলোকটী আমাদিগের বাড়ীতে নাই। আমার কথায় আপনি বিশ্বাস না করেন, আপনার যাহা অভিরুচি হয়, তাহা আপনি করিতে পারেন। কিন্তু, আমি পূর্ব্বেই আপনাকে সতর্ক করিয়া দিতেছি, যাহা করিবেন, ভবিষ্যৎ ভাবিয়া করিবেন।

 দারোগা। আমার কার্য্য আমি বুঝি, তাহার নিমিত্ত আমি আপনার নিকট উপদেশ গ্রহণ করিতে আসি নাই। আমি লোকজনের সহিত আপনার বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতেছি, ইচ্ছা করেন যদি, তাহা হইলে আপনার বাড়ীর স্ত্রীলোকদিগকে কোন একটা গৃহের ভিতর গমন করিবার নিমিত্ত বলিতে পারেন। আর ইচ্ছা না করেন, তাহাতে আমার কোনরূপ ক্ষতি-বৃদ্ধি নাই।

 এই বলিয়া দারোগা সাহেব আপনার সমভিব্যাহারী লোকজনের সহিত বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিবার অভিপ্রায়ে উত্থিত হইলেন। তখন অনন্যোপায় হইয়া গোফুর খাঁ, ওস্‌মান, এবং সেই সময় সেই স্থানে গোফুরের বন্ধু-বান্ধবগণের মধ্যে যাঁহারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁহারাও সকলে দারোগা সাহেবের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিবার নিমিত্ত উত্থিত হইলেন।

 দারোগা সাহেব প্রথমেই অন্দরমহলের মধ্যে প্রবেশ করিলেন না। সদর বাড়ীর ভিতর যে সকল গৃহ ছিল, প্রথমেই সেই সকল গৃহের মধ্যে অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। এক একখানি করিয়া সর্ব্বপ্রথমে সমস্ত খোলা ঘরগুলি দেখিলেন। তাহার ভিতর কিছু দেখিতে না পাইয়া, পরিশেষে যে ঘরগুলিতে চাবি বদ্ধ ছিল, চাবি খুলিয়া সেই ঘরগুলিও একে একে দেখিতে লাগিলেন।

 গোফুর খাঁর প্রকাণ্ড বাড়ী; সুতরাং সদরে ও অন্দরে অনেক ঘর। বাহিরের ঘরগুলি দেখিতে প্রায় দুই ঘণ্টাকাল অতিবাহিত হইয়া গেল। এইরূপে তালাবদ্ধ কতকগুলি ঘর দেখিবার পর এক পার্শ্বের একটা নির্জ্জন গৃহের তালা খুলিলেন। সেই গৃহের ভিতর অপর দ্রব্য-সামগ্রী কিছুই ছিল না, কেবল গৃহের মধ্যে একখানি পালঙ্কের উপর একটী বিছানা আছে মাত্র।

 সেই বিছানার সন্নিকটে গিয়া যাহা দেখিলেন, তাহাতে সমস্ত লোকেই একবারে বিস্মিত হইয়া পড়িলেন। ইতিপূর্ব্বে দারোগা সাহেব যাহা স্বপ্নেও একবার মনে ভাবেন নাই, তিনি তাহা দেখিয়াই যেন হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলেন। কিছুক্ষণের নিমিত্ত যেন তাঁহার সংজ্ঞাও বিলুপ্ত হইল। একটু পরেই দারোগা সাহেব কহিলেন, “কি মহাশয়। এ কি দেখিতেছি?”

 দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া আর কাহারও মুখে কোন কথা বাহির হইল না। পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে দেখিতে লাগিলেন। কেবল হেদায়েৎ সেই বিছানার সন্নিকটবর্ত্তী হইয়া কহিল, “মহাশয়! এই আমার কন্যা।” এই বলিয়া হেদায়েৎ তাহার কন্যার গাত্রে হস্তার্পণ করিয়া বার বার তাহাকে ডাকিতে লাগিল; কিন্তু সে নড়িলনা, বা তাহার কথায় কোনরূপ উত্তরও প্রদান করিল না। তখন সকলেই জানিতে পারিল যে, সে আর জীবিতা নাই।

 দারোগা। প্রথমতঃ বড় লম্বা লম্বা কথা কহিতেছিলে যে, এখন আর মুখ দিয়া কথা বাহির হইতেছে না কেন?

 গোফুর। ইহার ব্যাপার আমি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

 দারোগা। এখন ত কিছুই বুঝিতে পারিবেন না। এই স্ত্রীলোকের মৃতদেহ এই তালাবন্ধ গৃহের ভিতর কিরূপে আসিল?

 গোফুর। আমি ইহার কিছুই অবগত নহি।

 দারোগা। (ওস্‌মানের প্রতি) কিগো ওস্‌মান মিঞা, আপনিও বোধ হয়, ইহার কিছুই জানেন না?

 ওস্‌মান। না মহাশয়! আমিও ইহার কিছুই অবগত নহি।

 দারোগা। সদর বাড়ীর ভিতর তালাবদ্ধ গৃহে, পালঙ্কের উপর মৃত স্ত্রীলোকের লাস রহিয়াছে। আর আপনারা বলিতেছেন যে, আপনারা কিছুই জানেন না। দ্বারে যে দ্বারবান্ বসিয়া আছে, সেও বলিবে, ‘আমি কিছুই জানি না।’ কিন্তু কিরূপে এই স্থানে লাস আসিল, ইহার যদি সন্তোষজনক প্রমাণ আমাকে আপনার প্রদান করিতে না পারেন, তাহা হইলে জানিবেন, আপনাদিগের উভয়কেই আমি ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলাইব।

 দারোগার কথা শুনিয়া গোফুর খাঁ চতুর্দ্দিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন, এবং এই অবস্থায় কি করিবেন, তাহার কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া সেই স্থানে বসিয়া পড়িলেন।

 দারোগা। কি মহাশয়! আপনি চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন যে? এই লাস কিরূপে আপনার বাড়ীর ভিতর আসিল, সে সম্বন্ধে কোন কথা বলিতেছেন না কেন?

 গোফুর। আপনার কথায় আমি যে কি উত্তর প্রদান করিব, তাহার কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। যখন ইহার কিছুই আমি অবগত নহি, তখন আমি আপনাকে আর কি বলিব?

 দারোগা। কিগো দ্বারবান্ সাহেব! এ সম্বন্ধে তুমি কি বলিতে চাহ?

 দ্বারবান্। দোহাই ধর্ম্মাবতার। আমি ইহার কিছুই জানি না।

 দারোগা। তুমি দ্বারবান্, সর্ব্বদা তুমি দরজায় বসিয়া থাক, অথচ তুমি বলিতেছ, তুমি ইহার কিছুই জান না! এ কথা কি কেহ সহজে বিশ্বাস করিতে পারে?

 দ্বারবান্। আপনি বিশ্বাস করুন, আর না করুন, আমি প্রকৃত কথাই বলিতেছি। আমি প্রকৃতই জানি না যে, এই মৃতদেহ কিরূপে বা কাহা কর্ত্তৃক এই বাড়ীর ভিতর আসিল।

 গোফুর খাঁ, ওস্‌মান ও দ্বারবান্ যখন কোন কথা বলিল না, তখন সেই সময় দারোগা সাহেব তাহাদিগকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া, নিজের ইচ্ছামত অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন।

 লাসের সুরতহাল করিয়া পরীক্ষার্থ উহা জেলার ডাক্তার সাহেবের নিকট প্রেরণপূর্ব্বক ঘটনাস্থলে বসিয়া দারোগা সাহেব কয়েকদিবস পর্য্যন্ত অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। এখনকার অনুসন্ধান আসামীগণকে লইয়া নহে; এখনকার অনুসন্ধান, ফরিয়াদী ও সেই স্থানের প্রজাগণের সাহায্যে এবং জমাদার সাহেবের আন্তরিক যত্নের উপর নির্ভর করিয়াই হইতে লাগিল। অর্থাৎ গোফুর খাঁ ও আঁহার পুত্ত্রের বিপক্ষে এই হত্যা সম্বন্ধে যে সকল প্রমাণ সংগৃহীত হইতে পারে, এখন সেই অনুসন্ধানই চলিতে লাগিল।