জাপানে-পারস্যে/জাপানে/সপ্তম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


 এই কয়দিন আকাশ এবং সমুদ্রের দিকে চোখ ভরে দেখছি, আর মনে হচ্ছে অনন্তের রং তাে শুভ্র নয়, তা কালাে কিংবা নীল। এই আকাশ খানিক দূর পর্যন্ত আকাশ অর্থাৎ প্রকাশ—ততটা সে সাদা। তার পরে সে অব্যক্ত, সেইখান থেকে সে নীল। আলো যতদূর, সীমার রাজ্য সেই পর্যন্ত; তার পরেই অসীম অন্ধকার। সেই অসীম অন্ধকারের বুকের উপরে এই পৃথিবীর আলােকময় দিনটুকু যেন কৌস্তুভমণির হার দুলছে।

 এই প্রকাশের জগৎ, এই গৌরাঙ্গী, তার বিচিত্র রঙের সাজ পরে অভিসারে চলেছে—ওই কালাের দিকে, ওই অনির্বচনীয় অব্যক্তর দিকে। বাঁধা নিয়মের মধ্যে বাঁধা থাকাতেই তার মরণ—সে কুলকেই সর্বস্ব করে চুপ করে বসে থাকতে পারে না, সে কুল খুইয়ে বেরিয়ে পড়েছে। এই বেরিয়ে যাওয়া বিপদের যাত্রা, পথে কাটা, পথে সাপ, পথে ঝড় বৃষ্টি,–সমস্ত অতিক্রম করে, বিপদকে উপেক্ষা করে সে যে চলছে, সে কেবল ওই অব্যক্ত অসীমের টানে। অব্যক্তের দিকে, “আরাে”র দিকে প্রকাশের এই কুল-খােয়ানাে অভিসার-যাত্রা,—প্রলয়ের ভিতর দিয়ে, বিপ্লবের কাঁটাপথে পদে পদে রক্তের চিহ্ন এঁকে।

 কিন্তু কেন চলে, কোন্ দিকে চলে, ওদিকে তত পথের চিহ্ন নেই, কিছু তাে দেখতে পাওয়া যায় না?–না, দেখা যায় না, সব অব্যক্ত কিন্তু শূন্য তো নয়,–কেননা ওই দিক থেকেই বাঁশির সুর আসছে। আমাদের চলা, এ চোখে দেখে চলা নয়, এ সুরের টানে চলা। যেটুকু চোখে দেখে চলি, সে তত বুদ্ধিমানের চলা, তার হিসাব আছে, তার প্রমাণ আছে; সে ঘুরে ঘুরে কুলের মধ্যেই চলা। সে চলায়  কিছুই এগোয় না। আর যেটুকু বাঁশি শুনে পাগল হয়ে চলি, যে-চলায় মরা বাঁচা জ্ঞান থাকে না, সেই পাগলের চলাতেই জগৎ এগিয়ে চলেছে। সেই চলাকে নিন্দার ভিতর দিয়ে, বাধার ভিতর দিয়ে চলতে হয়, কোনো নজির মানতে গেলেই তাকে থমকে দাঁড়াতে হয়। তার এই চলার বিরুদ্ধে হাজার রকম যুক্তি আছে, সে যুক্তি তর্কের দ্বারা খণ্ডন করা যায় না। তার এই চলার কেবল একটিমাত্র কৈফিয়ৎ আছে,—সে বলছে ওই অন্ধকারের ভিতর দিয়ে বাঁশি আমাকে ডাকছে। নইলে কেউ কি সাধ করে আপনার সীমা ডিঙিয়ে যেতে পারে?

 যেদিক থেকে ওই মনোহরণ অন্ধকারের বাঁশি বাজছে, ওই দিকেই মানুষের সমস্ত আরাধনা, সমস্ত কাব্য, সমস্ত শিল্পকলা, সমস্ত বীরত্ব, সমস্ত আত্মত্যাগ মুখ ফিরিয়ে আছে; ওই দিকে চেয়েই মানুষ রাজ্যসুখ জলাঞ্জলি দিয়ে বিরাগী হয়ে বেরিয়ে গেছে, মরণকে মাথায় করে নিয়েছে। ওই কালোকে দেখে মানুষ ভুলেছে। ওই কালোর বাঁশিতেই মানুষকে উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরুতে টানে, অনুবীক্ষণ দূরবীক্ষণের রাস্তা বেয়ে মানুষের মন দুর্গমের পথে ঘুরে বেড়ায়, বারবার মরতে মরতে সমুদ্র-পারের পথ বের করে, বার বার মরতে মরতে আকাশ-পারের ডানা মেলতে থাকে।

 মানুষের মধ্যে যে-সব মহাজাতি কুলত্যাগিনী, তারাই এগচ্ছে,—ভয়ের ভিতর থেকে অভয়ে, বিপদের ভিতর দিয়ে সম্পদে। যারা সর্বনাশ কালোর বাঁশি শুনতে পেলে না, তারা কেবল পুঁথির নজির জড়ো করে কুল আঁকড়ে বসে রইল—তারা কেবল শাসন মানতেই আছে। তারা কেন বৃথা এই আনন্দলোকে জন্মেছে, যেখানে সীমা/কাটিয়ে অসীমের সঙ্গে নিত্যলীলাই হচ্ছে জীবনযাত্রা, যেখানে বিধানকে ভাসিয়ে দিতে থাকাই হচ্ছে বিধি।

 আবার উলটো দিক থেকে দেখলে দেখতে পাই, ওই কালাে অনন্ত আসছেন তাঁর আপনার শুভ্র জ্যোতির্ময়ী আনন্দমূর্তির দিকে। অসীমের সাধনা এই সুন্দরীর জন্যে, সেইজন্যেই তাঁর বাঁশি বিরাট অন্ধকারের ভিতর দিয়ে এমন ব্যাকুল হয়ে বাজছে, অসীমের সাধনা এই সুন্দরীকে নূতন নূতন মালায় নূতন করে সাজাচ্ছে। ওই কালাে এই রূপসীকে এক মুহূর্ত বুকের থেকে নামিয়ে রাখতে পারেন না,—কেননা এ যে তাঁর পরমা সম্পদ। ছােটোর জন্যে বড়াের এই সাধনা যে কী অসীম, তা ফুলের পাপড়িতে পাপড়িতে, পাখির পাখায় পাখায়, মেঘের রঙে রঙে, মানুষের হৃদয়ের অপরূপ লাবণ্যে মুহূর্তে মুহূর্তে ধরা পড়ছে। রেখায় রেখায়, রঙে রঙে, রসে রসে তৃপ্তির আর শেষ নেই। এই আনন্দ কিসের? অব্যক্ত যে ব্যক্তর মধ্যে কেবলই আপনাকে প্রকাশ করছেন, আপনাকে। ত্যাগ করে করে ফিরে পাচ্ছেন।

 এই অব্যক্ত কেবলি যদি না-মাত্র, শূন্যমাত্র হতেন,—তাহলে প্রকাশের কোনাে অর্থই থাকত না, তাহলে বিজ্ঞানের অভিব্যক্তি কেবল একটা শব্দমাত্র হত। ব্যক্ত যদি অব্যক্তেরই প্রকাশ না হত, তাহলে যা-কিছু আছে তা নিশ্চল হয়ে থাকত, কেবলি আরো-কিছুর দিকে আপনাকে নূতন করে তুলত না। এই আরাে-কিছুর দিকেই সমস্ত জগতের আনন্দ কেন—এই অজানা আরাে-কিছুর বাঁশি শুনেই সে কুল ত্যাগ করে কেন? ওই দিকে শূন্য নয় বলেই, ওই দিকেই সে পূর্ণকে অনুভব করে বলেই। সেইজন্যেই উপনিষদ বলেছেন—ভূমৈব সুখং, ভূমাত্বেব বিজিজ্ঞাসিতব্যঃ। সেইজন্যই তাে সৃষ্টির এই লীলা দেখছি, আলো এগিয়ে চলেছে অন্ধকারের অকূলে, অন্ধকার নেমে আসছে আলাের কূলে। আলাের মন ভুলছে কালােয়, কালাের মন ভুলেছে আলােয়।

 মানুষ যখন জগৎকে না-এর দিক থেকে দেখে, তখন তার রূপক একেবারে উলটে যায়। প্রকাশের একটা উলটো পিঠ আছে, সে হচ্ছে প্রলয়। মৃত্যুর ভিতর দিয়ে ছাড়া প্রাণের বিকাশ হতেই পারে না। হয়ে-ওঠার মধ্যে দুটো জিনিস থাকাই চাই,—যাওয়া এবং হওয়া। হওয়াটাই হচ্ছে মুখ্য, যাওয়াটাই গৌণ।

 কিন্তু মানুষ যদি উলটো পিঠেই চোখ রাখে,—বলে সবই যাচ্ছে, কিছুই থাকছে না; বলে জগৎ বিনাশেরই প্রতিরূপ, সমস্তই মায়া, যা-কিছু দেখছি, এ-সমস্তই “না”; তাহলে এই প্রকাশের রূপকেই সে কালাে করে, ভয়ঙ্কর করে দেখে; তখন সে দেখে, এই কালাে কোথাও এগুচ্ছে না, কেবল বিনাশের বেশে নৃত্য করছে। আর অনন্ত রয়েছেন আপনাতে আপনি নির্লিপ্ত, এই কালিমা তাঁর বুকের উপর মৃত্যুর ছায়া মতাে চঞ্চল হয়ে বেড়াচ্ছে, কিন্তু স্তব্ধকে স্পর্শ করতে পারছে না। এই কালো দৃশ্যত আছে, কিন্তু বস্তুত নেই—আর যিনি কেবলমাত্র আছেন তিনি স্থির, ওই প্রলয়রূপিণী না-থাকা তাঁকে লেশমাত্র বিক্ষুব্ধ করে না এখানে আলাের সঙ্গে কালাের সেই সম্বন্ধ, থাকার সঙ্গে না-থাকার যে সম্বন্ধ। কালাের সঙ্গে আলাের আনন্দের লীলা নেই, এখানে যােগের অর্থ হচ্ছে প্রেমের যােগ নয়, জ্ঞানের যােগ। দুইয়ের যােগে এক নয়, একের মধ্যেই এক। মিলনে এক নয়, প্রলয়ে এক।

 কথাটাকে আর একটু পরিষ্কার করবার চেষ্টা করি।

 একজন লােক ব্যবসা করছে। সে লােক করছে কী? তার মূল ধনকে, অর্থাৎ পাওয়া-সম্পদকে, সে মুনাফা, অর্থাৎ না-পাওয়া সম্পদের দিকে প্রেরণ করছে। পাওয়া-সম্পদটা সীমাবদ্ধ ও ব্যক্ত, না-পাওয়া সম্পদটা অসীম ও অব্যক্ত। পাওয়া-সম্পদ সমস্ত বিপদ স্বীকার করে না-পাওয়া সম্পদের অভিসারে চলেছে। না-পাওয়া সম্পদ অদৃশ্য ও অলর বটে, কিন্তু তার বাঁশি বাজছে,—সেই বাঁশি ভূমার বশি। যে বণিক সেই বাঁশি শোনে, সে আপন ব্যাঙ্কে জমানাে কোম্পানি-কাগজের কুল ত্যাগ করে, সাগর গিরি ডিঙিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এখানে কী দেখছি?–না, পাওয়া-সম্পদের সঙ্গে না-পাওয়া সম্পদের একটি লাভের যােগ আছে। এই যােগে উভয়ত আনন্দ। কেননা, এই যােগে পাওয়া না-পাওয়াকে পাচ্ছে, এবং না-পাওয়া পাওয়ার মধ্যে ক্রমাগত আপনাকেই পাচ্ছে।

 কিন্তু মনে করা যাক, একজন ভীতু লোক বণিকের পাতায় ওই খরচের দিকের হিসাবটাই দেখছে। বণিক কেবলি আপনার পাওয়া-টাকা খরচ করেই চলেছে, তার অন্ত নেই। তার গা শিউরে ওঠে! সে বলে, এই তাে প্রলয়! খরচের হিসাবের কালাে অঙ্কগুলাে রক্তলােলুপ রসনা দুলিয়ে কেবলি যে নৃত্য করছে। যা খরচ,—অর্থাৎ বস্তুত যা নেই,–তাই প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড অঙ্ক-বস্তুর আকার ধরে খাতা জুড়ে বেড়ে বেড়েই চলেছে। একেই তাে বলে মায়া। বণিক মুগ্ধ হয়ে এই মায়া-অঙ্কটির চিরদীর্ঘায়মান শৃঙ্খল কাটাতে পারছে না। এ-স্থলে মুক্তিটা কী?–না, ওই সচল অঙ্কগুলােকে একেবারে লােপ করে দিয়ে খাতার নিশ্চল নির্বিকার শুভ্র কাগজের মধ্যে নিরাপদ ও নিরঞ্জন হয়ে স্থিরত্ব লাভ করা; দেওয়া ও পাওয়ার মধ্যে যে একটি আনন্দময় সম্বন্ধ আছে, সে সম্বন্ধ থাকার দরুণ মানুষ দুঃসাহসের পথে যাত্রা করে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জয়লাভ করে, ভীতু মানুষ তাকে দেখতে পায় না। তাই বলে—

মায়াময়মিদমখিলং হিত্বা
ব্রহ্মপদং প্রবিশাশু বিদিত্বা
চীন সমুদ্র
 
তােকামারু
 
৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৩