জীবন বীমা/অষ্টম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

অষ্টম পরিচ্ছেদ।


 ঐ স্থান হইতে প্রত্যাগমন করিয়া সেই জমিদার মহাশয়ের সহিত পুনরায় সাক্ষাৎ করিলাম। তিনি আমার নিকট হইতে সমস্ত অবস্থা অবগত হইয়া কহিলেন, আপনি যে বিষয়ের অনুসন্ধান করিতেছেন, সে সম্বন্ধে আপনাকে আর কোনরূপ চিন্তা করিতে হইবেক না। ব্রজবন্ধু কৃষ্ণরামের সাহায্যে যে এই ভয়ানক জুয়াচুরি করিয়াছে, সে বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। আর আপনারা যে কৃষ্ণরামকে হরেকৃষ্ণ স্থির করিয়া তাহার অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, তাহা ব্রজবন্ধু জানিতে পারিয়া, কৃষ্ণরামকে স্থানান্তরে প্রেরণ করিয়াছেন। কৃষ্ণরাম একাকী কোন স্থানে থাকিলে তাহার বিশেষরূপ কষ্ট হইবার সম্ভাবনা, এই ভাবিয়া তাহার জামাতাকে তাহার সঙ্গে দেওয়া হইয়াছে। আপনি যে স্থানে কৃষ্ণরামকে পাইবেন, সেইস্থানেই তাহার জামাতাকেও পাওয়া যাইবে। আপনি সুন্দরবন হইতে প্রত্যাগমন করিবার পূর্বেই আমি জানিতে পারিয়াছি যে, কৃষ্ণরাম তাহার বাসা পরিত্যাগ করিয়া, ও তাহার জামাতাকে সঙ্গে লইয়া পশ্চিমাঞ্চলে পলায়ন করিয়াছে। কিন্তু কোথায় যে গিয়াছে, তাহা জানিতে পারি নাই। তবে এইমাত্র জানিতে পারিয়াছি যে, তাহারা এক স্থানে থাকিবে না, তীর্থে তীর্থে ভ্রমণ করিয়া বেড়াইবে। আরও জানিতে পারিয়াছি যে, তাহারা প্রথমত কোন নিকটবর্তী স্থানে যাইবে না, দূরবর্তী কোন তীর্থ স্থানে কিছু দিবস গুপ্তভাবে অবস্থিতি করিয়া, পরে অন্য স্থানে গমন করিবে। তিনি আরও বলিলেন, তাহাদের পশ্চিমে গমন করিবার অব্যবহিত পূর্বেই আমার একজন পরিচিত লোকের সহিত কৃষ্ণরামের সাক্ষাৎ হয়। তিনি কোন কার্যোপলক্ষে সুন্দরবনে গমন করিয়াছিলেন। প্রত্যাগমন করিবার সময় এক রাত্রি তাহাকে কৃষ্ণরামের বাসায় অতিবাহিত করিতে হয়। ইতিপূর্বে ইনি অনেক তীর্থ স্থান পর্যটন করিয়াছিলেন। কথায় কথায় কৃষ্ণরাম তাহাকে পুষ্কর তাথ, মথুরা, বৃন্দাবন, কাশী, অযোধ্যা, প্রয়াগ ও নৈমিষারণ্যের কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। আরও কথায় কথায়, তাহার নিকট হইতে জানিয়া লইয়াছেন যে, ঐ সকল স্থানে গমন করিলে কিরূপে ও কোথায় থাকিবার সুযোগ হয়। এরূপ অবস্থায় আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে যে, উপরি উক্ত তীর্থের কোন না কোন স্থানে তিনি গমন করিয়া সেই স্থানে লুক্কায়িত আছেন।

 জমিদার মহাশয়ের নিকট এই সকল কথা শ্রবণ করিয়া সরকারি খরচে ঐ সকল তীর্থ স্থান ভ্রমণ করিতে তাহার ইচ্ছা আছে কি না, তাহা জানিবার অভিপ্রায়ে আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসিলাম, যদি ঐ সকল স্থানে কৃষ্ণরামের অনুসন্ধান করিতে আমি গমন করি, আপনি সরকারি খরচে আমার সহিত ঐ সকল স্থানে গমন করিতে প্রস্তুত আছেন কি? তাহা হইলে এক কার্যে দুই কার্য্য অনায়াসেই শেষ হইবে।


 আমার কথার উত্তরে জমিদার মহাশয় কহিলেন, অন্য সময় হইলে আমি নিশ্চয়ই আপনার সহিত গমন করিতাম, কিন্তু এ সময় আমার এই স্থান পরিত্যাগ করিবার উপায় নাই। এই সময় আমি যদি এই স্থান হইতে অনুপস্থিত হই, জমিদারী ও ব্যবসা উভয় কার্য্যের আমার বিশেষরূপ ক্ষতি হইবে। আপনি নিজে গিয়া ঐ সকল স্থানে অনুসন্ধান করুন, আর আমি এই স্থানে থাকিয়া যতদূর সম্ভব উহাদিগের সংবাদ সংগ্রহ করিতে থাকি।

 জমিদার মহাশয়ের সহিত এই সম্বন্ধে কথা কহিয়া আমার মনে বিশ্বাস হইল যে, তিনি কোনরূপ কপটতা করিয়া আমাকে এই সংবাদ প্রদান করিতেছেন না। তিনি যাহা কিছু জানিতে পারিতেছেন, ব্রজবন্ধুকে জব্দ করিবার নিমিত্তই তাহাই আমাকে প্রদান করিতেছেন। কারণ তিনি বেশ অবগত আছেন যে, কৃষ্ণরাম ওরফে হরেকৃষ্ণকে ধরিতে না পারিলে, ব্রজবন্ধুকে বিশেষ রূপে বিপদাপন্ন করা যাইতে পারে না। এই ভাবিয়াই তিনি কৃষ্ণরামের অনুসন্ধানের নিমিত্ত প্রাণপণে এতদূর চেষ্টা করিতে ছেন। আমাদিগেরও এখন এই বিশ্বাস যে, তাঁহার চেষ্টাতেই আমরা আমাদিগের কার্য শেষ করিতে সমর্থ হইব।

 মনে মনে এইরূপ স্থির করিয়া কৃষ্ণরামের অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত আমি পশ্চিম অঞ্চলে গমন করিতে মনস্থ করিলাম। আমার সঙ্গে একটা বিশ্বাসী কনষ্টেবল, কৃষ্ণরাম বা হরেকৃষ্ণ ও তাহার জামাতাকে দেখিলে চিনিতে পারে এইরূপ একটা লোক সঙ্গ লইয়া সেই দিবস রাত্রির ট্রেনেই পশ্চিম যাত্রা করিলাম।