ডিটেক্‌টিভ পুলিস (প্রথম কাণ্ড)/ডাক্তার বাবু বক্তা/একাদশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

একাদশ পরিচ্ছেদ।

 জমীদার মহাশয় আমাকে একদিন বলিলেন, “ডাক্তার! কলিকাতায় অনেক বড়লােকের সহিত তােমার আলাপ আছে, শুনিয়াছি। যদি তুমি কোন বড়লােকের সাহায্যে আমার একটী উপকার করিতে পার, তাহা হইলে আমি নিতান্ত উপকৃত হই।”

 আমি তাঁহার কথা শুনিয়া একটু ব্যস্ত হইলাম, এবং তিনি কিরূপ উপকার-প্রার্থী, তাহা জিজ্ঞাসা করিলে জমীদার মহাশয় বলিলেন, “দেখ ডাক্তার! ইংরাজ-রাজত্বে বড়লোকের জন্য একটী আইন আছে, গবর্নমেন্ট ইচ্ছা করিলে তাঁহাদিগকে দেওয়ানী আদালতে উপস্থিত হইয়া সাক্ষ্য দেওয়ার যন্ত্রণা হইতে নিষ্কৃতি দিতে পারেন। অনেক বড়লোক, এ যন্ত্রণায় নিষ্কৃতি পাইয়াছেন। কিছুদিবস হইল, আমিও বেঙ্গল গবর্ণমেন্টে এই মর্ম্মে এক আবেদন করিয়াছিলাম; কিন্তু আমার সেই আবেদন সেই সময়ে গ্রাহ্য হয় নাই বলিয়া আমায় এইরূপ কষ্টভোগ করিতে হইতেছে। যদি কলিকাতার ভিতর এমত কোন লোকের সহিত তোমার বিশেষ জানা শুনা থাকে যে, তিনি লেপ্টেনেন্ট গবর্ণর বাহাদুরকে বলিয়া আমার এই কার্য্যটী সমাধা করিয়া দিতে পারেন, তাহা হইলে আমি যে কিরূপ উপকৃত হই, তাহা বলিতে পারি না। তুমি এই কার্য্য সমাপন করিয়া দিতে পারিলে ন্যায্য খরচ ব্যতিরেকে তোমার উপযুক্ত পুরস্কার দিতেও আমি প্রস্তুত আছি।”

 এই সুযোগে বিলক্ষণ দশ টাকা উপার্জ্জন করিতে পারিব ভাবিয়া দুষ্কর্মের আর এক সোপান উর্ধদ্ধে উত্থিত হইলাম। আমি সগর্ব্বে জমীদার মহাশয়কে বলিলাম, “আমাকে এত দিন জানাইলে অনেক পুর্ব্বেই এ কার্য্য সম্পন্ন হইতে পারিত। আপনি বিশেষরূপ জানেন যে, যে ইংরাজ ডাক্তার, মহাশয়কে রোগমুক্ত করিয়াছিলেন, তিনি আমার একজন পরমবন্ধু। লেপ্টেনেন্ট গবর্ণর বাহাদুরের সহিতও তাঁহার বিশেষ বন্ধুতা আছে। ইতিপূর্ব্বে আমাকে বলিলে ডাক্তার সাহেবের সাহায্যে এতদিনে সকল কার্য্য সম্পন্ন হইয়া যাইত, আপনাকেও দেওয়ানী আদালতে উপস্থিত হইয়া এতদিন কষ্ট পাইতে হইত না। যাহা হউক, কল্যই আমি তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া সকল কথা স্থির করিব, এবং আপনার এ কার্য্য নিশ্চয়ই সম্পন্ন করিয়া দিব। তবে একটী কথা মহাশয়কে প্রথমেই বলা উচিত যে, ডাক্তারগণ অর্থপিশাচ; বিনা স্বার্থে যে তিনি কিছু করিবেন, তাহা আমার বিশ্বাস হয় না। তবে তিনি যখন আমার একজন বিশেষ বন্ধু, তখন আমি নিশ্চয়ই বলিতে পারি যে, অতি সামান্য ব্যয়ে এ কার্য্য তাঁহার দ্বারা আমি সম্পন্ন করাইয়া লইতে পারিব।”

 জমীদার মহাশয় আমার এই কথা শুনিয়া অতিশয় আশ্বস্ত ও আহ্লাদিত হইলেন, এবং আমাকে বলিলেন, “তুমি যে প্রকারে পার, এই কার্য্য সমাধা কর, খরচ পত্রের জন্য তোমার কোন ভাবনা নাই।” “সমস্ত ঠিক করিয়া কল্য আসিয়া মহাশয়কে বলিব” বলিয়া আমি সেই দিবসের মত বিদায় হইয়া গোলাপের বাটীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম। তথায় সমস্ত রাত্রি আমোদ-আহ্লাদ ও সুরাপান প্রভৃতিতে কাটাইলাম।

 পরদিবস জমীদার মহাশয়ের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইয়া বলিলাম,“মহাশয়! ডাক্তার সাহেবের সহিত সমস্ত ঠিক হইয়াছে, কার্য্য শীঘ্র সম্পন্ন হইবে। কিন্তু তাঁহাকে দশ সহস্র টাকা দিতে হইবেক। এখন পাঁচ সহস্র দিলেই চলিবে, কার্য্য সমাপ্ত হইলে অবশিষ্ট পাঁচ সহস্র দিবেন। তিনি আমার নিতান্ত বন্ধু বলিয়া এইরূপ অল্প টাকায় সম্মত হইয়াছেন, নতুবা ৫০ সহস্র মুদ্রার কম এরূপ কার্য্য কখনই সম্পন্ন হইতে পারে না।”

 জমীদার মহাশয় আমার কথায় বিশ্বাস করিয়া সমস্ত টাকা দিতে সম্মত হইলেন। সেই দিবস ডাক্তার সাহেবকে দিবার নিমিত্ত আমাকে দুই সহস্র টাকা দিলেন। টাকাগুলি হস্তে পাইয়া আমি জমীদার মহাশয়ের বাড়ী পরিত্যাগ করিলাম। কিন্তু তাহার এক কপর্দ্দকও ডাক্তার সাহেবকে না দিয়া তাহার পরিবর্ত্তে সহস্র মুদ্রা গোলাপকে দিলাম, বক্রী পিতা মাতাকে দিলাম। জমীদার মহাশয়কে বুঝাইবার নিমিত্ত ঐ টাকার একখানি রসিদ লিখিলাম ও তাহাতে উক্ত ইংরাজ ডাক্তারের সহি জাল করিলাম। পরে ঐ জাল রসিদ জমীদার মহাশয়কে দিয়া কহিলাম; “ডাক্তার সাহেব টাকা পাইয়া এই রসিদ দিয়াছেন ও বক্রী তিন সহস্র টাকা চাহিয়াছেন।” রসিদ দেখিয়া তাঁহার আরও বিশ্বাস হইল, তিনি বলিলেন,—“বক্রী টাকার কতক কল্য দিব। তুমি ডাক্তার সাহেবকে বলিও, যাহাতে কার্য্য শীঘ্র সম্পন্ন করিতে পারেন, তাহার যেন বিশেষ চেষ্টা করেন।”

 পরদিন পুনরায় দুই সহস্র মুদ্রা পাইলাম। এইটাকা লইয়া আপনার স্ত্রীর নিকট রাখিয়া দিলাম ও পূর্ব্বমত জাল রসিদ লিখিয়া আনিয়া জমীদার মহাশয়কে দিলাম। তিনি বুঝিতে পারিলেন,—এ টাকাও ডাক্তার সাহেব পাইয়াছেন।

 সেইদিবস এই মর্ম্মে একখানি দরখাস্ত লিখিয়া আনিলাম যে, জমীদার মহাশয় ছোট লাট বাহাদুরের নিকট এই প্রার্থনা করিতেছেন যে, দেওয়ানী আদালতে তাঁহাকে আর সাক্ষী দিতে না হয়। তবে বিশেষ প্রয়োজন হইলে আদালতে তাঁহাকে স্বয়ং উপস্থিত না করাইয়া কমিশন দ্বারা তাঁহার সাক্ষ্য গৃহীত হয়। ঐ দরখাস্তে জমীদার মহাশয় স্বাক্ষর করিলেন। ডাক্তার সাহেবের দ্বারা ঐ দরখাস্ত পাঠাইতে হইবে বলিয়া, আমি উহা লইয়া সেইস্থান পরিত্যাগ করিলাম। বাহিরে যাইয়া ঐ দরখাস্ত টুক্‌রা টুক্‌রা করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিলাম; কিন্তু পরদিন আসিয়া বলিলাম যে, ডাক্তার সাহেব অদ্য আপনার দরখাস্ত লইয়া নিজে ছোট লাট বাহাদুরের নিকট গমন করিয়াছেন।