ত্রিপুরার স্মৃতি/চণ্ডীমুড়া

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



চণ্ডীমুড়া

 কুমিল্লা নগরীর পশ্চিমপ্রান্তে ন্যূনাতিরেক ৬ মাইল দূরে—“লালমাই” নামে খ্যাত যে দীর্ঘ পৰ্ব্বতমালা দৃষ্টি গোচর হয়, “চণ্ডিমুড়া” নামক তাহার দক্ষিণদিকের অরণ্যাবৃত শৃঙ্গোপরি বৃক্ষ-লতাজড়িত দুইটী সুপ্রাচীন মন্দির প্রতিষ্ঠিত আছে। সৰ্ব্বসাধারণ কর্তৃক মন্দিরদ্বয় “চণ্ডীমন্দির” নামে অভিহিত হয়। ত্রিপুরারাজ্যের সুপ্রসিদ্ধ প্রাচীন রাজধানী উদয়পুরে যে সমুদয় মন্দির সংস্থাপিত, উক্ত দুইটী মন্দির আকৃতিতে তদনুরূপ।

 মন্দির দুইটী খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে ত্রিপুরেশ গোবিন্দ মাণিক্যের অনুজ জগন্নাথ দেবের দুহিতা, যুবরাজ চম্পকরায়ের সহোদরা “দ্বিতীয়া দেবী” কর্ত্তৃক নিৰ্ম্মিত হইয়াছিল; এবং তিনিই তন্মধ্যে চণ্ডীমূৰ্ত্তি প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। বঙ্গভাষায় লিপিত “রাজমালা” নামে প্রসিদ্ধ ত্রিপুররাজগণের জীবনচরিত গ্রন্থে এই বিষয় একম্প্রকার লিপিবদ্ধ আছে।—

“চম্পকরায় দেওয়ানছিল হৈল যুবরাজ।
তার ভগ্নী দ্বিতীয়া নামে করে পুণ্য কাজ॥
মেহের কুল উদয় পুর দীর্ঘিকা খনিল।
দৌল সেতু চণ্ডীমুড়া চণ্ডিকা স্থাপিল॥”

রাজমালা—রত্নমাণিক্য খণ্ড

 দৈত্যের বা দুত্যার দীঘী নামক যে জলাশয় চণ্ডীমুড়ার নিকট আছে, তাহাই উল্লিখিত দ্বিতীয়া দেবী কর্ত্তৃক মেহেরকুলে খনিত দীর্ঘিকা। কালক্রমে “দ্বিতীয়া” শব্দ অপভ্রষ্ট হইয়া “দৈত্য” বা “দুত্যা” রূপে পরিণত হইয়াছে।

 একটী মন্দির-মধ্যে চণ্ডীদেবীর প্রতিমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে, কিন্তু অপরটীতে কি মূৰ্ত্তি ছিল, অথবা তাহাতে কোন মূৰ্ত্তিই সংস্থাপিত হইয়াছিল কিনা ইহা অবগত হওয়া যায় না।

 মন্দিরদ্বয়-মধ্যে একটীর উর্দ্ধভাগ পৰ্য্যবেক্ষণ করিলে একদা তদ্গাত্রে কোন প্রস্তর-ফলক সংলগ্ন ছিল—এই প্রকার চিহ্ন স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু কোনও ব্যক্তি ঐস্থানে কোনও শিলাফলক সংলগ্ন থাকিতে দেখিয়াছে বা শুনিয়াছে কিনা এই বিষয় বহু অসুন্ধানেও জ্ঞাত হওয়া যায় না।

 ত্রিপুররাজ-কুলোদ্ভবা দ্বিতীয়া দেবী নাম্নী জনৈক মহিলা-কর্ত্তৃক বর্ণিত দুইটী মন্দির নিৰ্ম্মিত হইয়া তন্মধ্যে যে চণ্ডীমূৰ্ত্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, এবং পৰ্ব্বতপ্রান্তদেশস্থ বৰ্ত্তমান দৈত্যের দীঘী (দ্বিতীয়ার দীঘী) নামে খ্যাত সরোবর যে তৎকর্ত্তৃক খনিত, এই সমস্ত কথা অধুনা সৰ্ব্বসাধারণের স্মৃতি হইতে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হইয়াছে। প্রকৃত বিষয় জ্ঞাত না হইয়া ভ্রমবশতঃ কেহ কেহ অত্রস্থ মন্দিরদ্বয় গোপীচাঁদের নিৰ্ম্মিত-ও বলিয়া থাকে।

 জনশ্রুতি এই—উভয় মন্দিরই বহুদিন যাবৎ পরিত্যক্ত ছিল। ১৩২৫ বঙ্গাব্দে চাঁদপুর-নিবাসী নিবারণচন্দ্র চক্ৰবৰ্ত্তী নামক জনৈক ব্রাহ্মণ ধাতুবিশেষ-নিৰ্ম্মিত সুবর্ণ পত্রে মণ্ডিত এক অষ্টভুজা শক্তিমূর্ত্তি প্রাগুক্ত মন্দিরদ্বয়-মধ্যের একটীতে প্রতিষ্ঠিত করে। মূৰ্ত্তিটী কুমিল্লা-নিবাসী মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্যের সাহায্যে বগাসাইর পরগণার অন্তঃপাতী দৌলবাড়ী গ্রামস্থ বৈকুণ্ঠ চক্রবর্ত্তীর নিকট হইতে উক্ত নিবারণচন্দ্র চক্ৰবৰ্ত্তী কর্ত্তৃক আনীত হইয়াছিল। ঐ মূৰ্ত্তি উল্লিখিত গ্রামের এক পুষ্করিণী হইতে উদ্ধৃত হইয়াছিল বলিয়া অবগত হওয়া যায়।

 উল্লিখিত মূৰ্ত্তি ১৩২৪ বঙ্গাব্দে আনীত হইলেও নানা কারণ বশতঃ তৎকালে উহা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, তদনন্তর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। দুঃখের বিষয়—যে বর্ষে দেবীমূৰ্ত্তিটী প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, সেই বর্ষেরই মাঘের এক রজনীতে উহা অপহৃত হয়, এবং এযাবৎ তাহার কোন অনুসন্ধান প্রাপ্ত হওয়া যায় নাই।

 ঢাকা নগরীর কৌতুক-সংগ্রহালয়ে বর্ণিত মূৰ্ত্তির যে আলোকচিত্র গৃহীত হইয়াছিল তদ্দৃষ্টে ইহার শিল্প-চাতুর্য্যের প্রশংসা করিতে হয়। মূৰ্ত্তিটীর কারুকৌশল পর্য্যবেক্ষণ করিয়া কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি উহা হস্তগত করিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন, কিন্তু নিবারণচন্দ্র চক্ৰবৰ্ত্তী কোন মতেই হস্তান্তর করিতে স্বীকৃত হয় নাই বলিয়া তৎকর্ত্তৃক কথিত হয়।

 প্রাগুক্ত শক্তিমূর্ত্তির পাদপীঠে যে লিপি উৎকীর্ণ আছে বলিয়া নিবারণচন্দ্র চক্ৰবৰ্ত্তী কহে, তাহা নিম্নে প্রদত্ত হইল।

“স্বস্তি শ্রীখড়্গোদ্যমো রাম নরাধিরাজঃ।
তৎসুনুরাসীদ্‌ভূবিজাতখড়্গঃ॥

তদাত্মাজো দানপতিঃ-প্রতাপী
শ্ৰীদেব খড়্গো ভূপতিবরঃ।
তৎসুতো বিজিতারিখড়গ রাজস্তস্য
মহাদেবী মহিষী শ্রীপ্রভাবতী সৰ্ব্বাণীং
প্রীতি ভক্ত্যা হেমলগ্না মকারয়ৎ শ্ৰীঃ॥”

 উল্লিখিত লিপি পৰ্য্যবেক্ষণ করিয়া ইহা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, একদা খড়গ বংশীয় নৃপতিগণ এতৎ প্রদেশ শাসন করিয়াছিলেন। তৎকালে উক্ত বংশোদ্ভব বিজিতারি খড়গরাজ নামক জনৈক নৃপালের “প্রভাবতী” নাম্নী মহিষী কর্ত্তৃক বর্ণিত সুবর্ণ পত্রে মণ্ডিত অষ্টভূজা শক্তি দেবীর ধাতু-মূৰ্ত্তিটী প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ইদানীং ঐ মূৰ্ত্তির মন্দিরের কিংবা ইহার প্রতিষ্ঠাতার বাস ভবনাদীর কোন নিদর্শনই বৰ্ত্তমান নাই এবং কোন্‌ স্থানে ছিল তাহাই বা কে কহিতে পারে? কালপ্রবাহে সে সমুদয় কথা কে জানে কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে।

 অধুনা চণ্ডীমন্দির-মধ্যে যে কতিপয় দেবমূৰ্ত্তি সংস্থাপিত, তৎসমুদয় পূৰ্ব্ববর্ণিত অষ্টভুজা শক্তিমূৰ্ত্তি অপহৃত হওয়ার পর নিবারণচন্দ্র চক্রবর্তী কর্ত্তৃক নানা স্থান হইতে সংগৃহীত হইয়া অত্রস্থ মন্দির-মধ্যে স্থাপিত হইয়াছে—এইরূপ উক্ত চক্রবর্তী কহে। ইহাও তৎকর্ত্তৃক কথিত হয় যে, বৰ্ত্তমান মূৰ্ত্তি নিচয় মধ্যস্থ কোন এক হিংস্ৰ জন্তু বিশেষোপরি আসীন দ্বিভূজ পুংমূর্ত্তিটীই আদৌ এইস্থানে প্রতিষ্ঠিত ছিল কিন্তু কোন এক অজ্ঞাতকালে অকস্মাৎ উহা এইস্থান হইতে অন্তর্হিত হয়। একদা নিশাযোগে জনৈক উন্মাদগ্ৰস্ত ব্যক্তি মূৰ্ত্তিটী এইস্থান হইতে অপসারণ করিয়াছিল, এবং উহা মহিচাইল পরগণার অন্তঃপাতী ফাঐ গ্রাম-মধ্যস্থ এক বটবৃক্ষের নিম্নদেশে নিক্ষিপ্ত ছিল—নিবারণ চক্ৰবৰ্ত্তী এই বিষয় ঘটনাক্রমে অবগত হইলে তথায় গমনপূৰ্ব্বক মূর্ত্তিটী আনয়ন করিয়া মন্দির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে।

 অজ্ঞতা কিংবা ভ্রমবশতঃ নিবারণচন্দ্র চক্রবর্ত্তী কর্ত্তৃক এইরূপ কথিত হইয়। থাকিবে। যে হেতু উক্ত মূৰ্ত্তি প্রকৃতই চণ্ডীমূৰ্ত্তি নহে; উহা বুদ্ধদেবের প্রতিমূৰ্ত্তি হওয়ারই সম্ভাবনা অধিক। মূৰ্ত্তিটী পৰ্য্যবেক্ষণ করিয়া অনুমিত হয় যে, মাররূপী হিংস্র জন্তুকে পরাজিত করিয়া বুদ্ধদেব তদুপরি উপবিষ্ট রহিয়াছেন।

 ইহাও হওয়া সম্ভব—চণ্ডীমুড়ার মন্দিরদ্বয় শূন্য পৰ্য্যবেক্ষণ করিয়া একদা কোন ব্যক্তি প্রাগুক্ত নরমূৰ্ত্তি অন্য স্থান হইতে আনয়ন পূর্ব্বক মন্দির মধ্যে স্থাপন করিয়া থাকিবে। পরিশেষে উল্লিখিত রূপে এই স্থান হইতে অপসারিত হইয়াছিল।

 প্রকৃতপক্ষে মন্দিরদ্বয়-মধ্যের একটীতে দ্বিতীয়াদেবী কর্ত্তৃক প্রতিষ্ঠিত চণ্ডীমূৰ্ত্তি কোন্‌ সময়ে কাহার দ্বারা অপসারিত হইয়াছিল এবং আর একটী মন্দিরেই বা কি মূৰ্ত্তি সংস্থাপিত ছিল, এই বিষয়ের প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটিত হওয়া সম্ভবপর বলিয়া বোধ হয় না।

 চণ্ডীমুড়ার শিখরোপরি অবস্থিত দুইটী মন্দির-মধ্যে একটীতে অধুনা যে সমস্ত মূৰ্ত্তি সংস্থাপিত, তৎসমুদ্ৰয়ের মধ্যস্থ একটী দণ্ডায়মান দ্বিভূজ নরমূৰ্ত্তি জনসাধারণকর্ত্তৃক সূৰ্য্য-মূৰ্ত্তি বলিয়া অভিহিত হয়। ইহার কারুকৌশল প্রশংসনীয়।

 এতদ্ব্যতিরেকে পিত্তল নিৰ্ম্মিত এক ক্ষুদ্রাকার অষ্টভুজা শক্তি-মূৰ্ত্তি ও প্রস্তরনির্মিত একটী চক্র এই মন্দির-মধ্যে স্থাপিত আছে। এই প্রস্তর-চক্রকে জনসাধাবণ বিষ্ণুচক্র আখ্যা প্রদান করে।

 উল্লিখিত মন্দিরের উত্তর দিকে সামান্য দূরে যে আর একটী মন্দির অবস্থিত, তন্মধ্যে অষ্টধাতু নিৰ্ম্মিত একটী শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত আছে। উক্ত লিঙ্গ-মূর্ত্তির পীঠ-নিম্নে এবংবিধ উৎকীর্ণলিপি পরিলক্ষিত হয়।

“দে ধৰ্ম্মোয়ং আচার্য্য প্রথমরাশি ভাদ্রস্য”

 চণ্ডীমুড়া হইতে ন্যূনাধিক ১০ মাইল দূরবর্ত্তী “হরিপুর” গ্রামমধ্যস্থ নমঃশূদ্র জাতীয় জনৈক ব্যক্তির আলয়ে প্রস্তর নিৰ্ম্মিত একটী দশভূজা মহিষমর্দ্দিনীর প্রতিমূৰ্ত্তি স্থাপিত আছে। ইহার আয়তন উচ্চে দ্বি-হস্তের কিঞ্চিদধিক হইবে। সুচারুরূপে নির্ম্মিত মূৰ্ত্তিটীর কোন অঙ্গ বিনষ্ট হয় নাই। ইহা পল্লীমধ্যস্থ পুষ্করিণী সংস্কার কালে পঙ্ক-মধ্য হইতে প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে বলিয়া অবগত হওয়া যায়।