পাখীর কথা/তৃতীয় ভাগ/মেঘদূতের পক্ষিতত্ত্ব (১)

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

কালিদাস-সাহিত্যে বিহঙ্গপরিচয়

মেঘদূতের পক্ষিতত্ত্ব

 কালিদাসের যে কাব্যের রসে বিভোর হইয়া রবীন্দ্রনাথ উচ্ছ্বসিতকণ্ঠে প্রশ্ন করিয়াছেন—

“কবিবর, কবে কোন্ বিস্মৃত বরষে
কোন্ স্নিগ্ধ আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
লিখেছিলে মেঘদূত? মেঘমন্দ্র শ্লোক
বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক
রাখিয়াছে আপনার অন্ধকার স্তরে
সঘন সঙ্গীত-মাঝে পুঞ্জীভূত করে’।”

 সেই বিশ্বের বিরহীর পুঞ্জীভূত বিরহব্যথার মধ্যে যদি কোন তত্ত্বজিজ্ঞাসু মানুষের জীবনরহস্য ছাড়িয়া পাখী প্রভৃতি ইতর জন্তুর জীবনবৃত্তান্ত সম্বন্ধে কোন তথ্য অবগত হইবার জন্য প্রয়াসী হন, তাহা হইলে তাঁহাকে “অরসিকেসু রসস্য নিবেদনম্” প্রভৃতি কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া সাহিত্যরসিক সমালোচকবর্গ হয়ত কৃপার চক্ষে দেখিবেন। আমি কিন্তু সেই দুঃসাহসিক কার্য্যে ব্রতী হইয়াছি। গয়টে হইতে রবীন্দ্রনাথ পর্য্যন্ত বিশ্বসাহিত্যের মহারথগণ যে রসসাগরে ডুব দিয়া অমূল্য রত্নরাজিতে মানবসাহিত্য অলঙ্কৃত করিয়াছেন, আমি সেখানে তাঁহাদের পশ্চাতে সন্তরণ করিবার স্পর্দ্ধা করি না; রসসমুদ্রের উপকূলে উপবেশন করিয়া পারাবত, রাজহংস, চক্রবাকের আনন্দমুখর জীবনলীলা উপভোগ করিবার চেষ্টা করিব।

 মেঘদূত কবে রচিত হইযাছিল, সে গবেষণায় প্রবৃত্ত হইবার আবশ্যকতা নাই,—খৃষ্টপূর্ব্ব অর্দ্ধশতাব্দী অথবা খৃষ্টের জন্মের চার পাঁচশত বৎসর পরে মহাকবি উজ্জয়িনী অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন, সে প্রসঙ্গ এখানে তুলিতে চাই না। যে বিস্মৃত বরষে মেঘদূত রচিত হইয়া থাকুক, সে সময়ে মহাকবির তুলিকায় পাখীর ছবি কেমন ফুটিয়া উঠিয়াছিল, সেই কথাই বিশেষভাবে আলোচনা করিতে চেষ্টা করিব। যক্ষেশ্বরের বাহ্যোদ্যানস্থিত হরশিরশ্চন্দ্রিকাধৌতহর্ম্ম্যা অলকায় গৃহীতালকান্তা পথিকবনিতার প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া আমি বুঝিতে চেষ্টা করিব কেমন করিয়া

মন্দং মন্দং নুদতি পবনশ্চানুকূলো যথা ত্বাং,
বামশ্চায়ং নদতি মধুরং চাতকস্তে সগর্বঃ।

দিবসগণনতৎপরা একপত্নী মেঘভ্রাতৃজায়াকে সসম্ভ্রমে দূর হইতে নমস্কার করিয়া আমি দেখিব, কিরূপে বিসকিসলয়চ্ছেদপাথেয়বান্ রাজহংস মানসসরোবরে যাইবার জন্য উৎসুক হইয়া, কৈলাস পর্য্যন্ত আকাশপথে মেঘের সহযাত্রী হইতেছে।

……………………… মানসোৎকাঃ।
আকৈলাসাদ্বিসকিসলয়চ্ছেদপাথেয়বন্তঃ
সম্পৎস্যন্তে নভসি ভবতো রাজহংসা সহায়াঃ।

হরিতকপিশ নীপকুসুম ও আবির্ভূতপ্রথমমুকুল কন্দলী দর্শন করিয়া সানন্দরবে চাতকপক্ষী মেঘদূতের পথনির্দ্দেশ করিয়া দিতেছে; অম্ভোবিন্দুগ্রহণচতুর চাতককে সিদ্ধপুরুষগণ দেখিতেছেন এবং শ্রেণীবদ্ধ বলাকাপঙ্ক্তি অবলোকন করিয়া অঙ্গুলিসঙ্কেতে পরিগণনা করিতেছেন; ককুভসৌরভে আমোদিত পর্ব্বতে পর্ব্বতে সজল-নয়ন, শুক্লাপাঙ্গ ময়ূরের কেকাধ্বনি মেঘসম্বর্দ্ধনায় তৎপর রহিয়াছে; মেঘাগমে দশার্ণগ্রামের চৈত্যগুলিতে গৃহবলিভুক্ পক্ষী নীড় রচনা করিতে থাকিবে এবং কতিপয়দিনস্থায়ী হংস উপস্থিত হইয়া দশার্ণভূমি অলঙ্কৃত করিবে;—মহাকবির অতুল তুলিকায় এই সমস্ত চিত্র প্রকৃতির রহস্য যবনিকার অন্তরাল হইতে রূপে ও রসে, গন্ধে ও শব্দে সত্য হইতে তিলমাত্র বিচ্যুত না হইয়া কাব্যমধ্যে প্রতিফলিত হইয়াছে।

 “কতিপয়দিনস্থায়িহংসাঃ”, “মানসোৎকা রাজহংসাঃ” প্রভৃতি শব্দগুলি পক্ষিজীবনের এক নিগূঢ় তথ্যকে নির্দ্দেশ করিয়া দেয়। যাযাবরতা বা migration পাখীর জীবনকাহিনীর মধ্যে একটি অত্যন্ত বিচিত্র ব্যাপাব। প্রব্রজনশীল পাখীগুলি এক অব্যক্ত নিয়মের বশবর্ত্তী হইয়া এক ঋতুতে যেমন এক দেশ হইতেপাখীর প্রবজন-রহস্য অপর দেশে গমন করিয়া থাকে, তদ্রূপ আবার নিয়মিত ঋতুতে ঘড়ির কাঁটার ন্যায় পুরাতন স্থানে প্রত্যাবর্ত্তন করে। বর্ষার প্রাক্কালে দশার্ণগ্রামসমূহে যে সকল হংস দৃষ্ট হইতেছে, তাহারা যাযাবর; শীঘ্রই তাহাদিগকে এই সকল গ্রাম পরিত্যাগ করিতে হইবে; ইহাই স্মরণ করিয়া কবি বলিতেছেন—

ত্বয্যাসন্নে পরিণতফলশ্যামজম্বূবনান্তাঃ
সম্পৎস্যন্তে কতিপয়দিনস্থায়িহংসা দশার্ণাঃ।

 যক্ষের কারাবাসভূমিতে অথবা তাহার নিকটবর্ত্তী জনপদসমূহে যে সকল রাজহংস লক্ষিত হইতেছে, বর্ষাগমে তাহারা সকলেই মানসসরোবরে যাইবার নিমিত্ত উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিয়াছে। আনন্দে বুক বাঁধিয়া তাহারা পাথেয়স্বরূপ বিসকিসলয় আহরণে তৎপর রহিয়াছে। অলকামধ্যবর্ত্তী যক্ষের স্বকীয় উদ্যানে কিন্তু হংসগণের কিছু বিপরীত ভাব দৃষ্ট হয়—

বাপী চাস্মিন্ মরকতশিলা-বদ্ধ-সোপানমার্গা
হৈমৈশ্ছন্না বিকচকমলৈঃ স্নিগ্ধবৈদূর্য্যনালৈঃ।

যস্যাস্তোয়ে কৃতবসতয়ো মানসং সন্নিকৃষ্টং
নাধ্যাস্যন্তি ব্যপগতশুচস্ত্বামপি প্রেক্ষ্য হংসাঃ॥

 মরকতশিলাবদ্ধ-সোপানমার্গ বাপীসমূহে অপর্য্যাপ্ত আহার পাইতেছে বলিয়া স্বচ্ছন্দবিচরণশীল হংসগণের মানসসরোবরে প্রস্থান করিবার বাসনা ক্ষীণ হইলেও একেবারে যে নাই, তাহা বলা যায় না। তবে গ্রীষ্মাতিশয্যে শুষ্কপ্রায় বাপীগুলি বর্ষারম্ভে বর্দ্ধিততোয় হইলে মানসসরোবরে যাইবার তত আবশ্যকতা নাই। এই নিমিত্ত বোধ হয় কবিবর লিখিয়াছেন—“হংসগণ আনন্দিত চিত্তে অবস্থান করিতেছে; মানসসরোবর সন্নিকৃষ্ট হইলেও তথায় যাইতে তাহারা প্রয়াসী নহে।”

 বৎসরের যে ঋতুতে আহার্য্যের অভাব হইবার সম্ভাবনা থাকে, সেই ঋতুর প্রাক্কালেই যাযাবর বিহঙ্গগণ যে স্থলে আপনাদিগের অভ্যস্ত উপাদেয় খাদ্যের স্বচ্ছলতা বর্ত্তমান আছে, তথায় প্রয়াণ করিয়া থাকে। পক্ষিতত্ত্ববিদ্ মিঃ ফ্রাঙ্ক ফিন্ লিখিয়াছেন—

 “Want of food is obviously the chief reason why birds of high elevations or high latitudes have to leave their haunts”[১]

 আরও একটা বড় কথা আছে। বৎসরের মধ্যে ঋতুবিশেষে যদি কোনও স্থানের জলবায়ু আহার্য্য প্রভৃতি সমগ্র পারিপার্শ্বিক অবস্থা কোনও পাখীর শাবকেৎপাদনের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে অনুকূল হয়, তাহা হইলে সেই পাখীর সহজ সংস্কারলব্ধ জ্ঞান তাহাকে সেই স্থানে উপনীত করাইবে। আধুনিক পক্ষিতত্ত্ববিদ্‌গণ ইহা সবিশেষ লক্ষ্য করিয়াছেন। তাঁহারা আরও দেখিয়াছেন যে যদি কোনও উপায়ে পাখীর আহার বিহার প্রভৃতির প্রকৃষ্ট ব্যবস্থা কোথাও করা যায়, তাহা হইলে কতিপয়দিনস্থায়ী যাযাবর পাখীও হয়’ত তথায় দীর্ঘকালস্থায়ী হইয়া যায়;—অর্থাৎ migratory পাখীর কালক্রমে resident হইয়া যাইবার প্রবণতা দৃষ্ট হয়। মিঃ ফ্রাঙ্ক ফিন্ স্পষ্টই বলিয়াছেন[২]

 “There is a strong tendency for migrants to settle down and form non-migratory local races.”

 এই আহার্য্য ও শাবকোৎপাদন-সমস্যা তাহাকে চঞ্চল করিলেও পরিচিত জনপদস্থ আবাসভূমি পরিত্যাগ করিয়া, গিরিদরী লঙ্ঘন করিয়া, অপরিচিত সুদূর প্রান্তর, সরোবর অথবা জলাভূমিসমূহ আহার্য্যবহুল হইলেও তথায় যাত্রা করিবার আয়াস স্বীকার করিতে পাখীকে কখন কখন পরাঙ্মুখ হইতে দেখা যায়।[৩]

 বিসকিসলয় পাথেয়স্বরূপ করিয়া রাজহংসগণ কি নিমিত্ত কৈলাস পর্য্যন্ত সানন্দে মেঘদূতের সহযাত্রী হইবে, তাহা পাঠকবর্গ সহজে উপলব্ধি করিতে পারিবেন। বর্ষার বারিধারায় যখন আর্য্যাবর্ত্তের সমস্ত নদনদী উভয় কূল প্লাবিত করিয়া এই সমস্ত পক্ষীর আহার্য্য নষ্ট করিয়া ফেলিবার উপক্রম করে, তখন মানসসরোবরে ও তন্নিকটস্থ কৈলাস ও অন্যান্য পর্ব্বতমালায় তাহার উড়িয়া গিয়া নিরাপদ আশ্রয় লাভ করে। হিমালয়ের উত্তরে এই কৈলাসপর্ব্বত অবস্থিত; আর কৈলাসের পাদদেশে অগ্নিকোণে মানসসরোবর বিদ্যমান। এই কৈলাস ও তৎসন্নিকটবর্ত্তী স্থানসমূহ যে হংসজাতীয় পক্ষীর পক্ষে অন্ততঃ বৎসরের কয়েক মাস সর্ব্বাপেক্ষা উপযুক্ত আবাসস্থান, তাহা হিমালয়পর্য্যটনকারিগণের অনেকেই লক্ষ্য করিয়াছেন। এখানে তাহারা স্বচ্ছন্দে নীড় নির্ম্মাণ করিয়া অনুকূল পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে নিরুপদ্রবে শাবকোৎপাদন করিয়া থাকে। বাস্তবিক বর্ষাগমে মানসসরোবর যে বন্য শ্বেত হংসগণের বিশিষ্ট আবাসভূমি, তাহা মিঃ মুর্‌ক্রফ্‌ট্ (Mr. William Moorcroft) মানসপর্য্যটনকালে স্বয়ং অবলোকন করিয়া এইরূপ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন,—

 “That the water’s edge was bordered by a line of wrack grass, mixed with the quills and feathers of the large grey wild goose which in large flocks of old ones with young broods hastened into the lake at my approach. * * * These birds from the numbers I saw and the quantity of their dung appear to frequent this lake in vast bodies, breed in the surrounding rocks, and find an agreeable and safe asylum when the swell of the rivers of Hindustan in the rains, and the inundation of the plains conceal their usual food.”[৪]

 যে সুখের রজনী মানসবক্ষে তরণী বাহিয়া ডাক্তার স্বেন্ হেডিন্ (Sven Hedin) অতিবাহিত করিয়াছিলেন, সে রজনীর প্রভাতোন্মুখ ক্ষণেও হংসকাকলী তাঁহার শ্রুতিপথবর্ত্তী হওয়ায় তিনি লিখিয়াছেন—

 “The wild geese have wakened up, and they are heard cackling on their joyous flights.”[৫]

 হংসজীবনের এই বিচিত্র কাহিনীর স্পষ্ট উল্লেখ মিঃ হ্যামিল্‌টন-প্রণীত East India Gazetteer নামক গ্রন্থে মানসসরোবর বর্ণনপ্রসঙ্গে আমরা এইরূপ দেখিতে পাই,—

 “Wild geese are observed to quit the plains of India on the approach of the rainy season, during which Lake Manasarovara is covered with them. * * * * Grey goose, which breed in vast numbers among the surrounding rocks, and here find food when Bengal is concealed by the inundation.”[৬]

 হতভাগ্য যক্ষের কারাবাসভূমি হইতে আরম্ভ করিয়া বিভিন্ন গিরি, উপত্যকা, সরোবর, নদ, নদী অতিক্রম পূর্ব্বক প্রব্রজনশীল হংসগণকে মানসসরোবরেক্রৌঞ্চরন্ধ্র প্রয়াণ করিতে হইলে ক্রৌঞ্চরন্ধ্রের ভিতর দিয়া যাইতে হয়। কবিবর ইহাকে হংসদ্বার বলিয়া জানাইয়াছেন,—

প্রালেয়াদ্রেরুপতটমতিক্রম্য তাংস্তান্ বিশেষান্
হংসদ্বারং ভৃগুপতিযশোবর্ত্ম যৎ ক্রৌঞ্চরন্ধ্রম্।

 তিনটি স্বতন্ত্র গিরিবর্ত্ম দিয়া ভারতবর্ষ হইতে সাধারণতঃ হিমালয় অতিক্রম করিয়া মানসসরোবর এবং কৈলাসপর্ব্বতে যাওয়া যায়,—লিপুলেখ (Lipu Lekh) বর্ত্ম, উন্তধুর (Untadhura) বর্ত্ম, এবং নিতি (Niti) বর্ত্ম। কেহ কেহ অনুমান করেন যে, শেষোক্ত নিতিবর্ত্মই ভারতবর্ষের প্রাচীন কবিগণের নিকটে ক্রৌঞ্চরন্ধ্র নামে পরিচিত[৭]। এই ক্রৌঞ্চরন্ধ্র বা হংসদ্বার কেবলমাত্র কবিকল্পিত নহে; বিহঙ্গতত্ত্ববিদ্‌ মিঃ ডেওয়ার লিখিতেছেন[৮],—

 “Migratory birds that pass the winter in India have to fly over the Himalaya Mountains to their breeding grounds in Tibet, China and Russia. They do not fly over the highest mountains, but cross them by what are known as passes in the mountains, that is to say, spaces between the higher hills.”

 উপরে উদ্ধৃত শ্লোকগুলি হইতে আমরা হংসগণের যাহা কিছু বিবরণ পাইলাম, তাহা হইতে বুঝিতে পারি যে, আসন্ন বর্ষায় ঐ সকল যাযাবর পাখী ভারতবর্ষের উত্তরপশ্চিমাংশে রাজপুতানায় এবং তন্নিকটবর্ত্তী স্থানসমূহে কেবলমাত্র কতিপয় দিনের নিমিত্ত অবস্থান করিবে, শীঘ্রই তাহাদিগকে কৈলাস এবং মানসবোবরাভিমুখে ক্রৌঞ্চরন্ধ্রের মধ্য দিয়া প্রস্থান করিতে হইবে। বিসকিসলয় তাহাদিগের একটি প্রধান ও প্রিয় খাদ্য।

 বিহঙ্গতত্ত্ববিদ্ পণ্ডিতমণ্ডলীর নিকটে এই হংসগুলি, বিশেষতঃ রাজহংসগুলি, ঠিক কোন্ জাতীয় বিহঙ্গ বলিয়া পরিচিত, এইখানে তাহার একটু আলোচনা আবশ্যক। মিঃ মুর্‌ক্রফ্‌ট্ মানসপর্য্যটনকালেরাজহংস সরোবরমধ্যে স্বচক্ষে যে সমস্ত হংস অবলোকন করিয়াছিলেন, তাহাদের তিনি বৃহৎ বন্য grey goose বলিয়া পরিচয় দিয়াছেন। মিঃ ব্লান্‌ফোর্ডের (W. T. Blandford) প্রসিদ্ধ পুস্তকে[৯] Grey goose বা Grey Lag Goose সম্বন্ধে যে বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে, তাহা হইতে জানিতে পারা যায় যে, তাহারা যাযাবর Anserinae জাতির অন্তর্ভুক্ত; অক্টোবর মাসের শেষ হইতে মার্চ্চ মাস পর্য্যন্ত পাঞ্জাব, সিন্ধু এবং ভারতের উত্তরপশ্চিম প্রদেশে তাহারা প্রচুর পরিমাণে দৃষ্ট হয়; চিল্কাহ্রদে এবং নর্ম্মদাসলিলে ক্রীড়া করিতে ইহাদিগকে প্রায় দেখা যায়। ইহাদিগের পুচ্ছ শুভ্র; পৃষ্ঠদেশে শ্বেতবর্ণের সহিত ভস্মবর্ণের সংমিশ্রণ লক্ষিত হয়। বক্ষঃস্থলে ও নিম্নদেশে সামান্য ধূসরবর্ণের সহিত শ্বেতবর্ণের মিশ্রণাধিক্য আছে। চঞ্চু ও পা সিত, ক্বচিৎ মাংসবর্ণ বা লাল। ইহাদের দেহে সামান্য ভস্ম বা ধূসরবর্ণের ছায়া বিদ্যমান থাকিলেও দূর হইতে তাহাদিগকে শুভ্রকায় দেখায়। ইহারা হিন্দুস্থানে রাজহংস নামে পরিচিত; তৃণ এবং সবুজ শস্য ইহাদিগের প্রিয় খাদ্য। জলাভূমি, সরোবর এবং বড় বড় নদীর ধারে ইহারা দলবদ্ধ হইয়া কালাতিপাত করে। ভারতবর্ষের বহির্দেশে, হিমালয়ের পরপারে, মধ্য এশিয়ায় এবং দক্ষিণ সাইবিরিয়ায় ইহাদিগকে সন্তানোৎপাদন করিতে দেখা যায়। মিঃ মুর্‌ক্রফ্‌ট্‌ স্বচক্ষে দেখিয়াছেন যে, হিমাচলস্থ পার্ব্বত্য প্রদেশের জলাভূমিতে ইহারা ডিম পাড়িয়া থাকে।

 আর এক জাতীয় হংসের বিবরণ আমরা মিঃ ব্লান্‌ফোর্ডের উক্ত গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃত করিলাম[১০]। ইহারাও রাজহংস নামে পরিচিত; Flamingo ইহাদিগের ইংরেজি নাম। দলবদ্ধ হইয়া জলাভূমি এবং সরোবরতটে ইহারা অবস্থান করে; উদ্ভিজ্জ পদার্থ ইহাদিগের অপরাপর খাদ্যের মধ্যে অন্যতম। মিঃ ব্লান্‌ফোর্ড লিখিয়াছেন যে, ভারতবর্ষের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে এই সকল যাযাবর পক্ষী বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসাবধি অবস্থান করিয়া পরে উড়িয়া যায়। পাঞ্জাব, সিন্ধু, গুজরাট ও রাজপুতানার স্থানে স্থানে, উত্তরপশ্চিম প্রদেশের জলাভূমি এবং সরোবরতটে ইহাদিগকে সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায়। ইহাদিগের বর্ণ মস্তক হইতে পুচ্ছ পর্য্যন্ত শুভ্র, ঈষৎ গোলাপী আভার সমন্বয়ও লক্ষিত হয়; কিন্তু শাবকগণের বর্ণে গোলাপী আভার পরিবর্ত্তে ঈষৎ ধূম্র-মালিন্য দৃষ্ট হয়। পদদ্বয় লাল; চঞ্চু আরক্তবর্ণ (fleshcoloured)। মোটের উপর, ইহাদিগের দেহও Grey gooseএর ন্যায় দূর হইতে সাদা দেখায়; কিন্তু Grey goose অপেক্ষা আরও অধিক কাল ইহারা ভারতবর্ষে অবস্থান করে, কারণ, ইহাদিগের প্রব্রজন বা migration প্রায় জুন মাস হইতেই আরম্ভ হয়।

 অমরকোষে রাজহংসের পরিচয় এইরূপ,—“রাজহংসাস্তু তে চঞ্চুচরণৈর্লোহিতৈঃ সিতাঃ,” অর্থাৎ যাহাদিগের দেহ শুক্ল, কিন্তু চঞ্চু এবং চরণ লোহিতবর্ণ তাহারা রাজহংস। উক্ত গ্রন্থে আমরা আরও দেখিতে পাই যে, হংসগণকে ‘মানসৌকস’ আখ্যা দেওয়া হইয়াছে,—“হংসাস্তু শ্বেতগরুতঃ চক্রাঙ্গা মানসৌকসঃ”, অর্থাৎ হংসগণ শ্বেতপক্ষ, চক্রাঙ্গ ও মানসসৱোররবাসী। পূর্ব্বে বলা হইয়াছে যে, মিঃ মুর্‌ক্রফ্‌ট্ মানস-পর্য্যাটন-সময়ে grey goose পক্ষীকে সরোবরতটে গার্হস্থ্যব্যাপারে লিপ্ত থাকিতে দেখিয়াছেন; এমন কি, নিকটবর্ত্তী রাবণহ্রদেও[১১] তিনি স্বচক্ষে ঐ জাতীয় পক্ষিগণকে অণ্ডপ্রসব এবং শাবক প্রতিপালনে ব্যাপৃত থাকিতে দেখিয়াছেন। বাস্তবিকই সহজে বুঝা যায় যে, হংসগণের কৈলাসপর্ব্বতে বা মানসসান্নিধ্যে যাইবার প্রয়োজন মুখ্যতঃ খাদ্যাভাবের আশঙ্কায় হইয়া থাকে বটে; সন্তানজনন ব্যাপারটিও ইহার অন্যতম কারণ। অমরকোষবর্ণিত রাজহংসের সহিত Grey goose এবং Flamingo এই উভয়জাতীয় হংসের বর্ণসাদৃশ্য রহিয়াছে। কালিদাসবর্ণিত হংসগুলির সহিতও ইহাদিগের খাদ্য এবং মানস-প্রয়াণ ব্যাপার লইয়া তুলনা করিলে যথেষ্ট সাম্য লক্ষিত হয়। তবে যখন কবিবর্ণিত প্রদেশসমূহে Grey goose পাখীগুলি কেবলমাত্র বসন্ত পর্য্যন্ত অবস্থান করে, গ্রীষ্মাগমে উড়িয়া যায়, তখন কেমন করিয়া আষাঢ় মাসে তাহারা মেঘদূতের সহযাত্রী হইতে পারে? এই সময় তাহারা মানসসরোবরে গার্হস্থ্যজীবন অতিবাহিত করিতেছে, ইহাই মিঃ মুর্‌ক্রফ্‌ট্ স্বচক্ষে দর্শন করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। Flamingo জাতীয় হংসগুলিকে কিন্তু ভারতবর্ষে, বিশেষতঃ কবিবর্ণিত স্থানসমূহে জ্যৈষ্ঠমাসাবধি অবস্থান করিতে দেখা যায় বলিয়া মিঃ ব্লান্‌ফোর্ড লিখিয়া গিয়াছেন। আষাঢ় মাসেও ইহাদিগকে স্বল্প সংখ্যায় দেখিতে পাওয়া সম্ভব, কারণ, কোন এক বিশিষ্ট শ্রেণীর সকল যাযাবর পাখীই যে এক সময়ে প্রস্থান করে, তাহা নহে। সচরাচর উহাদিগের প্রস্থানের রীতি এই যে, যাহাদিগের শাবকোৎপাদনাদি ব্যাপার সাইবিরিয়া প্রভৃতি সুদূর দেশে সম্পাদিত হয়, তাহাদিগকে সর্ব্বাগ্রে ভারতবর্ষ পরিত্যাগ করিতে হয়; কিন্তু যাহরা হিমাচলস্থ সরোবর-সান্নিধ্যে এই সমস্ত ব্যাপার সুসম্পন্ন করিয়া থাকে, তাহাদিগের অত শীঘ্র যাইবার প্রয়োজন নাই বলিয়া তাহারা বিলম্বে প্রস্থান করে। Anserinae জাতীয় হংসগণের প্রব্রজন (migration) রীতির বর্ণনপ্রসঙ্গে Raoul তাঁহার গ্রন্থে[১২] এইরূপ লিখিয়াছেন,—

 “By the end of February a good many of them have left India, probably those that have their homes in the Tian Shan and other Trans-Himalayan resorts. Those that still remain, do so till the end of the following month, and these are probably birds that nest among the Thibetan lakes.”

 অন্যান্য হংসশ্রেণীমধ্যেও এই পদ্ধতি আদৌ অপরিচিত নহে।

 কালিদাসের “মানসোৎক রাজহংসগণ” যে উল্লিখিত Flamingo শ্রেণীর পক্ষী, এই সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হইতে পারি। ইহারা যে তিব্বতের জলাশয়ে এবং মধ্যএসিয়ায় ভারতবর্ষ হইতে উড়িয়া গিয়া কিছুকাল অবস্থান করে, তাহা পক্ষিতত্ত্ববিদ্‌গণের নিকট সুপরিচিত। হংসজাতীয় বিভিন্ন পক্ষিশ্রেণীগুলির সম্বন্ধে মিঃ ম্যাকিন্‌টশ্ (L. J. Mackintosh) তাঁহার Birds of Darjeeling and India নামক পুস্তকে লিখিয়াছেন—

 “Most of the species belonging to this tribe migrate to Central Asia and lakes in Thibet.”

 উল্লিখিত species গুলি সংখ্যায় পাঁচটি, যথা—(১) Flamingoes, (২) Swans, (৩) Geese, (৪) Ducks, (৫) Mergansers। তবে যে মিঃ মুর্‌ক্রফ্‌ট্ এবং অন্যান্য হিমালয়পর্য্যটক মানসসরোবরে কেবলমাত্র Grey goose অথবা wild gooseএর উল্লেখ করিয়াছেন, বিশেষভাবে Flamingoর নির্দ্দেশ করেন নাই, তাহার কারণ এই হইতে পারে যে, তাঁহারা পক্ষিতত্ত্ববিদের মত সূক্ষ্মভাবে পাখীগুলির শারীরিক বৈষম্য এবং অবয়বের তারতম্য বোধ হয় লক্ষ্য করিবার অবসর পান নাই। এই Grey goose বা wild goose শব্দ তাঁহারা সাধারণভাবে ব্যবহার করিয়াছেন মাত্র। দশার্ণ জনপদে “কতিপয়দিনস্থায়ী” হংস বলিয়া কবিবর যে পাখীগুলির বর্ণনা করিয়ছেন, তাহাদের অধিকাংশই যে এই Flamingo জাতীয়, তাহাতে আর সন্দেহ কি?

 অনেকে রাজহংসকে Swan বলিয়া নির্দ্দেশ করেন; কিন্তু তাহা ঠিক নহে। কারণ, প্রথমতঃ যে দুই শ্রেণীর Swan ভারতবর্ষে দৃষ্ট হয় বলিয়া মিঃ ব্লান্‌ফোর্ড তাঁহার পুস্তকে[১৩] লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তাহাদের উভয়েরই পদদ্বয় কৃষ্ণবর্ণ, এমন কি, একশ্রেণীর চঞ্চুও কৃষ্ণবর্ণ; দ্বিতীয়তঃ কবি-বর্ণিত রামগিরি এবং তাহার নিকটবর্ত্তী স্থানসমূহে উহারা কখনও দৃষ্ট হইয়াছে, এ কথা আধুনিক পক্ষিতত্ত্ববিদ্ পণ্ডিতগণের বিদিত নাই। কেবলমাত্র পেশোয়ারের সমীপস্থ উত্তরপশ্চিম পাঞ্জাবে, নেপাল উপত্যকায়, কদাচিৎ বা সিন্ধুদেশে তাহাদের বিরলদর্শন পাওয়া যায়।

 শব্দার্ণব গ্রন্থে আমরা দেখিতে পাই যে, হংস অর্থে সারসপক্ষীও বুঝায়,—“চক্রাঙ্গঃ সারসো হংসঃ”। ভারতবর্ষে যে সমস্ত যাযাবর সারস দৃষ্ট হয়, তাহারা তথায় শীতঋতুতেসারস অবস্থান করিয়া বসন্তাবসানে, অর্থাৎ মার্চ্চ মাসের প্রারম্ভে উড়িয়া যায়। আষাঢ় মাসে তাহাদিগকে কখনই দেখিতে পাওয়া সম্ভবপর নহে। কেবল এক শ্রেণীর সারস পক্ষীকে সকল ঋতুতে পশ্চিমভারতে অবস্থান করিতে দেখা যায়; তাহারা যাযাবর নহে। অতএব কখনই তাহাদিগকে “কতিপয়দিনস্থায়ী হংস” বলা যায় না।

 সারসের অপর অভিধানার্থ এইরূপ,—“সারসো মৈথুনী কামী গোনর্দ্দো পুষ্করাহ্বয়ঃ”[১৪], “পুষ্করাহ্বস্তু সারসঃ[১৫]। ইহারা যথার্থ সারসপদবাচ্য, Grus পরিবারভুক্ত; হংস নহে। ইহাদিগের অবয়ব বৃহৎ, চঞ্চু অতিশয় দীর্ঘ। উল্লিখিত অভিধানার্থ হইতে ইহাদিগের প্রকৃতি বেশ বুঝা যায়। আধুনিক যুগের বিহঙ্গতত্ত্ববিদ্‌গণের পরিদর্শন এবং পর্য্যবেক্ষণের ফলে এই আভিধানিক অর্থ যে সারসজাতির বৈজ্ঞানিক পরিচয়, তাহা সম্যক্‌রূপে প্রমাণিত হইয়া গিয়াছে। পক্ষিদম্পতি সর্ব্বদা একত্রে থাকে বলিয়া ইহাদিগকে মৈথুনী আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। উভয়ের মধ্যে অনুরাগাধিক্যবশতঃ উহারা কামী। উহাদিগের কণ্ঠস্বর বৃষবৎ কর্কশ বলিয়া তাহা গোনর্দ্দ। সরোবরের সহিত উহারা এত ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট যে, উহাদিগকে অভিধানকার পদ্মের সহিত এক পর্য্যায়ভুক্ত করিয়া যেন আখ্যা দিয়াছেন, পুষ্করাহ্বয়ঃ বা পুষ্করাহ্বঃ। মিঃ ব্লান্‌ফোর্ড লিখিয়াছেন,—

 “The Sarus is usually seen in pairs, each pair often accompanied by a young bird or occasionally by two, in open marshy ground or the borders of swamps or large tanks. * * * * They have a loud trumpet-like call. * * * * The Sarus pairs for life, and if one of a pair is killed, the survivor is said not unfrequently to pine and die”[১৬].

সচরাচর যুগ্মাবস্থায় ইহাদিগকে বিচরণ করিতে দেখা যায়, কিন্তু সময়ে সময়ে ইহারা দল বাঁধিয়াও থাকে। সরোবরতটে বা জলাভূমির সান্নিধ্যে খোলা জায়গা ইহাদিগের বিহারভূমি। বর্ষাঋতুই ইহাদিগের গর্ভাধানকাল। বাস্তবিক ইহাদিগের দাম্পত্য প্রেম পক্ষিজগতে অতুলনীয়; পক্ষিদম্পতির মধ্যে হঠাৎ একটির মৃত্যু হইলে অপরটিকে বিরহজর্জ্জরিত হইয়া প্রায়ই প্রাণত্যাগ করিতে দেখা যায়[১৭]

 কালিদাস মেঘদূতে এই সারসগণের যৎসামান্য পরিচয় দিয়াছেন, তাহা নিম্নে উদ্ধৃত করিলাম—

দীর্ঘীকুর্ব্বন্ পটু মদকলং কূজিতং সারসানাং
প্রত্যূষেষু স্ফুটিতকমলামোদমৈত্রীকষায়ঃ।

* * * *

শিপ্রাবাতঃ প্রিয়তম ইব প্রার্থনাচাটুকারঃ।

 সারসদিগের কণ্ঠস্বর স্বভাবতঃ তীব্র এবং সুদূরপ্রসারী। অবন্তীজনপদস্থ বিশালা-পুরীমধ্যে প্রভাত সময়ে শিপ্রাতটে বিচরণশীল সারসগণের মদকলকূজিত যে সমীরণ কর্ত্তৃক বহুদূরে নীত হইবে, তাহাতে আর বিচিত্রতা কি? মিঃ ব্লান্‌ফোর্ড লিখিয়াছেন যে, জুলাই, আগষ্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে ইহারা অণ্ডপ্রসব এবং শাবকোৎপাদন করিয়া থাকে। মেঘাগমে সারসগণের মদকলকূজিত যে গর্ভাধান-সময়োপযোগী, তাহাতে সংশয় নাই।

 মেঘদূতে যে চক্রবাকের উল্লেখ দেখিতে পাই তাহা যে হংসশ্রেণীভুক্ত, এ কথা বোধ হয় অনেকেই জানেন না। সাধারণতঃ আমাদের দেশে ইহারা “চকাচকী”চক্রবাক নামে খ্যাত। ইহাদের বৈজ্ঞানিক নাম casarca rutila; ইংলণ্ডে Brahminy Duck বা Ruddy Goose নামে ইহারা পরিচিত। চক্রবাকের অপর তিনটি পর্য্যায় আমরা অমরকোষে পাই,—“কোকশ্চক্রশ্চক্রবাকো রথাঙ্গাহ্বয়নামকঃ”। প্রবাদ আছে যে, চক্রবাক-মিথুন সারাদিন একত্র অবস্থান করিয়া দিবাবসানে পৃথক্ হইয়া যায়। পক্ষী রহিল নদীর এপারে, পক্ষিণী পরপারে; এই অবস্থায় পরস্পর পরস্পরকে ডাকাডাকি করিতে থাকে। বিদেশী পক্ষিতত্ত্ববিদ্ অনেকে স্বকর্ণে নদীর উভয় পার্শ্ব হইতে নিশীথে এই প্রকার অবিরাম পক্ষিকণ্ঠধ্বনি শুনিয়া ব্যাপারটি লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছেন[১৮]। কিন্তু বৈজ্ঞানিক হিসাবে এবং বাস্তব পক্ষিজীবনের দিক্‌ হইতে দেখিলে এই চকাচকীর বিরহপ্রসঙ্গ কতদূর সত্য, তাহা আজ পর্য্যন্ত কেহ যে ভাল করিয়া পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন, এমন মনে হয় না। দিবাভাগে উহারা যে যুগ্মাবস্থায় নদীতটে একত্র অবস্থান করে, তাহা মিঃ ব্লান্‌ফোর্ড লক্ষ্য করিয়াছেন;—

 “In India this species is very common on all rivers of any size, generally sitting in pairs on the land by the riverside during the day.”

 কিন্তু দিবাবসানে তাহারা একত্র বাস করে কি না, তাহার কোন স্পষ্ট উল্লেখ কোথাও দেখিতে পাই না[১৯]

 সন্ধ্যাগমে অনাথা চক্রবাকীর প্রতি বিরহাতুরা কামিনীর সমবেদনা আরোপ করিতে এতদ্দেশীয় কবিগণ কুণ্ঠিত হন নাই। কালিদাসও এই চিরন্তন পদ্ধতির ব্যতিক্রম না করিয়া যক্ষপত্নীকে বিরহজর্জ্জরিতা অসহায়া চক্রবাকীর সহিত তুলনা করিয়াছেন,—

তাং জানীথাঃ পরিমিতকথাং জীবিতং মে দ্বিতীয়ং
দূরীভূতে ময়ি সহচরে চক্রবাকীমিবৈকাম্।

 রাজহংসের ন্যায় চক্রবাকও “কতিপয়দিনস্থায়ী”; কিন্তু আসন্ন বর্ষায় তাহাদিগকে দেখিতে পাওয়া সম্ভবপর নহে। কারণ, সমগ্র শীতকাল ভারতবর্ষে যাপন করিয়া বসন্তসময়ে উহারা হিমালয়ের পরপারে, তিব্বত প্রভৃতি স্থানসমূহে প্রয়াণ করিয়া থাকে।

 বর্ষাঋতু কতিপয় বিহঙ্গের গর্ভাধানকাল বলিয়া যে কেবলমাত্র বিহঙ্গতত্ত্ববিদ্ পণ্ডিতগণের নিকটে পরিচিত ছিল, তাহা নহে। ইহা মহাকবি কালিদাসেরও সূক্ষ্ম দৃষ্টি অতিক্রম করিতে পারে নাই; সর্ব্বদা ভাবরাজ্যে বিচরণ করিলেও তিনি ছন্দোবন্ধের মধ্য দিয়া পক্ষিজীবনের এই বাস্তব ঘটনার কিছু পরিচয় মেঘদূতে দিয়াছেন।

গর্ভাধানক্ষণপরিচয়ান্নূনমাবদ্ধমালাঃ,
সেবিষ্যন্তে নয়নসুভগং খে ভবন্তুং বলাকাঃ।

 মেঘাগমে আপনাদিগের গর্ভাধানকাল উপস্থিত হইতেছে মনে করিয়া বলাকাগণ উৎফুল্লচিত্তে আকাশমার্গে শ্রেণীবদ্ধভাবে উড্ডীয়মান হইয়া যেন মেঘের অভিনন্দন করিতে থাকিবে।

পাখীর কথা পৃ ১৬৯.jpg

চক্রবাক,

কাদম্ব

 
[পৃঃ ১৩৮

U. RAY & SONS, CALCUTTA.

পাণ্ডুচ্ছায়োপবনবৃতয়ঃ কেতকৈঃ সূচিভিন্নৈ-
র্নীড়ারম্ভে গৃহবলিভুজামাকুলগ্রামচৈত্যাঃ
ত্বয্যাসন্নে পরিণতফলশ্যামজম্বূবনান্তাঃ
……………………… দশার্ণাঃ॥

 তোমার (মেঘের) আগমনে দশার্ণজনপদের জম্বূকাননপ্রদেশ পরিপক্ক ফল দ্বারা শ্যামবর্ণ হইবে, উপবনবৃতিসকল প্রস্ফুটিত কেতকপুষ্পের দ্বারা পাণ্ডুবর্ণ হইবে; গৃহবলিভুক্ পক্ষিগণের নীড়নির্ম্মাণ-ব্যাপারে গ্রামের রথ্যাবৃক্ষগুলি আকুলিত হইবে।

 উল্লিখিত বলাকাপঙ্ক্তি এবং গৃহবলিভুক্ পক্ষিগণ কোন্ জাতীয় বিহঙ্গ, উহাদিগের প্রকৃতি এবং সন্তানজননকাল প্রভৃতি বিষয়গুলি আলোচনা করিবার পূর্ব্বে আমরা কবিবরের তুলিকায় পাখীর উৎপতন এবং অবস্থানভঙ্গী কিরূপে চিত্রিত হইয়াছে, তাহার দিকে তাকাইবার লোভ সম্বরণ করিতে পারিলাম না। বলাকা-পঙ্ক্তির শ্রেণীবদ্ধ অবস্থান এমন সুসম্বদ্ধ যে কবি দেখাইতেছেন—অনায়াসে তাহাদিগকে গণনা দ্বারা নির্দ্দেশ করিতে পারা যাইতেছে,—

শ্রেণীভূতাঃ পরিগণনয়া নির্দ্দিশন্তো বলাকাঃ

মেঘদূতকে নির্ব্বিন্ধ্যা নদীর বিহগরচিত কাঞ্চীদাম অবলোকন করাইয়া কবি যে বিহঙ্গগণের সুশৃঙ্খল অবস্থানভঙ্গীর নির্দ্দেশ করিতেছেন, সে বিষয়ে সন্দেহ কি?

বীচিক্ষোভস্তনিতবিহগশ্রেণিকাঞ্চীগুণায়াঃ
সংসর্পন্ত্যাঃ স্খলিতসুভগং দর্শিতাবর্ত্তনাভেঃ।
নির্ব্বিন্ধ্যায়াঃ ……………………… ।

 আবার অলকায় দেখিতে পাই—

হংসশ্রেণীরচিতরশনা নিত্যপদ্মা নলিন্যঃ।

মেঘলোকে ‘আবদ্ধমালা’ হইয়া বলাকাগণের উড্ডীনগতি যে বাস্তবিকই ‘নয়নসুভগ’, তাহাতে আর সংশয় কি? বিশেষতঃ এখন ইহাদিগের গর্ভাধানকাল উপস্থিত এবং এই সময়ে উহাদিগের অঙ্গভঙ্গীর বিকাশপ্রাচুর্য্য বিশেষরূপে প্রদর্শিত হওয়া কিছুই আশ্চর্য্যের বিষয় নহে।

 এখন যে সমস্ত ‘গৃহবলিভুক্’ পক্ষী দশার্ণজনপদের রথ্যাবৃক্ষ মধ্যে নীড়নির্ম্মাণে রত হইয়াছে, তাহাদের কিঞ্চিৎ পরিচয় আবশ্যক। মল্লিনাথ তাঁহার টীকায় “গৃহবলিভুজাং” অর্থেগৃহবলিভুক্ ‘কাকাদিগ্রামপক্ষিণাং’ এইরূপ লিখিয়াছেন; অমরকোষে কাকপক্ষীকে বলিপুষ্ট এবং বলিভুক্ আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। গৃহস্থপ্রদত্ত বলি ভোজন করে বলিয়া কাকাদি কতিপয় গ্রাম্যপক্ষী গৃহবলিভুক্ পদবাচ্য হইয়া থাকে। অভিধানচিন্তামণিতে উক্ত পদটিতে চটকপক্ষীকে বুঝায়। বাচস্পত্য অভিধানে বলিভুজ্ অর্থে “বলিং বৈশ্বদেবদ্রব্যং গৃহস্থদত্তবলিং ভুঙ্ক্তে; কাকে অমরঃ” এইরূপ লিখিত আছে। কোন কোন অভিধানকার লিখিয়া গিয়াছেন যে, ইহা বক পক্ষীকেও বুঝায়। আমরা কিন্তু বেশ বুঝিতে পারি যে, কাক এবং চটকপক্ষী মানবাবাসে অথবা তৎসান্নিধ্যে আশ্রয় লইয়া জীবনযাপন করে, মানব-প্রদত্ত বলি বকপক্ষী অপেক্ষা তাহাদিগের অধিকতর সুলভ। জনপল্লী মধ্যে পথের ধারে বৃক্ষশাখায় তাহাদের নীড়ারম্ভকার্য্য সহজেই পথিকের নয়নগোচর হয়। মিঃ উইল্‌সন্ মেঘদূতের টীকায় গৃহবলিভুজ্ পদের এইরূপ অর্থ করেন,—

 “গৃহ অর্থে গৃহিণী, তৎপ্রদত্ত বলি ভোজন করে এই নিমিত্ত গৃহবলিভুক্। কথিত আছে, ডিম্ব প্রসবের পর স্ত্রীপক্ষী পুং পক্ষীকে ভোজনে সহায়তা করে; কাক, চটক এবং বক পক্ষিগণের মধ্যে এইরূপ ঘটনার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়।”[২০]

 বিহঙ্গতত্ত্ব হিসাবে এই ঘটনার যাথার্থ্য আদৌ আছে বলিয়া মনে হয় না; পরন্তু পুংপক্ষীটিই অনেক স্থলে স্ত্রীপক্ষীকে সন্তানজননকালে আহার যোগাইয়া থাকে। পাছে আহার অন্বেষণের নিমিত্ত ঘুরিয়া বেড়াইতে হইলে ডিম্বের অনিষ্ট হয়, এই জন্য বিশ্বপ্রকৃতির বিধিব্যবস্থায় পুংপক্ষীই সাধারণতঃ পক্ষিণীকে চঞ্চুপুটের সাহায্যে আহার যোগাইয়া দিয়া তাহাকে খাদ্যাহরণ-চেষ্টা হইতে কিছু দিনের নিমিত্ত অবসর প্রদান করিয়া থাকে।

 এইবার দেখা যাক্, বলাকা কোন্ জাতীয় পক্ষী। মল্লিনাথ মেঘদূতের টীকায় বলাকার্থে একস্থলে “বকপঙ্ক্তি” এবং অপরস্থলে “বলাকাঙ্গনা” লিখিয়াছেন।বলাকা অমরকোষে বলাকা পর্য্যায়ে লিখিত আছে,—“বলাকা বিসকণ্ঠিকা” অর্থাৎ মৃণালের ন্যায় কণ্ঠ যাহার। ডাক্তার আর, জি, ভাণ্ডারকর মহাশয়ের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত উক্ত অভিধানের টীকায় টীকাকার বলাকার এইরূপ অর্থ করিয়াছেন,—“বলাকা বিসকণ্ঠিকা দ্বে বালঢৌঙ্ক বগচ্চা ইতি খ্যাতস্য বকভেদস্য। বিসমিব দীর্ঘঃ কণ্ঠোঽস্য বিসকণ্ঠিকা।” এই টীকাকারগণের মতে বলাকা শব্দ বকের ভেদ বা পর্য্যায়সূচক এবং স্ত্রীপক্ষীটীকেও বুঝায়। মিঃ মনিয়ার উইলিয়মস্ কৃত সংস্কৃত-ইংরেজি অভিধানে বলাকা শব্দের অর্থ দেওয়া আছে—a crane; এবং বক অর্থে—a kind of heron or crane, Ardea Nivea। মিঃ কোলব্রুকপ্রদত্ত অমরকোষের ইংরেজি টীকায় বককে crane এবং বলাকাকে ক্ষুদ্র বা small crane বলা হইয়াছে। এখন, crane এবং heron একই পক্ষী কি না, অথবা ভিন্নজাতীয় স্বতন্ত্র পক্ষী, তাহার নির্দ্ধারণ আবশ্যক। বিহঙ্গতত্ত্ববিদ্ মিঃ মণ্টেগিউর অভিধানে[২১] স্পষ্টই লেখা আছে যে, চলিত ভাষায় heron পক্ষীকে crane বলা হইয়া থাকে; তদ্রূপ আরও কয়েকটি গ্রাম্য শব্দ ব্যবহৃত হয়, যথা—heron, heronshaw, hegrie, heronswegh প্রভৃতি। বিহঙ্গতত্ত্বহিসাবে কিন্তু crane এবং heron সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র শ্রেণীর পক্ষী;—crane বা সারস পক্ষী Grus পরিবারভুক্ত এবং heron পক্ষী Ardea পরিবারভুক্ত। সারসের সবিশেষ পরিচয় আমরা পূর্ব্বে প্রদান করিয়াছি। অমরকোষে ইহাকে বলাকাপর্য্যায়ভুক্ত না করিয়া অভিধানকার লিখিয়াছেন—“পুষ্করাহ্বস্তু সারসঃ।” অপর অভিধানে ইহাকে “মৈথুনী”, “কামী”, “গোনর্দ্দ” ইত্যাদি বলিয়া পরিচয় দেওয়া হইয়াছে। বলাকা বা বিসকণ্ঠিকা হইতে ইহা যে স্বতন্ত্র, তাহাতে সংশয় নাই। বক অর্থে heron বা crane এই শব্দ দুইটির প্রয়োগ করিলেও মিঃ মনিয়ার উইলিয়ম্‌স্ যে কেবল একই জাতীয় (অর্থাৎ heron জাতীয়, যাহা গ্রাম্যভাষায় crane নামে পরিচিত) বিহঙ্গকে নির্দ্দেশ করিতেছেন, তাহা আমরা Latin প্রতিশব্দ Ardea Nivea দ্বারা বেশ বুঝিতে পারি, কারণ বৈজ্ঞানিকের নিকটে heron বা বকপক্ষী Ardea জাতির অন্তর্গত বলিয়া স্থিরীকৃত হইয়াছে। ইহারা আদৌ যাযাবর নহে; সকল ঋতুতে ইহারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে সুবিধামত অবস্থান করে। সারস বা crane জাতীয় পক্ষিগণের অধিকাংশই কিন্তু যাযাবর; সারা শীতকাল ভারতবর্ষে যাপন করিয়া বসন্তাগমে উহারা উড়িয়া যায়। Milton রচিত Paradise Lost গ্রন্থ হইতে যাযাবর crane পক্ষীর বাৎসরিক প্রয়াণ-বর্ণনার পদ উদ্ধৃত করিয়া মেঘদূতের টিপ্পনী-প্রসঙ্গে যখন মিঃ উইল্‌সন বলাকাগণের উৎপতনভঙ্গীর তুলনা করিয়াছেন তখন যে তিনি বলাকার যথার্থ পরিচয় পাইয়াছেন, এ বিষয়ে আমরা সন্দিহান হই। অনেকেই এইরূপ ভ্রমে পতিত হইয়াছেন বলিয়া মিঃ নিউটন তাঁহার Dictionary of Birds নামক পুস্তকে পাঠককে সতর্ক করিয়া দিয়াছেন—

 “Heron, a long-necked, long-winged, and long-legged bird, the representative of a very natural group, the Ardeidae which through the neglect or ignorance of ornithologists has been for many years encumbered by a considerable number of alien forms belonging truly to the Gruidae (crane) and Ciconiidae (stork), whose structure and characteristics are wholly distinct, however much external resemblance some of them may possess to the Herons.”

 অভিধানোক্ত long-necked শব্দটি অমরকোষের বিসকণ্ঠিকা পদকে স্মরণ করাইয়া দেয়; বিস বা মৃণালের ন্যায় দীর্ঘ কণ্ঠ আছে বলিয়া ইহারা বিসকণ্ঠিকা। মৃণালের সহিত তুলনা করায় বককণ্ঠের যে কেবল দীর্ঘত্ব সূচিত হয়, তাহা নহে, নমনীয়তাও (flexibility) সূচিত হইয়া থাকে। The World’s Birds নামক গ্রন্থে পক্ষতত্ত্ববিদ্ Frank Finn সাহেব heron বা বককণ্ঠের এইরূপ বর্ণনা দিয়াছেন—“Neck long with an S-like curvature in repose” অর্থাৎ ইহার কণ্ঠ দীর্ঘ; পাখীটি যখন চুপ করিয়া বসিয়া থাকে, তখন গতিবিহীন অবস্থায় ইহার গলদেশ ইংরেজি S অক্ষরের ন্যায় বক্রভাবে থাকে। তখন অনেক সময়ে ইহাকে সর্প বলিয়া ভ্রম হওয়াও সম্ভব। ডাক্তাৱ ব্যট্‌লার তাঁহার British Birds নামক পুস্তকে Purple Heronএর বর্ণনপ্রসঙ্গে লিখিয়াছেন—

 “In India the brown head of a closely allied species has been taken for a snake. The bird will trust greatly to this deception to escape notice.”[২২]

 বলাকা বা বকজাতীয় পক্ষীর কণ্ঠস্বর কর্কশ। সাধারণতঃ আকাশমার্গে উড্ডীয়মান বকের কণ্ঠস্বরই শ্রুত হয়; জলাভূমিতেও বিচরণকালে ইহাদের কণ্ঠধ্বনি প্রায়ই প্রদোষে ও প্রাতে শ্রুত হইয়া থাকে। এই জলচর বিহঙ্গের কণ্ঠস্বরের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়াই বোধ হয়, অভিধানকার বকপর্য্যায়ে ইহার ‘কহ্ব’ আখ্যা দিয়াছেন (কে অর্থাৎ জলে হ্বয়তে শব্দং কুরুতে ইতি)। মজা এই যে, পাশ্চাত্য ভূখণ্ডেও সাধারণতঃ ইহার উক্তপ্রকার নামকরণ পাওয়া যায়;—ওয়েল্‌সের লোকে ইহাকে Boom of the marsh বলে; ইংলণ্ডের নানাস্থানে ইহা Bog-Bumper নামে পরিচিত। মার্কিনদেশে অনেকে ইহাকে Bog-Bull বলিয়া অভিহিত করে। এই মার্কিন Bitternএর স্বর শুনিলে মনে হয় যেন ইহার গলা জলে ভরা; সেই জলের ভিতর দিয়া ইহার স্বর নির্গত হইতেছে।

 বর্ষাঋতু বলাকাগণের গর্ভাধানের প্রশস্ত সময়। এই সময়ে বকজাতীয় নানা পক্ষী নানা স্থান হইতে একত্র সমবেত হইয়া সাধারণতঃ একই বৃক্ষের নানা শাখাপ্রশাখায় নীড় রচনা করে। Egret, bittern, night heron, common heron, purple heron প্রভৃতি Ardea বা heron জাতীয় নানা পক্ষী স্বভাবতঃ বৎসরের অধিকাংশ সময় ভারতের নানা স্থানে সঙ্গিহীন অবস্থায় বিচরণ করে; কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে বর্ষাগমে কোথা হইতে যে তাহারা উড়িয়া আসিয়া এক বা ততোধিক গাছের সমস্ত শাখাপ্রশাখা জুড়িয়া বসে, এমন কি, অচিরে একটি পক্ষিপল্লী সৃজন করিয়া ফেলে, তাহা বলা যায় না। ইহারাই দলবদ্ধ হইয়া আকাশমার্গে উড্ডীয়মান হয়। মেঘৈর্মেদুরাম্বরাভিমুখে ইহাদিগের নয়নসুভগ উদ্দামগতি এখনও পাশ্চাত্য পথিকের মোহ উৎপাদন করিয়া থাকে। মিঃ সিভুমের (H. Seebohm) গ্রন্থে common heronএর উড্ডীনগতির যে চিত্র লিপিবদ্ধ আছে, তাহা মিঃ ব্যট্‌লার সম্পাদিত British Birds with their nests and eggs নামক পুস্তকে এইরূপ উদ্ধৃত হইয়াছে—

 “The flight of the Heron is slow and steady with deliberate and regular beats of the long wings. * * * * Although the flight appears to be laboured it is really very rapid. * * * * When flying, its long legs are carried straight out behind, and serve to balance and guide it in its course, whilst the head is drawn up almost to the shoulders.”

 বৃহৎ শুভ্র বক বা Large Egretএর উৎপতনভঙ্গী সম্বন্ধে উক্ত গ্রন্থে লিখিত আছে—

 “Its flight is moderately slow, performed by a series of regular flappings of the wings. It seems more buoyant in the air than the common Heron and looks more graceful—due to its standing erect and drawing in its neck less.”

 মেঘদূতের বিহঙ্গপরিচয় এখনও সম্পূর্ণ হইল না। সজলনয়ন, শুক্লাপাঙ্গ, নীলকণ্ঠ ময়ূর, অম্ভোবিন্দুগ্রহণচতুর চাতক, পিঞ্জরস্থা মধুরবচনা শারিকা, আর “নিশিদ্বিপ্রহরে সুপ্ত” পারাবাত লইয়া কতকটা বৈজ্ঞানিকভাবে Ornithologyর দিক্ হইতে আলোচনা করিতে হইবে।


  1. Bird Behaviour by Frank Finn, p. 208.
  2. Ibid, p. 219.
  3. স্বনামখ্যাত বৈজ্ঞানিক F. W. Headley পক্ষীর যাযাবরত্ব প্রসঙ্গে তাঁহার Structure and Life of Birds নামক পুস্তকের এক স্থলে লিখিয়াছেন যে, প্রতিকূল পারিপার্শ্বিক অবস্থার ভিতর হইতে পাখীগুলি বৎসরে বৎসরে স্থানান্তরে উড়িয়া যায়, শুধু যেগুলি মানুষঘেঁসা হইয়া পড়ে, তাহারা স্থান পরিত্যাগ করিতে চায় না—“Only those that are fed by their human friends remain.” Chapter XIV. p. 366.
  4. A journey to Lake Manasarovara in Un-des by William Moorcroft, Asiatic Researches, Vol. XII (1816), p. 466
  5. Trans-Himalaya by Sven Hedin, Vol. II, chapter XLIV, p. 119.
  6. Hamilton’s East India Gazetteer (Second Edition), Vol. II, pp. 202, 203.
  7. “Krauncha-Randhra—The Niti pass in the district of Kumaun which affords a passage to Tibet from India.”—Mr. Nanda Lall Dey’s Geographical Dictionary of Ancient and Mediaeval India.
  8. Birds of an Indian Village by D. Dewar, p. 56.
  9. Fauna of British India, Birds, Vol. IV, pp. 416-417.
  10. Fauna of British India, Birds, Vol. IV, pp. 408-409.
  11. A journey to Lake Manasarovara in Un-des by William Moorcroft, Asiatick Researches Vol. XII (1816), p. 473.
  12. Small Game Shooting in Bengal by “Raoul,” p. 77.
  13. Fauna of British India, Birds. Vol. IV, pp. 414-415.
  14. ইতি যাদবঃ।
  15. ইত্যময়ঃ।
  16. Fauna of British India, Birds, Vol. IV, p. 188.
  17. বিশপ্ ষ্টান্‌লি তাঁহার “Familiar History of Birds” নামক পুস্তকে নিম্নলিখিত ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করিয়াছেন:—একটি ভদ্রলোক অনেক দিন একজোড়া সারস পুষিয়াছিলেন; কালক্রমে পক্ষিণীর মৃত্যু হইল। পক্ষিপালক দেখিলেন যে, জীবিত পক্ষীটি ভগ্নহৃদয় হইয়া যেন মৃত্যুমুখে পতিত হইবার উপক্রম করিতেছে। তখন তিনি একটি বড় আয়না পক্ষিগৃহমধ্যে স্থাপিত করিলেন। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখিয়া বিরহী পক্ষী তাহার সঙ্গিনীকে ফিরাইয়া পাইল মনে করিয়া, আয়নার সম্মুখে নিজের পক্ষবিস্তার পূর্ব্বক হর্ষপ্রকাশ করিল। শীঘ্রই সে সুস্থ হইয়া উঠিল। অধিকাংশ সময় সে সেই কাঁচের সম্মুখে অতিবাহিত করিত। এমনি করিয়া সেই সারস অনেক বৎসর বাঁচিয়া ছিল। পৃঃ ৩১২।
  18. “Who is there, when travelling by river during the winter months, has not heard at night the warning call of Kwanko, Kwanko, repeated at intervals?—this call seeming often to come and being answered from opposite banks.”—Small Game Shooting in Bengal by “Raoul,” p. 93.
  19. হিউম্ ও মার্শ্যাল রচিত Game Birds of India, Burmah and Ceylon (Vol. III) পুস্তকে বরং উল্টা রকম বর্ণনা দেখিতে পাই। তাঁহারা বলেন যে, চকাচকী দিনরাত নদীর একই পারে অবস্থান করে; নদী যদি খুব সরু হয় তাহা হইলে তাহারা বিচ্ছিন্ন হইয়া উভয় পারে রাত্রিযাপন করে (execpt in the case of very narrow rivers like the Hindon in Meerut, alike by day and night, chakwa and chakwi are to be found both on the same side of the water—p. 129)
  20. “The term signifies ‘who eats the food of his female’; গৃহ commonly a house, meaning in this compound, a wife. At the season of pairing, it is said that the female of this bird assists in feeding the male; and the same circumstance is stated with respect to the crow and the sparrow, whence the same epithet is applied to them also.”—Megha Duta by H. H. Wilson, p. 24.
  21. Ornithological Dictionary of British Birds by Colonel G. Montague (second edition).
  22. British Birds with their Nests and Eggs, Vol. IV, p. 11.