পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/৩৪২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অথবা আসামের জঙ্গলে যাইয়া বসতি করে এবং সেখানে তাহারা প্রচুর ধান ও পার্ট উৎপন্ন করে। তৎসত্ত্বেও তাহারা চীনাদের সঙ্গে তো দরের কথা, উত্তর ভারত হইতে আগত হিন্দুস্থানীদের সহিতও প্রতিযোগিতায় টিকিতে পারে না। কলিকাতায় ছোট ছোট চামড়ার কারখানা এবং জনতার দোকান সমস্তই চীনা, জাঠ মসলমান এবং হিন্দুস্থানী চামারদের হস্তগত। নিম্নোদ্ধত বিবরণটি হইতে আমার উক্তির সত্যতা বুঝা যাইবে – “কলিকাতায় চীনাদের প্রায় ২৫০ শত জনতার দোকান আছে, উহারা সকলে মিলিয়া প্রায় ৮। ১০ হাজার মনচাঁকে কাজে খাটায়। প্রচলিত প্রথা এই যে, জতার উপরের অংশ চীনারা তৈরী করে এবং সকতলা ও গোড়ালি মচোঁরা সেলাই করিয়া দেয়। এই কাজে মচোঁদের মজরী সাধারণতঃ দৈনিক দ০ আনা হইতে দ০০ আনা। বেশী কারিগরির কাজ হইলে মজুরী এক টাকা পৰ্যন্ত দেওয়া হয়।” The Statesman, Oct., 1930. মচোঁদের সংখ্যা যদি গড়ে ১ হাজার এবং প্রত্যেকের মজরী দৈনিক তের আনা ধরা যায়, তাহা হইলে মচোঁদের আয় বৎসরে ২৬ লক্ষ টাকা দাঁড়ায়। হিন্দুস্থানীদের জন্তার দোকানে আরও কয়েক হাজার মচোঁ নিজেরা জনতা নিমাণের ব্যবস্থা করে; এবং পবোত্ত হারে তাহারাও বৎসরে প্রায় ২৬ লক্ষ টাকা উপাজন করে। সুতরাং কথাটা অবিশ্বাস্য মনে হইলেও, ইহা সত্য যে, অবাঙালী মচৌরা এই বাংলা দেশে বসিয়া বৎসরে ৫২ লক্ষ টাকা অথবা অন্ধ কোটী টাকার অধিক উপাঞ্জন করে। ঢাকা সহরের নিকটে ষে সব চামার বাস করে, তাহাদের ব্যবসা নাই, সতরাং তাহারা অনশনক্লিষ্ট জীবন যাপন করে। বাংলার অনন্নেত জাতিদের মধ্যে তাহারাই সবাপেক্ষা দরিদ্র ও নিপীড়িত। তাহারা জীবিকার জন্য ভিক্ষা করিতে লজা বোধ করে না। যদি তাহারা জতা মেরামত বা জতা সেলাইয়ের কাজও করিত, তাহা হইলেও দৈনিক বার আনা এক টাকা উপাজন করিতে পারিত। কিন্তু এই কাজ হিন্দসন্ধানী বা বিহারী চামারেরা দখন করিয়া লইয়াছে। অবশ্য এই কমে অপ্রবত্তিই ঢাকার চামারদের এই দদশার কারণ। শ্রীরামপন্রের বিখ্যাত পাদরী কেরী সাহেব একথা বলিতে লজা বোধ করিতেন না যে, তিনি এক সময়ে চমকারের কাজ করিতেন; লেনিনের পদাধিকারী ট্যালিন তাঁহার দারিদ্র্যের দিনে মনচাঁর কাজ করিতেন। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থার আগাগোড়া একটা কালপনিক গবে আচ্ছন্ন। একজন শিক্ষিত অধ্যবসায়শীল বাঙালী সরকারী রিসাচ ট্যানারীতে তিন বৎসর শিক্ষা লাভ করিয়া জতার ব্যবসা আরম্ভ করিয়াছেন। তিনি সাধারণতঃ তাঁহার কারখানাতে দশ জন হিন্দুস্থানী চামার নিযুক্ত করেন, উহারা দিন ১০ । ১২ ঘণ্টা কাজ করিয়া প্রত্যহ গড়ে এক জোড়া করিয়া জতা তৈরী করে। তাহদের আয় দৈনিক গড়ে ১॥ve অথবা মাসে ৫০ টাকা। বাঙালী যুবকটি আমাকে বলিয়াছিল যে, একজন চীনা মচোঁ যদিও মাসিক এক শত টাকার কমে কাজ করিতে রাজী হইবে না, তবুও তাহার বারা কাজ করানো শেষ পর্যন্ত লাভজনক। কেননা সে বেশী পরিশ্রম করে এবং তাহার কাজও ভাল হয়। চীনারা মৌমাছিদের মত পরিশ্রমী। তাহারা দিনের প্রত্যেকটি মহত কাজে লাগায়, এক মিনিট সময়ও নষ্ট করে না। তাহদের মেয়েরাও সমান পরিশ্রমী, এবং বাঙালী মেয়েদের মত তাহারা দিবানিদ্রার সময় নষ্ট করে না। দোকানের পিছনে নিজেদের বাড়ীতে তাহারা হয় কাপড় কাচায় ব্যস্ত অথবা জামা সেলাই করে। হিসাব করিয়া দেখা গিয়াছে যে, কলিকাতায় চীনারা জনতা ও চামড়ার ব্যবসায়ে বৎসরে প্রায় এক কোটী টাকারও বেশী উপাজন করে। তা ছাড়া, চীনা ছতারেরাও বৎসরে কয়েক লক্ষ টাকা উপাজন করে।