পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/৩৭২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


পরীক্ষা দেয় নাই। স্মরণ রাখিতে হইবে কলিকাতায় থাকিয়া একজন এম. এস-সি, ছাত্রের পড়িবার ব্যয় মাসিক ৪০ হইতে ৫০ টাকার কম নহে। সতরাং দই বৎসর কাল প্রত্যেক ছাত্রের অভিভাবকের গড়ে এক হাজার টাকা লাগিয়াছে এবং পবোন্ত ৪o জন ছাত্র মোট ৪o হাজার টাকা অপব্যয় করিয়াছে। কিন্তু এই নগদ টাকার অপব্যয়েই দুঃখের শেষ নহে। জাতির মনুষ্যত্ব ষে ভাবে এই দিকে ক্ষয় হইতেছে, তাহা সত্যই ভয়াবহ। (৩০) তারপর এখনও বাঙালী ছাত্রেরা বিদেশে, বিশেষতঃ জামানী ও আমেরিকায় যায়, তথাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী ও ডিপ্লোমার মোহে। তাহারা এজন্য নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি বন্ধক দেয়, এমন কি বিবাহের বাজারে সবোচ্চ দরে নিজেকে নীলাম করিতেও সে লজিত হয় না। কিন্তু দেশে ফিরিয়া সে চারিদিকে অকুল পাথার দেখে। সে ঝোঁকের মাথায় কখন কখন দুঃসাহসিক অভিযান করিতে পারে যথা, সে শ্রমিকদের দোভাষী হইয়া যাইতে পারে, অথবা হংকংএ সৈন্য বিভাগের ডাক্তার কিবা কোন সমন্দ্রেগামী জাহাজের ডাক্তার হইয়া যাইতে পারে। কিন্তু শীঘ্রই বাড়ীর জন্য তাহার মন আকুল হইয়া উঠে। পক্ষান্তরে গুজরাটী, কচ্ছী, সিন্ধীরা, অশিক্ষিত হইলেও সিঙ্গাপুর, হংকং, কিওটো, ইয়োকোহামা, হনললে, সান ফ্রান্সিসকো, কোনিয়া, মিশর ও পারিতে থাকিয়া ব্যবসায়ীরপে প্রভূত অর্থ উপাজন করে। পরিশেষে আমি পনবার বলিতেছি যে, বাঙালী দভাগ্যক্রমে বড় বেশী আদশবাদী হইয়া পড়িয়াছে, ব্যবহারিক জ্ঞান তাহার অত্যন্ত কম। এই বৈজ্ঞানিক যুগে দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা হওয়াতে, সে ইয়োরোপীয় ও চীনাদের সংস্পশে আসিয়াছে; মাড়োয়ারী, গুজরাটী, বোরা, পাশী, হিন্দুস্থানী, পাঞ্জাবী, উড়িয়া, কচ্ছী, সিন্ধী প্রভৃতি অ-বাঙালীদের সঙ্গেও তাহার ঘনিষ্ট পরিচয় হইয়াছে। কিন্তু জীবনের প্রত্যেক কমক্ষেত্রে সে প্রতিযোগিতায় হঠিয়া যাইতেছে। তাহার পাচক, ভূত্য, ফিরিওয়ালা, কুলী, ক্ষেতের মজর, জন্তা-নিমাতা, মচোঁ, ধোবা, নাপিত এ সমস্তই বাংলার বাহির হইতে আমদানী হইতেছে। দেশের অন্তবাণিজ্য, তথা বিদেশের সঙ্গে আমদানী রপ্তানীর ব্যবসা—সমস্তই তাহার হাত হইতে চলিয়া যাইতেছে। এক কথায়, অন্নসংস্থানের ব্যাপারে, বাঙালী তাহার নিজের বাসভূমিতে অসহায় হইয়া পড়িয়াছে। ২২ লক্ষ অ-বাঙালী প্রতি বৎসর বিপুল অথ-১২০ কোটী হইতে ১৫o কোটী টাকা—বাংলা হইতে উপাজন করিয়া লইয়া যাইতেছে। আর বাঙালী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী সবোচ্চ আকাঙ্ক্ষার বস্তু বলিয়া মনে করিতেছে, এবং এই ডিগ্রী না পাইলে নিজের জীবনকে ব্যথ মনে করিতেছে। সে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতি চিরদিনই বিরাপ। ইহাকে সে ছোট কাজ বলিয়া মনে করে। সতরাং অনাহারক্লিষ্ট ডিগ্রীধারীর দল যে বাজার ছাইয়া ফেলিবে, তাহা আর আশচব কি ? খবরের কাগজে যখনই কোন ৫o, হইতে ১oo, শত টাকা মাসিক বেতনের কম খালির বিজ্ঞাপন বাহির হয়, তখনই শত শত দরখাস্ত পড়িতে থাকে। যদি বেতন মাসিক ১৫o, শত টাকা বা বেশী হয় তবে দরখাতের সংখ্যা হাজার হাজার হয়। গত ২৫ বৎসর ধরিয়া এই হদয়বিদারক দশ্য দেখিয়া আমি মনে গভীর বেদনা বোধ করিতেছি। বস্তুতঃ, আর্থিক ক্ষেত্রে বাঙালীর ব্যর্থতার বিষয়ে চিন্তা ও আলোচনা করা আমার একটা প্রধান কাজের মধ্যে দাঁড়াইয়াছে। এই কারণেই প্ৰবজাতির এই দেবিল্যের প্রতি দটি আকর্ষণ করিয়া আমি সকলকে সচেতন করিবার চেষ্টা করিতেছি। (৩০) আরও দুঃখের বিষয় এই, যে ২২জন দিয়াছিল, তাহদের মধ্যে কেহই নিয়মিত ছাত্র নহে, অথাৎ কেহই প্রথম নাই। যাহারা শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দেয় না, অথবা পরীক্ষায় ফেল করে, অনিয়মিত ছাত্র রূপে পরীক্ষা হয়। সতরাং ইহাঙ্গের জন্য অভিভাবকদের অতিরিক্ত অর্থব্যয় হয়