পাতা:গল্পগুচ্ছ (প্রথম খণ্ড).djvu/৪৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


রামকানাইয়ের নির্বদ্ধিতা

যাহারা বলে, গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অস্তঃপুরে বসিয়া তাস থেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে। আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপর বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাটু চিবুক পর্যন্ত উখিত করিয়া কাচা তেঁতুল, কাচা লঙ্কা এবং চিংড়িমাছের ঝাল-চচ্চড়ি দিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পান্তাভাত খাইতেছিলেন। বাহির হইতে যখন ডাক পড়িল তখন স্তুপাকৃতি চর্বিত ডাটা এবং নিঃশেষিত অন্নপাত্রটি ফেলিয়া গম্ভীরমুখে কহিলেন, “দুটো পান্তভাত যে মুখে দেব, তারও সময় পাওয়া যায় না।”

এ দিকে ডাক্তার যখন জবাব দিয়া গেল তখন গুরুচরণের ভাই রামকানাই রোগীর পাশ্বে বসিয়া ধীরে ধীরে কহিলেন, "দাদা, যদি তোমার উইল করিবার ইচ্ছা থাকে তো বলে।” গুরুচরণ ক্ষীণস্বরে বলিলেন, “আমি বলি, তুমি লিথিয় লও।” রামকানাই কাগজকলম লইয়া প্রস্তুত হইলেন। গুরুচরণ বলিয়া গেলেন, “আমার স্থাবর অস্থাবর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি আমার ধর্মপত্নী শ্রীমতী বরদাসুন্দরীকে দান করিলাম।” রামকানাই লিখিলেন, কিন্তু লিখিতে তাঁহার কলম সরিতেছিল না। তাঁহার বড়ো অাশা ছিল, তাহার একমাত্র পুত্র নবদ্বীপ অপুত্ৰক জ্যাঠামহাশয়ের সমস্ত বিষয়সম্পত্তির অধিকারী হইবে। যদিও দুই ভাইয়ে পৃথগল্প ছিলেন তথাপি এই আশায় নবদ্বীপের মা নবদ্বীপকে কিছুতেই চাকরি করিতে দেন নাই, এবং সকাল-সকাল বিবাহ দিয়াছিলেন, এবং শত্রুর মুখে ভস্ম নিক্ষেপ করিয়া বিবাহ নিস্ফল হয় নাই। কিন্তু তথাপি রামকানাই লিখিলেন এবং সই করিবার জন্য কলমটা দাদার হাতে দিলেন। গুরুচরণ নির্জীব হস্তে যাহা সই করিলেন তাহা কতকগুলা কম্পিত বক্ররেখা কি তাহার নাম, বুঝা দুঃসাধ্য।

পাস্তাভাত খাইয়া যখন স্ত্রী আসিলেন তখন গুরুচরণের বাকুরোধ হইয়াছে দেখিয়া স্ত্রী কাদিতে লাগিলেন। যাহারা অনেক আশা করিয়া বিষয় হইতে বঞ্চিত হইয়াছে তাহারা বলিল ‘মায়াকান্না। কিন্তু সেটা বিশ্বাসযোগ্য নহে।