পাতা:গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/৪৬০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


কি এমনি করিয়া স্খলিত হইয়া যাইবে! তাহাকে রক্ষা করিবার কেহই নাই! যেমন করিয়া হােক ইহার প্রতিরােধ করিতেই হইবে।

 হারানবাবু একখানা কাগজ টানিয়া লইয়া সুচরিতাকে পত্র লিখিতে বসিলেন। হারানবাবুর কতকগুলি বাঁধা বিশ্বাস ছিল। তাহার মধ্যে এও একটি যে, সত্যের দোহাই দিয়া যখন তিনি ভর্ৎসনা প্রয়ােগ করেন তখন তাঁহার তেজস্বী বাক্য নিষ্ফল হইতে পারে না। শুধু বাক্যই একমাত্র জিনিস নহে, মানুষের মন বলিয়া একটা পদার্থ আছে সে কথা তিনি চিন্তাই করেন না।

 আহারান্তে হরিমােহিনীর সঙ্গে অনেক ক্ষণ আলাপ করিয়া গােরা তাহার লাঠি লইবার জন্য যখন সুচরিতার ঘরে আসিল তখন সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে। সুচরিতার ডেস্কের উপরে বাতি জ্বলিতেছে। হারানবাবু চলিয়া গেছেন। সুচরিতার নাম-লেখা একখানি চিঠি টেবিলের উপর শয়ান রহিয়াছে, সেখানি ঘরে প্রবেশ করিলে চোখে পড়ে।

 সেই চিঠি দেখিয়াই গােরার বুকের ভিতরটা অত্যন্ত শক্ত হইয়া উঠিল। চিঠি যে হারানবাবুর লেখা তাহাতে সন্দেহ ছিল না। সুচরিতার প্রতি হারানবাবুর যে একটা বিশেষ অধিকার আছে তাহা গােরা জানিত; সেই অধিকারের যে কোনাে ব্যত্যয় ঘটিয়াছে তাহা সে জানিত না। আজ যখন সতীশ সুচরিতার কানে কানে হারানবাবুর আগমনবার্তা জ্ঞাপন করিল এবং সুচরিতা সচকিত হইয়া দ্রুতপদে নীচে চলিয়া গেল ও অল্পকাল পরেই নিজে তাহাকে সঙ্গে করিয়া উপরে লইয়া আসিল তখন গােরার মনে খুব একটা বেসুর বাজিয়াছিল। তাহার পরে হারানবাবুকে যখন ঘরে একলা ফেলিয়া সুচরিতা গােরাকে খাইতে লইয়া গেল তখন সে ব্যবহারটা কড়া ঠেকিয়াছিল বটে, কিন্তু ঘনিষ্ঠতার স্থলে এরূপ রূঢ় ব্যবহার চলিতে পারে মনে করিয়া গােরা সেটাকে আত্মীয়তার লক্ষণ বলিয়াই স্থির করিয়াছিল। তাহার পরে টেবিলের উপর এই চিঠিখানা দেখিয়া গােরা খুব একটা ধাক্কা পাইল। চিঠি বড়াে একটা রহস্যময় পদার্থ। বাহিরে কেবল নামটুকু দেখাইয়া সব কথাই

৪৫০