বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:পথের পাঁচালী.djvu/৩৮

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৩২
পথের পাঁচালী

 আমি আবার কাকে বল্‌তে যাবো? তা হোক গে সদ্গোপ, দাও গিয়ে দিয়ে, এই কষ্ট যাচ্ছে—ঐ রায়বাড়ীর আটটা টাকা ভরসা, তাও দু তিন মাস অন্তর তবে দ্যায়—আর এদিকে রাজ্যির দেনা। কাল ঘাটের পথে সেজ ঠাকরুণ বল্লে—বৌমা, আমি বন্দক ছাড়া টাকা ধার দিই নে—তবে তুমি অনেক করে বল্লে বলে দিলাম—আজ পাঁচ পাঁচ মাস হয়ে গেল, টাকা আর রাখতে পারবো না। এদিকে রাধা বোষ্টমের বৌ তো ছিঁড়ে খাচ্চে, দুবেলা তাগাদা আরম্ভ করেচে! ছেলেটার কাপড় নেই—দু তিন জায়গায় সেলাই, বাছা আমার তাই পরে হাসিমুখে নেচে নেচে বেড়ায়—আমার এমন হয়েচে যে ইচ্ছে করে একদিকে বেরিয়ে যাই—

 আর একটা কথা ওরা বলছিল, বুঝলে? বলছিল গাঁয়ে তো বামুন নেই আপনি যদি এই গাঁয়ে উঠে আসেন, তবে জায়গা জমি দিয়ে বাস করাই—গাঁয়ে একঘর বামুন বাস করানো আমাদের বড্ড ইচ্ছে। তা কিছু ধানের জমি-টমি দিতেও রাজী—পয়সার তো অভাব নেই। আজকাল চাষাদের ঘরেই লক্ষ্মী বাঁধা—ভদ্দর লোকেরই হয়ে পড়েচে হা ভাত যো ভাত—

 আগ্রহে সর্ব্বজয়ার কথা বন্ধ হইবার উপক্রম হইল—এখ খুনি। তা তুমি রাজী হ'লে না কেন? বল্লেই হোত যে আচ্ছা আমরা আস্‌বো। ও রকম একটা বড় মানুষের আশ্রয়—এ গাঁয়ে তোমার আছে কি? শুধু ভিটে কামড়ে' পড়ে থাকা—

 হরিহর হাসিয়া বলিল—পাগল! তখুনি কি রাজী হ'তে আছে? ছোটলোক, ভাববে ঠাকুরের হাঁড়ি দেখচি শিকেয় উঠেচে—উঁহু, ওতে খেলো হয়ে যেতে হয়—তা নয়, দেখি একবার চুপি চুপি মজুমদার মহাশয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে—আর এখন ওঠ্ বল্লেই কি ওঠা চলে? সব ব্যাটা এসে বল্‌বে টাকা দাও, নৈলে যেতে দেবো না—দেখি পরামর্শ করে কি রকম দাঁড়ায়—

 এই সময়ে মেয়ে দুৰ্গা কোথা হইতে পা টিপিয়া টিপিয়া আসিয়া বাহিরের দুয়ারের আড়াল হইতে সতর্কতার সহিত একবার উঁকি মারিল এবং অপর পক্ষ সম্পূর্ণ সজাগ দেখিয়া ও-ধারে পাঁচিলের পাশ বাহিয়া বাহির-বাটীর রোয়াকে উঠিল। দালানের দুয়ার আস্তে আস্তে ঠেলিয়া দেখিল উহা বন্ধ আছে। এদিকে রোয়াকে দাঁড়ানো অসম্ভব, রৌদ্রের তাপে পা পুড়িয়া যায়, কাজেই সে-স্থান হইতে নামিয়া গিয়া উঠানের কাঁঠালতলায় দাঁড়াইল। রৌদ্রে বেড়াইয়া তাহার মুখ রাঙা হইয়া উঠিয়াছে, আঁচলের খুঁটে কী-কতকগুলা যত্ন করিয়া বাঁধা। সে আসিয়াছিল এই জন্য যে, যদি বাহিরের দুয়ার খোলা পায় এবং মা ঘুমাইয়া থাকে, তবে ঘরের মধ্যে চুপি চুপি ঢুকিয়া একটু শুইয়া লইবে। কিন্তু বাবার, বিশেষত মার সামনে সম্মুখ দুয়ার দিয়া বাড়ী ঢুকিতে তাহার সাহসী হইল না।

 উঠানে নামিয়া সে কাঁঠালতলায় দাঁড়াইয়া কি করিবে ঠিক করিতে না পারিয়া নিরুৎসাহভাবে এদিক ওদিক চাহিতে লাগিল। পরে সেখানেই বসিয়া পড়িয়া আঁচলের খুঁট খুলিয়া কতকগুলি শুক্‌নো রড়া ফলের বীচি বাহির করিল। খানিকক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া সে আপন মনে সেগুলি গুনিতে আরম্ভ করিল, এক—দুই—তিন—চার—ছাব্বিশটা হইল। পরে সে দুই তিনটা করিয়া বীচি হাতের