অপু বলিল—উঃ, অনেক রে দিদি!—একটা কঞ্চি দিয়ে পাড়া যায় না?
দুৰ্গা বলিল—তুই এক কাজ কর্, ছুটে গিয়ে বাড়ীর মধ্যে থেকে আঁকুষিটা নিয়ে আয় দিকি? আঁকুষি দিয়ে টান দিলে পড়ে যাবে দেখিস এখন—
অপু বলিল—তুই এখানে দাঁড়া দিদি, আমি আন্চি—
অপু আঁকুষি আনিলে দুজনে মিলিয়া বহু চেষ্টা করিয়াও চার পাঁচটার বেশী ফল পাড়িতে পারিল না—খুব উঁচু গাছ, সর্ব্বোচ্চ ডালে যে ফল আছে তাহা দুৰ্গা আঁকুষি দিয়াও নাগাল পাইল না। পরে সে বলিল—চল্ আজ এইগুলো নিয়ে যাই, নাইবার বেলায় মাকে সঙ্গে আন্বো—মার হাতে ঠিক নাগাল আস্বে। দে নোনাগুলো আমার কাছে, তুই আঁকুষিটা নে। নোলক পরবি?
একটা নীচু ঝোপের মাথায় ওড়-কল্মী লতায় শাদা শাদা ফুলের কুঁড়ি, দুৰ্গা হাতের ফলগুলা নামাইয়া নিকটের ফুলের কুঁড়ি ছিড়িতে লাগিল। বলিল—এদিকে সরে আয়, নোলক পড়িয়ে দি—
তাহার দিদি ওড়্কলমী ফুলের নোলক পরিতে ভালোবাসে, বনজঙ্গল সন্ধান করিয়া সে প্রায়ই খুঁজিয়া আনিয়া নিজে পড়ে ও ইতিপূর্ব্বে কয়েকবার অপুকেও পরাইয়াছে। অপু কিন্তু মনে মনে নোলক-পরা পছন্দ করে না। তাহার ইচ্ছা, বলে, নোলকে তাহার দরকার নাই। তবে দিদির ভয়ে সে কিছুই বলিল না। দিদিকে চটাইবার ইচ্ছা তাহার আদৌ নাই, কারণ দিদিই বনজঙ্গল ঘুরিয়া কুলটা, জামটা, নোনাটা, আমড়াটা সংগ্রহ করিয়া তাহাকে লুকাইয়া খাওয়ায়, এমন সব জিনিস জুটাইয়া আনে, যাহা হয়তো কুপথ্য হিসাবে উহাদের খাইতে নিষেধ আছে। কাজেই অন্যায় হইলেও দিদির কথা না শুনা তাহার সাহসে কুলায় না।
দুর্গা একটা কুঁড়ি ভাঙিয়া সাদা জলের মত যে আঠা বাহির হইল, তাহার সাহায্যে দুৰ্গা অপুর নাকে কুঁড়িটি আঁটিয়া দিল, পরে নিজেও একটা পরিল—তারপর ভাইয়ের চিবুকে হাত দিয়া নিজের দিকে ভালো করিয়া ফিরাইয়া বলিল—দেখি, কেমন দেখাচ্ছে? বাঃ বেশ হয়েচে—চল্ মাকে দেখাইগে—
অপু লজ্জিতমুখে বলিল—না দিদি—
—চল্ না—খুলে ফেলিস্নে যেন—বেশ হয়েচে—
বাড়ি আসিয়া দুৰ্গা নোনাফলগুলি রান্নাঘরের দাওয়ায় নামাইয়া রাখিল। সর্ব্বজয়া রাঁধিতেছিল––দেখিয়া খুব খুশি হইয়া বলিল—কোথায় পেলি রে?
দুৰ্গা বলিল—ঐ লিচু-জঙ্গলে—অনেক আছে, কাল গিয়ে তুমি পাড়বে মা? এমন পাকা—একেবারে সিঁদুরের মতো রাঙা—
সে আড়াল ছাড়িয়া দাঁড়াইয়া বলিল—দ্যাখো মা—
অপু নোলক পরিয়া দিদির পিছনে দাঁড়াইয়া আছে। সর্ব্বজয়া হাসিয়া বলিল—ও মা! ও আবার কে রে?—কে চিন্তে তো পারচি নে?—
অপু লজ্জায় তাড়াতাড়ি নাকের ডগা হইতে ফুলের কুড়ি খুলিয়া ফেলিল!—বলিল—ঐ দিদি পরিয়ে দিয়েচে—