পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২০৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেবী চৌধুরাণী a. SS बर्छ পরিচ্ছেদ সাগর শ্বশুড়বাড়ী আসিয়া দুইটি ঘর পাইয়াছিল, একটি নীচে—একটি উপরে । নীচের ঘরে বসিয়া সাগর পান সাঞ্জিত, সমবয়স্কাদিগের সঙ্গে খেলা করিত কি গল্প করিত। উপরের ঘরে রাত্রে শুইত ; দিনমানে নিদ্রা আসিলে সেই ঘরে গিয়া দ্বার দিত । অতএব ব্ৰজেশ্বর ব্ৰহ্মঠাকুরাণীর রূপকথার জাল এড়াইয়া সেই উপরের ঘরে গেলেন । সেখানে সাগর নাই—কিন্তু তাহার পরিবর্তে আর এক জন কে আছে । অনুভবে বুঝিলেন, এই সেই প্রথমা স্ত্রী । বড় গোল বাধিল । দুই জনে সম্বন্ধ বড় নিকট । স্ত্রী পুরুষ, পরস্পরে অৰ্দ্ধাঙ্গ ; পৃথিবীর মধ্যে সৰ্ব্বাপেক্ষ ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ । কিন্তু কখনও দেখা নাই । কখনও কথা নাই । কি বলিয়া কথা আরম্ভ হইবে ? কে আগে কথা কহিবে ? বিশেষ এক জন তাড়াইতে আসিয়াছে, আর এক জন তাড়া খাইতে আসিয়াছে। আমরা প্রাচীন। পাঠিকাদিগকে জিজ্ঞাসা করি, কথাটা কি রকমে আরম্ভ হওয়া উচিত ছিল ? উচিত যাহাই হউক, উচিতমত কিছুই হইল না। প্রথমে দুই জনের এক জনও অনেকক্ষণ কথা কহিল না । শেষে প্রফুল্ল অল্প, অল্পমাত্র হাসিয়া, গলায় কাপড় দিয়৷ ব্ৰজেশ্বরের পায়ের গোড়ায় আসিয়৷ টিপ করিয়া একটা প্রণাম করিল , ব্ৰজেশ্বর বাপের মত নহে। প্রণাম গ্ৰহণ করিয়া, অপ্রতিভ হইয়া, বাহু ধরিয়া প্রফুল্লকে উঠাইয়া পালঙ্কে বসাইল । বসাইয়। আপনি কাছে বসিল । প্রফুলের মুখে একটু ঘোমটা ছিল—সে কালের মেয়েরা এ কালের মেয়েদের মত নহে--ধিক্ এ কাল ! তা সে ঘোমটাটুকু, প্রফুল্লকে ধরিয়া বসাইবার সময়ে সরিয়া গেল। ব্রজেশ্বর দেখিল ষে, প্রফুল্প কঁদিতেছে। ব্ৰজেশ্বর না বুঝিয়া সুঝিয়া—আ ছি ছি ছি! বাইশ বছর বয়সেই ধিক্ ! ব্রজেশ্বর না বুঝিয়া স্বৰিয়া, না ভাবিয়া চিস্তিয়া, যেখানে বড় ডবর্ডবে চোখের নীচে দিয়া এক ফোটা জল গড়াইয়া আসিতেছিল—সেই স্থানে—আ ছি! ছি t—ব্রজেশ্বর হঠাৎ চুম্বন করিলেন । গ্রন্থকার প্রাচীন—লিখিতে লজ্জা নাই—কিন্তু ভরসা করি, মার্জিতরুচি নবীন পাঠক এইখানে এ বই পড়া বন্ধ করিবেন । *r যখন ব্রজেশ্বর এই ঘোরতর অশ্লীলতাদোযে নিজে দূষিত হইতেছিলেন এবং গ্রন্থকারকে সেই দোষে দূষিত করিবার কারণ হইতেছিলেন –ষখন নিৰ্ব্বোধ প্রফুল্ল মনে মনে ভাবিতেছিল যে, বুঝি এই মুখচুম্বনের মত পবিত্র পুণ্যময় কৰ্ম্ম ইহুঙ্কগতে কখনও কেহ করে নাই, সেই সময়ে দ্বারে কে মুখ বাডাইল। মুখখান বুঝি অল্প একটু হাসিয়াছিল -কিন্তু ষার মুখ, তার হাতের গহনার বুঝি একটু শব্দ হইয়াছিল- তাই ব্ৰজেশ্বরের কান সে দিকে গেল । ব্রজেশ্বর সে দিকে চাহিয়া দেখিলেন । দেখিলেন, মুখখানা বড় সুন্দর। কাল কুচকুচে কোকড়া কেঁকড়া ঝাপটায় বেড়া - তখন মেয়ের ঝাপটা রাখিত –তার উপর একটু ঘোমটা টানা—ঘোমটার ভিতর দুইটি পদ্মপলাশচক্ষু ও দুইখানা পাতলা রাঙ্গা ঠোট মিঠে মিঠে হাসিতেছে, ব্ৰজেশ্বর দেখিলেন, মুখখান সাগরের। সাগর স্বামীকে একটা চাবি ও কুলুপ দেখাইল । সাগর ছেলেমানুষ ; স্বামীর সঙ্গে জিয়াদা কথা কয় না। ব্রজ কিছু বুঝিতে পারিলেন না। কিন্তু বুঝিতে বড় বিলম্বও হইল না। সাগর বাহির হইতে কপাট টানিয়া দিয়া, শিকল লাগাইয়। কুলুপে চাবি ফিরাইয়া বন্ধ করিয়৷ চূড় ছড় করিয়া ছুটিয়া পলাইল। ব্রজেশ্বর কুলুপ পড়িল, শুনিতে পাইয়l, “কি কর সাগর ! কি কর সাগর ” বলিয়া চেঁচাইল । সাগর কিছুতেই কান না দিয়া দুড়"ড় ঝম্ ঝম্ করিয়া ছুটিয়া একেবারে ব্রহ্মঠাকুরাণীর বিছানায় গিয়া শুইয়া পড়িল । ব্ৰহ্মঠাকুরাণী বলিলেন, “কি লা সাগর বউ ? কি হয়েছে ? এখানে এসে গুলি যে ?” সাগর কথা কয় না । বৃহ্ম । তোকে ব্রজ তাড়িয়ে দিয়েছে না কি ? স। ত নইলে আর তোমার আশ্রমে আসি ? আজ তোমার কাছে শোব। ব্ৰহ্ম । ত শো শো ! এখনই আবার ডাকৃবে এখন ! আহা ! তোর ঠাকুরদাদা এমন বারো মাস ত্রিশ দিন আমার তাড়িয়ে দিয়েছে। আবার, তখনই ডেকেছে—আমি আরও রাগ ক’রে যেতাম না—তা মেয়েমানুষের প্রাণ ভাই । থাকতেও পারিতাম না । এক দিন হলো কি— স। ঠানদিদি, একটা রূপকথা বল না— ব্ৰহ্ম । কোনটা বলুবো, বিহঙ্গমা-বিহঙ্গমীর কথ। বলুবো? একলা শুনৃবি ? তা নুতন বউট কোথায় ? তাকে ডাক্‌ না —দু'জনে গুম্‌বি । স। সে কোথা, আমি এখন খুঁজতে পারি না । আমি একাই শুনুবো । তুমি বল ।