পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/২১২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


سالا রাজা নীলাম্বর দেব । নীলাম্বরের অনেক রাজধানী ছিল—অনেক নগরে অনেক রাজভবন ছিল । এই একটি রাজভবন । এখানে বৎসরে দুই এক সপ্তাহ বাস করিতেন । গৌড়ের বাদশাহ একদা উত্তরবাঙ্গাল জয় করিবার ইচ্ছায় নীলাম্বরের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করিলেন । নীলাম্বর বিবেচনা করিলেন যে, কি জানি, যদি পাঠানের রাজধানী আক্রমণ করিয়া অধিকার করে, তবে পূৰ্ব্বপুরুষদিগের সঞ্চিত ধনরাশি তাহাদের হস্তগত হইবে । আগে সাবধান হওয়া ভাল । এই বিবেচনা করিয়া যুদ্ধের পূৰ্ব্বে নীলাম্বর অতি সঙ্গোপনে রাজভাণ্ডার হইতে ধনসকল এইখানে আনিলেন ; স্বহস্তে তাহ মাটীতে পুতিয়া রাখিলেন । আর কেহ জানিল না যে, কোথায় ধন রহিল । যুদ্ধে নীলাম্বর বন্দী হইলেন । পাঠান-সেনাপতি তাহাকে গৌড়ে চালান করিল। তার পর আর তাহাকে মনুষ্য লোকে কেহ দেখে নাই । র্তাহার শেষ কি হইল, কেহ জানে না । তিনি আর কখনও দেশে ফেরেন নাই । সেই অবধি তাহার ধনরাশি সেইখানে পোত রহিল । সেই ধনরাশি কৃষ্ণগোবিন্দ পাইল । সুবৰ্ণ, হীরক, মুক্ত, প্রবাল অসংখ্য—অগণ্য, কেহ স্থির করিতে পারে না কত । কৃষ্ণগোবিন্দ কুড়ি ঘড়া এইরূপ ধন পাইল । কৃষ্ণগোবিন্দ ঘড়াগুলি সাবধানে পুতিয়া রাখিল । বৈষ্ণবীকে একদিনের তরেও এ ধনের কথা কিছু জানিতে দিল না। কৃষ্ণগোবিন্দ আতিশয় কৃপণ, ইহা হইতে একটি মোহর লইয়াও কখনও খরচ করিত না। এ ধন গায়ের রক্তের মত বোধ করিত । সেই ভীড়ের টাকাতেই কায়ক্লেশে দিন চালাইতে লাগিল । সেই ধন এখন প্রফুল্ল পাইল । ঘড়াগুলি বেশ করিয়া পুতিয়া রাখিয়া আসিয়া প্রফুল্ল শয়ন করিল। সমস্ত দিনের পরিশ্রমের পর সেই বিচালীর বিছানায় প্রফুল্ল শীঘ্রই নিদ্রায় অভিভূত হইল । দশম পরিচ্ছেদ এখন একটু ফুলমণির কথা বলি । ফুলমণি নাপিতানী হরিণীর ন্যায়, বাছিয়া বাছিয়া দ্রুতপদ জীবে প্রাণ সমর্পণ করিয়াছিল । ডাকাইতের ভয়ে দুর্লভচন্দ্র আগে আগে পলাইলেন, ফুলমণি পাছু পাছু ছুটিয়া গেল, কিন্তু ফুলভের এমনই পলাইবার রেখ যে, তিনি পশ্চাদ্ধাবিত প্রণয়িনীর কাছে নিতান্ত দুর্লভ হইলেন । ফুলমণি যত ডাকে, “ওগো, দাড়াও গো ! অামায় ফেলে ষেও না গো !” ভূলভচন্দ্র তত ডাকে, “ও বাবা গো ! ঐ এলে গে৷ ” কাটাবনের ভিতর দিয়া, পগার লাফাইয়া, কাদ। ভাঙ্গিয়া উৰ্দ্ধশ্বাসে দুর্লভ ছোটে-হায় ! কাছ খুলিয়া গিয়াছে, এক পায়ের নাগরা জুতা কোথায় পড়িয়া গিয়াছে, চাদরখানা একটা কাটাবনে বিধিয়া তাহার বীরত্বের নিশানস্বরূপ বাতাসে উড়িতেছে। তখন ফুলমণি মুন্দরী হাকিল, “ও অধঃপেতে মিনৃষে—ওরে মেয়েমানুষকে ভুলিয়ে এনে এমনি ক’রে কি ডাকাতের হাতে সঁপে দিয়ে যেতে হয় রে—মিন্‌ষে ?” শুনিয়া দুর্লভচন্দ্র ভাবিলেন, তবে নিশ্চিত ইহাকে ডাকাইতে ধরিয়াছে ! অতএব ভুলভচন্দ্র বিনা বাক্যব্যয়ে আরও বেগে ধাবমান হইলেন । ফুলমণি ডাকিল, “ও অধঃপেতে, ও পোড়ারমুখে-ও আঁটকুড়ীর পুত—ও হাবাতে —ও ড্যাক্রা-ও বিটুলে ।” ততক্ষণ দুর্লভ অদৃষ্ঠ হইল। কাজেই ফুলমণিও গলাবাজি ক্ষান্ত দিয়ার্কাদিতে আরম্ভ করিল । রোদনকালে দুৰ্লভের মাতাপিতার প্রতি মানাবিধ দোষারোপ করিতে লাগিল । এ দিকে ফুলমণি দেখিল, কৈ, ডাকাইতেয়া ত কেহ আসিল না । কিছুক্ষণ দাড়াইয়া ভাবিল—কান্না বন্ধ করিল । শেষ দেখিল, ন ডাকাইত আসে, ন দুর্লভচন্দ্র দেখা দেয় । তখন জঙ্গল হইতে বাহির হইবার পথ খুজিতে লাগিল । তাহার ন্যায় চতুরার পক্ষে পথ পাওয়া বড় কঠিন হইল না । সহজেই বাহির হইয়। সে রাজপথে উপস্থিত হইল । কোথাও কেহ নাই দেখিয় সে গৃহাভিমুখে ফিরিলশ ফুলভের উপর তখন বড় রাগ । অনেক বেলা হইলে ফুলমণি ঘরে পৌঁছিল। দেখিল, তাহার ভগিনী অলকমণি ঘরে নাই, স্নানে গিয়াছে । ফুলমণি কাহাকে কিছু না বলিয়া কপাট ভেজাইয়া শয়ন করিল । রাত্রে নিদ্র হয় নাই—ফুলমণি গুইবামাত্র ঘুমাইয়া পড়িল । তাহার দিদি আসিয় তাহাকে উঠাইল—জিজ্ঞাসা করিল, “কি লা—তুই এখন এলি ?” ফুলমণি বলিল, “কেন, আমি কোথায় গিয়াছিলাম ?” অলকমণি। কোথায় আর যাবি ? বামুনদের বাড়ীতে শুতে গিয়াছিলি, তা এত বেলা অবধি এলি नl, তাই জিজ্ঞাসা করছি s' ... s. ফুল । তুই চোখের মাথা খেয়েছিল, তার কি হবে ? ভোরের বেলা তোর স্বমুখ দিয়ে এসে শুলেম । —দেখিসনে ? mor অলকমণি বলিল, “সে কি বোন, আমি ভোর বেলা থেকে তিনবার বামুনদের বাড়ী গিয়ে তোকে