পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (তৃতীয় ভাগ).djvu/৮৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


: চন্দ্রশেখর । ఏ' সহসা সোধোপরি হইতে পেচকের গভীর কণ্ঠ শ্রীত্ব হইল । তখন চন্দ্রশেখর অনেক রাত্রি হইয়াছে বুঝিয়া, পুতি বাধিলেন। সে সকল যথাস্থানে রক্ষা করিয়া আলস্তবশতঃ দণ্ডায়মান হইলেন । মুক্ত বাতায়নপথে কৌমুদী-প্রফুল্ল প্রকৃতির শোভার প্রতি দৃষ্টি পড়িল । বাতায়ন-পথে সমাগত চন্দ্রকিরণ সুপ্ত সুন্দরী শৈব" লিনীর মুখে নিপতিত হইয়াছে। চন্দ্রশেখর প্রফুল্লচিত্তে দেখিলেন, তাহার গৃহসরোবরে চন্দ্রের আলোতে পদ্ম ফুটিয়াছে। তিনি দাড়াইয়া, দাড়াইয়া, দাড়াইয়৷ বহুক্ষণ ধরিয়া প্রীতি-বিষ্ফারিত নেত্ৰে শৈবলিনীর অনিন্দ্যসুন্দর মুখমণ্ডল নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন । দেখিলেন, চিত্রিত ধনুঃখণ্ডবৎ নিবিড়কৃষ্ণ জযুগতলে মুদ্রিত পদ্মকোরকসদৃশ লোচন-পদ্ম দুটি মুদিয়৷ রহিয়াছে ;–সেই প্রশস্ত নয়নপল্লবে সুকোমলা সমগামিনী রেখা দেখিলেন । দেখিলেন, ক্ষুদ্র কোমল করপল্লব নিদ্রাবেশে কপোলে দ্যস্ত হইয়াছে—যেন কুমুমরাশির উপরে কে কুমুমরাশি ঢালিয়া রাখিয়াছে। মুখমণ্ডলে করসংস্থাপনের কারণে সুকুমার রসপূর্ণ তাম্বুল রাগরক্ত ওষ্ঠাধর ঈষদুভিয় করিয়া, মুক্তাসদৃশ দস্তশ্রেণী কিঞ্চিম্মাত্র দেখা দিতেছে । একবার যেন, কি সুখ-স্বপ্ন দেখিয়। সুপ্ত। শৈবলিনী ঈষৎ হাসিল— যেন একবার জ্যোৎস্নার উপর বিদ্যুৎ হইল ! আবার সেই মুখমণ্ডল পূৰ্ব্ববং সুষুপ্তিসুস্থির হইল । সেই বিলাসচাঞ্চল্য-শূন্ত সুমুপ্তি মুস্থির বিংশতিবর্ষীয় যুবতীর প্রফুল্ল মুখমণ্ডল দেখিয়া চন্দ্রশেখরের চক্ষে অশ্রু বহিল । চন্দ্রশেখর শৈবলিনীর স্থাপ্তি-সুস্থির মুখমণ্ডলের সুন্দর কান্তি দেখিয়া অশ্রমোচন করিলেন । ভাবিলেন, “হায় ! কেন আমি ইহাকে বিবাহ করিয়াছি ? এ কুসুম রাজমুকুটে শোভা পাইত । শাস্ত্রানুশীলনে ব্যস্ত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের কুটীরে এ রত্ন আনিলাম কেন ? আনিয়া আমি সুখী হইয়াছি সন্দেহ নাই, কিন্তু শৈবলিনীর তাহাতে কি সুখ ? আমার মে বয়স, তাহাতে আমার প্রতি শৈবলিনীর অমুরাগ অসম্ভব—অথবা আমার প্রণয়ে তাহার প্রণয়াকাজক্ষা নিবারণের সম্ভাবনা নাই । বিশেব, আমি ত সৰ্ব্বদা আমার গ্রন্থ লইয়া বিত্ৰত ; আমি শৈবলিনীর সুখ কখনৃ ভাবি ? আমার গ্রন্থগুলি তুলিয়া পাড়িয়া এমন নব যুবতীর কি মুখ ? আমি নিতাস্ত আত্মসুখপরায়ণ-সেই জন্যই ইহাকে বিবাহ করিতে প্রবৃত্তি হইয়াছিল । এক্ষণে আমি কি করিব ? এই ক্লেশসঞ্চিত পুস্তকরাশি জলে ফেলিয়া দিয়া আসিয়া রমণীমুখপদ্ম কি জন্মের সারভূত ৩ছু—১১ করিব ? ছি ছি! তাহ পারিব না । তবে কি এই নিরপরাধিনী শৈবলিনী আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবে ? এই সুকুমার কুসুমকে কি অতৃপ্ত যৌবনতাপে দগ্ধ করিবার জন্তই বৃত্তচু্যত করিয়াছিলাম ?” এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে চন্দ্রশেখর আহার করিতে ভুলিয়া গেলেন । পরদিন প্রাতে মীর মুন্সীর নিকট হইতে সংবাদ আসিল, চন্দ্রশেখরকে মুরশিদাবাদ যাইতে হইবে । নবাবের কাজ আছে। তৃতীয় পরিচ্ছেদ লরেন্স ফষ্টর বেদগ্রামের অতি নিকটে পুরন্দরপুর নামক গ্রামে ইষ্ট ইণ্ডিয়৷ কোম্পানীর রেশমের একটি ক্ষুদ্র কুঠী ছিল । লরেন্স ফষ্টর তথাকার ফ্যাক্টর বা কুঠীয়াল । লরেন্স অল্পবয়সে মেরি ফক্টরের প্রণয়কাজক্ষায় হতাশ্বাস হইয়া, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর চাকরী স্বীকার করিয়া বাঙ্গালায় আসিয়াছিলেন । এখনকার ইংরেজদিগের ভারতবর্ষে আসিলে যেমন নানাবিধ শারীরিক রোগ জন্মে, তখন বাঙ্গালার বাতাসে ইংরেজদিগের অর্থাপহরণ রোগ জন্মিত । ফষ্টর অল্পকালেই সে রোগে আক্রান্ত হইয়াছিলেন। স্বতরাং মেরির প্রতিমা তাহার মন হইতে দূর হইল। একদা তিনি প্রয়োজনবশতঃ বেদগ্রামে গিয়াছিলেন— ভীম পুষ্করিণীর জলে প্রফুল্ল পদ্মস্বরূপ শৈবলিনী তাহার নয়নপথে পড়িল । শৈবলিনী গোরা দেখিয়া পলাইয়া গেল। কিন্তু ফষ্টর ভাবিতে ভাবিতে কুঠতে ফিরিয়৷ গেলেন । ফষ্টর ভাবিয়া ভাবিয়া সিদ্ধান্ত করিলেন যে, কটা চক্ষের অপেক্ষা কাল চক্ষু ভাল এবং কট। চুলের অপেক্ষা কাল চুল ভাল। অকস্মাৎ তাহার স্মরণ হইল যে, সংসারসমুদ্রে স্ত্রীলোক তরণীস্বরূপ—সকলেরই সে আশ্রয় গ্ৰহণ করা কৰ্ত্তব্য —যে সকল ইংরেজ এ দেশে আসিয়া পুরোহিতকে ফাকি দিয়। বাঙ্গালী সুন্দরীকে এ সংসারে সহায় বলিয়া গ্রহণ করেন, র্তাহারা মন্দ করেন না”। অনেক বাঙ্গালীর মেয়ে ধনলোভে ইংরেজ ভজিয়াছে— শৈবলিনী কি ভজিবে না? ফষ্টর কুঠীর কারকুনকে সঙ্গে করিয়া আবার বেদগ্রামে আসিয়া বনমধ্যে লুকাইয়া রছিলেন। কারকুন শৈবলিনীকে দেখিল— তাহার গৃহ দেখিয়া আসিল ।