পাতা:বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস গ্রন্থাবলী (দ্বিতীয় ভাগ).djvu/১৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।

দুর্গেশনন্দিনী তিলোত্তমার বয়স যোড়শ বৎসর, সুতরাং তঁাহার দেহায়তন প্ৰগল্‌ভবয়সী রমণীদিগের ন্যায় অস্থাপি সম্পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় নাই। দেহায়তনে ও মুখাবয়বে কিঞ্চিৎ বালিকাভাব ছিল । সুগঠিত সুগোল ললাট, অপ্রশস্ত নহে, অথচ অতি প্রশস্তও নহে, নিশীথকৌমুদীদীপ্ত নদীর স্থায় প্রশান্তভাব-প্রকাশক ; তৎপাশ্বে অতি নিবিড়বর্ণ কুঞ্চিভালক কেশসকল ক্রযুগে, কপোলে, গণ্ডে, অংসে উরসে আপিয়া পড়িয়াছে ; মস্তকের পশ্চাদ্ভাগে অন্ধকারময় কেশরাশি সুবিন্যস্ত মুক্তাহারে গ্রথিত রহিয়াছে ; ললাটতলে ক্রযুগ সুবঙ্কিম, নিবিড়বর্ণ, চিত্রকর-লিখিতবৎ হইয়াও কিঞ্চিৎ অধিক স্বল্পীকার, অার এক স্থত স্কুল হইলে নির্দোষ হইত। পাঠক কি চঞ্চল চক্ষু ভালবাস ? তবে তিলোত্তম তোমার মনোরঞ্জনী হইতে পারিবে না। তিলোত্তমার চক্ষু অতি শান্ত, তাহাতে বিদ্যুদাম ফুরণচকিত কটাক্ষনিক্ষেপ হইত না, চক্ষু দুটি অতি প্রশস্ত, অতি সুঠাম, অতি শাস্তজ্যোতিঃ । আর চক্ষুর বর্ণ উলাকালে স্বৰ্য্যোদয়ের কিঞ্চিৎ পূৰ্ব্বে চন্দ্রাস্তের সময়ে আকাশের যে কোমল নীলবর্ণ প্রকাশ পায়, সেইরূপ ; সেই প্রশস্ত পরিষ্কার চক্ষে যখন তিলোত্তম দৃষ্টি করিতেন, তখন তাঁহাতে কিছুমাত্র কুটিলতা থাকিত না ; তিলোত্তম অপাঙ্গে অৰ্দ্ধবৃষ্টি করিতে জানিতেন না ; দৃষ্টিতে কেবল স্পষ্টত আর সরলতা ; দৃষ্টির সরলতাও বটে, মনের সরলতাও বটে ; তবে যদি ঠাহীর পানে কেহ চাহিয়া দেখি ত, তবে তৎক্ষণাৎ কোমল পল্লব দুখানি পড়িয়া যাইত, তিলোত্তম তখন ধরাতল ভিন্ন অন্যত্র দৃষ্টি করিতেন মা ! ওষ্ঠাধর দুইখানি গোলীবী, রসে টলমল করিত ; ছোট ছোট, একটু ঘুরান, একটু ফুলান, একটু হাসি হাসি ; সে ওষ্ঠাধরে যদি একবার হালি দেখিতে, তবে যোগী হও, মুনি হও, যুব হও, বৃদ্ধ হও, আর ভুলিতে পারিতে না । অথচ সে হাসিতে সরলতা ও বালিকাভাব ব্যতীত আর কিছুই ছিল মা । তিলোত্তমার শরীর মুগঠন হইয়াও পূর্ণায়ত ছিল না ; বয়সের নবীনতা প্রযুক্তই হউক বা শরীরের স্বাভাবিক গঠনের জন্তই হউক, এই সুন্দর দেহে ক্ষীণতা ব্যতীত স্থূলতাগুণ ছিল না। অথচ তম্বীর শরীরমধ্যে সকল স্থানই স্বগোল আর সুললিত । স্বগোল প্রকোষ্ঠে রত্নবলয় ; স্বগোল বহুতে হীরকমণ্ডিত তাড় ; স্বগোল অঙ্গুলিতে অঙ্গুরীয় ; স্বগোল উরুতে মেখলা ; সুগঠন অংসোপয়ে স্বর্ণকার ; স্নগঠন কণ্ঠে রত্নকন্ঠী, সৰ্ব্বত্রের গঠন সুন্দর । ృతి তিলোত্তম একাকিনী কক্ষবাতায়নে বসিয়া কি করিতেছেন ? সায়াহ-গগনের শোভা নিরীক্ষণ করিতেছেন ? তাহা হইলে ভূতলে চক্ষু কেন ? নদীতীরজ কুস্থ যমুবাসিত বায়ুসেবন করিতেছেন ? তাহা হইলে লাটে বিন্দু বিন্দু ঘৰ্ম্ম হইবে কেন ? মুখের এক পাশ্ব ব্যতীত ত বায়ু লাগিতেছে না। গোচারণ দেখিতেছেন ? তাও নয়, গাভী সকল ত ক্রমে ক্রমে গৃহে আসিল । কোকিলরব শুনিতেছেন ? তবে মুখ এত স্নান কেন ? তিলোত্তম কিছুই দেখিতেছেন না, শুনিতেছেন না—চিন্তা করিতেছেন । দাসীতে প্রদীপ জালিয়৷ আনিল । তিলোত্তম চিন্তা ভ্যাগ করিয়! একখানা পুস্তক লইয়া প্রদীপের কাছে বসিলেন । তিলোত্তম পড়িভে জানিতেন ; অভিরাম স্বামীর নিকট সংস্কৃভ পড়িতে শিখিয়াছিলেন । পুস্তকখানি কাদস্বরা । কিয়ৎক্ষণ পড়িয়া বিরক্তি প্রকাশ করিয়া কাদম্বরী পরিত্যাগ করিলেন । আর একখানা পুস্তক আনিলেন, স্নবন্ধুকৃত বাসবদত্ত ; কখন পড়েন, কখন ভাবেন ; আরবার পড়েন , আরবার অন্তমনে ভাবেন ; বাসবদত্তাও ভাল লাগিল না । তাহা ত্যাগ করিয়া গীতগোবিন্দ পড়িতে লাগিলেন ; গীতগোবিনা কিছুক্ষণ ভাল লাগিল, পড়িতে পড়িতে সলজ্জ ঈষৎ হাসি হাসিয়া পুস্তক নিক্ষেপ করিলেন । পরে নিষ্কৰ্ম্ম হইয়া শয্যার উপরে বসিয়া রহিলেন । নিকটে একটা লেখনী ও মসীপাত্র ছিল ; অন্তমনে তাহ লইয়া পালঙ্কের কাঠে এ ত তা “ক” “স” “ম” ঘর, দ্বার, গাছ, মানুষ ইত্যাদি লিখিতে লাগিলেন, ক্রমে ক্রমে খাটের এক বাজু কালীর চিহ্নে পরিপূর্ণ হইল ; যখন আর স্থান নাই, তখন সে বিষয়ে চেতন হইল । নিজ কাৰ্য্য দেখিয়। ঈষৎ হাস্ত করিলেন ; আবার কি লিৰিয়াছেন, তাহা হাসিতে হাসিতে পড়িতে লাগিলেন । কি লিখিয়াছেন ? “বাসবদত্তা”, “মহাশ্বেতা”, “ক”, “ঞ্জ", “ই”, “প”, একটা বৃক্ষ, সেঁজুতির শিব, “গীতগোবিনা” “বিমলা”, লতা, পাতা, হিজি, বিজি, গড়—সৰ্ব্বনাশ, আর কি লিথিয়াছেন—- “কুমার জগৎসিংহ” লজ্জায় তিলোত্তমার মুখ রক্তবর্ণ হইল । নিৰ্ব্বদ্ধি ! ঘরে কে আছে ষে লজ্জা ? "কুমার জগৎসিংহ ।" তিলোত্তম দুইবার, তিনবার, বহুবার পাঠ করিলেন, দ্বারের দিকে চাহেন অীয় পাঠ করেন, গুণধার গঙ্কেণ অfর পাঠ করেন, ধেন চোর চুরি করিম্ভেছে ।